
এক অকেলা ইস শহর মে
রাত মে আউর দো পহর মে
আবদানা ঢুন্ডতা হ্যায়
আশিয়ানা ঢুন্ডতা হ্যায়।।
ভূপিন্দর সিংহ (Bhupinder Singh) চলে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন আমাদের সদ্যপাওয়া যৌবন, আমাদের রুখুশুখু তরুণ বয়স। আমাদের না আঁচড়ানো, না খোঁপা করা খোলা চুল, বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে বিকেল কাটানো, না পাওয়া ছেলেবন্ধুদের জন্য দীর্ঘশ্বাস, যারা তখনো বিএফ অভিধাপ্রাপ্ত না।
ভূপিন্দর নিয়ে গেলেন আমাদের পরীক্ষার আগের সন্ধের শোনা পাশের বাড়ির রেডিও চোঁয়ানো বিবিধ ভারতীর গানের কানের ভেতর দিয়ে মরমে ঢুকে আটকে যাওয়া! পরদিন পরীক্ষার হলেও পিছু-না-ছাড়া সুরের মায়াজাল! আমাদের চাকরি না পাওয়ার হতাশা। কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসার বুক-দুরদুর। এমনকি, প্রথম চাকরি পাবার পরের সেই ঊর্ধশ্বাস দিনকালের ভেতরে ভেতরে অতীত কুঁড়েমির দীর্ঘশ্বাসও। ঘুম ভেঙে আড়মোড়ার (আংরাইয়া তখন প্রথম শিখলাম) সকাল, গ্রীষ্মরাতের মতো আলস্য, হেমন্তের ‘বিমল-কর’ মিঠে রোদ্দুর, শীতের কুয়াশার মতো ভাসা ভাসা ছায়া ছায়া প্রেম। দিল ঢুন্ডতা হ্যায় ফির ওহি ফুরসত কে রাতদিন… যে-গান বহুদিন আমার বা আমার মতো আরো অনেকের রিংটোনে ছিল সেট করা অথবা কলারটিউনে লাগানো… যারা কর্মব্যস্ততা আর আলস্যের মধ্যে গসাগু লসাগু কষতে কষতে একটা নির্ভার যৌবন হারিয়ে ভারী কর্মজীবনের তলায় গিয়ে পড়েছিলাম। যারা আজ পঞ্চাশোর্ধ এবং স্মৃতিকাতর।
রেকর্ড করা গানগুলো রয়ে গেল কিন্তু আসলে সত্তর আশির দশকটা যারা ইশকুলের উঁচু ক্লাসে বা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাপন করেছিল, তাদের সবার অস্তিত্বের একটা বড় পর্ব যেন ভূপিন্দরের অশীতিপর এই অন্তর্ধানের পর সবটাই মিলিয়ে গেল শূন্যে। তবে, ইদানীং বারেবারেই এই আমাদের প্রজন্মটির গুরুদশা আসছে… সংস্কৃতির যেসব আইকন, সেসব চিহ্ন প্রতিটি অপসৃত হচ্ছেন দফায় দফায়। একে একে নিভিছে দেউটি।
ভূপিন্দর সিং চলে গেলেন। রেখে গেলেন ক্যাসেটে গান শোনা এক প্রজন্মের স্মৃতিকথা। ফিতে জড়িয়ে যেত সে-সময়ে ক্যাসেটের। পেন্সিল দিয়ে টাইট দিতে হতো ক্যাসেটগুলোর বাদামিরঙা পাতলা টেপ। বুশ বা ফিলিপ্স ক্যাসেট প্লেয়ারের শোক উথলে উঠছে আমাদের। আমাদের মনে পড়ছে পায়েপায়ে খুচরো পাথরের কুচির মতো ছড়িয়ে যাওয়া অসমাপ্ত প্রেমেদের। প্রান্তিক সম্পর্ক, না বলা বাণী, অযৌন চোখে চোখ রাখার আশ্লেষদের। মনে পড়ছে আমাদের প্রজন্মের নাসিরুদ্দিন শাহ পাগলামি, দীপ্তি নাভাল দীর্ঘশ্বাস ও স্মিতা পাতিল অবসেশন। ছলবলি রত্না পাঠকের কথা মনে পড়ছে অথবা চুলবুলি জারিনা ওয়াহাব। মনে পড়ছে অধুনালুপ্ত পূর্ণ সিনেমা বা প্রিয়া-উজ্জ্বলা সিনেমা। উজ্জ্বলার চানাচুর মনে পড়ছে, রাস্তার রোল কর্নার মনে পড়ছে। মনে পড়ছে অমল পালেকর। বিষণ্ণ বেগানা দেবদাস। একা একা মুম্বই শহরের পথেঘাটে ঘুরে বেড়ানো বেকার যুবক অথবা সামান্য চাকরির কেরানি। প্রেমে হতাশ। জীবনে ক্ষতবিক্ষত। লড়াকু অথবা অসহায়। গুরু শার্ট বা বেলবটম প্যান্ট। উশকো- খুশকো চুল, কোটরে বসা চোখ, বিষণ্ণ হাঁটাচলা। তীব্র সংক্ষোভে ঝুঁকে আসা পিঠ :
এক অকেলা ইস শহর মে
রাত মে আউর দো পহর মে
আবদানা ঢুন্ডতা হ্যায়
আশিয়ানা ঢুন্ডতা হ্যায়।।
সেই বুঁদ করে দেওয়া ভরাট কন্ঠ। ঈষৎ আনুনাসিক্যভরা। দানাদার সুরেলা কন্ঠ ভূপিন্দরের। অন্যরকম গানের রাজা। ছটি কি আটটি গান এমনভাবে আমাদের মনকে অধিগ্রহণ করেছিল, যা অন্য যে-কোনো গায়কের অজস্র গানের পাশে ভাস্বর। প্রতিটি গান একেক অনুষঙ্গ বয়ে আনে। প্রতিটি গান মধ্যবিত্ত শিক্ষিত এক ভীরু, আলস্যময়, খুব ডিকেডেন্ট তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল যেন। তাই, সুরকার আর গীতিকারদের দুরন্ত মেলবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে এই অতুলনীয় কন্ঠটিও প্রবলভাবে আমার প্রজন্মকে অধিগ্রহণ করেছিল সত্তরের শেষ থেকে আশির দশক চুঁইয়ে নব্বই অব্দি। মেসবাড়িতে প্রাইভেসিহীন প্রেম, সত্তরের উত্তাল সময়ের ছিন্নভিন্ন নানা অভিঘাতের মতো আছড়ে পড়া সময়ের পদশব্দ যেন। আমাদের প্রজন্মের তরুণদের জন্য অসম্ভব আবেদনময়। একাকিত্বের প্রজন্মে, বন্ধুদের কাছে টানা আর দূরে ঠেলার প্রজন্মে, ভূপিন্দর এক সাঙ্গীতিক ঈশ্বর যেন।
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের বিষাদে নাসিরের ঝুঁকে আসা পিঠ। রুখুদাড়ির নাসির। করোগে ইয়াদ তো হর বাত ইয়াদ আয়েগি/ গুজরতে ওয়াক্ত কে হর লমহে ঠহর যায়েগি। যে-গানের শেষে আসে অমোঘ সেই স্তবকে, গলির মোড়ে একলা দরজাকে দুটি অপেক্ষারত চোখের সঙ্গে তুলনা করা। তৃষিত চোখের মতো কারুর জন্য উতলা হয়ে থাকা একটি খোলা দরজার অনুষঙ্গ এসে হানা দিলো আমার সদ্য গজানো কবিজীবনেও। আমার কবিতাতেও ছাপ পড়ল তার। যেমন আমাদের অনেকের যৌথ স্মৃতির ভেতরে ঢুকে গেল নাম গুম জায়েগা অথবা বিতি না বিতায়ে রয়না। জিন্দেগি মেরে ঘর আনা। কভি কিসি কো মোকম্মল জগা নেহি মিলতার একটা লাইন খঁচ করে ঢুকে গেল বুকের ভেতরে… বৃষ্টিভেজা দিনের ভিজে সোঁদা গন্ধের মতো মিলিয়ে রইল আমার সত্তাতেও… জিসে ভি দেখিয়ে উয়ো আপনে আপ মে গুম হ্যায়, জুবাঁ মিলি তো হাম জুবাঁ নেহি মিলতা।
যাকে দেখো সে নিজেই নিজের ভেতরে মূক হয়ে আছে/ কথা যদি বা পাই, কথা বলার লোক কোথায়?
বিলুপ্ত শিল্পের মতো এইসব গান। কেননা এইসব ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতি আসলে মূল্যহীন আজ। গণবিচ্ছিন্ন এইসব পরিশীলনের একটা আবহমানতা নব্বই দশকের উদারীকরণের পর অর্থহীন গালগল্পের মতোই। সবক্ষেত্রে যেমন ঘোর পরিবর্তন ঘটে গেল, এই গানের ক্ষেত্রেও। ভূপিন্দরের অন্য অনেক টান আমাদের কাছে। তাঁর বাঙালি গিন্নি মিতালী তাঁকে আমাদের আরো আপন করেছিল। গিটারিস্ট ভূপিন্দর আকাশবাণীতে কাজের সূত্রে মদনমোহনের চোখে পড়েছিলেন। তারপর এক বিরল জার্নি তাঁর।

আমরা যারা হিন্দি বুঝতাম না তারাও হিন্দি শিখছিলাম নয়ের দশকের শুরুতে, শিমলার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সেইসব দিনে… এই বাঙালিনীর মনে মিলেমিশে গেল ভূপিন্দরের গান আর পাহাড়ের গায়ে চরতে থাকা গাভীর মতো সাদা মেঘের দল… মিশে গেল পাখিদের উচ্চনাদী টিট্টি রব আর বেদনারঙিন অসহ্যতা। রেখে গেল এক সারাজীবনের ভূপিন্দর প্রীতি।
এই সময়টাই হিন্দিতে একটা ঘরানার আধুনিক গানের জোয়ার আসছে, আসছে গজলের আলাদা এক শ্রোতাবর্গ। তখনো আসেনি উদার অর্থনীতি। কিন্তু আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্মের দুটো পরিষ্কার বিভেদ রয়েছে। রয়েছে আলাদা শ্রোতাবর্গ। এলিট বুর্জোয়া শ্রোতাদের জন্য আলাদা প্রডাক্ট হিসেবে এইসব গান উঠে এসেছিল। অনন্য মদনমোহন, অনন্য রাহুল দেব বর্মনের হাতে। লিরিক্স-এ গুলজারের অমোঘ পদচারণা শুরু :
তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো
ক্যা গম হ্যায় যো ছুপা রহে হো?
ভাস্বর অবিনশ্বর হয়ে এসেছেন জগজিৎ সিং আমাদের সদ্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনো জীবনে। এরই ভেতরে শিমলায় গিয়ে পেলাম পাকিস্তানি গজল। আমাদের পাঞ্জাবি/শিখ বন্ধু ইন্দর দীপ ধাড়িওয়াল বাংলা ক্যাসেটের গান শুনে একদিন বলল, আচ্ছা তোমাদের গানগুলো কেমন কবিতা আবৃত্তির মতো শুনতে। তোমরা আবিদা পারভিন শুনেছ? আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। তারপর সুফি সিন্ধি গায়িকা আবিদা পারভিনের মোটা হাস্কি জোরালো গলার গানগুলোতে ভেসে যেতে লাগলাম। পাশাপাশি ফরিদা খানুমের আজ জানে কি জিদ না করো। শুনতে শুনতে উত্তর প্রদেশের হাতে হাত রাখে তামিলনাড়ু, চোখের জল বাঁধ মানে না গুজরাতের, মেঘালয়বালকের দিকে তাকিয়ে। যাদের কোনোদিন কক্ষনো বিয়ে করার কথা নয়, মতলবও নেই, সম্ভবও নয়, তারাও প্রেমে পড়ে গেল! এমনই গান।
শিমলায় ট্রেনিং চলছে, সেই সময়েই আমরা আবিষ্কার করছি শচীন কর্তা থেকে সলিল চৌধুরী, পরে রাহুল দেব বর্মণের দোভাষী সুর আছে অনেক। বাংলা আর হিন্দি দুটোতেই বিখ্যাত সুরের গান গেয়ে আর শুনে একদল বাঙালি ছেলেপিলে হঠাৎ অবাঙালি বন্ধুদের মধ্যে বেজায় গাইয়ে হয়ে উঠল। সে শচীন কর্তার ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’ আর কিশোরের ‘ফুলো কি রঙ সে দিল কে কলম সে’ দুটোই এপিঠ ওপিঠে গেয়ে হোক, বা লতা মঙ্গেশকরের ‘সুন রে পবন পুরবৈয়া’ হোক। যার সুরের বাংলাটি হলো শচীন কর্তার অমর ‘কে যাস রে ভাটি গাং বাইয়া’। বলাই বাহুল্য শচীন কর্তার বাংলা গানগুলোই আমার বেশি প্রিয়।
কিন্তু ১৯৯২ পরবর্তী দু-তিন বছরের জীবন অনেক অনেককিছু পালটে দিয়েছিল, তার ভেতরে অনেকটা বদল কিন্তু এই নবলব্ধ হিন্দি গান শুনবার অভ্যাস। নিজেকে অনিশ্চিতির দিকে ঠেলে দিতে গিয়ে আসলে আমি ঠেলে দিয়েছিলাম ভালো ভালো হিন্দি আর উর্দু গানের দিকে, যে-গানগুলো, এর আগে, কথা বুঝতাম না বলেই হয়তো সম্পূর্ণ অধরা ছিল আমার কাছে। শিমলার সেই পাহাড়ি প্যানোরামিক দিগবলয়, শীতল প্রাচীন পাথুরে জিন্না সায়েবের বাংলো, আর সুপর্ণার মতো সুরেলাকন্ঠী, বাঙালি বান্ধবীর পাশাপাশি উর্দু জানা গীতালি তারে, কাশ্মিরী রূপসী কীর্তি তিওয়ারি, সব্বাই মিলে পুরু কার্পেটে পা ডুবিয়ে কালো কালো সোফায় বসে ছুটির দুপুরে ক্যাসেটে শুনছি হিন্দি ছবির গান, গজল… আর একটু একটু করে একটা জগৎ খুলে যাচ্ছে।
হিন্দি গানে শচীন কর্তার সুরারোপ একেবারে আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড, অতুলনীয়, কিন্তু তবু, প্রথম শোনা বলেই বোধহয়, মূল বাংলা গানটার দরদে, মেঠো বা ভাটিয়ালি টানে দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে অকাতরে। যখন বলে :
প্রাণ কান্দে, কান্দে
প্রাণ কান্দে কান্দে প্রাণ কান্দে রে, প্রাণ কান্দে
নয়ন ঝরে ঝরে নয়ন ঝরে রে, নয়ন ঝরে।
পোড়া মনরে বুঝাইলে বুঝে না
কান্দে কান্দে প্রাণ কান্দে।
অথবা যখন বলে, ভাই ‘না আসিলে স্বপনতে দেখা দিত বইল্যা’। জীবনের সবচেয়ে বড়ো সত্যটাই পেয়ে যাই মনে হয়, যে-কোনো লোকগানের ভেতরে যেমন। যদি বাস্তব হাত না ধরে, তাহলে তো ধরবই স্বপ্নের হাত। হিন্দিতে, আনন্দ বকশির লিরিকে ‘ম্যঁয় হু অকেলি অলবেলি’ বাক্যবন্ধটির তো তুলনাই নেই কোনো! যে-বয়সে শুনেছি তখন তো তাইই ছিলাম, একা এবং কিছুটা খাপছাড়া।
মনে পড়ে যায়, এই সময়েই ডাবরের দুটো ফ্লেভারের হাজমোলা লজেন্স বাজারে এসেছে। সহকর্মী কীর্তি আর আমি প্রথম রেলওয়ে বোর্ড বিল্ডিংয়ের সামনের ছোট চায়ের দোকান থেকে লজেন্স কিনে খেয়েছিলাম (ওই দোকানে পান লজেন্স পাওয়া যেত, সেও দিব্য, ভেতরে পান-সুপারি সব থাকত, কোনো এক লোকাল কোম্পানির)… আর কীর্তি বলেছিল, দেখ দেখ নামদুটো কী ভাল দিয়েছে! চুলবুলি ইমলি আর আলবেলা আম!
শিমলাতে আমরা প্রায়শই ডিনার পার্টিতে সিনিয়র অফিসারদের পরিবেশন করতাম গান। মাল্টি লিংগুয়াল গানের স্কিট বানিয়ে নামানো হতো। আমার ভূমিকা প্রায়শই হতো জোগাড়ের। আইডিয়া এলো, বিখ্যাত হিন্দি গানগুলোর মুখড়া গেয়ে তারপর বাংলা গান গাওয়া হতো প্রায়শ।

এই চাকরিসূত্রেই আমার হচ্ছে এক বৃহৎ ভারত দর্শন। হচ্ছে আগ্রা যাওয়া, যোধপুর জয়পুর জয়সলমির যাওয়া। পথপাশের গাইয়ে-বাজিয়ের কেশরিয়া বালমা শোনার কান গজাচ্ছে আস্তে আস্তে। গানের জগৎ ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমার অবশ্য কৈশোরকাল থেকেই আরেক প্রিয় গান ও লাল মেরি। সেটি তথাকথিত রাজস্থানি লোকগান নয়। কিন্তু অবশ্যই বৃহত্তর অর্থে ওই অঞ্চলের গান। সিন্ধি গান নামেই আমরা প্রথম শুনি। সেটাও স্কুল জীবনে শোনা। ও লাল মোরি… দমাদম মস্ত কলন্দর… গানটি প্রথম শোনা রুনা লায়লার গলায়। পরে অসংখ্য শিল্পীর গলায়। আবিদা পারভিন, নুসরাত ফতেহ আলি খান, কিন্তু আপাতত প্রথম শোনার গল্পটাই বলি।
দমাদম শব্দটার মজায় কিনা জানি না, তখনো ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে ঘোরে না লোকে। তবু গানটি কেমন ছড়িয়ে পড়েছিল মুখ থেকে মুখে। মুম্বই (তখন বম্বে, রোশনাইয়ের বম্বে) গিয়েছিলাম গরমের ছুটিতে। টিভিতে গানটি শুনেছিলাম। আমাদের কলকাতার তখন টিভির শৈশব দশা। কিন্তু বম্বের টিভি রীতিমত এগোনো। আমার মামাতো দিদি মহুয়াদি ক্লাসিক্যাল শেখে। আর দিদি না শিখেও দেশি-বিদেশি গান তোলে আর গায়। খুব ভালো গায় লোকসংগীত। সেই দিদিরা মিলে রুনা লায়লার গানটি তুলে ফেলল। কথা তো অর্ধেক না বুঝেই ছোট সরু মতো ডায়েরিতে উঠে গেল। বাংলা হরফে। সিন্ধ প্রদেশের বিখ্যাত সুফি গান। সে-গানের ভেতর দিয়ে কথা বলে রেশম পথের আত্মা। যে-রেশম পথে বাঁধা থাকত উটের সারি, সার্থবাহ পশুর পিঠে রঙিন পশরা। সঙ্গে গান। তার বাদ্য, তাল বাদ্য, গলার তানে নানা ধর্ম সংস্কৃতি যেখানে মিলেমিশে একাকার।
রাজস্থান গিয়ে এরপর সেলিম খানের রাজস্থানি গান শুনব তারাভরা রাতে, জয়সলমিরে। আর, আপিসের কাজেই অডিটর ট্রেনিং করতে চার মাসের জন্য ওয়াশিং টন ডিসি গেলাম ২০০২ সালে। সেখানেই আলাপ হল বাংলাদেশের অডিটর সাহেব বাসেত খানের সংগে। তিনি একদিন কম্পিউটারের সামনে বসে কাঁদছেন। কাছে গিয়ে দেখি কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ শুনছেন… আর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। বাসেত আমার প্রাণের বন্ধু হয়ে যান সেইদিন থেকেই। ওই ভরাট বিদেশে আমরা বাংলায় কথা বলতে পারছি। আমরা একইসঙ্গে কাফেতে গিয়ে বিদেশি খাবারের মধ্যে খুঁজে নিচ্ছি ভাত বা মাছের পদ। আমরা দুঃখ করছি দিনের পর দিন স্যান্ডুউইচ খেয়ে থাকার কষ্ট নিয়ে!
একদিন আমরা চলে যাচ্ছি স্মিথসোনিয়ান পাড়ায় ‘দ্য সিল্ক রুট ফেস্টিভ্যাল’ দেখতে। গ্রীষ্মের দুপুরে। সে-মেলায় চীন জাপান উজবেকিস্তান ভারত পাকিস্তান সবাই ছিল। সেখানে প্রতি গ্রীষ্মে স্মিথসোনিয়ান পাড়ায় হরেক মেলা বসে। চারিদিকে দুনিয়াজোড়া নামের বড়ো মিউজিয়ামগুলো। প্রতিটাই বাঘা। আর মাঝের সবুজ ঘাসে ছোট ছোট রঙচঙে শিবির। থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সাজানো। স্টলে স্টলে তরমুজ, আনারসের স্লাইস। আইসক্রিম কুলফি। আর ছবি। জিনিসের পশরা। গানবাজনা। পারস্য গালিচা থেকে চীনের রেশম। বেশিরভাগ পসরাধারী কালো বা রঙিন চামড়ার। আর দর্শক সাদা চামড়ার। অনেক অনেক দেশের লোক মিলেমিশে। ভারত থেকে এসে ওপেন এয়ারে রাজস্থানি গ্রুপ গান পরিবেশন করছেন। সেইসব তারের বাজনা আছে। সেইসব পারকাশান। মোরচাং, কামাইচা, রাবণহাত্তা… আর হাত উপরে-নিচে নেড়েনেড়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে খঞ্জনি বাজানো (বাজনাটার অন্য নাম থাকলে জানাবেন কেউ)।
দু-বছরের মেয়েকে ছেড়ে গিয়ে আর রোজ স্যুপের প্যাকেট খেয়ে এমনিই হোমসিক। ভারতীয়দের দল গান গাইছে দেখে কী-যে তুমুল আত্মীয়তা বোধ এসে গেল। কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। জুলাইয়ের জোর ওয়াশিংটন-রোদ্দুরে নিজের পেন্টুলুন-টপের সঙ্গে পরা স্কার্ফটা মাথায় মুড়ে নিয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ দেখি একেবারে কোণের দিক থেকে এক রাজস্থানি শিল্পী, আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। গান শেষ করে, হাত তুলে নমস্কার করলেন। আমিও, অন্যসব সাদা চামড়াদের হাততালির মধ্যে, নিজের ভারতীয়ত্ব জাহির করতেই, নমস্কার করলাম!
পরে খেয়াল করলাম ওই ভিড়ে দর্শকদের মধ্যে একমাত্র আমিই পরেছিলাম জয়পুরি প্রিন্টের টপ, আর বাঁধনির পাতলা সুতির চুন্নি। ঠিক এই কালার কম্বিনেশনের, যেটা ওদের পাগড়িতে। গা শিরশির করে উঠল। দেশে থাকলে আমরা অনেক দূরত্বের। এই প্রান্ত, আর ও-ই প্রান্ত। কিন্তু বিদেশের মাটিতে, একটাই পরিচয়। কালো চামড়া। এশিয়। ভারতীয়।
পুব পশ্চিম কোনো ব্যাপার? বলা যায় না, ওঁদের কেউ বাংলাদেশে তৈরি বানিয়ান পরেছিলেন কিনা। জানলে বাসেত খানকে বলতাম। তবে আমরা সবাই আবার মেড ইন ইন্ডিয়া পরা লোক! আর সব পরিচয় মুছে আদতে ভারতীয়। আর বিদেশের মাটিতে একজন ভারতীয়কে দেখলে আমার ঠিক যে আনন্দ, ওঁদেরও তো সেই আনন্দ!
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ আগের পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংক চাপুন …
নানারকম গানের স্মৃতি ভুবনজোড়া প্রাণের স্মৃতি-২ : যশোধরা রায়চৌধুরী
নানারকম গানের স্মৃতি ভুবনজোড়া প্রাণের স্মৃতি-১ : যশোধরা রায়চৌধুরী
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ : একটি গানের পঞ্চাশ বছর
‘লঞ্চ চলে ধীরে ধীরে’ : একটি গানের বয়স
নূর-ই পাক ‘আনাহিতা’ ও নির্মল জল ‘সরস্বতী’
গানের সীমারেখা : “কাতিবিম” ও নজরুল
লেডি গাগা : “দ্য মাদার মনস্টার”
. . .
লেখক পরিচয় : যশোধরা রায়চৌধুরী : ওপরের ছবি অথবা লিংক চাপুন
. . .

যশোধরা রায়চৌধুরী : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম
যশোধরা রায়চৌধুরী-র রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন




