আইলাম্বর ছড়াগান ও বাঘের সিন্নি ধামাইল

বাঘ তাড়ানো ও বাঘাইপিরের সিন্নির উপাদান সংগ্রহের প্রচলিত লোকাচার ‘আইলাম্বর’-এর বিবর্তিত রূপ হচ্ছে ‘বাঘের সিন্নি ধামাইল গান’। রাখাল সমাজে গানের এই ধারাটি জনপ্রিয় ছিল বা এখনো আছে মোটামুটি। মাগনের নিমিত্তে মাঘ-ফাল্গুন মাসে হাওরাঞ্চলের গৃহস্থবাড়িতে রাখালসমাজ পরিবেশিত এই ধামাইল মানুষকে বিনোদনের সঙ্গে লোকশিক্ষার বাহন হয়ে উঠেছিল। বাঘের বৈচিত্র্যময় রূপ ও সমাজজীবনে এর প্রভাব থেকে মূলত গানগুলোর জন্ম। বাঘের হিংস্রতা যখন কারো মধ্যে দেখা দেয়, আর সাধারণ মানুষ একে মারতে পারে না, তারা তখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নি ধামাইল গানকে বেছে নিয়েছিল। লোকবাংলায় জনপ্রিয় এসব ছড়া ও গীত অমূল্য সম্পদ। লোকশব্দের চমৎকার এক ভাণ্ডারের দেখা মিলবে সেখানে, যেমন :
ময়না যাইচ না রে জঙ্গলার মাঝে
বাঘ আইতাছে…
বাঘ আইতাছে রে ময়না
বাঘ আইতাছে।
দামা গেছে লামারবন্দ
ডেমি খাইবার আসে
ছোট্টু ছোট্টু বাঘের বাচ্চা
লেঙ্গুড়অ ধইরা টানে।
তুই যে টানছ রে বাঘা
আমার নাই যে ডর
আমারে গৃহস্থে বিছরায়
রাইতের আড়াই ফর।
রাইতের আড়াই ফর না রে
দিনের আড়াই ফর।
বাঘের মাথায় লাম্বা চুল
টগ্বগ্যাইয়া চায়
আবাল-বৃদ্ধ ছাইড়া দিয়া
যুবতী ধইরা খায়।
উপরের গানটিতে লম্বা চুলের বাঘের যুবতী ধরে খাওয়ার মনোরম বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে, যা আসলে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। গৃহস্থালি কাজকর্মের পালা শেষ হলে গাঁয়ের যুবক অথবা রাখালরা মেয়ে সেজে রাতের বেলায় ধামাইল গানের সুর ও নাচের তালে গানগুলো পরিবেশন করত। গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে, হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে একদল পুরুষ তামাশার ছলে খোল, করতাল, হারমোনিয়াম, বাঁশি ও কাঁসর সহকারে ধামাইল দিতে-দিতে বাঘের সিন্নি মাগার বাহানায় গৃহস্থবাড়ির উঠোনে ঢুকে পড়ত। তারা তখন গাইছে :
সোনা বউ দিদি গ দরজা খোলঅ বাত্তি জ্বালাও চাই,
বাতিটি জ্বালাইয়া দেখ দাদা ঘরে নাই,
বাতিটি জ্বালাইয়া দেখ কমলিনী রাই’…।
গৃহিণীকে এভাবে গানের ভাষায় ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত তারা। করতালি ধামাইলকে অধিক বেছে নিতো গায়কদল। করতালি ধামাইলের পরিবেশনরীতি আবার প্রচলিত ধামাইল থেকে কিছুটা ভিন্ন। শরীরী অঙ্গভঙ্গি ও নাচের শৈলীতে প্রভেদ থাকত।
ময়না যাইছ না রে জংগলার মাঝে বাঘ আইতাছে’…,
পিরিত কইরা যন্ত্রণা মন মিলে মানুষও মিলে সময় মিলে না…
নিস্তব্ধ রাতে ঝঙ্কৃত গানের সুরে ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলা সুখকর হওয়ার কথা নয়। গৃহকর্তারা তবু বিরক্ত না হয়ে খুশিমনে যুবকদের টাকাপয়সা অথবা চাল মাগন দিতেন। গান গেয়ে পাওয়া টাকা-পয়সা দিয়ে পরে বনভোজনে মেতে উঠত গাঁয়ের দামাল যুবকরা। হাওরপারে আয়োজিত ধামাইল গানের আসর মাটির গন্ধ, সুশীতল বাতাস, আলো-আঁধারের খেলা ও গায়কের হৃদয়-জড়ানো সুরে মানুষকে অভিভূত রাখার গুণে বিশিষ্ট। শুধু তাই নয়, পরস্পরকে এটা হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ রাখে জন্ম থেকে জন্মান্তর পর্যন্ত। জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও চাওয়া-পাওয়ার সবগুলো সুর যেন এরকম সব ধামাইল গানের আসরে বেজে উঠত!
সে যাইহোক, ধামাইল গানে নাচের মুদ্রা ও শৈলী সাতটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল :
১. হাত দিয়ে তালিয়া বাজানো; ২. হাতের আঙুল ব্যবহার করে তুড়ি; ৩.অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন; ৪. পদযুগলের ব্যবহার; ৫. বিশেষ মুদ্রায় হাত নাড়ানো; ৬. শির চালনা করা; এবং ৭. চোখের মুদ্রায় গানের ভাব প্রকাশ করা।
সপ্তক্রিয়ার এই সমাবেশ ধামাইল গানকে সচরাচর পূর্ণতা দিয়ে থাকে। বাঘের ভয় ও জীবনের প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া পিরের সিন্নি মাগার লোকাচার একটা সময় এসে শেষ হয়, কিন্তু থেকে যায় আইলাম্বর কিংবা বাঘের সিন্নির গান ও তার দল। জীবননিষ্ঠ আচার ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে হিন্দু-মুসলমান সকলে এই আয়োজনে অংশ নিতে দ্বিধা করেনি। ধামাইল গানের জনপ্রিয় ধারা দুটি সময়ের পালাবদলে সৃষ্টিশীলতা হারিয়েছে অনেকখানি! বিস্তারিত বিবরণে যাওয়ার আগে তবু বলে রাখা প্রয়োজন, রাখালিয়া আয়োজনে সূর্যব্রত থেকে গোষ্ঠ গানের সবটাই একে-একে পরিবেশিত হতো। মূলধারার গান যদিও প্রথমেই গাইত গায়কদল, যেমন …
সোনা বৌদিদি গ দরজা খোলঅ বাত্তি জ্বালাও চাই
বাতিটি জ্বালাইয়া দেখ দাদা ঘরে নাই
দরজাটি খুলিয়া দেখ কমলিনী রাই।
আ-রে মেছখানি লড়ে-চড়ে বাত্তি জ্বলে না
রাঙাবৌদির বাড়িত আইছি ফিইরা যাইতাম না।
আমরা ত বাঘের সিন্নি মাগিয়া যে খাই
টাকা দিয়া বিদায় করেন অন্য বাড়িত যাই।
গাও রে গাওয়ইয়া ভাইয়াইন ভাবনা কইর না
সোনা বৌদির বাড়িত আইছি খালি যাইতাম না।
এই বাড়ির রাঙা বৌদি বড় দয়াবান
পান চিনি খাওয়াইয়া টেকা করবেন দান
এই বাড়ি ছাইড়া চলঅ অন্য বাড়িত যাই।
হাওরাঞ্চলের যে-কোনো পাড়ায় বাড়িগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গায়ে-গায়ে লেগে থাকে। আলাদা করে দেয়াল বা সীমানা-প্রাচীর থাকে না। বাড়িগুলোর উঠোন হয়ে ওঠে সংযোগের সেতু। এক বাড়ির উঠোন থেকে অন্য বাড়ির উঠোনে পা রাখার সময় সুর-তাল-লয়ের রেশ ঠিকঠাক রেখে বাগভঙ্গি ও নাচের মুদ্রা যৎসামান্য বদলে ‘গাওয়ইয়া’রা গান ধরত…
এই বাড়ির জমিদার বাবু বড়ো ভাগ্যবান
ঢেউটিনের চৌকারিঘর গোলা ভরা ধান।
ভাবনা কইর না গ ভাইয়াইন চিন্তা কইর না
বাবুর বাড়িত আইছি আমরা খালি যাইতাম না।
আরে চাবিখানি লড়ে চড়ে তালা খুলে না
তালা খুইল্ল্যা দেখঅইন বৌদি টেকা মিলে না।
আমরা গাই বাঘের গান রহিতে না পারি
শীঘ্র করে বিদায় করঅইন যাই অন্য বাড়ি।
সারা গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে চলার পথে ভোরের লগ্ন যখন দেখা দিতো আকাশে, গায়কদল ‘মিলন গান’ গেয়ে আয়োজনের সমাপ্তি টানত।
. . .

লোকাচারের বিবর্তনরেখায় আইলাম্বর ছড়াগান ও বাঘের সিন্নি ধামাইল
হাওরাঞ্চলে বাঘের উপদ্রব ঠেকাতে লৌকিক ‘বাঘাইপির’-এর কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত। পাহাড় সংলগ্ন এলাকাজুড়ে লৌকিক পির ‘শারপিন শাহ’র প্রভাব যেমন আজো অমলিন। গাজী-কালুর সিন্নি বা গীত-মানত কিন্তু এখনও হয়। হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো কথা নেই। বালা-মুসিবত থেকে বাঁচার আশায় শারপিন শাহের কৃপা যাচনা করে গাঁয়ের মানুষ। হাওরাঞ্চলে বহু জায়গায় শারপিন শাহের ‘থলা’ ছিল;—এই কিচ্ছা এখনো অনেকে বলে থাকেন। অরণ্য-জঙ্গলার মাঝে একটুখানি ফাঁকা জায়গাকে শারপিন শাহের ‘থলা’ বলা হতো। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি নাকি এরকম সব ‘থলায়’ বিশ্রাম নিতেন। জিন্দাপির হিসেবে তাঁকে নিয়ে হাওরাঞ্চলে কিংবদন্তির অভাব নেই। মানুষের দুঃখবেদনা দূর করেন শারপিন শাহ। বাঘের হাত থেকে জনপদ রক্ষা করেন। বাঘ তাড়ানোর মানত পুরা করার এরকম ভাবনা থেকে মূলত বাঘের সিন্নির প্রচলন ঘটেছিল লোকসমাজে।
হাওরাঞ্চলে একসময় বাঘের উপদ্রব ছিল। বাঘ তাড়ানোর সিন্নি যে-কারণে এই জনপদে জীবনঘনিষ্ঠ আচারে মোড় নিয়েছিল। কেউ একে অবজ্ঞা করত না। হিন্দু-মুসলমান গৃহস্থরা নিরাপত্তার আশায় সিন্নি মানত করে স্বস্তি পেতে চাইতেন। বাঘ প্রজাতি হাওর থেকে উধাও হওয়ার পর জনমনে বাঘ তাড়ানোর প্রথা লোকস্মৃতিতে মোড় নেয়। রাখালরা একে বিনোদনের মাধ্যম করে নিতে দেরি করেনি। দিনের শেষে গৃহস্থের গরু গোয়ালঘরে বেঁধে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতো তারা। অতঃপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে আইলাম্বর গানের ছলে মাগন চাওয়ার বিনোদন চলত রাতভর।
জীবনঘনিষ্ঠ আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নি ধামাইল কেবল রাখালিয়া বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গৃহস্থ বাড়ির কামলা থেকে শুরু করে ছেলেবুড়োর মন জিতে নিয়েছিল লোকগানের এই দুটি প্রবাহ। রাতভর চলতে থাকা নাচগানে ইতি টানার জন্য গানের একেবারে শেষে পৌঁছে বাঘের সিন্নি দাবি করা হতো। বিনোদনে মোড় নেওয়া নৃত্যগীতের ধারায় সুর ও ছন্দে কিছু পরিবর্তন এনেছিল রাখালিয়ারা। নাচের ঢঙ তারা নিয়ে আসে গানের পরিবেশনায়। ভাঙা থালায় বাজনাও বাজত জোরেশোরে। দাবি আদায়ের ভাষা ও ভাবভঙ্গি গৃহস্থবাড়ির পরিবেশ বুঝে বদলানোটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়ায়। হাওরাঞ্চলে আইলাম্বর ছড়াগানের বিবর্তিত রূপ প্রকৃত অর্থে বাঘের সিন্নি ধামাইল নামে কালক্রমে মান্যতা পায় সমাজে। নিচে এরকম কিছু আইলাম্বর ছড়াগানের নমুনা তুলে দিচ্ছি :
আইলাম্বর আইলাম্বর
বাত্তি জ্বালাইয়া হসর কর।
আইলাম রে ভাই মড়লবাড়ি
মড়লবাড়ির কলারছড়ি।
কলারছড়ি লরবর
আমায় দিবে কত দর।
আমিঅ ত মাইগ্যা খাই
বাঘাই নামের সিন্নি চাই।
২.
আইলাম্বর আইলাম্বর
বাত্তি জ্বালাইয়া হসর কর।
আইলাম রে ভাই মড়লবাড়ি
পথে পাইলাম কলারছড়ি।
কলারছড়ি লরবর
ও পোলা চোর ধর।
চোর ধরিতে ছিক্ক্যা লড়ে
ঝন্ঝনাইয়া টেকা পড়ে।
উগ্গ্যা টেকা পাইলাম গ
বাইন্যাবাড়িত গেলাম গ।
বাইন্যা তর রূপার মালা
গৌর মালা গৌর মালা।/তর ঘর দেখতে বালা।
তর ঘর দেখতে বালা
ঘর বালা ঘর বালা।
গৌর মালা গাঁথুনি/ঘর বালা গাঁথুনি
গিত্তাইন বড় রাঁধুনি।
ও গিত্তাইন লড়চড় (লরচর)
আমায় দিবে কত দর।
আমিঅ ত মাইগ্যা খাই
বাঘাই নামের সিন্নি চাই।
৩.
আইলাম্বর আইলাম্বর
বাত্তি জ্বালাইয়া হসর কর।
আইলাম রে ভাই অরণে
লক্ষ্মী দেবীর চরণে।
ও লক্ষ্মী শ্যাম রে
সোনা বন্ধুর ধাম রে।
সোনাঅ তর রূপের মালা
গৌর মালা গৌর মালা।
গৌর মালা গাঁথুনি
গিত্তাইন বড় রাঁধুনি।
ও গিত্তাইন লড়চড় (লরচর)
আমারে দিবে কত দর।
আমিঅ ত মাইগ্যা খাই
বাঘাই নামের সিন্নি চাই।
বাঘাই গেছে নাগাইপুর
কিন্যা আনছে চাম্পাফুল।
চাম্পা ফুলের গেরাণে
জামাই আইছে আনন্দে।
খাও গ জামাই বাটার পান
সুুন্দরী রে করঅ দান।
দানঅ বইয়া দিব কী
সুতার কাপড় অরতকি।
ও চাম্পা গুয়াকাট
পানের বাটা ভাইয়া কাট।
চাম্পাগাইয়্যা পোলাইন রে
কী কী ধান মাগওছ রে।
আপন ধান মাগি রে
মল্লের বাড়িত আইলাম রে।
আপন ধানের কী কী পাতা
আপন ধানের বুলবুল পাতা।
বুলবুল পাতা বুলবুল পাতা
পোলায় ভাঙে পুরির মাথা।
আপন ধান মাইগ্যা খাই
বাঘাই নামের সিন্নি চাই।
উদ্ধৃত ছড়াগানগুলোর শুরুটা একরকম লাগতে পারে, তবে অর্থগত ভিন্নতা রয়েছে তাদের মধ্যে। একটি গানের বাগভঙ্গি বা ছন্দ-তালের উপর ভিত্তি করে সমকালীন বিষয়কে বিবরণে জুড়েছেন পদ-রচয়িতারা। উপস্থিত বিষয়ে ভর করে মূলত এ-গানের পথচলা, যেখানে আবার গানগুলোয় সমার্থক শব্দের ব্যবহার পৃথক ছবি ও ভাবার্থ ফুটিয়ে তুলতে ভোলেনি।
. . .

বাঘের সিন্নি ধামাইল গান ও সেকালের সমাজচিত্র
মনে রাখা প্রয়োজন, বাঘের সিন্নি ধামাইল কেবল সিন্নি মাগায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রেম-বিরহ-হাসি-কান্না ও সমসাময়িক বহু বিষয়কে গানে আপন করে নিতেন রচয়িতারা। গানের সুর ও ছন্দে যন্ত্রের মহড়া ও নাচের তাল এসে যুক্ত হয় সময়ের ধারাবাহিকতায়। এই ধামাইল গানের নাচে যে-শৈল্পিক দুরন্তপনা ও তেজোদীপ্ত ভাব রয়েছে, আমি তা অন্য কোনো নৃত্যগীত নির্ভর গানে এতটা মূর্ত ও জীবন্ত দেখিনি! ঘুমভাঙা চোখ মুহূর্তে চনমনে নেশায় পড়ে যায়! মনে হয় কিছু কিছু গান যেন নাচকে প্রাধান্য দেওয়ার খেয়াল থেকে পদকর্তারা তৈরি করেছেন। যেখানে, তাঁদের গুরুর নামধাম অজ্ঞাত। লোকনৃত্যের অমূল্য এই রতনকে তাই সময় থাকতে সংরক্ষণ করা জরুরি। একটা গান এখানে তুলে ধরছি, যার মধ্যে বাঘের সিন্নি ধামাইল গানের আদি উৎস আইলাম্বর ছড়াগানের রস ও সুরলয়ের অপূর্বতা ধরা পড়েছে মনোরম :
পিরিত কইরা যন্ত্রণা
মন মিলে মানুষ মিলে
সময় মিলে না।
আমি একখান পিরিত করলাম
কার বা করলাম ক্ষতি
গোকুলঅ নগরের মাঝে
কারবা মা বইন সতী।
আগে যে করিছলাম পিরিত
তুমি আর আমি
এখন কেন এ-সব কথা
লোকের মুখে শুনি।
২.
সাধের নাতিন জামাই রে…
কাজ নাই আমার বাঘ মারার (টাকাপয়সার)
নাতিন আইনা দে…।
নাতিন যায় গ শাগ (শাক) তুলিতে
গোয়াইলঘরের ফিছে
শাগের মাঝে বাঘের পারা
চম্কিয়া চম্কিয়া উঠে।
নাতি যায় গ মাছ মারিতে
ঠেলাজালি লইয়া…
নাতিন আমার চাইয়া থাকে
জানালা খুলিয়া।
নাতিন আমার আউশের নাতিন
তিন দিন ধইরা জ্বর
মশারি টানাইয়া ঘুমায়
বেইলের আড়াই ফর।
. . .

আইলাম্বর, বাঘের সিন্নি ধামাইল গান ও কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্ত
হাওরাঞ্চলে আইলাম্বর ছড়াগানের বিবর্তিত রূপ বাঘের সিন্নি ধামাইল গান রাখাল, গ্রামের যুবক, আর গৃহস্থবাড়িতে কাজের লোকজন অল্পবিস্তর গেয়ে যাচ্ছে। বিনোদনের জন্যই মূলত গাওয়া হয় এখন। গান গেয়ে পাওয়া নগদ-নারায়ণ, আগে বলেছি বোধহয়,—খানাপিনার আয়োজনে ব্যয় করে সবাই মিলে। আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নি ধামাইল গানের শিল্পীরা আসলে পেশাদার গায়কদল নয়। সম্প্রদায় রূপেও তারা একসাথে বসবাস করে না। লোকগানকে হাতিয়ার করে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য অবসরে গানে মেতে ওঠে।
হাওরাঞ্চলে আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নির গান জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। গানকে আকর্ষণীয় করার জন্য মহড়া, লোকবাদ্য সংগ্রহ ও বাঘের পোশাক তৈরির প্রথা এখনো অব্যাহত। বাঘের মাথা তৈরির জন্য লাউয়ের খোল আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখা হয়। খোলের গায়ে দাঁত, জিহ্বা ও গোঁফ সুন্দর করে আঁকেন চিত্রী। পাট দিয়ে তৈরি হয় বাঘের দেহ। চমৎকারভাবে বাঁকিয়ে তৈরি করা হয় বাঘের লেজ। এসব কাজে পারদর্শী পটুয়াকে সবাই কদর করেন। ছবি আঁকার কারণে আমাকে এই কাজে কামলা দিতে হয়েছে অতীতে। সানন্দে কাজটি উপভোগ করেছি।
হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা) বাংলাদেশ নামে সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় হাওর উৎসবে আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নি ধামাইল গান পরিবেশন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকগানের ধারা দুটিকে বর্তমানে ‘বাঘাম্বর’ নামে চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হাওরাঞ্চলে পরিলক্ষিত। আদি পরিচয় ‘আইলাম্বর’কে ধরে রাখা ও জাগিয়ে তোলার ভাবনা থেকে হাওরপারের ধামাইল সংগঠনের জন্ম। অতীত প্রথা ধরে রাখার সংকল্পে একালেও যুবকরা নারীসাজে মঞ্চে ধামাইল দিতে সংকোচ বোধ করে না। লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোলাগা ও দায় থেকে কাজটি তারা করে আসছে, এবং সেখানে আলাদা প্রাপ্তি ও অর্থযোগের আশা কারো মনে কাজ করে না।
গাঁয়ের গৃহস্থঘরের ছেলে হিসেবে রাখালদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ আমার হয়েছিল। খোলা মাঠে গরু চড়াতে গিয়ে বুকফাটা তৃষ্ণায় কাতর হয়েছি অনেকবার। আইলাম্বর গাইতে গিয়ে লেখাপড়া শিকেয় ওঠায় পিটুনিও খেয়েছি বাবা-মায়ের হাতে। নেশা তবু ছাড়তে পারিনি। আইলাম্বর গানের সময় এলে সুন্দর ফলা তৈরির পূর্বপ্রস্তুতি চলত গোপনে। চুপিচুপি মড়াল বাঁশের ফলা বানিয়ে দিতেন মাঝিপাড়ার ‘অরিকাকা’। আগুনে পুড়িয়ে কারুকাজ করা হতো ফলার গায়ে। তারপর সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষা। ‘আইলাম্বর আইলাম্বর বাত্তি জ্বালাইয়া হসর কর’;—এ-যেন ছিল শৈশবের আনন্দ উৎসব।
আইলাম্বর থেকে পাওয়া টাকাপয়সা দিয়ে বনের ধারে বনভোজনের আঙুলচাটা স্বাদ আজও ভুলতে পারি না! এ-আনন্দ অবশ্য বেশিদিন টিকেনি। বাঘের সিন্নি ধামাইল নৃত্যগীতের দল জনপ্রিয় হয়ে উঠল। বাঘের সিন্নি ধামাইল দলে গাওয়ার উপায় আমার ছিল না। কেননা, বাঘের সিন্নি গাইতে সুরের গলা লাগে, নাচটাও জানা থাকতে হয়। আমার তা নেই। সহযোগী হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।
আইলাম্বর ছড়াগান হওয়ার কারণে যে-কেউ সেখানে অংশ নিতে পারে। বাঘের ব্রত হলে চালের গুঁড়িতে লাল, নীল রং দিয়ে পানিতে মিশিয়ে কল্কির সাহায্যে গোল গোল ছোটো-বড়ো ছাপ বন্ধুদের গায়ে এঁকে বাঘ সাজিয়েছি কত তার হিসাব নেই। ছবি আঁকায় গাঁয়ে আমি ভালো ছিলাম। এজন্য গাঁয়ের লোকজন আমাকে ‘ছাপ্পা বানাউরা ছেরা’ বলে ডাকত। আহ্! সেই দিন ও সময় আর নেই। মা-বাবার কঠিন শাসনের ফলে গাঁয়ে থেকে লোকগায়ক বা লোকবাদক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না! বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ডিগ্রিটা মা-বাবাকে উপহার দিতে গিয়ে তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি ছেলেবেলায়, তবে ভিন্ন হইনি কখনো।
একসময় ঘুমের মাঝে খোল-করতালের আওয়াজ শুনতাম। মনে হতো বাঘের সিন্নির দল আসছে। আমি তখন ছোট। গান শুনে আইলাম্বর ও বাঘের সিন্নি গানের দলের পার্থক্য ধরার বয়সে তখনো পা দেইনি। বৈশাখ মাসের ভোরবেলার কথা মনে আছে! গানের সুরে ঘুম ভেঙেছিল সেদিন। বাঘের সিন্নির গান হচ্ছে ভেবে তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়তে মন করছিল। মা তা টের পেয়ে বিছানা থেকে উঠতে দিলেন না। তার কোলে শুয়ে জানলাম, ওরা হচ্ছে ‘বৈষ্ণবী’। প্রভাতি গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়। গাঁয়ের সবাইকে প্রভাতি গান শোনায়। সুরে সুরে মন ভরিয়ে দিনের শুরুটাকে করে তোলে মধুময়।
‘বৈষ্ণবী’রা দ্রুতপায়ে বাড়ি বাড়ি গান গায়, কারও বাড়ি থামে না তারা। এ-যেন সবাইকে গান শুনাবার তাড়াহুড়া ও দায়বদ্ধতা নিয়ে পথ ভাঙা। সঙ্গে বৈষ্ণবও থাকেন। ভোরে পাখিদের কলরবের সঙ্গে গান শেষ হয়। সকালে এসে ভিক্ষা নিয়ে যায়। গৃহস্থ পরমানন্দে ঢালা ভরে ভিক্ষা নয়, বরং সম্মানী দিয়ে তাদেরকে বিদায় করেন। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে এভাবে গৃহস্থরা পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বোষ্টুমিদের। কিন্তু, আইলাম্বরের নেশা তাতে আমার কাটেনি কখনো। কেননা, বাঘ দেখার আনন্দ ও এর সঙ্গে নাচের বাহার আর কোথায় পাবে এমন!
কৈশোরের বৈষ্ণবীকে আমি বছর পাঁচ আগে গ্রামে ভিক্ষা করতে দেখেছি। কপালে অস্ফুট তিলক, গলে নেই আগের মতো হলুদ গাঁদা ফুলের মালা। মুখে নেই প্রভাতি সুর। কেবল আর্তনাদ!—‘মাগো, দুইল্ল্যা ভিক্ষা দেইন।’ আমাকে আর চিনে না! ‘ছাপ্পাবানাউরা ছেরা’ বলে ডাকে না। বলে,—‘বাবু, দুইল্ল্যা ভিক্ষা দেইন।’ গান ও প্রাণের সুরে মিশে থাকা গাঁয়ের মানুষ পুড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার ঘ্রাণ ধূপের ধোঁয়ার মতো বাতাসে গিয়ে মিশছে না আর! একটা অপ-ঢাকনায় ঢেকে আছে গ্রামীণসত্তা ও তার অবয়ব!
. . .

. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়ার জন্য নিচের লিংকে চাপুন …
লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-২ : সজল কান্তি সরকার
লোকাচার ও ‘গোষ্ঠলীলা’-১ : সজল কান্তি সরকার
. . .
লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম
সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



