O Captain! my Captain! rise up and hear the bells;
Rise up—for you the flag is flung—for you the bugle trills,
Walt Whitman

‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’;—ক্রিকেট ময়দানের লিজেন্ড ও এক্সপার্টদের মুখে শুনে অভ্যস্ত প্রবাদটি দিয়েই শুরু করি ‘ক্যাপ্টেননামা’। কথা সত্য, প্রবাদটি ক্রিকেটে বেশি চলে। সারার্থ অবশ্য মানব প্রজাতির জন্য সর্বজনীন। ক্রিকেট বাদে অন্য খেলার গ্রেটদের বিশেষত্ব কেবল এই একখান উক্তি ধার করে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব। বাস্তব উদাহরণের নেই অভাব। ক্রিকেটেই যেমন শচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলি এর ক্লাসিক এগজাম্পল গণ্য হতে পারেন অনায়াসে।
একটা সময় আসে, ইনজুরি ও রানখরার পাল্লায় পড়েন এই দুজন। টানা রানখরায় ভোগার কারণে তাঁদের ক্যারিয়ারের অন্ত দেখে ফেলেছিলেন অনেকে! বিরাট কোহলিরটা এর মধ্যে এখনো টাটকা;—আঙুলে গুনলে বেশিদিন হবে না। এই তো পাঁচ-ছয় বছর আগে শনি পিছু নিয়েছিল বেচারার। ক্রিকেটের পরিভাষায় ‘ব্যাডপ্যাচ’ কাটিয়ে মাঠে ঝড় তুলতে হোঁচট খাচ্ছিলেন কিং কোহলি। খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল শচীন টেন্ডুলকারের পর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বিগনেম বল্লেবাজের ক্যারিয়ার। স্ত্রী আনুশকা শর্মা ও এম এস ধোনি ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে নাকি ধারেকাছে পাননি তখন। ক্যাপ্টেন কুল ধোনি কেবল নিজের ওপর বিশ্বাস হারাতে মানা করেছিলেন তাঁকে।
পর্তুগিজ ফুটবলের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ভক্ত বিরাট কোহলি নিজের আইডলের মতোই পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ফুটবল লেখক হুয়ান ভিলোরো তাঁর ‘গড ইজ রাউন্ড’ বইয়ে রোনালদোকে পরিশ্রমী প্রতিভা রূপে বিশেষায়িত করেছিলেন। আপাদমস্তক শৃঙ্খলার সারাগামে সাধা খেলোয়াড়ি জীবন। মাঠে এমনকি তাকে আবেগি হতে দেখার ঘটনা আজো দুর্লভ বলেই জানে দর্শক।
রোনালদোর চির প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির বেলায় ঘটনা বিপরীত। মাঠে ও মাঠের বাইরে মেসি-আবেগের বিস্ফার দর্শক অনেকবার দেখেছে। প্রকৃতি মায়ের প্রতিভায় মোড়ানো লিওনেল মেসি শান্তশিষ্ট লোক সন্দেহ নেই। ফুটবল ছাড়া কিছু বোঝে বলে কখনো মনে হয়নি। মাঠে ডিফেন্সচেরা ড্রিবল আর শৈল্পিক অ্যাসিস্টের জন্য ক্ষুধার্ত থাকা যার মজ্জাগত। এসব গুণ ছাপিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে ফুটবলকে হৃদয় ও মস্তিষ্কের সংরাগে পায়ে নামিয়ে আনা ও প্রতিপক্ষকে হতবাক করে তোলার মতো স্মরণীয় সব মেসিম্যাজিক।
এই মেসি দেশকে কোপা ও বিশ্বকাপ জিতাতে না পারার দুঃখে জাতীয় দল থেকে রিটায়ার করে বসেছিল একদিন! একই মেসিকে ফুটবলবিশ্ব ইস্পাতকঠিন স্থিরতা ও অদম্য জেদ নিয়ে দুইহাজার বাইশের কাতার বিশ্বকাপে সোনার কাপের জন্য লড়তে দেখেছে। স্বভাবসুলভ বিনয় ঝেড়ে ফেলে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে তর্কে নামতে যে-কিনা দুবার ভাবেনি। ছত্রিশ বছরের খরা কাটিয়ে দেশকে তৃতীয় ফিফা বিশ্বকাপ উপহার দেওয়ার খিদে এতটাই অদম্য ছিল তার মধ্যে!
বহু আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির ক্যারিয়ারে অপূর্ণতা বলে কিছু বাকি থাকেনি। কোপা আমেরিকার ফাইনালে তথাপি দেখা গেল ক্ষুধার্ত এলএম টেন-কে। কঠিন প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ানদের সঙ্গে মাঠের লড়াইয়ে ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে হলো তাকে। কোপাটা দ্বিতীয়বার জিততে না পারার শঙ্কায় মাঠের বাইরে চলে যেতে বাধ্য ফুটবল জিনিয়াস কেঁদে ফেলেছিল তাৎক্ষণিক। আর্জেন্টাইন দলটা মেসির জন্যই মূলত খেলে। একটা সময় যেমন মারাদোনার জন্য তারা খেলেছে। সতীর্থরা এবারও তাকে হতাশ করেনি। লাউতারো মার্টিনেজ দারুণ এক গোল করে মুছে দিয়েছিল মেসির চোখের জল। কোপায় চুমু খেয়ে মেসি উদযাপন করেছিল বিজয়ের সুখ।

Image Source & Credit: Old Soul Gallery: Pinterest
একই মেসি ছাব্বিশে আরো অদম্য ও নিখুঁত হয়ে মাঠে নেমেছে, এবং যথারীতি তাকে চট করে কান্না করতে দেখছে দর্শক। হ্যাটট্রিক শেষে মেসির চোখে জল। পঁচাত্তর মিনিট খেলিয়ে মাঠ থেকে তাকে উঠিয়ে নিলেন স্কালোনি। দুজনের আলিঙ্গনের মধ্যেও চলছিল অশ্রু বিনিময়। লাতিন ফুটবলে এই আবেগের দাম আছে! এটা ছাড়া ফুটবল পায়ে জাদু দেখানোর ছন্দ তারা পায় কি খোঁজে? আমার সন্দেহ আছে ভাই।
রোনালদোর অভিধানে এরকম মেসিতে মসিময় ‘আবেগ’ দর্শক কখনো দেখেছে বলে আমার অন্তত অজানা। ‘আবেগ’কে সম্ভবত ভিতরে গুম করে মাঠে নামে সিআর সেভেন। নিজের স্ট্রাগলকে পারতপক্ষে সামনে আনে না। মুখের রেখা দেখে বোঝার উপায় থাকে না এই লোকটা মাঠে খেলতে নেমে চোখের আসু কবে বা কোনোদিন মুছেছিল কি-না!
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সার্বক্ষণিক পেশাদার। মাঠে ও মাঠের বাইরে তার ভাবলেশহীন বিচরণ অনেকের চোখে যে-কারণে যান্ত্রিক লাগে দেখে। মেসি তা নয়। মাঠে তাকে দেখে বল পায়ে ছুটতে ওস্তাদ স্থিরমস্তিষ্ক শিল্পী মনে হবে। মাঠের বাইরে ‘ভ্যবলা ও আলাভোলা’। স্প্যানিশ ছাড়া এমনকি ইংরেজি তার মুখে রোচে না। টাইয়ের নট ঠিক করে বাঁধার ঘটনায় ভুল করে হামেশা। হাতে ট্যাটুর বাহার আছে বটে, পোশাকে ক্যাজুয়াল। কথাবার্তায় মৃদু ও লাজুক। মাঝেমধ্যে মনে হবে এইসব আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকাটা তার পোষাচ্ছে না।
রোনালদো এখানে এসে চৌকস। গ্ল্যামারের ছটা সামলে নেওয়া তার ক্ষেত্রে `ব্যাপার না’ মানতে হবে। অন্তরালের লোকটা হয়তো অন্যরকম। মা অন্তপ্রাণ এই কথাটা শোনা যায় বটে! মায়ের কাছে কি তবে নিজের ‘আবেগ’ সে প্রকাশ যায় নিভৃতে? হতেই পারে। খেলার ময়দানে হাজির রোনালদোকে দেখে এর কিছু বোঝার উপায় নেই। নিখাদ পেশাদার হয়ে মাঠে দেহটা নাচায়। যুতসই অ্যাসিস্টের আশায় ডি-বক্সের আশপাশে সতর্ক চিতার মতো ওঁত পেতে থাকে। ফিটনেস ধরে রাখতে মদ্যপান এড়িয়ে চলে এই লোক। এমনকি কোমল পানীয়কে তার জন্য ক্ষতিকর ভেবে নাকচ করে হামেশা।
যদি ভুল না করি, ঘটনাটি ইউরোয় ঘটেছিল,—সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতায় টেবিলে সাজানো কোকের বোতল অবলীলায় সরিয়ে দিয়েছিল এই লোক! কোমল পানীয়ের জায়গায় ততক্ষণে পানির বোতল শোভা পাচ্ছিল। স্পন্সরের সঙ্গে আয়োজকদের চুক্তির পরিষ্কার লঙ্ঘন ঘটেছিল সেদিনকার সংবাদ সম্মেলনে। রোনালদো কি তা জানত না? নিশ্চয় জানত, তবে তোয়াক্কা করেনি। সিআর সেভেনকে এরকম একখান কাণ্ড ঘটাতে দেখার চাপ শেয়ার বাজারে পড়েছিল তাৎক্ষণিক। কোকের শেয়ার ধাম করে নিচে নেমে যায় কিছুদিন। ক্ষতির অঙ্কটা অবিশ্বাস্য ছিল মনে পড়ে।
সেই রোনালদোকে চল্লিশ পার বয়সে দর্শক মাঠে দেখছে। প্রথম ম্যাচে বড্ডো বিবর্ণ সিআর সেভেনকে দেখতে হচ্ছে এবার! এই প্রথম বোধহয় ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’-এর দেবী তার সঙ্গে ছলনা করবেন বলে মনস্থ করেছেন! পর্তুগাল দলে নিজের অনিবার্যতা প্রমাণের পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে তাঁকে। এরচেয়ে বাজে অনুভূতি আর কী হতে পারে ক্লাব ফুটবলে মেসির সঙ্গে লম্বা সময় লড়ে যাওয়া সিআর সেভেনের জীবনে? সতীর্থরা দেশের সবচেয়ে বড়ো ফুটবল আইকনকে অশোভন ট্রিট দিলো নির্লজ্জের মতো! যেন কোথাকার কোন পাড়ার ছেলে এসে তাকে বল দিতে ইশারা করছে ডি বক্সে! তারা তা দিতে যাবে কোন দুঃখে? ‘যা ফুট’ বলে বরং নিজেরা কেরদানি দেখাবে!

অপমানের জবাব রোনালদো কি মাঠে দিতে পারবে? পর্তুগাল দলে অতিরিক্ত শক্তির ঠাসাঠাসি ভিড় পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে তার জন্য। বিরাট কোহলি অনেকটা এরকম অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গিয়েছিল ক্যারিয়ারের শেষ দিকটায়। দলের সতীর্থরা তবু তাকে অপমান করেনি। কোহলিকে অপমানিত হতে হয়েছিল ক্রিকেট সমালোচক, নির্বাচক ও মিডিয়ার লোকজনের কাছে। রোনালদোর ক্ষেত্রে ঘটনা ভিন্ন। দুদিনের ফুটো নবাবরা তাকে মাঠে তাচ্ছিল্য দেখাতে দ্বিধা করছে না। তার ওপর রাগ ঝাড়ছে। এই দল নিয়ে ক্যাপ্টেন তাহলে সামনে আগাবে ক্যামনে!
সিআর সেভেনের নিজেকে নিজে উজ্জীবিত করা ছাড়া বিকল্প নেই মনে হচ্ছে। কোচ থেকে সতীর্থ খেলোয়াড়দের সারগামে বেঁধে ফেলার ঘাটতি তার মধ্যে রয়েছে;—এই বাস্তবতাটা উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলাফল, কোচ হয়তো তাকে বসিয়ে রাখতে পারে ম্যাচের পর ম্যাচ। গতবার যেমন নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোয় মোটামুটি মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয়েছিল তাকে। ফলাফল অবশ্য তাতে কিছু পালটে যায়নি। না আটকানো গেছে পর্তুগালের অকাল বিদায়।
ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় ডুয়েলে রোনালদোর প্রতিযোগী মেসির দল সেখানে থেকেছে বিপরীত। এলএম টেন-কে দলনেতা ও আইডল মেনে অনুগত নাবিকরা জান লড়িয়ে দিয়েছিল মাঠে। ছাব্বিশেও তাই হতে যাচ্ছে। দলনেতার প্রতি ভালোবাসায় কমতি নেই কারো। তার জন্য জান উজাড় করে লড়তে প্রস্তুত প্রতিটা সতীর্থ। স্কালোনি এমনভাবে দলকে সাজিয়েছেন, এরা মেসি মাঠে থাকলে তার জন্য লড়বে। না থাকলেও তাকে প্রেরণা মেনে লড়বে। রোনালদোর বারুদভরতি পর্তুগাল এখানটায় এসে হিসাব মিলাতে পারছে না। সিআর সেভেন ‘গ্রেট’ হতে পারেন, কিন্তু দলের নাবিকদের কাছে সম্ভবত ‘গ্রেট ক্যাপ্টেন’ নন। বিশ্বকাপে মাঠের বাইরের এসব মনস্তত্ত্ব ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অবস্থা যেন-বা ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন’ কবিতাটির মতো। জাহাজ মিশন শেষ করে ডুবতে-ডুবতে বন্দরে ভিড়ছে ক্যাপ্টেনকে লাশ বানিয়ে। হুইটম্যান অবশ্য আব্রাহাম লিঙ্কনের নিহত হওয়ার শোকে কবিতাটি লিখেছিলেন। যে-লিঙ্কন আমেরিকানদের একতা এনে দিলেন, তাঁকে কিনা মরতে হলো তাদের হাতে!
রোনালদো এখানেও পিছয়ে আছেন মনে হচ্ছে। পর্তুগাল দলে একতার কাণ্ডারি হওয়াটা তাকে দিয়ে হয়ে উঠছে না কিছুতেই! নাবিকরা তাকে মৃত ভাবছে উলটো! ‘O Captain! my Captain! rise up and hear the bells;’ বলে তাকে জাগানোর কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। বন্দরে জাহাজ ভিড়ছে তো কী হয়েছে, ক্যাপ্টেন ঠাণ্ডায় জমে অক্কা পেয়েছে। ক্যাপ্টেনকে ছাড়া জাহাজ তার মিশন পুরা করতে নেমেছে! বালাই ষাট! রোনালদোকে যেন এরকম এক জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে তীরে এসে তরী ডুবাতে না হয়!
. . .
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


