
When we all give the power
We all give the best
Every minute of an hour
Don’t think about the rest
[Live Is Life: Song by Opus Band; 1984]
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের থিম সং ‘দাই দাই’ (Dai Dai) পোষালো না ভাই। শাকিরা ও বার্না বয় মিলে সময়ানুগ গেয়েছে। ব্যাস এটুকুই। লাতিনো ও আফ্রোবিটের রসায়ন মাতিয়ে তোলার মতো হলো কি? লোকজন কোমর দুলিয়ে নাচছে ও নাচবে ইভেন্ট চলা পর্যন্ত। শেষ হওয়ার পর বিশ্বকাপের জন্য অতীতে তৈরি আরো বহু থিম সংয়ের মতো এই গানটিও ভুলে যাওয়ার খাতায় ঠাঁই নেবে মনে হচ্ছে। শাকিরা তার সেরা গানটি আসলে ২০১০-এর বিশ্বকাপে গেয়ে দিয়েছে।
লম্বা ক্যারিয়ারে শাকিরার সেরা গানের তালিকায় ‘ওয়াকা ওয়াকা’-কে রাখা যায় হয়তো। বিশ্বকাপ থিম সংয়ের ইতিহাসে এটা এখনো সেরা হয়ে আছে। গানের লিরিক, কম্পোজিশন ও কোরিওগ্রাফি এক মোহনায় এসে মিলিত হওয়ার কারণে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ মাতিয়ে দিয়েছিল বিশ্ব। শাকিরা স্বয়ং গানটিকে পরে আর ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বিশ্বকাপ এলে তাকে আমরা গান নিয়ে হাজির থাকতে দেখি। আর কোনো গানের তারকা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’কে এভাবে উদযাপন করে বলে আমার জানা নেই। এবার তো ফিফা দ্বিতীয়বারের মতো শাকিরাকে দিয়ে থিম সং করিয়েছে, কিন্তু জমে ক্ষীর হলো কতটা? পপকর্ন খেতে যেটুকুন সময় লাগছে,—গানটির মেয়াদ যেন ওইপর্যন্ত!
স্ট্যাট বলছে, ১৯৬২ সালে ফিফা থিম সং আনে বাজারে। এই হিসাবে ১৬টি থিম সং ফুটবলখোর বিশ্বকে উপহার দিয়েছে তারা। আরো কিছু গান আছে আনঅফিসিয়াল। সংখ্যাটি হৃষ্টপুষ্ট হলে কী হবে, সাকুল্যে তিনখানা গান বোধহয় টিকতে পেরেছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রিকি মার্টিনের ‘ওলে ওলে’, এবং ২০১০-এ শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও আনঅফিসিয়াল কিনানের ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’ ছাড়া বাকি গানগুলো কালের স্রোতে গেছে হারিয়ে!
শাকিরার আরেকখানা দুনিয়ামাতানো গান ‘হিপস ডোন্ট লাই’ (Hips Don’t Lie)-এর কথা অনেকের মনে পড়বে জানি। ২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে গানটি সে গেয়েছিল। বিশ্বকাপের সঙ্গে গানটির সংযোগ তৈরি হয় তাৎক্ষণিক। মনে রাখা ভালো,—ওরাল ফিক্সেশন-২ (Oral Fixation; Vol. 2) অ্যালবামের এই গান আগে থেকে হিট নাম্বারে ছিল। বিশ্বকাপের আসরে ফিরে গাওয়ার কারণে শ্রোতা-দর্শককে নতুন ফিল দিচ্ছিল কেবল।
সে যাইহোক, বিশ্বকাপ নিয়ে গানের পসরায় ২০১০-কে এখন পর্যন্ত সেরা মানতে হচ্ছে। ‘ওয়াকা ওয়াকা’র পাশে কিনানের ‘Wavin’ Flag’ ভালো ফিল দিয়েছিল তখন। এক বিশ্বকাপে পরপর দুখানা থিম সংয়ের বিশ্বজয়ের নজির সম্ভবত বিরল! দুটো গান এই ছাব্বিশে এসেও মানুষ শুনছে সাগ্রহে।
ফিফা বিশ্বকাপের বাইরে ফুটবলকে কেন্দ্র করে হিট একখানা গানের নাম এখানে নেওয়া উচিত। গানটির শ্রোতাপ্রিয় হওয়ার ঘটনা ব্যতিক্রম ছিল,—অনন্যও বটে। রেলিগেশনের খাড়ায় পড়া নাপোলিকে পরপর দুবার ইতালির ঘরোয়া লিগ সেরি-আ ও নাপোলির ইতিহাসে ওই একবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো ম্যাড জিনিয়াস মারাদোনার নাম গানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জার্মানির মিউনিক স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচে নামার আগে সত্তর হাজার দর্শকের সামনে মাঠে শরীর ঘামিয়ে নিচ্ছিল নাপোলির খেলোয়াড়রা, আর তা Opus ব্যান্ডের অসম্ভব প্রেরণাদায়ী এক গানের ছন্দে। বিশ্ব দেখছিল এক পাগল প্রতিভা গানের ছন্দে তাল দিয়ে অবলীলায় ফুটবলটাকে পায়ে ও মাথায় ধরে নাচাচ্ছে!
ম্যাড জিনিয়াসের বুটের ফিতা ছিল খোলা! তার পায়ে, কাঁধে ও মাথায় বল বাবাজির চুম্বকের মতো আটকে থাকতে তাতে অসুবিধে হচ্ছে না একটুও! স্টেডিয়াম ভরতি দর্শকের সামনে গানের তালে গা গরম করে নেওয়ার ঘটনাটি পরে এভাবে ঘটেছে বলে শুনিনি। Opus-এর এই গানটি তাদের হিট অ্যালবামের একটি হলেও, মানুষ একে মারাদোনার সঙ্গে জুড়ে গুনগুন করেছে একটা সময়। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সেরা ওয়ার্মআপ সংয়ের স্বীকৃতি রয়েছে এই গানের। গানটি যে-কোনো বিশ্বকাপের থিম সং হতে পারে অনায়াসে এর রক শিহরনে পোরা কথার ওজনের জন্য :
When we all give the power
We all give the best
Every minute of an hour
Don’t think about the rest
যাকগে, স্মৃতিচারণা ছেড়ে ২০১০-এর দুনিয়া মাতানো শাকিরা বিবির ‘ওয়াকা ওয়াকা’য় ফিরি। ১৯৮৬-তে মারাদোনার একলার করে নেওয়া অতিমানবিক বিশ্বকাপটির মতোই ২০১০-কে মানুষ মনে রাখবে শাকিরার গান, আর স্পেন দলটার জন্য। টিকি-টাকা (Tiki-taka) ফুটবলের ওটা ছিল পরিশেষ। আস্ত বার্সেনোলা দিয়ে সাজানো স্পেনের জাতীয় দল কাপটা জিতেছিল অবশেষে। টিটি-টাকা পরে কার্যকারিতা হারায় দ্রুত। যার করুণ পরিসমাপ্তি গত বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে মরক্কোর কাছে হেরে স্পেনের বিদায় নেওয়ার মধ্যে দেখেছিল বিশ্ব।
. . .

Staying forever young
Singin’ songs underneath the sun
Let’s rejoice in the beautiful game
[Wavin’ Flag; K’naan]
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কি ২০১০-এ প্রথমবার কাপ জেতা স্পেনের মতো নতুন কাউকে পেতে যাচ্ছে? পর্তুগাল কি হতে পারে বাজির ঘোড়া? নাকি যথারীতি কাপ জেতা দলগুলোর একটি চুমু খাবে সোনার রেপ্লিকায়? কী বিষাদ! কী বিষাদ! পাওলো মালদিনি আর রবার্তো বেজ্জিওদের মতো ভুবনসেরা খেলোয়াড় দিয়ে সাজানো ইতালি নেই এবারের বিশ্বকাপে! ২০০৬-এ শেষ বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে তারা খেইহারা! জিনেদান জিদানের অভিশাপ লেগেছে মনে হয় আসমানি নীলদের ওপর।
মাতেরাজ্জির কাণ্ড কী ভোলা সম্ভব কোনোদিন! জিদানকে তার আলজেরিয় উৎস ও বোন নিয়ে বাজে মন্তব্য করে খেপিয়ে দিয়েছিল ইচ্ছে করে। ফুটবলের শিল্পী তখন কী করল? নিজের শেষ বিশ্বকাপে মাথাটাথা গরম করে মাতেরাজ্জিকে মোক্ষম একখান ঢুঁস দিয়ে বসল জিদান! কাম সারা ওতেই! লালকার্ড খেয়ে মাঠের বাইরে ফরাসিদের প্রথম বিশ্বকাপ পাইয়ে দেওয়া ড্রিবলম্যান। সেয়ানা ইতালি চামে কাপটা চতুর্থবারের মতো নিজের করে নিয়েছিল পেনাল্টি শুটআউটে।
তারপর থেকে ইতালি পথহারা। মাঝখানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইউরো জেতা ছাড়া আর কোনো অর্জন নেই আজ্জুরিদের। নব্বই দশকেও ইংলিশ লিগের পাশাপাশি বড়ো আকর্ষণ ছিল সেরি-আ লিগের ম্যাচগুলো, যা এখন পানসে ঠেকে দর্শকের। ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ বা জার্মান লিগ নিয়ে ক্লাব ফুটবলের ভক্তরা মেতে থাকে সারা বছর। মাফিয়ারা ইতালির ফুটবলে মরণ পেরেক ঠুকে দিয়েছে মনে হচ্ছে। একখানা তথ্যচিত্র দেখে সেরকমটাই ভাবতে হচ্ছে।
স্পেন অথবা ফ্রান্সকে ছব্বিশ বিশ্বকাপের ফাইনালে দেখতে পাচ্ছেন সকলে। স্ট্যাট ও কাগজে-কলম হাতে নিলে অনুমানটি যৌক্তিক। দল দুটি শক্তিমত্তায় নিখুঁত। আমি, তা-সত্ত্বেও স্কালোনির আর্জেন্টিনার ওপর বাজি রাখার পক্ষে। এই ভদ্রলোকের ফুটবলমেধা ও দলকে খেলানোর কৌশল ইম্প্রেসিভ!
এর সঙ্গে রয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবলকে সঠিক আকার দিতে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের নেওয়া একের-পর-এক পদক্ষেপ। ছত্রিশ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে আলবিসেলেস্তেরা ছন্দে ফিরে ২০২২-এ। তারপর থেকে ভালোই ধারাবাহিক মেসিবাহিনি। ২০২২-এর শ্বাসরোধী ফাইনালে ওদের কাপ জয়টা কাকতালীয় ছিল না। এর পেছনে প্রায় দশ বছর ধরে ধাপে-ধাপে নেওয়া স্টেপগুলো ভূমিকা রেখেছে। এবার যদি সেগুলো ঠিকঠাক কাজ করে, তাহলে হিস্ট্রি রিপিট হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে চ্যাম্পিয়ন দল কাপ ধরে রাখতে পারে না। একমাত্র ব্যতিক্রম পেলে জামানায় জুলেরিমে জেতা ব্রাজিল। ১৯৫৮-র পর ১৯৬২-তে সেলেসাওরা কাপ জিতে পুনরায়। ২০২৬-এ এসে পুনরাবৃত্তি ঘটলে অবাক হবো না। স্কালোনির ফুটবল মস্তিষ্কে সাজানো গেম প্ল্যান, দলীয় বোঝাপড়া ও মেসির অনুপ্রেরণার ওপর আলবিসেলেস্তেদের সাফল্য নির্ভর করবে অনেকখানি।
স্কালোনির মূল স্কোয়াডে আনহেল ডি মারিয়ার মতো লিজেন্ড নেই বটে, তবে গতবারের অভিজ্ঞ ও নবীনরা মিলে বোঝপড়ার জায়গাটি ভালো মনে হয়েছে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ড যথেষ্ট মজবুত। ফুটবল বিশ্লেষকদের গোনায় অবশ্যা তা আসছে না খুব একটা। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিয়ামক গণ্য পজিশনগুলোয় স্কালোনির দল গোছানো ও আক্রমণাত্মক। তাদের দুর্বলতা বলতে রক্ষণভাগ। পড়তি ফর্মের ওটামেন্ডিকে খেলানো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। গোলকিপিং বাদ দিলে ডিফেন্সকে চীনের প্রাচীর বলে মানতে চাইছেন তারা। বিশ্লেষকদের কথা আমলে নিলে স্কালোনির মাথাব্যথার কারণ হতে পারে রক্ষণভাগ। গতবারের মতো এবারও শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি আকাশি নীলদের তা দিতে পারে।
এর বাইরে সম্ভাবনা থাকছে সিআর সেভেন রোনালদোর পর্তুগালের। প্রত্যেকবার দারুণ টিম নিয়ে মাঠে নামে পর্তুগাল, কিন্তু সাফল্য অধরাই থেকে গেছে দলটির! লুই ফিগোদের সময়ে সেরা টিমদের একটি হয়েও পর্তুগাল কাপ ঘরে তুলতে পারেনি। বিশ্বকাপ আসলে অন্য মেজাজের হয়ে থাকে। টিম যত শক্তিশালী ও সলিড হোক-না-কেন, সবদিক দিয়ে সিনক্রোনাইজড হতে না পারলে কাপ জেতা অসম্ভব। ব্রাজিল যে-কারণে গত চব্বিশ বছর ধরে কাপ জিততে পারছে না! প্রতিভা এখানে একমাত্র নিয়ামক বিষয় নয়। খেলার কৌশল ও দলগত বোঝপড়ার পাশাপাশি কাপ জেতার মরিয়া প্রেরণা বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। হলুদ শিবিরে এটা শেষবার দেখা গিয়েছে রোনালদো-রোনালদিনহোদের সময়। মোমেন্টাম অবশ্য তৈরি হয়েছিল সাদা পেলে জিকো, ফ্যালকাও ও ডাক্তার মহাশয় সক্রেটিসদের জামানায়। ওরা কাপ জিততে পারেনি, কিন্তু খেলেছিল দারুণ।
এক-একসময় মনে হয় জুলেরিমে পর্বে পেলে-গারিঞ্চাদের মতো দুর্ধর্ষ প্রতিভায় ঠাসা ব্রাজিলিয়ান সাম্বার যুগ অস্ত যাওয়ার পর জিকো-সক্রেটিসরা মিলে যে-দলটি গড়েছিল, সেটা বেস্ট। কাপ জিততে পারেনি কপালদোষে। ব্রাজিলের কপাল ফিরে বেবেতো-রোমারিও-কার্লোসদের সময়টায় পা দিয়ে। ম্যাচের মধ্যে মাঠে বেবেতোর সন্তান হওয়ার সংবাদ দর্শকরা সেলিব্রেট করতে দেখেছে। প্রতিভা, সংহতি, আর সমন্বয়ে দলটি ঠাসা ছিল তখন।
এটা ধারাবাহিক থেকেছে রোনালদো-রোনালদিনহোর মতো খেলোয়াড়কে নিয়ে মাঠে নামার বছরগুলোয়। তারপর থেকে সিনক্রোনাইজেশনে ভাটা নামে হলুদ শিবিরে। সাম্বার ছন্দ আর পায়নি মেতে ওঠার মুহূর্ত। উলটো ২০২৪-র বিশ্বকাপে অদম্য জার্মানি গুনে গুনে সাত গোল দিয়েছিল ব্রাজিলের জালে, তাও স্টেডিয়ামে হাজির দেশবাসীর সামনে! ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্তের কারণে দলটি এখন অতীতের ছায়া। সেলেসাওরা ছন্দে ফেরত আসার মিশনে স্ট্রাগল করছে হয়ে গেল চব্বিশ বছর!
প্রতিভার বিচারেও নেইমার বাদ দিলে ব্রাজিল অন্য দলগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে হলে একাধিক শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে দলটিকে। কাজটি কঠিন থাকছে তাাদের জন্য। ভরসা বলতে ওই কোচ। তাঁর সক্ষমতা প্রশ্নাতীত, তবে তিনি দলটাকে এখনো নিখুঁত শেপ দিতে পারেননি। ব্রাজিল তবু যদি কাপ জিতে যায়, সেখানে তাঁর অবদান বিরাট থাকবে। সব বাধা কাটিয়ে ছন্দে ফেরা বলতে কাপ জেতার মরিয়া ক্ষুধায় নিজেকে তাতিয়ে তোলা সেলেসাওদের কাছে বড়ো শর্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি পারে তাহলে সম্ভাবনা থাকছে, অন্যথায় বেশি হলে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে টা টা হয়ে যাবে সাম্বা দিয়ে জগৎ মাতানো পেলের ব্রাজিল।
. . .

You’re on the front line
Everyone’s watching
You know it’s serious
We’re getting closer
This isn’t over
[Waka Waka; Shakira]
ফুটবলের জনক ইংল্যান্ড শক্তিশালী দল হয়ে এবারো মাঠে নামছে। স্ট্যাট ঈর্ষনীয় তাদের। গোল মেশিন হ্যারি ক্যান আছে ফুল গিয়ারে। ইংল্যান্ডকে নিয়ে অবশ্য বেশি আশা করাটা কাজের নয়। পেলের মতো লিজেন্ড যেমন ধরা খেয়েছেন আগে। উনি ভালো প্রেডিক্টর ছিল না। সম্ভবত দুবার ইংল্যান্ডের হয়ে তাঁকে বাজি ধরে ডাব্বা খেতে দেখেছি।
১৯৬৬-র পর থেকে এই দলটির কাপ জিততে না পারার পেছনে তাদের মিডিয়ার দায় অনেকখানি। দলের ওপর তারা আগে থেকে চাপ তৈরি করে বসে। প্রথমত মাথায় তুলে নাচে, তারপর একটা ম্যাচ হারলে মাটিতে আছাড় মারে। সবকিছুর পরেও হ্যারি ক্যানের ব্রিটসসেনাদের ভালো করা উচিত।
স্পেন ও ফ্রান্সকে হট ফেভারিট হওয়ার চাপ সামলে খেলতে হবে আগাগোড়া। দুটি দল দারুণ গোছানো ও চৌকস। ডিফেন্স, মিডফিল্ড, অ্যাটাকে ঘাটতি নেই। স্ট্যাট শতভাগ পক্ষে। তবে আটলান্টিকের ওপারের কন্ডিশনে খেলা তাদের জন্য সহজ হবে না। কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে খেলার দিকে থেকে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে লাতিন ও আফ্রিকান দলগুলো তাদের তুলনায় অনেকবেশি কমফোর্ট জোনে থাকবে।
তবে, এবার আনপ্রেডিক্টেবল হতে পারে নরওয়ে, মরক্কো, এমনকি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দল। জায়ান্টদের এরা খবর করে দিতে পারে নকআউটে পর্বে। লাতিন বলয়ে আর্জেন্টিনার জন্য কঠিন হবে কলম্বিয়ার ম্যাচটি। যারা কোপ দেখে থাকেন, তাদের বোঝার কথা লিজেন্ড ভালদেরামা ও মজারু প্রতিভা রেনে হিগুইতায় গর্বিত কলম্বিয়াকে খেলা কী-কারণে কঠিন। এরা ওই ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবারের মতো বেপরোয়া! হিসাব করে না খেললে ঠ্যাং বাঁচানো সহজ থাকবে না।
কোপায় যে-শারীরিক ফুটবলটা হয়, সেটা ইউরোপের দ্রুত গতির গাণিতিক ফুটবল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইনজুরির কঠিন ঝুঁকি নিয়ে খেলতে হয় সেখানে। এটা আবার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে যুক্তরাষ্ট্রের কন্ডিশনে বাড়তি সুবিধা দেবে। শেষ কোপা আমেরিকায় খেলার স্মৃতি তাদের এখনো টাটকা।
ইউরোপের দলগুলোর মধ্যে মেরে খেলার প্রবণতা কম। মূলত গতি সেখানে নিয়ন্ত্রক। গতির তোড়ে যা নিখোঁজ হতে চলেছে সেটা হলো ড্রিবলিং। মারাদোনা, রোনালদিনহো, জিদান হয়ে মেসি পর্যন্ত যে-ম্যাজিক মানুষ উপভোগ করেছে প্রাণভরে, ইংলিশ লিগে তার খরা দেখছি অনেকদিন ধরে। মেশিনের মতো গোল করা একমাত্র দ্রষ্টব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল হারাচ্ছে শৈল্পিক মুভ ও পাসিং, শিহরন তোলা কর্নার ও ফ্রি-কিক, যার পেছনে ড্রিবলারদের অবদান অনেকখানি। ম্যাজিশিয়ান নেই। অন্য লিগগুলোও তথৈবচ। ফুটবলের এই শিল্প জিনিয়াস খরায় ভুগতে আরম্ভ করেছে। মেসি রিটায়ার করার পর তা আরো প্রকট হয়ে ধরা পড়বে মনে হচ্ছে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে GOAT বাবাজির সুযোগ থাকছে ঝলক দেখানোর।

স্কালোনি, প্রায় সকলে বলছেন,—মেসিকে মাঠে স্ক্যানার হিসাবে খেলাবে ম্যাচ বুঝে। অলস হেঁটে বেড়াবে ৬২-র পেলের মতো। মানে মওকা খুঁজবে মোক্ষম সময়ে বলটা পায়ে আসার। বাকিটা কী করবে বা করতে পারে তা অনুমানের বাইরে! গতবার হল্যান্ডের সঙ্গে মারাত্মক স্নায়ুচাপে ঠাসা ম্যাচে মেসির বডি অ্যাঙ্গেল যে-জায়গায় দাঁড়িয়ে বল ছোট ডি-বক্সে চালান করে,—দেখে মাথা আউলা হয়ে গিয়েছিল পুরা! কী করে করেছিল, আল্লা জানে! মেসির মতো প্লেয়ার ক্রিয়েটিভ মুভ করে এমন, যেখানে এসে ফুটবলটা নিখাদ নান্দনিক হয়ে ওঠে। আর, মেসি এখানে মারাদোনা-জিদান-রোনালদিনহোর মহাযোগ্য উত্তরসূরি। কিছু জায়গায় পূর্বসূরী জিনিয়াসদের ছাড়িয়ে গেছে ম্যালা দিন আগে।
সব মিলিয়ে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ জমজমাট হবে বলে ধারণা করি। প্রচুর ম্যাচ, তবে টিম কম্বিনেশন গতবারের চেয়ে অনেকবেশি কাছাকাছি। অঘটন থাকার কথা ও থাকবে সম্ভবত। কাপ যেই জিতুক, ২২-এর মতো অবিস্মরণীয় ফাইনাল যদি হয়, আরো কিছু এরকম ম্যাচ হয় নকআউট পর্বে, শাকিরা বিবির দাই দাই গান আহামরি না হওয়ায় কিচ্ছু যাবে আসবে না। ফাইনালে শাকিরা-সহ অন্যরা গানে-গানে পুষিয়ে দেবে। আমেরিকান সকার লিগের ওই সুপার বোল-এ দর্শক নিয়মিত দেখতে অভ্যস্ত এই নাচ-গানের মজমা খেলার টাইমকে টেনে লম্বা করবে। কিছু করার নেই। আমেরিকান পপ কালচারের এই পপকর্ন তারা গেলাবেই গেলাবে।
যেই জিতুক, তার জন্য আগাম শুভেচ্ছা। ২০১০ বিশ্বকাপের পর থেকে একপ্রকার স্থায়ী থিম সংয়ে রূপ নেওয়া ‘ওয়াকা ওয়াকা’র তালে দর্শক মাতুক উৎসবে। জয়তু ফুটবল। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। জয়তু খেলাটির ওইসব মহান শিল্পী ও আগত শিল্পীদের, যাদের কল্যাণে খেলাটি মহিয়ান।
ফুটবল লেখক হুয়ান ভিলরো আর এদুয়ার্দো গালিয়ানোর মতো লেখকরা একে রঙিন করেছেন ভাষায়। আমরা দেখতে চাইব ওইসব ম্যাচ, পায়ের জাদু, ডিফেন্সচেরা অ্যাসিস্ট, আর দর্শকের পাগলামিভরা ম্যাক্সিক্যান ওয়েভ ও সিটি, যার কল্যাণে খেলাটির নামকরণ ভিলরো যেমনটি দিয়েছেন তাঁর বইয়ে তা যেন সত্য হয়। দেখে যেন মনে হয় ঈশ্বরের ধরণী আসলেও চামড়ার গোলক দিয়ে মোড়ানো;—‘গড ইজ রাউন্ড’!
. . .
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


