
আকাশ সংস্কৃতির যুগ আসতে তখনো ম্যালা দেরি। দেশি দর্শককে টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখানোর ভার বিটিভি একা সামলাচ্ছে। ওইসময়, ড্রইংরুমে মুরব্বিদের মাঝখানে স্যান্ডউইচ হয়ে বসা অবোধ কিশোর রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকটি জীবনে প্রথমবার দেখেছিলাম। মাথায় কিচ্ছু ঢোকেনি ছাই! স্মরণে তবু থেকে গেলেন ‘নন্দিনী’ দিলশাদ খানম। মনে গেঁথে রইল ‘রাজা’ গোলাম মোস্তফার জলদগম্ভীর আওয়াজ ‘বলছি তো বিরক্ত করো না নন্দিনী’। খনি-গহবরে সোনা তোলার কাজে নিষ্পেষিতদের তিক্ত যাতনা, আর নন্দিনীতে উচ্ছলিত প্রাণবন্যাকে আয়ুধ তাদের আয়ুধ করে নেওয়ার আবেশ কী-করে জানি মনে থেকে গেল অমলিন! এবং, আশ্চর্য স্মারকের মতো কিশোরমনে খোদাই থাকল ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-সহ রবিগানের ওইসব টুটাফাটা চরণ,—‘রক্তকরবী’র ইনার ফিলোসফিতে যারা এনে দিয়েছিল প্রাণ।
এতোকিছু মনে গেঁথে যাওয়াটাই শেষ নয়। নাট্য নির্দেশক মুস্তাফা মনোয়ার স্মৃতিকোষে জায়গা নিলেন! স্কুলে পড়ুয়া সত্যজিৎ রায়ের শিক্ষক কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে তিনি। ছবি আঁকেন, পাপেট্রি করেন, নাটকের শিল্প নির্দেশনা দেন… এসব তথ্যের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বোঝার বয়স তখন হয়নি। সবটাই ক্রমান্বয়ে জেনেছি পরে। বিটিভিতে জনপ্রিয় ‘মনের কথা’ দিয়ে পুতুল নাচের শিল্পকে নাগরিক সমাজেও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। পাপেট্রি বা পুতুল নাচের শিল্পমাহাত্ম্য ওই বয়সে কিছু না বুঝলেও অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছি নয়নভরে।
সেসামি স্ট্রিট-এর আদলে ‘সিসিমপুর’ যবে থেকে টেলিভিশনে দেখানো শুরু করল, আকাশ সংস্কৃতির জোয়ারে বিটিভি ততদিনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। রিমোট ঘুরিয়ে দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেলে ঘুরছে দর্শক। সংবাদ ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাসে এসেছে পালাবদল। আকাশ সংস্কৃতির চাপে কোণঠাসা বিটিভিকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেশি টিভি চ্যানেলরা সংখ্যায় বাড়ছিল। রকমারি বৈচিত্র্য ও চটকে ভরপুর ভিনদেশি টিভি চ্যানেলগুলো যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ। ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকা সহজ থাকেনি তাদের জন্য। আমরাও আর বাচ্চা নই তখন। বাচ্চাকাল ছাড়িয়ে মধ্য ত্রিশে পা দিয়েছি। দেশি- বিদেশি টিভি দেখার ফুরসত বা খিদের কোনোটাই প্রবল নেই আর! আকাশ সংস্কৃতির পাগলাটে জোয়ারের মধ্যে সেসামি স্ট্রিট-এর দেশি সংস্করণটা যেন দেশের জলবায়ুকে বাচ্চাদের মনে অকাট্য করে, শিল্প উপদেষ্টার দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার ও তাঁর টিম তা নিশ্চিত করেছিলেন।
আমাদের বাচ্চা বয়সটা যাদের মধ্যে চালান হয়েছিল, তারা তখন টিভির সামনে বসে এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে ঘুরছে সমানে। ভিনদেশি চ্যানেলগুলো তাদেরকে দখলে নিয়েছিল দ্রুত। এটাকে বদলানোর সাধ্য তাদের বাবা-মায়ের ছিল না! ‘দুরন্ত’ টিভির মতো কেবল বাচ্চাদের জন্য নিবেদিত বাংলা চ্যানেল তখনো আসেনি। তার মধ্যে, হ্যাঁ, তার মধ্যে দেখা গেল ‘সিসিমপুর’ বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে বাচ্চারা। আমরা যেমন বিটিভিযুগে দেখেছি ‘মনের কথা’। একটা অনুষ্ঠান অবশেষে পাওয়া গেল, যার বদৌলতে বাচ্চাদেরকে দেশি চ্যানেলের রিমোট বাটনে চাপ দিতে রাজি করাতে পারছিলেন তাদের বাবা-মা। মুস্তাফা মনোয়ার ও তাঁর টিম প্রমাণ করে দিলেন,—যুগের ভাষা পড়তে জানলে দেশি অনুষ্ঠান দিয়েও বাচ্চাদের মন জয় করা কঠিন নয়।
যতটুকু জানি, যুগের ভাষা বুঝে ‘সিসিমপুর’কে সাজানোর পরিকল্পনায় তাঁর টিমে থাকা তরুণরা বড়ো ভূমিকা রেখেছিলেন। হাজার হোক, জেনারেশন গ্যাপ চাইলেও এড়ানো যায় না। মুস্তাফা মনোয়ারও সবসময় এড়াতে পেরেছেন এমন নয়। কথাটি কেন বলছি তা বোঝার জন্য প্রয়াত আনিসুল হকের সঞ্চালনায় জনপ্রিয় ‘জলসা’র কথা টানতে হয়। ‘জলসা’র একটা অনুষ্ঠান আনিসুল হক ও তাঁর টিম অন্যভাবে সাজিয়েছিলেন। বাংলাদেশে তখন ব্যান্ড সংগীত আজম খানদের প্রেরণা মেনে নতুন বাঁকে পা রাখছিল। একটা প্রবল সাংগীতিক বিস্ফার চোখের সামনে ঘটছিল। এর ইতিনেতি নিয়ে গানে ও আলাপে মুখর সংলাপের আয়োজন করেছিল ‘জলসা’।
‘জলসা’র এই অভিনব আয়োজনে মুস্তাফা মনোয়ারের মতো প্রবীণ প্রজন্মের গুণিজনকে ব্যান্ড গানের শিল্পীদের সঙ্গে এক মঞ্চে বসিয়েছিলেন আনিসুল হক। বাঁকবদলের প্রাসঙ্গিকতা ও এর মাহাত্ম্যটা অনুভবে চমৎকার ধরেছিলেন খান আতাউর রহমান। মুস্তাফা মনোয়ার ও অন্যরা ততটা পারেননি। অনুষ্ঠানটি যারা দেখেছেন বা এখন অনলাইনে দেখতে পারেন সহজেই, বাংলা গানের নয়া এই যুগাবর্তকে মুস্তাফা মনোয়ার ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদরা সেদিন খুব ভালো পড়তে পারছিলেন, তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। ব্যান্ড সংগীতের উত্থান ও এর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের বক্তব্যে দ্বিধাজড়তা গোপন থাকেনি।
সে যাইহোক, আনিসুল হক চিরপ্রস্থানের দেশে পা রেখেছেন অকালে! বয়সভারে জীর্ণ মুস্তাফা মনোয়ার একই পথের পথিক হলেন। প্রয়াণের সংবাদ শোনার পর ‘রক্তকরবী’টা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি মনে হলো! ইউটিউব চ্যানেলে নাটকটি সংরক্ষণ করেছেন Cine Poison. প্রায় আড়াই ঘণ্টার নাট্যায়ন দেখতে বসলে সময় কোনদিক দিয়ে চলে যায়, তার কিছু হদিশ মিলে না! অভিনয় ও সেট ডিজাইন দুইহাজার ছাব্বিশে এসেও মন ভরায়।
গোলাম মুস্তাফা, সৈয়দ হাসান ইমাম, আনোয়ার হোসেন, মাসুদ আলী খান, আসকার ইবনে শাইখের মতো অভিনয়শিল্পীর কাছে দর্শক যে-মান আশা করতেন একটা সময়,—‘রক্তকরবী’র বিটিভি সংস্করণে তার ঘাটতি রাখেননি নির্দেশক। পরিবেশনায় যে-কারণে প্রাণ ঠিকরে পড়েছিল। আর, দিলশাদ খানম! নন্দিনীর চরিত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের সেরা নির্বাচন ছিলেন এই অভিনয়শিল্পী। একটা নাটকেই দেখেছি তাঁকে;—পরে আর পাইনি খুঁজে! কোথায় হারিয়ে গেলেন জানো হলো না আজো!
নন্দিনী তো বদ্ধ অচলায়তনে খোলা হাওয়া! রাজাকে সে বের করে আনছে জড়তা, দ্বিধা, দম্ভ দিয়ে ঘিরে রাখা অবরোধের প্রাচীর ভেঙে। সুহাসিনী দিলশাদ খানমের স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রাণবন্যা নন্দিনীর এই মোটিফটার প্রতি সুবিচারে খামতি রাখেনি। নাট্য নির্দেশনায় মুস্তাফা মনোয়ার যেটা চাচ্ছিলেন, দিলশাদ খানমে তা মর্মরিত হয়েছিল পুরোটাই।
রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ এপার-ওপার দুই বাংলায় ফিরে-ফিরে মঞ্চস্থ হয়েছে। শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় বহুরূপীর মঞ্চায়ন এর একটা মান স্থির করে দিয়েছিল একদা। সেই ‘রক্তকরবী’ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি। অডিও সংস্করণ পাওয়া যেত একটা সময়, আর অনলাইনে সেটাই সুলভ একমাত্র। শ্রুতিতে তবু এর শানমানের কারণ আন্দাজ করা যায়। পরে আরো অনেকে নাটকটি মঞ্চস্থ করেছেন। নয়া নাটুয়ার গৌতম হালদার যেমন সন্দর্ভ-র হয়ে আপাতত সর্বশেষ পরিবেশনা দর্শককে উপহার দিয়েছেন।
গৌতম হালদারের ক্ষেত্রে বড়ো অন্তরায় হচ্ছে তাঁরই অভিনয় ও নির্দেশনায় মঞ্চায়িত মেঘনাদবধ। মধুকবির মহাকাব্যের এই মহাকাব্যিক মঞ্চায়ন তাঁকে যে-উচ্চতায় তুলেছে, না-চাইলেও স্মরণে তা হানা দিয়ে যায়। মেঘনাদবধ-এর মঞ্চায়নে গৌতম হালদার এতটাই তুলনাহীন ও অলঙ্ঘ্য,—এরপর সেখানে অতিক্রমের কোনো জায়গা কোনো অভিনয়শিল্পীর জন্য থাকে কি-না, তা সঠিক জানা নেই! যুগের নতুন ভাষায় ‘রক্তকরবী’র থিমেটিক ব্যবহারের ভাবনা তথাপি মন্দ নয়, মনকে যদিও দখলে নিতে পারে না পুরোটা!
অমিতাভ চক্রবর্তী আবার রাজা ও নন্দিনীকে একালের ভাষায় হাজির করেছেন সিনেপর্দায়। আমাদের যুগভাষা যে-রাজনৈতিক পরিসরকে অমোঘ করেছে, রাজা ও নন্দিনীর রসায়নকে তার মধ্যে রেখে বোঝার চেষ্টা আছে এই সিনেবয়ানে। নাটকটি মঞ্চে তুলতে নিবেদিত একদল থিয়েটার আর্টিস্টকে উপজীব্য করে কাহিনিছক বুনেছেন অমিতাভ। ‘রক্তকরবী’ ও এর সমন্তরালে থিয়েটার শিল্পীদের বহতা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র টানাপোড়েন মূলত দেখার বিষয় সেখানে। নিঃশ্বাস নেওয়া ও নিঃশ্বাস ছাড়ার মধ্যবর্তী একটা ডিসকমফোর্ট দর্শককে টের পাওয়ানোর ভাবনা সম্ভবত কাজ করেছে নির্মাতার মনোতলে। মন্দ নয় এই চলচ্চিত্রায়ন।
বাংলাদেশে নাগরিক-এর পরিবেশনা বেশিদিন আগের নয়। নন্দিনীর ভূমিকায় অপি করিম প্রশংসিত হয়েছিলেন ব্যাপক। আশির দশকের গোড়ায় বিটিভির ‘রক্তকরবী’কে নাগরিক তারপরেও অতিক্রম করে যেতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি। ‘রক্তকরবী’র শৈল্পিক পরিবেশনায় মুস্তাফা মনোয়ারের নির্দেশনা সৃষ্টিশীলতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল। কেবল সেট ডিজাইন যদি খেয়াল করেন দর্শক, সহজে বুঝে যাবেন,—কোন মান ও উচ্চতার নাটক নিয়ে বিটিভি দর্শকের সামনে হাজির হতো একটা সময়।
তাঁর প্রয়াণকে যাঁরা স্মরণে ধারণ করছেন গত কিছুদিন ধরে, নাট্য নির্দেশনায় অনন্য এই মুস্তাফা মনোয়ারকে ত্বকে অনুভব করারই কথা। নব্বই-পার জীবনে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে পর্যন্ত কর্ম ও সৃজনে সরব ছিলেন। শিল্পমেধায় থেকেছেন বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়। যেখানে, ওই পাপেট্রি তথা পুতুল নাচের লোকায়ত আঙ্গিককে যুগভাষায় উপস্থাপনে তাঁর কুশলতা বাকি সবটা ছাপিয়ে গিয়েছিল। লোকবাংলার ক্ষয়িষ্ণু পুতুল নাচ নতুন ভাষা পেয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। লোকসমাজে সৃষ্ট ঘরানাকে এই দেশে তাঁর চেয়ে বেশি ভালোবেসে অন্য কেউ ধারণ করেছেন কি? আমার জানা নেই। মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচয়কে এটা পৃথক মাত্রা দিচ্ছে এখানে।
শিল্পী ও মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব ছিলেন তিনি। চারুকলায় পড়িয়েছেন। রেডিও ও টেলিভিশনে নাটক পরিচালনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশে বেতার ও টেলিভিশনের যাত্রালগ্নের অন্যতম একজন। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, শিল্প নির্দেশনা থেকে আরম্ভ করে বিচিত্র ঝক্কি সামলাতে হয়েছে তাঁকে। তকমাটি যে-কারণে অবধারিতই ছিল। ভারী তকমা কাঁধে বয়ে বেড়ানো সুখকর অভিজ্ঞতা নয় কারো জীবনে। একটা মানসিক চাপ শিল্পীমনে অবধারিত হয়। শুধু তাই নয়, এর আড়ালে তার অন্য পরিচয় ও স্বকীয়তা চাপা পড়ে যায় অনেকসময়। মুস্তাফা মনোয়ারের ক্ষেত্রে এরকম ঘটেনি, তা বোধহয় নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

তবু, এটা ধ্রুব সত্য-যে, পুতুল নাচের শিল্প তাঁকে স্মরণীয় রাখবে। একজন চারুশিল্পী তাঁর ভাবনা ও কাজে শৈল্পিক হবেন এটা প্রত্যাশিত! মুস্তাফা মনোয়ার এই ব্রতে নিবেদিত ছিলেন জীবনভোর। পুতুল নাচের মতো মরতে বসা ফোক-আর্ট তাঁর ভাবনার ছোঁয়ায় নবপল্লবে বিকশিত হয়েছিল। পাপেট্রির সাহায্যে দর্শককে বিনোদন ও জীবনশিক্ষার সবক দিতে কার্পণ্য ছিল না। ‘সিসিমপুর’ কি শুধু বাচ্চারা দেখেছে? আমার তা কখনো মনে হয়নি। আকাশ সংস্কৃতির যুগে পুনরায় টেলিভিশনে এটা অনালেন তিনি ও তাঁর দল। কল্পনায় তাঁরা সৃজন করলেন এমন এক রংয়ের বাংলাদেশ, যেখানে পুতুল নাচের বকবকানির স্ক্রিপ্টগুলো যথেষ্ট গোছানো ও সুপরিকল্পিত ছিল। বাচ্চাদের সঙ্গে বাবা-মা ও বয়স্করা এর রস উপভোগ করেছেন নির্দ্বিধায়।
ওয়াল্ট ডিজনির অমর সৃষ্টি টম অ্যান্ড জেরি, মি. বিনের কার্টুন কিংবা আরো পরে মোটু-পাতলু… এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘সিসিমপুর’-এর টিকে থাকার মূলে ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভাবনায় নতুনত্ব। আমেরিকার মিকি মাউস আর বাংলাদেশি পুতুল নাচের চরিত্রগুলো যেখানে একটা বিন্দুতে এসে মিলেছিল যেন! এই মানের টিভি সিরিজ অনেকের জন্য এখনো স্বপ্ন! সাদাকালো বিটিভির যুগে ফেরদৌসী রহমান ‘এসো গান শিখি’ নামে একটা অনুষ্ঠান করতেন। মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্ররা (একজনার নাম বোধহয় ছিল মন্টি; আরেকজনেরটা মনে পড়ছে না) সঙ্গে ফেরদৌসী রহমানের প্রাণবন্ত বাচ্চামো ও সেই ছলে গান শেখানোটা ছিল উপভোগ্য।
এটা সেইসময়, মানুষের হাতে চ্যানেল পালটানোর অপশন ছিল না। তারা কী দেখবে এর সবটাই বিটিভির অনুষ্ঠান পরিকল্পকরা ঠিক করতেন। দর্শককে যাচ্ছেতাই গেলানোর ঝুঁকি ছিল সেখানে। তা-যে অধিক ঘটেনি, এর পেছনে বাহান্ন থেকে একাত্তরের কালপর্বে বিকশিত আবহের আবদান অস্বীকার যাওয়ার সুযোগ নেই। সম্মুখগামী মধ্যবিত্ত সমাজপানে যাত্রার প্রেরণা মুস্তাফা মনোয়ারের মতো গুণিজনের আবির্ভাবকে সম্ভব করেছে ওই সময়টায়। টিভি অনুষ্ঠান তৈরির একশো সীমাবদ্ধতা ছিল, তার মধ্যেই তাঁরা এমন অনুষ্ঠান জাতিকে দেখিয়েছেন, যেখানে রবি ঠাকুরের ‘দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে’র সুরটি প্রবল থেকেছে।
বিটিভিকে বোকা বাক্স বলার চলটি জনপ্রিয় ছিল তখন। সায়েব-বিবি-গোলোমের বাক্স নামেও বিদ্রুপ করতেন অনেকে। বারবার মুখ থুবড়ে পড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র নিজ মতলব হাসিলে একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ত্রুটি করেনি। এরকম পরিবেশে বসে মুস্তাফা মনোয়ারের মতো সৃষ্টিশীল শিল্পমন বৈচিত্র্য ও বিনোদনে গোছানো অনুষ্ঠান জাতিকে উপহার দিতে চেষ্টা করেছেন। আকাশ সংস্কৃতির যুগে প্রবেশের পর টিভি অনুষ্ঠানের মান ঈর্ষণীয় উচ্চতায় পৌঁছানোর কথা ছিল, তা যদিও আমরা ঘটতে দেখিনি। ‘সিসিমপুর’-এর মতো কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া মধ্য নব্বই পরবর্তী সময়ে বিকশিত টিভি চ্যানেলের সৃজনশীল মান নিম্নগামী থেকেছে।
‘সিসিমপুর’কে মুস্তফা মনোয়ার ও তাঁর পেছনে খাটতে থাকা কলাকুশলীদের পক্ষে পরে ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হয়নি। যেমন সম্ভব নয় বিটিভযুগে নির্মিত ‘রক্তকরবী’র বিনির্মাণ। নাটকের নির্দেশনা ও সেট ডিজাইনে বিরল মাত্রার সৃজনশীলতা নতুন করে দর্শকের সামনে নিয়ে আসা কঠিন কাজ। পাপেট ও শিল্প-নির্দেশনার এসব ঝক্কি সামলাতে গিয়ে কি নিজের ছবি আঁকার ওপর অবিচার করে গেলেন মুস্তাফা মনোয়ার? মাঝেমধ্যে প্রশ্নটি মনে উঁকি দিয়েছে বৈকি।
সমসাময়িক আঁকিয়েরা ক্যানভাসে যে-মাত্রায় সক্রিয় থেকেছেন, মুস্তাফা মনোয়ারকে আমরা ছবি আঁকার জগতে সেভাবে কখনো পাইনি। ঘাটতি অবশ্য পুষিয়ে দিয়েছেন পুতুল নাচের পরিকল্পনা ও শিল্প নির্দেশনায়। লোকায়ত ঘরানার চারুশিল্পকে কেউ যদি অম্লযান সরবরাহ করে থাকেন একা, সেখানে তাঁর নাম আসবে। আর্টফর্মটিকে বাঁচিয়ে রাখা, গ্রামীণ ও শাহরিক আবহের রসায়নে নতুনত্ব আনা থেকে শুরু করে, একে সকলের কাছে প্রিয় করার ভার সামলেছেন তিনি।
আফসোসের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, নিজের কোনো উত্তরসূরি রেখে যেতে পারেননি এই গুণী। তাঁর প্রয়াণের পর পাপেটশিল্পের নয়া বিবর্তন কতটা কী ঘটবে, এটা এখনো অস্পষ্ট। তিনি-যে শিল্পরুচি ও শিল্প-নির্দেশনার বনেদ তৈরি করেছিলেন, এটা এখন কতখানি বজায় থাকছে বা ভবিষ্যতে থাকবে,—দেশের বিপথগামী পরিস্থিতিতে বসে সেই অনুমান দুঃসাধ্য বোধ হচ্ছে!
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


