পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-২ : সজল কান্তি সরকার

Reading time 10 minute
5
(8)

লোকব্রত ও গোষ্ঠগান

Book Illustration-I: Surjobrata Sangeet; Source & Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

আদিম নারীরা নিজের অজান্তে যখন ফসল উৎপাদনের গোপন কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন, ঠিক তখন থেকে কৃষিসভ্যতার সূত্রপাত ঘটে। শুরু হয় কৃষি নির্ভর সভ্যতা। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যুক্ত হতে থাকে লোকাচার ও ঐন্দ্রজালিক ধর্মাচার। এর বেশিরভাগ পালনের দায়িত্ব নারীদের উপর বর্তায়। কেননা, আদিমসমাজ মনে করত একমাত্র নারীই পারে সন্তান জন্মদানের মতো শস্য উৎপাদনেরও মর্ম বা সাধনা জানতে। তাই মা ও মাটির তুলনা করি আমরা। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মাটি বা পৃথিবীর সাথে সূর্যের গুরুত্বটাও ঐন্দ্রজালিক।

মনুসংহিতায় উল্লেখ রয়েছে :—‘সূর্যদেব অগ্রহায়ণ থেকে আরম্ভ করে আটমাস নিজ রশ্মির দ্বারা অল্প অল্প করে পৃথিবীর রস আকর্ষণ করেন।’ তাছাড়া মানুষ প্রত্যহ সূর্যকে এবং তার আলো ও তাপ প্রত্যক্ষ করে। কৃষিজীবী সমাজে, বিশেষত হিন্দু ধর্মে সূর্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুসারেও সমস্ত জৈবনিক ক্রিয়াকলাপ সচল থাকে সৌরশক্তির প্রভাবে।

বৈদিক ও পৌরাণিক যুগে আর্যদের সময় থেকে হিন্দু ধর্মে আলো, জীবন ও শক্তির উৎস হিসেবে ‘সূর্য’ বা ‘আদিত্য’কে অন্যতম প্রধান দেবতা হিসেবে আরাধনা করা হয়। কৃষিভিত্তিক লোকাচারে ব্রতগুলোর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আর্য সভ্যতা বিস্তারের পূর্বেও কৃষিসমাজে ফসলের নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য লৌকিক সূর্যব্রত বা সূর্যপূজার প্রচলন ছিল। সূর্যব্রতের আদি ইতিহাস মানব সভ্যতার শুরুর দিককার বৈদিক ও কৃষি সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

আদিকাল থেকেই কল্যাণ, রোগমুক্তি, বিশেষ করে চর্মরোগ বা চোখের রোগ, সন্তান কামনা, মাটির উর্বরতা কামনা, ঋতুচক্র ও দানাদার শস্যের বৃদ্ধি কামনায় নারীরা ব্রতটি পালন করে আসছেন। পরবর্তীতে এর সাথে বৈদিক শাস্ত্রীয় আচারের সংমিশ্রণ ঘটে। ব্রতটি উদযাপনের একটি নির্দিষ্ট সময় বিশেষভাবে লক্ষণীয়-যে, সূর্যের উত্তরায়ণ যখন থেকে আরম্ভ হয়, তখন থেকে সূর্যব্রত পালন শুরু হয়। পৃথিবীর বহু আদিম জাতিরও সূর্যোৎসবের অন্যতম সময় এটা। তাছাড়া দেবতা হিসাবে সূর্যের উপাসনা করা প্রাচীন সভ্যতার অঙ্গ ছিল। সর্বজীবে সমদর্শী হলেন সূর্যদেব।

কৃষির সাথে ব্রতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কৃষি ফলন হয় জমিনে, আর ব্রত পালন হয় জীবনে। জীবন ও জমিন উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত কৃষাণী বা কৃষক। কৃষক যেমন জানে বীজ অঙ্কুরিত করার নিয়ম, তেমনি জানে জীবনের সাথে বীজের সম্পর্ক। কৃষি কোনো অলৌকিক পদ্ধতি নয়। কৃষি প্রকৃতির ব্যবহারিক সত্য। যেখানে, কৃষক তার সাধনার দ্বারা প্রকৃতির ব্যবহারিক সেবা, মাটি, পানি, বায়ু, তাপ, বীজ, উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা, নদী-খাল-বিল-সাগর-হাওর-বাওরের যত্ন, সর্বোপরি নিজের, পরিবার ও সমাজের যত্ন এবং পরিচর্যার সাধক হয়ে ওঠে। কৃষি তখন সাধনায় রূপ নেয়, আর এই সাধনায় সূর্যব্রতের ভূমিকা অপরিসীম। সূর্যব্রত তাই সহজপথে প্রকৃতির অন্যতম সাধনা। শুধু দেবতা হিসেবে সূর্যের আরাধনা নয়, বরং শক্তির আরাধনা বা মান্যতাও তাতে প্রকাশ পায়।

সূর্যব্রত একটি সহজিয়া ভাব ও সাধনার চিরন্তন রূপ। খাদ্যশস্য উৎপাদন ও এর মাধ্যমে সূর্যশক্তি গ্রহণের সাধনাকে এটা মূর্ত করে তোলে। সূর্যব্রতে ব্যবহৃত গান ও সুর শুধু সূর্য নয়, প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্বন্ধ রচনা করে। এর ফলে সৃষ্টির সাথে মানুষের সখ্যতা বাড়ে ও বৈরিতা দূর হয়। সূর্যব্রত তাই কৃষিরক্ষার পদ্ধতি মাত্র নয়,—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের অনুশীলনকে তা একসুতোয় বেঁধে রাখে। মানুষের দেহভাণ্ড যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশ রূপে ব্রহ্মাণ্ডের জন্য কাজ করে,—চর্চা ও সাধনা করে। মানুষ, বিশেষভাবে কৃষকের বিশেষত্ব এখানেই। কৃষক মানে কেবল মানবদেহের অধিকারী কেউ নয়, আর দেহটাও কেবল ব্যক্তিগত শরীর নয়।

ব্রতের প্রচলন কবে শুরু হয়েছিল তার দিনতারিখ সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। ধারণা করা হয়, এর প্রচলন প্রায় ৪,০০০ বছরের পুরোনো। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ যখন প্রথম মাটির পাত্র তৈরি করতে শেখে, তখন থেকে শস্য রক্ষার্থে ও সূর্যের আশীর্বাদ পেতে ব্রত উদযাপিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন-ভিন্ন রূপে তা পালিত হয়। যেমন, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে ‘সূর্যষষ্ঠী’ বা ‘ছটব্রত’, অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে ‘ইতুব্রত’ বা ‘সূর্যপূজা’, মাঘ মাসজুড়ে ‘সূর্যব্রত’, ‘ঠাকুরব্রত’ বা ‘ধর্মব্রত’, এবং কুমারী মেয়েদের দ্বারা ‘মাঘণ্ডল ব্রত’ হিসেবে পালিত হয়।

আজকের বিষয় যেহেতু ‘লোকব্রত ও গোষ্ঠগান’ তাই গোষ্ঠগান সম্পর্কিত ব্রত হিসেবে মাঘ মাসের সূর্যব্রত আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়। ভাটি ময়ালে কৃষি মৌসুম শুরু হলে ফসল রক্ষায় কৃষাণীরা সারাদিন উপবাসের মাধ্যমে সূর্যকে আরাধনা করে। অঞ্চলভেদে ব্রতটিকে ধর্মব্রত, ঠাকুরব্রত বা সূর্য পূজাও বলা হয়। ‘ব্রত’ এবং ‘পূজা’ আবার এক নয়। ব্রত আদি ও দলীয় আচার ও সাধনা। ব্রতে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে দিয়ে মন্ত্রপাঠের বিধান নেই। ব্রতে যে-কারণে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের প্রয়োজন পড়ে না। ভাটির কৃষাণীগণ সারাদিন উপবাস থেকে খরা ও তাপদাহ থেকে বোরো ফসল রক্ষা ও রোগমুক্তি জন্য মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শেষ রবিবার সূর্যব্রত পালন করে। এজন্য একে রবিবারের ব্রতও বলা হয়। তবে অঞ্চলভেদে এ-ব্রত পালনের সময়কালে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মাঘ মাসজুড়ে সূর্যব্রতের প্রচলন রয়েছে। যেহেতু, সূর্য অগ্রহায়ণ থেকে মাটির রস আকর্ষণ করতে শুরু করেন, সেহেতু অগ্রহায়ণ মাস থেকে এই ব্রত পালনের রেওয়াজ আছে।

সাধারণত পরিবার, গোষ্ঠী কিংবা গ্রাম ভিত্তিক ব্রতের আয়োজন হয়ে থাকে। ব্রতীগণ ভোরবেলা দেবদেবী বন্দনা করে সূর্য উদয়ের সাথে-সাথে সূর্যকে প্রণাম করে এই ব্রতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। ব্রতপালনের বিশের নিয়ম হচ্ছে সূর্য উদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ব্রতীগণ উপবাসে থাকে, এবং শুয়ে-বসে বিশ্রাম নিতে পারে না। দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দাঁড়িয়ে থাকার সুবিধার্থে ব্রত পালনে উদয়অস্ত নৃত্যতালে গোষ্ঠগান পরিবেশন হয়। ময়ালে হিন্দু ধর্মালম্বীদের মাঝে বিশ্বাস আছে, গোচারণে রাধাকৃষ্ণের মিলনে সূর্যদেবসহ স্বর্গের দেবদেবীগণ খুশি হয়েছিল। তাই গোষ্ঠলীলার আদি-অন্ত গান পরিবেশন করে সূর্যদেবকে সন্তুষ্ট করা হয়।

সূর্যব্রতের অনুষ্ঠানে যেসব গান পরিবেশিত হয় তাকে ময়ালে সূর্যব্রত সংগীত বলা হয়। এই ব্রতে গানে-গানে কৃষ্ণের গোষ্ঠের কাহিনি তুলে ধরা হয় বলে একে গোষ্ঠ গীতিনাট্য বা সূর্যব্রত গীতিনাট্যও বলা যেতে পারে;—যা কেবল সূর্যের আরাধনায় পরিবেশন করা হয়। বাড়ির উঠোনে ধামাইল ঢংয়ে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে করতাল বাজিয়ে নেচে নেচে পরিবেশিত হওয়ার কারণে একে সূর্যব্রত ধামাইল বলেও অনেকে অভিহিত করেন। এই গানে ধামাইলের মতো হাতে তালি না দিয়ে কাসার তৈরি রড় করতাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একে রাম করতালও বলা হয়। প্রতিটি গানের ধারায় বা স্তরে করতালের তাল, নৃত্য ও সুরের ভিন্নতা রয়েছে।

Book Illustration-II: Surjobrata Sangeet; Source & Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

সূর্যব্রত সংগীতে বা সূর্যব্রত ধামাইলের নৃত্যশৈলী সাধারণ ধামাইল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। করতালে তাল দিয়ে হাত উঁচিয়ে আকাশ পানে চেয়ে, কখনও ডানে-বামে ঘুরে সুর ও করতালের ঝঙ্কারে আসর মাতিয়ে রাখা হয়। এ-গানের সুর, নৃত্য, তাল, লয় সবই বংশ পরম্পরায় বা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে শিখতে হয়। বিশেষ করে কৃষিজীবী হিন্দু মহিলাদের সূর্যব্রত সংগীত শিক্ষা পারিবারিক রেওয়াজ। ফসল রক্ষায় ভাটির ময়ালে সারা চৈত্র মাসজুড়ে সূর্যব্রত গানের করতালের ঝঙ্কার ও গোষ্ঠগানের সুর কান পাতলেই শোনা যায়।

সূর্যব্রতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ভোররাত থেকে। শুরুতে সৃষ্টি পত্তনের জন্য গানে-গানে দেবদেবীর বন্দনা হয়। ১৯৮৩ সালের কথা, যতদূর মনে পড়ে, মা-কাকীরা তখন উপবাস থেকে ভোররাতে বাড়ির সকলকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। পাড়া-প্রতিবেশীরাও জেগে উঠত। তার আগে ঘর ও উঠোন লেপেমুছে পবিত্র করে নেওয়া হতো। তারপর সকলে হাতে হাতে রামকরতাল, সূর্যব্রত গানের বই ও ব্রতের নানা উপাচারসহ একটি ঘরে সমবেত হয়ে প্রথমে দেব-দেবীর বন্দনা গাইতেন। কাকীমা বামহাতে কূপি বাতি আর ডান হাতে সূর্যব্রত সংগীতের বই ধরে দেখে-দেখে বন্দনা গান শুরু করতেন। সবসময় বই দেখে গাইতেন না। গানগুলো বলতে গেলে তাঁর মুখস্তই থাকত। আসরে অন্যরা কাসার তৈরি বড়ো রামকরতাল বাজিয়ে নেচে দোহার দিতেন। রাম করতালের ঝঙ্কারে জেগে উঠত সারা গ্রাম। পাড়া-প্রতিবেশীরাও আস্তে আস্তে সমবেত হত গান শুনতে :

বন্দনা
ধুয়া : শ্রীগুরু গৌরাঙ্গ প্রভু শচীর নন্দন।
নদীয়াতে অবতীর্ণ পতিত পাবন\


জয় জয় গৌরাঙ্গ, জয় নিত্যানন্দ।
জয় অদ্বৈত্য চন্দ্র, জয়-গৌরভক্তবৃন্দ\


প্রথমে বন্দনা করি অনাদির চরণ।
দ্বিতীয় বন্দিনু ব্রহ্মা, পরম কারণ\


তৃতীয়ে বন্দিনু বিষ্ণু জগতের পতি।
তাহার দুই ভার্য্যা বন্দি লক্ষ্মী সরস্বতী\


সরস্বতী মা বন্দি বিষ্ণুর বণিতা।
কন্ঠে বসি যোগায় গীত, সুরস কবিতা\


এসো মাগো সরস্বতী কন্ঠে করো ভর।
গায়কের দেও মাগো কোকিলের স্বর\


চতুর্থ বন্দিনু শিব গণেশ-সহিতে।
অর্ধ অঙ্গে দুর্গা শোভে গঙ্গা শোভে মাথে\
পুষ্প মধ্যে বন্দিলাম আদ্যের তুলসী।
ব্রত মধ্যে বন্দি মুই ভৈমী একাদশী\


পিতামাতা আদি গুরু বন্দি দুইজন।
শিক্ষাগুরু বন্দি যেই শিখাইল গায়ন\

ব্রতীগণ আসরে পালাক্রমে গান গায়। গানের আসর ভোর রাত থেকে শুরু হয়ে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত চলে। মূল গায়িকা হিসেবে অনেকেই সেখানে ভূমিকা রাখেন। বন্দনা শেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে সৃষ্টি পত্তনের জন্য গানে প্রার্থনা জানানো হয়। যেমন :

ভজ মন অনাদির আদি নারায়ণ রে। নিমিষে সৃজিলা প্রভু এ-তিন ভুবনরে\ দেব দৈত্য যক্ষ রক্ষ, কিন্নর কিন্নরী। গন্ধর্ব মানব আর অপ্সর অস্পরী\ নাগ পক্ষী মৎস্য কূর্ম্ম জলচর যত। স্থাবর জঙ্গম কীট পতঙ্গ শত শত\

তারপর পর্যায়ক্রমে পানি, বায়ু, মাটি ও সৃষ্টির বন্দনা গাওয়া হয়। মাটি বা স্থলি বন্দনা ছাড়া সূর্যব্রতের ক্রিয়াদি শুরুর কোনো বিধান বা সুযোগ নেই। স্থলি বন্দনা গাওয়া বাধ্যতামূলক। ব্রতীগণ এই বন্দনাগানে তাদের জীবনঘনিষ্ঠ ভাবের প্রকাশ ঘটায় :

স্থলি বন্দনা :
ধুয়া-মাটি কাটি স্থলি বান্দিলা।
এহেন স্থলির মাঝে পুকুর খুদিলা\

তার মাঝে দুগ্ধ ঢালি সম্পূর্ণ করিলা।
পঞ্চবর্ণ গুড় দিয়া আলিপনা দিলা\

এহেন স্থলির মাঝে রাধাকৃষ্ণের খেলা।
এহেন স্থলির মাঝে গোপীগণের মেলা\

এহেন স্থলির মাঝে ব্রতী দাঁড়াইলা।
জ্বালিয়া মৃতের দশি সূর্য প্রণামিলা\

এহেন স্থলির মাঝে তুলসী রোপিলা।
আনিয়া কদলীর চারা রোপন করিলা\

দ্বাদশ গোপালের ভোগ সাজাইয়া রাখিলা।
মধু বলে শিরে লই সেই স্থানের ধুলা\

মাটি বন্দনা শেষ হলে বৃক্ষের উৎপত্তি গীত হয়। প্রথমে তুলসী এবং দূর্বার উৎপত্তি ও স্তুতি বন্দনায় মাতেন ব্রতীগণ। তারপর ভোরের ‘মঙ্গলঊষা লগ্নে’ দূর্বা-তুলসী নিয়ে সূর্যদেবকে জাগানোর জন্য গান গাইতে গাইতে নদীর জলে দূর্বা ও তুলসীপাতা স্পর্শ করেন। ব্রতগানে এটা হলো ‘মঙ্গলঊষা’‘ডাকে পাখি না ছাড়ে বাসা, খনা বলে ওই যায় ঊষা।’-র এরকম এক মুহূর্তকে ‘মঙ্গলঊষা’ বোঝানো হয়ে থাকে। পৃথিবীর মাটি, পানি, বায়ু সবকিছু তকন পবিত্র থাকে। কোনো কাকপক্ষীর স্পর্শ পায় না কিছু, ঠিক সেই মুহূর্তে সূর্যব্রতের ব্রতীগণ নদীতে গিয়ে প্রথমে সূর্যদেবকে পৃথিবীতে আগমনের জন্য গানে গানে আরাধনা করেন; তারপর দূর্বা ও তুলসীপাতা দিয়ে পবিত্র গঙ্গাজল ছিটিয়ে সূর্যদেবকে জাগিয়ে তোলেন গানের আহবানে। যেমন :

উঠো উঠো সূর্য ঠাকুর ঝিঁকিমিকি দিয়া।
তোমারে পূজিব আমি রক্তজবা দিয়া\

যে জল ছোঁয়নাকো কাগে আর বাগে।
সেই জল ছুঁইলাম মোরা দূর্বার আগে\

Book Illustration-II: Surjobrata Sangeet; Source & Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

কৃষিময়ালের ব্রতীগণ তখন ব্রজের গোপীরূপে নারীশক্তির পরমারাধ্যা শ্রীমতি রাধিকাকে সূর্যব্রতের আহবান জানায়। তারই প্রেক্ষিতে তাদেরই একজন তখন রাধারূপে সূর্য আরাধনার মূল ব্রতী হন :

রাধে সূয্য পূজার বেলা হইল, করো আয়োজন।
দিবাকর পূজিবে আজি যত গোপীগণ\

আকাশে সূর্য উদিত হওয়ার সাথে সাথে তারা প্রদীপ জ্বালিয়ে সূর্যদেবের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করেন। লাল ফুল, লাল চন্দন জলে নিবেদন করেন। গানে গানে সূর্যকে প্রণাম করেন :

ধুয়া : আমি তোমার পূজা করি দেব দিবাকার।
নমো নমো শ্রীসূর্য্যায় নমো দিবাকার।
উদিত ভাস্কর ভানু জগত প্রখর\

তপন তেজোময় তুমি অর্ঘ্য তোমার নাম।
কশ্যপ আদিত্য রবি করি যে প্রণাম\

দীননাথ দীনমনি অন্ধকার অরি।
তুমি নারায়ণ প্রভু প্রণিপাত করি\

তুমি সে আরোগ্য দাতা সংসার পালন।
তেজোরূপে বিরাজিত এ তিন ভুবন\

তেজো হতে তিন লোক তুমি হে সাকার।
তুনি না হইলে প্রভু নৈরাকার\

তুমি সৃষ্টি তুমি স্থিতি তুমি যে প্রলয়।
দয়া কর দিনপতি মধুসূদন কয়\

ব্রতের ভোগ নৈবদ্য হিসেবে গম, কালাই ও বীজের ছাতু দেওয়া হয়। গঙ্গাজলে স্নান সেরে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরেন ব্রতীরা। বাড়ির উঠোনে ছোটছোট দুটি পুকুর খনন করা হয় প্রথমে। পুকুরের পুবপাশে মেদি তৈরি ও চারকোণায় কলাগাছ রোপন করা হলে চারপাশে আলপনা আঁকেন তারা। একটি পুকুরে জল ও অন্য একটি পুকুরে পানি দিয়ে শস্যের মঙ্গল কামনায় সূর্যশক্তির সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণমঙ্গল বা সূর্যব্রতের গান গাওয়া হয় এই সময়টায়।

ব্রতীগণের বিশ্বাস সূর্যদেব কৃষ্ণের মঙ্গললীলা পছন্দ করেন, তাই তারা উপবাস থাকাবস্থায় বিরতিহীন শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে বাল্যলীলা, গোষ্ঠে গমন ও পুনরায় বাড়ি ফেরত আসার কাহিনি গানে গানে বর্ণনা করে তাঁকে তুষ্ট করেন। সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন ও সূর্যাস্ত এই তিনবেলা প্রদীপ হাতে গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে সূর্যের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করেন তারা। যেখানে, শ্রীকৃষ্ণও ব্রতীদের সখা। কেননা, তারা বিশ্বাস করেন, শ্রীকৃষ্ণ রাখালের সখা, আর রাখাল তাদের লোক, সুতরাং কৃষ্ণ তাদেরই সখা।

সূর্যব্রত সংগীতে কৃষ্ণের অষ্টাদশ শতনাম বিরামহীন গাইতে হয়। বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয় এর জন্য। কৃষ্ণের ১০৮টি নাম পর্যায়ক্রমে গীত হওয়াটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্রতীগণ যে-কারণে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে শতনাম কীর্তন করেন গানে। কৃষ্ণের শতনাম কীর্তনের একটি ধুয়ার সুর আজও কানে বাজে :

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাধর। কৃষ্ণচন্দ্র করো কৃপা করুণা সাগর\

শতনামের সুর, তাল ও লয় আলাদা। শতনাম শেষে পুনরায় সূর্যব্রতের গান শুরু হয়। এককথায় বলা চলে, কৃষককুল ব্রত চলাকালীন সারাদিন জমিনে ও জীবনে, ক্ষেতে ও ব্রতে, কৃষাণে ও সাধনে আত্মমগ্ন থাকে।

একটি ঘটনা এখানে না বললে নয়। আমাদের বাড়িতে ঘটা করে সূর্যব্রত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। গ্রামের অনেকে সেখানে শরিক থাকতেন। বাড়ির বড়ো উঠোনজুড়ে সূর্যব্রতের গান করতাল বাজিয়ে একের পর এক গীত হয়ে চলেছে। করতলের ঝঙ্কার পৌঁছে যাচ্ছে মাঠ পেরিয়ে জমিন পর্যন্ত। এই সময়টায় সারা মায়াল জুড়ে কান পাতলে সূর্যব্রতের গান শোনা যেত।

পুরুষদের মাঝে যারা মানসী ব্রতী নিয়েছিলেন, তারা জমিনে ব্রতের নিবেদন সেরে বাড়ি ফিরছেন তখন। অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন ততক্ষণে। বিশ্রামের সুযোগ নেই। এ-ব্রতের বিধান হচ্ছে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস ও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ক্লান্ত হলেও শুয়েবসে বিশ্রাম নেওয়া যাবে না। আমার বাবা ওদিকে উপবাসের ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সোজা দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। ব্রত ভাঙা সম্ভব নয়, কেননা গেরস্তের জন্য তা অকল্যাণ বয়ে আনে। কৃষক যাঁরা মাঠে কাজ করছিলেন, তাঁরাও ততক্ষণে ক্লান্ত। উপায় না পেয়ে সকলে খড়ের গাদায় গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন! ব্রত তবু কেউই ভাঙেননি। সূর্যাস্তের পর সবাই মিলে ব্রতের প্রসাদ খেয়ে উপবাস ভাঙলেন। রাতে শুরু হলো কীর্তন ও খিচুড়ি খাওয়ার উৎসব। ভাটি ময়ালে কৃষিকল্যাণে সূর্যব্রতের এরকম আচার এখন আর নেই বলা চলে।

ধারণা করা হয়, ভাটির ময়ালে সূর্যব্রতের প্রচলন শুরু হয় নবম থেকে ষোড়শ শতাব্দীর কোনো একসময়। কিছু অঞ্চলে তা ‘সূর্য পূজা’ নামে প্রচলিত থাকলেও, ভাটির ময়ালে ‘ব্রত’ নামেই পরিচিত। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের প্রচলন যেখানে ছিল না বললেই চলে। এই ব্রতে স্বর্গ-নরক প্রাপ্তির আরাধনা নেই, কেবল জগৎ, সৃষ্টি, কল্যাণ, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও শস্যদানা সুরক্ষার ফরিয়াদটাই প্রধান। সূর্যকে যেখানে শক্তি রূপে সাধনা করা হয়;—দেবদেবী রূপে নয়।

প্রচলিত পূজাগুলোর বেশিরভাগ সাধারণত মন্ত্র ও পুরোহিত নির্ভর। দেবদেবীর আরাধনাই মুখ্য সেখানে। লোকব্রতগুলো মূলত কথা, গান ও পাঁচালী নির্ভর। সূর্যব্রত সেখানে সংগীত নির্ভর। ব্রত পালনের আচার, ব্যবহৃত গান ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করলে একে অতি প্রাচীন মানতে হবে। কেননা, সাধনার আদি মাধ্যম হচ্ছে সংগীত ও সুর। সুর আবার ভাষারও ‘আদি’। ভাষা ‘মন্ত্রেরও’ আদি। একথা সুতরাং বলাই যায়,—সুরে সুরে সাধন হচ্ছে আদি প্রচলন। সূর্যব্রত প্রচলনের সময়কাল সঠিক নির্ধারণ করা না গেলেও, বাসযোগ্য পৃথিবীর আদিশক্তি সূর্য ও সুরের প্রাচীনতা সাধন জগতের গোড়ার কথা হতেই পারে। সুর কিংবা গানকেন্দ্রিক ব্রতগুলো এ-কারণে ‘আদি’ হওয়ার দাবি রাখে।

Book Illustration-III: Surjobrata Sangeet; Source & Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

ভাটির ময়ালে সুর ও গান কেন্দ্রিক এরকম অনেক ব্রত প্রচলিত আছে। তার মধ্যে সূর্যব্রত, রূপসীব্রত বা বৃক্ষব্রত ও কল্কিনারায়ণ ব্রত অন্যতম। ব্রতগুলো যেহেতু মন্ত্র কিংবা শাস্ত্র নির্ভর নয়, তাই এসব ব্রতগান লোকমহাজনরা সময়ে-সময়ে রচনা করেছেন। ভাটির বিভিন্ন আর্থ সামাজিক স্তরের উপাদান সেখানে মিশ্রিত রয়েছে। সূর্যব্রত গানের আদি রচয়িতাদের মধ্যে রয়েছেন রাধারমণ দত্তের বাবা স্বনামধন্য সংস্কৃত পণ্ডিত রাধামাধব দত্ত। তিনি সূর্যব্রত পাঁচালী ও কৃষ্ণলীলার গান রচনা ও অনুবাদের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ব্রতের পাঁচালীগুলোও সুর নির্ভর। বাউল কবি রাধারমন দত্ত স্বয়ং কিছু সূর্যব্রত গান রচনা করেছেন। ভাটি মায়ালের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, গীত ও জনপ্রিয় সূর্যব্রত গানের রচয়িতা মনে হয় পণ্ডিত মধুসূদন দাস। তাঁর রচিত ‘সূর্যব্রত সংগীত’ বইটি আজও ভাটি ময়ালের ঘরে-ঘরে আদরে সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া প্রতাপ রঞ্জন তালুকদার রচিত ‘সূর্যব্রত সংগীত’-র একটি সংকলন ভাটি ময়ালে পাওয়া যায়। অন্যান্য গীতিকারগণ নির্দিষ্টভাবে আদি-অন্ত সূর্যব্রতের গান রচনা করেননি।

অনেক লোকমহাজনের গোষ্ঠলীলা কেন্দ্রিক কিছু গান সূর্যব্রত আসরে গীত হয়। সেক্ষেত্রে বাউল লালন ফকিরের গোষ্ঠগানের নাম নেওয়া যায়। খ্যাতনামা পদ্মপুরাণ গায়ক চৈতন্য চরণ পাল রচিত ‘সূর্যব্রত সংগীত’ বা ‘কালা ঠাকুরের কীর্তন’ গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। শ্রীমতি উষারাণী দাস রচিত ‘সূর্যব্রত সংগীত’ নামে একটি সংকলন রয়েছে। গীতিকার রামজয় দাস, গৌরচাঁদ, শশিশেখর, যদুনাথ, গোবিন্দ দাস, শ্যামদাস, বিপ্রদাস ঘোষ, ঘনারাম দাস, বাসুদেব ঘোষ, বিহারী দাস, মাধব দাস, রাধামোহন দাস, গোপী দাস, দেব নৃসিংহ, যদুনন্দন, বংশাবদন, বিশ্বম্ভর দাস, দাস উদ্ধব ও কৃষ্ণদাস প্রমুখ রচিত ‘সূর্যব্রত গানও’ ভাটি ময়ালে বেশ জনপ্রিয়।

তবে, আবহমান কাল ধরে গ্রামীণ লোকসমাজ ও নারীদের মুখে মুখে অনেক সূর্যব্রত গানের কথা ও সুর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আসছে। যেখানে গান চেনা কিন্তু গীতিকার অচেনা। ভাটি ময়ালের কৃষিসমাজে এসব গানের প্রচলন অতি আদরের সাথে এখনও টিকে আছে। সূর্যব্রত গানে মূলত শ্রীকৃষ্ণের মহিমা, বাল্যলীলা ও প্রশংসাসূচক নানা কাহিনি বর্ণনা করা হয়। এটি মূলত কৃষ্ণের গোষ্ঠলীলা গীতিধারার বিশেষ রূপ। গানগুলো গ্রামীণ নারীরা ব্রত উদযাপনের সময় ঐতিহ্যবাহী সুর, ছন্দ ও ধামাইল সহযোগে করতাল বাজিয়ে পরিবেশন করে থাকেন।
. . .

Surjabrata Dhamail in Sunamganj; Source: Sheta Anila song YTC

. . .

লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম

সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 8

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *