পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

‘জোলিন’, কেড়ে নিও না : স্মরণে ডলি পার্টন

Reading time 8 minute
5
(13)
Dolly Parton: Legend never dies; Image Source & Credit: Collected; Google Image

আমেরিকার লোকগানে ‘ডলি পার্টন’ (Dolly Rebecca Parton) মনে রাখার মতো ঘটনা হয়ে শ্রোতাদের আনন্দ বিলিয়েছেন। আগস্ট মাসের ২৫ তারিখে দেহ রেখেছেন জানার পর প্রশ্নটা মনে উঁকি দিচ্ছে,—কতটা কান পেতে শুনেছি তাঁর গান? ‘অকৃত্রিম আমেরিকান’ কিছুর অস্তিত্ব কি ধরায় সত্যিই আছে? মনে হয় না! তবু, আমেরিকার লোকধারার গানবাজনায় ডুব দিলে একটা দিশা হয়তো মিলতে পারে। কেননা, এর বাইরে দেশটা বহুরৈখিক সংস্কৃতির রসায়নে দাঁড়িয়ে থেকেছে সর্বদা। মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন দিয়ে হাইপ তৈরিতে ওস্তাদ ট্রাম্পু সর্দার ও তার সাঙাতরা চেষ্টা করেও দেশটিকে সঙ্করায়িত হওয়ার খাসলত থেকে বেশি হেলাতে পারছে না! একমাত্র ওই লোকগান, যেখানে শত-শত বছর ধরে দেশটির বৈচিত্র্যময় নিসর্গে বিবর্তিত গানের রেশ ‘খাঁটি আমেরিকান’ নামে কিছু একটার আভাস দিয়ে যায়।

অভিযোজনের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস থেকে ছিটকে বের হওয়া গানকলির দেখা-সাক্ষাৎ দুনিয়াজুড়ে ছড়ানো-ছিটানো লোকগানে গমন করলে মিলবে। আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চল থেকে উৎসারিত গানের আবেদন সেখানে অন্যদের থেকে ভিন্ন নয়। অন্যান্য ভাষায় গীত গানের মতোই সমান হৃদয়গ্রাহী এই গানের আবেদন। অনুভূতিকে আর্দ্র করার ক্ষমতায় ভরপুর গানসম্ভার হলো আমেরিকান ফোক সংমার্কিন দেশের পাহাড়ি কথা ও সুরের টানে বাঁধা গানের জগতে ডলি পার্টন ছিলেন লোকপ্রিয় নাম। আশি বছরের জীবনে টানা পাঁচ-ছয় দশক শ্রোতাদের মন ভরিয়েছেন কানায় কানায়।

ডলি পার্টনের গানের প্রতি অনুরক্তি সময়টানে নিছক আমেরিকান না-থেকে সর্বজনীন ঘটনায় মোড় নিয়েছিল। গ্রেট ব্রিটেনের রাজা, আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান ও সাধারণ নাগরিকের যেখানে কোনো তফাত থাকেনি। তিনি দেহ রেখেছেন জানার পর রাজা চার্লস বাকিংহাম প্যালেস পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যদের দিয়ে রাজকীয় কেতায় শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন তাৎক্ষণিক। আমজনতাও তাঁকে স্মরণ করেছে ভালোবাসায়। সম্মানটা ডলি পার্টন ডিজার্ভ করেন। আমাদের মতো ইংরেজি ভাষায় অদক্ষ শ্রোতামহলে যিনি একদিন ঢুকে পড়েছিলেন তাঁর গান নিয়ে! ঢুকে পড়েছিলেন ভালো কথা, কিন্তু স্মরণ করতে গিয়ে দেখছি, তাঁর গাওয়া এতো-এতো গানের মধ্যে শোনা হয়েছে অতি অল্প কিছু গান!

কান্ট্রি সংয়ে মাঝেমধ্যে কান পাতার যে-অভ্যাস, ডলি পার্টন সেখানে ভিন্ন দুটি পথে মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। কেনি রজার্সের সঙ্গে তাঁর গানের রসায়ন বা ডুয়েটের মাধ্যমে প্রথম কানে পৌঁছান তিনি। মনে পড়ছে,—বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অগ্রজ ও তার বন্ধুরা মিলে আশি-নব্বইয়ের দশকে ইংরেজি অ্যালবাম বাজাতেন মাঝেমধ্যে। উডি গাথরি, বব ডিলান, জন ডেনভারজোয়ান বায়েজের সঙ্গে হঠাৎ বেজে উঠতেন জনি ক্যাশ ও কেনি রজার্স।

কেনি রজার্সের সঙ্গে ডুয়েটে মশগুল নারীকণ্ঠের মধ্যে ডলি পার্টন ও কিম কার্নেস-এর নাম কানে প্রবেশ করেছিল তখন। নামকরা শিল্পীর তালিকায় দুজনের নাম ততদিনে পাকাপোক্ত হয়েছে। মার্কিন মুল্লুক ছাপিয়ে দুনিয়াজুড়ে ছড়ানো ইংরেজি গানের শ্রোতামহলে সুপরিচিত ছিলেন দুজনে। বাংলাদেশে বসে, তাও আবার সেইসময়ের সিলেট শহরে কী-করে জানি এই দুজন পৌঁছে গেলেন! সকল দিক দিয়ে বিপর্যস্ত বর্তমানে বসে বাল্যকালে দেখা শহরটির কথা ভাবলে অবাক লাগে বৈকি!

হিন্দি সিনেমার গান আর গজল-ভজন ইত্যাদির বাড়াবাড়ি পরিপুষ্টি ছিল তখনকার শহরে। বাংলা গান বলতে ছিল চিরাচরিত রবি-নজরুল, দুই বাংলার সিনেমা ও আধুনিক, সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা পপ-রক-ফোক মিলেঝুলে সঙ্কর বাংলা ব্যান্ডের গান ইত্যাদি। তার মধ্যে আবার সকল ধারা ছাপিয়ে মেঠোসুরের গানগুলো সহজ অভ্যাসে শহরের আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াত প্রতিদিন! আজকের পচা শহরটার চেয়ে ছেলেবেলার মফস্বল সিলেট ঢের অগ্রসর ছিল বলে মনে হয় আমার।

সে যাইহোক, ইংরেজি গানে কান পাতা লোকজন রাজধানী ও চট্টগ্রামে বেশি ছিলেন। বাংলা ব্যান্ড গানের বিকাশে এটা বড়ো অবদান রেখেছিল। অন্যদিকে, সিলেটের মতো নিরিবিলি একটা শহরে ইংরেজি গানবাজনার শ্রোতাসংখ্যা ডাট মেরে বলর মতো আহামরি ছিল না। ‘বিটলস’-এর পর মাইকেল জ্যাকসন ও ম্যাডোনার যুগ এলো। বিশ্বে দাপট দেখাতে শুরু করলেন দুই মহাতারকা। জ্যাকসন ও ম্যাডোনার মতো পপ-আইকনের কথা বাদ দিলে ইংরেজি গানের বাদবাকি শিল্পীরা সেভাবে পাদপ্রদীপে আসতে পারেননি।

বেতার ও টেলিভিশনে বিশ্ব সংগীতের আসরে নানা দেশের গান বেশ নিয়মিত বাজানো হতো। ক্যাসেট ও পরে সিডিতে যারা ইংরেজি গান শুনেছেন, তাদের গান শোনার তালিকায় ডলি পার্টনের নাম দেখেছি মনে পড়ে। আমাদের বাসায় তাঁর আগমন অবশ্য কেনি রজার্সের হাত ধরেই প্রথমে ঘটেছিল। কেনির একখানা ডুয়েট অ্যালবাম টপচার্টে রাজত্ব করছিল তখন। বাংলাদেশের ক্যাসেট ও পরে সিডির দোকানে অ্যালবামটি সুলভ হতে শুরু করে। কেনি রজার্সের সঙ্গে যেসব নারীকণ্ঠ ডুয়েট গেয়েছেন একটা সময়, অনলাইন জামানা চলে আসার পর সেগুলো একে-একে দেখা এবং শোনার সুযোগটা উন্মুক্ত হয়। কিম কার্নেস সম্ভবত সবচেয়ে যোগ্য জুড়ি ছিলেন! আমার ধারণা এখনো তাই বটে! অন্যদের ভিন্নমত থাকতে পারে সেখানে।

Kenny Rogers and Kim Carnes; Image Source & Credit: Collected; Google Image

আহা! Don’t Fall in Love with a Dreamer গানটায় কেনি রজার্সের সঙ্গে কিম কার্নেসের ডুয়েট আজো গুজবাম্প দিয়ে যায় শরীরে! এই একটা গান কতবার যে-শুনেছি কিম কার্নেসের খসখসে কণ্ঠ হতে বিচ্ছুরিত সুরকম্পন কানে নেওয়ার রোমাঞ্চ টের পাওয়ার লোভে! অদ্য সেই স্মৃতি উসকে দিলেন ডলি পার্টন! ওদিকে আবার কেনির সঙ্গে তাঁর Islands in the Stream অতিমাত্রায় চর্চিত একটা গান ছিল বিশ্বে। ইনফ্যাক্ট, পরে জানতে পেরেছি,—অ্যালবামের প্রতিটা গানের পেছনে শ্রম ও পরামর্শকের ভূমিকা নিভিয়েছিলেন ডলি পার্টন। কেনি রজার্স ওয়েলকাম করেছিলেন এই হস্তক্ষেপ; কেননা, ডলি ততদিনে আমেরিকার কান্ট্রি সংয়ে লিজেন্ড হওয়ার পথেই ছিলেন। Islands in the Stream গানটা পরে বহুবার শুনেছি দুই মহান শিল্পীকণ্ঠে নির্গত ভালোবাসার সরল আবেদন অনুভব করার খিদে মিটানোর আশায়। কী দুর্দান্ত কেমিস্ট্রি ছিল গানটার!

কেনির গ্যাম্বলার বা এরকম গানের দিওয়ানা ছিলাম বা এখনো দিওয়ানা লাগে শুনলে, কিন্তু ডুয়েট গানে ফিমেল ভয়েস বেছে নেওয়ার গুণে তিনি বরাবর অন্যদের থেকে এগিয়ে ছিলেন। তাঁর ক্যারিয়ারকে স্বর্ণালী করার পেছনে কিম কার্নেস, শিনা ইস্টন, ডটি ওয়েস্ট (নামগুলো এই মুহূর্তে মনে পড়েছে, এবং আরো আছেন নিশ্চয়) ও ডলি পার্টন বড়ো ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ধারণা করি।

এটা গেল ডলি পার্টনের ব্যাপারে জানাশোনা ও তাঁর সঙ্গে আরো অনেক নামকরা শিল্পীর দ্বৈত পরিবেশনা শ্রবণের কাহিনি। এমন নয়, গানখোর হয়ে ইংরেজি গান নিয়মিত শোনার অভ্যাস ছিল বা আছে আমার! দৌড় বলতে বাংলা ও হিন্দি গানে মূলত সীমিত ছিল চরাচর। তার মধ্যে ইংরেজি গান যখন যেটুকুন শুনেছি,—ডলি পার্টন সেখানে অদ্বিতীয় ডুয়েটরানি হয়ে জাদু বিলিয়েছেন। পরে অবশ্য স্থিরেধীরে শুনেছি তাঁর একক কণ্ঠের দুনিয়া মাতানো কিছু গান।

দ্বৈত বা একক যাই শুনেছি অল্পস্বল্প, শুনেছি এজন্য-যে, গানগুলোকে মার্কিন মুল্লুকের বলে চিনে নেওয়ার ক্ষণে টের পেয়েছি সারল্য ও সীমানাতীত আর্তি। লোকগানের মধ্যে এই ফিলটা চলে আসা মানে হলো এটা আর কোনো দেশ বা ভাষার গানে সীমাবদ্ধ নেই। সীমানার বেড়াজাল পেরিয়ে গানটা বিশ্বের। এই পালসটা ধরে রাখার কুশলতায় সফল ছিলেন ডলি পার্টন। হতে পারে, অনেকখানি বোঝা ও না-বোঝার ঘোর নিয়ে মাঝেমধ্যে কান পেতেছি তাঁর গানে। পাহাড়ি উপত্যকা হতে সমতলে নেমে আসা এক মেয়ের কষ্টকর জীবন ও জয়ী হওয়ার গল্পগুলা গানে বলেছেন তিনি। উডি গাথরি, পিট সিগার ও বব ডিলানের মতো ফোক সংকে প্রতিবাদের হাতিয়ার করার রাজনীতিটা সেখানে বড়ো হয়ে ওঠেনি। জন ডেনভারের মতো মার্কিন দেশের পল্লী-প্রকৃতিকে কথা ও সুরে ধরেছেন অনায়াস এক সহজ উচ্ছলতায়!

তথাপি, টেনেসির গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়া এক মেয়ের সংগ্রামী জীবনের বিচ্ছুরণ তাঁর গানের ভাষাকে নিছক ভালোবাসার গানে বন্দি রাখেনি;—চোয়ালাচাপা সংকল্প ও লড়াইয়ের প্রেরণা শ্রোতারা ঠিক খুঁজে নিয়েছে সেখানে। কান্ট্রি সংয়ের রানি হওয়ার গল্পটা যে-কারণে সামান্য ব্যাপার থাকেনি ডলি পার্টনের জীবনে। পাহাড়ি প্রকৃতি ও যাপনের কত-না অনুষঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এই যাত্রায়! অল্প কয়েকটা শুনেও যা মালুম করতে কারো কষ্ট হয় না।

Jolene: Dolly Parton’s iconic song covered by Miley Cyrus; Source: Miley Cyrus YTC

তুচ্ছ দৈনন্দিন থেকে বেছে নেওয়া গানে কথা ও সুরের সারল্য ছিল তাঁর আসল চাবি। আজকে মিলি সাইরাসের মতো এ-যুগের তারকরা তাঁর বহুশ্রুত গান সময়-উপযোগী পরিবেশনায় গাইছে এবং ভালো গাইছেও তারা। তথাপি, মিলির পক্ষে ফিলটা ধরা কঠিন,—জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক মেয়ের জটিল মুখাবয়বকে ডলি পার্টন বলে চলেছেন সারল্যে গাঁথা গানের কথা ও সুরে। পাহাড়ি নিসর্গে মোড়ানো তাঁর গানগুলো অজস্র তিক্ততা পেরিয়ে তবেই পৌঁছাতে পেরেছিল এই সারল্যে;—বর্তমান যুগবিশ্বে এরকম ‘সারল্য’ প্রত্নতত্ত্ব হতে চলেছে। দরদি বিষাদ ও উচ্ছলতার নিকষিত স্বর্ণ হচ্ছে ডলি পার্টনের গান;—একে এখন যুগের সঙ্গে অভিযোজন করে গাওয়া কঠিন থাকবে এ-যুগের শিল্পীদের জন্য।

প্রশ্নটা উঠবে যে-কারণে,—গানের কী আলাদা ভাষা হয় কোনো? আমরা একটা ভাষায় তা শুনি হয়তো, যেখানে ভাষাতীত আবেদনে তা যখন মনে জায়গা করে নেয়,—তাকে বলতে পারি সংগীত। আর, ডলি পার্টন সেই সংগীতের রানী ছিলেন।

যাকগে, সোলোর কথায় আসি। Coat of Many Colors, I Will Always Love You, 9 to 5-এর মতো গান দিয়ে ডলি পার্টন শ্রোতামনে জায়গা করে নিলেন। অজস্র গান করেছেন। সবগুলো শোনা হয়নি বা শুনলেও এখন মনে পড়ছে না! কারণ হয়তো এই,—উডি গাথরি, পিট সিগার, জোয়ান বায়েজ, জনি ক্যাশ, সাইমন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল, জন ডেনভার, কেনি রজার্স ও বব ডিলানকে শোনার অভিজ্ঞতা বেশ ধারাবাহিক থেকেছে জীবনে;—ডলি পার্টনের এতো-এতো গান সেখানে গলতিদোষে কান পেতে শুনেছি অল্প!

কিছু যায় আসে না তবু! কারণ, যে-কয়টা শুনেছি, সেগুলো পরে ফিরে-ফিরে শুনতে বাধ্য করেছেন এই শিল্পী। এখানেই তিনি জিতে গেছেন। কোনো গান যখন শ্রোতা কিছুদিন অন্তর শোনার বাসনা মনে পুষে রাখে, তখন সেই গানের শিল্পী জিতে যায়। কানে ও মগজে তার নাম খোদাই হতে থাকে অক্ষয়।

আর কি লাগে একজন শ্রোতার,—‘জোলিন’-এর (Jolene) মতো কোনো গান যখন আবার এবং আবার শোনার বেগ তাকে নাচায়? সারল্য ভারাতুর আর্তি গানটাকে সিম্পল বাট অ্যালিগ্যান্ট করে তুলেছে! সাধে কি বলা হয়,—মার্কিন লোকগানকে রাজকীয় মহিমা দান করেছেন ডলি পার্টন। এমন একটা গান এই ‘জোলিন’, এর ভাষা ইংরেজির সীমানা ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়েছে অনায়াসে! কিছু শোনা লাগে না আর, শ্রোতার হৃদয় ঠেলে আপনবেগে বেরিয়ে আসে গানটার চরণ :

Jolene, Jolene, Jolene, Jolene
I’m begging of you please don’t take my man

গানের অন্তরায় নিজেকে যে-পিকে তুললেন শিল্পী, অতঃপর তাঁর নাম শ্রোতার দিলকাবায় খোদাই হয়ে গিয়েছে। গানটি ডলি পার্টন নিজে লিখেছিলেন বলে জানতে পেরেছি অনেক পরে। একাধিক আলাপচারিতা ও গানের আসরে নেপথ্য কারণ বলে দিতে দ্বিধা রাখেননি মনে। ঘটনাটি মজার ছিল বটে! লাল চুলের এক সুন্দরী, ব্যাংকে চাকরি করতেন, কাজের ছুতোয় তাঁর বাসায় যাওয়া-আসা করতেন একটা সময়। ডলির বরের প্রতি মনে-মনে দুর্বল ছিলেন রূপবতী। সামনে ধরা দিতেন না, তবে দেহের ভাষায় বার্তা দিতেন মনে হয়, আর ডলির তা ধরতে সময় লাগেনি।

নারীকুল ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা এরকম কিছু একটার অধিকারী বলে জগতে প্রচারিত! লাল চুলের রূপসী-মনে সুপ্ত বাসনা ডলিকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। প্রকৃতির নিয়মে মনে শঙ্কা ও কষ্টের মেঘ জমছিল ধীরে-ধীরে। ঈর্ষাও জেগে উঠছিল ভিতরে। বরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে নিজেকে হালকা করতে মন ওঠেনি ডলির। চাপটাকে অগত্যা গানে রূপ দিলেন পরে। ‘জোলিন’ নামে গানটা এভাবে লিখে ফেললেন ডলি পার্টন। তাঁর ভাষায়, ‘স্বামীকে নিয়ে মজা করা ও তাকে খ্যাপানোর’ ভাবনা মাথায় কাজ করছিল গানটা লেখার সময়। ‘জোলিন’ নামের রূপসী নারীকে গানে ধরলেন ওই কারণফেরে। নামটা আবার কোনো এক কন্সার্টে বাচ্চা একটা মেয়েকে অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় পেয়েছিলেন। মেয়েটার নাম ছিল ‘জোলিন’। ডলি তাকে বলছিলেন,—‘তোমার নামটা দারুণ! আমি এই নাম গানে ব্যবহার করব একদিন।’

Dolly Parton in 1977, just several years after ‘Joleneৎ was a hit; Source & Credit: Wikimedia

সে যাইহোক, লোহিতকেশ রূপবতী অবশেষে ‘জোলিন’ নামে গানে দেখা দিলেন! নিজের পুরুষকে তার কাছে হারানোর শঙ্কা গানের ভাষায় অবিনশ্বর করলেন ডলি পার্টন। গানটির প্রতি চরণে বিচ্ছুরিত সহজ আর্তি ও আবেদনের কি কোনো দেশকাল আছে? আমার কাছে নেই! ‘জোলিন’ সুতরাং গানের ভাষায় নারী-পুরুষের মধ্যে চলতে থাকা সম্পর্কের আলাপ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ঈর্ষা ও আবেদনের অবিনশ্বর বোধ জাগিয়ে তোলে মনে। কোনো নারীবাদী বয়ানের সাহায্যে গানটিকে ব্যাখ্যা করা অবান্তর। প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই :

আরে বাবা, বেটাছেলে যদি বেটিমানুষের ফাঁদে পা দেয়, তার জন্য কেন পুড়বে নারীর মন? বিচ্ছেদ নেওয়া উচিত সেই নারীর। এটা ছাড়া নারী তাহলে কীসের স্বাধীনচেতা?

সমস্যা হলো, ভালোবাসার ইলাজে নারীবাদী ভ্যানতারা খাটে না। ডলি পার্টন পোড়খাওয়া সংগ্রামী মেয়ে ছিলেন, কিন্তু গানটা শুনে মনে হবে পল্লীবাংলার সরলা বঙ্গবধূ পথ ভুলে মার্কিন মুল্লুকে ঢুকে পড়েছে! মেমসায়েবের বেশ ধরে গানটা গাইছে কেবল! লোহিতকেশী এক নারীর রূপগুণ অকপটে গানে বর্ণনা করছেন শিল্পী। অসহায় আত্মসমর্পণ করছেন তার রূপ-বাহারের কাছে। মেনে নিচ্ছেন নিজের পরাজয়। সবিনয় আর্জি ঠুকছেন,—লালচুলের রূপসী যেন তার পুরুষের মাথা খাওয়ার পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। যেহেতু, ডলি পার্টনের মতো মেয়ের জীবনে কাউকে বিশ্বাস করে ভালোবাসার ‘কিমত’ আজো অমূল্য। গানে অকপটে বলছেন :

You could have your choice of men
But I could never love again
He’s the only one for me, Jolene

মর্মন্তুদ ও গভীর এই বিবৃতি! হাজার পাতা কবিতা কিংবা আখ্যান লিখে মনে হয় না বোঝানো সম্ভব;—গানের কয়েকখানা চরণে যা বলে দিয়েছেন ডলি পার্টন! But I could never love again;—মর্মান্তিক এই অনুভবটা এখানে গানের চাবি। সত্যিই তো, বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা কি ফেরত পায় কোনো নারী বা পুরুষ? না, পায় না। হারগিজ পায় না।

সেইসঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন,—ডলি পার্টন কিন্তু বিষাদরসে চুবিয়ে গানটা গাইছেন না! একটা ফানি ভাব ছলকে পড়ছে গানের সর্বাঙ্গে। প্রতিপক্ষ নারীর দিকে পরিহাসমাখা বাক্যবাণ ছুড়ছেন ডলি তাকে প্রশংসা করার ছলে। লাল চুলের রূপসীর ক্ষমতাকে বিদ্রুপ করছে গানটা। বুঝিয়ে দিচ্ছে,—কাউকে বিশ্বাস করে ভালোবাসার শক্তিতে হার মানতে তিনি রাজি নন। অন্য নারীর জাদুটানে রূপলোভী পুরুষের সমর্পণ ‘জোলিন’ গানের মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য হলো,—নিজেকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচানোর তাড়নায় এক নারী লড়ছেন গানের ভাষায়! লাল চুলের রূপসী যেন মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার একমাত্র ‘শক্তিটা’ তাঁর থেকে কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্য যতদূর যেতে হয় তিনি যাবেন। একটা টাফ ব্যাটল ও তাতে জয়ী হওয়ার প্রত্যয় গানটাকে উচ্ছল রাখে আগাগোড়া।

ডলি পার্টনের সকল অর্জন ছাপিয়ে মনে তাই গুনগুন করছে এই একটা গান ‘জোলিন’। গুনগুন করছে গানের শেষ নিবেদন :

জানি হে লালচুলের রূপসী, তুমি ইচ্ছে করলে আমার পুরুষটাকে মুঠোয় পুরতে পারবে। রূপলোভী পুরুষের শক্তি নেই তোমার মাধ্যাকর্ষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করে! তোমাকে তবু বলছি সবিনয়ে,—আমার থেকে তাকে কেড়ে নিও না। আমার মধ্যে ‘ভালোবাসার’ শক্তি ও বিশ্বাসটা এখনো বেঁচে আছে। ওটা ধসে পড়ার মানে হলো, আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না কখনো! এমনকি নিজের প্রতি ‘বিশ্বাস’ হারিয়ে ফেলব। দেখো মেয়ে, নিজের ‘বিশ্বাস’ রক্ষায় আমাকে তোমার প্রতি নির্দয় হতে বাধ্য করো না। জানি, তাকে কেড়ে নিতে পারো তুমি, তবু সবিনয়ে বলছি আবার..

Please don’t take him even though you can.

এই ডলি পার্টনকে কেন ভুলে থাকা সম্ভব নয় তা বোঝার জন্য আর কিছু কি লাগে শ্রোতার? কিছু লাগে কি বুঝতে, মিলি সাইরাসের ভাষায় কেন তিনি ‘আমেরিকান লোকগানের গডমাদার’? জীবনের ভারা পরিপূর্ণ করে যে-গডমাদার মাত্র বিদায় নিলেন আগস্টের ২৫-এ।
. . .

Dolly Parton performs Jolene at Glastonbury; Source: BBC

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

গানালেখ্য : হদয়ের কী হয়

লেডি গাগা : “দ্য মাদার মনস্টার”

ওজি অসবর্ন — বিদায়, ক্লেদজ কুসুম

লেট ইট বি

প্রথা ও প্রতিমার দেশে সন্‌জীদা খাতুনের শেষযাত্রা

অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান

মগজের মাস্তানি

. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *