
টি এস এলিয়ট তাঁর The Waste Land কাব্যগ্রন্থে আধুনিক মানুষের আত্মিক বন্ধ্যাত্বকে বিরানভূমির অনন্য উপমায় তুলে ধরেছিলেন। বিশ্বজুড়ে ছড়ানো কবিতা-পাঠককে শিহরিত করেছিলেন কবি। এলিয়টের অমর সৃষ্টি মানব-সভ্যতার অবক্ষয়জনিত নিঃস্বতা ও এর বিপরীতে আত্মিক শান্তি খুঁজে পাওয়ার ক্ষুধাকেও সামনে এনেছিল। বিংশ শতকে প্রবল হয়ে ওঠা আধুনিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলনে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড বা পোড়োজমির প্রভাব ও আবেদন যে-কারণে অমলিন। নগরজীবনে অভ্যস্ত মানুষের দেহমনে মূর্ত ক্লান্তি, মিথ সংলগ্ন অতীত-বিশ্বের রোমন্থন, আর সভ্যতার নবনব উৎকর্ষের প্রতি অঙ্গে প্রবল হয়ে ওঠা বন্ধ্যাত্বের ছবি এলিয়টের সৃষ্টিতে ডুব দিলে পাঠক এখনো টের পায়।
বাংলা সাহিত্য টি এস এলিয়টের দ্বারা একটা সময় প্রভাবিত ও আচ্ছন্ন ছিল। সাত সমুদ্র তেরো নদীর এপারে ভিন্ন পরিপার্শ্ব ও বাস্তবতায় এলিয়টসৃষ্ট ‘বিরানভূমি’ বাংলার কবিতা-মহলেও যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। বাংলা কবিতায় আধুনিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন ও এলিয়ট-পাউন্ডদের প্রভাব নিয়ে তারপর থেকে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক আজো থেমে নেই। পাশাপাশি এটিও সত্য-যে, বাংলায় অনেক কবির কবিতায় এলিয়টসৃষ্ট ‘বিরানভূমি’ নানান ছলে উঁকি দিয়ে যায়। নাজমুল হক নাজুর সদ্য প্রকাশিত কবিতাবই ‘বিরানভূমির গান’-এ যেমন এটি প্রচ্ছন্ন উঁকি দিচ্ছে বলে মনে হলো পাঠ শেষ করে।
মানব হৃদয়ে মর্মরিত নিঃস্বতার বেদনা ও এর নাগপাশ কেটে বেরিয়ে আসার আকুতি সদ্য প্রকাশিত কবিতাবইয়ে কবি নিজের অনুভব দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছেন। ‘কাব্যিক পরিসরে ‘বিরানভূমি’টা শুধু জনমানবহীন শুষ্ক কোনো ভৌগোলিক প্রান্তর বোঝায় না। মানুষের অন্তর্বেদনা, আত্মিক শূন্যতা ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতার বিষণ্ণ প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে। শিল্প ও কাব্যের আয়নায় আমরা একে এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি :
মানবমনের ভেতরে সচল হাহাকার, একাকিত্ব, এবং সম্পর্কের স্থবিরতা যখন মরুর মতো অনুর্বর হয়ে ওঠে, তখন তা বিরানভূমির রূপ ধারণ করে।
নাজমুল হক নাজুর ‘বিরানভূমির গান’ কবিতাবইয়ে প্রবাহিত সুরতরঙ্গ এরকম একটি অনুভবে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এলিয়টের কাব্যসুষমায় অন্তর্বেদনার রাগিনী সুতীব্র ছিল। নাজমুল হক নাজুর ‘বিরানভূমির গান’ যেন সেরকম এক রাগিনী মাঝারে গলেমিশে যেতে অধীর! বইয়ের কবিতাগুলোয় অন্তরদহনে অতুর কবি পাঠকের অনুভবে ধরা দিয়ে যান। সংকলিত কবিতাগুলোয় কবি সময়ের ইতিহাসে ঢুকে পড়ছেন। যুদ্ধ ও ক্ষুধা তাঁকে তুুমুল নাড়িয়ে যাচ্ছে। কখনও আবার ভাঙন ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে হৃদয়মথিত পঙক্তিতে বিদীর্ণ করছেন নিজেকে।
বুক-পাঁজরের গহিনে ‘বিরানভূমির গান’ নীরবপ্রেমে গুমরে মরছে বলে পাঠকের মনে হতে থাকে। রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হওয়ার তাড়না কবির মধ্যে প্রবল। আধ্যাত্মিক ঐশী আলো খুঁজেছেন বইয়ের শরীরে। ‘বিরানভূমি’র প্রান্তরে সবুজ সমারোহের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরিত দেখার আর্তিও গোপন থাকেনি। জীবনকে উদযাপনের আশা কবিকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। স্নিগ্ধ ভোরের প্রত্যাশা যে-কারণে কবিতাগুলোয় মর্মরিত। এরকম কিছু পঙক্তি আলোর রোশনাই হয়ে বইটিকে দ্যুতি দিয়েছে। নাজমুল হক নাজুর ভাষানির্মাণ জটিল নয়। সরল-সংযত ভাষাপৃথিবীতে বসে কবিতাগুলো লিখেছেন কবি। চিত্রকল্পে ভাবালুতার প্রয়োগ চোখে পড়বে। উৎপ্রেক্ষা-রূপক ও উপমারা মিলে ধ্রুপদি এক আমেজ যেন এভাবে পাঠককে উপহার দিয়ে যায়। গতিপথের এই সহজযাত্রা মনের দরজায় কড়া নাড়ে।
সবুজের জন্ম অনেকসময় বিরানভূমির বুকেই কিন্তু হয়;—আর গভীরতম নীরবতার রয়েছে নিজস্ব সংগীত। নাজমুল হক নাজুর ‘বিরানভূমির গান’-এ পাঠক সেই সবুজে নিকানো জীবনের জয়গান শুনতে পায়।

যাইহোক, কবির এ-যাবত প্রকাশিত বইগুলো এই ফাঁকে একবার দেখে নেওয়া যাক। তিন দশকের পথচলায় এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘পাথরচাপা কষ্ট বুকে’ ছিল প্রথম কবিতার বই। ২০০৬ সনে বইটি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কবি। ‘তিনখণ্ড জলের নেশা’ নামের পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ বের করতে সময় লাগে তিন বছর। দ্বিতীয় কবিতাবই প্রকাশের আরো পাঁচ বছর পর তাঁর অন্যতম আলোচিত ও পাঠসমাদৃত ‘আমাকে স্পর্শ করে কোথায় সেই রৌদ্র’ বইটি আলোর মুখ দেখে। ‘আঁধারচেরা জল’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সনে।
নাজমুল হক নাজু কেবল কবিতায় আটকে রাখেননি নিজেকে। ‘অজানা অর্কিড’-এ তাঁর লেখা একগুচ্ছ গল্প মলাটবন্দি হয়েছিল। করোনা অতিমারির বছর ২০২১-এ বইটি বের করেন কবি। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি ২০২৪-এ শিলং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন সুখপাঠ্য ‘শিলঙের রৌদ্র-মেঘে’ বইটিও। এছাড়া সিলেট অঞ্চলের কৃতি কয়েকজন লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতার সংকলন ‘সংলাপে সংরাগে’ বেরিয়েছে গত বছর।
সিরিজ কবিতাসহ মোট ৫২টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত ‘বিরানভূমির গান’ পাঠকের জন্য অনুপম আস্বাদ হয়ে ধরা দেবে বলে আমার বিশ্বাস। ৬টি কবিতা নিয়ে ‘দীর্ঘশ্বাসের দেশে’ ও ১০টি কবিতা নিয়ে ‘অসময়ের দিনলিপি’ ছাড়াও বইয়ে সংকলিত বাকি কবিতাগুলো পাঠ উপভোগ্য। ‘দীর্ঘশ্বাসের দেশে’ সিরিজের একটা কবিতা পড়তে ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে। কবি সেখানে লিখেছেন :
আর কদিন পরেই উঠে যাবে এই মলিন পর্দা—
অপেক্ষাটুকুই এখন আমাদের শেষ পরীক্ষা।
তুমি সুনসান নীরবতায় দাঁড়িয়ে
এখনও দেখো ভিনবাসী মানুষের দীর্ঘ ছায়া;
আর আমি
ঘুমের অতল ঘোরেও অবিরাম ছুটে চলি।
শুনতে কি পাও
অগণিত মানুষের চিৎকার?
না, ওসব চিৎকার নয়—
বিজয়ী মানুষের নিথর দেহ থেকে
উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস।
আমাদেরও তো এখন
বিজয়ের উল্লাসে ভেসে থাকার কথা।
অথচ, তুমি এখনও
ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছ—
আর আমি আলোর অপেক্ষায়।
—দীর্ঘশ্বাসের দেশে-১
আমরাও কবির মতো আলোর অপেক্ষায় আছি আসলে! ‘আমাদেরও তো এখন/ বিজয়ের উল্লাসে ভেসে থাকার কথা।’
‘ঘাস প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত কবিতাবইটির গঠন, বাঁধাই ও প্রচ্ছদে শৈল্পিক ব্যঞ্জনা এবং যত্নের ছাপ চোখে পড়ছে। ছাপাকনন বইটি ছেপেছেন। বিনিময় মূল্য দেড়শো টাকা রেখেছেন প্রকাশক। অগ্নিমূল্যের বাজারে একে বেশি বলা যাবে না। আর হ্যাঁ, উৎসর্গপত্রে কবির ছোট্ট সংযোজনটি একবার স্মরণ করতে চাই। কবি লিখেছেন : ‘মনোজবিকাশ দেবরায়/ প্রেরণা বাতিঘর’। এই উৎসর্গপত্রটিকে কবির ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ ধরে নেওয়াটাই সংগত। ‘বিরানভূমির গান’ পাঠক-হৃদয়ে অনুরণিত ও সমাদৃত হবে এই কামনা থাকল আন্তরিক।
. . .
একদিন
পৃথিবী তার নীরব খতিয়ান খুলে
আমার নামটি মুছে দিলো।
তখন বুঝলাম—
এই সুনসান ভূখণ্ডে আমার কোনও নাগরিকত্ব ছিল না; মানুষের দীর্ঘ বংশলতিকায়ও
আমার কোনও সবুজ পাতা জন্মায়নি।
আদিপিতা, পিতামহ, রক্তের উত্তরাধিকার—
সবই যেন কুয়াশার ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা একটি নামহীন বৃক্ষ।
তোমরা, হে বন্ধুসব,
আমাকে জড়িয়ে রাখো মধুর স্বপ্নের রেশমি জালে; আঙুল তুলে দেখাও সোনালি শিখরের দিগন্ত। …

. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এর প্রাসঙ্গিক আরো পড়ুন …
. . .
লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সুমন বনিক : থার্ড লেন স্পেস.কম
সুমন বনিক-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



