পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

দীর্ঘশ্বাসের দেশ : নাজমুল হক নাজু

Reading time 5 minute
5
(13)
Conceptual Artwork-I, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-১

আর কদিন পরেই
উঠে যাবে এই মলিন পর্দা—
অপেক্ষাটুকুই এখন আমাদের শেষ পরীক্ষা।

তুমি সুনসান নীরবতায় দাঁড়িয়ে
এখনও দেখো ভিনবাসী মানুষের দীর্ঘ ছায়া;
আর আমি
ঘুমের অতল ঘোরেও অবিরাম ছুটে চলি।

শুনতে কি পাও
অগণিত মানুষের চিৎকার?

না, ওসব চিৎকার নয়—
বিজয়ী মানুষের নিথর দেহ থেকে
উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস।

আমাদেরও তো এখন
বিজয়ের উল্লাসে ভেসে থাকার কথা।

অথচ, তুমি এখনও
ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছ—
আর আমি আলোর অপেক্ষায়।
. . .

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-২

শেষমেশ বুঝে আসে—কিছুই হওয়ার নয়।
সব নদীই একদিন বালুচর হবে।
নিভে যাবে প্রার্থনার প্রদীপ;
ধূপের ধোঁয়ার মতো উড়ে যাবে সমস্ত আরতি।

পুবের দুয়ারে বোধের শেষ পাখিটি
ডানা গুটিয়ে বসে থাকে;
কোনও ভোর
আর ডাকে না আমাদের নাম ধরে।

তুমি আর আমি-দুই সন্ধ্যাতারা,
অন্ধকারের কপালে ক্ষণিক জ্বলে উঠি।

দেখো,
আজ নুনেরও কদর ফুরিয়েছে।

একটি দরজা আধখোলা রেখে
ঘর ছেড়ে চলে গেছে দক্ষিণা বাতাস।
. . .

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-৩

একদিন
পৃথিবী তার নীরব খতিয়ান খুলে
আমার নামটি মুছে দিলো।

তখন বুঝলাম—
এই সুনসান ভূখণ্ডে আমার কোনও নাগরিকত্ব ছিল না;
মানুষের দীর্ঘ বংশলতিকায়ও
আমার কোনও সবুজ পাতা জন্মায়নি।

আদিপিতা, পিতামহ, রক্তের উত্তরাধিকার—
সবই যেন কুয়াশার ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা
একটি নামহীন বৃক্ষ।

তোমরা, হে বন্ধুসব,
আমাকে জড়িয়ে রাখো মধুর স্বপ্নের রেশমিজালে;
আঙুল তুলে দেখাও সোনালি শিখরের দিগন্ত।

আমি দেখি—
সেসব কেবল
কুয়াশার গায়ে আঁকা অন্ধকারের মানচিত্র;
রাত্রি তার কালো হাত বাড়িয়ে নীরবে ডেকে যায়।

হয়তো আমি
কোনও নক্ষত্রের কক্ষপথ থেকে
খসে পড়া এক নির্বাসিত স্ফুলিঙ্গ;
অথবা
আলোর ইতিহাসে নাম না-থাকা এক বাদুড়,
যে কেবল অন্ধকারের ভাষা পড়তে জানে।
. . .

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-৪

আমাকেও তুলে দিয়ো শিন্নির থালায়—
যদি চাও,
মরুর দুলাল ভেবে;
নতুবা
এক মুঠো খড়কুটোর মতো রেখে দিয়ো
আগামী দিনের বাতাসের কাছে।

আমি তো মানুষ নই—
পুবের পথে বসে থাকা
অদ্ভুত সেই প্রাণীটিরও অধম,
এখনও যার চোখে
ভোরের বদলে জমে থাকে ধুলোর ইতিহাস।

কীসের আশায় এখনও জেগে থাক, হে বিনিদ্র পাথর?
দিনের শেষ আলো নিভে গেলে
আমাদের মিছিলও নেমে যায়
একফোঁটা নোনা জলের সন্ধানে।

প্রাণ কেবলই
হারানো পথের ধুলো কুড়িয়ে ফেরে;
যেদিকে চলে গেছে
ফেলে-আসা দিনের পদচিহ্ন,
সেদিকেই ডাকে অনামা বাতাস।

না প্রেম, না পুণ্য, সখি—
আমি কি তবে নিজের শূন্য ভাঁড়ারে
কোনও অদৃশ্য তস্করের হাত রেখে এসেছি?

তাই কি
চারদিকে আজও ক্ষুধার্ত মেকুরেরা
আমার নীরবতার অন্ন খুঁজে ফেরে?
. . .

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-৫

আমাকেও দিয়ো, সখি,
সুতোর একটুকরো বাঁধন।

দিকহারা পাখির মতো
যদি হারিয়ে যাই পথের শেষে,
তবু যেন
স্মৃতির মুকুট খসে না পড়ে।

বলো—
এই বিরানভূমি ছেড়ে কোথায় গেল সূর্যের আলো?
কোথায় হারাল চাঁদের জোছনা?

আমার ভাঁড়ারে আজ
শুধু জমে আছে অপূর্ণ ঋতুর ধুলো,
আর না-পাওয়া দিনের নিঃশব্দ দেনাপাওনা।

তবু
একদিন যদি খুলে যায় সেই সুতোর বাঁধন,

দেখে নিয়ো—
আমিও উড়ে যাব
স্মৃতিহীন রাতের এক নিরুদ্দেশ কপোত হয়ে।
. . .

দীর্ঘশ্বাসের দেশ-৬

আমাকেও ধুয়ে দিয়ো ধর্মের জলে—
যেন পুণ্যস্নানের শেষে
আমিও একজন পুণ্যবান মানুষের মুখ
পরে নিতে পারি।

প্রতিদিন
আমিও তো গুনে গুনে জপি ধর্মের বর্ণমালা।

তবু
দিনশেষে বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে
ফিরে আসি আরশি নগরের ভাঙা দরজায়।

সেখানে দাঁড়িয়ে
শুধু এই কথাটুকুই বলি—
ক্ষুধার রাজ্যে যে-পাখিটি
প্রতিদিন করুণ স্বরে ডেকে যায়,
আমি তারই অদৃশ্য প্রতিধ্বনি;
দুয়ারে দুয়ারে
আমিও ফিরি এক মুঠো আলোর ভিক্ষায়।

এবার
আমাকেও ধুয়ে দিয়ো—
অন্ধকুঠুরির বদ্ধ জলে।

তারপর মুখে তুলে দিয়ো নিষিদ্ধ গন্দম;

দেখব আমি,
পাপের স্বাদ নাকি ক্ষুধার জ্বালা বড়ো।
. . .

Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

. . .

লেখক পরিচয় : নাজমুল হক নাজু

কবি নাজমুল হক নাজু আশৈশব সিলেটভূমির সন্তান। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে মুদ্রণ ব্যবসাকে পেশা করেছেন। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও কবিতাচর্চা ও ছোটকাগজ সম্পাদনা করে চলেছেন নিয়মিত। কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লেখেন।

নাজমুল হক নাজু-র প্রকাশিত কবিতাবইয়ের মধ্যে ‘পাথরচাপা কষ্ট বুকে’, ‘তিনখণ্ড জলের নেশা’, ‘আমাকে স্পর্শ করে কোথায় সেই রৌদ্র’, ‘আঁধার-চেরা জল’ ও আপাত সর্বশেষ ‘বিরানভূমির গান’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভ্রামণিকের চোখ দিয়ে লিখেছেন ভ্রমণগদ্য ‘শিলঙের রৌদ্র-মেঘে’। সিলেটের সাহিত্যমহলে সক্রিয় লেখকদের সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘সংলাপে সংরাগে’ তাঁর আগ্রহের পরিসরকে আরো বিস্তৃত করেছে।

লেখকজীবনের গোাড়া থেকে পাঠকমহলে সমাদৃত ছোটকাগজ ‘ঘাস’ সম্পাদনা তাঁকে পৃথক পরিচিত দিয়েছে। সৃজনশীল বইপত্র প্রকাশের লক্ষ্যে একই নামে প্রকাশনা চালু করেন পরে। বাংলাদেশে সৃজনশীল বইপত্রের প্রকাশনায় ‘ঘাস প্রকাশন’ সফলভাবে নিজের স্থান করে নিয়েছে।

Nazmul Haque Nazu’s Literary Venture; Image Source: Author; @thirdlanespace.com

নাজমুল হক নাজু-র কবিতা ব্যক্তির অন্তর্জগতে কেন্দ্রীভূত থেকে সময় ও পরিপার্শ্বে নিজেকে প্রগাঢ়ভাবে একীভূত রাখে। কবিতার মর্মমূলে প্রেমিক কবির সংবেদনশীল অনুভবের পাশাপাশি আত্মিক নিঃস্বতা যাপন করেন সযত্নে। তবে, এটা তাঁর কবিতার একমাত্র নির্ধারক নয়। নিজেকে নিঃস্ব ভাবার অনুভব পেরিয়ে মরমি সংবেদে লীন হওয়ার আকাঙক্ষা তাঁর কবিস্বরকে ভিন্নতা দিয়েছে।

তিন দশকের অধিক কবিজীবনে নাজমুল হক নাজু প্রেমক্ষুধায় আত্মযাপন করলেও সময়-সচেতনা তাঁর কবিতায় ফিরে-ফিরে আসে। প্রবহমান সময়স্রোতে জন্মভূমির মুখচ্ছবি অবলোকন ও কবিতায় তা ধারণ করেন। তাঁর আপাত সর্বশেষ কবিতাবই ‘বিরানভূমির গান’-এর পাঠ-আলোচনায় কবি ও গদ্যকার সুমন বনিক যেমন লিখছেন :

‘কাব্যিক পরিসরে ‘বিরানভূমি’টা শুধু জনমানবহীন শুষ্ক কোনো ভৌগোলিক প্রান্তর বোঝায় না। মানুষের অন্তর্বেদনা, আত্মিক শূন্যতা ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতার বিষণ্ণ প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে। শিল্প ও কাব্যের আয়নায় আমরা একে এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি :

মানবমনের ভেতরে সচল হাহাকার, একাকিত্ব, এবং সম্পর্কের স্থবিরতা যখন মরুর মতো অনুর্বর হয়ে ওঠে, তখন তা বিরানভূমির রূপ ধারণ করে।

নাজমুল হক নাজুর ‘বিরানভূমির গান’ কবিতাবইয়ে প্রবাহিত সুরতরঙ্গ এরকম একটি অনুভবে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এলিয়টের কাব্যসুষমায় অন্তর্বেদনার রাগিনী সুতীব্র ছিল। নাজমুল হক নাজুর ‘বিরানভূমির গান’ যেন সেরকম এক রাগিনী মাঝারে গলেমিশে যেতে অধীর! বইয়ের কবিতাগুলোয় অন্তরদহনে অতুর কবি পাঠকের অনুভবে ধরা দিয়ে যান। সংকলিত কবিতাগুলোয় কবি সময়ের ইতিহাসে ঢুকে পড়ছেন। যুদ্ধ ও ক্ষুধা তাঁকে তুুমুল নাড়িয়ে যাচ্ছে। কখনও আবার ভাঙন ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে হৃদয়মথিত পঙক্তিতে বিদীর্ণ করছেন নিজেকে।

‘দীর্ঘশ্বাসের দেশ’ শিরোনামে লেখা কবিতারা যেমন সুমন বনিকের বলা কথাগুলোকে এখানে প্রাসঙ্গিক করছে। ধারাবাহিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত স্বদেশকে নাজমুল হক নাজু সংবেদী কবির অনুভূতি দিয়ে পড়ছেন যেন! যেখানে একইসঙ্গে নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত ভাবার নিঃস্বতা আভাসিত, আবার অন্ধকারকে অনন্ত ভাবা সত্ত্বেও আলোস্নানের আকুলতা সেখানে মর্মরিত। কবি লিখছেন :

হয়তো আমি
কোনও নক্ষত্রের কক্ষপথ থেকে
খসে পড়া এক নির্বাসিত স্ফুলিঙ্গ;
অথবা
আলোর ইতিহাসে নাম না-থাকা এক বাদুড়,
যে কেবল অন্ধকারের ভাষা পড়তে জানে।

ঘোর অন্ধকারে পথ হারানো স্বদেশকে ছাপিয়ে জন্ম-মৃত্যুর রহসময় দুর্বোধ্যতা নিয়ে কবির মনে সজাগ অনুভব এখানে আভাসিত! একটা কসমিক ফিল কবিকে নিজের উৎস ও পরিণাম নিয়ে ভাবাচ্ছে। দ্বিরাভাস এভাবে জাগিয়ে রাখছেন কবি। এটা নাজমুল হক নাজুর কবিতাযাত্রার অন্যতম মৌলস্বর। অন্যদিকে, ‘দীর্ঘশ্বাসের দেশ’ শিরোনামে এই-যে পরপর কবিতাগুলো লিখলেন, তার একটায় আলোয় পথ খোঁজার তাড়নাকে ফিরে ভাবছেন কবি :

আমাদেরও তো এখন
বিজয়ের উল্লাসে ভেসে থাকার কথা।

অথচ, তুমি এখনও
ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছ—
আর আমি আলোর অপেক্ষায়।

আলোর অপেক্ষা নাজমুল হক নাজুর কবিতায় নানাছলে ফেরত আসে, যদিও এই অপেক্ষা যতটা-না মানবজীবনের দৈনন্দিনকে ফিরে পাবার জন্য, তার অধিক হয়তো মানবজন্ম, মানবযাপন ছাড়িয়ে অজানা গন্তব্যে ফানা হওয়ার আকুলতাকে নিজের সার বলে মানে।

. . .

নাজমুল হক নাজু : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *