
সত্তর দশকের শেষ কিংবা আশির দশকের শুরুর দিকের কথা—‘নারী সঙ্গীত’ বইটি কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। বারনির (বান্নি/বারুনি) মেলা সারাদিন তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষপর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে ‘চাইরানা’ দিয়ে একটা লাল আইসক্রিম কিনে চাটতে-চাটতে চিন্তা করতেছিলাম—বাড়ি গিয়ে মাকে কী জবাব দেব!
বল, আড়বাঁশি, বন্দুক, ষাঁড়, হাতি, ঘোড়া, গৌরাঙ্গলাডি, উখড়া, খেলনা;—ঠাম্মার জন্য চুলের টার্সেল, পান, সুপারি, জর্দা;—কর্ত্তার জন্য ‘কমেট সিগারেট’ এবং ছোটবোনের জন্য পালকি, পুতুল, ফিতা, আলতা, চুড়ি, কাজল সবই-তো কিনলাম কিন্তু মায়ের আবদার ‘গানের বই’ শুধু কেনা হলো না! এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকাল। বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে। গাঁয়ের আরো যারা একসঙ্গে বারনিতে এসেছেন সবাই সওদাপাতি সেরে মেলার পাশে হিজল গাছের নিচে বসে দলবেঁধে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করছেন। গণেশদা তো অধৈর্য হয়ে আমাকে বলেই বসলেন :
ল যাই-গা ভাইয়ু, এইফিরা বান্নি’ত বইয়ের দোহান আইছে না।
বেনু কাকা বলতে গেলে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন :
তর মা’র আর খাইয়াদাইয়া কাম নাই, গানের বই আরেকবার পৈইসা দিয়া কিনন লাগেনি। বুড়াব্যট্টাইনের মুখেমুখে কত গান আছে। এইতা লেখত্য হারে না? নাইকাম যত! ল যাই-গা; গান আমি জোগার কইরা দিয়াম নে!
এইকথা শুনে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা হিজল গাছের তলে বসা কানিবাড়ির জেঠিমাও বলতেছেন :
ল রে বাপু যাই গা, আমরার বাড়িত ‘নারী সঙ্গীত’ গানের খাতা আছে, দিয়ামনে তর মা’রে। হাঞ্জা অইয়া যাইতাছে। দেরিং করিছ না।
অপেক্ষারত সকলের মুখে একই কথা—‘ল যাই-গা, ল যাই-গা।’ এদিকে আমাদের অভিবাবক বাপ্পু’র (কাকা) খবর নাই। তিনি কেথায় আছেন কেউ জানেন না। তাকে ছাড়া বাড়ি ফেরাও যাবে না। তাই সবাই বলাবলি করছেন—‘এই মানুষটা বড়ো কু-চালা, সময়জ্ঞিয়ান নাই। যেনও যায়, খবর থাহে না।’
সকলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি আর বেনু কাকা আবার মেলায় গেলাম বাপ্পু’কে খুঁজতে। বারনির এইমাথা থেকে ওইমাথা পর্যন্ত তাকে খুঁজে না পেয়ে যখন হিজলতলিতে ফিরতেছি, তখন চোখে পড়ল মেলার একপাশে একটি দোকানে ক্রেতাদের খুব ভিড়। বিশেষ করে মহিলাদের। কৌতূহলবশত বেনু কাকাকে নিয়ে ভিড় ঠেলে গিয়ে দেখি বইয়ের দোকান। যাত্রাপালা থেকে শুরু করে পুঁথি-পুরাণ-শাস্ত্রগ্রন্থ সবই আছে, তবে গানের চটিবই সবচেয়ে বেশি। নানা লোকমহাজনের রচিত বই। মানুষজন আম কুড়ানোর মতো ধুমধাম যে-যার পছন্দের বই কিনে মূল্য দিয়ে বিদায় হচ্ছে। ভিড় সামলাতে দোকানদার রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল। মায়ের কথামতো মধুরবান্ধা (মধুসূদন দাস রচিত) ‘নারী সঙ্গীত’ বইটি আমি কিনলাম।
মায়ের সংগৃহীত অন্যান্য গানের বইয়ের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠা ছিঁড়ে গেছে তা আমি জানি। তাই মধুরবান্ধা ‘সুর্যব্রত সঙ্গীত’ ও ‘গোপিনী কীর্তন’ আরও দুটি বই কিনে ঊর্ধ্বশ্বাসে হিজলতলিতে ফিরে এসে দেখলাম বাপ্পুসহ সবাই আমাদের অপেক্ষায় পোটলাপুটলি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দাঁড়িয়ে আছে। যেন আমি আর বেনু কাকা এলেই হাঁটা শুরু হবে। আমার হাতে তিন-তিনটি বই দেখে কানিবাড়ির জেঠিমা তো বেঁকে বসলেন। তাকেও অন্তত ‘গোপিনী কীর্তন’-র একটি বই কিনে দিতেই হবে। কিন্তু কেউ আর অপেক্ষা করতে রাজি না। অনেকে তো বিরক্ত হয়ে পা চালিয়ে দিয়েছেন বাড়ির পথে। একটু আগে বাপ্পুকে যে-জেঠি ‘কু’চালা মানুষ’ বলে মন্দ চারিকথা বলছিলেন, সেই জেঠিকে এই সুযোগে বাপ্পু বলে উঠলেন—‘অহ! নিজের বেলা ষোলআনা! অন্নে দেরি অয় না?’ জেঠিমা কিছুটা নত হয়ে কথায় রংরস লাগিয়ে বাপ্পু’র নাম ধরে বললেন :
হুন অরি (হরিধন), আমার ছেরার ‘গোপিনী কীর্তন’ মানত। এইবার দিতেই অইব। বইডা লইয়াউক। এট্টু দেরিং অইলে কিছতা অইত না।
সদানন্দ বাপ্পু মৌন সম্মতি দিলেন। জেঠির কথায় সায় দিয়ে কেউ কেউ অপেক্ষা করলেন, অনেকে আবার ঢিলেঢালা তালে হাঁটতে হাঁটতে অপেক্ষার মহড়া দিতে শুরু করলেন। বাপ্পুর অনুমতি পেয়ে আমি একদৌড়ে দোকান থেকে বইটা কিনে আনলাম। ‘গোপিনী কীর্তন’ বই পেয়ে জেঠিমার কী-যে আনন্দের হাসি! বইয়ের জন্য এমন হাসি দেখার সৌভাগ্য আমার অধ্যাবধি হয়নি।

গণেশ’দা এবং বেনু’ কাকা মাথায় করে বারনি আর গিরস্তালি সওদাপাতি নিয়ে হাঁটছেন। বাপ্পু অভিভাবক হিসেবে বিড়ি টানতে টানতে আয়েশ করে হাঁটছেন, আর সওদাপাতি কেনাকাটার হিসেব করছেন। এদিকে বেনু কাকা এবং গণেশদা প্রতিযোগিতায় আছেন কে আগে পাবেন বাপ্পুর কাছ থেকে বিড়ির শেষ অংশ। অনেক দূরের পথ। হাঁটতে হাঁটতে অনেক বিড়ি খাওয়া হলো। আমি ফুটবলে লাথি আর বন্দুকের গুলি ছুড়তে ছুড়তে একইপথ কতবার-যে আগপিছ করে হেঁটেছি তার হিসেব নেই। ক্লান্তিও নেই। জেঠিমার মাথায় ‘গোপিনী কীর্তন’ গান আর বাপ্পু’র মাথায় বারনির কেনাকাটার হিসাব, তাই তারাও ক্লান্ত নয়। ক্লান্ত কেবল গনেশদা ও বেনু কাকা। কেননা তাদের মাথায় কেবলি বারনির সওদাপাতি।
পথিমধ্যে খেয়া পারাপার হতে হতে সবাই বিশ্রাম করে নিলেন, আর জেঠিমা এই ফাঁকে ‘গোপিনী কীর্তন’ বইয়ের দু-এক পাতা উলটে-পালটে গানে বিভোর হয়ে কট্টা খুলে পান খেলেন। কেউ আবার খেয়াঘাটের পানিতে পা ভিজিয়ে পথের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার আরাম পেলেন কিছুটা। আমিও পানিতে বলটা ধুয়ে নিলাম। বাপ্পু আরেকটা বিড়ি ধরিয়েছেন তখন। গনেশদা আর বেনু কাকা পুটলি থেকে বের করে খেলনা হাতি-ঘোড়া চিবিয়ে খেয়াঘাটের পানি খেয়ে বিড়ির শেষ অংশের অপেক্ষায়ে থাকলেন। খেয়া পার হতেই জেঠিমা গানে টান দিলেন। ছোঁয়াচ রোগের মতো নিজের অজান্তে পথহাঁটা সকলের মাঝে গানটা ছড়িয়ে পড়ল। সওদাপাতির ভারে নুয়ে পড়া ঘামে ভিজে একশা গনেশদা ও বেনু কাকা পর্যন্ত ক্লান্তি ঝেড়ে জেঠিমার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠলেন :
রানী দেও গো তোমার গোপাল মাঠে লইয়া যাই,
তোমার গোপাল মাঠে গেলে বড়ো সুখ পাই।
মধুরবান্ধা এমন গানে-গানেই বাড়ি ফেরার পথ ফুরাল, গান তবু ফুরাল না। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হলো আমাদের। কূপিবাতির আলোয় গানের বইটা দেখে নিলেন মা। আমাদের গিরস্তি কাজের সহযোগী গনেশদা ও বেনু কাকা বারনি থেকে গানের বই কেনার আদ্যেপান্ত কিচ্ছা বলতে বলতে রাতের খাবার শেষ করে পরের দিনের কাজের দায়দায়িত্ব সমঝে ঘুমাতে গেলেন। বাপ্পু কেনাকাটার হিসাব বাবাকে সমঝে দিয়ে গানের বই নিয়ে দু-চার নাইকথা শুনিয়েও দিলেন। ঠাম্মা বাপ্পুর কথায় বিরক্ত হয়ে বললেন—‘গানের বই ছাড়া গিরস্ত বাড়ির বিধি-ব্যহার কেমনে অয়। বই ত লাগবই।’
এমন সময় শ্যামাচরণ দাদা ঘরের দরজায় এসে হাঁক দিলেন—‘কাকিমা ঘরো নি।’ মা কথায় সায় দিলেন। তিনি ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে মায়ের কাছে ‘সূর্যব্রত’র বইটা চাইলেন। আজ রাত বাঘের সিন্নি মাগন গান হবে। গাঁয়ের রাখাল ও কৃষিজীবী যুবকরা মেয়ে সেজে রামকরতাল ও ঢোলের তালে তালে সূর্যব্রত-র গোষ্ঠ গান পরিবেশন করবে। এটা নিয়ে সারা গাঁয়ে উৎসবের আমেজ। হৃষ্টপুষ্ট সুকুমার যখন বাঘের মুখোশ পড়ে বাঘ সেজে গোষ্ঠ গানের তালে তালে নাচতে থাকে, বাঘাই পীরের সিন্নির অপার ক্ষমতা বুঝতে গাঁয়ের কারো তখন বাকি থাকে না। উলুধ্বনি দিয়ে গিরস্তবধূ বাঘের মাথায় সেলাম করতে করতে টাকাপয়সা-চালডাল দান করে। দানে সন্তুষ্ট না হলে বাঘ বেজার হয়ে হাউমাউ করে বধূর পা চেপে ধরে, আর গায়ক শ্যামাচরণ দাদা তখন করতালে তাল দিয়ে গেয়ে উঠে অন্য গান :
বৌদি তুমি বেজার হইয়ো না গো তুমি, বেজার হইয়ো না,
ভাঙতি টেকা উনা-চাউল আমরা নিতাম না।
বড়ো বাড়ির বড়ো ঘর বড়ো লেনাদেনা,
এক’শ টেকা না দিলে ছাইড়া দিতাম না।
মধুরবান্ধা গানের সাথে মূলত এভাবেই আমার পরিচয়। একপর্যায়ে লেখালেখির সুবাদে তার মর্মার্থ আরও বিশদভাবে বুঝতে পারি। মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে লোকাচারের মাধ্যমে সমাজের পরতে পরতে মধুসূদন দাসের গানের ঘনিষ্ঠতা, শক্তি ও জনবিশ্বাস ভাটির লোকসাহিত্যের স্মারক। নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মধুরবান্ধা গান গ্রামীণ ‘বস্তুগত সংস্কৃতি’ (Material Culture) ও ‘আচারিক অনুষ্ঠানাদি’র (Ritualistic Performance) মেলবন্ধন।
লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ওং (Walter Ong)-এর তত্ত্ব অনুযায়ী লোকসমাজ প্রধানত ‘মৌখিক সংস্কৃতির’ (Oral Culture) অংশ। যেখানে বেনু কাকার একটি কথায় তা প্রকাশ পায় : ‘…বুড়াব্যট্টাইনের মুখেমুখে কত গান আছে। এইতা লেখত্য হারে না? নাইকাম যত!…’ একইসাথে, গ্রামীণ নারী ও সাধারণ মানুষ বই কেনার জন্য যে-আবেগ দেখায়, তা ‘মৌখিক থেকে মুদ্রণ সংস্কৃতিতে’ (Oral-to-Written Transition) লোকসমাজের উত্তরণের নজির তুলে ধরে। মধুরবান্ধা গানকে কেবল অপেশাদার বা আঞ্চলিক গান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নৃবিজ্ঞান ও লোকদর্শনের বিচারে এটা ভাটিবাংলার সাধারণ মানুষের আত্মপরিচয়, আধ্যাত্মিক আশ্রয় এবং সামাজিক জীবনধারার স্থায়িত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মধুরবান্ধা গানের দর্শন উচ্চমার্গীয় শুষ্ক উপনিষদিক দর্শন নয়;—এটা হলো ‘সহজিয়া দর্শন’।
সত্তর-আশি দশকের মধুরবান্ধা চটিবইগুলো লোকজীবনের সেই সেতু, যা মুখেমুখে থাকা পদগুলোকে লিখিত রূপ দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী করেছে, কিন্তু সমাজবাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন ও সংরক্ষণের অভাবে সংস্কৃতির এই সেতুটা আজ ভেঙে যেতে বসেছে!
. . .

. . .
লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-৩ : সজল কান্তি সরকার
লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-২ : সজল কান্তি সরকার
লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-১ : সজল কান্তি সরকার
. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম
সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



