
Things fall apart;—সবকিছু ভেঙে পড়ার আভাস বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় টি এস এলিয়ট তাঁর কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন। আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বস্তুজগতের লয়-বিলয়-উদয় নিয়ে ভাবতে বসে সবকিছুর বয়ে চলা ও রূপান্তরের মধ্যে সারসত্য দেখতে পান। পৃথক কালপর্বে দেখা দেওয়া দুই মনীষার আপ্তবাক্য ভিন্ন স্বরূপ ও নির্মমতায় বর্তমান বিশ্বের যুগভাষায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে! প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘কী ভেঙে পড়ছে’? উত্তরটা আমার কাছে এরকম :
ভেঙে যাচ্ছি আমি, ভাঙছে মানুষ, আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধ।
এতদিনের চেনা পৃথিবীর কিছু আর আগের মতো নেই। ডিনামাইট দিয়ে যেন ধসিয়ে দেওয়া হচ্ছে একেকটা ইমারত। চারদিকে ধোঁয়াশা। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সময়ে আমাদের ভবিষ্যৎ ঝাপসা হয়ে এসেছে। কী হতে যাচ্ছে এর আভাস সেখানে স্বচ্ছ নয়। ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে সময়ের গতিবিধি বোঝা তাই দায় হয়ে উঠেছে। এমনকি যে-বিষয় নিয়ে এই নিবন্ধের সূত্রপাত, সেই ছোটকাগজের মতো মনকে জাগিয়ে তোলার ব্রতে নিবেদিত মাধ্যমের সংকট সময়ের এসব টানাপোড়েন ও ভাঙনের মধ্যেই নিহিত মনে হচ্ছে। যেহেতু, সময়ের মাঝে লুকিয়ে থাকে সকল প্রশ্নের উত্তর ও সংকট থেকে উত্তরণের নিশানা।
সমাজতন্ত্রের পতন ঘটার পর বিকল্পের অভাবে পুঁজিবাদ বিশ্বের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। পুঁজি তারপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধ। কার্ল মার্কস তাঁর অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টিতে এর যে-নির্মমতা ব্যাখ্যা করে গেছেন, তা আরো ক্ষিপ্রতায় নিজেকে পরিপুষ্ট করেছে। একথা সবার জানা,—পণ্যায়নের মাধ্যমে বিরামহীন উপযোগ তৈরি পুঁজির স্বভাব। একুশ শতকে এসে যার বাঁকবদল ভয়াল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিগত শতাব্দী শেষ হওয়ার লগ্নে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটার পর পুঁজিবাদের কর্তাব্যক্তিদের মুখে বিশ্বায়নের কথা শুনেছিল বিশ্ব। তাত্ত্বিকভাবে এর আভাস যদিও আগে থেকে সামনে আসছিল, কিন্তু বিশ্বায়নের বাস্তবিক নির্মমতা মানুষ তখন উপলব্ধি করতে পারেনি।
বিশ্বায়নের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক দেশগুলোর স্বাতন্ত্র্য মোটাদাগে বুঝে নেওয়া কঠিন থাকেনি। বাঙালি জাতিসত্তার গণ্ডিতে বাস করে নিজেকে অনুভবের যেসব প্রথা-মূল্যবোধ ও অভ্যাসে মানুষ অভ্যস্ত ছিল, গত দশ-পনেরো বছরে তা আমূল বদলে গেছে;—আগের মতো স্পষ্ট হয়ে কিছু ধরা দেয় না চেতনায়! আমাদের চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে মেরুকরণ তীব্র হয়েছে। অস্থিরতা, বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতা মানব উপলব্ধিতে শক্ত খুঁটি গেড়ে বসেছে।
প্রশ্নটি কাজেই ওঠে,—এই মেরুকরণ বা পালাবদলের স্রোত আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? একরৈখিক বিশ্বের দিকে আমরা যাচ্ছি কি? সেই বিশ্বের স্বরূপ কেমন হতে পারে অনাগত সময়ে? কারা এর রূপকার থাকছে সেখানে? পুঁজির কর্তাব্যক্তি? তাদের অনুগত নেতা ও রাজনীতি? রাষ্ট্রপতি? বিজ্ঞানী? লেখকসমাজ? সকলে মিলে কি ত্বরান্বিত করছে মানবজাতির নতুন ‘ভবিতব্য’ বা ‘পতন’? নতুন ভবিষ্যতের মাঝে কি নিহিত কল্যাণ অথবা ধ্বংসের রক্তবীজ? প্রশ্নগুলোর উত্তর, আমার মনে হয়, মানবজাতির সামগ্রিক জীবন ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় খুঁজতে হবে। সবকিছু একটা পরিণামের দিকে স্থির বা নির্ধারিত করতে যারা ভূমিকা রাখছে, সেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা-পরিভাষাও অন্যতম নিয়ামক সেখানে।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা যদি ধরি, জ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী শাখা দর্শন ও বিজ্ঞান ঠিক কোন অবস্থায় আছে বর্তমানে? দর্শন কি ক্ষয়িষ্ণুতায় পতিত নয়? দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দার্শনিক চিন্তন ধীরে-ধীরে পরিণতি পাচ্ছিল, সেখানে তার এই আকস্মিক বিপর্যয় কেন ঘটল? কে বা কারা একে ত্বরিত করেছে? প্রগতির মানদণ্ড বিবেচিত বিজ্ঞানের সাথে বিচ্ছিন্নতা কি দর্শনকে ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে? নাকি, দীর্ঘ দার্শনিক ভাবনার ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করে একালের দার্শনিক মনন এই সিন্ধান্তে উপনীত হয়েছেন :
সময়ের সঙ্গে প্রবল হওয়া বিচ্ছিন্নতা বা সামগ্রিক নৈরাজ্যকে গ্রহণীয় আবহে ধরতে হলে ব্যক্তি ও সমাজ-অস্তিত্বে ভাষার ব্যবহার বা যেসব তন্ত্রের কারণে ভাষা চিন্তাকে অবরুদ্ধ করছে, তাকে বুঝে নেওয়াটাই দর্শনশাস্ত্রের একমাত্র কাজ হবে।
গত শতাব্দীর শেষ দিকে মিশেল ফুকো, রোঁলা বার্থ, জ্যাক দেরিদার দর্শনে নৈরাজ্যের উপস্থিতি কি তাহলে সময় প্রভাবিত? ‘উন্মাদনার ইতিহাস’ লিখতে বসে মিশেল ফুকো যখন মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তি ‘যুক্তি’কে আঘাত করলেন, আঘাত হানলেন রেনেসাঁ প্রসূত মানবতাবাদকেও,—আমাদের দাঁড়াবার জায়গা থাকল কি আর? অনেক সীমাবদ্ধতা আছে জেনেও যুক্তিবোধের চর্চায় মানুষ নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলেছিল;—ফুকো এখন যে-দৃষ্টিকোণ থেকে আঘাতটি করেছেন, একে কীভাবে মোকাবিলা করবে বর্তমানে চর্চিত দর্শন? মানুষের উপর এর প্রভাব কী পরিণাম রাখতে যাচ্ছে সামনে?
ভাষা-দার্শনিকরা মানুষের সকল সীমাবদ্ধতাকে তার ভাষা-ব্যবহারের মধ্যে আগে খোঁজেন। তাঁরা বলেন,—‘ভাষাকে ব্যবহারের পদ্ধতি’গত সমস্যা মানবপ্রগতিকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। নতুন ভাষার সন্ধান করতে বলছেন তাঁরা। সেই ভাষার সন্ধান অবশ্য আজো জানা হয়নি! অধিবিদ্যার জালে বরং হারিয়ে যাচ্ছে দর্শনের সকল প্রগতি। একুশ শতকের প্রধানতম দার্শনিকদের বক্তব্যে পুঁজি ও বিজ্ঞান প্রভাবিত দেশকাল বা এর ভাষাকাঠামো নিয়ে সমালোচনা আমরা পাই, কিন্তু উত্তরণের নিশানা তাঁরা দেখাতে পারেননি। প্রত্যেকে বরং আলাদা করে রহস্যীকরণে ঝুঁকে থেকেছেন। রহস্যীকরণটা এমন, তাঁদের নির্দেশিত পথে ভাষাকে মুক্ত করতে হলে রক্তমাংসের অস্তিত্বে তাকে ফেরত পাওয়া মুশকিল হয়। বিংশ শতকের এসব দার্শনিক বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ও প্রভাব বিস্তার করেছেন, তবে চিন্তাজগতে অস্বস্তিকর স্থবিরতা ও ভ্রান্তির জন্ম-যে তাঁরা দেননি,—একথা বোধহয় হলফ করে বলা যাবে না।
ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত দর্শনশাস্ত্র বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে সংযোগরেখা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এবং এর রেশ এখনো কাটেনি। বিজ্ঞান হয়ে পড়েছে অপ্রতিরোধ্য শক্তি। সবকিছুর পরিশেষ দেখার উন্মাদনা যেন তাকে পেয়ে বসেছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষকে অনেকদূর নিয়ে এসেছে, এবং এর বিপরীতে ভীতও করে তুলছে অধিক! ভীতিটা এসেছে অপব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে। বিজ্ঞানের অপব্যবহার গত শতাব্দীতে ব্যাপকহারে ঘটেছিল। নতুন শতকেও তা ঘটছে। প্রতিটি অসাধারণ আবিষ্কারকে রাজনীতি ও পুঁজিস্বার্থে ব্যবহারের ঝুঁকি তীব্রতর হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের সুফল নিয়ে যে-কারণে বাক-বিতণ্ডা প্রবল হতে দেখছি আমরা। প্রশ্ন উঠছে,—পুঁজিবাদের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অধীনে থেকে বিজ্ঞান যে-প্রগতি সম্ভব করেছে, এটি এখন মানবজাতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা সুস্থির সেখানে?
বিজ্ঞানকে অবশ্য এর জন্য দায়ী করে লাভ নেই। সে তার নিজ গতিতে কাজ করবে, কিন্তু তাকে প্রভাবিত করার মতো শক্তির অভাব অনেকে দেখতে পাচ্ছেন। অভাবটি বোধহয় আমাদের নৈতিকতারও। অন্যান্য জ্ঞানের নিক্তিতে তাকে পরিমাপ ও তার সঙ্গে সংলাপের অভাব কি বিজ্ঞানকে বাধ্য করছে পুঁজির ভাড়া খাটতে? পুঁজিবাদ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করবে এটা স্বাভাবিক। পুঁজির মূল নিয়ন্ত্রকদের একচেটিয়া করতল থেকে বিজ্ঞানকে মুক্ত করতে নতুন ভাষা ও দর্শন-পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। সমস্যা হলো দর্শনকে সংযোগহীন হতে দেখছি আমরা! ভাষা-দার্শনিকদের ময়নাতদন্তের শিকার হয়ে পথহারা অধিবিদ্যার জালে সে আটকে গেছে।
বলা হচ্ছে এই শতাব্দীতে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানের অন্যতম হলো জৈবপ্রযুক্তি। বিগত শতকের মাঝামাঝি ওয়াটসন ও ক্রিক যখন ডিএনএর গঠনকাঠামো আবিষ্কার করলেন, তখন থেকে বিজ্ঞানের সামনে বিশাল দরোজা খুলে গেল। জিনতত্ত্ব খুলে দিলো অপার সম্ভাবনার জগৎ। নতুন শতকে পা দিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন কোন কাজের জন্য কোন জিন প্রয়োজন, তা ব্যবহারের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে আগামীকে। নির্ধারণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে ইতোমধ্যে ফলতে শুরু করেছে। জৈবপ্রযুক্তির অভিনব সব আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য বা মুনাফা নিয়েছে নতুন মোড়। সব মিলিয়ে অমোঘ নির্ধারণবাদের দিকে দ্রুত নিজের পরিণাম খুঁজছে মানুষ!
সভ্যতাকে নির্ধারক এই পরিস্থিতির দিকে ঠেলতে থাকা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে কে রুখবে? দার্শনিক? তিনি তো এসবে নেই! লেখক? বিজ্ঞানকে গালিগালাজে পারঙ্গম অথচ বিজ্ঞানের সুবিধাভোগী একজন! বিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ-কেউ নিজস্ব নৈতিক দায়বদ্ধতার কারণে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন এবং বিশ্বকে অবহিতও করছেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের চেষ্টা সেখানে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই অবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি এলাকায় বিশৃঙ্খলা জন্ম নিয়েছে। শুধু তাই নয়, যুগটাই হয়ে পড়েছে বিশেষায়িত। জ্ঞান-বিজ্ঞান, এর ব্যবহারজীবী ও নিয়ন্ত্রণক ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো,—অসংখ্য বিশেষায়িত অঞ্চলে সবকিছু ভাগ হয়ে বিচ্ছিন্নতাকে ত্বরিত করে দিয়েছে! বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ;—সমাজ-রাষ্ট্র দুটি ভাগে সম্পূর্ণ বিভক্ত হয়ে গেছে। একজন বিশেষজ্ঞের সারা জীবন তার নিজ কর্ম-এলাকায় কেটে যায়, অন্য এলাকার খোঁজখবর নেওয়া বা সংযোগ করার মতো সময় ও মানসিক স্থিতি অবশিষ্ট থাকে না। এর ফলে কবির তোলা প্রশ্নটি ফিরে-ফিরে আসে : ‘কতদূর এগুলো মানুষ’?
এই জিজ্ঞাসাকে অন্যদের সঙ্গে খোলামেলা পরিসরে যাচাই করার সময় কারো নেই। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংলাপের অভাব জন্ম দিয়েছে অসংগতি ও বিচ্ছিন্নতা, যার ফলাফল হিসেবে আত্মকেন্দ্রিক জ্ঞানবিশ্বের দিকে মানুষ ধাবিত হচ্ছে। দায়িত্ব-কর্তব্য-নৈতিকতার যেসব চর্চা বা বাক-বিতণ্ডা অতীতে হয়েছে, সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে একেও সাবেকি লাগে এখন! সব ছাপিয়ে বিচ্ছিন্নতা, মনোবিকলন, বিভ্রান্তি ও স্থবিরতা ব্যক্তি ও সমাজকে যেন জিম্মি করে ফেলেছে!
এই সামগ্রিকতায় সাহিত্য ও ছোটকাগজকে যদি বিবেচনা করি, সেখানে তাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। সাহিত্যের কথাই ধরি। সৃজনশীল লেখকমাত্রই জানেন,—ব্যাপক জনতার উপর তাঁদের প্রভাব অতীতের মতো প্রবল নয়। সাহিত্যের লেখক-পাঠক নামে চিহ্নিত গোষ্ঠী বা গোত্রের মতো একটা কিছুর মধ্যে নিজের চলাচল সীমিত হয়ে এসেছে। মানুষের জীবন-যাপন ও মনোজগৎ নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন, কিন্তু সময়ের গতি-প্রকৃতি বিশেষায়িত পরিসরে একজন লেখককেও বন্দি করে রেখেছে।
বিজ্ঞানীও তাই। সাধারণের দরবারে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক সুফল পৌঁছে দেওয়া ছাড়া বিজ্ঞানীরা নিজের মননশীল ভাবনাকে বিশেষায়িত মহলে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী লেখালেখি মাধ্যমের গুণীরা যেমন সীমাবদ্ধ পরিসরে আটকা পড়েছেন;—একটি ছোটকাগজ একইভাবে সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামগ্রিক প্রভাব-বলয়ের বাইরে বসে সময়ের গতিধারা বোঝার চেষ্টা করছে। সংযোগহীনতার সংকট তীব্র হওয়ার কারণে মানবপ্রগতির দায়ভার বিচ্ছিন্নভাবে যাঁরা বইছেন এখনো, তাঁদের কণ্ঠস্বরকে আলাদা করে শনাক্ত করার পরিসরটি জীবন্ত থাকছে না। সৃজনশীল ও মননশীল এলাকায় সমন্বয়ের অভাব প্রচণ্ড হওয়ার কারণে ‘সার্বিক’কে ধারণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নেই আর! ‘বিচ্ছিন্নতা’ কাজেই ভয়াল হয়ে উঠছে দিনদিন! প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, বিংশ শতকের অস্তিত্ববাদী দর্শন বিচ্ছিন্নতার এই সংকট নিয়ে ভেবেছিল। পুঁজিবাদের গতিশীল ব্যবস্থাপনা কীভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্ন সত্তায় পরিণত করছে, তার একটা রূপরেখা আমরা সেখানে খুঁজে পাই।
আধুনিক দর্শনশাস্ত্রের অন্যতম পুরোহিত মার্টিন হাইডেগারের দর্শনে ব্যক্তি-অস্তিত্বের দুটি দিক আলোচিত হয়েছিল, যার একটি হলো ‘যথার্থ’ এবং অন্যটি ‘অ-যথার্থ’। ‘যথার্থ’ অস্তিত্বে মানুষ তার নিজের ব্যাপারে সঠিক ধারণা রাখে; কিন্তু ‘অ-যথার্থ’ অস্তিত্বে সে কিছু না বুঝে কাজ করতে থাকে। প্রথমটায় নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করে সে অগ্রসর হয়, দ্বিতীয়টায় অন্যের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করে বা তাকে করতে বাধ্য করা হয়। সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাসের স্বার্থে আত্মবিরোধী হওয়ার নিয়তিটা সে মেনে নেয়। নিজের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় এর ফলে। এই দূরত্ব হাইডেগারের চোখে ‘বিচ্ছিন্নতা’ হয়ে ধরা দিয়েছিল। অনুরূপ বক্তব্যের দেখা মিলবে পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে। তাঁরা মনে করেন, বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রযুক্তিযুগের অবদান;—প্রথম শিল্পবিপ্লবে এর বিকাশ, এবং দ্বিতীয় মহাসমর পরবর্তী প্রযুক্তিক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে বিস্তার ঘটেছে বিশ্বে।
সমাজবিজ্ঞানীরাও এই মতের সাথে সহমত পোষণ করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ খুঁজেছেন। সুতরাং, সামাজিক-ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের প্রায়োগিক অবদান বা তার পুঁজিকরণ নিয়ে অন্য এলাকার বিশেষজ্ঞজনের মত-মন্তব্যে ঐক্য দেখা যায়। এটা প্রমাণ করে,—সামাজিক প্রক্রিয়াকরণের পথে বিজ্ঞানকে মানুষের স্বাধিকারবোধ ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে তার নিজের সঙ্গে এবং অন্যদের সঙ্গে দূরত্বকে সচেতনভাবে অমোঘ করা হচ্ছে। আমার মনে হয়, সংকটের কার্যকারণ বোঝার জন্য বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে বিজ্ঞানের যোগসূত্র নিয়ে আরো গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
বিচ্ছিন্নতার সংকট অতীত সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি তীব্র ও বেদনাদায়ক পরিণতিতে মোড় নেওয়ার কারণে সমাজ-প্রগতির প্রত্যেকটি ক্ষেত্র এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। বর্তমান যুগবিশ্বে ব্যক্তিমাত্র কোনো-না-কোনোভাবে বিচ্ছিন্নতার শিকার। ‘চাপিয়ে দেওয়া’ অনেককিছুর মধ্যে সত্তাবিমুক্ত মানুষ নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বিচ্ছিন্নতায় নিঃস্ব মানুষের মনে যে-কারণে এত অবিশ্বাস, এত সন্দেহ ও অসহায়ত্ব! বিগত শতাব্দীর সাহিত্যিক-দার্শনিক চিন্তনে সর্বব্যাপী হতাশার চিত্র আমরা দেখেছি। জীবনের মর্মমূলে প্রবিষ্ট হওয়ার ব্যর্থতা থেকে যে-সাহিত্যের ভাষা হতাশা বা নৈরাশ্যের গরল পান করেছে বারবার। বলা হয়, মানুষ অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করছে, যা সে অতীতে কখনো ভোগ করেনি এভাবে। প্রশ্ন হলো,—মানুষ কি আসলেই স্বাধীন হয়েছে? যন্ত্রশাসিত ভোগ প্রাচুর্যের যুগে তাকে কি যৎসামান্য ব্যক্তি হয়ে ধরায় বিচরণ করতে দেখছি না আমরা? দাঁড়ানোর কোনো জায়গা কি তার জন্য সত্যি অবশিষ্ট আছে এখনো?
মোটাদাগে এইসব গুরুতর অথচ আপাত সমাধানহীন সংকটের ভিতর দিয়ে আমরা সামনে পা বাড়াচ্ছি। সার্বিকতাকে ধরতে না পারলেও সকলে মিলে কমবেশি সামগ্রিক সংকট ও জটিলতার শিকার হচ্ছি প্রতিনিয়ত। বিভ্রান্তি, হতাশা ও স্থবিরতাকে বড়ো করে তুলতে বাধ্য হচ্ছি বলা যায়। এতক্ষণ ধরে যা বললাম তা এই কারণে-যে, সংকটের বহুমুখী দিকগুলো নিয়ে আমরা অহরহ কথা বলি, কিন্তু এর সুরাহা কীভাবে হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবি না। শুধু তাই নয়, কোনো-একটি সংকট নিয়ে আমরা যখন কথা বলছি, সার্বিকের জায়গা থেকে একে তলিয়ে দেখার তাড়া বোধ করছি না। আমার কাছে ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে এরকম একটি বিষয়;—একে তার দেশ-কালের বাইরে গিয়ে সামগ্রিকের জায়গা থেকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে, যদিও তা আমরা করে উঠতে পারিনি।
ছোটকাগজ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়-যে, তাকে কেবল স্থানিক মাপে বিচার করতে হবে। এইসব বিবেচনা থেকে ছোটকাগজের সংকট নিয়ে আলোচনার মুখবন্ধ হিসেবে উপরের কথাগুলো বলা। আশা করি আমরা এসব নিয়ে আরো ভাববো, যেন অদূর ভবিষ্যতে ছোটকাগজের আওয়াজ সবল করতে কাজে লাগে। যাইহোক, ভূমিকায় ইতি টেনে ঢুকে পড়ি ছোটকাগজের বৃত্তে।

বাংলা ছোটকাগজের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো নিজেকে দেখা ও নানামুখী সংকট বোঝার জন্য যে-তত্ত্বগত ভিত্তি প্রয়োজন, আমাদের এখানে তার কোনো ভিত তৈরি হয়নি। যে-কোনো বিষয়ের দার্শনিক তাৎপর্য ও তাত্ত্বিক ফ্রেম থেকে একে বিবেচনা করার বাস্তবতাকে ছোটকাগজের লেখক-কর্মীরা আমলে নিতে অনীহা দেখান। এর ফলে পরিষ্কার চিন্তাসূত্র ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পথটা বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিকভাবেও যে-কারণে ছোটকাগজের পরিচিতি ও মান্যতা মানুষের কাছে আজো কোনো গুরুত্ব রাখে না।
ওপার বাংলার কাগজগুলো দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে অনেকটা দাঁড়াতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশের ছোটকাগজ চর্চায় ঘটনাটি ঘটেনি। পরিষ্কার তত্ত্বগত ভিত না থাকায় ছোটকাগজের সম্পাদক, লেখক, পাঠককে যদি আলাদাভাবে প্রশ্ন করা হয়, ‘ছোটকাগজ কী?’—কিছু মৌল ঐক্য ছাড়া প্রত্যেকে নিজের সংজ্ঞা দাঁড় করান, এবং তাঁর ভাবনা প্রসূত কাগজটি প্রকৃত ছোটকাগজ ও বাকিরা নয়,—এরকম মতামত দিতে দ্বিধা করেন না। ছোটকাগজে সক্রিয়দের যে-কারণে নিজের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে দেখেছি আমরা একটা সময়।
অনেকে বলতে পারেন,—ছোটকাগজ বিষয়টি এমন, সবকিছু এর মধ্যে আঁটানো যায়, সুতরাং বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক। সংজ্ঞা বা তত্ত্ব অন্তত ছোটকাগজের জন্য অপরিহার্য নয়। মতামতের গভীরতা অনুধাবন করেও বলতে হচ্ছে,—শক্ত কোনো ভিতের ওপর দাঁড়াতে না পারলে যে-বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য জন্ম নেয়, সেখানে এর নিরসন কীভাবে হবে? ধারণাগুলোর গভীরে গিয়ে যদি আমরা পরিষ্কার ধরতে না পারি ছোটকাগজ কী বা কী হতে চাইছে,—তাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যটা তাহলে স্থির করব কীভাবে? ছোটকাগজকে অতএব দার্শনিক অভিজ্ঞতা ও ধারণাগত দৃষ্টিকোণ থেকে তলিয়ে দেখার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। এরকম সব জায়গা থেকে এর সৃষ্টি-প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণের মতো গভীর মননশীলতার অভাবে ছোটকাগজের জোয়ার নিস্তেজ হতে চলেছে। লেখালেখির স্বাধীন ও নিরীক্ষাপ্রবণ পরিসরটিকে কেবল অস্তিত্ব কেন্দ্রিক উদ্বিগ্নতার কারণে আজ ম্রিয়মাণ দেখায়!
যাইহোক, ছোটকাগজ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাগুলোর দিকে এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক। এর সাথে জড়িতরা যে-বিষয়গুলোকে কমবেশি গুরুত্ব দিয়ে কাগজ বের করতেন অতীতে, এবং এখনো অনেকে বের করছেন, সেখানে মূল ভাবনাগুলো এরকম :
ছোটকাগজ হচ্ছে সৃষ্টিশীল সাহিত্যচর্চার মাধ্যম।
প্রচলিত সাহিত্যকে অস্বীকার করে নতুন সাহিত্য-নির্মাণ ছোটকাগজের ব্রত।
প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখকদের প্লাটফর্ম হিসেবে নিজেকে উপযুক্ত প্রমাণ করে ছোটকাগজ।
ছোটকাগজ তারুণ্য ও এর ভিতরে সক্রিয় দ্রোহকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। পুঁজি যে-প্রথাগুলো অনিবার্য করে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন বিকল্পের স্পর্ধা একমাত্র এই মাধ্যমটির পক্ষে দেখানো সম্ভব। কেননা, তার লেখক-পাঠক বৃত্তটি ছোট হলেও পরিপক্ক। অবাণিজ্যিক ও শুদ্ধ সাহিত্যের চর্চায় যারা নিবেদিত ভাবেন নিজেকে।
‘সবুজপত্র’, ‘কল্লোল’-যুগ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা কমবেশি এই ধারণাগুলো মনে গেঁথে কাগজ বের করেন। এর বাইরে গিয়ে যারা কাগজ করেছেন অতীতে বা আজো করছেন, তাঁরা আদৌ ছোটকাগজের সংজ্ঞায় পড়ছেন কি-না এই বিতর্ক একটা সময় জোরেশোরে তোলার প্রবণতা আমরা দুই বাংলাজুড়ে দেখেছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা যদিও আমাদের শেখায়,—সবকিছু পালটায় এবং পরিবর্তন হলো বাস্তবতা;—যদি তাই হয়ে থাকে, বস্তুজগত ও চিন্তা-চেতনা যদি অনবরত বদলাতে থাকে,—ছোটকাগজ কেন একরাশ প্রচলিত ধ্যান-ধারণায় ভর দিয়ে টিকে থাকবে?
যে-ছোটকাগজকে বলা হচ্ছে প্রচলিত পথ-পন্থার বিরোধী, অথচ ধারণাগতভাবে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার খাঁচায় তাকে আমরা বন্দি দেখতে পাচ্ছি! সময়ের অনিবার্য প্রভাব কি তাকে বদলাতে পারে না? নিজেকে পালটানো ও সংগঠিত করার দায় কি বোধ করেন না ছোটকাগজের সম্পাদক ও লেখক? সময়কে বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি ছোটকাগজকে বুঝে নেওয়ার মামলায় প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। বর্তমান যুগবিশ্বে ছোটকাগজ কেমন হওয়া উচিত তা বুঝতে একটু পেছন ফিরে তাকানোও দরকারি।
বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার উন্মেষপর্বে বঙ্কিম যখন ‘বঙ্গদর্শন’ কিংবা প্রমথ চৌধুরী ‘সবুজপত্র’ প্রকাশ করছেন, তখনো আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়নি। সবে যাত্রা শুরু করেছে। সেইসময় কয়েকজন প্রতিভাধরের হাতে সাহিত্য নতুন ভাষা পাচ্ছিল। নিজেকে প্রকাশের একটা তাগিদ তাঁদের মধ্যে ছিল, দায়িত্বও ছিল অনেক, ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে কাগজগুলো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। ‘সবুজপত্র’, ‘কল্লোল’-র পাশাপাশি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’, বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’র নাম করা যায়। সুধীন্দ্রনাথের ‘পরিচয়’ সেই সময়কার বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল;—মননশীলতায় সমৃদ্ধ করেছিল বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ভূগোলকে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ বিশ্বসাহিত্যের নিরীক্ষাধর্মী ভাষাভঙ্গির সঙ্গে আমাদের জানাশোনাকে নিবিড় করে তখন। এর প্রয়োজন যেহেতু ফুরোবার নয়, সকল যুগের ছোটকাগজের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা অনিবার্য গণ্য হয়েছে।
সৃৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রের আকাঙ্ক্ষা থাকে নতুনভাবে নিজেকে প্রকাশ করা, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে। সাহিত্যের অন্যান্য প্রকাশমাধ্যমে যেহেতু এত সুযোগ থাকে না, সৃষ্টিশীল নিরীক্ষার জন্য ছোটকাগজ হচ্ছে উপযুক্ত ক্ষেত্র। ছোটকাগজ কেন্দ্রিক এসব নিরীক্ষার অনেককিছু টিকে আছে বা ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে। বাংলা সাহিত্য শুধু নয়, বিশ্বসাহিত্যে মাধ্যমটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রায় সকল সচেতন লেখক-পাঠক স্বীকার করবেন। এ-প্রসঙ্গে লেখক-পাঠক মনস্তত্ত্বের একটি সংকট আমি ভুলে ধরতে চাইব :
ব্যক্তিমাত্র নিজস্ব জগৎ/মনোজগতের অধিকারী হয়ে থাকেন। জন্মের পর থেকে ধীরে-ধীরে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তার নিজস্ব ধ্যান-ধারণার জগৎটি তৈরি হয়। ব্যক্তিগত নানা সংস্কার এসে দানা বাঁধে, এর ফলে অনেক নতুন নিরীক্ষা, যেগুলো কালোত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে, সেগুলোর ফলাফল দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে না। অভ্যাসগত সংস্কারের কারণে নিরীক্ষাকে খোলামনে যাচাই করতে পারেন না অনেকে। গভীরভাবে সৃষ্টিশীল ও নিরীক্ষাধর্মী লেখার ক্ষেত্রে যুগে-যুগে এ-সংকট আমরা দেখেছি;—সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এসব লেখা মূল্যায়ন হয় অনেক পরে। এ-প্রসঙ্গে কিছু বক্তব্য বা হতাশা লেখাটির পরবর্তী কোনো অংশে আলোচনার ইচ্ছে থাকল।
সংস্কার থেকে বেরিয়ে নতুন নিরীক্ষাধর্মী সৃষ্টিকে বুঝে নেওয়া ছোটকাগজের কর্তব্যের মধ্যে পড়ছে। নতুন অথবা ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে নতুন হয়েছে, সময়কে ধারণ করতে পেরেছে কি পারেনি ইত্যাদি সেখানে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশে অসংখ্য ছোটকাগজ চোখে পড়বে, যার মধ্যে নতুনত্বের ছাপ নেই। কষ্টকল্পিত লেখা ছাপে কাগজগুলো। নতুন নামের এইসব লেখায় শিল্পসৌন্দর্য যেমন নেই, যুুগযন্ত্রণাও টের পায় না পাঠক। সস্তা আবেগকে পুঁজি করে লেখক নিজেকে প্রচার করেন। তথাকথিত এসব নিরীক্ষাধর্মী লেখা নিশ্চয় ছোটকাগজকে ঋদ্ধ করে তোলে না।
ছোটকাগজ কেন্দ্রিক আরো একটি প্রচলিত ধারণার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন, ছোটকাগজ হবে সাহিত্যচর্চার মাধ্যম। তাদের মতে কবিতা, গল্প ইত্যাদির সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করা ছোটকাগজের একমাত্র কাজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের ছোটকাগজগুলোর দিকে তাকালে ধারণার সত্যতা পাওয়া যায়। এসব কাগজে সাহিত্যের চর্চা ব্যাপক, কিন্তু উপেক্ষিত থাকে মানবগ্রগতিকে সম্ভব করেছে এরকম মননশীল মাধ্যমগুলোর চর্চা ও অনুশীলন। এমনকি এখনো মোটাদাগে উপেক্ষার শিকার হতে দেখছি সংগীত, চিত্রকলা, চলচ্চিত্রের মতো সৃজনশীল মাধ্যমগুলোকে।
যাঁরা ভাবেন, ছোটকাগজ মূলত সাহিত্যচর্চার ‘আশ্রয়’, তাঁদেরকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়,—বাংলা ছোটকাগজের শুরুটা সাহিত্যকে ভিত্তি করে হওয়ার কারণে কি তাকে সাহিত্য কেন্দ্রিক থাকতে হবে সর্বদা? সময় যে-বহুবিধ জটিলতা নিয়ে আঘাত করছে, সেগুলোর দিকে কি তাকানো বারণ? সাহিত্য কি স্বয়ংসম্পূর্ণ? দায়হীন স্বয়ম্ভর কিছু? কেবল আবেগ প্রকাশের জায়গা? বাস্তবতার সাথে তার যোগসূত্র কি নেই? মানুষের ক্রমাগত যান্ত্রিক হয়ে ওঠার পরিণতি কি তাকে পীড়িত করছে না? লেখকের সংবেদনে সাহিত্য বলতে ঠিকঠাক কি বুঝাতে চাইছি আমরা? মননশীলচর্চা ছাড়া সৃজনশীল গভীরতা সাহিত্যে কতটা সম্ভব? প্রশ্নগুলোর আলোকে আমার মনে হয় ছোটকাগজ সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করার সময় পেরিয়ে যেতে বসেছে। নানাকারণে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলাকে একত্রে গেঁথে সামগ্রিক অনুভবে পৌঁছানো ছোটকাগজের মতো ব্যতিক্রম প্রকাশমাধ্যমের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক।
লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত ছোটকাগজের লোকজন যেহেতু নিজেকে সামাজিকভাবে সবচেয়ে প্রাগ্রসর বলে ভাবেন, আমি মনে করি দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তায়। বাংলাদেশের ছোটকাগজগুলো মননশীল-চর্চায়, বিশেষ করে দর্শন-বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে নিবিড় অনুশীলনে এখন পর্যন্ত গতানুগতিক ধারার বাইরে যেতে পারেনি। বিজ্ঞানের যুগে বাস করে এবং সকল প্রকার বৈজ্ঞানিক চিন্তন ও প্রযুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও একজন লেখক এর থেকে অনেক দূরে ঘুরে বেড়ান;—বিষয়টি তাকে বিচ্ছিন্ন ও অবোধগম্য করে বৈকি! তিনি যে-ভাষা অতঃপর সাহিত্যে হাজির করেন, সেখানে এর পারম্পর্য ও সমকালীনতা বোঝা দুরূহ হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞানের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ভবিষ্যৎ, এমনকি সাহিত্য-শিল্পকলার মতো বিষয়কে তা প্রভাবিতও করে যথেষ্ট;—উপলব্ধিটি হয়তো আমাদের ছোটকাগজগুলোর মধ্যে অতটা গভীর নয়। মননগভীর দার্শনিকতা ও সৃজনগভীর কল্পনাশক্তির অভাবে ছোটকাগজ প্রথাবিরোধী সৃষ্টিশীল ভাবনায় নিজেকে সময়-প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারছে না। তারুণ্যের ওজস্বিতার সঙ্গে প্রবীণের অভিজ্ঞতা মিলে যুগানুগ যে-ভাষা জন্ম নেয়, এই সেতুবন্ধন ভেঙে যাওয়ার কারণে আমাদের লেখকরা পরিপার্শ্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন দ্রুত। প্রতিবাদের ভাষাও কি হারিয়ে ফেলেননি অনেকখানি? ছোটকাগজ সেই ভাষা ও মঞ্চ জন্ম দিতে পারত। ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের ছোটকাগজ এরকম কোনো মঞ্চে আজো দাঁড়িয়ে নেই!
সময়ের প্রাগ্রসর চিন্তাচেতনাকে ধারণ করা ও নতুন চিন্তনস্রোত তৈরি ছোটকাগজের অন্যতম কাজ বলে আমার মনে হয়। ‘নতুন সাহিত্য’ কথাটার বদলে আমি তাই ‘নতুন চিন্তা’ কথাটা ব্যবহার করতে চাই; যেহেতু সত্যিকারের সাহিত্য যা সৃষ্টি করে তার সাথে চিন্তার সংযোগ দূরবর্তী নয়,—নিবিড় ঐকতান সৃষ্টি ও চিন্তন পরস্পরকে সেখানে আলিঙ্গন করবে। যুগটা যেহেতু বিশেষায়িত, লেখককে বিশেষায়িত হতে হবে এমন কোনো দায় নেই, তবে বিশেষায়িত যুগের লক্ষণগুলোর ব্যাপারে সজাগ থাকা যুগভাষা বোঝার জন্য অনিবার্য।
লেখকের রয়েছে সাহিত্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যেখানে আবার মানুষকে বুঝে ওঠার তাগিদ তার জন্য অমোঘ। মানবিক বা প্রাকৃতিক সংকটকে ধরার মতো সজাগ কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া ভাষা-শিল্পকলার চর্চা সভ্যতাকে কিছু দান করতে পারে না। আজকের লেখককে যে-কারণে উৎসুক ও অনুসন্ধানী হতে হয়। নৈতিক ও দার্শনিক পরিণতি নিয়ে ভাবার দায়বোধ ছাড় দিলে, বিজ্ঞানীকে কেবল বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকলেও চলে,—লেখকের বেলায় তা নয়। মানুষ তার রচনার বিষয়বস্তু হওয়ার কারণে ত্রিকালদর্শী হওয়ার দায় তাকে বহন করতে হচ্ছে। বিষয়টি দার্শনিকদের জন্যও প্রযোজ্য। এইটুকু দায়বোধ ও সাধনা ছাড়া কোনো লেখক বা দার্শনিক কী-করে প্রকৃত সৃষ্টিশীল হয়ে উঠছেন, তা আমার বোধগম্য নয়!
বিজ্ঞান-দর্শন-সমাজবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা ও এর গতি-প্রগতি-অধোগতি মিলিয়ে আমাদের দেশকাল বা স্বদেশ-বিদেশ। একদিকে যাবতীয় স্বাতন্ত্র্য ভেঙে একরৈখিক হওয়ার তাড়না তীব্র হয়েছে, অন্যদিকে স্বাতন্ত্র্য খোয়ানোর চাপা বেদনা কাজ করছে মানুষের মনে;—একদিকে মানুষকে গতিশীল যন্ত্র করে তোলার কাজ প্রায় শেষের পথে, অন্যদিকে অমোঘ নির্ধারণের ছকে তার উপযোগ ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করার তোড়জোর চলছে জোরেশোরে… সংকটের নানামুখী চেহারা একজন লেখক ও ছোটকাগজকর্মীর কাছে অসাধারণ বিষয় হতে পারত। বাংলাদেশের ছোটকাগজ কি সেই পথে হেঁটেছে ভালোভাবে? সমকাল বা উত্তরকালের আভাস টের পাওয়ার মতো সৃষ্টিশীল লেখা কি অধিক পেয়েছে পাঠক? সৃজনশীলতার দায় মেটানোর সঙ্গে মননশীলতায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছে গভীরভাবে,—এরকম রচনা ও লেখক ছোটকাগজ কি দিতে পেরেছে অধিক?
মনন ও সৃজনের সংযোগরেখা ধারণের অক্ষমতা থেকেই কি ছোটকাগজে সৃজনশীল ভাবনা ও কল্পনার আকাল আমরা দেখছি এখন? অবশ্য ভালো কাজ-যে হয়নি এমন নয়। ছোটকাগজে মাঝেমধ্যে এমনসব লেখা আমরা পেয়েছি, যেগুলো পাঠ-অভিনিবেশ দাবি করে। নিরীক্ষাধর্মী লেখার উপযোগিতা সম্পর্কে পুনরায় সজাগও করে। আরেকটি কথা না বললেই নয়,—ছোটকাগজের লেখক-পাঠকদের মধ্যে ‘পাঠবিমুখতা’ বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরস্পরকে পাঠ ও আবিষ্কারের তাড়না আগের মতো প্রবল নয়। সৃষ্টিশীল সমালোচনার ঘাটতিও রয়েছে।
নিজের লেখা বা নিজের কাগজ ছাড়া অন্য লেখা ও কাগজ পাঠের সময় সংকুচিত হয়ে আসছে ছোটকাগজের পাঠমহলে। মিশেল ফুকো তাঁর ‘উন্মাদনা ও সভ্যতা’ প্রকাশ করার পর বইটি নিয়ে নীরবতা দেখে প্রশ্ন তুলেছিলেন,—সমকালীন মার্কসবাদী ভাষাকাঠামোর সঙ্গে ব্যতিক্রম দেখে কি সকলের এই আশ্চর্য নীরবতা? ছোটকাগজের পাঠমহল যেন এরকম নীরবতায় গুম হচ্ছে সময়টানে! মাধ্যমটির মরণকে যা অনিবার্য করতে পারে সামনে।
বাংলাদেশে এখনো অনেক ছোটকাগজ প্রকাশ হতে দেখছি আমরা। হাতেগোনা কিছু কাগজ বাদ দিলে বাদবাকি কাগজগুলোর নিজানুগ চিন্তা ও পরিকল্পনা কিছু পরিষ্কার ধরা পড়ে না। গতানুগতিক প্রথায় লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ ও সেই সুবাদে পাওয়া দায়সারা লেখা প্রকাশে নিজের সার্থকতা খোঁজেন সম্পাদক। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী বা ছোটকাগজের বিকল্প বলে ‘বিজ্ঞাপিত’ সাহিত্যপত্রের সঙ্গে এইসব ছোটকাগজের পার্থক্য আগের মতো স্পষ্ট নয়। দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক যেমন পাঠক খাবে এমন লেখককে পুঁজি করে সাময়িকী প্রকাশ করেন, এমন অনেক ছোটকাগজ আছে যারা একই কাজ করছেন। ছোটকাগজের সঙ্গে দৈনিকের সাহিত্য পাতার মৌলিক তফাত ধরা যাচ্ছে না বা ধরার অবস্থাটি বজায় নেই;—এটি মনে হয় সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছোটকাগজের জন্য। বেসিক সংজ্ঞা থেকে সরে আসাটা এক্ষেত্রে কাল হয়ে উঠেছে।
বুদ্ধদেব বসু’র বহুচর্চিত উক্তি স্মরণ করতে চাই পুনরায়। ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন,—‘ছোটকাগজ কখনো মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল’। তাঁর প্রবাদপ্রতিম মন্তব্যটি বিবেচনায় নিলে আমরা সহজে বুঝতে পারি ছোটকাগজ কেন অন্য মুদ্রণমাধ্যম থেকে ভিন্ন। এখানে তার দায়িত্ব অনেক। এমন সত্যবচন রয়েছে, এমন সৃষ্টি আছে, যেগুলো দৈনিকের সাহিত্য পাতা ছাপতে সাহস করবে না,—ছোটকাগজের দায়িত্ব হচ্ছে সেগুলোকে নিজের মধ্যে জায়গা দেওয়া ও পাঠকের নজরে আনা। দৈনিকের পাতায় জায়গা করে নেওয়া সাহিত্য যেমন পাঠক-মনোরঞ্জন করে, সেটা কি ছোটকাগজের দায়িত্ব ছিল কখনো, নাকি দায়িত্বের মধ্যে পড়ছে তা? ছোটকাগজের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ ও দার্শনিক-ভাবনা বরং সেখানে থাকাটা বাঞ্ছনীয়। বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যে যার প্রতিফলন স্বচ্ছ হয়ে ধরা দেয়।
ছোটকাগজে যা হয়, ব্যক্তিক চিন্তা-ভাবনা ও বোধের জায়গায় দাঁড়িয়ে অনেকে কাগজ বের করেন, আবার চিন্তা ও মতের মিল থাকলে একাধিক ব্যক্তি মিলে গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে ও কাগজটা বেরোয়। নিজস্ব ভাবনার ছাপ, সাহিত্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণে একটি ছোটকাগজ অন্যটির থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। এগুলো ছোটকাগজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ছে। তবে, যে-দৃষ্টিভঙ্গি এর ফলে গড়ে উঠত থাকে, তা যেন আবার ‘অচলায়তন’ হয়ে বিপ্রতীপ ও বিকল্প চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে খারিজ করে না বসে;—প্রাসঙ্গিক এই বিবেচনাজ্ঞান ছোটকাগজের লেখক-সম্পাদক-পাঠকের থাকা উচিত।
‘অচলায়তন’ কিন্তু এভাবে তৈরি হয়, এবং সাহিত্য ও ভাষার ক্ষতি করে যায়। ছোটকাগজের ধারাবাহিকতা বিষয়ক আলাপটি প্রসঙ্গসূত্রে তুলতে চাই এখানে। কোনো লক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন একটা কাগজ বের হয়, এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সেখানে জরুরি। এমন অনেক কাগজ আছে, অপার সম্ভাবনা জাগিয়ে অচিরে অবলুপ্ত হয়ে যায়! ধারাবাহিকতার এই অভাব কেন ঘটে? আমার ধারণা,—নিজের একরোখা দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানে অটল থাকা এবং সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা হারালো দেখে অনেক সম্ভাবনাময় কাগজ নিজের অপমৃত্যু ঠেকাতে পারে না। এটিও হতে পারে,—ধারদেনায় বিপর্যস্ত হয়ে ছোটকাগজের পেছনে লেগে থাকা নিয়ে মনে বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়;—কাগজের বিলুপ্তির যা অন্যতম কারণ।
ছোটকাগজ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এরকম,—‘ছোটকাগজ বেশিদিন বাঁচে না, বাঁচা উচিত নয়’। মুনাফার আকাঙ্ক্ষী যেহেতু নয়, ধারদেনা বা নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে কাগজ বের করতে হবে ইত্যাদি;—আমার মনে হয়, ধারণাটির মধ্যে ছোটকাগজের মৃত্যুঘণ্টা লুকিয়ে রয়েছে, যা একধরনের স্ববিরোধিতা ছাড়া কিছু নয়। একদিকে ছোটকাগজকে বলা হচ্ছে নতুন চিন্তা ও সৃজনশীলতার খনি, বলা হচ্ছে তার দায়িত্ব ও দায়বোধের কথা, অথচ তাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো সংগঠিত উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বিক্ষিপ্তভাবে ছোটকাগজ নিয়ে গলাবাজি করেন সবাই।
ছোটকাগজে সম্পৃক্তরা ব্যতিক্রম বাদ দিলে মধ্য বা নিম্নমধ্যবিত্ত, অনেকে বেকার অথবা ছোট চাকরীজীবী। গাঁটের পয়সা খরচ করে তাদের পক্ষে আর কতদিন কাগজ বের করা সম্ভব? ছোটকাগজ বের করতে গিয়ে ব্যক্তি-মর্যাদার যে-অবনয়ন ঘটে, তার পুনরাবৃত্তি কতকাল করবেন? আর্থিক সংকট ছোটকাগজের প্রধানতম সংকট। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে একে ধারাবাহিক করা সম্ভব নয়;—লক্ষ্য ও দায়পূরণের প্রশ্নই ওঠে না!
প্রত্যেক ছোটকাগজের নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত। মুনাফা করার জন্য নয়, বরং ছোটকাগজকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে রাস্তাটি খুঁজে বের করা ছাড়া নিজের বিলুপ্তি সে রুখতে পারবে না। ছোটকাগজের মধ্যেও বিকল্প এবং স্বকীয় পেশাদারি প্রকাশনার পথ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। কাগজের নিজস্ব আয় থাকলে লেখক-সম্মানী চালু করা সম্ভব হতো। সম্ভব হবে লেখককে দায়বদ্ধ করে ভালো ও পরিশ্রমী লেখা আদায়ের কাজটিও।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ছোটকাগজকেন্দ্রিক চর্চা থাকায় সমাজমানসে এর একটা প্রভাব তৈরি হয়েছে। সেখানকার শিক্ষিত সমাজ এর সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত। অনেক ছোটকাগজ প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে বিক্রি না করেও কাগজ চালানোর বিকল্প উপায় বের করে নিতে পেরেছে। লক্ষ্যপূরণে ধারাবাহিক থাকার পরিসরটি এভাবে জন্ম নিয়েছে সেখানে। কিছু ছোটকাগজ আছে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অনুদান পেয়ে থাকে;—রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সেখানে বাদানুবাদ আছে, তবে অনুদানের ওপর নির্ভরশীল কাগজের বড়ো অংশকে মানহীন বলা যাবে না। অনুদানপ্রাপ্ত অনেক কাগজ রুচি ও মানের প্রশ্নে আমাদের কাগজগুলোকে লজ্জায় ফেলতে পারবে অনায়াসে।
বাংলাদেশে এরকম কোনো প্রক্রিয়া আজো গড়ে ওঠেনি। সাধারণ মানুষ দূরে থাক, সচেতন শিক্ষিত সমাজের অনেকে ছোটকাগজ সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না! দৈনিকের গৎবাঁধা সাময়িকী এবং মেলা কেন্দ্রিক বইপত্রের বাইরে ছোটকাগজের প্রকাশনা পদ্ধতি নিয়ে তাদের অজ্ঞতা শোচনীয়। একটি ছোটকাগজকে ধারণাগত তত্ত্বের জায়গা থেকে দেখতে হলে দেশের শিক্ষিত সমাজকে সেখানে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে এটা ঘটেছে। আমাদের এখানে অভাবটি পীড়াদায়ক। দেশের সুশীল সমাজ বা সামগ্রিক শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে সংযোগের ঘাটতি ও বিচ্ছিন্নতাকে দুর্দশার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ছোটকাগজ অবশ্য নিজের দায় এড়াতে পারে না। নিজেকে কেন বাংলাদেশে সংযুক্ত করতে পারছে না;—এই প্রশ্ন ও আত্মানুসন্ধানের সময় কি হয়নি এখনো?
আরেকটা প্রশ্ন ও বিতর্ক শোনা যায়,—বিজ্ঞাপন নিয়ে কাগজ বের করা কতখানি যৌক্তিক? নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আপস না করে যদি বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে আপত্তির কিছু আছে বলে মনে হয় না। কর্পোরেটের কাছে ধর্না নিয়ে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ এবং ভাষা ও শিল্পচর্চার অজুহাতে বিজ্ঞাপন-বাণিজ্য যেন লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়, এই ব্যাপারে কেবল সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ‘প্রাতিষ্ঠানিকতা’ নিয়ে ছোটকাগজ-কর্মীদের মাঝে ধোঁয়াশা ও পরস্পরবিরোধী নানা ভাবনা রয়েছে। একটা মীমাংসারেখা টানা ছাড়া কাগজকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। ছোটকাগজের লেখক-পাঠক-সম্পাদকের মধ্যে এ-নিয়ে বিনিময় ঘটলে মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব হতেও পারে।
প্রতিষ্ঠান মানে কি প্রতিষ্ঠানহীনতা? নিশ্চয় তা নয়। পশ্চিবঙ্গে সুবিমল মিশ্র এটা ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর নিজস্ব ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় দাঁড়িয়ে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অচলায়তন তৈরির ঝুঁকি থাকবে জেনেও ‘বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিকতা’ এবং প্রয়োজনে ‘বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিকতার বিকল্প’ ছোটকাগজকে খুঁজে নিতে হয়। এভাবে একটা নিরবচ্ছিন্ন পরিসর তৈরি করা ছাড়া ছোটকাগজের বিলুপ্তি আটকানো সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানকে গালিগালাজ করার আগে ছোটকাগজ সম্পাদক তার কাগজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কী ভাবছেন, তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেখানে। বাংলাদেশের ছোটকাগজে এই কাজটি আমরা করে উঠতে পারিনি। ছোটকাগজে দ্রোহ প্রায়শ সস্তা আবেগে নিজেকে নিঃস্ব করে এখানে। দ্রোহী লেখক অচিরে দৈনিক কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ দেখেন।
আরেকটি প্রসঙ্গ মনে করি বাংলাদেশের ছোটকাগজ সম্পর্কে বেশ খাটে, এখানকার কাগজগুলো পরিসর ও অঙ্গসজ্জায় মনভোলানো হয়ে থাকে, অথচ ভেতরের মশলাপাতি সৃজনশীল ও মননশীল মান-বিবেচনায় মহার্ঘ হয় খুব কম। কাগজের অঙ্গসজ্জায় সম্পাদকরা মেধা খাটান, কিন্তু ভেতরে কী মালমশলা দিচ্ছেন, তা নিয়ে ভাবার দায় তীব্র নয়। ইলেকট্রনিক চ্যানেলের নিউজ প্রেজেন্টারের সঙ্গে এসব কাগজের কাজেই পার্থক্য থাকে না।
টিভি চ্যানেলগুলোয় সংবাদ পরিবেশনায় একসার সুন্দর মুখের ভিড় আমরা দেখি। পঠিত-সংবাদের বিষয়বস্তু না-বুঝে তারা অনেকসময় ঠোঁট নাড়ান। ছোটকাগজের কিছু সম্পাদক যেন সেরকম। লেখার সৃজনশীল মূল্যকে প্রাধান্য দেওয়ার চাইতে মাল্টিকালার প্রচ্ছদ ও বাহারি অঙ্গসজ্জায় ডুবে থাকতে ভালোবাসেন! অঙ্গসজ্জায় রূপসী হওয়ার বাতিক বাংলাদেশের অধিকাংশ ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। অঙ্গসজ্জার পেছনে সম্পাদক যে-সময় ও টাকা-পয়সা খরচ করেন, একটু সংযমী হলে ওই অর্থ দিয়ে লেখক-সম্মানীর (পারিশ্রমিকের জায়গা থেকে দেখলে অবশ্য খুবই নগণ্য) একটা ব্যবস্থা হতে পারত। নিদেনপক্ষে পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশের চাপ লঘু হতো কিছুটা।
ছোটকাগজের এহেন প্রবণতার পেছনে বাংলাদেশের মেলা ভিত্তিক বই প্রকাশনার একটা ভূমিকা রয়েছে। অঙ্গসজ্জাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সিরিয়াস লেখকের বইয়ের এমন অঙ্গসজ্জা করা হয়, পরিষ্কার বোঝা যায়,—প্রচ্ছদ আঁকবার সময় প্রচ্ছদকার বইটি পড়েননি, এবং প্রকাশক তার ব্যবসায়িক ধান্ধা থেকে ওটা বের করছেন। আমাদের প্রকাশনা জগতে সম্পাদকীয় পর্ষদ বা এডিটোরিয়াল প্যানেলের চল নেই। প্রকাশক একা একটি প্যানেল এবং সিরিয়াস লেখক তার অনুগ্রহপ্রার্থী ভিখারি। নিজের বইটি বের করার জন্য প্রকাশকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে তিনি জিম্মি।
বাংলাদেশের ছোটকাগজে ‘সম্পাদকীয় মান’ কোনো গুরুত্ব তৈরি করেনি। পত্রিকার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্র গড়ে ওঠার ভাবনায় গমনের প্রথা যে-কারণে সবল ছিল না কখনো। সাংগঠনিক গুণের পাশাপাশি ছোটকাগজ সম্পাদকের বোধ-বুদ্ধি-চিন্তার পরিসর ব্যাপক থাকা ভালো। এছাড়া, লেখক তৈরিতে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয় না। ছোটকাগজের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদক অতীতে গমন করলে আমরা পাবো। দুইবাংলায় এরকম অনেক সক্ষম সম্পাদক ছিলেন বা এখনো আছেন, তাঁরা কিন্তু ‘মান’ কীভাবে তৈরি হয় এর নমুনা রেখেছেন আমাদের জন্য;—অদ্য এর অভাব প্রবল হয়েছে।
প্রসঙ্গত বলে নিই, বাংলাদেশে ছোটকাগজ সম্পাদক ও লেখকদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি গত কয়েক বছর ধরে নজরে পড়ছে। দেশের নব্য ধনিকদের হাতে জন্ম নেওয়া প্রিন্ট ও টেলিমিডিয়ায় ঝাঁকে-ঝাঁকে ছোটকাগজকর্মী ও লেখকরা আশ্রয় নিয়েছেন নিশ্চিত জীবনের তাগিদে। ছোটকাগজে জড়িত অনেকের অস্বস্তিটা সেখানে। প্রভাবশালী হয়ে ওঠা মিডিয়া-সাম্রাজ্যের কবলে পড়ে ছোটকাগজের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে যাবে?
প্রশ্নের উত্তরে বলব, নিবন্ধের শুরুতে সামগ্রিক যে-সংকট ও বিচ্ছিন্নতার আভাস দিয়েছি, ছোটকাগজ-কর্মীরা যদি নিজের স্থানিক অবস্থানের সঙ্গে বিশ্বায়নের জায়গায় দঁড়িয়ে সবটা দেখেন, যদি ছোটকাগজের লেখক-সম্পাদক ও পাঠক মিলে সংকট ও বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্পভাষা তৈরিতে নিবিড় ও আন্তরিক থাকেন, তাহলে শুভ উত্তরণ সম্ভব। নতুন পথের দিশা খোঁজা ছোটকাগজের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় কি? দিশা খোঁজার প্রশ্নে কয়েকটি শর্ত স্মরণ রাখা যেতে পারে :
ছোটকাগজের জন্ম হয় স্বাধীন নিরীক্ষা ও গভীর সৃষ্টিশীলতার আর্তি মিটানোর তাগিদে, এবং সেখান থেকে পিছু হটা যাবে না।
অনিয়মিত ও বিলুপ্ত হওয়ার স্বভাবজ ধারণার পরিবর্তে মনন-গভীরতা ধারণে নিয়মিত বা ধারাবাহিক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
লেখককে ছোটকাগজের প্রতি দায়বদ্ধ ও গভীর করার জন্য লেখক-সম্মানী, অপ্রাতিষ্ঠানিক লেখকের বই প্রকাশ ও বিপণনের নতুন উপায় খুঁজে বের করা সময়ের অনিবার্যতা।
মননশীল-সৃজনশীল লেখালেখির যোগসূত্র তৈরিতে ছোটকাগজ সম্পাদকের ব্যক্তিত্বের জায়গাটি আরো গভীর হওয়া প্রয়োজন।
অঙ্গসজ্জায় বাহারি হওয়ার চেয়ে বরং মানের প্রশ্নকে আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অনলাইন প্রকাশনায় গমন করা ও ডিজিটাল আর্কাইভের ভাবনা দ্রুত বাস্তবতা হয়ে উঠবে। এদিকটা ভেবে দেখা জরুরি।
কর্পোরেট পুঁজির সাথে রণলিপ্ত হওয়ার আগে নিজস্ব বিপণন কৌশল নিয়ে ভাবনা-চিন্তা ও পথ অন্বেষণ।
ছোটকাগজের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ক আমার বক্তব্য হয়তো আশাবাদী ও আবেগপ্রবণ হলো না। ছোটকাগজ যাঁরা করেন, তাঁরা যে-আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা থেকে ভাষাসৃষ্টির চমৎকার মাধ্যমটিকে দেখে থাকেন, তাঁদের মতো করে উদ্বেলিত হওয়া সম্ভব হলো না! কারণগুলো আশা করি কিছুটা হলেও পরিষ্কার করতে পেরেছি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ছোটকাগজের প্রয়োজনীয়তাকে ভালোবাসার যে-জায়গা থেকে দেখি, তাকে ছাপিয়ে সার্বিক সংকট বড়ো হয়ে উঠছে এই মুহূর্তে। একটা নিরাশাবাদী সুরে যে-কারণে কথা বলতে বাধ্য হয়েছি। ছোটকাগজের কাছ থেকে প্রাপ্তির আশা এত বড়ো,—অন্যথা ঘটছে দেখে মনোবেদনা আটকানো কঠিন হয়।
ছোটকাগজ এমন একটি প্লাটফর্ম, যেখানে মত প্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতাকে অন্য মাধ্যমের তুলনায় নির্ভার পরিসর থেকে ব্যবহার করা যায়। সৃষ্টিশীলতাকে অনবরত যাচাই কিংবা সৃজন ও মনন-গভীর লেখার জমি তৈরিতে পরিসরটি ভীষণ কাজের। বিচিত্র মাধ্যম আমাদের চারপাশে এখন বিরাজ করছে, তা-সত্ত্বেও ‘বিকল্প মাধ্যম’ হিসেবে ছোটকাগজ নিজের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে এমনটি বলা যাবে না। ছোটকাগজের জমিনে এখনো অনেক কিছু ফলানো বাকি রয়ে গেছে। ভবিষ্যতের লেখক-সম্পাদক-পাঠকরা মিলে তা সম্ভব করে তুলবেন বলেই আশা রাখি।
. . .
. . .

… পাঠসূত্র : বিচ্ছিন্নতার যুগভাষা ও ‘ছোটকাগজ’-এর সংকট …
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর ছোটকাগজ বিষয়ক গদ্যটি আহমদ সায়েম সম্পাদিত ‘হরমা’য় আটারো বছর আগে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। গদ্যটি জাভেদ লিখছেন নিসর্গ সম্পাদক সরকার আশরাফ ও ছোটকাগজকর্মীরা মিলে আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন মেলা ঘুরে আসার কিছুদিন পর। দিনতারিখ এখন আর স্মরণে নেই, তবে মেলাটি সম্ভবত ছিল বাংলাদেশের ছোটকাগজ প্রকাশনায় নিবিড়দের নিয়ে শেষ প্রাণবন্ত সম্মিলন।
হ্যাঁ, সংকট ঘনীভূত হলেও, তখনো ছোটকাগজ নিয়ে উদ্দীপনা নিঃশেষ হয়ে যায়নি তরুণ কবি-লেখক ও কাগজওয়ালাদের মনে। আশাটা বেঁচে-যে, ছোটকাগজের বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ-সংলাপের পরিসরটি মৃত নয়। বিশ্বায়নের চাপ, অর্থনীতি ও রাজনীতির মেরুকরণ, কম্পিউটার প্রযুক্তির অভিভূত বিকাশ ও বাণিজ্যায়ন, মানুষের পাঠাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক রুচির পালাবদলকে সৃষ্টি, মনন ও নিরীক্ষায় ধারণ করার শক্তি ও সেই স্বাধীন পরিসর ছোটকাগজে অমলিন। পরিসরটা অন্তত এখনো মাথা তুলে আছে, যেখানে লেখক নিজেকে স্বচ্ছন্দ ভাবতে পারেন। হতে পারে, ছোটকাগজের পাঠ-পরিধি সীমিত, বইয়ের দোকানে পড়ে থাকে ধূলিধূসর, তবু এটা এমন এক পরিসর, যে-তার ওই সীমিত পরিসর ও আরো সীমিত পাঠ-সংস্কৃতির দিকে গভীর মনোযোগী।
আশাবাদের পেছনে শক্ত ভিত কি ছিল তখনো? মনে হয় না ছিল। যুক্তি ও ভিতের সবটাই ততদিনে টুটাফাটা হওয়ার কথা! ছোটকাগজে নিবিড় লেখকরা তবু আরো একবার একত্রে বসে পরিস্থিতিকে তলিয়ে ভাবতে উন্মুখ ছিলেন। অভিজ্ঞতাটি মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদকে আলোড়িত করেছিল। ভাবিয়েছিল ততধিক। একটা প্রেরণা ও নিরাশার দোলাচল নিয়ে ঢাকা থেকে ফিরেছিলেন তিনি ও বন্ধুরা। ‘ফোকাস আইটি’র ছোট্ট দোকানটায় বসে বাকিরা শুনেছিলেন তাঁদের অভিজ্ঞতার খুঁটিনাটি। ‘হরমা’ ও ‘সূনৃত’-র কাজ চলছিল তখন।
সিলেট থেকে ছোটকাগজ, দেশের অন্য জেলা ও মফস্বল শহরের মতো বেরুচ্ছিল যথারীতি। পশ্চিমবঙ্গের কাগজগুলো তাদের শান ও গরিমা নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছিল রাজধানী শহর এবং অন্যত্রও। বৈচিত্র্য, বিষয়বস্তুর গভীরতা, সৃজনশীল নিরীক্ষায় আরবান কালচার হয়ে ওঠার ঘটনা ওপারবাংলার ছোটকাগজকে অনেক আগে থেকে ফুয়েল দিয়ে যাচ্ছে। আটারো বছর পার করেও যেটি পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি মনে হচ্ছে! কলকাতার বইমেলায় এখনো ছোটকাগজের স্টলগুলো জমজমাট থাকে। কলকাতা থেকে কাগজ বের হওয়ার জোয়ার অতীতের মতো শানদার নয় হয়তো, কিন্তু জেলা শহর ও মফস্বলে চর্চা জোরেশোরে চলে এখনো।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ছোটকাগজ বের হয় এদিক-ওদিক, সরকার আশরাফের মতো লড়াকু নিয়মিত বের করছেন নিসর্গ, বেরুচ্ছে পুরোনো বা নতুন কাগজ কমবেশি নিয়মিত, কিন্তু পাঠ-পরিধিটা আর আগের মতো পরিচিত নেই। কারা পড়ছেন বা কিনছেন তা ইতোমধ্যে অস্পষ্ট! আটারো বছরে ছোটকাগজের পাঠক কি বাংলাদেশে বেড়েছে? সত্যটা ‘সুখী’ হওয়ার কথা নয়। এই অনুমান বরং সংগত,—পাঠক বাড়ার পরিবর্তে হ্রাস পেয়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়! বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ভিড় জমে না এখন, যেমন জমত দশ-বারো বছর আগে অবধি। কাগজ নিয়ে যাঁরা বসেন সেখানে, তাঁদের ম্লান মুখ দেখে বোঝা যায়,—একটা অসহায় হাহাকারের মধ্যে ডুবে গিয়ে বেগার খাটনি খেটে যাওয়ার যুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
ছোটকাগজের নিজস্ব পাঠসংস্কৃতির ‘পতন অথবা ধস’ বাংলাদেশে ঘটে গেছে। সেটা এখন সমাজমাধ্যম কিংবা এআইয়ের দানবীয় উত্থানের কারণে, নাকি অতি বিশ্রী ও অশুভ এক সাংস্কৃতিক পালাবদলকে ঠেকানোর ব্যর্থতাদোষে অথবা লেখার পরিসরে নিজেকে সবল প্রমাণ করতে না পারার কারণে ঘটেছে, তা হয়তো গবেষণার বিষয়। জাভেদ, যে-সময়ে বসে লেখাটা লিখেছেন, সেখানে ছোটকাগজের মর্বিড হয়ে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা কিন্তু গোপন থাকেনি।
লেখাটি, যারপরনাই এখন আর প্রাসঙ্গিক নয় এরকম কিছু অংশ বাদ দিয়ে ভাষিক কিছু পরিমার্জনা-সহ থার্ড লেন স্পেস-এ সংরক্ষিত হলো। আটারো বছর আগে জাভেদ যে-ভাবনা থেকে লিখেছিলেন, সেখানে তাঁর ব্যাখ্যা, প্রশ্ন, পূর্বাভাসে ছলকে ওঠা হতাশা আরো গাঢ় হয়েছে। ছোটকাগজ, মানতে অনেকের কষ্ট হবে,—বাংলাদেশে সত্যিই দাঁড়াতে পারেনি। দাঁড়ানোর জন্য যেসব ন্যারেটিভ সামনে আনা প্রয়োজন ছিল, শিক্ষিত সমাজের কাছে এগুলোকে ভ্যালিড করে তোলা,—এখানকার ছোটকাগজে নিবিড় লেখক-সম্পাদকরা কাজটি সফলভাবে করে উঠতে পারেননি।
অনেকে এই মাধ্যমটিতে লিখেছেন একটা সময় এবং পরে সরে গেছেন হতাশায়। কেউ এখনো লিখছেন অন্য মাধ্যমের পাশাপাশি অথবা কেবল এখানেই লিখছেন এরকম আছেন বটে,—সেটা ঠিক কী কারণফেরে তা অনুমান করা কঠিন। যাইহোক, এআইর প্রবল উত্থান মানুষের সকল সৃষ্টি ও মননকে দুমড়ানো কাগজের ফালি করে দেওয়ার বাস্তবতা নিয়ে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। যুগান্তকারী মেরুকরণের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তারপরেও লিখে চলেছে! সামনেও লিখবে নতুন বাস্তবতাকে বোঝা ও মোকাবিলার দায় থেকে। ছোটকাগজ কী করবে? এখন যেমন নিভু নিভু বের হয় ও অচিরে কোথায় হারিয়ে যায় কে জানে,—তখনো কি থাকবে তেমন? নাকি, একটা নয়া আঙ্গিক দেখা যাবে তার প্রকাশনা ও উদ্দেশ্যমূলক আয়োজনে?
মানব প্রজাতি তার সৃষ্ট যন্ত্র প্রজাতির সঙ্গে একটা অসম মোকাবিলাকে অনিবার্য করেছে এই আটারো বছরে। এই যন্ত্রের মধ্যে দেখা দিচ্ছে মানব প্রজাতিকে সবদিক থেকে নকল করতে পারা ও অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ফলাফল দানের সক্ষমতা। এমন দিন আসছে সামনে, মানুষ যা পারত তার সবটা সে পারবে অনায়াসে। তারপর এমন দিন আসতে পারে,—সক্ষমতায় সম্পূর্ণ অতিক্রম করে যাবে মানবমেধাকে। যেখানে সে নিজে হয়ে দাঁড়াবে নিজের চালক ও নিয়ন্ত্রক। এরকম এক বিশ্বে মানব প্রজাতির মতো যন্ত্র প্রজাতি হয়ে দাঁড়াবে নতুন যুগবাস্তবতা। এর সঙ্গে মানুষের সহবত, সংঘাত ও আরো বহু ঝড়ো ঘটনার মধ্য দিয়ে নবীন এক পৃথিবীর জন্ম হওয়াটা অবান্তর নয়!
ছোটকাগজ কি থাকবে সেখানে? যদি থাকে, ঠিক কোন আঙ্গিকে দেখব তাকে? যুগভাষাকে কীভাবে পাঠ ও ব্যাখ্যা করবেন ওই সময়ের ছোটকাগজে নিজেকে লিখতে থাকা কোনো মানব অথবা এআই? মানুষ কি জয়ী হওয়ার কাব্য লিখবে, নাকি ম্লানমুখে পরাজিত হওয়ার বেদনা লিখতে মাধ্যমটি বেছে নেবে তখন? ঘটবে কি অচিন্ত্যনীয় কিছু, যা এখনো কল্পনাতীত!
এসব প্রশ্ন আপাতত আগামীর জন্য তোলা থাক। প্রস্থানশোক স্থগিত রেখে মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদের গদ্যটি আমরা পড়ে নিতে আরেকবার। কেননা, অশনির অনেককিছু গদ্যটি তখন পড়তে পেরেছিল, যা এমনকি এখনো অনেকে পড়তে ও মানতে নারাজ।
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



