‘বই ছুঁয়ে কই’
হেলাল চৌধুরী-র কণাগদ্য
. . .

চাণক্যকথা
খলব্যক্তির স্থান জগতে কোথাও নেই। তাকে তার স্ত্রী-পুত্ররাও পরিত্যাগ করে।
কথাগুলো সত্য, তবে এর গুরুত্ব বর্তমানে আপেক্ষিকও বটে। কোনো দোষ করেনি, তবু অতি বিনয়ী ব্যক্তির ঘাড়ে খলব্যক্তিটি সহজেই দোষ চাপিয়ে দেয়। অতি বিনয়ী ব্যক্তি যার ফলে বেশিরভাগ লোকের কাছে পরিত্যাজ্য ও ডাহা পচা মাল বলে গণ্য হতে থাকে। এ-যুগে খল ও দুর্বিনীত ব্যক্তিরা সমাজে প্রবলভাবে সম্মানিত। সৎ ব্যক্তি নয়,—খলনায়ককে উত্তম ভাবে অধিকাংশ মানুষ।
. . .
ঘেউ ঘেউ করিও না
যে-দেশের মাতৃভাষা আরবি, সেই দেশের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ জায়গায় No Parking-এর বদলে No Barking কথাটি লিখতে হয়! কারণ, আরবি বর্ণমালায় P ও V নেই। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। আরবি, ইংরেজি, রুশ, ফরাসি, চীনা ও স্প্যানিশ। মিশরীয়দের মাতৃভাষা আরবি। এসব কারণে ইংরেজি কথোপকথনে তাদের কিছুটা সমস্যা থেকে যায়। তারা অগত্যা গাড়ি পার্কের জন্য বরাদ্দ জায়গায় No Barking লিখে। মজার বিষয় হচ্ছে ইংরেজি No barking বাংলায় পৌঁছে ‘ঘেউ-ঘেউ করিও না’ অর্থে প্রকাশ পায়! 😇
. . .
‘গাধা’ নিয়ে ধাঁধা
Baie Dankie একটি আফ্রিকান বাক্য। এর উচ্চারণরূপ হচ্ছে Buy Donkey. ইংরেজিতে পৌঁছে এর অর্থ : Thank you very much.😆
. . .
মঞ্জুভাষণ
কঠিন কথাকে মোলায়েম করে ঘুরিয়ে বলাকে বাংলায় ‘মঞ্জুভাষণ’ বলা হয়। যেমন :
‘হেলালের চুরির অভ্যাস আছে’ না-বলে বলতে পারি ‘হেলালের হাতটানের অভ্যাস আছে’।
‘ঘরে চাল নেই’… সরাসরি কথাটি না-বলে বলা হলো ‘ঘরে চাল বাড়ন্ত’।
ভিক্ষুককে ভিক্ষা না-দিতে চাইলে আমরা বলি ‘মাফ করো’।
‘হাতটান’, ‘বাড়ন্ত’ ও ‘মাফ করো’টা হচ্ছে বাংলায় মঞ্জুভাষণ।
. . .
কপালজোরে বাঁচা
বার্ট্রান্ড রাসেল একবার মারাত্মক বিমানদুর্ঘটনায় মরতে বসেছিলেন। বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছিলেন। ভারতে এপিজে আবদুল কালামও ভয়ংকর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা থেকে ভাগ্যের জোরে বেঁচে ফিরেছিলেন। দুজন মনীষীর কাহিনি পাঠ করে নিজের কথা মনে পড়ল। আমি নাকি ছোট থাকতে ইংরেজ সায়েবদের তৈরি ফোর্ড বাসগাড়ির নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। কপালজোরে প্রাণটা যায়নি সেদিন! পরে দুই-দুইবার মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ যাই-যাই অবস্থা হয়েছিল। ঘটনাগুলো আমার বাবার থেকে শোনা।
. . .

পুণ্ডিত
আমাদের এখানে রবীন্দ্রপণ্ডিতের (?) অভাব নেই। হাটে পণ্ডিত(?)। ঘাটে পণ্ডিত (?)। পণ্ডিত ঘরে এবং পুকুরপাড়ে। সেখানে আমি আজও রবীন্দ্রপাঠ ভালোভাবে শেষ-ই করতে পারিনি! আসলে এরা রবীন্দ্রপণ্ডিত নয়, এরা হলেন ‘শুনিয়া পণ্ডিত’। নিজে পড়িয়া বা জানিয়া পণ্ডিত নন একজনও! আমি বলি তারা হলেন ‘পুণ্ডিত’।
আজকাল দেখছি আমার জনৈক বন্ধুর মতো অনেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সলিমুল্লাহর কথাবার্তা শুনে ‘শুনিয়া পণ্ডিত’, অথচ ‘পড়িয়া পণ্ডিত’ না। তারা আসলে ‘রবীন্দ্রপুণ্ডিত’। আমাদের এখানে অনেকেই রবীন্দ্রঅন্ধ, অনেকে আবার ‘রবীন্দ্র-বাড়বিদ্বেষী’।
আমি তখন মদনমোহন কলেজে ইন্টারের ছাত্র। আমার এক জৈন্তাবাসী মাদ্রাসাপড়ুয়া বাচালবন্ধু ছিল ইনকিলাবঅন্ধ। আমাকে একবার আড্ডায় হুট করে প্রশ্ন করে বসল : রবীন্দ্রনাথ তো মুসলমান বিরোধী? তাই নয় কি? প্রশ্নের ছলে একবাক্যে রবীন্দ্রনাথকে সে খারিজ করে বসল!
মূলত ইনকিলাব-এ সে সৈয়দ আলী আহসানের একটি লেখা পড়ে রবীন্দ্রপণ্ডিত (?) হয়। আমার ধারণা, সৈয়দ আলী আহসানের লেখাটি হয়তো সে ভালো করে গিলতে পারেনি। আমি আবার সৈয়দ আলী আহসানের লেখা পড়িনি। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম,—রবীন্দ্র বানান লাঠির বাট দিয়ে নাকি ছাতার বাট দিয়ে হবে? মানে, রস্ব-ইকার, নাকি দীর্ঘ-ঈকার হবে? উত্তরে সে বলেছিল,—রস্ব-ইকার।
সেদিন তার মুখের দিকে উত্তরবাণ ছুঁড়ে দিয়েছিলাম :—রবির গালে য’গাছি চুল (চুল না-বলে চুলের হিন্দি প্রতিশব্দ ব্যবহার করেছিলাম) আছে, তারচেয়ে বেশি হবে তাঁর লেখা। আমি বড়োজোর তাঁর কোনও একটি লেখার সমালোচনা করতে পারব, কিন্তু তাঁর বিরোধিতা করা ও একবাক্যে খারিজ করার জ্ঞান আমার আজও হয়নি!
. . .
ময়নাতদন্ত
ময়না শব্দটির তিনটি অর্থ রয়েছে : প্রথমত : ময়না একটি দেশি শব্দ। যা একজাতীয় পাখিকে বোঝায়। দ্বিতীয়ত : ময়না একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ ডাকিনী বা খল স্বভাবের নারী অথবা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী নারী। তৃতীয়ত : ময়না আরবি মুআইনা থেকে বাংলায় এসেছে। এর বাংলা অর্থ অনুসন্ধান।
আর ময়নাতদন্ত হচ্ছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঠিক কারণ, সময় ও ধরন অনুসন্ধান করা। এর ইংরেজি হচ্ছে পোস্টমর্টেম। সহজ কথায় ময়নাতদন্ত হচ্ছে একটি মৃতদেহের প্রকৃত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা।
. . .
ওহ কারাগার!
কারাগারে ধনী ব্যক্তিও অতি দরিদ্র, কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি দরিদ্র নয়। কারাগারে ধনী ব্যক্তির ধন সঙ্গে থাকে না, তাই সে ধনের জন্ম দিতে পারে না; কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞান সঙ্গে থাকে, তাই সে কারাগারেও জ্ঞানের জন্ম দিতে পারে। রাহুল সাংকৃত্যায়ন কারাগারে বসেই ‘মানব সমাজ’, ‘দর্শন-দিগ্দর্শন’, ‘বৈজ্ঞানিক ভৌতবাদ’, ‘বিশ্বের রূপরেখা’, ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ এই পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ও মূল্যবান গ্রন্থের জন্ম দিয়েছিলেন।
. . .
দুস্তর পারাবার
শুচিশুদ্ধ জ্ঞানসমাজ তৈরি করতে হলে মস্তিষ্কে জ্ঞানের পুকুর নয়, বরং পারাবার তৈরি করতে হয়। পুকুর ক্ষুদ্র ও সসীম। ক্ষুদ্র ও সসীমে গা ভাসানো মানে শরীরে পচা মাটি ও নোংরা জল লেপ্টানো। পারাবার দুস্তর ও অসীম। দুস্তর ও অসীমে গা ভাসানো মানে ঢেউ আর নোনাজলে ঝুঁকি নিয়ে সাঁতার কাটা।
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ ‘কণাগদ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবনা’র অন্য পর্ব দেখুন …
‘বই ছুঁয়ে কই’ : কণাগদ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবনা-১ : হেলাল চৌধুরী
. . .
লেখক পরিচয় : হেলাল চৌধুরী : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .

অবদায়ক : হেলাল চৌধুরী : থার্ড লেন স্পেস
হেলাল চৌধুরী-র অন্যান রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



