পাসোলিনি ও ফুটবল

বিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে পিয়ের পাওলো পাসোলিনি (১৯২২–১৯৭৫) প্রভাববিস্তারী এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নিজদেশ ইতালির সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত চলচ্চিত্র নির্মাতা কেবল সিনেমায় বিচরণ করেছেন, তা নয়। কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও জনসম্পৃক্ত বুদ্ধিজীবীর পরিচয় তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে নতুন পালাবদল ও রূপান্তরে গভীরভাবে আলোড়িত ছিলেন পাসোলিনি। তাঁর সিনেমা তৈরির শিল্পকৌশল ও লেখালেখিতে যা গভীর ছাপ ফেলেছিল। সমকালীন ইউরোপীয় সাহিত্য-শিল্পকলায় পাসোলিনির মতো বহুমনস্বীতার নজির অধিক নেই। তাঁর কাছে শিল্প ছিল বাস্তবতাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার শক্তিশালী প্রকাশমাধ্যম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, টেলিভিশনের বিস্তার ও ভোগবাদের উত্থান দেশটিকে নতুন সমাজ-বাস্তবতায় ঠেলে দেয়। অনেকের কাছে পরিবর্তনটি ছিল আধুনিকতার দিকে নতুন অগ্রযাত্রা। পাসোলিনি কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতরে অন্য সংকট দেখতে পাচ্ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল,—অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের অভিজ্ঞতা, ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একরকম হয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, স্থানীয় সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর বাজার মানুষের রুচি ও কল্পনাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। পরবর্তী সময়ে এই পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখা প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও চলচ্চিত্রের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্বাসে বামপন্থী পাসোলিনি কখনো দলীয় আনুগত্যকে সার্বভৌম বিবেচনা করেননি। রক্ষণশীল রাজনীতির সমালোচনা করেছেন, আবার প্রয়োজনে বামপন্থায় দেখা দেওয়া আত্মতুষ্টি, মধ্যবিত্তপণা ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতাকে কুঠার হানতে দ্বিধা করেননি। ষাটের দশকজুড়ে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন নিয়ে তাঁর অবস্থান অনেককে বিস্মিত করেছিল, যদিও ভোগবাদের উত্থান নিয়ে তাঁর ভাবনা ও সতর্কবার্তায় সময়ের চেয়ে এগিয়েই থেকেছেন ইতালীয় সিনেমার সৃষ্টিশীল কাণ্ডারিদের অন্যতম এই গুণী। নিজের স্বাধীন অবস্থান পাসোলিনিকে তাঁর সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত ও একাসঙ্গে মনোযোগী চিন্তকদের একজন করে তুলেছিল।
পাসোলিনির চলচ্চিত্রে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাই। Accattone, Mamma Roma, The Gospel According to Matthew, The Hawks and the Sparrows, Oedipus Rex কিংবা Medea… প্রতিটি চলচ্চিত্রে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, ধর্ম, ক্ষমতা, যৌনতা, পৌরাণিক কাহিনি এবং আধুনিকতার দ্বন্দ্ব নতুন ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তিনি। পাসোলিনি বিশ্বাস করতেন,—চলচ্চিত্রও একধরনের ভাষা, যার নিজস্ব ব্যাকরণ ও প্রকাশরীতি রয়েছে। ধারণাটি পরে তাঁকে আরেকটি প্রশ্নে নিয়ে যায়,—চলচ্চিত্র যদি একটি ভাষা হতে পারে, তাহলে ফুটবল কেন নয়?
এই প্রশ্নের পেছনে শুধু একজন ভাবুকমনের কৌতূহল ছিল এমন নয়,—এর সঙ্গে ছিল একজন খেলোয়াড়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। শৈশব থেকে ফুটবল পাসোলিনির জীবনধারার অংশ হয়ে থেকেছে। স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন,—জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় বিকেলগুলো কেটেছে টানা সাত-আট ঘণ্টা ফুটবল খেলে। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতেন পাসোলিনি। রোমে থাকার সময় পাড়ার তরুণদের সঙ্গে ফুটবল খেলছেন নিয়মিত। শুটিংয়ের অবসরে ইউনিটের সবাইকে জড়ো করে ফুটবল ম্যাচ খেলতে নামতেন। বন্ধুদের স্মৃতিতে পিয়ের পাওলো পাসোলিনি কেবল একজন কবি ও চলচ্চিত্রকার ছিলেন না;—জিততে মরিয়া ফুটবলার পরিচয়েও তাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছেন।
ফুটবল তাঁর কাছে মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম ছিল। মাঠে একজন শ্রমিক, ছাত্র, অভিনেতা অথবা কবির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না;—অভিজ্ঞতাটি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। ফুটবলকে যে-কারণে সামাজিক ছকের বাইরে ঘটতে থাকা কোনো ঘটনা হিসেবে কখনো বিবেচনা করেননি। পাসোলিনি বিশ্বাস করতেন,—সমাজকে বুঝতে হলে তার ভাষা, সাহিত্য, সিনেমার পাশাপাশি ফুটবল খেলার মাহাত্ম্য বোঝাটাও সমান গুরুত্ব রাখে। নিজের এক লেখায় ফুটবল নিয়ে তাঁর মন্তব্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। পাসোলিনি সেখানে লিখেছেন :
Football is the last sacred ritual of our time.

বাক্যটির মধ্যে তাঁর ভাবনার গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে। আধুনিক পৃথিবীতে এমন সামাজিক অভিজ্ঞতা আমরা কম খুঁজে পাই, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ অভিন্ন অনুভূতি, আবেগ, প্রতীক্ষা ও প্রতীককে ঘিরে এভাবে সমবেত বা একত্রিত হয়। তাঁর কাছে ফুটবল হচ্ছে সেই বিরল অভিজ্ঞতার একটি। তিনি জানতেন, কোনো একটি খেলা যদি কোটি-কোটি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে একে অবজ্ঞা করে সমাজকে বোঝা সম্ভব হয় না। আমাদের বরং প্রশ্ন তোলা উচিত,—মানুষ কেন এই খেলার সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত করছে নিজেকে? কী এমন আছে ফুটবলের মধ্যে, যা ভাষা, শ্রেণি, অঞ্চল কিংবা শিক্ষার নানান প্রভেদ ছাপিয়ে মানুষের অনুভূতিকে একসুতোয় বেঁধে রাখছে? ক্যারিবীয় লেখক ও ইতিহাসবিদ সি. এল. আর. জেমস ক্রিকেট সম্পর্কে লিখেছিলেন :
যারা শুধু ক্রিকেট জানে, তারা ক্রিকেট সম্পর্কে কতটুকু জানে?
তাঁর বক্তব্য ছিল, ক্রিকেটকে বুঝতে হলে উপনিবেশ, শ্রেণি, বর্ণ ও সমাজকে আগে বুঝতে হবে। পাসোলিনির ফুটবল-ভাবনা যেন এখানে বিয়ন্ড অ্যা বাউন্ডারির (Beyond a Boundary) প্রাতঃস্মরণীয় লেখকের ক্রিকেট-ভাবনার সঙ্গে একরেখায় মিলেছে! পাসোলিনিও ভেবেছেন,—ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু খেলার নিয়ম আর আইন জানলে চলবে না;—এর ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জানা প্রয়োজন। চামড়ার গোলক যে-সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা বহন করছে, এর মূল্য নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা উচিত। এবং, ফুটবল কেন ও কীভাবে রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তার অন্ধিসন্ধি জানাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাবনা ও অনুসন্ধান পাসোলিনিকে ভাষাতত্ত্বের আলোয় ফুটবল কীভাবে স্বয়ং একটি ভাষা ও চিহ্নব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে, এর ব্যাখ্যায় আগ্রহী করে তুলেছিল।
১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে ইতালির দৈনিক Il Giorno-তে তাঁর ছোট্ট কিন্তু অসাধারণ একটি রচনা প্রকাশিত হয়। Il calcio è un linguaggio con i suoi poeti e prosatori শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধটি যুগান্তকারী ছিল। বাংলা ভাষান্তরে আমরা একে ‘ফুটবল একটি ভাষা, যার নিজস্ব কবি ও গদ্যকার রয়েছে’ বলে বুঝে নিতে পারি। ফুটবল-চিন্তার ইতিহাসে ছোট্ট লেখাটির গুরুত্ব অসামান্য। ফুটবলকে পাসোলিনি দেখেছেন স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতায় পরিপূর্ণ ভাষা হিসেবে। এই ভাষার একান্ত সব চিহ্ন, ব্যাকরণ, প্রকাশভঙ্গি ও নন্দনতত্ত্ব রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত ‘গদ্যের ফুটবল’ ও ‘কবিতার ফুটবল’ ধারণাটি মূলত এই লেখাটি লিখতে বসে জন্ম নিয়েছিল।
লেখাটির বয়স পঞ্চাশের কোঠা ছাড়িয়েছে ইতোমধ্যে। ফুটবলে পালাবদল ঘটেছে ব্যাপক। ইয়োহানেস ক্রুইফদের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসা ‘টোটাল ফুটবল’-এর ধারণা ইউরোপে খেলাটির কৌশলে এনেছে রূপান্তর। অন্যদিকে, ১৯৮২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিল দেখিয়েছে,—সৌন্দর্য সবসময় শিরোপার সমার্থক নয়। দিয়েগো মারাদোনা, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, জিনেদান জিদান, লিওনেল মেসি, এবং বর্তমান প্রজন্মের অসাধারণ ফুটবল প্রতিভারা ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাকে নতুন মাত্রায় রঙিন করেছেন। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ফুটবলশৈলী ও নান্দনিকতায় বিদ্যমান ‘ভিন্নতা’ সময়ের পালাবদলে অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তি, বিশ্বজুড়ে খেলা সম্প্রচারে আমূল পরিবর্তন, আর বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ফুটবলকে নতুন মেরুকরণ ও বাস্তবতায় গমন করতে বাধ্য করেছে।
পাসোলিনির লেখা তবু প্রাসঙ্গিক। সৃজনশীলতা, ভাষা ও মানুষের প্রকাশ-ক্ষমতাকে লেখায় তুলে আনার কারণে এর প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন। কোনো খেলোয়াড় যখন প্রতিষ্ঠিত ছক ভেঙে এমন কিছু করেন, যা আগে কল্পনা করেনি কেউ, আমরা তখন এই সৃজনশীলতার মূল্য অনুভব করতে পাসোলিনির ভাবনায় বর্ণিল ফুটবলের কাছে ফেরত যাই। তাঁর ছোট্ট নিবন্ধটি তখন ‘সমকালীন’ হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। ফুটবল পালটেছে বা সামনে আরও পালটাবে, কিন্তু তার ভিতরে সক্রিয় সৃষ্টিশীল উত্তাপ টের পাওয়া ও এর উষ্ণতা উপভোগ করার বিস্ময় যেন শেষ হওয়ার নয়!
পাসোলিনি এই নিবন্ধটি লেখেন ১৯৭১ সনে। তাঁর সামনে তখন ১৯৭০-এর বিশ্বজয়ী অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিল! পেলের নেতৃত্বে এমন একটি দল তখন মাঠে খেলছিল, যাদের ফুটবলশৈলীতে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখতে পাচ্ছিলেন পাসোলিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ইউরোপীয় ফুটবলকে ‘গদ্যচালে বোনা ফুটবল’ ও ব্রাজিলীয় ফুটবলকে ‘কবিতা দিয়ে মোড়ানো ফুটবল’ নামে প্রশংসিত করেন। এই বিশেষায়ণকে অবশ্য স্থির মানদণ্ড গণ্য করেননি তিনি। তাঁর নিজের ভাষায়, এটি ছিল ফুটবলের দুই ভিন্ন নন্দনতাত্ত্বিক রূপের ছটা।

পাসোলিনি যখন তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধটি লিখছেন, ইউরোপের ফুটবল ততদিনে দ্রুত পরিবর্তনের পথে হাঁটছিল। কয়েক বছরের মধ্যে রিনুস মিখেলস ও ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডস টোটাল ফুটবল খেলে ইউরোপীয় ফুটবলশৈলীকে নতুন চেহারা দেন। আর, এর ঠিক এক দশক পরে ব্রাজিল এমন একটি দল নিয়ে বিশ্বকাপে আসে, যাকে আজও অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে নান্দনিক ফুটবল দলগুলোর একটি মনে করেন। পাসোলিনি মারা যাওয়ার এগারো বছর পর মেক্সিকোর আজটেকায় দিয়েগো মারাদোনা এমন এক গোল করেন, যা তাঁর ‘কবিতার ফুটবল’ ধারণাটিকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়। আজ, ফিরে তাকালে বিস্ময় জাগে—পাসোলিনি যেন শুধু তাঁর সময়ের ফুটবলকে বিশ্লেষণ করেননি, খেলাটিকে বোঝার এমন এক ভাষা রপ্ত করেছিলেন, যা পরবর্তী ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে।
১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলের খেলাকে কবিতা নামে বিশেষায়িত করেন পাসোলিনি। দলটির খেলায় এমন এক নান্দনিক প্রতিভাস তাঁর চোখে ধরা পড়ছিল, যেখানে ড্রিবল হচ্ছে কল্পনার ভাষা, পাস হলো ছন্দ, আর গোল ছিল কবিতার শেষ পঙ্ক্তি। পেলে, গারিঞ্চা, জাইরজিনহো, তোস্তাঁও, রিভেলিনো, কার্লোস আলবার্তো… প্রত্যেকে যেন একই ভাষার ভিন্ন-ভিন্ন প্রকাশ। তারা কেবল জিততে মাঠে নামেনি, খেলায় নতুন অর্থ ও দ্যোতনা উপহার দিচ্ছিল। পাসোলিনির কাছে এই সৃজনশীলতা ছিল কবিতার লক্ষণে ভরপুর।
পাসোলিনি যখন ব্রাজিল দলের খেলাকে ‘কবিতা’ এবং ইতালিকে ‘গদ্য’ রূপে পাঠ করছেন, ইউরোপের ফুটবল ততদিনে নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হচ্ছিল। ১৯৭৪ সালের নেদারল্যান্ডস, রিনুস মিখেলস ও ইয়োহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবল সেই পরিবর্তনকে বিশ্বমঞ্চে দৃশ্যমান করে। ইয়োহান ক্রুইফের উক্তি নতুন যুগের ফুটবলশৈলীতে লাভ করে অমরত্ব :
In my team, the goalkeeper is the first attacker and the forward is the first defender.
প্রথম দর্শনে টোটাল ফুটবলের ছকটাকে মনে হবে শৃঙ্খলায় সাজানো ফুটবল;—মাঠে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন, সমষ্টিগত চলাচল, জ্যামিতিক বিন্যাসে বাঁধা জমাট ছন্দে খেলছে এগারোজন। গভীরে তাকালে বোঝা যায়,—শৃঙ্খলাটি যান্ত্রিক নয়। এর ভেতরে কল্পনার বিস্তার আছে যথেষ্ট। প্রতিটি খেলোয়াড় যেন ফুটবলের ছকে একইসঙ্গে লেখক ও পাঠক! নিজের অবস্থান মুহূর্তে রদবদল করছে তারা। লেখক রচিত বাক্যকে পূর্ণতা দিতে ভূমিকা রাখছে পাঠক, আবার পাঠককে পূর্ণতা দিতে লেখক যোগ করছে নতুন বাক্য। পাসোলিনির ধারণার আলোকে টোটাল ফুটবলকে গদ্যদেহে জন্ম নেওয়া ‘নতুন এক কবিতা’ রূপে পাঠ করা যায় অনায়াসে।
তবু, তাঁর ‘কবিতার ফুটবল’-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উত্তরাধিকার সম্ভবত ধরা দেয় ১৯৮২ সালে। স্পেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল যে-দল নিয়ে এসেছিল তারা ট্রফি জিততে পারেনি। তা-সত্ত্বেও এই দলটিকে ইতিহাসের সেরা দলগুলোর একটি গণ্য করা হয়। টেলি সান্তানার সেই ব্রাজিলে জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও, সেরেজো, এডেরের মতো ফুটবলশিল্পী ছিলেন। পুরো দলটির খেলায় এমন এক সমন্বয় ও সৃজনশীলতা ছিল, যা পাসোলিনির ভাষায় ফুটবলকে কবিতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। দলটি তারপরেও বিশ্বকাপ জেতেনি। পাওলো রসির ইতালির কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা। পরাজিত দলটি মানুষের স্মৃতিতে অদ্ভুতভাবে বিজয়ীদের চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে আছে! ফলাফল ইতিহাসে লেখা থাকে, কিন্তু সৌন্দর্য মানুষের স্মৃতিতে বাস করে।
পরবর্তী দশকগুলোয় দিয়েগো মারাদোনা, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, জিনেদিন জিদান, লিওনেল মেসি ও আরও অনেক অসাধারণ ফুটবলারের খেলায় আমরা ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার এমন সব মুহূর্ত দেখেছি, যা পাসোলিনির ভাষাকে নতুন করে স্মরণ করতে বাধ্য করে। বিশেষত মারাদোনার কথা আগে আসে। পাসোলিনি তাঁকে দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর ‘কবিতার ফুটবল’ ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি হয়ে আছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মারাদোনার দ্বিতীয় গোল।

পাসোলিনি লিখেছিলেন, পৃথিবীর প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্বপ্ন মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একে একে সবাইকে কাটিয়ে গোল করা। তিনি নিজে স্বীকার করেছিলেন, বাস্তবে এমন ঘটনা বিরল। ষোলো বছর পরে মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মারাদোনা সেই অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দেন। প্রতিটি ড্রিবলে প্রতিষ্ঠিত ছক ভেঙে এগিয়েছেন, আর শেষপর্যন্ত এমন একটি গোল করলেন, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সৃজনশীল মুহূর্তগুলোর একটি বিবেচিত হয়।
একইভাবে, লিওনেল মেসির খেলাও পাসোলিনির ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়ে যায়। তাঁর ফুটবলে ব্যক্তিগত প্রতিভা ও দলগত সংহতি পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। কখনও তিনি একক ড্রিবলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন, আবার কখনও একটি নিখুঁত পাস বা সমষ্টিগত আক্রমণে শেষ স্পর্শ দিয়ে একই কাজ করেন। মেসির ফুটবল দেখায়,—আধুনিক ফুটবলে সৃজনশীলতা ও কৌশলকে আলাদা করে দেখার সুযোগ সীমিত। এই অর্থে পাসোলিনির ‘গদ্যের ফুটবল’ ও ‘কবিতার ফুটবল’ একালে এসে পরস্পরবিরোধী নয়, তারা বরং একই খেলার দুটি সম্পূরক রূপ।
সময়ের বিবর্তনে অঞ্চলভিত্তিক ফুটবলে বড়ো পরিবর্তন এসেছে। শিল্প-সৌন্দর্যের চেয়ে ফলাফল হয়ে উঠছে বিবেচ্য। লাতিন আমেরিকার চিরায়ত শৈলী ইউরোপীয় কৌশলগত ফুটবলের প্রভাবকে আত্মস্থ ও গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকক্ষেত্রে। ইউরোপীয় ফুটবল অন্যদিকে আরও গতিশীল, সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। এর ফলে ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকার ফুটবলে যে-স্পষ্ট নন্দনতাত্ত্বিক পার্থক্য পাসোলিনি দেখেছিলেন তাঁর সময়ে, আজ তা অনেকখানি ম্লান মনে হবে দেখে!
আরও একটি পরিবর্তন ঘটেছে, যা সম্ভবত পাসোলিনিকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলত। তাঁর সময়ে ফুটবল ছিল প্রধানত একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা;—আজ তা নয়! ফুটবল এখন একাধারে বৈশ্বিক ও বহুজাতিক পুঁজি নির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। খেলার সম্প্রচারস্বত্ব, বহুজাতিক বিনিয়োগ, খেলোয়াড়ের বাজারমূল্য নির্ধারণ, তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম ও ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রভাব ফুটবলের চেহারা পালটে দিয়েছে। ক্লাব শুধু ক্লাব নয়, ওটা এখন বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। খেলোয়াড় মানে বিজ্ঞাপনের মডেল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবক ও বিপণনের প্রাণভোমরা। খেলার এই অতি বাণিজ্যিকায়ন এর নান্দনিকতাকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে অনেকক্ষেত্রে।
পাসোলিনি আধুনিক প্রযুক্তির বিরোধী ছিলেন না। তাঁর আপত্তি ছিল এমন এক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যেখানে সবকিছুর মূল্য শেষপর্যন্ত বাজার নির্ধারণ করছে। আজকের ফুটবলের দিকে তাকালে তাঁর সেই আশঙ্কা অর্থবোধক হয়ে ধরা দেয়। একজন তরুণ খেলোয়াড় মাঠে নামার আগে তার বাজারমূল্য ঠিক হয়ে যাচ্ছে। অনেকসময় একটি ড্রিবলের চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ট্রান্সফার ফি। মাঠের ভেতরেও পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্প্রিন্ট আজ পরিমাপযোগ্য তথ্য। প্রশ্ন থেকে যায় :—এই অগ্রগতির ভেতরেও মানুষের স্বাধীন কল্পনার জায়গা কতটা রয়েছে এখনো? ফুটবলের কবিরা কি নিজভাষায় কথা বলতে পারেন, নাকি তাদেরকে বাজারের ব্যাকরণ মেনে চলতে বাধ্য করা হয়?
ইতিহাস অবশ্য বারবার দেখিয়েছে,—বাজার কখনও পুরোপুরি কল্পনাকে বন্দি করতে পারে না। রোনালদিনহো যখন হঠাৎ বলটি প্রতিপক্ষের মাথার ওপর দিয়ে তুলে আবার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন, মেসি যখন চারজনকে কাটিয়ে এগিয়ে যান, লুকা মদ্রিচ এমন একটি পাস দেন, যা মুহূর্তে পুরো রক্ষণভাগের বিন্যাস বদলে দেয় অথবা লামিন ইয়ামাল যখন অল্প বয়সে এমন ড্রিবল করেন, যা অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারকেও বিস্মিত করে,—তখন মনে হয়, ফুটবলের ভাষায় কবিতা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
পাসোলিনির মৌলিক ভাবনাকে এখানে এসে আর অপ্রাসঙ্গিক ভাবার সুযোগ থাকে না। কারণ, তিনি কখনো কোনো নির্দিষ্ট খেলার কৌশলকে চূড়ান্ত সত্য বলে ভাবেননি। ফুটবলকে কেবল ফলাফল বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না ভেবে এর সৃজনশীল মুহূর্তগুলোর দিকে তাকাতে শিখিয়েছেন। একটি অপ্রত্যাশিত ড্রিবল, একটি কল্পনাপ্রসূত পাস কিংবা একটি গোল যে-মুহূর্তে প্রতিষ্ঠিত ছক ভেঙে নতুন কিছু সৃষ্টি করে, সেই মুহূর্তে ফুটবল তার বাজারমূল্য ও প্রয়োজনীয়তা অতিক্রম করে শিল্প হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর রচনাটিকে আজও সমকালীন করে রেখেছে।
১৯৭৫ সালে রহস্যজনকভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন পাসোলিনি। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা আজও বিতর্কের বিষয়। শেষ বিদায়ের একটি দৃশ্য বহু মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সের্জিও চিত্তি কফিনের ওপর একটি ফুটবল জার্সি বিছিয়ে দিয়েছিলেন। যে-মানুষটি লিখেছিলেন :
Football is the last sacred ritual of our time.
তাঁর প্রতি এরচেয়ে উপযুক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি আর কী হতে পারত! কবিতা, চলচ্চিত্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতিচিন্তার পাশাপাশি ফুটবল ছিল তাঁর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ফুটবল নিয়ে পাসোলিনির সংক্ষিপ্ত রচনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা বেশ কঠিন মনে হবে। কেননা, এটি তাঁর বৃহত্তর চিন্তার স্বাভাবিক সম্প্রসারণ;—যেখানে ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতা এসে মিলিত হয়েছে এক অভিন্ন মানবিক অভিজ্ঞতায়।
. . .

ফুটবল একটি ভাষা, যার নিজস্ব কবি ও গদ্যকার রয়েছে
মূল রচনা : পিয়ের পাওলো পাসোলিনি
ভাষান্তর : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
ভাষা নিয়ে বর্তমানে যে-বিতর্ক চলছে, যা কৃত্রিমভাবে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও ফুটবলারদের পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, উক্ত বিষয়ে ‘ল’ ইউরোপো’ পত্রিকার সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। সাংবাদিকতার স্বভাবগত সংক্ষিপ্ততার কারণে আমার উত্তরগুলো সেখানে সংক্ষিপ্ত ও খণ্ডিতভাবে এসেছে। বিষয়টি যেহেতু আমার জন্য বিশেষ আগ্রহের, এবার তাই শান্তমনে ও প্রতিটি কথার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
ভাষা কী? একজন সেমিওলজিস্ট (চিহ্নতাত্ত্বিক) সম্ভবত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও নির্ভুল উত্তর দেবেন,—ভাষা হলো একটি চিহ্নব্যবস্থা। এই ‘চিহ্নব্যবস্থা’ কেবল লিখিত বা মৌখিক ভাষা নয়;—যেমন এই মুহূর্তে আমি লিখছি, আর আপনি পাঠক তা পড়ছেন। চিহ্নব্যবস্থার স্বরূপ অনেকরকম হতে পারে। একটি উদাহরণ নেওয়া যাক :
আপনি আর আমি একটি ঘরে আছি। ঘিরেলি (Ghirelli) ও ব্রেরাও (Brera) সেখানে রয়েছে। আপনি আমাকে ঘিরেলি সম্পর্কে এমন কিছু বলতে চাইছিলেন, যা আবার ব্রেরা শুনে ফেলুক তা চাইছেন না। এমতাবস্থায় মুখে কিছু বলা যাবে না। আপনাকে বাধ্য হয়ে অন্য একটি চিহ্নব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হবে। ধরা যাক, মুখভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির সাহায্য নিলেন আপনি। চোখ দিয়ে ইশারা করলেন। মুখ বিকৃত করলেন। হাতের ইশারায় ও পা দিয়ে সংকেত জানালেন। আপনি তখন একটি নীরব বার্তা পাঠাচ্ছেন, আর আমি সেই বার্তার অর্থ উদ্ধার করছি। আমাদের দুজনের মধ্যে বিনিময়ী সেই ভাষাটি বোঝার অভিন্ন সংকেত যেখানে কাজ করছে।
চিত্রকলা, চলচ্চিত্র কিংবা পোশাকে গুঞ্জরিত ভাষার মতো আরও অনেক অ-শাব্দিক চিহ্নব্যবস্থা রয়েছে;—এটা নিয়ে ভাষাতত্ত্ব ও চিহ্নবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাবুক রোলাঁ বার্থ (Roland Barthes) বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ফুটবলও সেরকম এক চিহ্নব্যবস্থা। একটি ভাষা, যদিও শব্দে স্পন্দিত ভাষা এটা নয়। আমি এই আলোচনা শুরু করছি কেন? কারণ, সাহিত্যিকদের ভাষা আর সাংবাদিকদের ভাষাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যে-বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে, সেটি আসলে ভ্রান্ত। প্রকৃত প্রশ্নটি অন্যত্র।
প্রতিটি ভাষার, অর্থাৎ প্রতিটি লিখিত বা কথ্য চিহ্নব্যবস্থার একটি সাধারণ কোড থাকে। ইতালীয় ভাষার কথাই ধরি। আমি ও আপনি এই ভাষায় একে অপরকে বুঝতে পারি, কেননা ভাষাটি আমাদের যৌথ সম্পদ;—আমাদের পারস্পরিক বিনিময়ের সাধারণ মাধ্যম। কিন্তু প্রতিটি ভাষার ভেতরে আবার নানা উপভাষা ও নিজস্ব ভাষারীতি গড়ে ওঠে। চিকিৎসকরা তাঁদের বিশেষ পরিভাষায় কথা বললে অন্য চিকিৎসক সহজেই বুঝতে পারেন, যেহেতু তাঁরা সেই ভাষারীতির সঙ্গে পরিচিত। ধর্মতাত্ত্বিকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সাহিত্যিক ভাষাও একটি বিশেষ ভাষা, যার নিজস্ব ভাষারীতি রয়েছে। যেমন ধরুন কবিতা। দৈনন্দিন ভাষার পরিবর্তে লাতিনমূলের শব্দ, প্রাচীন শব্দ, সংক্ষিপ্ত রূপ বা পুরোনো শব্দচয়ন ব্যবহৃত হতে পারে। এতে আমরা বিস্মিত হই না, কারণ আমরা জানি সাহিত্যিক ভাষার নিজস্ব নিয়ম আছে, সেই নিয়ম এসব ব্যবহারের অনুমতি কবিকে দিচ্ছে।
সাংবাদিকতার ভাষাও সাহিত্যিক ভাষার কোনো নিম্নস্তরের শাখা নয়, এবং তা বোঝার জন্য এর নিজস্ব ভাষারীতির সঙ্গে আমাদের পরিচিত হওয়া দরকার। সহজ কথায়,—সাংবাদিকরাও লেখক। পার্থক্য এই-যে, জটিল ধারণা ও বাস্তবতাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ করে তুলে ধরার জন্য তাঁরা সাহিত্যিক ভাষার তুলনায় অপেক্ষাকৃত সরল ভাষারীতি ব্যবহার করেন। খেলাধুলার ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়,—তা যেন সাহিত্যিক ভাষার দ্বিতীয় বিভাগ। এমনকি জিয়ান্নি ব্রেরার ভাষাও কার্লো এমিলিও গাদ্দা বা জিয়ানফ্রাঙ্কো কন্তিনির ভাষার তুলনায় দ্বিতীয় স্তরে পড়ছে। তবু, ইতালীয় ক্রীড়া-সাংবাদিকতায় ব্রেরার ভাষাকে সম্ভবত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উদাহরণ গণ্য করা যেতে পারে।
অতএব সাহিত্যিক ভাষা ও সাংবাদিকতার ভাষায় প্রকৃতপক্ষে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। বরং সাংবাদিকতা, যা দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যিক ভাষার সহচর, গণসংস্কৃতিতে তা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করার পর কিছুটা নব্যধনীর মতো আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতায় ভুগছে।

এবার ফুটবলের কথায় আসি। ফুটবলও একটি চিহ্নব্যবস্থা, অর্থাৎ ওটাও একটি ভাষা। শুধু তাই নয়, ভাষা বলতে আমরা সচরাচর যে-লিখিত বা কথ্য ভাষা বুঝি, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো এখানেও মিলবে। কেন? যেহেতু, ফুটবলেও ‘শব্দ’ সেভাবে জন্ম নেয়, লিখিত বা কথ্য ভাষায় ‘শব্দ’ যেমন করে জন্ম নিয়ে থাকে। শব্দ কীভাবে তৈরি হয়? ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায়,—শব্দ গড়ে ওঠে অসংখ্য ধ্বনির সমন্বয়ে। ইতালীয় ভাষায় এই ধ্বনিগুচ্ছের প্রতীক হলো বর্ণমালার একুশটি অক্ষর। ধ্বনি-একক, যাকে আমরা ‘ফোনিম’ বলছি, এটা হলো ভাষার ক্ষুদ্রতম গাঠনিক উপাদান।
মজা করে বলা যাক,—ফুটবলের ক্ষুদ্রতম একক হচ্ছে একজন মানুষ। নিজের পা দিয়ে সে বলে লাথি মারছে। ইচ্ছে করলে এই একককে আমরা ‘পোদেমা’ নামে ডাকতে পারি। যেমন, অসংখ্য ‘ফোনিম’ মিলিয়ে শব্দ তৈরি হয়, তেমনি অসংখ্য ‘পোদেমা’র সম্ভাব্য সমন্বয় থেকে জন্ম নেয় ফুটবলের নিজস্ব শব্দ। আর, এই শব্দগুলো একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে একটি পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য,—যার নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে।
একটি ম্যাচে পোদেমার সংখ্যা বাইশ। সংখ্যাটি কাকতালীয়ভাবে ফোনিমের সংখ্যার কাছাকাছি। কিন্তু তাদের সমন্বয়ের সম্ভাবনা কার্যত অসীম। কারণ এক খেলোয়াড় থেকে আরেক খেলোয়াড়ের কাছে বল কতভাবে যেতে পারে, তার কোনো শেষ নেই। সেই অসংখ্য সম্ভাব্য পাসই ফুটবলের অভিধান তৈরি করে। এই শব্দগুলোর সমষ্টি, একটি নির্দিষ্ট বাক্যবিন্যাসে সংগঠিত হয়ে, শেষপর্যন্ত যে-রূপ ধারণ করে, সেটি গড়ায় ফুটবল ম্যাচে।
অন্যভাবে বললে,—একটি ম্যাচ হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ বয়ান। এই ভাষা কারা লেখে? খেলোয়াড়রা লেখে। আর আমরা? আমরা, গ্যালারিতে বসে ভাষাটি পাঠ করে চলি। খেলোয়াড় সংকেত তৈরি করেন, আমরা ওই সংকেতের অর্থ উদ্ধার করি। অর্থাৎ, আমাদের সবার মধ্যে একটি অভিন্ন ভাষারীতি কাজ করছে। যে-মানুষ ফুটবলের এই ভাষারীতি জানে না, সে একটি পাসেরও অর্থ বুঝবে না। আর, পাসগুলো একত্রে যে-বৃহত্তর বক্তব্য তৈরি করছে, অর্থাৎ একটি ম্যাচের জন্ম দিচ্ছে, এর অর্থও তার কাছে অধরাই থেকে যাবে। আমি রোলাঁ বার্থ নই, আলগিরদাস জুলিয়ান গ্রেইমাসও নই। একজন অপেশাদার হিসেবে তবু ইচ্ছে করলে ‘ফুটবলের ভাষা’ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার পরিবর্তে সবিস্তারে লেখাটা আমাকে দিয়েও সম্ভব।
আমার আরও মনে হয়,—‘ফুটবলে প্রপের তত্ত্বের প্রয়োগ’ শিরোনামে একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখা সম্ভব। কারণ, অন্য সব ভাষার মতো ফুটবলেরও একদিকে রয়েছে সম্পূর্ণ কার্যকর বা যান্ত্রিক স্তর, যা কঠোরভাবে নিয়ম ও সংকেত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত;—আর অন্যদিকে রয়েছে তার প্রকাশময় বা সৃজনশীল স্তর।
আমি আগেই বলেছি, প্রতিটি ভাষাই নানা উপভাষা বা উপ-ভাষিক রূপে বিভক্ত, এবং প্রতিটি উপভাষার নিজস্ব ভাষারীতি থাকে। ফুটবলের ভাষার ক্ষেত্রেও একইকথা প্রযোজ্য। ফুটবল যখন কেবল একটি কার্যকরী বা যান্ত্রিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রকাশের মাধ্যম রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন তারও ভিন্ন-ভিন্ন ভাষারীতি গড়ে ওঠে। এমন ফুটবল আছে, তার ভাষা মূলত গদ্যময়;—আবার এমন ফুটবলও আছে, যার ভাষা কবিতাময়।
আমার বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দিই। বুলগারেল্লি (Giacomo Bulgarelli) গদ্যের ফুটবল খেলেন। তিনি একজন বাস্তববাদী গদ্যকার। রিভা (Gigi Riva) খেলেন কবিতার ফুটবল। তিনি একজন বাস্তববাদী কবি। করসোও (Mario Corso) কবিতার ফুটবল খেলেন। তবে তিনি বাস্তববাদী কবি নন, তিনি যেন এক অভিশপ্ত কবি!—খামখেয়ালি, ব্যতিক্রমী ও নিয়মভঙ্গকারী। রিভেরা (Gianni Rivera) গদ্যের ফুটবল খেলেন, কিন্তু তাঁর গদ্য কাব্যিক;—যেন এলৎসেভিরো ধারার পরিশীলিত সাহিত্যিক গদ্য। মাজ্জোলার (Sandro Mazzola) গদ্য যেন Corriere della Sera (ইতালির অন্যতম প্রধান দৈনিক)-এর কোনো পরিশীলিত সাহিত্যিক প্রাবন্ধিকের গদ্য। তবে তিনি রিভেরার চেয়ে বেশি কবি। মাঝেমধ্যে তিনি গদ্যের প্রবাহ থামিয়ে এমন দুই-একটি মুহূর্ত সৃষ্টি করেন, যা বিদ্যুৎ ঝলকের মতো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আমি গদ্য আর কবিতার মধ্যে কোনো মূল্যগত পার্থক্য করছি না। আমার এই বিভাজন সম্পূর্ণ আঙ্গিকগত, সম্পূর্ণ নন্দনতাত্ত্বিক। তবু একটি কথা না বললে নয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইতালীয় সাহিত্য মূলত এলৎসেভিরো ধারার সাহিত্য। মার্জিত, পরিশীলিত, কখনও কখনও অতিরিক্ত নান্দনিক। কিন্তু তার অন্তর্গত সুরটি প্রায়ই রক্ষণশীল, কিছুটা প্রাদেশিক, সংক্ষেপে বললে,—খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী মানসিকতার। একটি দেশে যত ভাষাই প্রচলিত থাকুক না কেন,—সেগুলো যত বিশেষায়িত বা দুর্বোধ্য হোক, সবকিছুর নিচে একটি অভিন্ন ভিত্তি আসলে কাজ করে। সেটি হলো সেই দেশের সংস্কৃতি, সেই দেশের ইতিহাস ও সেই সময়ের বাস্তবতা।
এসব কারণে কিছু জাতির ফুটবল মূলত গদ্যময়। কোথাও তা বাস্তববাদী গদ্য, কোথাও নান্দনিক গদ্য। ইতালীয় ফুটবল তার উদাহরণ। আবার এমন জাতিও আছে, যাদের ফুটবল মূলত কবিতার ভাষায় কথা বলে। ফুটবলে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা সম্পূর্ণরূপে কবিতার অন্তর্গত। সেই মুহূর্তটির নাম হলো… ‘গোল’।
প্রতিটি গোল একটি আবিষ্কার। প্রতিটি গোল প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বিরুদ্ধে একধরনের বিদ্রোহ। প্রতিটি গোলের মধ্যে আছে অনিবার্যতা, আকস্মিক আলোর ঝলক, বিস্ময়, এবং এমন এক চূড়ান্ততা, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। ঠিক একটি প্রকৃত কবিতার মতো। এ-কারণেই একটি মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা আসলে সেই বছরের সেরা কবি। এই মুহূর্তে সেই কবি সাভোলদি (Giuseppe Savoldi)। যে-ফুটবল সবচেয়ে বেশি গোল সৃষ্টি করে, সেটিই সবচেয়ে কবিতাময় ফুটবল। ড্রিবলও নিজস্বভাবে এক ধরনের কবিতা। যদিও প্রতিবার নয়, গোলের মতো অনিবার্যও নয়।

প্রতিটি ফুটবলারের, আর প্রতিটি দর্শকেরও,—একটি গোপন স্বপ্ন থাকে। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একা ছুটে যাওয়া, একে-একে সবাইকে কাটিয়ে ওঠা ও তারপর গোল করা। ফুটবলে যদি সত্যি কোনো মহিমান্বিত দৃশ্য কল্পনা করা যায়, তবে এটি তাই। বাস্তবে অবশ্য এমন ঘটনা খুব কম ঘটে। এটি প্রায় স্বপ্নের মতো। আমি এই স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখেছি কেবল ফ্রাঙ্কো ফ্রাঞ্চির Maghi del pallone (ফুটবলের জাদুকররা) ছবিতে। চলচ্চিত্রটি যতই সরল বা কৌতুকধর্মী হোক, সেই স্বপ্নের অনুভূতিটুকু সে আশ্চর্যরকম নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছিল।
পৃথিবীর সেরা ড্রিবলার কারা? সবচেয়ে বড় গোলস্রষ্টারাই-বা কারা? ব্রাজিলিয়ানরা। অতএব তাদের ফুটবল কবিতার ফুটবল। কারণ তাদের সমগ্র খেলার দর্শন দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিষয়ের ওপর—ড্রিবল এবং গোল। অন্যদিকে কাতেনাচ্চো আর ত্রিভুজ পাসের সমন্বয়—যাকে ব্রেরা ‘জ্যামিতি’ বলেন—সেটি গদ্যের ফুটবল। এর ভিত্তি হলো বাক্যবিন্যাস;—অর্থাৎ সমষ্টিগত, সংগঠিত ও পরিকল্পিত খেলা। অন্যভাবে বললে, এটি ফুটবলের ভাষার প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও রীতিকে যুক্তিসংগতভাবে অনুসরণ করার শিল্প।
এইধরনের ফুটবলে প্রকৃত কাব্যিক মুহূর্ত একটিই—পাল্টা আক্রমণ, এবং তার শেষ পরিণতি হিসেবে গোল। কারণ আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, গোল ছাড়া আর কিছুই সম্পূর্ণ অর্থে কবিতার পর্যায়ে পৌঁছায় না। অর্থাৎ ফুটবলের কবিতা শেষপর্যন্ত ব্যক্তির মধ্যে জন্ম নেয়—ড্রিবলে, গোলে কিংবা এমন একটি পাসে, যা হঠাৎ করে খেলার অর্থ বদলে দেয়। গদ্যের ফুটবলই হলো তথাকথিত ‘সিস্টেম ফুটবল’ অর্থাৎ ইউরোপীয় ফুটবল। তার গঠন মোটামুটি এমন :
কাতেনাচ্চো (রক্ষণনির্ভর ইতালীয় কৌশল) → ত্রিভুজ পাস → সমাপ্তি।
এই কাঠামোয় গোলের দায়িত্ব থাকে শেষ আক্রমণকারীর ওপর, সম্ভব হলে রিভার মতো একজন বাস্তববাদী কবির ওপর। কিন্তু সেই গোল আসতে হবে সমষ্টিগত খেলার সংগঠিত নির্মাণ থেকে;—ধারাবাহিক, জ্যামিতিক ও নিয়মমাফিক পাসের ফল হিসেবে।
এই অর্থে রিভেরা প্রায় নিখুঁত। কিন্তু ব্রেরা তাঁকে খুব একটা পছন্দ করেন না। কারণ তাঁর এই নিখুঁততা কিছুটা বেশি নান্দনিক, বাস্তববাদী নয়;—ইংরেজ বা জার্মান মিডফিল্ডারদের মতো কঠিন বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা নয়। অন্যদিকে কবিতার ফুটবল হলো লাতিন আমেরিকার ফুটবল। তার গঠন অনেক সহজ :
অবিরাম ব্যক্তিগত অগ্রযাত্রা → সমাপ্তি।
এইধরনের ফুটবল খেলতে হলে প্রয়োজন অসাধারণ ড্রিবলিং ক্ষমতা, যে-ক্ষমতাকে ইউরোপে অনেকসময় সমষ্টিগত ফুটবলের নামে অবহেলা করা হয়। এখানে মাঠের যে-কোনো খেলোয়াড়, যে-কোনো অবস্থান থেকে গোল সৃষ্টি করতে পারে।
যদি ড্রিবল আর গোলই ফুটবলের ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাব্যিক মুহূর্ত হয়, তবে ব্রাজিলীয় ফুটবল নিঃসন্দেহে কবিতার ফুটবল। আবারও বলছি, এখানে আমি কোনো মূল্যবিচার করছি না। এটি সম্পূর্ণ আঙ্গিকগত অর্থে বলা কথা। তবু এটুকু বলা যায়, মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইতালির নান্দনিক গদ্য শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল ব্রাজিলের কবিতার কাছে।
. . .

. . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা
নেটালাপ : ফুটবল মেরুকরণে ‘আফ্রিকা’ ও ‘লাতিন’
কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক
আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার
‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার
‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন




