দেখা-শোনা-পাঠ - পোস্ট শোকেস

আর্টলাভার শচীন এবং যোগেন চৌধুরীর ‘চোখের ভাষা’

Reading time 5 minute
0
(0)
Jogen Chowdhury (1939-2026); Image Source & Credit: Collected; Google Images

দুই বাংলার গুণী আঁকিয়েদের অন্যতম যোগেন চৌধুরী দেহ রেখেছেন সম্প্রতি। খবরটি শোনার পর ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের ‘যোগেনযোগ’ বিষয়ক একটা কাহিনি মনে ভেসে উঠছে। জনপ্রিয় ইউটিউবার অরিজিৎ চক্রবর্তীর পডকাস্ট-এ প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য এটা দর্শককে শুনিয়েছিলেন। বেশ ‘অবাককরা’ একটা ফিল হয়েছিল শুনে!

ক্রিকেট মাঠের বাইরে শচীন রমেশ টেন্ডুলকার কেমন? অরিজিতের এরকম একটা প্রশ্নের চাপান উতোরে গৌতম জানালেন,—ক্রিকেট পিচের মহান শিল্পী একজন আর্টলাভার। ব্যস্ত ক্রিকেটসূচির মধ্যেই ছবি দেখা ও সংগ্রহের বাতিক ছিল। আর্টের উপর জানাশোনা ও দখল ঈর্ষনীয়। একটা শিল্পরুচি এভাবে ধারণ করেন উইলো হাতে তুখোর বল্লেবাজ কিংবদন্তি।

তথ্যটা জেনে একটু চমকেই গেছিলাম তাৎক্ষণিক। শচীন গানবাজনা ভালোবাসেন শুনেছি। লতা মঙ্গেশকরের গানের প্রতি অনুরাগের কথা খবরের কাগজে পড়েছিও। গানবাজনায় অনুরাগ পরিবারসূত্রে পেয়েছেন মনে হয়। তাঁর বাবা শচীন দেব বর্মণের ভক্ত ছিলেন। ছেলের নাম শচীন কর্তার সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিলেন বলে কথা চালু আছে। খবরের কাগজে এগুলো চর্চিত হতে দেখেছি নানাসময়।

গানবাজনা, সিনেমা কিংবা সাহিত্যপ্রীতির নজির খেলোয়াড়দের মধ্যে দুর্লভ নয়। গতিদানব ব্রেট লি যেমন গান করেন বলে জানি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ক্যালিপসোঝড় ডুইন ব্রাভো গায়কবেশেও ভালোই জনপ্রিয়। বিষাক্ত ইয়র্কারে ইউকেট উপড়ে নিতে পটু লাসিখ মালিঙ্গাকে অনলাইনে গিটার বাজাতে দেখছি ইদানীং। বইখোর প্লেয়ারও মনে হচ্ছে খুঁজলে পাওয়া যাবে। কিন্তু, চিত্রকলার প্রতি টান ও ভালো দখল রাখেন, এমন খেলুড়ে মনে হয় না অধিক মিলবে ভবে। শচীন এখানটায় এসে ব্যতিক্রম হয়ে উঠছেন।

একটা ছবি চড়া দামে কেনা ও ঘরে সাজিয়ে রাখা এককথা, আর এর সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া, দৃষ্টিভঙ্গি বা পারসেপশনে পৌঁছানো… এগুলো সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনা। চিত্রকলা অবশ্য ফিকশনের মতোই একটা কাহিনি রেখে যায়। দর্শক তার নিজের মতো করে এর সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে। ছবি কী বলতে চাইছে তা আবিষ্কার করে নেয়। সেইসঙ্গে এটাও সত্য বটে,—শিল্পীর আঁকা ছবি অনেকসময় কিছু বলবে না বলে পণ করে বসে! কবিতার চেয়েও গভীর অর্থবাহক ব্যঞ্জনায় হয়ে ওঠে অবোধ্য সুন্দরী। ‘অনুভব’টা তখন আর যথেষ্ট থাকে না। কল্পনাশক্তি ও ভাবনার আলো-সংকেত স্বয়ং দর্শককে খুঁজে নিতে হয়। আর্ট ক্রিটিকরা এখানে এসে জরুরি সহায়ক হয়ে ওঠেন। সাহিত্যে নয়, ক্রিটিকের আসল বাজার আজো চিত্রকলাকে ঘিরে সবচেয়ে দামি ও জীবন্ত হয়ে ওঠে বলে আমার মনে হয়।

সে যাইহোক, গৌতম ভট্টাচার্যের কথা থেকে ঠার হলো,—দেশি-বিদেশি চিত্রকরদের আঁকা ছবি দেখা ও সংগ্রহের ঘটনায় দর্শক-স্বকীয়তা শচীনের ভিতর কাজ করে। ছবি ও শিল্পী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নাকি যথেষ্ট চুজি এই লোক! শচীনের শর্টলিস্টে যোগেন চৌধুরী ছিলেন অন্যতম। শিল্পী কথা দিয়েছিলেন, নিজের আঁকা ছবি থেকে একটা তাঁকে দেবেন। যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে শচীনের সংযোগসেতু হিসেবে গৌতম তখন ভূমিকা রাখছেন। তো সেই শচীন একবার শ্রীলংকার বিপক্ষে কলকাতায় ম্যাচ খেলতে আসলেন। ডিসিশন আগেই নিয়েছেন,—যোগেন চৌধুরীর আঁকা ছবি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। শিল্পীর সঙ্গে সংযোগের ভার গৌতম ভট্টাচার্যের উপর চাপালেন শচীন।

লাতিন ফুটবল এক্সপার্ট টিম ভিকরির মতো গৌতম ভট্টাচার্যও সাহিত্যের পাঠক। সাহিত্যরসে মাখোমাখো প্রতিবেদনে তা ধরাও পড়ে হামেশা। কলকাতার কবি-লেখক-চিত্রশিল্পী ও সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে পরিচয় নিবিড়। যোগেন চৌধুরীর কাছে ছুটলেন অগত্যা। সব শুনেটুনে যোগেন চৌধুরী তাঁর ছবিভরতি ক্যাটালগ ধরিয়ে দিলেন হাতে। বললেন,—এখান থেকে ওকে বেছে নিতে বলো। আশা করি এটা কাজে দেবে।

When it talks-I: Jogen Chowdhury’s Artwork; Image Source & Credit: Collected; Google Images

ঢাউস ক্যাটালগ হাতে গৌতম পরের দিন হাজির ড্রেসিংরুমে। প্র্যাকটিস সেশন শুরু হতে ঘণ্টা দুই বাকি তখনো। শচীন টেন্ডুলকার সাগ্রহে ক্যাটালগ নিয়ে বসে পড়েছেন। একটার পর একটা ছবি দেখছেন, ফাঁকে কথা বলছিলেন দু-এক ছত্র, যার সারার্থ অনেকটা এরকম ছিল :

দেখো, আমি মর্বিড কিংবা নগ্নশিল্প চাইছি না। এর শিল্পমূল্য আছে জানি। অন্যরস আছে। মিনিং ও বিউটি আছে। আমার তবু ভালো লাগে এমন ছবি, যেটা এর বাইরে অন্য বার্তা দিচ্ছে দর্শককে।

সে তো হলো। গৌতম এদিকে ভাবছেন,—অনুশীলন শুরু হতে বেশি দেরি নেই। এই লোক এর মধ্যে ক্যাটালগে ঠাসা এত্তো ছবি থেকে বাছাইটা করবে কখন! শচীনের ভাবান্তর নেই। একমনে যোগেন চৌধুরীর আঁকা ছবির-পর-ছবি উলটে যাচ্ছে। যেন খেলায় নামার কথা ভুলে বসেছে মাঠে শান্তমনের আগ্রাসী এই বল্লেবাজ।

যাহোক, শচীন শেষপর্যন্ত যোগেন চৌধুরীর কোন ছবিটা সংগ্রহের জন্য বেছে নিয়েছিলেন, গৌতম তা আর ভেঙে বলেননি। সঞ্চালক অরিজিৎ ততক্ষণে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। যোগেন চৌধুরীর ছবির মধ্যে রিয়েল আর্টের নজিরগুলো এই-যে শচীন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন, এটা অনেকবেশি অর্থ রাখে।

বিংশ শতকের গোড়ায় বেঙ্গল আর্ট স্কুল মুভমেন্ট ভারতীয় চিত্রকলায় যুগাবর্ত নিয়ে আসে। আত্মপরিচয় অন্বেষণের উত্তাপ সেখানে ছিল বৈকি। প্রাচ্যরীতিকে প্রাধান্য দিয়ে ছবি আঁকার চল সুতরাং তীব্র হয়েছিল। স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তার অনুষঙ্গ ক্যানভাসে একটা রাজনৈতিক ভাষা ও পরিচয় রাখছিল নীরবে। এখন, এই অঙ্কনরীতি ও এর সফলতা-বিফলতা নিয়ে পরে তীব্র হওয়া প্রশ্ন ও বিতর্ককে যদি আপাতত পাশে সরিয়ে রাখি, তাহলে এটা স্বীকার করতে হবে,—অবন ও গগন ঠাকুর, নন্দলাল বসু, অসিত কুমার হালদার, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেইজ… প্রমুখরা মিলে একটা Aura এনে দিয়েছিলেন। ছবির গঠন, বিষয়বস্তু ও অঙ্কনশৈলীতে প্রাচ্যসুবাস টের পেতে দর্শকের অসুবিধা হতো না।

দেশভাগ পরবর্তী বিশ্বে এটাকে ভেঙে নতুন যুগান্তর নিয়ে আসার প্রয়োজন পড়ছিল। ছবি আঁকার পদ্ধতি, বিষয়বস্তু ও ভাবনায় পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের একটা মেলবন্ধন ঘটানোর তাগিদ দেখা দিলো। মকবুল ফিদা হুসেনরা এটার উপর জোর দিলেন, এবং তা অনেকটা দ্রোহের মতো ছিল। এঁনাদের সৃষ্ট তরঙ্গ আবার বাংলায় সরাসরি গভীর অভিঘাত ফেলতে পারেনি। দুই বাংলার চিত্রীরা বরং নিজস্ব স্থনিকতা মেনে মিশ্রণ ও মেলবন্ধন পরখে আগ্রাসী থেকেছেন।

When it talks-II: Jogen Chowdhury’s Artwork; Image Source & Credit: Collected; Google Images

ওপারবাংলায়, বিশেষত বেঙ্গল আর্ট স্কুলের পুঁতে দেওয়া ভাববীজ অঙ্কনরীতির ভিন্নতা সত্ত্বেও নিজ প্রভাব ধরে রেখেছিল। এই পটপর্বে যাঁরা বিশিষ্ট হলেন, তাঁদের মধ্যে গণেশ পাইন, যোগেন চৌধুরী ও বিকাশ ভট্টাচার্যকে আমার কেন জানি থ্রি মাস্কেটির্য়াস ভাবতে ভালো লাগে। তিনজনই ওরিয়েন্টাল অঙ্কনরীতির ভিন্ন মহাল তৈরির ওস্তাদ আঁকিয়ে ছিলেন। বলাবাহুল্য, গণেশ হালুইকে রাখতে হয় ফ্রেমে, যদিও তাঁর অঙ্কন-পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু বিমূর্তরীতির রেখাঙ্কনে দেশভাগ পরবর্তী পরিবেশকে ভাষা দিয়েছে অধিক। সে যাইহোক, এঁনাদের অঙ্করীতি ও বিষয়বস্তুর দেহ থেকে বিচ্ছুরিত শিল্পভাষা, ভারতীয় পৌরাণিক বিশ্বের পোস্টমডার্ন ইন্টারপ্রিটেশান ও বিনির্মাণ কি বলা যায় একে? আমার ঠিক জানা নেই। শিল্পরসিকরা তা ভালো বলতে পারবেন।

মিথরঞ্জিত ক্যারেক্টারগুলো তাঁরা কেবল অন্যছাদে এঁকেছেন তা নয়, লোকায়ত ও শাহরিক মধ্যবিত্ত মিলে যে-বাংলা, তার অজস্র ডিটেল সুনিপুণ ছড়িয়েও দিয়েছেন ক্যানভাসে। সংমিশ্রণটা সেখানে ডিপ স্পিরিচুয়াল ক্যাথারসিস বা গভীর মরমি মোক্ষণ টের পেতে দর্শককে বাধ্য করে অনেকখানি। যেখানে, প্রত্যেকে নিজের মতো করে একটা কাহিনি ক্যানভাসে আঁকছেন, ফিগারগুলো তার মধ্যে অভিব্যক্ত হচ্ছে, এবং তারা কথা বলছে নিঃসঙ্গ নীরবতায়। যোগেন চৌধুরীর ছবিতে তা আবার রস-পরিহাস থেকে শুরু করে গভীর ক্ষরণের বার্তা দিতে ত্রুটি করেনি। এবং প্রতিটা ছবি আশপাশের মানুষজনের ঘরকন্নায় নিকানো জীবনের দলিল বা প্রতিচ্ছবিও বটে!

শচীন ওই-যে ন্যুডিটির বাইরে অন্য বার্তা দিচ্ছে এমন ছবির কথা গৌতম ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন, সেটা দিয়ে ক্রিকেট-ঈশ্বর ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন কে জানে! তবে, গণেশ পাইন ও বিকাশ ভট্টাচার্যের পরে যোগেন চৌধুরীও প্রস্থান নিলেন দেখে একথা ভাবতে মন চাইছে :

তাঁর আঁকা ছবির প্রতিটা ক্যারেক্টার, প্রতিটা সাবজেক্ট, প্রতিটা তুলির টানে সেই জীবন মর্মরিত, যেখানে ‘আমরা মানুষ’ কথা বলছি নীরবতায়। যেখানে, প্রাচ্যজীবনের প্রতিটা মর্মর, একান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে সংযোগ ও সংযোগহীনতার গল্পরা যেমন রয়েছে,—এটাকে ছাপিয়ে যাওয়া রহসময়তাও হৃদমাঝারে অনুভব করে দর্শক।

শিল্প মহান, যখন তা চোখের ভাষায় কথা বলে; আর দেহের বাদবাকি যা-কিছু, তারা ওই চোখের ভাষায় খুঁজে নেয় নিজের লয়-তাল ও সংগতি। যোগেন চৌধুরী চোখের ভাষায় কথা বলতেন ছবিতে। প্রতিটা ছবি একান্ত আমাদের জন্য। তারা একান্ত এই প্রাচ্যের। যেখানে, জীবন তার অপার একঘেয়েমি ও শত হাজার চাপের মধ্যে রঙ্গ-পরিহাসে জীবনের দিকে সজীব। যেখানে, রহসময়তা চোখের ভাষা ও দেহের নগ্নতায় ভারতীয়। যেখানে, জীবনের পাশে জরা ও মরণ তবু চরৈবেতি বা এগিয়ে চলোর গল্পটা বলছে অবিরাম।

যোগেন চৌধুরী যথেষ্ট মাত্রায় নগ্নতা এঁকেছেন ক্যানভাসে, কিন্তু ওটা হলো সেই নগ্নতা, যার মধ্যে জন্ম, বিকাশ, যাপন ও জরা একত্রে সন্ন্যাস নিচ্ছে পাশাপাশি। সত্যি অদ্ভুত! প্রণাম, এই মহান শিল্পীকে প্রণাম। আপনার ছবি দেখার মুগ্ধতা অমলিন থাকবে—এটা জেনে-যে, গণেশ পাইনের মতো আপনিও চলে গেছেন জীবনের ভারা সাঙ্গ করে।

. . .

When it talks-III: Jogen Chowdhury’s Artwork; Image Source & Credit: Collected; Google Images

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

মুস্তাফা মনোয়ার : স্মরণে সতত ‘শিল্পমেধাবী’

হ্যারল্ড রশীদ : দ্য আর্ট অব ইনার সাইলেন্স

উজ্জ্বল ‘এই’ নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক!

আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’ ও হ্যারল্ড রোজেনবার্গ সমাচার : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

কৃষ্ণ বুদ্ধ : ক্ষমতা-রাজনীতি ও শিল্পের বিলোপ

. . .

আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *