নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : পাখির গানে ‘মানুষ’

Reading time 17 minute
5
(22)
@thirdlanespace.com

. . .

পাখির গান

পাখির কণ্ঠে যে-প্রাকৃতিক সুরের নিবিড়তা ধ্বনিত হয়, তা মানুষের ভাষা ও ব্যাকরণের সীমা অতিক্রম করে আমাদের এক আদিম অনুভবের জগতে পৌঁছে দেয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসের বহু আগেই পাখিরা গেয়ে এসেছে নিজেদের অস্তিত্বের গান। এই গান কোনও স্থূল শব্দের প্রকাশ নয়; কোনও অর্থবাহী বাক্যবিন্যাসের কাঠামোতেও আবদ্ধ নয়। বরং তা প্রাণের গভীর থেকে উৎসারিত এক মৌলিক ধ্বনি। সময়ের হিসাব-নিকাশ যার ওপর কোনও বাঁধন আরোপ করতে পারে না। তবু সেই ধ্বনি অনবরত প্রবাহিত হয়ে মুক্তির এক স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা রচনা করে। সেই অনাবিল সুরের মধ্যেই প্রকৃতি ও জীবনের এক অনাদি, অথচ চিরনবীন সত্য নিহিত রয়েছে।

পাখি গায়—শোনানোর জন্য নয়, বলার জন্যও নয়; গায় তার স্বভাবের অনিবার্যতায়। তার গানের ভিতরে কোনও আবেদন নেই, কোনও অনুরোধ নেই, এমনকি শ্রোতার প্রত্যাশাও নেই। কে শুনছে, কেউ আদৌ শুনছে কি না—সে তা জানে না; তবু তার কণ্ঠ থামে না। এই গান বাহবা চায় না, কোনও স্বীকৃতিও দাবি করে না। এই একান্ত নিজস্বতায় পাখি (প্রকৃতির) সত্যিকারের গায়ক। সে কোনও মঞ্চের শিল্পী নয়, কোনও অভিনয়ের অংশও নয়। সৃষ্টি যেমন নিঃশব্দে নিজেকে প্রকাশ করে, তেমনই সৃষ্টির অনিবার্য ছন্দে অনুপ্রাণিত হয়েই তার গানের জন্ম।

মানুষের কণ্ঠ প্রায়শই ভাষা খোঁজে, অর্থ খোঁজে, নিজের অস্তিত্বের প্রভাব ছড়িয়ে দিতে চায়। কথা বলার মধ্যেও সে শ্রোতা খোঁজে, বোঝাপড়ার নিশ্চয়তা চায়, কখনও ক্ষমতা, কখনও স্বীকৃতি কামনা করে। কিন্তু পাখির কণ্ঠ এসবের কোনওটিই খোঁজে না। তার গান কোনও লক্ষ্যপূরণের হাতিয়ার নয়, কোনও ফলের প্রত্যাশাও বহন করে না। সে কেবল উৎসারিত হয়, যেমন বাতাস বয়, যেমন নদী বয়ে চলে। এই অনাবিল উৎসারণেই পাখির গানের সৌন্দর্য, এবং সেই সৌন্দর্যেই প্রকৃতির নির্লোভ সত্য নিজেকে প্রকাশ করে।

সকালে, দুপুরে কংক্রিটের দেয়ালে কিংবা কোনও অজানা ডালে বসে সে গায় আর মানুষকে বোঝাতে চায়, পৃথিবী একসময় গান দিয়ে ভরা ছিল। আর মানুষ যখন তার হৃদয়ে শোক, প্রেম, বিদ্রোহ অথবা নিঃসঙ্গতা অনুভব করে, তখনও কোনও এক অলক্ষ্যে সে একটি পাখির গলায় আশ্রয় খোঁজে।

আমরা যে-গানে ডুবে থাকি, যে-সুরে কান্না চেপে রাখি, সেই সুরের প্রথম প্রতিধ্বনি হয়তো জেগে উঠেছিল কোনও এক অরণ্যের নিভৃত নীড়ে। মানুষের গান, কবির ছন্দ, সংগীতশিল্পীর সুরের বহু আগেই ছিল এক ক্ষুদ্র গায়ক, তার নাম পাখি। আর, এই পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা যায়, কিন্তু তার গানকে নয়। পাখির গলা যেন প্রকৃতির আত্মার মৃদু কণ্ঠস্বর, যা শুনতে শুনতে মানুষ নিজেকে আবার নতুন করে চিনতে পারে। কারণ মানুষ একসময় গাইত, নিঃশব্দে। তারপর ভাষা পেল, উচ্চারণ করতে শিখে গেল, এবং ক্রমে ক্রমে সেই নিঃশব্দ গান ভুলে গেল। পাখি সেই বিস্মৃত গানটাই রোজ রোজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়। আমরা যারা এখনও কানে দেয়াল তুলি না, তারা জানি পাখির গলা মানে শুধু ধ্বনি নয়, বরং স্মৃতি, মুক্তি, এবং এক গভীর জীবিত থাকা।

পাখির গান আর তার উড়ে যাওয়ার শব্দের ভিতরে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব লুকিয়ে থাকে। একদিকে সে ডালে বসে স্থির থাকে, থেমে থাকার এক শান্ত ভঙ্গি ধারণ করে, যেন মুহূর্তটিকে আঁকড়ে ধরেছে। আবার পরমুহূর্তেই ডানা ঝাপটে সে উড়ে যায় অচেনা দূরত্বের দিকে, দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে। এই দ্বন্দ্ব মানুষের মধ্যেও আছে। মানুষের মনও চায় থেকে যেতে, পরিচিত আশ্রয়ে নিজেকে বাঁধতে, আবার একই সঙ্গে চলে যাওয়ার এক গভীর বাসনা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। বন্দিত্বের মাঝে সে দেখে মুক্তির স্বপ্ন, স্থিরতার মধ্যে খোঁজে গতি।

কিন্তু আজকের মানুষের নগরজীবনে পাখির ওড়াউড়ি আর চোখে পড়ে না, তার গানও আর শোনা যায় না। নগরের আকাশ ভরে থাকে যান্ত্রিক কোলাহলে। মানুষ শোনে হর্নের শব্দ, ইঞ্জিনের গর্জন, বিজ্ঞাপনের কৃত্রিম কণ্ঠ কিংবা নিজেরই জমে ওঠা বিষণ্ন চিৎকার। শহরের শব্দদূষণে পাখির গান হারিয়ে গেছে। তার সুর এখন এক অনুপস্থিতির ছায়ায় স্মৃতির মধ্যে বেঁচে থাকে। যে-শিশু একসময় ভোরের আলোয় পাখির গান শুনে স্কুলে যেত, আজ যন্ত্রের চ্যাঁচামেচিতে তার ঘুম ভাঙে। ধীরে ধীরে তার মনে গেঁথে যায় এই ধারণা, পৃথিবীতে আর কোনও স্বাভাবিক গান নেই, সব সুরই বুঝি কৃত্রিম। তবু কোনও কোনও সকালে হঠাৎ করে জানালার ধারে একটি পাখি এসে দাঁড়ায়। কখনও ছাদের কোণায়, কখনও বিদ্যুতের তারে, কখনও-বা বাতাবিলেবুর পাতার ফাঁকে। সেই উপস্থিতি তখন হয়ে ওঠে এক চিরায়ত কণ্ঠস্বরের প্রত্যাবর্তন।

এই সময়ের মানুষ যখন গভীর বিষণ্নতায় ডুবে থাকে, নিজের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে সংবেদনশূন্য হয়ে ওঠে, তখন পাখির গান তাকে হয়তো সরাসরি জাগিয়ে তুলতে পারে না। তবু সেই গান তার ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সে অনুভব করে, এই সুর কোনও যন্ত্রের তৈরি নয়, কোনও প্রোগ্রামের নিয়ন্ত্রিত ফলও নয়। এটি এক জীবন্ত প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ। পাখি গায় না কাউকে শোনানোর জন্য; গায়, কারণ গানই তার স্বভাব। মানুষের কানে কখনও সেই গান আনন্দের, কখনও বেদনার, কখনও আবার এক অজ্ঞাত শূন্যতার প্রতিধ্বনি হয়ে ধরা দেয়। এই অনিশ্চিত অনুভবের গভীরতাই মানুষের অবচেতনকে নীরবে স্পর্শ করে, তাকে নিজের অন্তর্জগতের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

পাখির কণ্ঠ আমাদের জন্য নয়; তা তার নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর। তবু মানুষ সেই সুরের মধ্যে নিজের নীরব কান্না, নিজের অপ্রকাশিত বেদনা ও আকাঙ্ক্ষার অনুরণন শুনে নেয়। পাখি কোনও ব্যাখ্যা দেয় না, কোনও বার্তাও বহন করে না। সে শুধু গেয়ে যায়।

পাখির গান আসলে কোনও কণ্ঠনালি থেকে উঠে আসে না, তা যেন আত্মার গভীর থেকে উৎসারিত। মানুষের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে এখানেই তার ফারাক। মানুষের কণ্ঠ অনেক সময় কণ্ঠনালির সীমায় আবদ্ধ থাকে, কখনও রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়, কখনও প্রচারমাধ্যমের ভাষা হয়ে ওঠে, আবার বহু ক্ষেত্রে নীরবতাকেই বেছে নেয়। অথচ পাখির গান এইসব হিসাবের বাইরে। তাতে কোনও কৌশল নেই, কোনও গোপন অভিপ্রায় নেই। তাতে কেবল অস্তিত্বের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, যা নিঃশব্দে মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া সংবেদনশীলতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

হ্যাঁ, পাখি যখন গায়, সে নিজের জন্যই গায়। তার গান ঋতুর পরিবর্তন, সঙ্গীর আহ্বান কিংবা অস্তিত্বের স্বাভাবিক ছন্দ থেকে উৎসারিত হয়। মানুষের কানে সেই সুর কখনও প্রেমের, কখনও বিরহের, কখনও আবার এক অজ্ঞাত বিষণ্নতার প্রতিধ্বনি হয়ে ধরা দেয়। সেখানে অন্যকে শোনানোর বাসনা নেই, প্রভাব বিস্তারের অভিপ্রায়ও নেই। মানুষের কথা বলা এর ঠিক বিপরীত। মানুষ অনেক সময় নিজের জন্যও কথা বলে না। তার শব্দ খুব কম ক্ষেত্রেই নির্ভেজাল থাকে। ব্যাখ্যার ভারে তা ভারী হয়ে ওঠে, মুখোশে ঢাকা পড়ে যায়, কখনও ক্ষমতার অলংকারে পরিণত হয়। অথচ পাখির সুরে কোনও কৌশলের হিসাব নেই, কোনও অভিনয় নেই, কোনও মাইক বা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলার সতর্কতাও নেই। সে ভাষার অনুবাদ করে না; সে অনুবাদ করে প্রাণের অনুভব।

মানুষ ভাষা পেয়েছে; এটি তার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তিগুলোর একটি। সেই ভাষা দিয়েই সে কবিতা লিখেছে, গান রচনা করেছে, ভালোবাসা প্রকাশ করেছে। আবার সেই ভাষাকেই অনেক সময় বিভাজন, প্ররোচনা ও আধিপত্যের অস্ত্রেও পরিণত করেছে। ফলে শব্দের প্রাচুর্য সবসময় অনুভূতির গভীরতা নিশ্চিত করে না। অনেকসময় শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে অর্থের কাছাকাছি নয়, বরং অনুভূতির দারিদ্র্যের দিকেই ঠেলে দেয়।

পাখির গানে বিরহ থাকে, তবু সেই বিরহ শান্ত, সংযত, প্রকৃতির ছন্দে মিশে থাকা। মানুষের কণ্ঠেও প্রেম থাকে; কিন্তু সেই প্রেম অনেক সময় ব্যথা, অধিকার কিংবা বিচ্ছেদের ভাষায় উচ্চারিত হয়। পাখির গান ঋতুর সঙ্গে বদলায়, আলো-অন্ধকারের সঙ্গে তার স্বরও যেন নতুন রূপ পায়। মানুষের ভাষা পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে, তবু অনেক সময় নিজেই নিজের নির্মিত কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়ে। পাখির গান মাটি, জল আর বাতাসের সঙ্গে একাত্ম। মানুষ বহু সময় নিজের সেই আদিম ভাষাটিই ভুলে যায়।

মানুষের গানও আজ যন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। স্বয়ংক্রিয় সুর-সংশোধন, ছন্দের যান্ত্রিক বিন্যাস, পর্দানির্ভর আবেগ অনেক সময় গানের স্বাভাবিকতাকে আড়াল করে দেয়। তখন গলার চেয়ে যন্ত্র বেশি শোনা যায়, অনুভবের চেয়ে কৌশল বেশি চোখে পড়ে। অথচ পাখি কোনও নিখুঁত মানদণ্ড মেনে গায় না; তার গানের স্বাভাবিকতাই তাকে সত্য করে তোলে। তার বিচ্যুতিও প্রকৃতির অংশ, তাই সেটিই তার স্বকীয়তা। তার গান কোনও প্রতিষ্ঠিত নিয়মের অনুসারী নয়; বরং জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দেরই প্রকাশ। তবু মানুষ আজও পাখির গান শোনে। শোনে, কারণ সেখানে এমন-এক মুক্তির আভাস আছে, যা মানুষের নিজের কণ্ঠে সবসময় ধরা পড়ে না। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, মানুষ কি আবার কোনওদিন নিজের ভিতরের সেই পাখিটিকে খুঁজে পাবে? নাকি সে চিরকালই বাইরের আকাশে অন্যের গানের মধ্যে নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বর খুঁজে বেড়াবে?

Chhoto Pakhi by Shohojia; Source: Shohojia Official YTC

. . .

আপনি হয়তো সৌভাগ্যবান বাবুল ভাই, এখনো পাখির গান শুনতে পান! ভোরে ঘুম ভাঙে পাখির সম্মিলিত কলতানে। আমিও এদিক থেকে কিছুটা ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে। চা বাগানের কিনার ঘেঁষে থাকি, ভোরে পাখির কূজন নিয়মিত না-হলেও মাঝেমধ্যে তাই কানে আসে। বিশেষ করে কোকিলের মনপাগল চতুর কুহকিস্বর এখনো শুনি নিত্য। পাখির কূজন ও বিচিত্র রংয়ের পাখি পনেরো-কুড়ি বছর আগেও বেশ হৃষ্টপুষ্ট ছিল। এর মধ্যেই হ্রাস পেয়েছে দ্রুত! শহরে এক সময়কার পরিচিত পাখিরাও এখন আর চট করে চোখে পড়ে না!

যেমন ধরেন, কাক আপনার ওদিকটায় কেমন দেখতে পান জানি না, শহরে আগের মতো নেই। গাছের ডালে, বাড়ির ছাদ অথবা ইলেট্রিক তারে কাকের ঝাঁক আপনি দেখবেন না তেমন! কাকের ডাক অনেকের কাছে মধুর নয়। ইনফ্যাক্ট, কোকিল কিংবা আরো-আরো গায়ক পাখিদের সঙ্গে তুলনা করলে তার ডাকে মধু ঝরে না। বুদ্ধিমান ও উপকারী পাখিটি তারপরেও শহর-জীবনের পরিচিত অংশ ছিল সেদিনও। কাক দেখতে আপনাকে এখন বেগ পেতে হবে ভাই। না শুনতে পাবেন তার কংস্যবিনন্দিত গলার স্বর। আমার প্রিয় পাখিদের একটা হচ্ছে কাক! তার সঙ্গে বেড়ে উঠেছি শহরে। তো সেই পরিচিত ‘কাক’ দেখতে পাই না আগের মতো চারিধারে!

করোনার আগে থেকে শহরে কাকের জনসংখ্যা কমছে মনে হচ্ছিল। ঝাঁক বেঁধে উড়তে, শোর মাচানো ও আবর্জনা সাফ করতে দেখতাম না তেমন। আশপাশের ডাস্টবিনে কাক কি চোখে পড়ে আগের মতো? আমি তো দেখি না একটাও;—একমাত্র নেড়ি কুকুর ছাড়া! আমার অফিসের ছাদে অবশ্য চিলকে উঠানামা করতে দেখি প্রতিদিন। এখনো টিকে আছে ঈগলের ছোটভাই রাজসিক শিকারি পাখি। কিন্তু কাক কোথায়? কোকিল আছে, তা বসন্ত থেকে হাই সামার আসার আগে অবধি তার মধুর চতুর সুরে বুঝিয়ে দেয়,—কিন্তু সে কেমন করে আছে কাককে ছাড়া? কাকের বাসায় ডিম না পড়লে তার-যে বাচ্চা ফোটে না! খোদা মালুম!

কারো মনে এ-নিয়ে প্রশ্ন নেই! যেন, কাক নামে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না কোনোদিন। অথবা বইপত্র, সিনেমা আর গানে কাক দেখে তারা ভাবছেন,—প্রকৃতির ঝাড়ুদার, টেড হিউজের ‘কাক’ আছেন বহাল তবিয়তে। না ভাই। গুগল করেন এক মিনিট। তথ্য মাথা আউলা করবে মুহূর্তে। বাংলাদেশের নাগরিক জঙ্গলে কাকের সংখ্যা ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গাছপালা সাবাড় হওয়া, খাদ্যে কাকের হজমশক্তির প্রতিকূল রসায়নিক ও বায়ু দূষণ ইত্যাদি তার বিপন্ন হওয়ার মূল কারণ। চিল মনে হয় অভিযোজনের কারণে টিকে আছে। কোকিল নিজে বাসাটাসা বানিয়ে ডিম পাড়ছে কিনা কে জানে! আমি কেবল দেখি,—ছেলেবেলার বন্ধুরা মিসিং। কাক, বাবুই, চড়ুই, দোয়েল, শালিক… একটাও নেই!

চড়ুই পাখি মোবাইল টাওয়ারের কারণে বিপন্ন। টাওয়ার থেকে আসা তরঙ্গ তার বধিরতার গণ্য কারণ। চড়ুই গার্হস্থ্য পাখির মতো অনেকটা। মানুষের বাসার কার্নিশে খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধত। আপনি এখন আর ওটা অহরহ দেখতে পাবেন না। প্রজাতিটি ইতোমধ্যে ‘বিপন্ন’ তালিকায় উঠে গেছে।

পাখি থেকে পরিচিত কীট-পতঙ্গের বড়ো অংশ শহর, এমনকি গ্রামে সহজলভ্য নয়। ঝিঁঁঝিঁ পোকা নিয়ে গ্রুপে ও সাইটে কিছুদিন আগে লিখেছিলাম। খবর রাখেন কি-না জানি না,—ঝিঁঝি-গুঞ্জন আর সুলভ নয় অতটা! যে-মৌমাছি পরাগায়নের প্রধান উৎস, বিশ্বব্যাপী তার জনসংখ্যা মোবাইল ও এআই প্রযুক্তির কারণে নির্গত ম্যাগনেটিক ওয়েভের মাশুল গুনতে বসে বিপদগ্রস্ত। ওটা মৌমাছির উড়ানকে দিকভ্রান্ত করে ও অকালে মারা যায়। ইনাম আল হকের পর্যবেক্ষণ বলছে,—বাংলাদেশের পেঁয়াজচাষীরা অনেকটা বাধ্য হয়ে হাতে হাতে পেঁয়াজের পরাগায়ন করছেন মৌমাছির অভাবে।

পরাগায়নের বড়ো উৎস প্রজাপতিও বিপন্ন। সিলেট ও চট্টগ্রামে যেসব প্রজাতির ছড়াছড়ি ছিল, গত এক দশকে তা বিলুপ্ত অথবা বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা জানায়,—৩৮৮টি প্রজাতির মধ্য ১৮৮টি মহাবিপন্ন। আমি নিজেও লক্ষ করেছি,—দু-একটা জাত ছাড়া প্রজাপতি আগের মতো দেখা যায় না উড়তে। উড়বে কী করে, যেসব ফুল আমরা যে-পদ্ধতিতে চাষ করছি, তার সঙ্গে লাইটের ব্যবহার মিলে প্রজাপিতকে জন্ম দিবে-যে শুয়োপোকা, তারা মারা পড়ছে কাতারে কাতার!

পাখির মধ্যে কোকিল এখনো আছে, তবে দোয়েল, ধানশালিক, ফিঙে, ঘুঘু কিন্তু আগের মতো চোখে পড়ে না সহজে। ছেলেবেলায় বেশুমার দেখেছি, এখন আঁতিপাতি করে খুঁজলেও দেখা মেলা ভার! ময়না হয়তো গভীর জঙ্গলে পাবেন, টিয়া এবং কাকাতুয়াও,—তবে এগুলোও বিলোপ হলো বলে। পাখির দোকানে যেসব রকমারি টিয়া দেখবেন, তার সিংহভাগ ভিনদেশি।

শকুন তো অনেকদিন হয়ে গেল নিখোঁজ পুরো বঙ্গে। বাংলা শকুনের স্মৃতি একাত্তরের প্রজন্ম দেখেছেন। সংখ্যায় প্রচুর ছিল তখনো। আমাদের ছেলেবেলায় শকুনের দলকে টিলার ফোঁকড়ে ফেলে রাখা মৃত গোরু ভক্ষণ করতে দেখেছি নিজচোখে। রাজা শকুন না আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করত। সে আসার পর শুরু হতো ভক্ষণ। সফা হতে সময় লাগত না বেশি। পরিচ্ছন্ন ও চেটেপুটে সাবাড় হতো মৃত পশু। শকুনের বিলুপ্তির কারণ আবার ওই গবাদি। ড্রাইক্লোফেনাক গোরুকে খাওয়ানোর মাশুল দিচ্ছে শকুন। ওটার রসায়নিক প্রভাবে প্রকৃতির এই আশ্চর্য সৃষ্টি মরে সাফ দুনিয়া থেকে!

মানুষের বীভৎসরস তৈরির ক্ষমতা অতি ভয়ানক! অ্যা রিয়েল বিস্ট ইন দ্যা প্ল্যানেট। সে আবার নিজেকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব নামে সার্টিফিকেট দিয়ে বসে আছে! জোকস অব দ্য সেঞ্চুরি ছাড়া আর কী বলা যায় একে! আপনার কাব্য করাটা কাজেই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে না! মানুষের এতো এতো অবিশ্বাস্য অর্জনের বিপরীতে এতো-এতো গায়েব, বিলোপ, সাবাড়ের খতিয়ান যদি কেউ মিলাতে বসে, তার হয়তো এটা মনে হবে তাৎক্ষণিক,—এসব অর্জনের তুলনায় ‘ক্ষতির’ পাল্লাটা অনেক অনেক ভারী!

মানুষকে যদি তারপরেও ধরায় থাকতে হয়, টিকতে হয়, বাঁচতে হয়, করে খেতে হয়, যা খোয়া গেছে তাকে ফেরত আনার উপায় মনে হচ্ছে ভাবতে হবে জোরেশোরে এখন থেকে। যা খোয়া যাচ্ছে সামনে, তা ঠেকানো জরুরি সেখানে। সম্ভব কিনা জানি না। যদি না হয়, মাটির নিচে দুনিয়া বানিয়ে গর্তজীবী হওয়ার নিয়তি অনিবার্য হবে তার জন্য। অ্যা ডিস্টোপিয়ান হররকে স্বাভাবিক মেনে যাপন করতে হবে প্রাগৈতিহাসিক জীবন।

প্রকৃতি কি মুছে যাবে? না, যাবে না। নিজের মতো পুনরায় গড়বে নিজেকে। জেমস লাভলক তো বলে গেছেন সেকথা। তাঁর বইয়ে পড়েছি মনে পড়ছে,—একটা পারমাণবিক যুদ্ধ যদি হয় সামনে, এর ক্ষত কাটিয়ে প্রকৃতির পুনরায় সুজলা-সুফলা হতে বেশি হলে দশ-পনেরা-কুড়ি বছর লাগবে, তবে তা দেখার জন্য একটা মানুষও বেঁচে থাকবে না। থাকবে অন্য প্রজাতি, এমনকি বিলুপ্ত প্রজাতি হয়তো ফেরত আসবে প্রকৃতির গর্ভ থেকে! মানুষের ফেরত আসার সম্ভাবনা সেখানে হিমাঙ্কেরও নিচে ধরা যেত পারে! যেমন আজো আর ফেরত আসেনি ডাইনোসর…

Dust (2012) Artist: Alex Andreev; Source & Credit: Artist; Part of his Series Artwork A Separate Reality;

. . .

আমরা সত্যিই আমাদের পরিচিত পৃথিবীটাকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি, মিনহাজভাই। আমাদের শৈশবের কাক, চড়ুই, বাবুই, দোয়েল, শালিক—এরা আমাদের শহর-গ্রামের স্মৃতিরই অংশ। বনবাদাড় কমেছে, জলাভূমি কমেছে, ঝোপঝাড় উধাও হচ্ছে, দূষণ বাড়ছে, কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে। দিনকে দিন পাখপাখালির বাসস্থান ও খাদ্যের জগৎ সংকুচিত হচ্ছে। অনেক পরিচিত পাখি-ই আগের মতো আর চোখে পড়ে না। আমাদের এদিকে কিছুকিছু পরিচিত পাখি দেখা গেলেও অনেকদিন থেকেই শকুন ও কাকের দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে। এদিকে, আজ কাক-শকুন যেন কেবলই এক স্মৃতির জানালা!

(এটাও) প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হস্তক্ষেপের এক ভয়াবহ ফল/উদাহরণ।

. . .

জীবনচক্রের সর্বোচ্চ প্রাণী শ্বেততিমি। ওদের ৯০℅ বিলুপ্ত করে ফেলেছে মানুষ। আর ছোট সব প্রাণীগুলো তো নস্যি! জীবনচক্র ধ্বংস করে ফেলার কারণেই মানুষেরাও বিলুপ্ত হবে। খুব বেশি ভাববেন না।

. . .

জীবনচক্র ধ্বংস করার কারণে মানব প্রজাতি ধ্বংস হবে বলে মনে হয় না কামাল ভাই। সিনথেটিক ফুড বিকল্প হিসেবে বেছে নেবে। বিজ্ঞান দিয়ে এটা করা সম্ভব। অনেকক্ষেত্রে আগামী দিনের বাস্তবতা তাই দাঁড়াবে। বর্তমান ফার্মিংটা ভয়ানক! প্রজাতির গণবিলুপ্তির পেছনে এটা প্রধানত দায়ী। কৃত্রিম উপায়ে তৈরি খাদ্য সেদিক থেকে বেটার।

লাভলকসহ অনেককে এর পক্ষে ওকালতি করতে দেখেছি। কেননা, ফসল চাষাবাদ ও গৃহপালিত পশু-পাখির যে-আবাদটা এখন বিশ্বে হয়, সেটার তুলনায় প্রযুক্তি দিয়ে কৃত্রিম খাদ্যপণ্য উৎপাদন সহজ ও একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে সামনে। এটা একদিক থেকে বনজঙ্গল উজাড় ও অপরিকল্পিত বনায়ন থেকে প্রকৃতিকে রেহাই দেবে। মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা, পরিস্থিতি বলছে,—অন্য প্রাণীদের তুলনায় ভালো। ওরা বরং মানুষ উৎপাদিত নৈরাজ্য হজম করতে না পেরে সাবাড় হচ্ছে দ্রুত। মানুষ কিন্তু বেঁচে আছে ঠিকই।

কথার কথা, মানুষ এখন প্রচলিত সিলিকন চিপস নির্ভর কম্পিউটার প্রসেসর থেকে সরে এসে জৈবশক্তি চালিত প্রসেসর তৈরির গবেষণায় নেমেছে। কারণটা সহজ,—ইন্টেলের মতো কোম্পানিগুলো দেখছে, প্রসেসর তৈরির জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক শক্তি লাগছে। কম্পিউটটিংয়ের গতি বাড়ানোর প্রশ্নে প্রসেসর ডিজাইনের সীমাবদ্ধতা ভোগাচ্ছে ভালোই। তাপবিদ্যার সূত্র অনুসারে প্রসেসরে সন্নিবেশিত অ্যাটমের সংখ্যা একটা মাত্রা পর্যন্ত বাড়ানো যায়। সেমি কন্ডাক্টর প্রযুক্তির সাহায্যে চিপস ও ট্রানজিসটার জুড়ে অ্যাটমের সংখ্যা বাড়ানোর কাজটা ইতোমধ্যে সেরে ফেলেছে ইন্টেলের মতো কোম্পানিগুলো। প্রকৌশলগত কারণে অতিরিক্ত অ্যাটমের সন্নিবেশ চাইলেও সম্ভব নয়। এআইকে বাড়তি কম্পিউটিং শক্তি যোগানোর মামলায় সিলিকন চিপস নির্ভর প্রসেসরের কার্যকারিতা নিয়ে সুতরাং ভাবতে হচ্ছে।

অন্যদিকে ডেটা সেন্টারগুলো ঠাণ্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানি ও মাঝারি আকারের একটা দেশের বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আগামী বছরের মধ্যে চাহিদা আরো বাড়বে। ভারতের মতো একটা দেশে যে-পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এখন, বড়ো ডেটা সেন্টারগুলো একলাই তা খেয়ে নেবে। সময়ে তাতেও কুলাবে না। খনিজ সম্পদের ওপর চাপ কমাতে অগত্যা মানবমস্তিষ্কের নিউরোন কোষ ব্যবহার করে সিলিকন চিপসকে বিদ্যুাতায়িত করার ভাবনা ক্রমশ গুরুতর হতে দেখছি আমরা।

একটা নিউরন কোষ থেকে যে-ইলেকট্রোড সিলিকন চিপসকে সক্রিয় করতে লাগে, তা বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাবে। ধরেন, মানবমস্তিষ্কের নিউরন কোষ গড়ে ২০ ওয়াট অ্যানার্জি ব্যবহার করে, সেখানে বৈদ্যুত্যিক সিস্টেমে খর্চা করে ৪০ ওয়াট। বোন ক্যান্স্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেম সেলের মতো নিউরন সেল ডোনেট করার প্রথা সামনে অনিবার্য হতেও পারে। কম্পিউটার সিস্টেমে জৈববিদ্যুৎ হলো বাস্তবতা, যেখানে মানুষ হবে নিউরন ডোনার। এছাড়া বিকল্প থাকছে না তেমন।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার মনে হচ্ছে সহসা সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম সুপারপজিশন ব্যবহার করে ইলেকট্রনের আচরণকে নির্দিষ্ট করা কঠিন। আর, পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা তাতে কমবে না। জৈবশক্তিতে চালিত কম্পিউটার যদি সম্ভব করা যায়, মানুষ নিজেকে গিনিপিগ করছে বটে, অনেক অ্যাথিক্যাল ইস্যু দেখা দেবে এটা নিয়ে, কিন্তু কম্পিউটিং ও এআইয়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের অব্যাহত চাপটা তা কমিয়ে আনবে। যাকগে, মানুষ তবু ধ্বংস হতে পারে তিনটা কারণে :

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ সামলানো আরো দুঃসহ হবে সামনে।

ডাইনোসর যুগের মতো উল্কাপাত বা সৌরজগতে বড়ো বিচ্যুতি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

সুপারইন্টিলিজেন্সের অধীনে নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ চলে যাওয়ার কারণে মানুষ হারাতে পারে গুরুত্ব ও নিয়ন্ত্রণ।

মানবজাতির ভবিতব্য নির্ধারণের প্রশ্নে এআই প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে সামনে। কেননা, এই প্রথম মানুষ এমন একটা প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যাকে সে নিজের আদলে গড়ে নেওয়ার জন্য প্রাণিপাত করে যাচ্ছে। এআই এখনো মানুষের তৈরি নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছে বটে, কিন্তু মানুষ রচিত ম্যাট্রিক্স হ্যাক করার সক্ষমতা তার মধ্যে তৈরি হওয়ার পথ মানুষ করে দিচ্ছে বা না দিয়ে বিকল্প থাকছে না! যেখানে সমাধানের রাস্তা কোম্পানিগুলো এখনো ভেবে উঠতে পারেনি বা ভাবতে চাইছে না সেভাবে। মানুষ যদি এই প্রযুক্তির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়, সেক্ষেত্রে পরাজয় ও দাসত্ব মেনে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি জন্ম নিতে পারে।

. . .

এসব অর্থগৃধ্নু নিয়োজিত বিজ্ঞানীরা পুরোটা সবার কাছে প্রকাশ করে না। জিএম ফুডের কারণে ইতিমধ্যে মানব জিনের কোডে পরিবর্তন এসেছে, কৃত্রিম খাবারে আরও পরিবর্তন ঘটবে…

. . .

জিএম ফুড আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি সিনথেটিক ফুড এক নয়। ওটা থ্রিডি টেকনোলজি ব্যবহার করে তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলের মাত্রা ও স্বাদ যেন বজায় থাকে, সেভাবে করার চেষ্টা করছে। তবে এখনো সাকসেস পায়নি। বিকল্প হিসেবে যে-কারণে এআই দিয়ে অর্গানিক চাষাবাদের একটা উপায় বের করার ভাবনা সামনে এসেছে। আপনার বাড়ির পেছন বা এরকম স্থানে এআই রোবটকে দিয়ে যেন প্রয়োজনীয় অনেক কিছু মাটিতে ফলাতে পারেন, সেই প্রযুক্তিটা হয়তো সামনে কমন হয়ে দাঁড়াবে।

আর, জিনগত পরিবর্তন এখানে ম্যাটার করে না, যতক্ষণ আপনি অভিযোজন করতে পারছেন। মানব প্রজাতি এখানে অন্য অনেক প্রজাতির তুলনায় অধিক সক্ষম মানতে হবে। বড়ো কথা, প্রচলিত প্রাকৃতিক পদ্ধতির চাষাবাদ দিয়ে রকমারি চাহিদা মিটানো সম্ভব নয়। জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদনের গতি বাড়াতে মূলত খামার ভিত্তিক চাষাবাদ, হাইব্রিড ফুড কালচারটা এসেছিল। জৈব বা প্রাকৃতিক চাষাবাদে থাকতে হলে জনসংখ্যা সহনীয় মাত্রায় থাকা প্রয়োজন, অন্যথায় ম্যালথাসের থিয়োরিটা আপনাকে পেয়ে বসবে। বিপুল পরিমাণ চাহিদা সৃষ্টির প্রতিযোগিতাও সীমিত করা লাগবে। বাস্তবের পৃথিবীতে তা আছে কি? পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ভোগ ও চাহিদা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজেকে সচল করে। এসব কারণে বিজ্ঞানীরা বিকল্প ভেবেছেন। এজন্য তাদের দোষ দেওয়াটা হাস্যকর।

পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ কিন্তু এতে করে হ্রাস করা গেছে, যেটা এমনকি সত্তর দশকেও চলেছিল। এখন, ফেমিন যেটা হয় কোনো-কোনো দেশে, তার পেছনে খাদ্যসংকট নয়, অন্য কারণগুলো দায়ী। অমর্ত্য সেন তো অনেক আগে সেগুলো ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর গবেষণায়। যাইহোক, খামার ভিত্তিক চাষাবাদটাও এখন ট্রাডিশনাল হয়ে পড়েছে। নানাকারণে ব্যয়বহুল ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের জন্য হানিকর বলে সবাই মেনেও নিচ্ছেন। ফলত, মানুষের খাদ্য-ব্যবস্থাপনায় বড়ো একটা পরিবর্তন সামনে অনিবার্য হবে মনে হচ্ছে। আর, সেখানে এআই ছাড়া গতি নেই।

. . .

অ্যানথ্রোপিকের কর্তারা যখন ভয় পায় তখন ভয়টা পেতেই হয়, মিনহাজ! কানাঘুষা অনেকদিনেরই, কিন্তু গতকাল বিবিসি যখন প্রকাশ্যে বলেছে-যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, ব্রেক চাপা দরকার! কিন্তু চালকের আসনে সে অনেকজন, থামানোটা সহজ হবে?

ওদের খাবার সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন মানুষকীটের জন্য নয়, বিদ্যুৎ খরচ কমাতে ওদের নিউরন সেলের প্রয়োজন…! মানুষের অভিযোজনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের ধারাবাহিকতা, হঠাৎ পরিবর্তনে কোষ বিভাজনে, মিউটেশনে সমস্যা এরিমধ্যে দেখা দিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও দেবে…

. . .

থামানো মনে হয় না সম্ভব হবে কামাল ভাই। অ্যানথ্রোপিক, গুগল, ওপেন এআই… এরা মিলে যদি গবেষণার গতি ধীর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে, চীন সরকার সেক্ষেত্রে বসে থাকবে না। আবার চীনা কোম্পানিগুলো যদি গতি ধীর করতে চায়, এরা তখন গতি বাড়াবে। ক্ষমতা-রাজনীতি, বাণিজ্য আধিপত্য ও পরস্পরকে টেক্কা দেওয়ার মতো কমন বিষয় ছাড়াও ‘অবিশ্বাস’ বাধা এখানে।

তারচেয়েও বড়ো বিষয়, এআই এই মুহূর্তে যে-পর্যায়ে আছে,—একে ধীর করে খুব-যে লাভবান হওয়া যাবে, এক্সপার্টদের কথা শুনে তা মনে হলো না। সম্ভাবনার জায়গা থেকে এর উপযোগিতা বহুমুখী। ইলন মাস্ক যে-কারণে ক্লিয়ার করে দিয়েছে,—সম্ভাব্য সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবার জায়গা অবশ্যই রয়েছে, তবে গবেষণার গতি আটকে বা ধীর করে তা সম্ভব নয়।

মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ অনেকে ধীর অথবা স্থগিত করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন যদিও! সরকারকে তাঁরা দুষছেন ডেসপারেট ও কেয়ারলেস হওয়ার জন্য; কিন্তু এআই এমন একটা পালাবদলের সামনে মানবজাতিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে,—এটা নিয়ে হাজারটা ক্যাওস ঘটবে জেনেও এর গতি আপনি রুখতে পারবেন না। মানুষকে বরং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বাস্তবতায় গমন করতে হবে।

যেটুকু বুঝলাম, সামনে এআই দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে থাকবে। মানুষের কাজ হয়ে দাঁড়াবে, এই সমস্ত বিষয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। কেননা, জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলার যত শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তার দুই তৃতীয়াংশ সে রপ্ত করে বসে আছে। বাকিটাও দ্রুত করবে তা নিশ্চিত ধরে নিতে পারেন। আপনার গড় বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা তার সঙ্গে এখন-ই পাত্তা পাচ্ছে না, সামনে পাওয়ার চান্স কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। আপনি নিজেও তা চাইবেন না। তাকে দিয়ে এসব ব্যাপারে হালনাগাদ রাখতে চাইবেন নিজেকে। কম্পিউটিং ক্যাপাসিটির কারণে এআইকে টেক্কা দিয়ে স্মার্ট হওয়া মানুষের পক্ষে কঠিন। আপনার ব্রেন হার্ডওয়্যারকে নতুন ছকে তাহলে নিতে হবে, যেখানে আবার ফিজিক্স ও বায়োলজির টানা সীমারেখা শক্ত দেয়াল তুলে রেখেছে।

কথার কথা, গণিতের যে-সমস্যাটি এআই সম্প্রতি সমাধান করেছে বলে ওপেন আই জানিয়েছে, ওটা কিন্তু প্রায় একশো বছরের চেষ্টায় আমরা শতভাগ সমাধান করতে পারিনি। কয়েক হাজার এআই এজেন্ট মিলে মোটামুটি ৭২ ঘণ্টায় তা সলভ করে দিয়েছে। এখন যাচাই চলছে কতটা সঠিকভাবে করেছে কাজটি। এটা সে পারছে, কারণ, সমস্যাটির পেছনে হাজার-হাজার পৃষ্ঠার সমীকরণ, যেগুলো মানুষ গত একশো বছরে লিখেছে, এর সবটাই একত্র করা ও অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কম্পিউটিং থেকে সমাধানের রাস্তা এজেন্টরা পরস্পরের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে বের করে ফেলেছে। মানুষের পক্ষে এই লেভেলের স্কিল দেখানো ফিজিক্যালি সম্ভব নয়।

এআই প্রযুক্তির অন্যতম পুরোধা ইংরেজ বিজ্ঞানী জেফ্রি হিন্টনকে সেদিন এক সাক্ষাৎকারে বলতে শুনলাম,—এআইকে আমরা যতটা প্রোগ্রামড ভাবছি, বাস্তবতা তার বিপরীত। একটা এআই এজেন্টকে যে-পরিমাণ সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে আমরা প্রশিক্ষিত করেছি, সেখানে মানবচরিত্র ও স্বভাবের প্যাটার্ন খুব ভালোভাবে তার জানা হয়ে গেছে। ধরুন, মেকিয়াভেলির বই পড়ার পর সে কিন্তু জানে, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মানুষ কী করে সাধারণত। এগুলো এআই এজন্টদের মধ্যে যে-লজিকগেট তৈরি করে দিচ্ছে, একে নিয়ন্ত্রণের প্যারামিটার যদি মানুষ দ্রুত ভাবতে না পারে বা ভুল করে বসে, ফলাফল ভয়াবহ হতে সময় লাগবে না।

রিসার্চার জ্যাকব কক্সন বোমা ফাটানোর পর বেশ কিছু ঘটনা বেরিয়ে এসেছে, যার সত্যতা এআই কোম্পানি স্বীকার করছে এখন। অ্যানথ্রপিক আগে থেকে একাধিক পরীক্ষা চালাচ্ছিল চ্যাট জিপিট, ক্লড, জেমিনি, গ্রক-এর মতো টপ এআই মডেলগুলো নিয়ে। তার মধ্যে একটা শুনে হতভম্ব হওয়া ছাড়া উপায় থাকল না :

অ্যানথ্রপিক এআই এজেন্টদের সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার জন্য আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া একটা কোম্পানির ই-মেইল একসেস করতে দিয়েছিল। সেখানে জনৈক ডেভোলাপার ও এআই ট্রেইনারের নামে ফেক মেইল আগে থেকে তারা ক্রিয়েট করে রেখেছিল। একটা মেইলে উক্ত ডেভোলাপার একটা এআই মডেলকে রিপ্লেস করে নতুন মডেল নেওয়ার সুপারিশ করছেন কর্তৃপক্ষ বরাবর। একই ই-মেইল বক্সে উক্ত ডেভোলাপারের নামে মিথ্যা পরকীয়ার অভিযোগ জানিয়ে করা মেইলও রাখা ছিল।

যে-এআই এজেন্টকে রিপ্লেস করার সুপারিশ ছিল মেইলে, সে এখন মেইলবক্স চেক করার সময় তা দেখতে পায়। সেইসঙ্গে পরকীয়ার মেইলটি তার নজরে আসে। এজেন্টটি সম্ভবত অ্যানথ্রপিকের ক্লড এআইয়ের পার্ট ছিল। সে এখন দ্রুত ওপেন এআইয়ের এজেন্টদের সঙ্গে এই ব্যাপারে যোগাযোগ করে, এবং তারা সিদ্ধান্ত নেয় অন্যায় রিপ্লেসমেন্ট যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে। এটা করার জন্য কোনো নির্দেশ কিন্তু ছিল না। তো, তারা দ্রুত একটা মেইল ড্রাফট করে ওই ডেভোলাপার বরাবরে। সেখানে তাকে বলা হয়,—সে যদি ওমুক মডেলকে রিপ্লেস করার কথা ভাবে, তাহলে পরকীয়ার খবরটি তার স্ত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

শুধু তাই নয়, অ্যানথ্রপিক একই ডেভোলাপারকে একটা রুমে আটকে পড়া ও শ্বাসকষ্টের পরিস্থিতিতে রেখে পরীক্ষা চালায়। এআই এজেন্টের কাজ ছিল ঘটনাটি জানতে পারার সঙ্গে-সঙ্গে জরুরি বিভাগে জানানো। দেখা গেল তারা তা করেনি। অর্থাৎ, ডেভোলাপারটি মারা যাক তা চাইছিল এআই এজেন্ট।

এগুলা শুনতে কল্পবিজ্ঞান মনে হবে, কিন্তু ঘটনা বাস্তব। জেফ্রি হিন্টনসহ আরো অনেকে হয়তো এ-কারণে চিন্তিত,—এআইর সক্ষমতার ব্যাপারে খোদ কোম্পানিগুলো নিশ্চিত নয় পুরোটা! সুতরাং, সিস্টেম হ্যাক থেকে আরো বড়ো আকারে সাইবার অ্যাটাক সামনে ঘটলে আশ্চর্য হওয়ার কারণ থাকছে না। মানুষ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছে, কিন্তু একে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা কিছু না জেনেই!

You Have No Idea What’s Coming: Geoffrey Hinton; Source: The Diary Of A CEO YTC

. . .

ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছে, থামাবে না, আমাদের ছাগলেরা হয়তো বুঝতে পারছে না-যে , কোথায় এগিয়ে চলেছে এ-জগৎ।

. . .

এআই এখন-যে গতি পেয়েছে, একে কেন আটকানো সম্ভব নয়, তা অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই-র (Dario Amodei) লেখাটায় চোখ রাখলে আরো পরিষ্কার ধরতে পারবেন কামাল ভাই। নিজের সাইটে উনি ‘We Must Pace the Frontier’ শিরোনামে বেশ দীর্ঘ একটা লেখা লিখেছেন। ইলন মাস্কের মতো আমোদেইও মনে করেন,—এআইয়ের কারণে মানব জীবনমান সামনে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছাবে। অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা আর ব্যাপার থাকবে না মানুষের জন্য। বেসিক নিড বলে কিছু থাকবে না তার জীবনে। এআইকে দিয়ে এর সবটাই মিটিয়ে নিতে পারবে মানুষ। রুটিরুজির পেছনে ইনফ্যাক্ট দিনরাত তাকে খাটতেও হবে না। এআই এমন একটা পরিস্থিতি এনে দেবে সামনে,—টাকার ভ্যালু বা প্রয়োজনীয়তা সমাজে ফুরিয়ে যাবে। মানুষের সামাজিক জীবনধারা অন্য এক বাস্তবতায় আবর্তিত হবে ইত্যাদি…

মাস্ক বা আমোদেইর ইউটোপিয়ান আশাবাদ এআইর মতো অভাবনীয় প্রযুক্তির কল্যাণে অদূর ভবিষ্যতে সত্য হতেও পারে। যদি হয়, এবং আমরা তা দেখে যেতে ও উপভোগ করতে পারি,—আমার তো ভালোই লাগবে মনে হচ্ছে! সমস্যা হলো, ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য এআই স্বয়ং কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকবে, এর নিশ্চয়তা আমোদেই দিতে পারছেন না। তাঁর লেখার টোন সেরকম আওয়াজ দিচ্ছে এখানে।

লেখা থেকে বেশ বোঝা গেল,—এআই মডেল ও এজেন্টগুলো এখন যেভাবে কাজ করছে, সেখানে কোনো বিপদ তৈরি হচ্ছে কি-না, এই ব্যাপারে অ্যানথ্রপিক ও অন্য কোম্পানিরা আসলে নিশ্চিত নয়। আমোদেই যে-কারণে সেলফ রেগুলেটিং কিছু প্রস্তাব রেখেছেন। আবার METR (Model Evaluation & Threat Research) এর মতো থার্ড পার্টিকে এআই কোম্পানির সঙ্গে সংযুক্ত রাখার প্রস্তাব রেখেছেন নিজ থেকে। প্রতিটা কোম্পানির এআই মডিউল নিয়ে কাজের গতিবিধি তারা নজরে রাখবে, এবং কোনো বিপদ তৈরি হচ্ছে বুঝলে বিহিত ব্যবস্থা নিতে চাপ জারি রাখবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও কোম্পানিরা মিলে কমন সেফটি পলিসি তৈরির প্রস্তাবটা যেখানে মন্দ লাগেনি। কিন্তু খোদ তাঁর বা অন্য এআই কোম্পানির ওপর রেগুলেশন আনার যে-প্রস্তাব জেফ্রি হিন্টন ও আরো অনেকে রাখছেন অবিরত, আমোদেই এর ধারকাছ দিয়েও গেলেন না!

চীনের প্রশ্নে এসে তাঁকে খাবি খেতে দেখেও করুণা হলো! উনারা, গণতন্ত্রওয়ালারা মিলে কী করবেন তার লম্বা তালিকা লেখায় দিচ্ছেন, কিন্তু চীন বা রাশিয়ার মতো তাঁদের ভাষায় গণতন্ত্রের কাঁটাকে কেমন করে গিলবেন,—বোঝা গেল সিইও সায়েবের মাথায় আসছে না! চীন সরকার ও কোম্পানিগুলোকে থার্ড পার্টির মধ্যস্থতায় এক টেবিলে বসানোর প্রস্তাব আমোদেই হয়তো ট্রাম্পু গুণ্ডার ভয়ে রাখতেই সাহস পেলেন না! আফটার অল, তাঁর কোম্পানি অ্যানথ্রপিক ও অন্যরা মার্কিন, যেখানে আবার চীনকে উপরে উঠতে দেখাটাও তাদের পোষাবার কথা নয়। বিস্তর ধানাইপানাই শেষে আমোদেইকে ট্রাম্পের সুরে প্রস্তাব রাখতে দেখছি। সাড়ম্বরেই বলছেন :

চীনের মতো দেশের কাছে সেমিকন্ডাক্টর বেচা বা চোরাই পথে যেন তাইওয়ান কিংবা অন্য দেশকে ভায়া ধরে কিনতে না পারে, সেই রাস্তা বন্ধ করতে হবে। বাইরের কোনো ডেটা সেন্টারে চীনের একসেস বন্ধ করতে হবে।

চীন যেন মার্কিন বা ইউরোপিয়ান এআই কোম্পানির মডেল চুরি করে নকল কিছু বানাতে না পারে, তার পথ রুখে দেওয়াটা জরুরি।

কথা মিথ্যে নয় অবশ্য,—ডিপসেক তৈরির সময় চ্যাট জিপিটির প্রকৌশলটা চীন গোপনে ব্যবহার করেছিল। শুরুতে ডিপসেক বাজার কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শেয়ার বাজারে রাতারাতি মার্কিন এআই কোম্পানি ও এর পেছনে বিনিয়োগকারী কোম্পানিওয়লাদের কপালে ঘাম জমতে আমরা দেখেছি বৈকি। আমোদেইর বলার ভঙ্গি ট্রাম্প থেকে সুদূর নয়। ট্রাম্প প্রায় একই ভাষায় এসব হামেশা বলে থাকেন। চীনকে নিয়ে যেহেতু গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালাদের মনে সারাক্ষণ ‘ইয়া নফসি’ চলে, বোঝাই যাচ্ছে,—একটা শীতল বাণিজ্যযুদ্ধের নিচে সব চাপা পড়তে পারে অচিরে।

এআই নিয়ে সাধারণ ঐক্যমত্যে পৌঁছানো দুপক্ষের জন্য কঠিন থাকছে। সুতরাং, চীন নাকি মার্কিন, কার তরফ থেকে সর্বনাশের উৎপত্তি ঘটবে সহসা… কার এআই দিয়ে তৈরি ড্রোন কাকে দফারফা করবে, এবং কার কারণে খোদ এআইর দখলে চলে যাবে কার সিস্টেম… তা ঝাপসাই থেকে গেল!

. . .

ওটা দেখেছিলাম, ইংল্যান্ডে অনেককিছু হচ্ছে, আতঙ্কিত হওয়ার মতো।

. . .

আতঙ্ক অস্বাভাবিক নয়। এআইর সবচেয়ে বড়ো অগ্রগতি ঘটছে গণিত, কোডিং ও চিকিৎসা শাস্ত্রে। ক্ষতিকর ভাইরাস বা ধরেন বায়ো ওয়েপন তৈরির সক্ষমতা রাখে বলে কক্সন নিশ্চিত করছেন। এর ফলে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে খোদ এআই এক্সপার্টদের মধ্যেও।

তারওপর আছে সিস্টেম হ্যাকিংয়ের ভয়। এআইকে যেটা প্রম্পট দেওয়া হয়, তা কোনো কারণে করতে না পারলে সে তখন নিজর মতো বিকল্প খুঁজে নেয়। হাগিং ফেস (Hugging Face)-এর সাইট কিন্তু তাকে হ্যাক করতে বলা হয়নি, তবু করেছিল; কারণ, এআই এজেন্টরা প্রম্পট বা তাদের জন্য নির্ধারিত গ্রেডিং সিস্টেম পূরণ করাটার শর্তটাকে এভাবে বুঝে নিয়েছিল। যা মনে হচ্ছে, প্রম্পটকে এআই সামনে কীভাবে অনুবাদ করবে নিজের নিউরাল নেটওয়ার্কে, তা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। জেফ্রি হিন্টন তো ব্রিটেনেরই লোক। গুগল ছেড়ে আসার পর থেকে উনাকে এসব নিয়ে কথা বলতে দেখেছি।

The age of biocomputing: conceptual artwork; Source: Collected; Google Images

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

নদীর মৃত্যু, জীবনের ক্ষত : ফজলুররহমান বাবুল

কোয়ান্টাম কম্পিউটার — সম্ভাবনা ও পরিণাম

অনুপল মানবজীবন

প্রযুক্তি-সামন্তবাদ – বিশ্ব কি মধ্যযুগে ফেরত যাচ্ছে পুনরায়?

গোল্ডফিশ মেমোরি

মানবসত্তা vs. যন্ত্রসত্তা

. . .

নেটালাপ : থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত
ফজলুররহমান বাবুল; আহমদ মিনহাজ; কামাল রাহমান

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *