
বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে চার বছর পরপর পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ কয়েক সপ্তাহের জন্য আনন্দ, বিষাদ, প্রত্যাশা, হতাশা, তর্ক-বিতর্ক ও উদ্যাপনের অভিন্ন এক সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠেন। বৈশ্বিক এই আবেগ থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় এখানে বরং আবেগের মাত্রা অধিক তীব্র দেখা যায়।
বাংলাদেশে টেলিভিশন বিস্তার লাভ করলে বিশ্বকাপ ফুটবল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৮৬ সনের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ও ১৯৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপ দেশের দর্শকমনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেইসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার সুযোগ সীমিত থাকায় বিশ্বকাপ ছিল বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত বোধ করার এক বিরল সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। নব্বইয়ের দশকে আকাশ সংস্কৃতির প্রসার আগ্রহের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার বিশ্বকাপ ফুটবলকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। টেলিভিশনের গণ্ডি পেরিয়ে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এখন। বিশ্বকাপ আজ শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নয়;—মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, সংবাদমাধ্যম ও প্রতিদিনের আলাপ-আলোচনায়ও তা সমানভাবে উপস্থিত।
বিস্ময়কর বিষয় হলো,—বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি, র্যাঙ্কিংয়ে তলানিতে রয়েছে দেশটি, অথচ সেই দেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড়ো সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। পর্তুগাল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়, তবে তারা এখনো সংখ্যালঘু। বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা মূলত ফুটবলের দুই লাতিন পরাশক্তিকে ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে শহর, শ্রমিক থেকে শিল্পপতি, সাধারণ দর্শক থেকে বুদ্ধিজীবী… সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিভাজনটি গোপন থাকে না।
সমর্থন কেবল খেলা উপভোগে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যদিকে গড়ায়। আত্মপরিচয়, আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলো সবকিছু ছাপিয়ে সামনে চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিদ্রুপ করা, পুরোনো ম্যাচের স্মৃতিগুলো টানা, পরিসংখ্যানে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও প্রতিপক্ষের পরাজয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক ঘটনায় মোড় নেয়। সংবাদমাধ্যমে সমর্থকদের সংঘাত, ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি, এমনকি বিচ্ছিন্নভাবে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার মতো খবর শিরোনাম হয়। খেলার উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবরও সংবাদমাধ্যমে জায়গা নিতে দেখা যায়।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ-উন্মাদনার তীব্রতা আন্তর্জাতিক গবেষক ও লেখকদের নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন, প্রখ্যাত ফুটবল গবেষক ও অর্থনীতিবিদ সাইমন কুপার (Simon Kuper) ও স্টেফান সিমানস্কি (Stefan Szymanski) মিলে রচিত এবং বহুল আলোচিত Soccernomics-এর কথা আমরা বলতে পারি। বইয়ের দুই গবেষক ফুটবল-সমর্থকদের চরম আবেগের নজির নিয়ে আলোচনায় ব্রাজিল, জার্মানি, এল সালভাদর ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন। বইয়ের ভাষ্যটি প্রায় হুবহু উদ্ধৃত করছি এখানে :
Then there was the Bangladeshi woman who reportedly hanged herself after Cameroon lost to England in the World Cup of 1990. ‘The elimination of Cameroon also means the end of my life,’ said her suicide note. In fact, if The Hindu newspaper in India is right, Bangladeshis have a terrible proclivity for soccer suicides. After Diego Maradona was thrown out of the World Cup of 1994 for using ephedrine, ‘about a hundred fans in Bangladesh committed suicide,’ said an article in The Hindu in 2006. (It would be fascinating to know the newspaper’s source.)
কুপার ও সিমানস্কি তাঁদের বইয়ে A Fan’s Suicide Notes: Do People Jump Off Buildings When Their Teams Lose? অধ্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাস্তব ঘটনা, পরিসংখ্যান ও গবেষণার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। ফুটবলকে ঘিরে আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত অনেক দাবির প্রতি সংশয়ও প্রকাশ করেছেন দুজনে। তাঁদের আলোচনায় বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে সন্নিবেশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও গবেষণা দুই গবেষকের হাতে থাকলে বইয়ের এই অংশটির আলোচনা হয়তো আরও ভিন্ন মাত্রা পেত। কারণ, বাংলাদেশে বিশ্বকাপকে ঘিরে আত্মহত্যা, আত্মহত্যার চেষ্টা কিংবা আত্মবিধ্বংসী আচরণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও নতুন কিছু নয়;—সংবাদমাধ্যমে এ-ধরনের ঘটনা বহুবার উঠে এসেছে। একটি দূরবর্তী দেশের জয়ে অনেক সমর্থক ব্যক্তিগত সাফল্যের অনুভূতি পান, আবার সেই দলের পরাজয়ে হতাশা, ক্ষোভ কিংবা অপমানবোধে আক্রান্ত হন। ফলে, ফুটবল এখানে কেবল খেলায় সীমিত না-থেকে ব্যক্তিগত পরিচয়, আবেগ ও সামাজিক সম্পর্কে রূপ নেয়।

এই বাস্তবতা কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কীভাবে একটি দূরবর্তী দেশের ফুটবল দল একজন মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে? কেন একজন শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মানুষ তার সমর্থিত দলের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না? কেন একই ম্যাচ, একই ঘটনা কিংবা একই সিদ্ধান্ত দুই দলের সমর্থকের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বয়ে আনে? আর, কেনই-বা হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের ‘বিজয়’ একজন মানুষের কাছে ব্যক্তিগত আনন্দ, আর ‘পরাজয়’ ব্যক্তিগত বেদনার কারণ হয়ে ওঠে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের বিবর্তন, সামাজিক পরিচয়, সমষ্টিগত আবেগ, মিথ নির্মাণ ও বিচারবোধের মনস্তত্ত্বের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। বিশ্বকাপ ফুটবলকে এই বৃহত্তর মানবিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বোঝার চেষ্টা এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য। আলোচনার ভিত্তি রূপে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই, গবেষণাপত্রের নির্বাচিত তালিকা পরিশিষ্টে সংযুক্ত করেছি।
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শুরুতে মানুষের আদিম সমাজ-জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ছোট ছোট শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীতে বসবাস করেছে। প্রতিটি গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ছিল সীমিত, আর টিকে থাকা নির্ভর করত পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্পদের ভাগাভাগি ও বাইরের গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের ওপর। এই পরিবেশেই মানুষের মধ্যে একটি মৌলিক মানসিক প্রবণতার বিকাশ ঘটে—নিজেদের ও অন্যদের আলাদা করে দেখার প্রবণতা। নিজের গোষ্ঠীর মানুষকে বিশ্বাস করা, তার জন্য ঝুঁকি নেওয়া এবং বহিরাগতকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা তখন শুধু সামাজিক অভ্যাস ছিল না, ওটা ছিল বেঁচে থাকার কৌশল।
দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই প্রবণতা মানুষের মানসিক গঠনের অংশ হয়ে ওঠে। এই ধারণার ভিত্তি প্রথম স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় চার্লস ডারউইনের The Descent of Man (১৮৭১) গ্রন্থে। পরে রবিন ডানবার Grooming, Gossip, and the Evolution of Language (১৯৯৬) বইয়ে দেখান, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশে জটিল সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, মানুষ কেবল বুদ্ধিমান বলে টিকে থাকেনি,—সহযোগিতার ক্ষমতাও তার বিবর্তনের একটি বড় শক্তি ছিল।
আজ মানুষ আধুনিক রাষ্ট্রে বসবাস করে, জটিল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে এবং বিজ্ঞানের সহায়তায় পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু মানুষের মানসিক বিবর্তন একই গতিতে এগোয়নি। আমাদের সামাজিক পরিবেশ বদলেছে, কিন্তু মস্তিষ্কের অনেক মৌলিক প্রবণতা এখনও সেই আদিম গোষ্ঠীনির্ভর ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে। শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর জায়গায় আজ এসেছে জাতি, ধর্ম, ভাষা, রাজনৈতিক দল, পেশা, ক্রীড়া ক্লাব কিংবা জাতীয় ফুটবল দল। গোষ্ঠীর রূপ বদলেছে, কিন্তু কোনো বৃহত্তর পরিচয়ের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সেই গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য মানুষের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে রয়ে গেছে।
এ-কারণে একজন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সমর্থক প্রতিপক্ষের সাফল্যকে কেবল একটি খেলার ফল হিসেবে দেখেন না। অনেক সময় সেটি তাঁর কাছে নিজের গোষ্ঠীর প্রতীকী পরাজয়ে পরিণত হয়। আবার নিজের দলের বিজয়ও নিছক একটি ক্রীড়া-সাফল্য থাকে না, তা ব্যক্তিগত গর্বের অংশ হয়ে ওঠে। ফুটবল এখানে বাস্তবের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, কারণ এটি মানুষের বহু পুরোনো গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলে। তবে এই ব্যাখ্যা পুরো বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান আমাদের বলে, মানুষ কেন গোষ্ঠী গড়ে তোলে, কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একটি দেশের ফুটবল দল জিতলে একজন বাংলাদেশি কেন ব্যক্তিগত আনন্দ অনুভব করেন তার উত্তর আরও গভীরে খুঁজতে হয়।
এই জায়গায় সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল ও জন টার্নারের Social Identity Theory গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁদের মতে, মানুষের পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত নয়, তার একটি বড়ো অংশ গড়ে ওঠে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে নিজেকে দেখার মধ্য দিয়ে। একজন মানুষ একইসঙ্গে বাংলাদেশি, বাঙালি, শিক্ষক, লেখক, হিন্দু কিংবা মুসলিম হতে পারেন। তেমনি তিনি নিজেকে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবেও ভাবতে পারেন। একবার কোনো গোষ্ঠী আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে গেলে সেই গোষ্ঠীর সম্মান, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতাও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে রূপ নেয়।
এই ধারণার পক্ষে তাজফেলের একটি বিখ্যাত পরীক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে দুই দলে ভাগ করা হয়েছিল। দলগুলোর মধ্যে আগে থেকে কোনো ইতিহাস ছিল না, কোনো বাস্তব স্বার্থও ছিল না। তবু খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেখা গেল, মানুষ নিজের দলের সদস্যদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছে এবং অন্য দলের প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছে। অর্থাৎ, শক্তিশালী গোষ্ঠীগত পরিচয় গড়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ ইতিহাস সবসময় অপরিহার্য নয়, অনেকক্ষেত্রে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ এই বিভাজন যথেষ্ট।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই। বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহের জন্য তবু লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেকে সেই দলের অংশ বলে অনুভব করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আমরা জিতেছি’, ‘আমরা ফাইনালে’, ‘আমাদের দল’—এই ভাষার ব্যবহার তারই বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবে এই ‘আমরা’ একটি প্রতীকী পরিচয়, কিন্তু মানুষের অনুভূতিতে তা সম্পূর্ণ বাস্তব।
এই মুহূর্ত থেকে একজন সমর্থক আর কেবল দর্শক থাকেন না, তিনি নিজের গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। ফলে একই ফাউল একজনের কাছে কৌশল, অন্যজনের কাছে প্রতারণা। একই রেফারির সিদ্ধান্ত একজনের কাছে ন্যায্য, অন্যজনের কাছে অন্যায়। ঘটনাটি এক হলেও তার ব্যাখ্যা আর এক থাকে না। ব্যক্তিগত পক্ষপাতের কারণেই নয়, সামাজিক পরিচয়ের কারণেও মানুষ একই বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করে।
ভাবিয়ে তোলার মতো একটা বিষয় তবু সেখানে থেকেই যায়। একটি দলের সমর্থক হওয়া এক কথা, আর সেই দলটির দেশের মানুষের মতো আনন্দ, হতাশা ও অপমান অনুভব করা অন্য বিষয়। একজন বাংলাদেশি কেন নিজের বাড়ির ছাদে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ান? কেন কয়েক সপ্তাহের জন্য দূরবর্তী একটি দেশের ভাগ্য তাঁর নিজের আবেগের অংশ করে ফেলেন? সামাজিক পরিচয়ের ধারণা প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, কিন্তু গভীর আবেগগত এই সংযুক্তিকে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে উঠতে পারে না।
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের Imagined Communities (১৯৮৩) বইটির দিকে ফিরে তাকাতে হয়। অ্যান্ডারসনের মতে, একটি জাতি মূলত একটি কল্পিত সম্প্রদায়। কারণ, একটি দেশের অধিকাংশ মানুষ কখনও একে অপরের সঙ্গে দেখা করেন না, ব্যক্তিগতভাবে পরিচিতও হন না। নিজেকে তারা তবু একই জাতির সদস্য ভাবেন, একই ইতিহাসের অংশ বলে বিশ্বাস করেন, এবং একই পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্তও করেন। এই যৌথ কল্পনাই জাতীয় পরিচয়কে একটি শক্তিশালী সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করে।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-উন্মাদনাকে এই দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একজন সমর্থক নিজের জাতীয় পরিচয় বদলে ফেলেন না, কিন্তু কয়েক সপ্তাহের জন্য নিজেকে তিনি আরেকটি জাতির আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের ‘জয়’ তাঁর কাছে নিজের ‘আনন্দ’, ‘পরাজয়’ যেন নিজের-ই হতাশার কারণ হয়ে ওঠে। ভৌগলিক বিচারে এই সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু অনুভূতির জগতে তা সম্পূর্ণ বাস্তব।
এই সম্পর্ক কেবল একটি দেশের প্রতি সমর্থনে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কিছু স্মৃতি, কিছু পারিবারিক উত্তরাধিকারের গল্পও। ব্রাজিল মানে অনেকের কাছে সুন্দর ফুটবল;—পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো বা রোনালদিনহো। আর্জেন্টিনা মানেই মারাদোনা, মেসি;—সংগ্রাম ও ব্যর্থতা পেরিয়ে ফিরে আসার ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে দল বদলায়, খেলোয়াড় বদলায়, কিন্তু এই গল্পগুলো সমর্থকের মনে অমলিন থেকে যায়। অনেক সময় মানুষ বর্তমান দলকে নয়, বরং সেই দলকে ঘিরে গড়ে ওঠা দীর্ঘ স্মৃতিকে সমর্থন করেন।
এই জায়গায় রোলাঁ বার্থের (Roland Barthes) Mythologies (১৯৫৭) গুরুত্বপূর্ণ। রোলাঁ বার্থ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সমাজেও মিথ তৈরি হয়, তবে তা আর দেবদেবীকে ঘিরে নয়, বরং জনপ্রিয় সংস্কৃতি, রাজনীতি, বিজ্ঞাপন কিংবা খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে। সময়ের সঙ্গে ফুটবলের কিংবদন্তিরাও কেবল খেলোয়াড় থাকেন না;—তাঁরা সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হন। তাঁদের ঘিরে তৈরি হয় গল্প, স্মৃতি ও বিশ্বাস, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আবিষ্কার করেন না। তাঁরা এই গল্পগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পান। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী, প্রথম দেখা বিশ্বকাপ কিংবা প্রিয় কোনো খেলোয়াড়—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে একটি সামাজিক স্মৃতি তৈরি হয়। একসময় সেই স্মৃতি ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। তাই দল পরিবর্তন করা অনেকের কাছে শুধু পছন্দের পরিবর্তন নয়;—নিজের দীর্ঘদিনের এক পরিচয় ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বদলে ফেলার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসবিদ এরিক হবসবাম (Eric Hobsbawm) তাঁর The Invention of Tradition (১৯৮৩) বইয়ে দেখিয়েছেন। অনেক সামাজিক ঐতিহ্য সুদীর্ঘ অতীতের উত্তরাধিকার নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে সেগুলো ধীরে ধীরে নির্মিত হয়, এবং পরে স্বাভাবিক ঐতিহ্য রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতিকে সেই অর্থে একটি নির্মিত সামাজিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখা যায়। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন, ছাদজুড়ে পতাকা, জার্সি, পাড়ার তর্ক কিংবা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সমর্থনের উত্তরাধিকার—এসবই গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভ্যাস।
প্রশ্ন তবু থেকেই যায়। একটি কল্পিত পরিচয় বিশ্বকাপ উন্মাদনার পুরো ব্যাখ্যা দেয় কি? কেননা, কোটি কোটি মানুষ যদি একই দলকে সমর্থনও করেন, তাহলে কীভাবে সেই সমর্থন একটা সময় এসে অভিন্ন আবেগে রূপ নেয়? কেন একটি গোলের মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা অসংখ্য মানুষ একইসঙ্গে উল্লাস করেন, আবার একই সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যান?

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম তাঁর The Elementary Forms of Religious Life (১৯১২) বইয়ে ধর্মীয় আচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা তোলে ধরেন। তাঁর মতে, ধর্মের শক্তি শুধু বিশ্বাসে নয়,—মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেও। বহু মানুষ যখন একই প্রতীককে ঘিরে একই সময়ে একই আবেগ ভাগ করে নেয়, তখন এমন এক সমষ্টিগত শক্তির জন্ম হয়, যা একা কোনো মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। ডুরখেইম এই অভিজ্ঞতাকে collective effervescence নামে অভিহিত করেছিলেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল এই ধারণার একটি আধুনিক রূপ। বাংলাদেশের সমর্থকেরা একে অপরকে চেনেন না, একই শহরে থাকেন না, এমনকি একই সামাজিক পটভূমির মানুষ তারা নন। তবু, খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে একই প্রতীকের চারপাশে সকলে সমবেত হন। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা তখন আর শুধু একটি দেশের পতাকা থাকে না, তা একটি যৌথ আবেগের প্রতীকে পরিণত হয়। জার্সি, স্লোগান, একসঙ্গে খেলা দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক অস্থায়ী, কিন্তু প্রবল সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা।
এই সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত আবেগকেও বদলে দেয়। একজনের উচ্ছ্বাস দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, আবার একজনের হতাশা মুহূর্তে বহু মানুষের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। সমকালীন মনোবিজ্ঞান এই ঘটনাকে আবেগের সংক্রমণ (emotional contagion) হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ডুরখেইমের পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক মনোবিজ্ঞানের এই ধারণা একই বাস্তবতার দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সময় এই সমষ্টিগত আবেগ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। পাড়ায় বড়ো পর্দায় খেলা দেখা, রাতভর আড্ডা, ছাদে পতাকা টাঙানো, জার্সি পরে ঘুরে বেড়ানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনায় অংশ নেওয়া—এসব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এক ধরনের সামাজিক আচারে পরিণত হয়। প্রতি চার বছর পরপর এই আচার ফিরে আসে, নতুন প্রজন্মকে এর সঙ্গে যুক্ত করে এবং পুরোনো সমর্থকদের পরিচয় ও আবেগকে আবারও জাগিয়ে তোলে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করা প্রয়োজন। সমষ্টিগত আবেগ মানুষকে একরকম অনুভব করতে শেখায়, কিন্তু একরকম ভাবতে শেখায় না। একই ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন গোষ্ঠী বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। একটি বিতর্কিত পেনাল্টিকে ব্রাজিল সমর্থক যেভাবে ব্যাখ্যা করেন, আর্জেন্টিনা সমর্থক তা সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখেন। একই ভিডিও, একই তথ্য, একই ঘটনা—তবু সিদ্ধান্ত এক হয় না। কেন?
উপরের প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের বিচারবোধ কীভাবে কাজ করে, সেদিকে তাকাতে হয়। মনোবিজ্ঞানী জনাথন হাইট The Righteous Mind (২০১২)-এ দেখিয়েছেন, মানুষ সাধারণত আগে আবেগ বা নৈতিক অনুভূতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। তাঁর বিখ্যাত উপমা অনুযায়ী, মানুষের যুক্তি অনেক সময় নিরপেক্ষ বিচারকের মতো নয়, তা বরং একজন আইনজীবীর মতো কাজ করে,—যার প্রধান কাজ নিজের পক্ষকে সমর্থন করা। বিশ্বকাপের সময় এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। একটি বিতর্কিত গোল বা পেনাল্টির পর দুই দলের সমর্থকই ভিডিও, পরিসংখ্যান, নিয়ম কিংবা পুরোনো উদাহরণ খুঁজে আনেন। বাইরে থেকে মনে হয় তাঁরা সত্যের অনুসন্ধান করছেন। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা আগে নেওয়া অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।
ড্যানিয়েল কানেমান তাঁর Thinking, Fast and Slow (২০১১) বইয়ে যেমন চিন্তার দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। একটি দ্রুত, স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগনির্ভর;—অন্যটি ধীর, বিশ্লেষণধর্মী ও সচেতন। ফুটবল সমর্থনের ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে আবেগ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাই, পরে যুক্তি দিয়ে সেই প্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করি। এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন হুগো মার্সিয়ার ও ড্যান স্পারবার। The Enigma of Reason (২০১৭)-এ তাঁরা যুক্তি দিয়েছেন, মানুষের মস্তিষ্কে সক্রিয় যুক্তিবোধের প্রধান কাজ সবসময় সত্য আবিষ্কার করা নয়, বরং সামাজিক পরিসরে নিজের অবস্থানকে সমর্থন করা ও অন্যকে এর দ্বারা প্রভাবিত করা। বিশ্বকাপের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একই ঘটনার পর সমর্থকেরা ভিডিও, পরিসংখ্যান কিংবা পুরোনো ম্যাচের উদ্ধৃতি সামনে আনেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নয়, আগে থেকে গ্রহণ করা সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করার জন্য।
এ-কারণেই শিক্ষা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সবসময় পক্ষপাত কমায় না। অনেক সময় শিক্ষিত মানুষ নিজের অবস্থানকে সমর্থন করার জন্য আরও সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত যুক্তি নির্মাণ করতে পারেন। ফলে একজন অধ্যাপক, গবেষক, লেখক কিংবা সাধারণ সমর্থকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য সব সময় আবেগে নয়, বরং সেই আবেগকে ব্যাখ্যা করার ভাষায় নিহিত থাকে। তবু একটি প্রশ্ন রয়ে যায় :—যদি সমর্থনের কেন্দ্রবিন্দু হয় নিজের দলের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে প্রতিপক্ষকে ঘিরে এত প্রবল আগ্রহ কেন? কেন অনেকসময় নিজ দলের জয়ের চেয়ে প্রতিপক্ষের পরাজয় বেশি আলোচিত হয়? এমনকি কেন বহু সমর্থকের কাছে প্রতিপক্ষের হার নিজের দলের জয়ের সমান, কখনো-কখনো তারচেয়েও বড়ো আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে?

প্রশ্নটি আমাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অনুকরণের মনস্তত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। ফরাসি চিন্তাবিদ রেনে জিরার Violence and the Sacred (১৯৭২) এবং Things Hidden Since the Foundation of the World (১৯৭৮) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন,—মানুষ অনেক ক্ষেত্রে কোনোকিছু সরাসরি আকাঙ্ক্ষা করে না, বরং অন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে তারা অনুসরণ করে। তিনি এই প্রবণতাকে mimetic desire বা অনুকরণমূলক আকাঙ্ক্ষা নামে ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথম দৃষ্টিতে এই ধারণার সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক স্পষ্ট মনে নাও হতে পারে। কিন্তু, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির দিকে তাকালে এর যৌক্তিকতা আমরা টের পাই। কোনো শিশু জন্মগতভাবে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক হয় না। বড়ো হওয়ার পথে সে দেখে—বাবা একটি দলকে সমর্থন করেন, বড়ো ভাই অন্য দলের জার্সি পরে, পাড়ার বন্ধুরা তর্ক করে, বিদ্যালয়ে খেলা নিয়ে আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই যেন কোনো-না-কোনো পক্ষ বেছে নিতে থাকে। ধীরে ধীরে সে বুঝতে শেখে,—বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এখানে একটি পক্ষ নেওয়াটা সামাজিক অংশগ্রহণের অংশ। প্রথমে সে ফুটবলকে নয়, অন্য মানুষের সমর্থনকে অনুসরণ করতে শেখে। এর ফলে সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে নয়, সামাজিক অনুকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
রেনে জিরার এখানে থেমে থাকেননি। তিনি দেখিয়েছেন,—দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষপর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। বাইরে থেকে তারা যতই বিপরীত মনে হোক, সময়ের সঙ্গে তাদের আচরণ, আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার ধরনে আশ্চর্য রকমের মিল তৈরি হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাই শুধু দূরত্ব সৃষ্টি করে না; অদৃশ্য এক ধরনের সাদৃশ্যও গড়ে তোলে। বাংলাদেশের ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা যায়। তাঁরা একই ম্যাচ দেখেন, একই ঘটনা নিয়ে তর্ক করেন, একই পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করেন, এবং একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যাও করেন। উভয় পক্ষই বিশ্বাস করেন,—তাঁরা যুক্তির পক্ষে আছেন, আর প্রতিপক্ষ আবেগের বশবর্তী। আবার উভয় পক্ষই মনে করেন, তাঁদের দল বঞ্চিত হয়েছে, এবং প্রতিপক্ষ অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে।
বাইরে থেকে দুই পক্ষকে সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হলেও, একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়,—তাঁদের আবেগের ধরন, প্রতিক্রিয়ার ভঙ্গি ও যুক্তি নির্মাণের কৌশলে বড়ো কোনো তফাত নেই। পার্থক্য মূলত সমর্থিত দলের, কিন্তু সমর্থনের মনস্তত্ত্বে নয়। দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাই দুই পক্ষকে যতটা আলাদা করে, অনেক ক্ষেত্রে ততটাই একে অপরের মতো করে তোলে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ করা জরুরি :
একজন সমর্থক যতটা নিজের দলকে অনুসরণ করেন, প্রায় ততটাই অনুসরণ করেন প্রতিপক্ষকেও। বিশ্বকাপের সময় একজন ব্রাজিল সমর্থক আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচের ফল, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও দলকে ঘিরে প্রতিটি বিতর্কের খবর রাখেন। একইভাবে একজন আর্জেন্টিনা সমর্থকও ব্রাজিলের প্রতিটি ম্যাচ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিপক্ষের খেলা, খেলোয়াড়, সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া কিংবা সংবাদমাধ্যমের আলোচনা—সবই তাঁর নিয়মিত আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। একঅর্থে প্রতিপক্ষও তখন তাঁর ফুটবল-পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
এই পর্যবেক্ষণ কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়; প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যও বটে। দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে নিজ পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। নিজের দলকে বোঝার স্বার্থে প্রতিপক্ষের উপস্থিতি দরকার হয়। সম্পর্কটি শুধু প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না;—আকর্ষণ, ঈর্ষা, নির্ভরতা, শ্রদ্ধা ও বিদ্বেষ মিলে জটিল আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে অন্যের ব্যর্থতা থেকে যে-আনন্দের জন্ম হয়, তাকে জার্মান ভাষায় Schadenfreude বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড এইচ. স্মিথ The Joy of Pain (২০১৩)-এ দেখিয়েছেন, এই অনুভূতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সামাজিক তুলনা এবং আত্মপরিচয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আমরা নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখি, তখন তার ব্যর্থতা অনেক সময় আমাদের নিজের অবস্থানকে আরও নিরাপদ বা মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করায়। ফলে আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে শুধু নিজের সাফল্য নয়, প্রতিপক্ষের ব্যর্থতাও।
বিশ্বকাপের সময় এই প্রবণতা খুব সহজে চোখে পড়ে। অনেকক্ষেত্রে নিজের দলের জয়ের চেয়ে প্রতিপক্ষের পরাজয়ই বেশি উল্লাসের কারণ হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় ব্যঙ্গচিত্র, পুরোনো ভিডিও, পরিসংখ্যান কিংবা কৌতুকে। এগুলোর বড়ো অংশের উদ্দেশ্য নিজের দলের সাফল্য উদ্যাপন নয়; প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপ করা। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মনে রাখা জরুরি। অধিকাংশ সমর্থক বাস্তবে কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে ঘৃণা করেন না। তাঁরা প্রতিপক্ষকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রতীকী পরিচয়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখান। বাস্তবের ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা বহুমাত্রিক সমাজ, কিন্তু সমর্থকের কল্পনায় তারা ধীরে ধীরে একটি প্রতীকে সংকুচিত হয়ে যায়। তখন সেই প্রতীককে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা বাস্তব মানুষকে বোঝার চেয়ে অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে এই প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও স্বাধীন হয়ে যেতে পারে। আজকের বহু তরুণ সমর্থক এমন সব ম্যাচের আবেগ বহন করেন, যেগুলো তাঁদের জন্মেরও বহু বছর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭০, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪ কিংবা ২০০২ সালের ম্যাচ তাঁদের ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, কিন্তু সামাজিক স্মৃতি হিসেবে সেগুলো তাঁদের পরিচয়ের অংশ। পরিবার, বন্ধু, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এই স্মৃতি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যায়। এখানে এসে ফুটবল একটি সাধারণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সীমা অতিক্রম করে ইতিহাস, স্মৃতি ও পরিচয়ের ধারকে পরিণত হয়। একটি ম্যাচ শেষ হয়, একটি বিশ্বকাপও শেষ হয়, কিন্তু তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া গল্প, প্রতীক, আবেগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমষ্টিগত স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। তাই প্রতিটি নতুন বিশ্বকাপ শুধু নতুন একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি পুরোনো স্মৃতি, পরিচয় ও আবেগেরও পুনর্নির্মাণ।
এখন পর্যন্ত আলোচনায় আমরা মানুষের গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তি, সামাজিক পরিচয়, সমষ্টিগত আবেগ, বিচারবোধের পক্ষপাত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনও রয়ে যায়। এই সব প্রবণতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশের ক্ষেত্র হয়ে উঠল কেন ফুটবল? কেন ক্রিকেট, টেনিস, বাস্কেটবল কিংবা দাবা একইমাত্রার বৈশ্বিক আবেগ তৈরি করতে পারেনি? এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু সমর্থকের মনস্তত্ত্ব নয়, ফুটবল খেলাটির দিকেও তাকাতে হবে। মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্বকাপ-উন্মাদনার ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু ফুটবলের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য সেই আবেগকে অসাধারণ শক্তি দেয়। সহজ নিয়ম, অনিশ্চিত ফলাফল, দলগত চরিত্র, নাটকীয় মুহূর্ত এবং ন্যায়-অন্যায়ের অন্তহীন বিতর্ক—সব মিলিয়ে ফুটবল একটি খেলার চেয়ে অনেক বড় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ ক্রিশ্চিয়ান ব্রমবার্গার Football as a Worldview and as a Ritual (১৯৯৫)-এ দেখিয়েছেন, ফুটবলের জনপ্রিয়তার কারণ শুধু এর সরলতা নয়। এই খেলাটি মানুষের জীবনের বহু মৌলিক অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারে। এখানে যেমন যোগ্যতা আছে, তেমনি ভাগ্যও আছে। সহযোগিতা যেমন আছে, তেমনি প্রতিযোগিতাও। ন্যায় আছে, তেমনি বিতর্কও। বাস্তব জীবনের মতোই ফুটবলেও কোনো কিছুই পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো শক্তি সম্ভবত এই অনিশ্চয়তা। অনেক খেলায় দক্ষতার পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট-যে ফলাফল আগেভাগে অনেকটা অনুমান করা যায়। ফুটবলে তা নয়। একটি দল পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, বলের দখল রাখতে পারে, অসংখ্য আক্রমণ গড়ে তুলতে পারে, তবু শেষ মুহূর্তের একটি ভুল, একটি কর্নার, একটি পাল্টা আক্রমণ কিংবা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। এই অনিশ্চয়তা ফুটবলকে নাটকীয় করে তোলে।
এই নাটকীয়তা মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে মিলে যায়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই-যে পরিশ্রম, মেধা ও যোগ্যতা সাফল্যের পথ তৈরি করে। কিন্তু জীবন বারবার মনে করিয়ে দেয়, সেগুলো সবসময় যথেষ্ট নয়। আকস্মিক ঘটনা, সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য কিংবা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অসংখ্য পরিস্থিতিও মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। ফুটবলও সেই একই সত্যের প্রতিচ্ছবি। দক্ষতা অপরিহার্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। সম্ভবত এ-কারণে ফুটবলের অনিশ্চয়তা দর্শকের কাছে অবাস্তব নয়, তা বরং জীবনেরই স্বাভাবিক রূপ হয়ে তার কাছে ধরা দেয়।
ফুটবলকে অন্য খেলার থেকে আলাদা করে আরেকটি বিষয়। এটি একইসঙ্গে ব্যক্তির এবং দলের খেলা। একজন অসাধারণ ফুটবলার একটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, কিন্তু তিনি একা কোনো বিশ্বকাপ জিততে পারেন না। আবার নিখুঁত দলগত সমন্বয়ও অনেক সময় অসাধারণ ব্যক্তিগত প্রতিভা ছাড়া সাফল্যের শেষ ধাপে পৌঁছাতে পারে না। আধুনিক সমাজও এই একই ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ব্যক্তিগত মেধা, উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা; অন্যদিকে সহযোগিতা, প্রতিষ্ঠান এবং সমষ্টিগত প্রচেষ্টা। ফুটবল এই দুই বাস্তবতাকে একইসঙ্গে দৃশ্যমান করে।
ফুটবলকে অন্য অনেক খেলার থেকে আলাদা করে আরেকটি বিষয়। এর নিয়ম তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু সেই নিয়মের প্রয়োগ কখনো পুরোপুরি যান্ত্রিক নয়। ফাউল হয়েছে কি না, হ্যান্ডবল ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দেয়। অর্থাৎ নিয়ম সুস্পষ্ট হলেও তার ব্যাখ্যা সব সময় এক হয় না। বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়। রাষ্ট্রে আইন আছে, আদালত আছে, বিচারব্যবস্থা আছে; তবু একই আইনকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়, একই ঘটনার একাধিক পাঠ সম্ভব হয়। ফুটবলের মাঠেও আমরা অনুরূপ দৃশ্য দেখি। ফলে ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা দেয় না,—ন্যায়, অন্যায়, প্রাপ্যতা এবং বিচার সম্পর্কে মানুষের অনুভূতিকেও সক্রিয় করে।
এসব কারণে বিশ্বকাপের অনেক বিতর্ক কেবল খেলার বিতর্ক হয়ে থাকে না। একটি অফসাইড, একটি পেনাল্টি কিংবা একটি লাল কার্ড মুহূর্তের মধ্যে নৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়। সমর্থকরা তখন শুধু নিয়ম নিয়ে তর্ক করেন না, তাঁরা ন্যায্যতা, বৈধতা ও প্রাপ্যতা নিয়েও তর্ক করেন। ফুটবলের একটি ঘটনা খুব দ্রুত সামাজিক ও নৈতিক ভাষায় অনূদিত হয়ে যায়।

আধুনিক খেলাধুলা নিয়ে নরবার্ট এলিয়াস ও এরিক ডানিং Quest for Excitement (১৯৮৬)-এ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের মতে, আধুনিক সমাজ মানুষকে প্রতিনিয়ত নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়, কিন্তু খেলাধুলা সেই নিয়ন্ত্রিত জীবনের ভেতরে আবেগ প্রকাশের একটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি করে। বিশ্বকাপের সময় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সারা বছর সংযত জীবনযাপন করা একজন মানুষও খেলার সময় চিৎকার করেন, হতাশায় মাথায় হাত দেন, অপরিচিত কাউকে জড়িয়ে ধরেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অন্য সময় যে-আচরণ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, বিশ্বকাপের সময় সেটিই সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়।
ফুটবলের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তার সার্বজনীনতা। এই খেলার জন্য ব্যয়বহুল সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। একটি বল, সামান্য খোলা জায়গা এবং কয়েকজন খেলোয়াড় থাকলে খেলা শুরু করা যায়। বিশ্বের দরিদ্রতম শিশু থেকে শুরু করে ধনীতম দেশের পেশাদার খেলোয়াড়—সবাই একই নিয়মে খেলাটির সঙ্গে পরিচিত হয়। এই সহজলভ্যতা ফুটবলকে একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ভাষায় পরিণত করেছে। তবে ফুটবলের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে গভীর কারণ সম্ভবত অন্যত্র। মানুষের জীবনের প্রায় সব মৌলিক অভিজ্ঞতা এই খেলায় একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। এখানে আশা আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সাফল্য ও ব্যর্থতা আছে, সহযোগিতা আছে, প্রতিযোগিতা আছে, ন্যায় আছে, অন্যায়ও আছে। মানুষের জীবনে যেসব অনুভূতি বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে জমা হয়, ফুটবল সেগুলোকে নব্বই মিনিটের মধ্যে ঘনীভূত করে তোলে।
বিশ্বকাপের সমষ্টিগত আবেগকে শুধু মানুষের মনস্তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। আধুনিক ক্রীড়া-বাণিজ্য, বৈশ্বিক সম্প্রচারব্যবস্থা, বিজ্ঞাপনশিল্প এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই আবেগকে আরও তীব্র, দৃশ্যমান ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। বিশ্বকাপ আজ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বৈশ্বিক বিনোদন ও ক্রীড়া-বাণিজ্যের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন। মানুষের স্বাভাবিক আবেগ ও পরিচয়বোধ একদিকে যেমন এই উন্মাদনার ভিত্তি তৈরি করে, অন্যদিকে আধুনিক গণমাধ্যম ও ক্রীড়া-অর্থনীতি সেই আবেগকে কোটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়, পুনরুৎপাদন করে ও দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখে। এ-কারণে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি আধুনিক মানুষের সামাজিক জীবনের এক প্রতীকী প্রকাশ। একটি ম্যাচের মধ্য দিয়ে মানুষ শুধু জয়-পরাজয়ই দেখে না; নিজের পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা, অনিশ্চয়তা, ন্যায়বোধ এবং গোষ্ঠীগত সত্তারও প্রতিফলন খুঁজে পায়।
এখানে আলোচিত মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রবণতাগুলো শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ফুটবল-সমর্থনের ক্ষেত্রে এগুলোর বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই বৃহত্তর মানবিক বাস্তবতার উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে প্রতিটি দেশের ইতিহাস, ক্রীড়া-সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং সামাজিক বাস্তবতা এই প্রবণতাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেয়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-উন্মাদনা তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। এটি মানুষের চিরন্তন গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তি, পরিচয়, সমষ্টিগত আবেগ এবং আধুনিক গণমাধ্যমনির্ভর বিশ্বের এক মিলিত প্রকাশ।
. . .
নির্বাচিত গ্রন্থ ও তাত্ত্বিক সূত্র : Simon Kuper & Stefan Szymanski, Soccernomics (2009) Robin Dunbar, Grooming, Gossip, and the Evolution of Language (1996) Henri Tajfel, Human Groups and Social Categories (1981) Benedict Anderson, Imagined Communities (1983) Roland Barthes, Mythologies (1957) Emile Durkheim, The Elementary Forms of Religious Life (1912) Jonathan Haidt, The Righteous Mind (2012) Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow (2011) Hugo Mercier & Dan Sperber, The Enigma of Reason (2017) Rene Girard, Violence and the Sacred (1972) Richard H. Smith, The Joy of Pain: Schadenfreude and the Dark Side of Human Nature (2013) Christian Bromberger, Football as a Worldview and as a Ritual (1995) . . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা
পিয়ের পাওলো পাসোলিনির ‘ফুটবল’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
নেটালাপ : ফুটবল মেরুকরণে ‘আফ্রিকা’ ও ‘লাতিন’
কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক
আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার
‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার
‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



