
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো;—আকাশ কালোমেঘে ঢাকা। সন্ধ্যায় রাতের আঁধার নেমে এসেছে। কুলাউড়া থেকে সিলেট ফিরছিলাম। যাত্রাবিরতি নিতে রাজনগর চৌরাস্তায় গাড়ি থামাই। একটা ভাঙাচোরা চায়ের দোকান পড়েছে সামনে। টং-দোকানে চায়ের স্বাদটা অন্যরকম! আমার দুজন সহকর্মী সেদিন সঙ্গী ছিলেন। লম্বা একটা বেঞ্চে আমরা বসে পড়ি। তিনকাপ লাল-চা দিতে বলি দোকানিকে। আশপাশ থেকে এসেছেন এরকম আরও তিনজনকে দেখলাম অন্য আরেকটি বেঞ্চে বসে চায়ের সঙ্গে পাতাবিড়ি ফুঁকছেন। চায়ে চুমুক দিতে-দিতে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছেন তারা। আমিও মাথা ঢোকাই তাদের আলাপে। একজনের নাম আছকন মিয়া। পেশায় রাজমিস্ত্রি। পাশের গাঁয়ে থাকেন। কোন দলের সমর্থক তা বুঝতে পারলাম না, তবে বিশ্বকাপ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন সরাসরি :
ফুয়াইনতে-ফুরিন্তে গেঞ্জি পরি ঘুরঅইন, আর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল লইয়া ঝগড়া করঅইন। হুনছো-নি-বা আর্জেনতিনা ইজরাইলর দুস্ত।
কথাটা শেষ করে আরেকজনের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কাটলেন আছকন মিয়া। বুঝলাম, যাকে টিপ্পনী কাটছেন, তিনি সম্ভবত আর্জেন্টেনার সমর্থক হবেন। খেলার ভেতর এতো কাহিনি লুকিয়ে থাকে তা আমার ধারণা ছিল না! চায়ের আড্ডা জমে উঠতে এক-দুজন করে লোক বাড়ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে সিএনজি চালক, মুদি দোকানি, দিনমজুরে ছোট্ট দোকানটি ভরে গেল।
‘ভাই খেলা তো খেলাই। আনন্দটা উপভোগ করেন।’ আমার কথার পিঠে একজন মুদিদোকানি কথা জোড়েন : ‘আইজ আর্জেন্টিনার খেলা। তেরোটা মুরগির ছালন আর খিচুড়ি পাকাইমু। ভাইছাব আফনার দাওয়ত।’ আমি স্মিত হেসে অপারগতা জানাই : ‘ভাই আফনারা হক্কলে-মিলি খেলা দেখইন। মজা করইন। খেলা-রে খেলা মনে করি দেখবা। আমরা যাইরামগি। আল্লাহ হাফেজ।’
চা-দোকানে উতলে ওঠা বিশ্বকাপঝড় মাথায় নিয়ে সিলেটে রওনা দেই। একটা ভাবনা শুধু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন :—খেলা কী শুধু মাঠে গড়ায়, নাকি তা বহুধারায় প্রবাহিত! বিষয়টি খোলাসা করি চলুন। বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা, এবং বৈশ্বিক viewership-এর কারণে ফুটবল বিশ্বকাপকে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ নামে ডাকা হয়। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ এমন এক আসর, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে পুরো বিশ্ব একটি মঞ্চে একত্রিত হয়।
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। স্থানভেদে যে-নামে পরিচিতি থাক-না-কেন, ফুটবলটাই দুনিয়াজুড়ে খেলে মানুষ। বিশ্বকাপ চলাকালীন একটা মাস প্রতিটি ম্যাচে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উল্লাস ও কান্নার মিশে তৈরি হয় অন্যরকম পরিবেশ। ফিফা বিশ্বকাপ হলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লোক দেখে এমন একটা ইভেন্ট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন ও মোবাইল স্ক্রিনে চোখ থাকে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের।
চার বছর পর পর আসে এই মহাযজ্ঞ, যার কারণে সমর্থকদের মাঝে তৈরি হয় তীব্র কৌতূহল, ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস। উচ্ছ্বাসের ঢেউ হাজার হাজার মাইলের সীমানা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রতিটি কোণে। তরঙ্গে আন্দোলিত হয় বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়। অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে প্রতিটি শহরের অলিগলিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা ছলকে ওঠে। মাঠের খেলার সাতকাহন ঝড় তুলে চায়ের কাপে, এমনকি প্রতিটি পরিবারের অন্দরমহলে। নিজের অজান্তে সমর্থকের দেয়াল তৈরি করে মানুষ। দূরের দেশকেও মনে হয় আপন। হৃদয়ের অন্তপুরে ঠাঁই নেয় ব্রাজিল,আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, সেনেগাল, কেপ ভার্দে… আরও কতো কতো দেশের ফুটবল টিম! দেশগুলোর জন্য দরদ আর ভালোভাসার আবেগে সিক্ত হয় মানুষ!
শুধু কী তাই, লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, লামিন ইয়ামাল, হ্যারি কেইন, লুকা মদরিচ, ভোজিনহা, আশরাফ হাকিমি, আর্লিং হলান্ড, মোহামেদ সালাহ, ব্রুনো ফার্নান্দেজ… আরও কতো নামকরা/ খ্যাতিমান ফুটবলার বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জিতে নেয়! তাঁদের খেলায় মুগ্ধ দেশের আট থেকে আশি বছর বয়সী মানুষ!

ফুটবল বিশ্বকাপের এই মহারণ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়,—বিশাল বিনোদন ও বাণিজ্যিক মহোৎসব। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক উৎসব ভাবা যেতে পারে একে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলারের লেনদেন ও কর্মসংস্থান তৈরি করে এই আয়োজন। বাণিজ্যের ছাত্র হিশেবে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের ওপর কিছুটা আলো ফেলতে চাই এখানে :
বিশ্বকাপের পুরো সময় বিশ্বজুড়ে বিরাট অঙ্কের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উৎপাদনের প্রবাহ তৈরি হয়। যেমন, ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ বৈশ্বিক স্তরে প্রায় ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির সম্ভাবনা রাখছে। স্বাগতিক দেশগুলোয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও পর্যটন খাতে তুমুল জোয়ার দেখছি আমরা। স্টেডিয়াম নির্মাণ, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রচারণায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে বিশ্বকাপ। ফিফা নিজে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব (ব্রডকাস্টিং) ও স্পন্সরশিপ থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রাইজমানি ও অংশগ্রহণ ফি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জাতীয় অর্থনীতিতে ভালোই প্রভাব ফেলে। অনেক ছোট ও মাঝারি দেশ অংশগ্রহণ ফি ও বোনাস থেকে যে-টাকা পায়, তা তাদের নিজস্ব ফুটবল অবকাঠামো ও তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখে। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেই,—প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ থেকে প্রাপ্তি ২৫০ কোটি টাকা। তাদের মোট জিডিপির ০.৭৫% কেবল বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দেশটি আয় করেছে। বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞ কেন্দ্র করে আয়োজক দেশে নতুন নতুন পর্যটক সমাবেশ ঘঠে। আয়োজক শহরের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পায়।
কিছু প্রভাব আছে, যা আবার চট করে চোখে পড়ে না। যেমন, মানুষ খেলাধুলায় মেতে ওঠায় স্থানীয় ব্যবসা প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর কাছে দেশের ভাবমূর্তি বদলে যায়। ফিফা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেন ইকোনমিকস এবারের বিশ্বকাপের আসর নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। তাদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজার ৫০ কোটি ডলার, আর বিশ্বের অন্যান্য দেশে ৪ হাজার ৯৬০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন ঘটবে। বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যয় বাদ দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪ হাজার ৯০ কোটি ডলার যোগ হবে বলে তারা আভাস দিচ্ছে। প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে,—বিশ্বকাপ কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনে তা নয়, মানুষের আয়-রোজগার বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।
আমার একজন এক্স কলিগ নিউইয়র্ক থেকে জানালেন, সেখানে ব্যবসা খুবই জমজমাট। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আগে যে-বার্গারের দাম ছিল ১০ ডলার, এখন সেটি কয়েকগুণ বেড়েছে। কর্মসংস্থানে জোয়ার এসেছে। মানুষের আয়-রোজগার বেড়েছে কিছুটা। ধারণা করা হচ্ছে, এই আয়োজনে যুক্ত কর্মী, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের মোট ২ হাজার ৮০ কোটি ডলার আয় হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হবে ১ হাজার ২০ কোটি ডলার এবং অন্যান্য দেশে ১ হাজার ৬০ কোটি ডলার। কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব বিরাট। হিসাব বলছে, বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার মানুষের পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৫ হাজার চাকরি হবে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৬ লাখ ৯২ হাজার চাকরি বিশ্বের অন্যান্য দেশে।

সর্বশেষ প্রকাশিত ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী বাংলাদেশ পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল ১৮১ নাম্বারে আছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তুলনামূলক কম ম্যাচ খেলা ও পয়েন্টের ওঠানামার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে র্যাঙ্কিংয়ে এই অবস্থান বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তবে মানুষের মধ্যে ফুটবল নিয়ে তীব্র আবেগ থাকায় দেশে বিপুল পরিমাণ মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পলিলক্ষিত হয়। জার্সি, পতাকা, ব্যানার তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। বড়ো পর্দায় খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী প্রচার, ডিজিটাল ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিশেষ প্যাকেজ দেশে শত শত কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি করে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ, ব্র্যান্ড প্রমোশন ও পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে সাময়িক গতি সঞ্চার করে। কিন্তু, বাংলাদেশের এইমাত্রায় জনপ্রিয় ফুটবল খেলাটি গুণগত মান বিবেচনায় বিশ্ব আসর থেকে যোজন যোজন দূরেই থেকে গেছে! সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বাফুফের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের উদাসীনতা বাংলাদেশের ফুটবলকে পিছিয়ে রেখেছে তাতে সন্দেহ নেই। এদেশে ফুটবল-ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের, তথাপি ফুটবলবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আজও উজ্জ্বল হতে পারল না!
. . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা
সমাজ-মনস্তত্ত্বে ফুটবল বিশ্বকাপ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
পিয়ের পাওলো পাসোলিনির ‘ফুটবল’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
নেটালাপ : ফুটবল মেরুকরণে ‘আফ্রিকা’ ও ‘লাতিন’
কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক
আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার
‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার
‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ
. . .
লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সুমন বনিক : থার্ড লেন স্পেস.কম
সুমন বনিক-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



