
‘আজ গোষ্ঠেতে যাবো না ভাই, মন যে আমার কেমন করে দাদা। আজ গোষ্ঠেতে যাবো না ভাই….।’ এই গানটি গোষ্ঠলীলা পালাগানের আসরে শুরুতে গাইতে শুনেছি। ভাটি-ময়ালে বৈশাখী দাওয়া-মাড়া শেষে অলস বর্ষায় গিরস্ত-বাড়ির উঠোনে গোষ্ঠলীলা পালায় গাঁয়ের কিশোর শ্যামচরণ দাস কৃষ্ণরূপে মাথায় ময়ূরপালক, বামহাতে বাঁশের বাঁশি, আর ডানহাত দাদা বলরামের প্রতি না-সূচক ভঙ্গিতে বিনয়ের সহিত গোষ্ঠে না যাওয়ার জন্য অপারগতা প্রকাশ করে ও অনিচ্ছানুরাগ কাতর কণ্ঠে গাইতে গাইতে গ্রিনরুম থেকে ধীরলয়ে শ্রোতাদের একপাশ দিয়ে মূল আসরে উঠত,—শ্রোতাগণ তখন কেউ গলা উঁচিয়ে কেউবা দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ দেখার প্রতিযোগিতায় রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি ও গণ্ডগোল পাকিয়ে বসত।
কৃষ্ণ দরশনে ব্যকুল-পরাণ শ্রোতাদের গণ্ডগোল সামাল দিতে দর্শকসারি থেকে উঠে শহর আলী মেম্বার আসরে দাঁড়িয়ে তার ব্যবহৃত টর্চলাইট বামহাতের বগলতলিতে চেপে ধরে বিশেষ ভঙ্গিতে দুইহাত জোড় করে বিনয়ের সাথে শ্রোতাদের উদ্দেশে বলে উঠত,—‘ভাইসগল, বৈন, বৈন। অনুরুধ। জোড়া’ত করি। গণ্ডগোল করৈন না-যে। পালা শুরু অইয়া গেছে।’
কার কথা কে শুনে! কৃষ্ণ দেখতে গিয়ে আসরের সামনে বসার প্রতিযোগিতায় সবাই ব্যস্ত। তুলা মিয়ার বাপ তখন একফাঁকে বাদক সুবলের পাশে আসরে সবার সামনে বসে পড়ে! আসরের সামনের সারিতে বসতে পারার সৌভাগ্য সকলের হয় না। এদিকে শ্রোতাদের মাঝে ধাক্কাধাক্কি আর কলরব সামাল দিতে গিয়ে আসরে বাজৈন্নাগণ শুরু করে জোরেসোরে বাজনা বাজানো। তুলা মিয়ার বাপ তখন বাজনার তালে হাতেতালি দিতে দিতে সফলতার হাসি হাসে। ছোটদের অনেকে বাপ-চাচার ঘাড়ে চড়ে কৃষ্ণ দেখার সুযোগটা নেয়। হরিধনের ছেলে যুইতমতো আমগাছের কেওরা ডালে বসে দু-একটা আমপাতা ছিঁড়ে গণ্ডগোলের মাঝখানে ছুড়ে দিয়ে মজা নেয়।
হ্যাজাক লাইটের আলোয় আত্মহুতি দিতে আসা পোকামাকড়ের উৎপাত সহ্য করেও পারভেজ আসরের সামনে স্থির বসে থাকে। বৃদ্ধ বারিন্দ্র ডানহাতে লাঠি আর বামহাতে ধূতির মালকোঁচা ধরে অসহায় হয়ে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছে,—‘আগের বাহাদুরি এখন গেল কই…’। আবার কেউ কেউ সামনে বসতে না পেরে বেজার হয়ে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলাবলি করে,—‘আইজ-কাইল কেউর কুনু মানা-মান্যতা নাই, বাহে-পুতে ধক্কাধাক্কি শুরু কইরা দিচ্ছে। ছি! ছি! ছি! এইডা কুনু কথা অইল?’
ঘরের বারান্দায় বসা মহিলাগণ দাঁতে কামড় দিয়ে ঘোমটা সামলে কৃষ্ণ দেখতে পারা-না-পারার আনন্দ-বিষাদে আলোছায়ার মতো ভ্যাবলা হয়ে হাতজোড় করে হায়উতাশ করছে। কোলের শিশুর কান্না থামাতে আদুরীর মা বুক উদলা করে স্তন মুখে গুঁজে দিয়ে বাজনার তালে তালে ঝাঁকি দিয়ে সুর ধরে বলছে,—‘আমরা আবুরে কেলায় মারত রে… কান্দে না, কান্দে না, কান্দে না রে…।’ যাইহোক আসরে অনেক কাউচালির পর একপর্যায়ে বাজনা শুনতে শুনতে শ্রোতারা শান্ত হলে পুনরায় শুরু হয় গোষ্ঠলীলার পালা।
শ্যামচরণ আবার শুরু থেকে গান ধরে। শ্যামচরণের গায়ের রং ফর্সা। চ্যাংড়া বয়স। ডিলচৈইল খুব সুন্দর। বাবরি চুল। গোষ্ঠ পালায় কৃষ্ণচরিত্রে অভিনয় করে ময়ালে সে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। তাকে কৃষ্ণ রূপে সাজাতে গিয়ে দুই দোয়াত সুরমা কালিতেও যখন মুখমণ্ডলসহ সাজানো শেষ হলো না, তখন তার হাতেপায়ে রান্না করা পাতিলের কালি মাখিয়ে দেওয়া হলো। শ্যামচরণকে এখন আর মানুষ হিশেবে চেনার উপায় নেই। এ-যেন অরূপের রূপ! নিরাকারের আকার। ঈশ্বরের ঐশ্বর্য রূপে সাম্যতা। ভাব ও রসের রাখালিয়া লীলা।
শ্যামাচরণের দরদি গানের গলা। অঙ্গভরা রাখালিয়া নৃত্য-তাল। নয়ন বাঁকা তার ভঙ্গি বাঁকা। মাথায় আছে ময়ূরপাখা। এমন কৃষ্ণরূপ স্বচক্ষে দেখতে আশেপাশে গ্রামগুলো থেকে শেখে-দাশের উপস্থিতিতে বাড়ির উঠোনে তিলধারণের ঠাঁই নাই। উঠোনেই দেখা দিচ্ছেন লোকঈশ্বর। এটাই যেন উঠোন-আসরে লীলাশক্তি আর কৃষিজীবী মানুষের সহজিয়া ভাব। যদ্দূর মনে পড়ে,—কৃষ্ণের বড়ো ভাই চরিত্রে অভিনীত বলরামের কথা। কাঁধে লাঙল, হাতে ফলা,—কোমরে গামছাবাঁধা কৃষকের প্রতিচ্ছবি। এ-যেন লোকবলরাম। লোককৃষ্ণ। প্রেমের সহজিয়া ভাব। বৈকুণ্ঠের ঈশ্বর আজ কৃষকের উঠোনে। গোচারণে। এভাবেই কৃষ্ণলীলা পালা চলে সারারাত।
পালা চলাকালে অহেতুক টু-শব্দও হয়নি আসরে, বরং পালার ভাবে ভাবায়িত হয়ে আসরের শ্রোতাগণ কখনও বিষাদে অশ্রু ঝরিয়েছে, কখনও আনন্দে মশগুল থেকেছে। একপর্যায়ে পালা শেষে কৃষ্ণের চরণধূলি নিতে গিয়ে রমাকান্ত হাত বাড়ায় কৃষ্ণের চরণতলে, শ্যামাচরণ তাকে বারণ করে বুকে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,—‘আমি অধমকে পাপের ভাগি কইরেন না কাকাবাবু।’
রমাকান্ত তখন শ্যামাচরণকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কান্নার সুরে বিলাপ করতে করতে বলে,—‘আমি অপরাধী…আমি অপরাধী…। হে অন্তর্যামী! এই অধমরে তুমি মাপ কইরা দিও…।’ এ-যেন কৃষ্ণপ্রেমের শক্তি। কৃষ্ণপ্রেমের লীলা। জগৎ-সংসারের সম্পর্ক কিংবা জাতপাত যেখানে তুচ্ছ। তাই বোধহয় লোককথায় প্রচলিত আছে,—‘কৃষ্ণ কেমন? যার কাছে যেমন।’
গোষ্ঠলীলার কাহিনি প্রাচীন ভারতীয় বৈষ্ণব সাহিত্যে, বিশেষত শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ-এ বর্ণিত হয়েছে। যেখানে ‘গোষ্ঠ’ শব্দের অর্থ হলো গো-চারণভূমি বা গরুর পাল রাখার স্থান। আর ‘লীলা’ শব্দের অর্থ হলো গো-চারণভূমিতে খেলা, নৃত্য বা কার্যকলাপ। বৈষ্ণব ধর্ম ও লালনগীতির মরমি দর্শনে গোষ্ঠলীলা শুধু গোচারণভূমিতে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর রাখাল সখাদের নিয়ে গরু চরানো কিংবা খেলা নয়, ‘এটি নিখিল প্রাণ-প্রকৃতি ও পরমেশ্বরের একাত্মতার প্রতীক। এখানে কৃষ্ণ হলেন পরমাত্মা এবং সখারা হলেন জীবাত্মা।’
এই গোষ্ঠলীলা কেন্দ্রিক ‘গোপাষ্টমী উৎসব’ হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষ দিন। কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমীকে বলা হয় গোপাষ্টমী। এই দিন শ্রীকৃষ্ণ গোপবালক বয়স্ক রূপে পরিণত হন। অর্থাৎ তিনি পাঁচ বছর বয়স শৈশবকাল অতিক্রান্ত করেন। ছয় থেকে দশ বছর পর্যন্ত বয়সকে ‘গোপবালক’ বা ‘পোগন্ড’ বয়সকাল বলা হয়। যেদিন থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম গো-চারণে যাওয়ার দিন শুরু হয়। সেদিন তিনি তাঁর মা যশোদা ও বাবা নন্দ মহারাজের কাছে প্রথম গোষ্ঠে যাওয়ার অনুমতি চান। প্রথমে শ্রীকৃষ্ণের পিতা-মাতা পুত্রের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে রাজি না হলেও পরবর্তীতে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে অর্থাৎ গোপাষ্টমীতে গোষ্ঠে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।
শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বড় ভ্রাতা বলরাম ও তার রাখাল সখা সুবল, মধুমঙ্গল, দামা প্রমুখ সঙ্গে নিয়ে গোচারণে প্রথম যাত্রা করেন আর এই আনন্দঘন মুহূর্তটি দেখতে শ্রীমতি রাধিকা ব্যাকুল হয়ে সখীদের নিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে তাঁরাও গোচারণে গমন করেন। শ্রীমতি রাধিকা সুবল রূপে গোপবালক সেজে কৃষ্ণের সখা হয়ে গোচারণে যান। তাই এই দিনটি রাধা কৃষ্ণের মিলনের একটি দুর্লভ দিন। যার অপেক্ষায় দেবদেবীগণও ছিলেন। আর এহেন কাণ্ডটি ঘটিয়েছে কিনা দুইকড়ার রাখাল সমাজ!

তবে এখানে একবাক্যে বলা মুশকিল-যে রাধা-কৃষ্ণ কিংবা কৃষ্ণ-রাখাল গোষ্ঠমিলনে কার ত্যাগ বা অবদান বেশি! কৃষ্ণ? নাকি রাখাল? আরেকটু ভিন্নভাবে প্রশ্ন রাখা যায়—‘পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,/ মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী!’ যাইহোক, গোচারণে গমন থেকে সারাদিন ধেনু চড়ানো, খেলাধুলা, বনভোজন থেকে শুরু করে নানাকাজ শেষে গোধূলিলগ্নে বাড়ি ফেরার আনন্দময় যাপনটুকুই ‘গোচারণ লীলা’, ‘গোষ্ঠলীলা’ বা ‘কৃষ্ণলীলা’। রাখালসখা, গোষ্ঠ, ধেনু, কৃষ্ণ ও বাঁশি এক চেতনায় শাণিত হয়ে সৃষ্টি হয় গোষ্ঠ ও গোষ্ঠকূল শিরোমণি কৃষ্ণ নির্ভর লীলা, যা একটি শক্তির জয়ধ্বনি।
মূলত সনাতন বৈষ্ণব ধর্মে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য ও কৈশোর জীবনের বাৎসল্যরস, মাধুর্যরস (অন্তর্লীন) এবং সখ্যরসের একটি বিশেষ অধ্যায় গোষ্ঠলীলা। তাছাড়া ঈশ্বরত্ব ভুলে শ্রীকৃষ্ণের মানবিক ও স্বাভাবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, বাধাহীন ও শর্তহীন আত্মনিবেদন, মোহ-মায়ার আবরণ খণ্ডন, অভিন্ন, চিরন্তন ও সাম্য-আনন্দ, অহংকারহীন ভক্তি, সমকক্ষতা ও প্রকৃতির মোহন রূপের আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গোষ্ঠের চিত্রপট গোষ্ঠলীলা বা কৃষ্ণলীলায়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে গোষ্ঠ হলো পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনক্ষেত্র। যেখানে কৃষ্ণের বাঁশি হলো পরমাত্মার আহ্বান এবং রাখাল সখাগণ হলো ভক্তের প্রতীক, যা জীবাত্মাকে জাগতিক মোহ ত্যাগ করে পরমাত্মার দিকে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। যেখানে, বিখ্যাত পদকর্তা চণ্ডীদাস ও তার ভাবশিষ্য জ্ঞানদাস, এবং গোবিন্দদাসের রচনায় এর গূঢ় আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
গোষ্ঠলীলা বৈষ্ণব পদাবলীর একটি মাধুর্যপূর্ণ পর্যায়। মধ্যযুগে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের বিস্তারের সময়, বিশেষ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাবে কৃষ্ণলীলা কেন্দ্রিক কীর্তন, পালাগান ও লোকনাট্যের মাধ্যমে গোষ্ঠলীলা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোষ্ঠলীলা কীর্তন বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। যেখানে বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্তন গানের রীতি অনুসারে গোষ্ঠলীলাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। পূর্বগোষ্ঠ বা গমনগোষ্ঠ, মধ্যগোষ্ঠ ও উত্তরগোষ্ঠ বা ফিরাগোষ্ঠ।
১. পূর্বগোষ্ঠ বা গমনগোষ্ঠ : কৃষ্ণের মা যশোদার অনুমতি নিয়ে বড় ভাই বলরাম ও রাখালসখাদের নিয়ে সকালবেলা গোচারণের উদ্দেশ্যে বৃন্দাবন থেকে বের হওয়ার আনন্দময় বর্ণনা পূর্বগোষ্ঠ বা গমনগোষ্ঠর মূল উপজীব্য।
২. মধ্যগোষ্ঠ : গো-চারণভূমিতে সারাদিন সখাদের নিয়ে ধেনু চরানো, বিভিন্ন খেলাধুলা যেমন, কানামাছি, কুস্তিগিরি, লুকোচুরি ও বনভোজনের বিবরণ মধ্যগোষ্ঠের প্রধান অবলম্বন।
৩. উত্তরগোষ্ঠ বা ফিরাগোষ্ঠ : গোধূলিলগ্নে গোচারণভূমি থেকে নন্দলায়ে ফিরে আসা, মাতা যশোদা ও গোপীদের অপেক্ষায় থাকাসহ কৃষ্ণের গৃহপ্রবেশ ও বিশ্রামের বর্ণনায় উত্তরগোষ্ঠ বা ফিরাগোষ্ঠে পাওয়া যায়।
তাছাড়া গোষ্ঠলীলার আরও অনেক পর্যায় ও পর্ব রয়েছে। বিশেষ করে ভাটির জীবনাচার গোষ্ঠপালা বা গোষ্ঠনাট্য, গোষ্ঠব্রত, গোষ্ঠগান, গোষ্ঠকীর্তন, গোষ্ঠমেলা, গোষ্ঠকাহিনিসহ নানা লোকাচার প্রচলিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে রাখালসখাদের গোষ্ঠে গমন থেকে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কাহিনি নিয়ে পালাকার কর্তৃক রচিত নাট্যরূপই গোষ্ঠপালা বা গোষ্ঠনাট্য। ভাটির মায়ালে গিরস্ত বাড়ির উঠোনে কৃষিজীবী মানুষের অভিনীত নাট্যরূপ গোষ্ঠলীলা পরিবশনের কলাকৌশল ও রসবোধ আজও চোখে ভাসে, হৃদে ঢেউ তোলে। পালায় ব্যবহৃত গানের কথা ও সুর আজও আমার মনে আচালা চারার মতো সেই সুরে-তালে গজিয়ে ওঠে। একথা মনে হলে আজও শ্রোতা হয়ে হারিয়ে যাই গিরস্ত বাড়ির উঠোনে আয়োজিত গোষ্ঠলীলার আসরে। যতদূর মনে পড়ে, আসরে প্রথম দৃশ্যের একপর্যায়ের একটি গান হলো গোষ্ঠে যাইতে বলরামের আহবান :
ধুয়া :
দাদা বলাই ডাকে সিঙ্গারবে কানাই গুণের ভাই।
হইল অনেক বেলা গৃহে রইল গাই\
যশোদার আঙিনায় নাচে প্রভু বনমালী।
চৌদিকে গোপীগণ দেয় করতালি\
স্বর্গে থাকি দেবগণে বলে ধন্য ধন্য।
জন্ম জন্মান্তর কত যশোদার পুণ্য\
ব্রহ্মা আদি দেব যারে ধ্যানে নাহি পায়।
হেন প্রভু যশোদার আঙ্গিনায় খেলায়\
সাজ সাজ করিয়া সিঙ্গায় দিল সারা।
বলরামের সিঙ্গায় সাজিল গোয়ালপাড়া\
সুদাম সাজে শ্রীদাম সাজে সাজে রে সুবল।
ব্রজের রাখাল যত সাজিলা সকল\
চুড়ু বান্ধি ধরা পরি লইলা ধেনুগণ।
উপনীত হইলা সবে নন্দের ভবন\
হেন কালে বলরামে সিঙ্গায় দিল শান।
শুনিয়া যশোদা রানীর কাঁপিল পরাণ\

গানটিতে যা প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, গোষ্ঠের সাজে সুদাম, শ্রীদাম, সুবল, বলরামসহ সকল রাখালগণ মিলিত হয়ে নন্দের আলয়ে এসে কানুকে আহবান করে গোষ্ঠে যাওয়ার জন্য সিঙ্গা বাজায়। হাওরাঞ্চলের রাখাল সমাজেও গিরস্ত কেন্দ্রিক গরু নিয়ে গোষ্ঠে যাওয়ার এরকম আহবানের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল বা আছে। সিঙ্গা দিয়ে নয়, মুখে ডাক দিয়ে রেওয়াজটি পালিত হয় ভাটির ময়ালে; যেমন, ‘গরু ছাড়ও…’। ভাটি-ময়ালে কৃষিসমাজ তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ কাহিনি যখন দেবলোকে দেখতে পায়, তখন এই আসর আর রংতামাশার থাকে না। কেহ কান্দে কেহ হাসে, কেহ ডুবে প্রেম রসে। যাইহোক, এ-গানটি শেষ হওয়ার পরে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি রাখালগণের ভর্ৎসনা বাক্য প্রয়োগে আরেকটি গান আসরে পরিবেশিত হয় :
ধুয়া :
গোষ্ঠে যাবে কি না যাবে রে প্রাণের কানাই।
গগনে অনেক বেলা গৃহে রইল গাই\
মায়ের কোলেতে আছ আদরে বসিয়া।
হইল অনেক বেলা দেখ না চাহিয়া\
কোনোকালে আমাদেরে ডেকে দেখ নাই।
নিতি নিতি তোমারে ডাকিতে আসি ভাই\
রাজপুত্র বলিয়া গৌরব করো এত।
কে তোমার নফর আছে কে সহিবে কত\
এইরূপেতে সখাগণে কহিছে রোষিয়া।
উত্তর করেন কানাই হাসিয়া হাসিয়া\
নিশ্চয় জানিও আমি মাতৃ আজ্ঞাকারী।
মায়ের আদেশ বিনে যাইতে না পারি\
মায়ের দুলাল আমি মায়ের জীবন।
মায়ের আদেশ বিনে যাইতে নাহি বন\
সবে মিলে আজ্ঞা লও মায়েরে বুঝাইয়া।
যাইতে তোদের সনে ধেনু বৎস লইয়া\
মধু বলে সখ্য রসে ডুবে যায় মন।
তার বাদ্য কৃষ্ণ চন্দ্র আছে সর্বক্ষণ\
গানে গানে রাখালগণ যখন শ্রীকৃষ্ণকে গোষ্ঠে নিতে অনুনয়-বিনুনয় করে কিংবা রোষে বিচলিত হয় তখন আসরে বসে থাকা তুলা মিয়ার বাপ মাথা নাড়িয়ে মিনমিন করে তার ভিতরে লালন করা আসল কথাটি বলে ওঠে : ‘কাম অইত না! কাম অইত না! মা’র কাছে যাও। মাতৃআজ্ঞা নাও।’ যেই কথা সেই কাজ। আসরে শ্রীকৃষ্ণেরও এককথা : মাতৃআজ্ঞা বিনে নাহি যাব গোচারণে। তাই শ্রীদামকে মিনতি করে বলে তার মায়ের নিকট থেকে গোষ্ঠে যাওয়ার অনুমতি আনতে। এক্ষেত্রে শ্রীদামকে অনুরোধ করে শ্রীকৃষ্ণ একটি গান ধরেন :
ও তুই যারে শ্রীদাম দাদা
মায়েরে আগে বুঝা
মায়েরে কান্দাইয়া ভাই
যাইবার শক্তি নাই
বনে গেলে না বাঁচিবে মা।…
পর্যায়ক্রমে আরও বেশকিছু গান পরিবেশন হয়। শ্রীদাম যশোদাকে নানাভাবে বোঝায় গোষ্ঠের কথা। অভয় দেয়। গোষ্ঠের গুণগান করে। শ্রীদাম গানে গানে বিনয় করে বলে :
শোনো গোষ্ঠের অপূর্ব কাহিনি যশোদা মা
শোনো গোষ্ঠের অপুর্ব কাহিনি
শ্রীদাম কহিছে রানী
শোনো মাগো নন্দরানী
হেনরূপ না দেখি না শুনিগো…।
তাতেও যখন ফল হয় না তখন রাখালগণ শ্রীকৃষ্ণকে গোষ্ঠে নিতে বারবার শ্রীকৃষ্ণের মা যশোদার কাছে গানে-গানে অনুমতি প্রার্থনা করতে থাকে। রাখালদের এ-অপারগতা দেখে আসরে বসে থাকা রমাকান্ত সরকার কাঁদতে কাঁদতে কয় : ‘বাৎসল্য ভাবে মজাইয়া মন, মা’য়ের চিত্ত করো হরণ…।’ মনে হয় যেন আসরের সকল শ্রোতা মা যশোদার কাছ থেকে অনুমতি পেতে করজোড়ে প্রর্থনায় মগ্ন। এভাবে আসর চলে বাৎসল্য ভাবাবেগে। একপর্যায়ে রাখালগণ শ্রীকৃষ্ণকে রাখালরাজা করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গান ধরে। এমন একটি গান হলো :
ধুয়া :
রানী দেওগো তোমার গোপাল মাঠে লইয়া যাই।
তোমার গোপাল মাঠে গেলে বড়ো সুখ পাই\
সকল রাখালের রাজা তোমার কানাই।
বনফুলে সবে মিলি তাহারে সাজাই\
ধেনু চড়ে ধেনু ফিরে বৈসে রঙ্গ চাই।
এর লাগি তার সঙ্গে গোচারণে যাই\
রাখালের জীবন মাগো তোমার কানাই।
মরিলে বাঁচিতে পারে কানু গুণে ভাই\
কানাই লইয়া সবে অরণ্যে বেড়াই।
বনে বনে গিয়া কত বনফল খাই\
যশোদার নিকটে গিয়া কহিছে বলাই।
শীঘ্র করে সাজাও মাগো প্রাণের কানাই\
যতেক রাখাল গেলা যশোদার ঠাঁই।
মধু বলে যশোদাগো কানু ভিক্ষা চাই\
তাতেও মা যশোদার মন গলে না। তিনি রাখালদের প্রতি নিষ্ঠুর বাক্য উচ্চারণ করেন, যা গানে-গানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয়। যেমন :
বলরাম ফিরে যা তোরা গৃহেতে
নীলমণিকে দিব না আজ গোষ্ঠেতে।
শুনরে বলাই আমার একেলা কানাই
মায়ের আর লক্ষ্য নাই।…
ওহে কালীদহের কালো জলে
কানাই ঝাঁপ দিয়াছে তাহাতে।

যশোদার মুখে এসব শুনে আসরে শ্রোতাগণের আক্ষেপের সীমা নাই। কেউ কেউ হাতজোড় করে অদৃশ্য শক্তির কাছে যশোদার অনুমতি পেতে মাথায় হাত ঠেকিয়ে প্রর্থনা করছে। বলতে গেলে এ-আসরে সকলেই যেন অভিনেতা! রাখালগণ নাছোড়বান্দা, যশোদার পায়ে ধরে ক্রন্দন করে, অনুনয়-বিনয় করে আবারও গান ধরে তারা :
ধুয়া :
কান্দে রাখালগণে যশোদার সদনে।
প্রাণের কানু বিনে মাগো বাঁচিব কেমনে\
কানাইকে লইয়া যাইব ধেনু চড়াইতে।
এই আসে সখাগণ দাঁড়ায় রাজপথে\
পায় ধরি জননীগো ক্ষমা দেও চিত্তে।
না হবে কানাইর মন্দ আমরা থাকিতে\
রাখালের ক্রন্দনে রানী লাগিলা ভাবিতে।
রোহিনীকে ডাক দিয়া আনিলা ত্বরিতে\
রাম কানু গোষ্ঠে যাবে ধেনু চড়াইতে।
আনগো যমুনার জল স্নান করাইতে\
মঙ্গল ঘট ভরি জল আনিলা সাক্ষাতে।
জয়ধ্বনি করি ঢালে রাম কানুর মাথে\
দু’ভাই করিলা স্নান বড় হরষিতে।
চাঁদমুখ মুছাইলা মা আঁচলেতে\
যশোদার সম্মতির পরপরই আসরে একটা আনন্দ হইচই শুরু হয়ে যায়। উলুধ্বনি দিয়ে জয়ধ্বনি হয়। এ-আনন্দ সবার ভাগ্যে জোটে না। আমি এই আনন্দ-যে কতবার পেয়েছি তা মনে করলে আজও পুলকিত হই। আসরে দেখেছি সেদিন মাতৃশক্তির স্বরূপ। তারপর কীভাবে জয়ের আনন্দে আসরের ভাব পাল্টে যায়। শ্রোতাদের অনেকে পানতামাকে মগ্ন হয়। শুরু হয় কানুকে গোষ্ঠের নানাসাজে সাজিয়ে দেওয়ার পয়ার ছন্দে রচিত গান। শ্রীকৃষ্ণের মা যশোদা রাখালগণের কাছে তাঁর প্রাণের কানু সঁপিয়া দেয়। এ-নিয়েও ভিন্ন বাদ্য-তাল ও ভাবাবেগে যশোদার নানা শর্ত ও শঙ্কাকে মূর্ত করে গান হয়। যেমন :
ধর নেওরে বলাই, প্রাণের কানাই, সঁপিলাম তোর হাতে।
ওরে সন্ধ্যাকালে এনে দিবে হস্ত দেওরে মাথে।
মন্ত্রপড়ি বক্ষণ বান্ধিলা কৃষ্ণ মাথে\
রাম আদি দশ নাম করি উচ্চারণ।
চন্দ্র সূর্য্য সাক্ষী করে যত দেবগণ\
তার শেষে বাম করের আঙ্গুলি ধরিয়া।
দন্তাঘাত করি রানী দিলেন ছাড়িয়া\
মায়ে দন্তাঘাত করে শরীরে।
অন্যে তার সঙ্গে দণ্ড বসাইতে না পারে\
বৃদ্ধ বয়সের মতো গোয়ালিনী ছিল।
সবাকার পদধূলি কৃষ্ণ মাথে দিল\
এই আশীর্বাদ গোপী করগো সকলে।
বনে যায় প্রাণ কানু থাকে-যে কুশলে\
বলরামের দুই হস্ত করিলা ধারণ।
হাতে হাতে প্রাণ কৃষ্ণ করে সমর্পণ\
এখানেই শেষ নয়। শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠে গমনকালে বলরামকে উদ্দেশ করে মা যশোদার মনের সংশয় জানিয়ে গান পরিবেশন করা হতো। উপস্থিত শ্রোতাদের মনে গানটি এমনভাবে প্রভাব ফেলত, মনে হতো সকল শ্রোতাই এখন মা যশোদা! ত্রিপদী ছন্দে গানটি হলো :
ধুয়া :
হারিবে না দিও দূরে, বনের রাখাল যাদুরে,
না দিও দূর বনে\
শুন বাছা বলরাম, মায়ের নবীন শ্যাম,
কানাই রাখিও সাবধানেরে\
ভাগ্যবতী মাও তার, সাত পাঁচ পুত্র যার,
কেহ গোষ্ঠে কেহ মাঠে যায়রে\
আমি নারী অভাগিনী, একা পুত্র নীলমণি,
কংস তারে ধরি নিতে চায়রে\
সব যাইও আগেপাছে, হরিকে রাখিও মাঝে,
কানুর মনেতে বড় ভয়রে\
বলাই থাকিও সাথে, নানা ভয় আছে পথে,
সদা অন্তরে কাঁপে মোর\
নিকটে চরাইও ধেনু, চাঁদ মুখে বাজাইও বেনু,
গৃহে থাকি মায়ে যেন শুনেরে\
যার ক্ষেত্রে যাবে ধেনু, কেড়ে নিবে সিঙ্গা বেনু,
মধু কয় কাধিবে মায়ের পরাণীরে\
বলরামসহ রাখালগণ যথাসময়ে কানুকে গৃহে ফিরিয়ে দেওয়ার শপথ করে মা যশোদার কাছে। তারপর তারা আনন্দ-উদ্যমে গোষ্ঠে গমন করে সকলে। গমনকালে মা যশোদার বিদায়- বেদনাকে উদ্ধৃতি করেও গান হয়। যেমন :
নন্দের নন্দন হরি বংশী বাজাইয়া বনে যায়রে
ওরে বংশী বাজাইয়া বনে যায়রে
ধেনুগণ যুতে যুতে
রাজপথে গোষ্পীদের ধুলারে
চলিল মাঠের পথে
বাজাইয়া সিঙ্গা বেনু
মাঠে চলে রাম কানু
হৈ হৈ রব করি
কীবা শোভা রাখালের খেলারে…।

যে-গানের ভাব সকল শ্রোতাকেও আন্দোলিত করে। এদিকে আসরে বসা আদুরীর মা তার কোলের শিশুকে বুকে চেপে ধরে আদর করতে করতে হয়তো যশোদা হয়ে কৃষ্ণরূপে সন্তানস্নেহ বিলায়ে কোথায় জানি হারিয়ে যায়! আমি সেদিন আদুরীর মায়ের মাঝে দেখেছি যশোদার প্রতিছবি। দেখেছি নারীশক্তি জেগে ওঠার মহেন্দ্রক্ষণ। দেখেছি অবলা স্ববলা হওয়ার রূপ। কৃষ্ণের গোষ্ঠে গমনকালে মনে হয় যেন আসরে সকল শ্রোতা মনেপ্রাণে তাদের শুভ-গমন কামনায় ব্যস্ত। মায়ের কানাই গোষ্ঠে যায় মা যশোদা চেয়ে থাকে যতক্ষণ দেখা যায়। গানে- গানেই গোষ্ঠে গমন করে রাখালসখাসনে শ্রীকৃষ্ণ আসর ত্যাগ করে :
ধুয়া :
ফিরে ধেনুর সনে বনে বনে রাম কানাই।
বেনু রবে ফিরে কানুর নব লক্ষ গাই\
বলাই’র সাক্ষাতে কহে নবঘন শ্যাম।
কোন বনে চড়াবে ধেনু দাদা বলরাম\
তাল বন খেজুর বন ভাণ্ডিল বন কাছে।
নিধুবন নিকুঞ্জবন মধুবন আছে\
বলরামে বলে আরে কোথা নাহি যাই।
মধুবনে গিয়া সবে মধু পান করাই\
সেই বনে লক্ষ ধেনু দিলা চড়াইয়া।
মধুপান করে সবে আনন্দিত হইয়া\
এতেক উন্নত বলাই মধুবনে মধু পান করি।
চারিদিকে ধাইয়া যায় মার মার করি\
মারামারি ধরাধরি কাঁধে চড়াচড়ি।
হুড়াহুড়ি জড়াজড়ি ধুলা উড়াউড়ি\
নানা খেলা করে সবে আনন্দে মাতিয়া।
গোবর্দ্ধন পর্বতে ধেনু দিলা চলাইয়া\
পাইয়া নতুন তৃণ ধেনুগণে খায়।
মধু বলে পুচ্ছ তুলি নাচিয়া বেড়ায়\
আসরে এই গানটিতে গায়কগণ নানা ধরণের নৃত্য ও সুর পরিবেশন করেন। প্রাণের উল্লাসে এ- গানটি পরিবেশন হয়। শ্রোতাগণও যেন গানটির প্রতিক্ষায় রাত জেগে বসে থাকেন। তারপর গোষ্ঠের আরও অনেক কাহিনি গানে-গানে অভিনীত হয়। বিশেষ করে গাভী দোহন করে দুধ সংগ্রহ ও জমিনের ধান থেকে চাল তৈরি করে মিষ্টান্ন রান্না করে খাওয়া। গোষ্ঠে মিষ্টান্ন খাওয়া নিয়ে ভাটি-ময়ালের রাখালজীবনে নানা কাহিনি প্রচলিত আছে। এভাবেই রাত দ্বিপ্রহর হয়ে আসে। নিশিতি সুর বাজে। একপর্যায়ে বন থেকে চম্পক ফুল তুলে সুবল যখন মালা গেঁথে কৃষ্ণের গলে পরিয়ে দেন, তখন কৃষ্ণের মনে পড়ে যায় চম্পকের রানী রাধার কথা। কৃষ্ণ তখন সুবলকে বিনয় করে গানে গানে বলে :
…চম্পক ফুল ভাই দেখিয়া নয়নে
চম্পকরমণী রাধা জাগিয়াছে মনে
রাধার বিচ্ছেদানল দহিল অন্তরে
শীঘ্র করি যাও ভাই রাধা আনিবারে…
রাধা আনয়নের কাহিনিও গানে গানে বলা হয়। তারপর রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি, বিচ্ছেদ নিয়ে গান হয়। অবশেষে প্রভাতী সুরে রাধাকৃষ্ণের প্রচলিত মিলন গান গেয়ে গোষ্ঠলীলা পালা শেষ হয়।
আসরে রাধাকৃষ্ণের যখন মিলন হয় শহর আলী মেম্বার হাতের টর্চলাইট উঁচিয়ে মহিলা শ্রোতাদের উদ্দেশে বলে : ‘মা-বইনসগল জুকার দেইন গো, জুকার দেইন।’ উপস্থিত মহিলা শ্রোতাগণ মঙ্গল উলুধ্বনি দিয়ে যুগল মিলনের চরণতলে লুটিয়ে পড়ে। আদুরীর মা কোলের সন্তানকে মাটিতে লুটিয়ে গড়াগড়ি দেয়। ঘোমটা খুলে নিজের মাথায় মেখে নেয় মিলনের চরণধূলি। বয়সভারে নতজানু বৃদ্ধ বারিন্দ্র সরকার হামাগুড়ি দিয়ে চরণধূলি নিতে গিয়ে হাতের সম্বল লাঠি হারিয়ে উঠতে না পেরে গড়াগড়ি যায়। পারভেজ আসরের সামনে থেকে উঠে এসে বৃদ্ধ বারিন্দ্র সরকারকে টেনে তুলে লাঠিটা হাতে ধরিয়ে বাড়ি যাওয়ার পথ দেখিয়ে বলে : ‘জেডাবু বাড়িত যাইন, ঘুমাইন গা, পালা শেষ।’
আসরে অন্যান্য পুরুষ শ্রোতাগণ গান গেয়ে একে-অপরে কোলাকুলি করে ভাব বিনিময় করে। তুলা মিয়ার বাপও তখন হারমোনিয়াম বাদককে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গনে ভাব বিনিময় করে। এমন সহজিয়া ভাবের দেখা কেবল ভাটি-ময়ালের গিরস্ত বাড়ির উঠোনে গোষ্ঠলীলার আসরে হরহামেশা মিলবে। আসরে তখন নারী-পুরুষ, শ্রোতা-অভিনেতা-বাদকরা এক হয়ে নেচে-নেচে রাধা-কৃষ্ণের যুগল মিলন গায় :
ধুয়া
আমার রাই মিলিল গো শ্যামের সনে।
এগো আলো করল নিধুবন রূপের কিরণে।।
চন্দ্র বৃষ্টি যেমন হেরে নক্ষত্রগণে।
এগো তেমনি মত রাইখে ঘেরে সব সখিগণে।।
গাঁথিয়া মালতীর মালা অতি যতনে।
আনন্দ মনে এগো পরাইয়া শ্যামের গলে মিশাইয়া চন্দনে।।
শ্যামের বামে রাই কিশোরী এক আসনে মিলে দুজনে।
এগো দীনহীনের বাঞ্ছা যুগল চরণ সেবনে।।

আসর শেষে নানারকম ভাবের শরীর নিয়ে শ্রোতারা ধীরলয়ে বাড়ি ফিরে;—তাদের দেখে তখন বুঝতে বাকি থাকে না,—এই গোষ্ঠলীলা বা কৃষ্ণলীলা জনজীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে! তবে, ভাটির ময়ালে আমার জানা মতে গোষ্ঠলীলা গোষ্ঠে রাধাকৃষ্ণের মিলনের মধ্য দিয়ে মধ্যগোষ্ঠ পর্বে শেষ হয়। অনেকসময় মিলন শেষে বাড়ি ফেরার একটি গান গাইতে গাইতে আসর ত্যাগ করার মধ্য দিয়েও সমাপ্তি টানা হয়। উত্তরগোষ্ঠ বা ফিরাগোষ্ঠের আদিঅন্ত সাধারণত কৃষ্ণলীলা পদাবলী আসরে গাওয়া হয়ে থাকে।
ভাটি-ময়ালের পালায় ব্যবহৃত ও প্রচলিত গানের বেশিরভাগের রচয়িতা পণ্ডিত মধুসূদন দাস বলে আমি জানি। তাঁর রচিত গানের সংখ্যাই গোষ্ঠলীলা আসরে অধিক গাইতে শুনেছি। মূলত তাঁর গোষ্ঠগানকে কেন্দ্র করে পালাকারগণ গোষ্ঠপালার কাহিনি ছোটবড়ো করে নানাভাবে নাট্যরূপ দিয়েছেন। পণ্ডিত মধুসূদন দাস গোষ্ঠলীলা পালায় যেসব বিষয়ের উপর গান রচনা করেছেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে তুলে ধরছি :
১. নন্দালয়ে যশোদা কৃষ্ণকে ননী খাওয়ানোর দৃশ্য।
২. গোষ্ঠে যাইতে বলরামের সাড়া।
৩. শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সখাগণের ভর্ৎসনা বাক্য।
৪. যশোদার কাছে শ্রীদামের আগমন।
৫. যশোদার কাছে শ্রীদামের গোষ্ঠের দিব্যমূর্তি বর্ণনা।
৬. শ্রীকৃষ্ণকে গোষ্ঠে নিতে সখাগণ কর্তৃক যশোদাকে প্রার্থনা।
৭. বলরামের প্রতি যশোদার নিষ্ঠুর বাক্য।
৮. যশোদার কাছে রাখালগণের ক্রন্দন।
৯. যশোদা শ্রীকৃষ্ণকে গোষ্ঠে দিতে শর্তসাপেক্ষে সম্মতি।
১০. গোষ্ঠে যেতে গোপাল বা কৃষ্ণকে সাজানো।
১১. যশোদা রাখালগণের কাছে গোপালকে সঁপে দেওয়া।
১২. রাখালসখা সনে গোষ্ঠে গমন।
১৩. পথে যেতে-যেতে গোষ্ঠের বর্ণনা।
১৪. গোষ্ঠে গরু চরানো, খেলাধুলা ও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের বর্ণনা।
১৫. গোষ্ঠে রাধা কৃষ্ণের মিলন।
১৬. গোষ্ঠ থেকে বাড়ি ফিরে আসার বর্ণনা।
অঞ্চল ভেদে গোষ্ঠলীলা বা কৃষ্ণলীলা পালা উপরোক্ত মূল বিষয়গুলো ছাড়াও আরও বেশকিছু গোষ্ঠকেন্দ্রিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে, যার মূল কাহিনি কৃষ্ণের গোপবালক কাল থেকে রাখালসখাসনে গোচারণ কেন্দ্রিক।
. . .
লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম
সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



