
বাটালিপাহাড়ের দিনসব
বৃক্ষের পাতায় ভর করে পার হয় বছর-বৃষ্টি-বসন্ত;
ইউক্যালিপটাস বাকল ওঠানো শরীরে যারা লিখেছে স্মারক-সংকেত তাদের অস্পষ্ট উপস্থিতি বহন করে বাটালিপাহাড়। ছয় ঘণ্টার সংসার করার কথা জানাচ্ছে সুমি আর ফারদিন; গাণিতিক সূত্রের বিনির্মাণে ভালোবাসার বন্ধনী হোল স্কয়ার। অভয় বিচরণক্ষেত্র পেয়ে জোড়া শালিক ভাববিনিময়ে সেগুনের আড়াল হয় ভিন্নগোত্রের কিচিরমিচির শব্দে; বৃক্ষমা পরম মমতায় কোলে রাখে প্রশাখা আর শাখাসব পাঁজর প্রসারিত রাখে পক্ষীমোলাকাতে—জিরায়, সুর তোলে, একার সন্ন্যাসে নিমগ্ন থাকে। কে কার ছায়া মাড়ায় এই নির্জন পাহাড়ে বরং বৃক্ষরা মায়ার ছাতা হয়ে আদরের ছায়ায় মমতার ছোঁয়া দেয় অস্বস্তি গরমে। মিথোজীবিতার মানে খুঁজতে যারা নগরভ্রমণে হয়রান তারা সময় করে ঘুরে আসতে পারেন বাটালিপাহাড়ে, যার উদোম গতরে রক্ষিত আছে সবুজাভ অভিধান, যা আকাঙ্ক্ষিত তা অনায়াসে পেয়ে যাবেন বক্ষপাতার সূচিতে…
বাটালিপাহাড়ের যতই গহিনে যাই ততই বিস্ময়, লতাপাতায় সমর্পিত প্রকৃতিজাতক সাম্যে অধিষ্ঠিত; এখানে জ্যোৎস্নার আভা সমান, বৃষ্টিজল সমান, সূর্যালোক সমান, নিকষকালো অন্ধকারও একই; কারো বিপক্ষে কোনো পক্ষের নেই কোনো অভিযোগ, শুধুই ভালোবাসায় জড়ানো আর মনজুড়ে সৌন্দর্যের অভিজ্ঞান।
বাটালিপাহাড়ের প্রাচীনবৃক্ষের পক্ষীরা বংশপরম্পরায় জেনেছে একদা এখানে শেকড়- গোড়ায় বসে বাঁশি বাজাত সুচরিত চৌধুরী; যার বাঁশির ধ্বনিতে আনন্দিত দশদিক এমনকি পক্ষীকুলেও বেড়ে যেত কোলাহল। কিংবদন্তির এইসব বয়ান এখনো ভাসমান বন্দরনগরীর পথে পথে…
. . .
সমুদ্র স্বনন
আমার ভেতরে জাগে তরঙ্গিত ঢেউ
দিক নেই চোখ নেই মানে না বাধা
নিজ কর্ম সমাপনে ধাবমান সদা…
আমিও অজানা সমুদ্র নীলরক্ত গায়ে!
সমুদ্রের স্বরগ্রামে দ্বিধা কেন আজ
২৯ এপ্রিল গেল কতদিন হলো?
আভাসে কী বলে!
এখন আগের মতো ডরাই না বিষম গর্জনে।
চেনাসমুদ্র, তুমিও দিয়েছ সাহস সক্রিয় চেষ্টায়
অবিরত থাকি কাজে নিজের জারণে
ফেনা ওঠে নোনা মুখে লবণাক্ত দিন
আমার সমুদ্র ভোলে না জানাতে সংক্ষিপ্ত অথচ উজ্জ্বল সূর্যাস্ত!
সমুদ্রের গর্ভ থেকে যারা বাতিল হয়;
তারা আজীবন ত্যাজ্য
তারা চরে পড়ে থাকে ঘরহারা মরা তারামাছ;
খেলার সামগ্রী হয় উড়ন্ত ধুলোবালুয়…
আমার সমুদ্র জানামতে ফেনা তোলে না মুখে
গভীর জঠরে থাকে সরল আদর
জলীয় জটিল বলে কিছু নেই ধবধবে বুকে
নিজ নিজ পাঠে মত্ত বুননে বানায় মুক্তো…
তবুও সমুদ্র বলে কথা;
এত আপসোস
এত গর্জন
এত হাহাকার
এত উচ্ছ্বাস!
অথচ
আমিও সমুদ্র ছিলাম জন্মসূত্রে,
সমুদ্র আছি অস্থির ভালোবাসায়
আর জন্মান্তরেও পুনর্জাত সমুদ্র
. . .
নিয়তির তরি
নদীঘেরা পলিচরে বসতি আমার;
কুহু স্বরে পার হই জলের শরীর।
নৌকা ভাসে, শব্দ হাসে, দাঁড়ের সোদর
ভালো লাগে জল, চর, মিহিবালি সুখ…
বর্ষায় বাড়ন্ত দেহ, নুড়িতে আবেগ ঢেলে প্রসব-বেদনা
উড়িয়ে-গড়িয়ে এলো পাড়ের সীমায়
পরিমিত নীতি নিয়ে সমরূপে গতি
বেড়াজালে ভিড়ে আমি নিয়তির তরি…
আমারও ঝিমুনি হয় সন্ধ্যার পাঠে
আমারও ঝাঁকুনি হয় বোধের উঠোনে
বুঝে নিতে কিছুক্ষণ অনায়াসে কাটে
ততোক্ষণ মনোতলে তরঙ্গফেনা…
মনে হয় নিয়মের ঘেরাটোপে দিন-রাত
মনে ভাসা কথামালা অবিরাম জায়মান
কানে কেউ বলে যায়;
অধিক সবুজ মন জেগে ওঠা চরে…
. . .
ছুরি বৃত্তান্ত
ছুরি নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই হত্যার কথা মনে পড়ে; ইচ্ছে জাগে হন্তারক হই নিজের আর কষ্ট সৃষ্টকারী ঘটক ও প্রভাবকের!
গতির নিয়মে গোলক চলবে, চলন্ত নদীতে জলও প্রবাহিত হবে, শুধু ঘাতক আর নিহত পরিবার বহন করে ঘুসঘুসে আবদ্ধ যন্ত্রণা…
ঘোরের মধ্যে ঘাতক ছুরির ধারের তীক্ষ্মতা দেখে, বোঝে না ঘরের আদর, জীবনের সুর, ভোরের ছন্দ, জবার জৌলুস, পাখির কলরব আর বটমূলের শীতল ছায়ায় জিরানোর অনন্য মায়া!
ধাতব জীবন নিয়ে ছুরি ধাতস্থ হতে পারে না; ধ্যানস্থ হতেই অসুরদল হাতে নেয় আর রক্তাক্ত করে শরীর আর সময়; আমি তো নিমিত্ত মাত্র তোমাদের জেহাদি হৃদয়ে…
ধার ধরে দেখে কতটা মসৃণ দেহ; ঘাতক ধারালো কোপ মারে তাদের যারা ধার ধারে না প্রচলিত আঁধার কুহক!
দিনশেষে রক্তাভ ব্যান্ডেজে মোড়ানো আমিও অধিক শোকে লৌহখণ্ড বৈকি…
. . .
ফেরিঘাটে দেরি!
চিকনগুনিয়া জ্বরের ভাগশেষ ব্যথার মতো তুমিও জড়িয়ে আছো মনোসন্ধিতে; অনুসন্ধানে বের হলো দেহতাপে অদৃশ্য নব কম্পজ্বর!
সরল ভালোবাসার এসব দিনে বুড়ো মেঘের এলোমেলো চুল, পদ্মার ফেরিতে দু’ধারা জলরেখার টান আর দূর থেকে কাছে আসা গাঙচিলের গান, জ্বরে যেন গা মুছিয়ে শীতল পরশ…
ফেরিঘাটে দেরি হবে কি আজ? আমার ফেরা হবে হেলানো মধ্যরাতে, চাঁদের সাথে কথা বলে রেখো, ফিরতিবেলায় জেনে নেবো কতটা কামনায় কঁকিয়ে ছিলে তুমি…
এই সন্ধ্যা কিছুক্ষণ পরে আঁধারকে বুকে নেবে আর তাতে উলটপালট হয়ে মিশে যাবো দুজনে। আলোআঁধারী সন্ধিক্ষণে মনের বাসনা রেখে যাই বাবুইপাখির বাসায়, বুনবো দুজনে নিবাস—নকশার নিপুণ স্থাপত্যে…

. . .
পাঠ সংযুক্তি
ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতা ও বাটালিপাহাড়ে ‘সুচরিত’

নব্বই দশকের কবিতাস্রোতে শরিক ভাগ্যধন বড়ুয়ার এই একগুচ্ছ কবিতা কবি ফজলুররহমান বাবুল সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘ঋতি’ থেকে তুলে আনার কিছু কারণ রয়েছে। প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত ‘ঋতি’র ষষ্ঠ সংখ্যাটি সম্পাদকের ভাবনা ও পরিকল্পনা মান্য করে যথারীতি কবিতাময় ছিল। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক গদ্যে সাজানো সংখ্যায় দুই বাংলার ছোটকাগজ ও সাহিত্যপত্রে নিয়মিতদের অনেকে লেখা দিয়েছিলেন। চট্টলানিবাসী হাফিজ রশিদ খান ও ভাগ্যধন বড়ুয়া তাঁদের অন্যতম।
সিলেট থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজের সঙ্গে হাফিজ রশিদ খানের সম্পর্ক নিবিড়। কবিতার সঙ্গে যথারীতি গদ্যও পাঠিয়েছিলেন একদা আদিবাসী জনজাতি নিয়ে মগ্ন কবি ও সম্পাদক। ‘কবির নান্দনিক সম্পৃক্ততা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ’ শিরোনামে রচিত গদ্যটা দুইহাজার ছাব্বিশ বর্ষে পুনর্পাঠের দাবি রাখে মনে হচ্ছে। থার্ড লেন স্পেস-এর অনলাইন পরিসরে তাঁর এই গদ্য দুকথা সঙ্গে জুড়ে পাঠনজরে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
যাইহোক, ভাগ্যধন বড়ুয়ার প্রসঙ্গে ফেরত যাই। ‘ঋতি’-র ষষ্ঠ সংখ্যায় মুদ্রিত কবিতাগুলো ধারণা করি কবি-প্রকাশিত বইয়ে এতদিনে জায়গা করে নিয়েছে। বইগুলো আপাতত হাতের নাগালে না থাকায় যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। বইয়ে স্থান পেয়েছে ধরে নিয়ে ‘কেন এই পুনর্পাঠ’?—এই প্রশ্নের লেজ ধরে বরং সামনে আগানো যাক।
সময়ের সঙ্গে নিজের লাবণ্য হারিয়ে ফেলা সাগরমেখলা চট্টলার নিসর্গ ও জলবায়ুকে ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতারা অনুভবে নিয়েছিল বলেই কি পুনর্পাঠের তাগিদ বোধ করছি পাঠক? উত্তরে বলতেই হচ্ছে,—ঘটনা সেরকম কিছু নয়। চট্টলার স্থানিক রং গায়ে মেখে কবির বেড়ে ওঠা ও যাপনের স্মৃতিকাতর কাব্যরস গ্রন্থিত কবিতায় মিলছে, কিন্তু পাঠতাড়না উসকে দেওয়ার পেছনে এর ভূমিকা অতখানি প্রবল নয়। ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতারা পাঠআগ্রহ জাগিয়ে তুলছে মূলত তাদের ভিতরে সক্রিয় অ্যাসিমিলেশন বা আত্মীকরণের বার্তাটির জন্য। দুইহাজার ছাব্বিশে দাঁড়িয়ে বার্তাটি পাঠক স্পষ্ট পড়তে পারছেন, যা এতদিন গুহ্য ছিল অথবা পাঠ-অনুভবে ধরা দেয়নি!
বিষয়টি ভেঙে বলা যাক। ‘ঋতি’ সংকলিত কবিতাগুচ্ছে ‘মিথোজীবিতা’ বা ‘সিমবায়োসিস’ শব্দটি কবি ব্যবহার করেছেন। বাটালিপাহাড় নিয়ে লেখা কবিতায় বন্দরনগরী ঘুরতে আসা সৌখিন পর্যটকদের লক্ষ করে শব্দটি কবিতায় জুড়েছেন। শব্দটি একবারই ব্যবহার করেছেন কবি, কিন্তু অবশিষ্ট কবিতাগুলোর ভিতরে এর প্রচ্ছন্ন অনুরণন অনুভূত হচ্ছে বৈকি! আট-দশ বছর আগে যদি ফেরত যাই, এটা তখন এভাবে অনুভূত হয়নি। নিরাভরণ কবিতাগুলোর গোপন সুড়ঙ্গে জায়গা নিতে থাকা খণ্ড-খণ্ড ইমেজারি যেন নতুন অর্থদ্যোতনার সংকেত দিচ্ছে এখন! থার্ড লেন স্পেস যে-কারণে কবিতাগুলো নতুন করে পাঠনজরে আনার তাগিদটা অনুভব করছেন।
ভাগ্যধন বড়ুয়ার এই কবিতাগুলোয় বন্দরনগরী চট্টলার স্থানিক অনুষঙ্গরা রেফারেন্সের মতো করে আসছে। সম্পর্কের রংগুলোকে কবি যেন এগুলোর মাঝে খুঁজে ফিরছেন। যেখানে আবার স্মৃতিকাতর একটা ধসকে মেরামতের চেষ্টা চলছে বলে মনে হবে পাঠকের। এগুলো হচ্ছে তাঁর কবিতার বাহ্য রূপ। অভ্যন্তরের পরিবেশটা ভিন্ন, এবং সেখানে কবি-ব্যবহৃত ‘মিথোজীবিতা’ শব্দটি স্বয়ং সাবজেক্টিভ (Subjective) মোড় নিয়েছে। ‘মিথোজীবী’ বলতে আমরা কী বুঝব অথবা কবি এই-যে নিজের একান্ত অনুভবে গুম থেকে স্থানিক রেফারেন্সগুলো টানছেন, এই নিরিখে ‘মিথোজীবিতা’টা আসলে কেমন দেখায়,—এসবের একটা ধারাবাহিক ইমেজারি কবিতা থেকে কবিতায় গড়িয়ে পড়ছে পাহাড় বেয়ে নামতে থাকা ঝর্নার মতো। পড়তে বসে পাঠক তাই এটা ভাবছে,—সময়গর্ভে বিলীন অনেকগুলো ইমেজকে মিথোজীবী সংশ্লেষটার মধ্য দিয়ে বুঝি ফেরত চাইছেন কবি!
চট্টলার নিসর্গ ও জলবায়ুতে যাপিত দিনগুলো ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। স্মৃতিকাতর কবি এর সঙ্গে দ্বিমত করছেন না, তথাপি এই অনুভূতি কবিতায় চারিয়ে তুলতে চাইছেন,—একটা মানুষের জীবনে ‘মিথোজীবিতা’ হলো যেসব চিহ্নের সঙ্গে তার পরিচয় ও সান্নিধ্য ছিল একদিন, সেগুলোর সঙ্গে সহাবস্থান কেন জরুরি তা মরমে অনুভব করা। একমাত্র এটা তাকে নিজের সাবজেক্টিভ সত্তার ধস কিংবা পতন থেকে কিছুটা হলেও বাঁচাতে পারে। যে-কারণে কবিতায় লিখছেন :
ঘোরের মধ্যে ঘাতক ছুরির ধারের তীক্ষ্মতা দেখে, বোঝে না ঘরের আদর, জীবনের সুর, ভোরের ছন্দ, জবার জৌলুস, পাখির কলরব আর বটমূলের শীতল ছায়ায় জিরানোর অনন্য মায়া!
ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতায় ‘নদীঘেরা পলিচর’, ‘পক্ষীমোলাকাত’, ‘ঘরহারা মরা তারামাছ’, ‘সমুদ্রের স্বরগ্রাম’, ‘বাবুইপাখির বাসা’-র মতো আটপৌরে ইমেজারি এভাবে একটা সূত্রের মতো নিজের ধস ঠেকানোর বার্তা দিয়ে যায়। মানুষ ইতোমধ্যে যত নীড় খুইয়ে বসেছে ও পরস্পর থেকে আলগা হয়ে খাদে পড়তে যাচ্ছে,—এখন এই খাদ থেকে উঠে আসার বার্তা ‘মিথোজীবিতা’য় খুঁজলে মিলবে। দুইহাজার ছাব্বিশ সনে পৌঁছে ‘ঋতি’ থেকে কবিতাগুলো পুনরুদ্ধারের এটা অন্যতম কারণ!
আরেকটি কারণ হলেন ‘সুচরিত চৌধুরী’! বাটালিপাহাড় ও বন্দরনগরী চট্টলার নদী-সমুদ্র-পাহাড় ও এর ক্ষীয়মাণ হতে থাকা সবুজ নিসর্গে বিলীন নামটিকে ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতায় রেফারেন্স হিসেবে আসতে দেখাটা তাৎপর্য রাখে। নব্বই দশকি কবিতার বৈচিত্র্যগামী স্বভাবে স্থানিক চিহ্নগুলোকে লক্ষ করে ওঠা এবং কবিতায় দ্রষ্টব্য করার ঘটনা অতখানি প্রবল নয়। কবিরা বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই। অন্তর্মগ্ন উচ্চারণকে অনেকভাবে ফলবান করার চেষ্টা ছিল ব্যাপক। কিন্তু স্থানিকতার যেসব রং কবি-অনুভবে ছাপ রেখে যায়, সেগুলোর তাপ-উত্তাপ ও বিবর্তনরেখা অনুসরণের তাগিদ নব্বই দশকি কবিতায় কেন জানি প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠেনি!
স্থানিক অনুষঙ্গে কবির সংযোগ ও সেগুলোর ভিতরে বেড়ে ওঠার মুহূর্তগুলো কবিতায় রিকল করার সময় নব্বইয়ের কবিরা কি অ্যাপাথি (Apathy) বা আবেগজনিত সংকটে ভোগেন বলে এমনটা হয়? তাঁদের কবিতায় স্থানিকতার বিচিত্র অভিজ্ঞতা বিপুল জায়গা নিয়েছে, কিন্তু এগুলোকে তাঁরা যাপন করছেন,—এই বিশ্বাসটা পাঠকমনে কেন জানি গেড়ে বসে না। পেছনে ফেলে আসা শতকে নব্বই যে-পালাবদল নিয়ে হাজির হলো, ভাগ্যধন বড়ুয়া তাকে ধারণ করেছেন, এবং সেখানে বাটালিপাহাড় ও সুচরিত চৌধুরীর মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে নব্বইয়ের মুদ্রাদোষ অ্যাপাথিটা আভাসিত নয় একথা বলা যাচ্ছে না;—তথাপি তাঁর কণ্ঠস্বর অন্য অনেকের তুলনায় মৌল ও প্রাণবন্ত লেগেছে পাঠে। বাটালিপাহাড় নিয়ে রচিত একাধিক কবিতা ও কবিতালগ্ন গদ্যবিবরণে গমন করলে এটা আরো গাঢ় টের পাওয়া যায়। ‘বাটালিপাহাড়ে পাতা ঝরে’র বিবরণে যেমন কবি পাতা ও মানুষের জীবনচক্র বা ওই ‘মিথোজীবিতা’কে এভাবে হোমেজটা দিয়েছেন :
ঝরাপাতার রং কী? কৌতুহলী জিজ্ঞাসায় ফিরে যাই বাটালিপাহাড়ে। নিরং আদলে নিঃশব্দ ধ্যানে নিমগ্ন পাতাসব, আমিও অবলীলায় পার হই পথ আর অর্থহীন শব্দ বানাই পাতার ভূ-লগ্ন শরীরে। অথচ পাতার শরীরে ছিল বসন্ত দোলা, সূর্যালোকে সবুজ সুন্দর হওয়ার সাধন প্রক্রিয়া। আশ্বিনের আকাশ গুমোট হলে ঝরে যায় পাতা, কারণের কথাসব লিখা ছিল বাটালির কঠিন গায়ে—হিজিবিজি দালিলিক হরফে! পাহাড়ের শরীর ক্ষয়ে কিছুটা উন্মুক্ত অঙ্গ তাতে বৃক্ষমূলের আঁকড়ে ধরার কৌশল জনসমক্ষে প্রকাশিত, ফলে দলে দলে অনুসন্ধিৎসু মানুষের ভিড়, জানার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, সম্পর্কের শিকড় কতটুকু গভীরে গেলে বৃক্ষও প্রতীক্ষা করে কাঙ্ক্ষিত জীবনপ্রক্রিয়া… চোখের সম্মুখ থেকে অনেকে আড়াল হয় ভুলপথে কিংবা বাতাসে ঘুরে ঘুরে দিশেহারা মনে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকেই একমুখী পথে পথ হারায় বাটালির ঝরাপাতার মতো।
বাটালিপাহাড় তাঁর কবিতাযাত্রায় গাঢ় ছাপ ফেলেছে বলেই মনে হচ্ছে। এর ভূপ্রকৃতিকে তিনি নব্বইয়ের স্বভাবজ আত্মমগ্ন স্বরে ফিরেফিরে অনুভবের তাড়া বোধ করেছেন। ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতায় সুতরাং বাটালিপাহাড় ক্রমশ চিহ্নে রূপান্তরিত হয়ে পরিপক্কতা পেয়েছে। পাহাড়টি যেন স্মারক, যার থেকে চট্টলাবাসীর বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিণাম তিনি কবিতায় ভাবছেন।
রবার্ট ফ্রস্টের ‘যে-পথে হয়নি যাওয়া’র মতো পথের দেখা এই বাটালিপাহাড়ে মিলবে। স্থানীয়দের কাছে পাহাড়টি যে-কারণে ‘জিলাপি পাহাড়’ নামেও খ্যাত। ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী পাহাড় তার আপন খেয়ালে প্যাঁচানো পথে বাঁক নিয়েছে। যতই পাকা সড়কে বাঁধানো থাক, প্রকৃতির রহসময়তায় হানি ঘটে না। অনেকের কাছে পাহাড়টি নিছক ট্যুরিস্ট স্পট, যেখান থেকে চট্টলা শহরটা দেখে নেওয়া যায়। তো, এই বিচ্ছিন্নতার উপশম কী থাকছে তাহলে? উত্তরটা ‘সুচরিত চৌধুরী’র মাধ্যমে দিয়েছেন কবি। তাঁর সঙ্গে অভিন্ন হয়ে বাটালিপাহাড়ে ‘মিথোজীবিতা’য় মানুষের স্থান খুঁজে নিচ্ছেন ভাগ্যধন বড়ুয়া :
বাটালিপাহাড়ের প্রাচীনবৃক্ষের পক্ষীরা বংশপরম্পরায় জেনেছে একদা এখানে শেকড়- গোড়ায় বসে বাঁশি বাজাত সুচরিত চৌধুরী; যার বাঁশির ধ্বনিতে আনন্দিত দশদিক এমনকি পক্ষীকুলেও বেড়ে যেত কোলাহল। কিংবদন্তির এইসব বয়ান এখনো ভাসমান বন্দরনগরীর পথে পথে…
সুচরিত চৌধুরীর নামখানা অধুনা এই দেশে বিস্মৃতিগর্ভে তলিয়ে গেছে! নিসর্গ ও জীবনের সঙ্গে যাঁর গাঢ়তা একটা সময় নানা কাহিনির জন্ম দিয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য রচিত সাহিত্যভাষায় মানুষ ও নিসর্গকে ধারণ করতেন সুচরিত। চট্টলার পাহাড়ি প্রকৃতি ও বহুবর্ণিল জনসংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও যাপন বাহ্যিক নয়, বরং আত্মিক ছিল। কবিতা, গল্প, গান ও বাঁশিতে যার রেশটা ধরে রাখতেন সুচরিত। এরকম একটা মানুষকে স্বয়ং চট্টলাবাসী মনে হয় ভুলতে বসেছেন!
ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতায় বাটালিপাহাড়ে অভিন্ন সুচরিত যে-কারণে ‘মিথোজীবিতা’র কেতাবি সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা রেখে যায়;—যার দিকে প্রত্যাবর্তন ছাড়া বিচ্ছিন্নতা, বিবিক্তি ও বিভাজনরেখায় ইতি টানা হয়তো আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
. . .
… ছোটকাগজ থেকে পুনর্পাঠ : থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
হারমোনিয়াস দেহে হেলান দিয়ে, এক পাথরযুবক : মুহম্মদ ইমদাদ
‘দ্য এগ’ সমাচার : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন? : সত্যজিৎ সিংহ
বিচ্ছিন্নতার যুগবিশ্বে ‘ছোটকাগজ’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
মন-মিররে কিছু প্রলাপ ও ঈগলটনের সাহিত্য : সন্তর্পণ ভৌমিক
মায়া : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
. . .

বাংলাদেশে কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া থানার বিনামারা গ্রামের ছেলে কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া। পেশায় চিকিৎসক। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুনামের সঙ্গে রোগ নিরাময়ে অবদান রাখছেন। জনদরদি চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। চিকিৎসা পেশার বাইরে কবিতামগ্ন ও সদালাপি সামাজিক। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কবিতাবই ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত, ‘নদীর নিজস্ব ঘ্রাণ’ ও ‘বক্ষরথে ষষ্টপদী’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ছোটকাগজ ও অনলাইন সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন।
. . .

ভাগ্যধন বড়ুয়া : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম


