পোস্ট শোকেস - বিবিধ ও বিচিত্র

কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক

Reading time 4 minute
5
(6)
Messi in action agianst the indomitable Cape Verde; Match for round-16; Source & Credit: Marta Lavandier, AP

ফুটবলের সব গল্প ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। কিছু-কিছু গল্প লেখা হয় দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম আর টিকে থাকার লড়াকু মানসিকতা দিয়েও। বিশ্বকাপ খেলতে আসা ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দের গল্পটাও সেরকম। মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি অনেক আশা আর স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল। ফুটবলবিশ্ব তাদেরকে নিয়ে কোনও আশা/স্বপ্ন হয়তো দেখেনি, কিন্তু তারা স্বপ্নের সমান উচ্চতায় ওঠে সবাইকে দেখিয়ে দিলো,—ফুটবল শুধু শক্তির খেলা নয়, এটা হৃদয়েরও খেলা। জয় করে নিলো অগণিত ফুটবল দর্শকের হৃদয়।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কঠিন লড়াইয়ে চেপে ধরে বিশ্বকাপ থেকে অবশেষে বিদায় নিয়েছে কেপ ভার্দে। নকআউট পর্বে দুবার পিছিয়ে পড়ে সমতায় ফেরা দলটি শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের খেলা দিয়ে মন ভরিয়েছে দর্শকের। ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা তাই তো বুক ফুলিয়ে বলতে পারছেন :

দলটি নিয়ে আমি গর্বিত। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে যেভাবে আমার দল খেলেছে, দুবার পিছিয়ে পড়েও যেভাবে সমতায় ফিরে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গেছে, তা আমাদের দেশকে সম্মানিত করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বিত। এই বিশ্বকাপ ও আমাদের লড়াকু মানসিকতা বিশ্বমঞ্চে দেশকে অনন্য মর্যাদায় বসিয়েছে। এটি আমাদের ফুটবল পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করেছে।

কেপ ভার্দে হেরে যায়নি। খেলার ফলাফল যাই বলুক, অগণিত ফুটবলপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে ওরা ঠাঁই করে নিয়েছে। কেপ ভার্দে এখন ফুটবলে ইতিহাস হয়ে গেছে। শাবাশ কেপ ভার্দে… শাবাশ!

কেপ ভার্দের নাম অনেকে এর আগে শুনেননি। এটা একধরনের অজ্ঞতা হতে পারে, তবে সবকিছু সবার জানা থাকবে তাও নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে দেশটি জায়গা করে নেওয়ার পর সবার নজরে আসে। বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে অংশ নেওয়া অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগালের প্রতিবেশী রাষ্ট্র কেপ ভার্দে দশটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। সেনেগালের সঙ্গে তার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। ফিফা বিশ্বকাপ থেকে সাদিও মানের সেনেগাল হুটহাট বাদ পড়ে যায়। সেখানে কেপ ভার্দের জন্য বিশ্বকাপ অলীক স্বপ্নের মতো ছিল। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে নাইজেরিয়া, ক্যামেরুনের মতো দেশ এবার বিশ্বকাপের টিকিট পায়নি। সেখানে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটে ইতিহাস গড়ে মূল্যবান সাদা বালুর দেশটি।

Tactical Brilliance: Cape Verde’s Defensive Mastery against Spain; Group Match FIFA 2026; Source: Collected; Google Image

দলটির অনেক ফুটবলারের কাছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোয় খেলতে যাওয়াটাই ছিল বিরাট ব্যাপার। বিশ্বকাপে স্পেনের লামিনে ইয়ামাল, রদ্রির বিপক্ষে তারা খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ফেদে ভালভার্দে, রোনাল্ড আরাহোর বিপক্ষে মাঠ ভাগাভাগি করার স্বপ্ন পূরণ হবে। অনেকে ভেবেছিলেন, কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা রথ দেখা নাকি কলা বেচার দ্বন্দ্বে ভুগবে। বিশ্বকাপ খেলার চেয়ে দেখা ও অংশগ্রহণ বড়ো মনে হবে তাদের কাছে। বাস্তবে কেবল দেখেনি, দেখিয়েও দিয়েছে,—সুযোগ পেলে তারা প্রতিপক্ষের জন্য কতটা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে!

কেপ ভার্দে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের অধীনে ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮২ পর্যন্ত ফিফার সদস্য পদ তারা পায়নি। ১৯৮৬-১৯৯৮ পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলার লড়াইয়ে তারা নেমেছে, তবে বাছাইপর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। ২০০২-২২ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ঢুকলেও মূল পর্বে যাওয়ার টিকিট জোটেনি কপালে। এবার ব্লু শার্কসরা আঞ্চলিক বাছাই পর্বের গ্রুপ ‘ডি’ থেকে ক্যামেরুনকে হটিয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

বাছাই পর্বের ১০ ম্যাচে সাতটিতে জিতেছিল তারা। হেরেছে একটি। ঘরের মাঠে কন্ডিশনের সুবিধা নিয়ে পাঁচ ম্যাচের জয় তাদের বিশ্বকাপে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। অনেকে ভেবেছিলেন কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ যাত্রা কঠিন হবে। প্রথম ম্যাচে তাদের খেলতে হবে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে দুইয়ে থাকা ও টুর্নামেন্টের রেড হট ফেভারিট স্পেনের বিপক্ষে। পরের ম্যাচে পরীক্ষা নেবে উরুগুয়ে। দুটি ফুটবল পরাশক্তির সঙ্গে পরীক্ষার পর শক্তি বাঁচিয়ে রাখতে পারলে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৯ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে সৌদি আরবের বিপক্ষে লড়াই করতে পারবে।

লড়াই করার মতো কয়েকজন খেলোয়াড় অবশ্য দলটিতে ছিলেন। ইউরোপে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বেশ কজন কেপ ভার্দিয়ান আছেন দলে। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া ২৩ বছর বয়সী বেনফিকার সিডনি লোপেজ কাবরাল তাদের মধ্যে অন্যতম। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ভিয়ারিয়ালের ২৫ বছর বয়সী ভেগান কস্তাও আছেন দলে। দলটির হাতেগোনা দু-একজন নিজ দেশের লিগে খেলেন। বাকিরা তুরস্ক, পর্তুগাল থেকে সাইপ্রাস, যুক্তরাষ্ট্রে খেলে বেড়ান। যে-কারণে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস তাদের মধ্যে কাজ করেছে। আত্মবিশ্বাসে ভর করে স্পেনের বিরুদ্ধে খেলায় মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়ে কেপ ভার্দে। স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে প্রমাণ করে,—তাদের দেশটি ছোটো হলেও স্বপ্ন অনেক বড়ো! এবারের বিশ্বকাপ আসরে যেন সেকথা জানান দিলো দেশটি!

এবারের বিশ্বকাপে চমক দেখিয়ে তারা শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়েছে, উরুগুয়েকে ছাড় দেয়নি, এমনকি তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে ১২০ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে মাথা নত করেনি একবারও। দুবার পিছিয়ে পড়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ফেরত এসেছে। ওরা যেন প্রতিবার বলছিল, ‘আমরা এখনও বেঁচে আছি, টিকে আছি।’ কেপ ভার্দে যেন মাথা নোয়াতে আসেনি। ফুটবলে ভাগ্য বলে একটা কথা আছে, দলটির বেলায় সেই কথাটা যেন সত্যি হলো। খেলা নয়, ভাগ্যের কাছে হেরে গেছে দলটি!

Vozinha: The man behind the dominance; Source & Credit: Collected; Google Image

গোলপোস্টের নিচে ৪০ বছর বয়সী যে-গোলরক্ষকটি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই ভোজিনিয়া (Vozinha) ফুটবল মহাকাব্য লিখেছেন গোলপোস্টের নিচে। কিংবদন্তি হতে খেলেছেন মাত্র চারটি ম্যাচ। বয়সকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রমাণ দিয়েছেন, বয়স নয়, সাহস হলো ‘যুদ্ধ জয়ের’ মূল মন্ত্র। কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষকের প্রকৃত নাম জোসিমার দিয়াস। তবে ভোজিনিয়া (Vozinha) নামে অমরত্ব পেলেন ছাব্বিশের বিশ্বকাপে। গোলবার সামলানোয় তাঁর অবিশ্বাস্য কীর্তি ফুটবলদর্শকের মনে থাকবে দীর্ঘ দিন।

স্কোরবোর্ড হয়তো বলবে, কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে এবারের আসর থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস অন্য কথা বলবে। একটি নাম না-জানা দেশের একদল লড়াকু ফুটবলার তাদের স্বপ্নের স্পর্ধা দেখিয়ে ফুটবলবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। অগণিত ফুটবলপ্রেমিকের হৃদয় স্পর্শ করেছে নিমিষে। ইতিহাসের পাতায় কেপ ভার্দে ‘সমরে ডরে না বীর’-এর উপমায় হবে স্মরিত। ফিনিক্স পাখির মতো কেপ ভার্দে তুমি বারবার ফিরে এসো দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ এই বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে।
. . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা

আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার

‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার

‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ

. . .

লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

অবদায়ক : সুমন বনিক : থার্ড লেন স্পেস.কম

সুমন বনিক-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 6

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *