দেখা-শোনা-পাঠ - পোস্ট শোকেস

‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ : একটি গানের পঞ্চাশ বছর

Reading time 9 minute
5
(8)
Hotel California: the song in its 50s; Image Source & Credit: Collected; Google Images

কিছু গান পুরোনো হয় না। সময়-গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মনে সতেজ থাকে, যেমন সতেজ ছিল তার জন্মের প্রথম প্রহরে। পৃথিবীর প্রতিটা ভাষায় খোঁজ করলে এরকম গানের সন্ধান মিলবে। যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এসব গানকে নতুন করে রং করা লাগে না। রংমিস্ত্রী ডাকার প্রয়োজন হয় না বড়ো! গানগুলো ভিন্টেজ স্থাপনার মতো বয়সভারে জীর্ণ, কিন্তু সর্বাঙ্গ থেকে ঠিকরে পড়ে সমীহ জাগানো শিল্পদ্যুতি।

ইংরেজি রক গানে অগণিত হিট নাম্বারের মধ্যে ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ (Hotel California) সেরকম একটা গান। গানটি আসন্ন ২০২৭ সনে পঞ্চাশ বছরে পা রাখতে চলেছে জেনে কথাটি মনে এলো। ১৯৭৬-এ তৈরি ও সে-বছর ইগলস ব্যান্ডের অ্যালবামে স্থান পায়, তবে একক গান হিসেবে তারা এটা রিলিজ করে ১৯৭৭-এ। সে যাইহোক, বিংশ শতাব্দীর ষাট থেকে আশির দশক অবধি রক গান বিশ্বজুড়ে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন ভাষা দিয়েছিল। তথ্যটি গানবাজনা যারা শোনেন ও খবর রাখেন নিয়মিত, তাদের কারো অজানা নয়। রক গানে বিস্ফারিত ভাষার প্রভাব ও এর ভালোমন্দ অভিঘাত নিয়ে সুতরাং আলাপে যাবো না। এটা শুধু মনে রাখছি,—‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নিয়েছিল। রক গানের ইতিহাসে যে-দশকটি একাধিক কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এটা হচ্ছে সেই সময়, বিশ্বজুড়ে রক গানবাজনা নিছক গানের ভাষায় সীমিত থাকার পরিবর্তে বৃহৎ ফেনোমেনন বা প্রপঞ্চে মোড় নিয়েছিল। মোটের ওপর ত্রিশ বছরের কালপর্ব বলা যেতে পারে একে। উক্ত কালপর্বে একের-পর-এক সফল ইংরেজি ব্যান্ডের উত্থানকে অবিশ্বাস্য মনে হবে, যদি পেছনে ফিরে তাকাই একটিবার। রক গানের নবজাগরণ বা রেনেসাঁকে এটা অনিবার্য করে, আর ঈগলস সেখানে তার চওড়া ডানায় বয়ে এনেছিল ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’র মতো গোলকধাঁধায় মোড়ানো এই গান!

গানটা নিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে বিংশ শতাব্দীর কুড়ি থেকে পঞ্চাশ বা চল্লিশবর্ষী সময়রেখাকে স্মরণে রাখা প্রয়োজন। স্মৃতিকাতর রোমান্সে গাঁথা গান দিয়ে পঞ্চাশ দশকটাকে নিজের করে নেওয়া এলভিস প্রেসলি যেখানে রকঝড়ের আগাম পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন। রক-পপের রাজাধিরাজ এলভিস তখনো রোমান্টিক সং গাইছিলেন মূলত। ভিন্টেজ হতে চলা দিনগুলোকে ইয়াদ করছিল তাঁর গান। পেছনে ফেলে আসা প্রেমের জখমে তাঁকে তখন আহত দেখছে শ্রোতা। একটা সময়রেখাকে এভাবে বিলীন হতে দেখার আফসোস ঝরে পড়ত প্রেসলিকণ্ঠে। এলভিস, ওই সময়জুড়ে সর্বত্র বাজছেন, আর শ্রোতা ভাবছে,—মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে ঈশ্বরীকে খুঁজছে ঈশ্বর!

আমেরিকান গানের অভিধানে ‘গুড ওল্ড ডেজকে’ যেসব গানের শিল্পী স্মরণীয় রাখলেন, এলভিস প্রেসলি সেখানে শেষ সার্থক প্রতিনিধি। সামনে ভিন্টেজ হতে যাচ্ছে এরকম স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা ও সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর দায় বহন করছিলেন দ্য লাস্ট মোহিকান এলভিস। তাঁর গানে বিচ্ছুরিত সুইট টেন্ডার লাভ ও এর জখমকে অতিক্রম করে যায় এরকম গানের কথা যদি তুলতে চাই, তাহলে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ৪০ থেকে ৫০ বছরে জন্ম নেওয়া বাংলা গানের কথা বলতে হয়।

শচীন কর্তার ভাটিয়াল টানে সাধা অবিনশ্বর গানগুলো ঝরাপাতার মতো ঝরে যাওয়া সময়কণাকে আলিঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে জাগরুক গানের কথা স্মরণ করিয়ে যায়। ‘শোনো গো দখিনা হাওয়া, প্রেম করেছি আমি’র মতো গানে এমন এক দরদি অনুরাগ ও হাহাকার শ্রোতা টের পায়,—তার মনে উতলে ওঠে প্রেমের সুবাস। ইংরেজি গানে এলভিস এরকম এক সুবাসকে ধরেছিলেন। সুতরাং, রেডিও, টেলিভিশন ও মঞ্চে ভেসে আসা তাঁর গানগুলোর অবিনশ্বর হতে সময় লাগেনি।

সুইট ফিফটিজেই মোটের ওপর গানগুলো গেয়ে ফেলেছিলেন এলভিস, এবং গাইছিলেন কিছুদিনের মধ্যে অনিবার্য হতে চলা জিম মরিসনদের সাইকেডেলিক-ঝড়ে তছনছ ভাষামুদ্রার প্রায় কিনার ঘেঁষে। এই জায়গায় এসে ইংরেজি গানের সঙ্গে বাংলা গানের সময়রেখা পৃথক মোড় নিয়েছিল।

শচীন-হেমন্তের প্রশ্নই উঠছে না;—ইউরোপের অর্কেস্ট্রেশনকে বাংলায় নতুন ভাষা ও চেহারায় প্রাণবন্ত করে তোলা সলিল চৌধুরী কিংবা সিনেমার গানে পশ্চিমের রস নির্বিচারে আমদানি করলেন যে-পঞ্চমবাপ্পী লাহিড়ী… আসন্ন রকঝড়কে কণ্ঠে গাইতে থাকা এলভিস প্রেসলির সঙ্গে তাঁদের মিলবে না তেমন। তাঁর গানগুলো আদি রকঝড়ের ইতিহাসে এখন হয়তো শ্রোতার কানে ভিন্টেজ শোনায়, ওইসময় তা ছিল না। গানে গুঞ্জরিত স্মৃতিকাতর আবেগটা ভিন্টেজ, কিন্তু গায়কিটা সেখানে ভিন্ন ছিল;—আসন্ন এক ঝড় আসতে যাচ্ছে জেনেই গানগুলো গাইছিলেন এলভিস।

মহীনের ঘোড়াগুলি-র গৌতম চট্টোপাধ্যায়রা সত্তর দশকে ইংরেজি রকগানের সাইকেডেলিক অ্যাপিল বাংলায় নিয়ে আসেন। শ্রোতারা তখনো একে লুফে নেওয়ার জায়গায় ছিল না! পরে এই-যে তারা মোহিত হলো, এর পেছনে কুড়ি বছরের ট্রানজিশন রয়েছে। বিংশ শতকে ৫০-৬০ বছর ধরে চলে আসা বাংলা গানের জলবায়ু মোটের ওপর স্থিতিশীল থেকেছে। পুরোনো সময়ে ডুবে থাকার নস্টালজিয়া, ধীরলয়ে সাধা জীবনতরঙ্গে গ্রামীণ মেঠোসুর ও ভক্তিবাদ থেকে উছলে পড়া রসের আধিক্য বাংলা গানে নিখাদ শহুরে অনুভূতি ধারণের পক্ষে অনুকুল থাকেনি। নব্বই দশকে তা আর বজায় থাকল না! স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বেনোজল এসে সব ভাসিয়ে নিলো! মহীনের গাওয়া গানগুলোর মাহাত্ম্য শ্রোতারা এতদিনে যেন ধরতে পারলেন এবার! সুমন, অঞ্জন, নচিকেতা, প্রতুল ও মৌসুমী ভৌমিক কিংবা আমাদের এখানে বাংলা ব্যান্ড গানের বিকাশের মধ্য দিয়ে যা পূর্ণতা খুঁজে নিলো অবশেষে।

ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ততদিনে নগরজীবন দম আটকে ফেলা যান্ত্রিকতায় মানুষকে গিঁথে ফেলেছে। সুইট টাইম আর সুইট নেই অনেকদিন ধরে। গানের ভাষায় উচ্চনাদ, রক গানের ঘরানায় বাদ্যযন্ত্র ও সুরের বিচিত্র নিরীক্ষা অনিবার্য ছিল। এর সঙ্গে যোগ হলো অতিরিক্ত বস্তুবাদী যাপনের কারণে নিজেকে শূন্য-রিক্ত ভাবার হাহাকার। একটা মরমি মোক্ষণ বা স্পিরিচ্যুয়াল ক্যাথারসিস সুতরাং সেখানকার জীবেনবোধে ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল।

The trailblazer Gautam Chattopadhyay: Mohiner Ghoraguli; Image Source & Credit: Collected; Google Images

এই এতোকিছুর মধ্যে মধ্য সত্তরের দশকে পা রেখে ঈগলস ব্যান্ড ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানটি অবশেষে কম্পোজ করে বাজারে ছাড়লেন। গানটি লিখে ওঠা ও শ্রোতাদের জন্য উন্মুক্ত করার ইতিহাসে আপাতত যাওয়ার প্রয়োজন দেখি না। গুগল করাটা বোধহয় যথেষ্ট এটুকু জানার জন্য। পঞ্চাশ বছরে পা রাখতে চলা গানটি পুনরায় শুনতে বসার অভিজ্ঞতাটা বরং বলে ফেলি আজকে।

গানটি নিয়ে অজস্র কথা বাতাসে উড়ছিল সেইসময়। আজো উড়ছে না, তা বলা যাবে না। সংগীতের অন্যতম মুখপত্র রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রোতা ও বোদ্ধারা গানটার সারার্থ, এর কম্পোজিশন ও গায়কি নিয়ে প্রচুর কথা বলেছেন। সেগুলোকে যদি সারসংক্ষেপ করি তাহলে এটা পাই,—ভোগসুখের পেছনে অবিরাম ছুটতে থাকা আমেরিকান সমাজের স্বপ্ন ও চাওয়া-পাওয়ার হেঁয়ালির অনেকখানি ধরা পড়েছে ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানটায়।

ল্যাবিরিন্থ বা গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাওয়া সমাজকে ধরেছে এই গান। গানে বর্ণিত হোটেলে মধ্যরাতের পার্টি চলছে, নারী-পুরুষে রোমান্স থেমে নেই, পেছনে ফেলে আসা সময়কে স্মরণ করছে অনেকে, আবার বর্তমান সময়কে উপভোগ করতেও তারা মরিয়া! সবই চলছে সেখানে, এবং তার মধ্যে গানটা জাগিয়ে রেখেছে কিছু একটা খোয়া যাওয়ার অনুভূতি! সেইসঙ্গে জেগে থাকছে প্রশ্ন,—হোটেলে যা চলছে এইবেলা, সেগুলো কি সত্যিই চলছে, নাকি সবটাই স্বপ্ন? ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ নামে বাস্তবিক স্থান কি রয়েছে মরুভূমি পেরিয়ে আসা জায়গাটায়? গায়ক কি সত্যি শরিক সেখানে? আজকের মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন-এর মতো ওই সময়ে চাউর আমেরিকান ড্রিম ফ্রেজিংকে এই গান যেন প্রশ্নবিদ্ধ করে যায়।

উপরে সারসংক্ষেপে যা বলেছি, একে এখানে গানটার ব্যাপারে এতদিন ধরে চর্চিত মতামত বলা যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে এরকম কিছু মাথায় নিয়ে কখনো গানটা শোনা হয়নি। একটা সময় পর্যন্ত ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’কে ঈগলস ব্যান্ডের গাওয়া অন্য আরেকটি গান ‘লাভ উইল কিপ আস এলাইভ’-এর মতো বারবার শোনা গানের অতিরিক্ত কিছু মনে হতো না। গানটা কেন শুনছি এর উত্তর নিজের কাছে অজানা ছিল। হতে পারে এর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট ও গায়কি, প্রতিটা পিস যেখানে নিখুঁত সময়জ্ঞান ও ভারসাম্যে একে অন্যকে ধরছে ও ছেড়ে দিচ্ছে, অর্থাৎ, সুরসংগতির নেশায় পড়ে শুনেছি। পরে, মাঝেমধ্যে শুনতে বসে প্রশ্ন মনে জেগেছে,—আচ্ছা, কেন শুনছি এটা? পরিষ্কার উত্তর পাইনি তখন।

ডেভিড লিঞ্চের স্বপ্নগ্রস্ত চেতন-অবচেতনে জিম্মি ছবিগুলোর বেশ কয়েকটা দেখে ফেলেছি ততদিনে। প্রতিটা ছবিতে এমন এক জগৎ দেখাতেন লিঞ্চ, ফ্রয়েডের ড্রিম থিয়োরিকে নিজের মতো গড়েপিটে নিতেন অচেনা ভাষা-পৃথিবী দিয়ে, মনে হতো গোলকধাঁধায় ঘুরছি-তো-ঘুরছিই কেবল! ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানটাকে মাঝখানে কিছুদিন লিঞ্চিয়ান ড্রিম সাইকোলজির আদি প্রতিধ্বনি ভেবেছি মনে-মনে। সে যাহোক, পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আসা গানটি পুনরায় শুনতে বসে দুটো বিষয় চেতনায় ধরা দিচ্ছে। গানটিকে আমেরিকান ড্রিম-এর গোলকধাঁধায় খাবি খাওয়ার প্রতীক বলে যারা নিদান হেঁকেছেন অতীতে, তার পেছনে গানের সঞ্চারী অংশের প্রথম চরণে ব্যবহৃত ‘Tiffany-twisted’ শব্দটির ভূমিকা থাকতেও পারে।

‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানে হোটেলের বিবরণ উত্তমপুরুষে দিয়ে যাচ্ছে গায়ক। হোটেলটি পুরাতন। ভিন্টেজ মেমোরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্জনতায়। হোটেলে কক্ষের অভাব নেই। যে-কোনোসময় চাইলে বুকিং দিতে পারে গ্রাহক। এরকম একটা হোটেলের ডাইনিং হলে নারী-পুরুষ মিলে ওয়াইনের পোয়ালায় চুমুক দিয়ে চলেছে। কোমরে হাত রেখে নাচার সময় হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নগ্রস্ত জগতে! ফেলে আসা সময়কে যদি কারো ফিরে দেখতে ইচ্ছে হয়, হারানো দিনের স্মৃতির আস্বাদ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নিতে চায়,—‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ তাকে জানায় স্বাগতম। গায়কের বিবরণে হোটেলটি আবেদনময় হয়ে ওঠে, বারে বসে সেলারে অনেকদিন রাখা পুরোনো মদ সে পান করতে চায় এক পেয়ালা। বারটেন্ডার বিনয়ের সঙ্গে তাকে বলে,—১৯৬৯ সনের পর থেকে এই মদ তারা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।

১৯৬৯? সংখ্যাটি এম্নি-এম্নি গানের চরণজুড়ে বসেনি। ১৯৬৯ মানে হিপি-বিটনিক আন্দোলন ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ার বছর। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের তুঙ্গ বছর। রকগানের তোড়ে নিজের ভিতরে তীব্র হতে থাকা শূন্যতা থেকে নির্ভার হওয়ার খেয়ালে উডস্টকে লক্ষ-লক্ষ যুবক-যুবতী দলবেঁধে ক্যাম্প ফেলেছিল সংগীত উৎসবে যোগ দিতে। মরমি মোক্ষণ বা স্পিরিচুয়াল ক্যাথারসিসে নিজেকে হালকা করার আশায় তারা গমন করছিল ভারত, জাপান, মৌরিতানিয়া ও মরক্কোয়।

১৯৬৯ হচ্ছে সেই বছর, যবে উডস্টকের পাশাপাশি নিউ ইয়র্কের হার্লেমে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আদায়ে চলছিল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল। জ্যাজ, ব্লুজ, হিপহপ ও রকগানে বিস্ফারিত হচ্ছিল হার্লেমের পার্কে আয়োজিত কন্সার্টটি। লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ শ্রোতার ঢল সেখানেও নেমেছিল, যদিও উডস্টকের মতো প্রচার পায়নি। গণমাধ্যম সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছিল এই ইভেন্ট, যেন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ঘটছে না!—এক ওই উডস্টকে হঠাৎ সমবেত ও ভবঘুরে হতে মরিয়া লক্ষ-লক্ষ শ্বেত তারুণ্য ছাড়া!

দশক ধরে দফায়-দফায় চলতে থাকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিষিয়ে তুলেছিল পরিবেশ। সংগতকারণে ‘Tiffany-twisted’ শব্দটা গানে বসাচ্ছে ঈগলস ব্যান্ডভোগসুখের রমণে মেতে থাকা ও নিজেকে মনেপ্রাণে সুখী ভাবতে চাওয়া মার্কিন সমাজকে শব্দটি বিদ্রুপ করে যায়। গানের লাইনগুলো গুনগুন করা যাক একবার :

Her mind is Tiffany-twisted, she got the Mercedes-Benz, uh
She got a lot of pretty, pretty boys that she calls friends
How they dance in the courtyard, sweet summer sweat
Some dance to remember, some dance to forget

Memorable 1969: Main Woodstock and Black Woodstock (on Harlem) Music Festival; Image Source & Credit: Collected; Google Images

একদিকে ওই ১৯৬৯-টা এলভিস প্রেসলির গানে মর্মরিত সুইট মেমোরিকে বিদায় দিয়ে জিম মরিসনের ‘ডোরস’কে জানাচ্ছে ‘স্বাগত’;—অন্যদিকে মনে রাখা ও ভুলে যাওয়ার মতো নাচের ছন্দগুলো আমেরিকান সোসাইটি লাইফকে প্রহেলিকায় ধোঁয়াটে করে তুলছিল। সুতরাং, Tiffany-twisted শব্দটা এ-গানে চাবির মতো কাজ করে। সত্যি কথা বললে, ফ্রেজিংটা শক্তিশালী হওয়ার কারণে গানটির সংটাইমে চলতে থাকা বাদবাকি অনুষঙ্গ শ্রোতামনে গৌণ হয়ে পড়ে! ফ্রেজিংটা একপাশে সরিয়ে যবে শুনছি এখন,—আমার অনুভূতি-যন্ত্রে দুখানা জিনিস সঞ্চারিত হচ্ছে :

প্রথমত, এই গানটার সঙ্গে পূর্বস্মৃতি বা দেজাভুর সম্পর্ক টের পাচ্ছি অগের চেয়ে তীব্রভাবে। ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ এমন একটা জায়গা, যেখানে আসার পর মনে হতে থাকে,—আগে এখানে এসেছি! হোটেলে এই মুহূর্তে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো আগেও ঘটেছিল অবিকল! দেজাভুর এই অনুভূতি তীব্র করছে গানের শেষচরণ : You can check out any time you like, but you can never leave. মানে, এই হোটেলে তুমি যখন ইচ্ছা ঢুকতে পারো, কিন্তু একবার ঢোকার পর বের হতে পারবে না। বের হওয়ার নিয়ম ও রাস্তা নেই। ভোগসুখের অন্তহীন চংক্রমণে ঘুরে মরা সমাজকে যদি পুনরায় ভাবি,—অর্থটা যেন পরিষ্কার হয় আরো।

তা না-হয় হলো। পেইনটা এখানে-যে,—নিজের গঠন ও অবয়বে হোটেলটি যেসব পূর্বস্মৃতি বা পূর্বজন্মের অনুভূতি সরবরাহ করছে, সেখানে কোনো বাছবিচারের জায়গা নেই। ভালোমন্দ সবটাই হোটেলে ঘূর্ণির মতো ঘটে চলে। এমন এক ফাঁদ এই হোটেল, যেখানে প্রবেশের পর বেরুনোর পথ কেউ খুঁজে পায় না! হোটেলটি হয়ে ওঠে ভূতুড়ে ও রহসময়! জীবন সেখানে স্পন্দিত, কিন্তু তা কি জীবন, নাকি জীবনের মিম?—প্রশ্নের উত্তরটা ঝাপসাই থাকে গানে!

দ্বিতীয়ত, ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানটা প্রতিচরণে ডেভিড লিঞ্চের ছবির-পর-ছবিতে চলতে থাকা স্বপ্ন ও বাস্তবের ঘূর্ণিকে মনে করায়। লিঞ্চের Twin Peaks, Eraserhead, Mulholland Drive, এবং অবশ্যই Lost Highway-এ দেখতে বসলে আমাদের মনে কোনটা বাস্তব আর কোনটা স্বপ্নে ঘটে চলেছে, তার কিনারা করা কঠিন হয়। মহাজটিল বুননে ফ্রয়েডের ড্রিম থিয়োরিতে ব্যক্ত মন যেন মানুষের চেতনমন ঠেলে বেরিয়ে আসে! মানবমনের ভিতরে চাপা ডিজায়ারকে ডেভিড লিঞ্চ আরো ঘোলাটে করেন তাঁর তৈরি সিনেভাষায়;—‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’র প্রতি অঙ্গে এরকম অনুভুতির ঝড় কি আসলেও চলতে থাকে? স্থায়ী অংশের স্তবক যদি গুনগুন করি একবার, গায়ক কাহিনির সূত্রপাত বলে দিচ্ছে সেখানে :

On a dark desert highway, cool wind in my hair
Warm smell of colitas rising up through the air
Up ahead in the distance, I saw a shimmering light
My head grew heavy and my sight grew dim, I had to stop for the night

লিঞ্চের ছবিতেও এরকম অন্ধকার নির্জন সড়কের দেখা মিলবে। ভূতুড়ে আঁধার চিরে ছুটে চলা গাড়ির ধাতব গুঞ্জন স্নায়ুর ওপর তীব্র ছাপ রেখে যায়! মনে রাখা চাই,—মারিজুয়ানা, হ্যাশিস বা গাঁজার জোয়ার চলছে এমন সময়ে বসে গানটা বাঁধছে ঈগলসকাঁপা কাঁপা আলো ভেদ করে বাতাসে গাঁজার গন্ধ ভেসে আসার রেফারেন্স গানে জুড়ছে অবলীলায়। গায়ক, বোঝাই যাচ্ছে নেশা করে বসে আছে ইতোমধ্যে, এবং ঠিক করেছে হোটেলে রাত কাটানোর। সন্দেহ জাগে,—সে কি সত্যি কোনো হেটেল দেখেছে সামনে? অথবা, সবটাই অলীক নেশাতুর মন দেখাচ্ছে তাকে?

টেনশনটা ওই সময়ে স্বাভাবিক ছিল প্রায়। বর্ণনা এখানে ডেভিড লিঞ্চের সাররিয়াল আন্ডারটোনে বাঁধা ছবিগুলোর প্রতিধ্বনি। স্বপ্নগ্রস্ত পরাবাস্তবতা যেখানে বাস্তবতার সীমারেখা হয়ে মৃদু মুদ কাঁপা আলোর মতো ঘোলাটে হতে থাকে। পরের স্তবকে গায়ক হোটেলের ব্যাপারে নিজের ডিক্লারেশন পরিষ্কার বলে দিলো এভাবে : This could be heaven or this could be hell. এবং, গানের এই জায়গায় এসে আবার ওই দেজাভু-বিকার :

Then she lit up a candle, she showed me the way
There were voices down the corridor, I thought I heard them say

মানে, গায়কের বুঝতে বাকি নেই, সে এমন এক গোলকধাঁধায় হয়তো প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে অনেককিছু পূর্বে দেখা ও পরিচিত থাকছে, এবং সেগুলো এখন এই হোটেলে অভিনীত হয়ে চলেছে! টাইমলুপে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি গানে তীব্র হতে থাকবে ক্রমশ। কিছু যেন বদলাবার নয়;—কেবল পুনরাবৃত্তির অন্তহীন নাটিকা এই ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’! যেখানে, শেষ স্তবকের আগের স্তবকটা সোজা কথায় ‘বিস্ফোরক’!

সত্তরের দশক, মনে রাখতেই হচ্ছে, ধনিকবাদে নিমজ্জিত মার্কিন ও বিশ্ব-জীবনধারায় অর্থহীনতার অনুভূতি বড়ো করে তুলেছিল। এটা জায়গা নিচ্ছে মূলত, যখন চার্লি চ্যাপলিন মডার্ন টাইমস ছবিতে হাস্যরসের ছলে তুলে ধরছেন মানুষকে যান্ত্রিক করে তোলার পরিণাম। মার্কসের উদ্বৃত্ত শ্রম যেখানে নতুন ছকে আরো বীভৎস রূপ নিচ্ছিল। টি এস এলিয়ট পোড়োজমিতে শিখররস্পর্শী নিঃসঙ্গতায় মানুষের বিমানবিক হওয়ার বিবরণ রাখছিলেন কবিতায়। যে-মানুষ বেরিয়ে পড়তে চাইছে এমন কোনো ভূমির সন্ধানে, যেটা তাকে এই ভরসা দেবে,—সে এখনো রক্তমাংসে জীবিত সত্তা, কাফকার পতঙ্গ কিংবা কামুর আটউসাইডার নয়। আরো মিলবে তারকোভস্কির সিনেভাষায়। মরমি জীবনবেদে নিজের অবগাহনকে যেখানে মানুষ নিরাময় ভাবছিল। বিটলস থেকে আরম্ভ করে ওই সময়কার রক-বিস্ফারের বৃহৎ অংশে মরমি জীবনবেদ নিয়ে তীব্র রোমান্টিকতা কাজ করেছে।

অন্যদিকে, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার অনেক দেশে এই জীবনবেদ ও ভক্তিরস সংকীর্ণ ধর্মান্ধতায় মানুষকে স্থবির করে রেখেছিল। গরিবি, শোষণ ও দুর্নীতির মচ্ছব, যা আজো চলছে সগৌরব! তথাপি, মনের পশুটাকে মারো আগে, যদি মুক্তি পেতে চাও গোলকাধাঁধা থেকে;—এরকম একটা সংবেদন ঈগলস গানটা লেখার সময় অনেককে দখলে নিয়েছিল। রোমান্টিকতা ছাড়া বড়ো কিছু কি ছিল সেখানে? গানের শেষ স্তবকের আগের স্তবকে গায়ক পারিষ্কার বলেই দিচ্ছে :

Mirrors on the ceiling, the pink champagne on ice
And she said, ‘We are all just prisoners here of our own device’
And in the master’s chambers, they gathered for the feast
They stab it with their steely knives, but they just can’t kill the beast

উপরে বলা কথাগুলো তখনো সত্য ছিল, এখনো সত্য, এবং আগামীতেও সত্যই থাকবে। আমরা নিজে যে-সভ্যতা নামের যন্ত্রটা বানালাম খেটেখুটে, সেখানে নিজেকে কয়েদ করেছি নিজে। আর, এটাও সত্য,—হোটেলের শেফ ধারালো ছুরি দিয়ে মাংস কাটছে, একটু পরে তা রান্না হবে ও পরিবেশিত হবে মদের পেয়ালাসহ। সবাই তা ভক্ষণ করবে মৃদুস্বরে আলাপ ও নাচের মেজাজে। কিন্তু, মনের ভিতরের জন্তুটাকে মারবে কে? ফালি-ফালি করে কে তাকে কুচুকাটা করবে? নিকাশ করবে এমনভাবে, যেন আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিতে না পারে!

প্রশ্নের উত্তর আজো অধরা থেকে গেছে মানুষের! ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ হয়তো এই কারণফেরে পঞ্চাশ বছরে পা রাখার আসন্ন মুহূর্তে ততটাই প্রাণবন্ত,—যেমন তা ছিল পঞ্চাশ বছর আগেকার ওই মধ্য সত্তর দশকের পৃথিবীতে!
. . .

Hotel California (Live 1977) by Eagles; Source: Eagles YTC

. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 8

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *