পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

সুরেন বাইন : শেখ লুৎফর

Reading time 14 minute
5
(11)
Bullfight: Conceptual Artwork-I, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

অনেক অনেক দিন আগের কথা… এইভাবে যদি গল্পটা শুরু করতে পারতাম! কারণ এটা পঞ্চাশ বছর আগের একটা ঘটনা। নাকডরা নামের হাওরের গোপাটে সেদিন বিকালে শশাঙ্করা তিনজন বসে ছিল। পুব দিকে নজাই মণ্ডলের ছোটো ছেলে একটা ষাঁড়কে ঘাস খাওয়াচ্ছে। আকার-প্রকারে প্রাণীটা ছোটোখাটো একটা হাতি। সাদা-কালো চক্কর চক্কর জীবটাকে দেখে শশাঙ্ক বলে অই দ্যাখ…। বাকি তিনজন সেদিকে তাকায়। তাদের ছজোড়া চোখ আটকে যায় ষাঁড়টার থকথকে চর্বিঠাসা শরীরে। অসিত হো হো করে হেসে ওঠে। আমাশার রোগীর মতো পাঙশা চেহারার শশাঙ্ক চোখ নাচিয়ে ঘটনা জানতে চায়। কারণ মনটাই গ্রামের খবরে কান দিতে প্রায় ভুলেই গেছে। দিনের বেশির ভাগ সময় সে থাকে গুরুর কাছে। আর শশাঙ্ক গিয়েছিল উজানে। দিদির বাড়ি। ফিরেছে গতকাল।

অসিত তার কালো গতরটা দুলিয়ে হাসতে হাসতেই বলে—গত বিষুদবারে যে-ষাঁড়টারে টাইগারে হারাইছে, হের নাম কি পড়ছে জানছস?

অবাক শশাঙ্ককে বোবা মানুষের মতো নীরবে মাথা নাড়ে। অসিত হাসতেই থাকে। হাসির গমকে তার ময়লা দাঁতগুলোসহ আলজিভের গোড়াতক বিকালের লাল আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শশাঙ্ক, লেদু, মনটাই অসিতের কুশ্রী দাঁতগুলোর দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে। অসিত হাসির মাঝেই বলে—কোনাবাড়ির মাইন্শে হেরে ‘ল্যাচ্ছর’ নাম দিছে।

অসিতের মুখে ‘ল্যাচ্ছর’ শব্দটার উচ্চারণ ও ভঙ্গি দেখে বাকিরাও এবার সেই বেদম হাসিতে শরিক হয়।

গেল সপ্তাহে দেখা লড়াইয়ের দৃশ্যটা হাসির মাঝেই তাদের সবার চোখে ফের সমান তেজে ভেসে ওঠে। লড়াইটা শুরু হয়েছিল ঠিক দুপুরে। বিশালদেহী দুটো ষাঁড় সামনাসামনি লড়ছে। হাজারে-বিজারে মানুষ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। ষাঁড় দুটোর গতিক দেখে সবাই ভেবেছিল, ধুন্ধুমার সেই যুদ্ধের শেষ আর বেশি দূরে নয়। ততক্ষণে দুর্ধর্ষ জীব দুটোর পেছন দিক দুর্গন্ধ ভরা পাতলা হাগুতে সয়লাব হয়ে গেছে। আছরের অক্ত ধরে ধরে এমন সময় চূড়ান্ত ফয়সালার আগেই একটা ষাঁড় ভেক করে পিছু হটে ছুটতে শুরু করে। আবংটা ছোটো ছোটো মাঠ, শুকনা হাওর, আর দুটো গ্রাম পেরিয়ে সোজা গিয়ে নিজ মালিকের বাড়িতে ওঠে। তাতেই উত্তেজিত জনতার মুখে মুখে তার নাম রটে যায় ‘ল্যাচ্ছর’।

অসিত চোখের কোণাকানায় জমে ওঠা পানি মুছতে-মুছতে বলে—জীবনে এর-চে মজা খুব কম পাইছি।

চারপাশে কম করে হলেও কুড়ি মাইলের মাঝে কোনও শহর নাই। নাই কোনও রেল কিংবা পাকা সড়ক। শুকনার দিনে হাওরবাসী মানুষগুলোর দুখানা পা-ই বরাদ্দ। কম করে হলেও ওরা সাতমাস জলে বন্দি থাকে। ছুরির ফলার মতো ধেয়ে আসা ভেজা বাতাস আর আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া জীবনটা কুল্লে খেতা-বালিশ। পোষ-মাঘ আর বোশেখ মিলে বছরের তিনটা মাস বলতে গেলে কাম-গিরস্তিতে ওরা খেতেই কাটিয়ে দেয়। তা-বাদেও বাকি থাকে আরও দুইমাস। সেই কয়টা দিন তারা বিলের খানাখন্দ সেচে মাছ ধরে, শুঁটকি দেয়, শুঁটকির কড়া ঘ্রাণের সঙ্গে ফালতু গপ্পো আর তাস পেটানো ছাড়া সে-জীবনে কোনও রং নাই।

সত্যিকারের রং আসে ফাগুন-চৈতে;—ষাঁড়ের লড়াইয়ে। তখন তরুণদের তিড়িং-বিড়িং দৌড়ঝাঁপ দেখে বুড়োদের মরচেপড়া রক্তেও যেন টান পড়ে। বাকি থাকলো ঘরের ঝি-বেটি। চ্যাংড়াদের মুখে-মুখে উড়তে থাকা আলাপের ভাঁপে তাওয়ার রুটির মতো তারাও গরম হতে শুরু করে।

এখনও ওরা সেই লড়াইয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে জোশে কথা বলছে। ওদের পেছনে হাওর ঘেরা ছোট্ট একটা গ্রাম। করচ, জাম, জারুল গাছ আর বাঁশঝাড়ের গহিনে জগৎ বিচ্ছিন্ন সেই জনপদ যেন ভয়-তটস্থ কাঠবিড়ালি। তাদের ডাইনে একটা মরা নদী। খরার ধকলে নদীর বুক শুকিয়ে ফাটা বাঙ্গি। কিন্তু বর্ষার শুরুতে যখন উজানের পাহাড় থেকে জলের গোলা ছুটে আসে, তখন দিনরাত সে কামারের হাপরের মতো শোঁ শোঁ গর্জাতে থাকে। সম্ভবত তার থেকেই নদীটার নাম হয়েছে কামারখাল। কামারখালের ডান বাজুতে একটা উঁচু ঢিবির উপর পুরানা দিনের শ্মশান। সামনের কাঠা কয় পতিত জমির পেছনে ঘির-পারে বিশাল বিশাল সব শিমুল, শিলকড়ুই, অর্জুনের সরল সরল দেহকাণ্ডের ভিড়। নিচে জাত-বেজাতের লতাগুল্মে আচ্ছন্ন, যেন কালান্তরের অন্ধকার ও পৌরাণিক গালগপ্পো নিয়ে ছোটোখাটো ওই জংলাটা আজব এক জগৎ বানিয়ে বম ভোলানাথ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বেলা ডুবতে দেখে কেউ কেউ উঠি-উঠি করছিল। তখন লুঙ্গির ফারে গুঁজে রাখা একটা বাঁশি বের করে মনটাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে শুরু করে। এতেই আলাপের মোড় বেকসুর পালটে যায়।

অসিত কুতকুতে ছোটো চোখ দুটো চিকন করে মনটাইয়ের হাতের বাঁশিটা নীরবে দেখছিল। জিনিসটা যেমন ছোটো তেমনই অদ্ভুত। এমন বাঁশি তার বাপের জন্মে দেখেনি। তাই সে চোখ মটকে, কপাল কুঁচকে বাঁশিটার দিকে ইশারা করে।

—এইডা কই পাইলে?

অসিতের প্রশ্ন শুনে মনটাইয়ের কালো মুখটা তার নিজের অজান্তে লাল হয়ে ওঠে। সে মিহি গলায় জবাব দেয়—গুরু দিছে।

—গুরু দিছে!

এইকথা বলে ওরা তিনজনেই অবাক চোখে বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে থাকে! যেন অই আজব বস্তুটার মাঝে তারা মনটাইয়ের গুরু, সুরেন বাইন নামের আজগুবি মানুষটাকে দেখছে!

বাঁশিটা নিয়ে মনটাইয়ের গর্বের শেষ নাই। ফের সে ভয়েও আছে। কেমন পাথরের মতো শীতল আর ওজনদার জিনিসটার দিকে মাঝেমাঝে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। ছবকের শেষ দিন তার বাজন শুনতে-শুনতে গুরু সুরেন বাইন ঝরঝর করে চোখের জল ছাড়ছিল। একসময় মনটাইয়ের বাঁশি থেমে যায়, কিন্তু সুরেন বাইন আগের মতোই নিথর দেহে বসে থাকে। তখনও অন্ধ বাইনের চোখে জলের রেশ। অনেক পরে বৃদ্ধ বাইনের শিথিল অঙ্গসমূহে সাড়া ফিরে। ধীরে ধীরে সে বিছানার শিথানের দিকে যায়। বালিশের পাশে রাখা বিস্তর বাঁশির মাঝ থেকে সবচেয়ে ছোট্ট এই বাঁশিটা নিয়ে মনটাইয়ের হাতে তুলে দেয়। সে তার অবোধ চেতনায় তখন বুঝেছিল,—নীরব সে দান, বহু মূল্যবান আমানতের মতোই অর্থবহ।

মনটাইয়ের দিকে তাকিয়ে শশাঙ্ক মট করে ডাল ভাঙার মতো নীরবতা ভাঙে,—হাচা কইলে কি জানছস, এই অঞ্চলে বাঁশিতে তর লগে টক্কর দেয় তেমুন কেউ আর দ্যাহি না।

গালভাঙা খ্যাংরা চেহারার অসিত শিরাওঠা হাতে হাঁটুতে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে ওঠে,—কতাডা এক্কেবারে খাঁটি।

অসিতের কথায় মনটাইয়ের কালো মুখটা যেন কয়লাচাপা আগুনের মতো ফের এট্টু লাল হয়। সেটা কি তৃপ্তির না বিনয়ের তা ভেবে দেখার আগেই অসিত ‘কিন্তু’ বলে ছোট্ট একটা হেঁচকি মেরে বসে।

বন্ধুর প্রতি মুগ্ধতায় শশাঙ্কের চোখ দুটো তখনও জ্বলজ্বল করছে। নিজের সরল বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতেই যেন সে মোরগার মতো ঘাড় ঝাঁকিয়ে গলা আরও চড়িয়ে দেয়,—এর মাঝে কোনও কিন্তু-টিন্তু নাই।

অসিত মুখটা ছুঁচোর মতো লম্বা করে রায় দেয়,—আছে, অবশ্যি আছে; গুরুর পরীক্ষা শেষ কিন্তু আমগর পরীক্ষাটা তো বাকি রইছে। তাই আমি কই কী, আইজ রাইতে ওই চাতালটায় বাঁশি বাজায়া মনটাই আমাদের কাছে পরীক্ষা দিতে পারে।

শশাঙ্কর মনে হয়, এই মুহূর্তে অসিত ইতরের মতো কথা বলছে চিবিয়ে চিবিয়ে। অসিতের প্রতি রাগে শশাঙ্কর বুক জ্বলতে থাকে। ওর ঈর্ষাকাতর থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার আগেই অন্যমনস্ক মনটাই অসিতের দিকে তাকায়। কটাবর্ণের তরুণ চোখ দুটোতে আত্মবিশ্বাসের ঝিকিমিকি,—কোনহানের কতা কইলে?

—ওই যে।

Magic Flute: Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

অসিত হাত তুলে মরা নদীর পাশে শ্মশানের সামনের পতিত চাতালটা দেখায়। চিকন-চাকন আর শ্যামলা গতরটা ঘুরিয়ে, শ্মশানের পতিত চাতালটার দিকে তাকিয়ে মনটাইয়ের বুকটা ধক্ করে ওঠে। দিনের আলো এখনও মরেনি, তবু জংলাটা ঘন, গভীর রহস্যে ভোম হয়ে আছে, আর সামনের পতিত চাতালটা কেমন ভয়ানক ভাবে শক্ শক্ করছে। অবশ্য শশাঙ্কদের নিরিখে মনটাই যেই-সে বাদক নয়। সে সুরেন বাইনের শিষ্য। বাঁশি বাজায় কালার মতো। অসিত মুখেমুখে তর্ক করে শশাঙ্ককে কাবু করতে, আর মনটাইকে উসকে দিতে। কিন্তু মনের গোপনে তারও বিশ্বাস, এখন মনটাই বাঁশিতে টান দিলে নাগডরার আনাচ-কানাচ থেকে জাত-বেজাতের সব সাপ চেল-চেল করে এই দিকেই ছুটে আসবে।

এ-অঞ্চলের সবাই মানে, সুরেন বাইনের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্তই স্থির না। লোকটা আসলেই মানুষ কি-না সেই বিষয়েই তাদের গুরুতর মতভেদ আছে। আছে বুক-কাঁপানো নানান অভিজ্ঞতা। সত্যমিথ্যা পরের কথা, কিন্তু এলাকার সবচেয়ে বয়স্ক জইফ লোকটিও বলে, তার শিশুকালেও সে সুরেন বাইনকে এমনটিই দেখেছে। আর তার এ-তল্লাটে আসার বছরটাও নাকি বিশেষভাবে চিহ্নিত একটা বছর।

অনেক অনেক দিন আগের কথা;—তখন কার্তিকের শেষেই এ-গ্রামে কলেরা লাগে। ঘরেঘরে মানুষ রোগে পড়ছে আর মরছে। দিনকে দিন লাশের কাফেলা দীর্ঘ হতে শুরু করে। শেষে এমন দশা হয়, মুর্দা কবরে কিংবা শ্মশানে নেওয়ার মতো লোক পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। ঠিক এমন সময় একরাতে কামার খালের তীরে আজব সুরে বেজে ওঠে একটা বাঁশি। রাত ভোর হয় হয়, বাঁশি তবু থামে না। সেই সুর ধীরে বহমান নদীর মতো করুণ আর গভীর!

যারা বেঁচে ছিল তারা ভয়ে সব ফেলে কাঁদতে বসে। কেউ কেউ আবার খিলধরা বুকে ঝিম মেরে বসে থাকে। মনটাইয়ের দাদা ছিল জান-গতর আর সাহসে অসুরের মতো এক মানুষ। বাঁশির সুরে টিকতে না-পেরে লোকটা হড়াৎ করে কপাট খুলে কামার খালের দিকে ছুটতে থাকে। গ্রামের শেষে গোপাটে গিয়ে দেখে, দানব আকৃতির একটা মহিষের পিঠে চড়ে এক বুড়ো বাঁশি বাজাচ্ছে আর তার সামনে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে একটা বুড়ি। বুড়ির বুকভরতি লাল লাল চোখ। গাঁয়ের মুরুব্বিরা এখনও কয়, ওই বুড়িটাই ছিল নাকি ওলা বিবি, আর সেই বুড়োটাই হল আজকের সুরেন বাইন। গ্রামের সকলের বিশ্বাস, সেই দিন ওলা বিবি সুরেন বাইনের কাছে নাকে খত দিয়ে গ্রাম থেকে জন্মের মতো বেরিয়ে গেছে। আর সুরেন বাইন রয়ে গেছিল গোপাটের পাশের জংলায় আস্তনা গেড়ে।

বাইনের আসল নাম কী কেউ জানে না। লোকটা জাতপাতের ধার ধারে না;—মন্দির-মসজিদে যায় না। গা-গতরে শেওলাপড়া শালকাঠের মতো মানুষটা বাঁশি বাজিয়ে লোকের ভোক-তিশ্যা ভোলায়। গ্রামের পাঁচজন সেই তিলিসমাতি দেখেই তার নাম দিয়েছিল সুরেন বাইন।

ভাবমনস্ক মনটাইয়ের নীরবতায় অসিত খোঁচা মারে,—ডরাইয়া গেলে নাকি?

মনটাই ফের গুরুর বাঁশিটির দিকে তাকায়। জিনিসটা দেখলেই তার বুকের তাকদ এক লাফে বেড়ে যায়। অসিতের কথায় তার নরম-ঠাণ্ডা চোখ দুটোতে দুঃসাহস ঝলকে ওঠে,—ডরের কী আছে, মন ঠিক কইরা খাড়াইলে মানুষের সামনে কিছু টিকে?

ডুবুডুবু সূর্যের পরিধি তখনও লাল আর তার জেল্লায় গোটা হাওরের সবুজ পৃথিবীটাও যেন রুজ-লিপিস্টিক মাখা কিশোরীর মতো রঙিন হয়ে উঠছে। সেইদিকে তাকিয়ে মনটাই ভাবে,—গ্রাম থেকে বেশ ফারাকে, বাসক-আকন্দ-শিয়াকুলের ঝোপঘেরা, বড়ো বড়ো বনজ গাছের ছায়ায় সুরেন বাইনের দোচালাটা। প্রায়ান্ধকার ঘরের ভেতরটা কেমন স্তব্ধ, শীতল। ঘরের ভারী বাতাসে জংলি ফুলের মতো একটা হালকা ঘ্রাণের সঙ্গে কাদের ফিসফিসানি যেন সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায়। বেশিক্ষণ বসে থাকলে মনটাইয়ের হাড়ের ভেতর ভয় ও শীতের ফুটকি জমতে থাকে!

মনটাই বাঁশিটা পরম ভক্তিতে কপালে ঠেকায়,—বাজাইলে কী দিবে?

অসিত নয়া জোশে লাফায়,—একশ ট্যাহার একখান আস্তা নোট পাইবে।

মনটাই মনে মনে হাসে। বোকাটা ভুল করছে। তার দীক্ষা-গুরু সুরেন বাইন বলেন,—বাঁশির সুরের বল মন্ত্রের চে সবল। তার অসাধ্য কিছু নাই। সেই শক্তি অর্জনের জন্য চাই সাধনা। যোগসাধনায় সফল হলে পঞ্চভূত বশীভূত হয়। সুরেন বাইন সেই সাধনায় শ্রেষ্ঠী। সে পঞ্চমকার ত্যাগী;—শাকান্নভোজি। সুরের সাধনায় তপস্বী যন্ত্রী।

মনটাই ওঠে দাঁড়ায়,—তাইলে এইডাই কথা রইল। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। আমি যে-শ্মশানেই বাঁশি বাজাইলাম তার সাক্ষী কী? সেই সত্য যাচাইয়ের জন্য তরা এইখানে বইয়া থাকবে আর আমি হেই চাতালে বাঁশি বাজায়াম। সারা রাইত বাজায়াম। বইয়া থাকতে হিম্মতে কুলাইব?

অজানা ভয়ে অসিতের জোশ দপ করে নিভে যায়। আড়চোখে একবার শ্মশানের চাতালটা দেখে। বিজলি-চমকের মতো মনে পড়ে মুরুব্বিদের মুখে শোনা ওই শ্মশানের নানান লোমহর্ষক ঘটনার কথা। তারপরও ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তারুণ্যের অপ্রতিরোধ্য খোমারে, গোঁয়ারের মতো মাথা নাচিয়ে সম্মতি জানায়, একশোবার।

গ্রাম ঘুমিয়ে তখন পৌষের পান্তা ভাত। পঞ্চমীর ক্ষীণাঙ্গী চাঁদটাও মরে মরে। ওরা চারজন হাওরের লম্বা লম্বা ঘাসে কিম্ভূত ছায়া ফেলে মরা কামার খালের পাড়ে এসে চোরের মতো দাঁড়ায়। একটু দূরে শ্মশানের ছোট্ট জংলাটা গম্ভীর অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। সে অন্ধকার বুঝিবা ইহ-সংসারের নয়, যেমন নিথর তেমনই কুটিল। চৈতের হালকা-ধূমল কুয়াশায় চওড়া হাওরটাও গা-মুড়ি দিয়ে আত্মগোপন করেছে। দূরে কোথাও একটা হট্টিটি পাখি চিকন গলায় আজাজিলের মতো ক্ষণে ক্ষণে কাঁদছে। কারা যেন খচমচ করে শ্মশানের চাতালটা মুহূর্তে পেরিয়ে যায়, অস্পষ্ট সেই শব্দে অসিতের মাথার রুয়াতক ফড়ফড় করে খাড়া হয়ে গেল!

শশাঙ্ক মনটাইয়ের একটা হাত খাবলা দিয়ে ধরে,—ল যাইগা।

অসিত উছিলা পেয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিসায়,—হ, ল যাইগ্যা। বাঁশি-টাশি বাজায়া কাম নাই। কেমুন জানি অসম্ভব… অসম্ভব… লাগতাছে।

নিরবয়ব অন্ধকারে মনটাই অস্ফুট হাসে। তার দীক্ষিত হৃদয় পরম ঔদাস্যে বাইনের ঠাণ্ডা ঘরখানার কথা ভাবে। সে ঘরের জংলি ফুলের সুবাসটাও যেন মালুমে আসে। জটিল দীক্ষা গ্রহণের দিনগুলো কি সে কখনও ভুলবে? গুরুর চারপাশে সারাক্ষণ যেন কারা ঘুরঘুর করে। দিনের পর দিন এত কাছে থেকেও সে তার গুরুকে ঠিক যেন চিনে উঠতে পারেনি। সময়-অসময়ে কতদিন হুট করে গিয়ে তার ঘরে উঠেছে, কিন্তু কোনওদিনই বাইনকে অবাক হতে দেখেনি। আলোহীন চোখ দুটো পিটপিট করে একটু মুচকি হাসি দিয়েছে। দীর্ঘ গোঁফদাড়ির জটলায় চাপা পড়া সে হাসি যেন কোনও মানুষের নয়। কোনওদিন তাকে রোগ-শোক-বেদনায় কাতর হতে দেখেনি। মেশিনের মতো চিরদিন একরকম।

মনটাইয়ের মনে পড়ে,—গুরুতর এক বর্ষণের বিকেলে সে গুরুর ঘরে আছকা উঠে পড়েছিল। বাইন তখন বিছানায় চিত হয়ে ঘুমুচ্ছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে যেন তার নাক দিয়ে আগুনের লাল হলকা বেরুচ্ছে। সে কি ভুল কিছু দেখল? মনটাই চোখ কচলে ফের তাকায়। কিন্তু এবার আর আগুন নয়, গুরুর নাক দিয়ে দুটো জ্যান্ত সাপ বেরুচ্ছে। পলক পরেই দেখে সাপ নাই। আজব এক লীলা। মুহূর্তে মুহূর্তে সিফত বদলে যাচ্ছে। কোনওকিছুই সে স্থির করতে পারছে না দেখে ভয়ে হিতাহিত ভুলে দৌড়ে পালিয়ে আসে। পরদিন যেতেই গুরু পিটপিট করে নিঃশব্দে হাসতে থাকেন,—কাইল খুব ডর পাইসছ?

মনটাই ডানে-বামে মাথা নেড়ে না বলতেই তিনি গম্ভীর হয়ে ওঠেন।

মনটাইয়ের নীরবতায় শশাঙ্ক ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে,—ল ফিইরা যাই; আগুনে হাত দ্যায়া কাম নাই।

সে সুরেন বাইনের মতো নিঃশব্দে হাসে, হেলাফেলায় কথা কয়, আইয়া যহন পড়ছি তাইলে আর ফিরতাম না। তগর ইচ্ছা অইলে চইলা যা। আমি আছি।

মনটাই সামনের দিকে পা বাড়ায়। অসিত তার একটা হাত খপ্ করে ধরে ফেলে, যদি সাপে কাটে?

—একটুও না।

কী যেন ভেবে অসিত মনটাইয়ে হাতটা ছেড়ে দেয়।

Suren Bain: Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

একটু পরেই শ্মশানের উঁচু চাতাল থেকে বাঁশির মিঠে বোল আসতে শুরু করে। ওরা তিনজন হাওরের ঘাসে খাড়ু ডুবিয়ে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে মনটাইয়ের বাঁশির সুর চড়ছে। সে সুর যেন হীরের ছুরি, কলিজা বিদ্ধ করে;—আগুনের চোরা তীরের মতো পলে পলে মনের দিলোকোঠায় জ্বালা ধরায়। অব্যক্ত অনুভবের তীব্র দহনে এক সময় ওরা তিনজনের দেহ নেতিয়ে এলে গোপাটে বসে পড়ে।

পিঙ্গলবরণ চাঁদটা পুরো ডুবে যেতেই তাদের চারপাশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে মনটাইয়ের বাঁশির সুর মেতে উঠছে এক ভয়ংকর খেলায়। শ্মশানের গাছ-বৃক্ষ, লতা-পাতা মায় তাদের পায়ের তলার ঘাস-মাটিও যেন সেই সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গাইছে, দুলছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে একসময় ওরা জান নিয়ে গ্রামের দিকে দৌড়ে পালায়।

অসিত, শশাঙ্ক গ্রামের রাস্তায় উঠে থমকে দাঁড়ায়;—সুরেন বাইনের দোচালায় বুঝি আরেকটা বাঁশি বেজে উঠল! সে সুর বড়ো গম্ভীর। বোলের তান-লয় যেন ঝলসে উঠছে তিরস্কার আর আক্ষেপে। কিন্তু এ কী আচান্নক ব্যাপার! বাঁশিটা বুঝি হাওরমুখো উড়তে-উড়তে বাজছে!

সুরে-সুরে বাইন বলছে—বাঁচতে চাইলে থামিছ না বাপ। বাজায়া যা।

ওদিক থেকে বড়ো করুণ সুর ভেসে আসে। মনটাই জানায়, তার চারপাশে কারা যেন গাঁজনের নৃত্য শুরু করেছে। আবার জানায়, আরেকদল তার বাজনা থামিয়ে দিতে গলা চেপে ধরতে চাইছে। দুপক্ষের আলাপ চলছিল বাঁশির সুর-তানে। মনটাই শ্মশানে না যেতে তার গুরুকে মিনতি করে। সে নিশ্চিত, তাহলে দুজনেরই মরণ হবে; কিন্তু বাইন জানায়, এইক্ষেত্রে সে অপারগ। গুরু থাকতে পুত্রতুল্য শিষ্যের জীবন বিপন্ন হবে এটা কেমন কথা! মৃত্যুতেই তো আসল মুক্তি, আর সেই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গুরু তার শিষ্যের মাঝে নবজীবন পায়;—এই সত্য আজও মনটাই জানে না, তবে সে কেমন শিষ্য?

একটু পরেই অসিতরা শুনে দুটি নয়, এখন কেবল একটি বাঁশির সুর ভেসে আসছে। অকল্পনীয় সে সুরসুধা পলেপলে জীবনকে তুচ্ছ করে। পতঙ্গের মতো পুড়ে মরতে সাধ জাগায়। সেই সুরের গভীর মন্ত্রণায় চারপাশের সব জড়-জীব যেন নৃত্য শুরু করেছে।

পুবদিক ফরসা হয়ে যেতেই গোটা গ্রামটা বাসিন্দাদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে। আগ রাতে শ্মশানে মনটাইয়ের বাঁশি বেজে উঠতেই ঘুমন্তরা ভয়ে ঠকঠক করে জেগে উঠেছিল। সেই থেকে ওরা ভোরের অপেক্ষায়। অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে, পুরুষেরা পতঙ্গের মতো ঝাঁকবেঁধে শ্মশানের দিকে ছুটে। আবাল, অবলারা গ্রামের শেষে, গোপাটের মুখে দল বেঁধে দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়ে থাকে।

ওরা গিয়ে দেখে সুরেন বাইন উপুত হয়ে পড়ে আছে। নাকেমুখে থকথকে জমাট রক্ত। পাশেই বাঁশিটা। খোঁজ পড়ে মনটাইয়ের। এত লোকের মাঝে সেই শুধু গরহাজির। আতঙ্ক এবার অন্য মাত্রা পায়। গ্রামখানা তন্নতন্ন করে তালাশ করা হয়। ভয়-তড়াসে সবাই কথা বলছে জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে। এবার পিঁপড়ার লাছির মতো সার বেঁধে মানুষগুলো বাইনের ঘরের দিকে ছোটে।

দরজাটা খোলাই ছিল। দুজন সাহসী মরদ উঁকি দিয়ে দেখে—বাঁশি হাতে মগ্ন মনটাই অন্ধের মতো বাইনের বিছানায় বসে আছে। তার শরীরের হাবভাব, বসার ভঙ্গিটঙ্গি অবিকল সুরেন বাইনের মতো!
. . .

পাঠ-সংযুক্তি : ‘সুরেন বাইন’ শেখ লুৎফর

কবি আহমদ সায়েম সম্পাদিত ছোটকাগজ সূনৃত, নবম সংখ্যা থেকে শেখ লুৎফর-এর ‘সুরেন বাইন’ গল্পটি থার্ড লেন স্পেস-এ সংরক্ষণের কারণ ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে পর্তুগিজ কবি ফার্নান্দো পেসোয়ার ‘বুক অব ডিসকোয়েট’ (The Book of Disquiet)-এ বিরতিহীন স্রোতের মতো বহমান মনোলোগের ছিন্নাংশ মনে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে। কবিআত্মার পাতাল থেকে উঠে আসা এরকম অজস্র ছিন্নাংশে ঠাসা বইয়ের ওই অংশটায় নিজের সঙ্গে আলাপে নিমগ্ন কবি লিখছেন :

আমার লেখা কেউ পড়ে না;—আমি তার পরোয়া করতে যাবো কেন? জীবনকে ভুলে থাকার জন্য আমি লিখি ও সেই লেখা ছাপাই;—এটাই খেলার রীতি এখানকার। কাল যদি লেখাগুলা হারিয়ে যায়,—আমার খারাপ লাগবে, হিংস্র ও উন্মত্ত হওয়ার দুঃখটা বোধহয় ভিতরে টের পাবো। একজন হয়তো আশা করে,—লেখাগুলোর সঙ্গে আমার গোটা জীবন বুঝি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে! আমি,—সেই মায়ের মতো, তার সন্তান আর বেঁচে নেই, কিন্তু কয়েকমাস পর স্বাভাবিক জীবনেই তাকে ফিরতে হয়।

এআই-শাসিত লেখালেখির দাপুটে মওসুমে শেখ লুৎফরের এ-যাবত লেখা গল্প, আখ্যান, গদ্য ও হাবিজাবি অনেককিছু কখনো নিবিড় মনোযোগে ও অধিকাংশ সময় হেলায় পাঠ যাওয়ার দিনগুলো স্মরণ করে এই বোধোদয় হলো,—এমন এক যাপনের মানচিত্র এই লেখক অনবরত কলমে ধরেছেন, যখন তাঁর চোখের সামনে সবকিছু বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। তাঁর লেখা রক্তমাংসে খাঁটি ও আদিম। বছরের-পর-বছর ওটাকে টানা লিখতে থাকায় আমরা পাঠক তাঁকে পড়েও পড়িনি আসলে! চমকে যেতে-যেতে, আচমকা ঘায়েল হতে-হতে, এবং পরক্ষণে প্রাগৈতিহাসিক বিদ্যুৎ শিরদাঁড়ায় আঘাত করছে ভাবতে-ভাবতে ফেরত গেছি চেনা বৃত্তে।

এবং এভাবে, লম্বা সময়জুড়ে শেখ লুৎফর একটা ‘অভ্যাসে’ মোড় নিয়েছিলেন তাঁর পাঠকের কাছে। তাঁকে পড়তে বসা মানে পাঠকমন আগে থেকে বুঝে নিতো,—ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জের অঞ্চলসীমায় যে-জল-মাটিছানা জীবনস্রোত, এর কোনো একটা অংশ লেখক তাঁর সদ্য লেখা গল্প বা আখ্যানে তুলে আনবেন। ল্যান্ডস্কেপটা তবু মনে হতে থাকবে,—দেখেও দেখিনি আগে; শুনেও শুনিনি কোনোদিন; জেনেও জানা হয়নি আজো!

একটা যাপন-মানচিত্র, যার পুরোটা তার সৌন্দর্য ও পাশবতায় আদিম থাকছে, এবং, তার মধ্যে বিশেষভাবে উঠে আসবে অন্ধ লিবিডো-তাড়িত শরীরীভাষা। ভাষাটা সেখানে অঞ্চলসীমায় বন্দি, কিন্তু শেখ লুৎফরের হাত ধরে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণার ছলে মানভাষাকে দুমড়ে দিচ্ছে। শেখ লুৎফর মানভাষায় আজো বয়ান সাজান, যদিও চোরাইস্রোতের টানে ওটা আর মানভাষায় থাকে না,—বিপজ্জনক ডহরে ডুবে নিজের কৌলিন্য হারায়। ভাষাকে এভাবে অসতি করতে পারাটা লেখকের কৃতিত্ব, কেননা এটা পারে অল্পজন। শেখ লুৎফরের এই সক্ষমতা সামনে দুর্লভ হওয়ার সম্ভাবনা রাখছে। ভাষার রূপান্তর তাঁর লেখায় প্রাগৈতিহাসিক বাসনাভরা জীবনস্রোতে গলে যাওয়ার ফলে ওটা তাঁর নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করে, এবং এখন এটা স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ, যা এআই আসার আগেও অতটা অনুভূত হয়নি।

Book Cover, written by Sheikh Lutfor; Collage; @thirdlanespace.com

শেখ লুৎফর ওইসব শব্দ পরপর টানা বুনে গেছেন লেখায়, যেগুলো দেশজুড়ে ব্যাপক নয় সংগতকারণে। শব্দরা সেখানে আঞ্চলিক হওয়ার কারণে অপ্রথাগত ও জৈবিক। এর জরুরত সামনের দিনগুলোয় পাঠক-লেখক টের পেতে থাকবেন শিরদাঁড়ায়। এই লেখক বা তাঁর মতো লেখকরা যেখানে দামি প্রত্নবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা রাখছেন। নিজেকে চেতিয়ে তুলতে ও ছকবাঁধা ভাষায় নিঃস্ব হওয়ার অনুভূতি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য পাঠক খুঁজবে এরকম লিবিডোঘন তড়িতাঘাত;—কথাটা বোধহয় নিশ্চিত করে বলা যায় এখনই।

এমন নয় এখানে বেছে নেওয়া ‘সুরেন বাইন’-এ যে-মিথরঞ্জিত অতিলৌকিকে পাঠক তাৎক্ষণিক জব্দ হলো, এরকম গল্পের কোনো কমতি আছে শেখ লুৎফরের ভাণ্ডারে। কমতি নেই, বরং অতিরিক্ত ছিল ও এখনো আছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি। কাহিনি ভিন্ন, চরিত্ররা ভিন্ন, পটভূমি পৃথক, গল্প বলার ছিরিছাদ এক নয় সম্পূর্ণ, কিন্তু শেখ লুৎফরের অ্যানার্জির শিকড়ে থাকে জলমাটিছানা যাপনকে সম্ভোগের নগ্ন বাসনা। এটাও দামি হতে যাচ্ছে অচিরে।

এতদিন দামি হয়েও দামি ঠেকেনি পাঠকের কাছে; কেননা, শেখ লুৎফরের ধারায় লিখেছেন বা লিখছেন… এরকম কথাকারের সংখ্যা কম নয় বাংলায়। কম নয়, তবে সময়ের পালাবদলে সংখ্যাটা গৌণ হতে থাকবে ক্রমশ। অন্যদিকে, সময় যত গড়াবে,—ওই শেখ লুৎফরের মতো কথাকাররা পাঠকের আগ্রহ ও কৌতূহলের কারণ হবেন। তাঁদের প্রকৃত পাঠকরা আসলে এখনো বেশ দূরবর্তী কালপর্বে ঘুমিয়ে আছে। সময় হলে তারা জেগে উঠবে ঠিকই।

লুৎফর-পাঠকের স্মরণে থাকার কথা, শেখ সাবের তলানী গল্পে বদ্ধ মাতাল গায়ক নিশিরাতে দুর্বোধ্য গানের কলি আওরায়। মাতাল গায়কের গানের কলির রেশ কাজের বুয়া রহিমার দেহে তরঙ্গ খেলে। মাতালের সঙ্গে তার পরিচয় নেই, কিন্তু অবোধ্য গানের কলি রহিমাকে বায়বীয় জৈববাসনায় উতলা রাখে। কাহিনিটানে বায়বীয় বাসনা মাতাল গায়ককে রহিমায় অভিন্ন হতে বাধ্যও করে। গায়ক ক্রমাগত তার দেহের গভীর চোরাগর্তে জায়গা নিতে থাকায় রহিমার বঞ্চিত নারীজন্ম পূর্ণতা পায় এভাবে।

মাতাল গায়কের কাহিনি পাঠ করার ক্ষণে শেখ লুৎফরের পাঠক অজান্তে বাঁশিআল সুরেন বাইনকে স্মরণ করে। তার মনে হতে থাকে, রহিমার দেহে মধ্যরাতের মাতাল গায়কের চতুর অনুপ্রবেশের সঙ্গে ছোকরা মন্টাইয়ের দেহে সুরেন বাইনের অনুপ্রবিষ্ট হওয়ার ঘটনার মধ্যে তফাতটা বেশি নয়। দুটি গল্পের পটভূমি ভিন্ন, কিন্তু গন্তব্য অভিন্ন। বদলে যাওয়া বস্তুজগৎ ছাপিয়ে একটা বাস্তবতাকে তালাশ করেন শেখ লুৎফর। যুগপ্রভাবে তা নিখোঁজ মনে হলেও লেখকের দেহকোষে বাস্তবতার পরিসরটি আজো সজাগ।

Author’s recognition; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

অতীত দিয়ে বর্তমানের বিনাশ ঘটানোর এমন কাণ্ড শেখ লুৎফরের লেখায় সহজাত। তাঁর শহুরে বেশভূষায় ঢাকা দেহের মধ্যে বিলবাওর-পাখপাখালি-সাপখোপ এন্তার উড়ে বেড়ায়। বট-পাঁকুড় ও জলাজংলা হতে ধান-পাট-সরিষাখেতে গলেমিশে একাকার গল্পের চরিত্ররা দরিদ্র। ভরপেট খেতে না পারার ক্ষোভটা তাদের ওই প্যাঁকাটি দেহকোষে সচল জৈববাসনা দিয়ে রিফু করেন লুৎফর। লোকগুলো দুবেলা ভরপেট খেতে পায় না, এর মানে এটা নয়,—তারা পর্যদুস্ত। মোড়ল-জোতদার-মোল্লা-পুরুত ঠাসা দুনিয়া মেয়েছেলের গতর ছিঁড়ে খাচ্ছে, নিজেকে তবু তারা পরাভূত ভাবে না। বঞ্ছনার ক্ষতিপূরণ দেহ দিয়েই মিটায়। অভুক্ত দেহে বলসঞ্চারের জন্য সভ্যসমাজে নিন্দিত রিপুবাসনাকে হাতিয়ার করে তারা। পড়তে যেয়ে মনে হবে লেখক নিজের ফ্যান্টাসি চাপাচ্ছেন চরিত্রদের ওপর! হতে পারে, তবে শেখ লুৎফরের কাছে ওটাই প্রতিরোধের আসল আয়ুধ।

পেছনে ফেরত যাওয়া মানে উন্নয়নকে লেখক প্রত্যাখ্যান করছেন, তা নয়। তবে একথাও সত্য,—তাঁর বয়ানবিশ্বের ধাত উন্নয়নের রাজনীতিকে গ্রহণের বার্তা দেয় না। গ্রাম-শহরের মিলনস্থলে চোখ রাখার ক্ষণে তাঁর বুক ভেঙে আসে দুঃখে। অপ্রাকৃত আদিম আঞ্চলিক সীমায় বসে লেখেন তিনি, এর রূপান্তর তাঁর কাছে অচেনা ভাষার সমতুল! তাঁর গল্পের চরিত্ররা আগের মতোই মন্তু, সজল, চানু, গঙ্গারাম, মালেক অথবা অহাকালু নামে ঘুরছে চারধারে… কিন্তু তারা কি সেই লোক,—যাদের দেখলে কলিজায় আপাদশির জৈবপ্রকৃতির কটু গন্ধ নাকে ধক করে ঢুকবে? এই প্রশ্নটা শেখ লুৎফরের মধ্যে সময়ের সঙ্গে তীব্র হতে দেখা যায়।

দূর অতীতেও লোকগুলা গোলামখাটা ও পরিত্যক্তদের কাতারে শামিল থেকেছে, কিন্তু তাদের দেহকে পরিত্যক্ত মনে হয়নি। অদ্য তারা ভরপেট খেতে-পরতে পাওয়ার বিনিময়ে গতরকে বিক্রিই-তো করছে মিল-কারখানায়! দাসত্বের ফেরে পতিত মানুষগুলোকে যে-কারণে তব্দাখাওয়া ঠেকে লেখকের কাছে। শেখ লুৎফরকে হয়তো এ-কারণে পেছনে ফিরতে হয়েছে বা হচ্ছে বারবার! গোলামখাটার বন্দোবস্ত পেছনেও বর্তমানের মতো বজায় থাকছে,—তবে দেহটা জৈবপ্রকৃতির গুণে মুক্ত ছিল বলে দেখাচ্ছেন লেখক। ‘সুরেন বাইন’ হলো এরকম এক পুনর্জাগরণের প্রতীক, বর্তমানের আগ্রাসন ঠেকাতে যাকে তিনি পুনরায় জন্ম দিচ্ছেন

শেখ লুৎফরের লেখক-জীবনে সক্রিয় রিপুবাসনা মাঝেমধ্যে জগদীশ গুপ্তকে মনে করিয়ে যায়, তবে খেয়াল রাখা ভালো,—তাঁর গল্প-আখ্যানে রিপুতাড়নাটা কেবল চোদনবাসনায় নিঃস্ব নয়। প্রান্তিক বলে দাগিয়ে দেওয়া আদমসুরতের ভরপেট খেতে পারা ও না-পারা, শাড়ি-তহবন পিন্ধতে পারা ও না পারা, শখ মিটাতে পারা ও না-পারার ক্ষোভ থেকে শুরু করে যত প্রাচীর তোলা হয়েছে ইতোমধ্যে, চোদনের খেলাটা সেখানে ছিদ্র খুঁজে পায়, এবং রিপুবিক্রম নিয়ে ঢুকে পড়ে কিছুর পরোয়া না করে। শেখ লুৎফরের রিপুতাড়না সুতরাং হয়ে দাঁড়ায় প্রতিশোধের স্মারক।

সোজা কথায়, শেখ লুৎফরের পাঠকরা তাঁর প্রতি অনুরাগ ও তাঁর বিরুদ্ধে অনুযোগসহ হারিয়ে যাওয়া সময়বিশ্বে স্থবির। ওটা কখনো ছিল না বা এখনো নেই এমন নয়, কিন্তু লুৎফর যেভাবে দেখান,—পাঠকের জন্য একে মিলানো কঠিন। শেখ লুৎফর সবটা জেনেও গাঢ় অবচেতনে নিজেকে প্রাগৈতিহাসিক ভাবতেই ভালোবাসেন। এটাই তাঁর লেখার শক্তি;—দাঁড়ানোর শক্তি বললেও ভুল হয় না।

এআই-শাসিত নতুন যুগবিশ্বে এটার মূল্য বা অনুভূতি অনেকের কাছে আপাতত গৌণ মনে হবে, কিন্তু সামনে দিন আসছে,—আদিম জৈবশক্তিটাকে মানুষ মনে-মনে খুঁজবে। ‘সুরেন বাইন’-এর মতো কাহিনি সেখানে তাকে এই অনুভূতি দিয়ে যাবে,—কোনো একদিন মানুষ এভাবেও গল্প লিখত!

—আহমদ মিনহাজ

. . .

লেখক পরিচয় : শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফরের জন্ম মধ্য ষাটের দশকে। ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের সঙ্গে নিবিড় এই লেখক টানা কয়েক দশক ধরে সিলেটি জলবায়ুকে নিজের করে নিয়েছেন। বাল্য ও উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। হাওরবেষ্টিত সুনমাগঞ্জের সুনামধন্য বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান ও সেখানে নিবাস। কথাসাহিত্যে চার দশক ধরে সক্রিয়। গল্প, উপন্যাস, আত্ম-জৈবনিক ছাড়াও নানামুখী গদ্য ও সাক্ষাৎকারে রেখেছেন স্বকীয়তার ছাপ।

বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর লেখ-বুনন গ্রাম ও শাহরিক পরিসরকে নজরে নিলেও, মূলত তাঁর জমিজিরেতের সবটাই গ্রামীণ যাপনে নিজেকে জড়িয়ে রাখার মধ্য দিয়ে উঠে আসে। অভিজ্ঞতা বিপুল, এবং তা জন্মমাটি গফরগাঁও থেকে সিলেটের হাওরবেষ্টিত মানচিত্রেও ছড়ানো। নিজেকে গফরগাঁওয়ের ছেলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। মেধাবী কন্যাসন্তানের জনক শেখ লুৎফরের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘আত্মজীবনের দিবারাত্রি’, ‘কালোমাটির নিশ্বাস’, ‘রাজকুমারী’ ও আপাত সর্বশেষ ‘চন্দ্রাবতীর পুত্রগণ’।

গল্প বয়নে নিপুণ লেখকের প্রথম গল্পবই ‘উল্টারথ’ প্রকাশের পরপরই পাঠকের সমাদর কুড়ায়। তারপর একে-একে বেরিয়েছে ‘ভাতবউ’, ‘অসুখ ও টিকনের ঘরগেরস্তি’, ‘ফলের নামটি ভুবন নটী’। ছোটদের জন্যও লিখেছেন মনকাড়া কিশোর-আখ্যান ‘সূতিয়া নদীর বাঁকে’, ‘সোমা ভূতের কাণ্ড’ ও ‘ক্লাশ অভ ভূত’। প্রয়াত বাউলসাধক মকদ্দস আলম উদাসীর সঙ্গে ছিল নিবিড় সখ্য। ভালোবাসেন বাউলসঙ্গ, যা তাঁর জীবনবোধকে নতুন করে গড়েছে বলে মানেন। এহসান হায়দারের সঙ্গে আলাপে শেখ লুৎফর বলছেন :

আমি মরমিবাদী মানুষ, বাউল চেতনা আমার রক্তে। গত বিশ-বাইশ বছর ধরে সাধুসঙ্গ যাপনের ফলে আমার ব্যক্তি-মানসে ব্যাপক বদল ঘটেছে। সোনার অঙ্গ পুড়ে হয়েছে ছাই। হাওরের পাশে, ছায়াঢাকা বিশাল কোয়ার্টারের রুমে রুমে শান্তিময়-সুন্দর নিঃসঙ্গ বেঁচে থাকা, প্রতিটি মুহূর্তকে নিজের চেতনা দিয়ে চিহ্নিত করা।

‘আজ আমি নিজের জীবন ও কর্মকে অন্যের সাথে তুলনা করি না। বিনয়ের সঙ্গে বলছি, আমি সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি গালভরা শব্দ দ্বারা নিজেকে চিহ্নিত করি না। আমি নিরুপায় হয়ে লিখি এবং শুধু নিজেকে লিখি।

বাউলদের সঙ্গে আলাপ নিয়ে লিখেছেন একাধিক গদ্য। ছোটকাগজ ও অনলাইন সাহিত্যপত্রে নিয়মিত লিখছেন, এবং সক্রিয় আছেন পরবর্তী গল্প-আখ্যানের মুসাবিদায়।

. . .

শেখ লুৎফর : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *