
অ্যাট দ্য এইজ অব হিজ সেভেনটি, হ্যারল্ড রশীদ তাঁর আঁকা ছবির একজিবিশনটা করলেন অবশেষে! রবি ঠাকুরের মতো সত্তর বছরে পা দিয়ে এই লোকের মনে পড়েছে,—তার একটা একজিবিশন হওয়া উচিত! ক্যানভাসে আঁকা জগৎটাকে অবশেষে শিল্পরসিকদের নজরে আনলেন চারুশিল্পের এই ‘মেঘদূত’। সে নাহয় হলো। আষাঢ়ের বৃষ্টিধারায় ভিজে একশা শহরে তবু ভাপ ওঠা গরম টের পাচ্ছে ত্বক। বৃষ্টিদিনের আর্দ্রতায় সেদ্ধ মনে বুদবুদ তুলছে বিস্ময় :—গোনাগুনতির জীবনে দেশ-বিদেশের আর্ট গ্যালারিতে এই লোকের আঁকা ছবির প্রদর্শনী এতদিনে কমন হওয়ার কথা ছিল! একজিবিশন করার জন্য মাকড়সা-জালের মতো ছড়ানো নেটওয়ার্ক, ব্যক্তি-সংযোগ ও পকেটের জোর… এসব অন্তত হ্যারল্ড রশীদের ক্ষেত্রে অন্তরায় হওয়ার কথা নয়। রাজধানী বা দেশের বড়ো শহরগুলোয় পাঁচ-দশটা একজিবিশন নামানোর জন্য তাঁর নামের জেল্লা যথেষ্ট সেখানে। তাহলে!
ভেবেটেবে একটা কারণ বের করা গেল,—লোকটা অতিমাত্রায় খাপছাড়া হওয়ার কারণে ব্যাটেবলে মিলেনি। মর্জি ও খেয়াল একটা মোহনায় মিলিত হলে এই লোককে দিয়ে কিছু করানো সম্ভব। এছাড়া, তাঁকে ম্যানেজ করা সম্ভবত কঠিন থাকে বাকিদের জন্য। অবশেষে, এই-যে সম্ভব হলো ব্যাপারটা, এবং কী-করে সম্ভব হলো, এটা এখন হ্যারল্ড ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা ভালো বলতে পারবেন। ঘটনাটি যেভাবে হোক ঘটেছে। ক্যালেন্ডারের ঘরে ২০২৬ সালের ২৯ জুন অতএব মার্ক করে রাখা যেতেই পারে। দিনটি তাদের জন্য স্মরণীয় থাকছে, যারা দূর অথবা নিকট থেকে এই ভদ্রলোক ও তাঁর পরিবারকে অনুসরণ ও পাঠের চেষ্টা করেছেন এতদিন।
সে যাইহোক, বাবা শাহজালালের মাটিতে হ্যারল্ড রশীদের পয়লা আর্ট একজিবিশন উপলক্ষ্যে মুদ্রিত স্মারক ও এর সঙ্গে জোড়া ছবিগুলো ভালোই পরিপাটি লেগেছে দেখে। দেশের প্রথিতযশা আঁকিয়ে রফিকুন নবী ও নিসার হোসেন-এর শুভেচ্ছাবার্তা ছেপেছেন প্রদশর্নীর আয়োজকরা। ব্যক্তি হ্যারল্ড ও তাঁর আঁকা ছবি সম্পর্কে আভাস তাঁরা দিয়েছেন সেখানে। শুভেচ্ছা-বক্তব্য পাঠে বোঝা গেল, চিনপরিচয় থাকলেও হ্যারল্ড রশীদ স্বয়ং দেশের দুই গুণী আঁকিয়ের কাছে এখনো দূর দ্বীপবাসী হয়ে একজিবিশনটা করছেন। অনুষ্ঠানে সশরীর উপস্থিত শিশির ভট্টাচার্য্য, সৈয়দ আবুল বারাক আলভীর মতো দেশবরেণ্য চিত্রীরা তাঁকে কীভাবে পাঠ করলেন, তা অবশ্য ভালো করে জানা হয়নি। থার্ড লেন স্পেস-এর দুই নিয়মিত অবদায়ক ফয়েজ আহমদ ও সজল কান্তি সরকার মনে হচ্ছে এই ব্যাপারে ধারণা দিতে পারবেন। আফটার অল, একজিবশনটা দুজনে উপভোগ করেছেন সোৎসাহে।
আমি আপাতত স্মারকে মুদ্রিত রফিকুন নবী ও নিসার হোসেনের ‘মন্তব্যে’ মনোযোগী থাকাটাকে শ্রেয় মানছি। হ্যারল্ড রশীদের শিল্পীসত্তাকে পাখির চোখ করে দেখা ও জানাবোঝায় ঘাটতি দুজনের কথায় পরিষ্কার আভাসিত। ঘটনাটি সার্কাসিস্ট ঠেকছে ভাই! একটা সিন মাথায় বিজলি হানছে তাৎক্ষণিক :
A man sitting beside the lonely island, and that was Harold. They watched him afar. He was also looking over them afar, and both were unable to communicate.
যে-হ্যারল্ডকে রফিকুন নবী ও নিসার হোসেন তাঁদের শুভেচ্ছাবার্তায় টানলেন, তাঁকে ছায়ামানব ভাবা যায় বড়োজোর! বাস্তবের হ্যারল্ড রশীদকে এই শহরে আমরা চলাফিরা করতে দেখেছি ম্যালা। দেখেছি, তবে যেচেপড়ে পরিচিত হওয়ার ঠেকা বোধ করিনি। অপরিচিত এই হ্যারল্ড রশীদ তবু আমাদের ত্বকে ছাপ রেখে চলেছেন আজো!
একবসায় লেখা এই ‘হ্যারল্ডনামায়’ আমাদের মতো আমড়াকাঠের ঢেঁকিদের জীবনে দূর দ্বীপবাসী লোকটির প্রভাব ও আবেদন জানাবোঝার চেষ্টা থাকবে। বন্ধু বলে বুঝে নেওয়া রফিকুন নবী ও নিসার হোসেনরা যেখানে তাঁকে দুরবিনচোখে নজরে আনতে পেরেছেন বলে মন এখনো মানতে নারাজ! সেলুকাস! বিচিত্র এই ‘ভাঙ্গাদেশ’, আর এর ক্যারিকেচারে ভরা শিল্পজগৎ!
. . .

হ্যারল্ড রশীদের ছবিতে সরাসরি ঢুকে পড়ার আগে বাড়তি কিছু প্রসঙ্গ আগেভাগে সেরে ফেলা প্রয়োজন মনে করি। এছাড়া তাঁর ছবির সঙ্গে পিরিতের আলাপ জমানো সম্ভব নয়। এই লোক ইচ্ছে করলে তাঁর বাপ-চাচাদের মতো কেউকেটা হতে পারতেন সহজেই। পারিবারিক পরিচয়কে পুঁজি করে তরতর উপরে উঠে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন ছিল না। আমাদের বরাত ভালো-যে, তা ঘটেনি। অঘটনটি হ্যারল্ড রশীদকে বিরল পথে টেনে নিয়ে গেছে। পথটি ধরে তিনি হেঁটেছেন। ইচ্ছে হলে জিরান নিয়েছেন কিছু সময়। এবং, পুনরায় হেঁটেছেন টানা।
সত্তর বছরে পা রাখার দিনটি এখন একটা পজ নিতে বলছে তাঁর কানে-কানে। নিজের জীবনজার্নিটা সাধারণ দর্শকের নজরে আনার ভাবনা বোধহয় এই প্রথম তাঁকে বিচলিত করেছে। বন্ধুবৃত্ত থেকে বেরিয়ে সাধার দর্শকের কাছে নিজের অঙ্কনবিদ্যাটা অবমুক্ত করলেন তিনি। শিল্পীর আঁকা ছবির সঙ্গে কথা বলার স্পেস এর ফলে তৈরি হলো এতদিনে। আয়োজক কমিটির যাঁরা প্রদর্শনীর পেছনে শ্রম দিয়েছেন, তাঁরা ধন্যবাদের দাবিদার সেখানে।
যাইহোক, প্রসঙ্গে ফিরি। হ্যারল্ড রশীদের মরহুম পিতা চা-কর আমীনূর রশীদ চৌধুরী ব্যবসা ও রাজনীতির মারপ্যাঁচে ঠাসা জগতে বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। চাচা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে পরিচয় করানোটা বাহুল্য। রশীদ পরিবারের লিগ্যাসি কয়েক পুরুষের পুরোনো। সিলেটের টপ এলিট পরিবারগুলোর মধ্যে উনারা ডমিনেটিং থেকেছেন ম্যালা দিন। ব্যবসা ও রাজনীতি তাঁদের রক্তে বাপিয়াতি বলাটা ভুল হবে না আশা করি! যেসব লক্ষণ দিয়ে আমরা সহি বুর্জোয়ার খবর করি, যাদের বিকাশ ছাড়া নাকি একটা সমাজে হাই আর্টের প্রসার হোঁচট খায় অনেকভাবে,—রশীদ পরিবার সেই শিল্পবোধের চর্চায় ত্রুটি করেননি। হ্যারল্ডযুগে এসে যা মনে হয় পূর্ণতা পেয়েছে।
সত্যমিথ্যা নিশ্চিত নই, তবে আব্বার মুখে শুনেছি,—এই পরিবারের মেয়ে (নামটা স্মৃতি থেকে মুছে গেছে!) পাক-জামানায় বিলেত পাস আইনজীবী ছিলেন। আম্বরখানায় রশীদ পরিবারের বিখ্যাত বাড়ির লনে বসে সিগারেট ফুঁকতে দেখা যেত তাঁকে। ধোঁয়ার সঙ্গে ব্যক্তিত্বটা উড়িয়ে দিতেন হাওয়ায়। আভিজাত্য শুরুতে চর্চার বিষয় থাকে, তারপরে সহজাত অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় ওটা। অ্যান্ড ফাইনালি, একটা একঘেয়ে পুনরাবৃত্তির মধ্যে নিজেকে অবসন্ন হতে দেখে। রশীদ পরিবারের কন্যা ঠিক কোন পর্যায়ে অবস্থান করছিলেন, আব্বার বিবরণ থেকে এর কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে হ্যাঁ, আমীনূর রশীদের স্ত্রীকে আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। সিম্পল বাট অ্যালিগেন্ট ছিলেন। হ্যারল্ড রশীদের থেকে পাওয়া তথ্য অনেকের জানা,—তাঁর মা ভালো এসরাজ বাজাতেন। গিটারের ভাও রপ্ত করতে এটা তাঁকে সাহায্য করেছে তখন।
আমীনূর রশীদ ওদিকে রাজনীতি করেছেন জাতীয় পর্যায়ে, কিন্তু সিলেট ছাড়তে হবে দেখে মন্ত্রীত্ব ও দেশের হয়ে বিদেশে দূতিয়ালির অফার নাকচ করতে দ্বিধা করেননি। ব্যবসা ও রাজনীতির পাশাপাশি সিলেটে বসে ‘যুগভেরী’ চালিয়েছেন। বয়সের অঙ্কে প্রায় শতবর্ষী এই কাগজকে নিছক আখবার ভাবাটা ভুল হবে। সিলেটের বিকাশমান সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় ‘যুগভেরী’ ব্রান্ড ছিল একসময়। ধনকুবের রাগিব আলীর ‘সিলেটের ডাক’ পরে তাকে খেয়ে দিয়েছে ঠিকই, তবে ‘যুগভেরী ওয়াজ যুগভেরী’। আমীনূর রশীদও তাই! রাজনীতির সঙ্গে সাংবাদকিতাটা নখদর্পণে ছিল তাঁর।
‘যুগভেরী’কে পরে সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে মোড় নিতে দেখেছি আমাদের সময়ে এসে। আমীনূর রশীদ ততদিনে ধরায় বেঁচে নেই। কাগজ চালানোর ভার রশীদ পরিবার বহন করছিলেন। অল্প কিছুদিন চলার পর বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। পরে অবশ্য অনলাইন ও ছাপা সংস্করণে কাগজটি ফেরত এসেছে পুনরায়।
‘যুগভেরী’ এখনো বেরোয়, তবে জেল্লা মৃত। অতীতের ছায়া হয়ে কাগজটি বাজারে টিকে আছে! হ্যারল্ড তাঁর বাবার রেখে যাওয়া লিগ্যাসিটা ভালোভাবে ধরে রাখতে পারেননি। ‘যুগভেরী’র জন্য বরাদ্দ জমি বেচে দিয়েছিলেন শোনা যায়। এভাবে যেন একটা ভার নামিয়ে হালকা করছিলেন নিজেকে। আমীনূর রশীদের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের অনেকখানি এভাবে তিনি হালকা করেছেন বলে বাজারে কথা চাউর আছে। তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, হালকা হওয়া ছাড়া তাঁর যেসব কাজে মতি, সেগুলোয় লেগে থাকা দুষ্কর হতো। হ্যারল্ডের ওই যৎসামান্য উপকরণ ব্যবহারে আঁকা ছবিগুলোর দেহ থেকে ঠিকরে পড়া বার্তার মাহাত্ম্য এরকম সব তথ্য ছাড়া বোঝা কঠিন থাকছে দর্শকের জন্য।
সে যাকগে, আমীনূর রশীদে আরো থাকি কিছুক্ষণ। বহুবর্ণিল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গান লিখতেন। গদ্য লেখার হাত কতটা ভালো তা ‘সত্য ও তথ্য : অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী’র পাতায় চোখ রাখলে পাঠক ভালোই টের পায়। তাঁর লেখা একমাত্র বইটি দেশভাগ ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক আবর্তনের ছবি চোখে ভাসিয়ে তোলে। বইয়ের বিবরণ এক যুবককে সামনে হাজির করছে। জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে সে শরিক করছিল ভারতবর্ষে তখনো সবল প্রগতি-রাজনীতির পাঠ নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
সিলেট থেকে ভারতবর্ষের পরিসীমায় পোড়খাওয়া নেতাদের সঙ্গে ওঠবসের অভিজ্ঞতা আমীনূর রশীদের রাজনীতিজ্ঞানকে পরিপক্ক করতে বড়ো অবদান রেখেছে। মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন আমৃত্যু। সেই মানুষটি আবার চা-শিল্পে পাকামাথার ব্যবসায়ী থেকেছন। টি-এস্টেট মালিকদের একটা আলগা চটক থাকে। লাভক্ষতি ছাপিয়ে তারা তা বহন করেন। পরিচয়টি দেশে-বিদেশে কাজে দেয় ব্যাপক। বাগান-মালিক আমীনূর রশীদ এই জায়গায় পা রাখার সময় নিপাট বুর্জোয়া। আভিজত্য ও গরিমা ঠিকরে বের হতো বলে কিংবদন্তি আজো শহরে উড়ে। নিজের ক্লাসটা মনে হয় এভাবে ডিফাইন করতেন । বুঝিয়ে দিতেন,—দেখো, আমি একটা ক্লাসে বিলং করি, এবং এর একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। রশীদ পরিবারে উচ্চাঙ্গ সংস্কৃতিচর্চার ঘটনাকে কাজেই একটা বিশেষ শ্রেণিতে বিলং করার সম্প্রসারণ ভাবা যেতে পারে। এটা ছাড়া বনেদি হওয়া যায় কি? সব মিলিয়ে ভার্সেটাইল ক্যারেক্টার ছিলেন হ্যারল্ড রশীদের জীবনে প্রভাববিস্তারী এই যুগপুরুষ।
. . .

আমীনূর রশীদের রাজনীতি, সাংবাদিকতা, পত্রিকা চালানো, লেখালেখি ও গান এই অঞ্চলের আধ্যাত্মিক অনুরণনকে বাদ দিয়ে কিন্তু ঘটেনি। হ্যারল্ডের মধ্যে পরে তা সংক্রমিত হয়েছে অনেকখানি। পাকিস্তানের লাহোরে শৈশব ও পরে বিলেতে পড়ালেখা করেছেন হ্যারল্ড। ছবি আঁকা ও রক মিউজিকের পাশ্চাত্যঝড় দেখেছেন সেখানে। গায়ে এর ঝাপটা সামলেছেন ভালোভাবে। ল্যাভিশ লাইফে গা ভাসানো তাঁর জন্য কঠিন ছিল না। মোহমায়া ছেড়ে তবু দেশে ফেরত আসেন। বাপের মতো ততদিনে তাঁর মধ্যে সিলেটের জল-হাওয়া আসর করেছিল। তারপর থেকে দেশ-বিদেশে যাওয়া-আসায় থেকেছেন নিরন্তর। শম্পা রেজা এই পরিবারটির অনেকখানি জানতে পারছেন পরে, হ্যারল্ডের বউ হয়ে আসার সুবাদে।
এখন, হ্যারল্ড রশীদ নিবিষ্ট হলে কী হতে পারতেন তা বোধহয় আমরা কল্পনা করতে পারি। গ্রাফিক্সের ওপর ডিগ্রি নিয়েছেন সেইসময়। সিরিয়াস থাকলে দেশের নামকরা গ্রাফিক আর্টিস্ট ও ডিজাইনার হওয়া ব্যাপার ছিল না তাঁর জন্য। অ্যাড বানানেওয়ালারা লাইন দিতো রাতারাতি। সিলেটে বসে আগ্রহীদের গিটার শিখিয়েছেন কিছুদিন। নিজের খেয়ালে কাজটি তখন করেছেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি।
গিটার বাদ্যযন্ত্রটি তাঁর হাতে কোন লেভেলে বাজে, সেটা বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে তারকা হয়ে ওঠা ব্যান্ডশিল্পীদের অনেকে টের পেয়েছেন। হ্যারল্ড তাঁদের সঙ্গে বাজিয়েছেন ও গলা মিলিয়েছেন বিভিন্ন সময়। মিউজিকে তাঁর ‘নিজস্ব চাওয়া’ বলে কিছু কি পাচ্ছি আমরা? ‘কিছু একটা হতে চাওয়া’ বা ‘হয়ে ওঠার’ গরজ এই লোকের মধ্যে প্রকট দেখা যায়নি। কয়েক প্রজন্মের বনেদিয়ানা অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর ‘কিছু হতে চাওয়ার’ ক্ষুধা উত্তরপুরুষে এসে অনেকখানি মরে যায়। হ্যারল্ড রশীদকে এর উদাহরণ ধরে নেওয়াটা আশা করি ভুল নয়। তাঁর মধ্যে ‘কিছু হতে চাওয়ার’ খিদে প্রবল থাকেনি। বাংলাদেশে ব্যান্ডগানের শিল্পীদের সঙ্গে তিনি কেবল মুহূর্তগুলো উদযাপন ও উপভোগ করেছেন। তাঁর কাছে বড়ো হয়ে উঠেছিল বন্ধুসঙ্গ ও আড্ডা।
ছবি আঁকাটা সম্ভবত সবচেয়ে মেধাদীপ্ত এলাকা হয়ে তবু জেগেছিল তাঁর মনে। সত্তরে এসে যে-কারণে সোলো একজিবিশন করছেন! তাও আবার দেশের নামকরা চিত্রী ও আর্ট গ্যালারিকে পাশ কাটিয়ে! এখানেও মনে হচ্ছে ‘আই ডোন্ট কেয়ার’ যোগীভাব লোকটাকে একজিবিশনে মরিয়া করেনি এতদিন। তিনি বরং আরো দশটা কাজ করেছেন এই ফাঁকে। শাহ আলম গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এর মধ্যে অন্যতম।
সিলেটের প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রশিল্পী শাহ আলমের অকালে চলে যাওয়া শগরবাসীর জন্য শকিং ছিল। আহা শাহ আলম! প্রণয়ঘটিত ঝামেলায় কিছুদিন জেল খেটেছিলেন শিল্পী। জেলে দাগি আসামির সঙ্গে এক সেলে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। লোকটি কুড়ি বছর ধরে জেলের কুঠুরিতে বন্দি। শাহ আলম ছবি আঁকেন জেনে তাঁকে নারীর ছবি এঁকে দিতে বলেছিল। কুড়ি বছর হয়ে গেল কোনো নারীমুখ নাকি সে দেখেনি! চকখড়ি দিয়ে শাহ আলম সেদিন এঁকেছিলেন নারীসুরত,—কুড়ি বছর ধরে জেলখাটা এক দাগি আসামির জন্য।
ফোকাস আইটিতে আমাদের আড্ডায় মাঝেমধ্যে হাজিরা দিতেন স্বভাব বাউল এই আঁকিয়ে। এরকম এক সন্ধ্যায় হাজির শাহ আলম জীবনখাতা থেকে তুলে আনা গল্পটি শুনিয়েছিলেন। তাঁর অকাল প্রস্থান আজো শেল হয়ে বুকে বিঁধে। শাহ আলমদের শিল্পগুরু স্বভাব-সাত্ত্বিক অরবিন্দ দাশ গুপ্তু ওদিকে জীবদ্দশায় নিজের প্রাপ্য সঠিক বুঝে পাননি! ঢাকা ছেড়ে আসা বুমেরাং হয়েছিল মনে হয়। মফস্বলে থাকলে যা হয়, এক নিঃসঙ্গ দুর্যোগ ঘিরে ধরে ও ধীরে-ধীরে অজগরের মতো খেয়ে ফেলে মানুষের কলিজা। হ্যারল্ড রশীদ বেঁচে গেছেন কপালজোরে। দেশে-বিদেশে সমানে যাওয়া-আসার কারণে মফস্বল তাঁর কলিজা চিবিয়ে খেতে পারেনি। দেহটা অবশ্য সিলেটি ও মফস্বলী তারে বেঁধে রেখেছেন এই সত্তরেও।
শাহ আলম ও অরবিন্দ দাশ গুপ্তকে সহজটানে নিজের করে নিয়েছেন হ্যারল্ড। দুই চিত্রীকে স্মরণে ধরে রাখতে গাঁটের পয়সা ও পারিবারিক প্রতিপত্তি ব্যবহারে কৃপণতা করেননি। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে দিয়ে হিমন সায়েবের আর্ট স্কুলের বনেদটা তৈরি করে দিয়েছেন। মুহিতদের পরিবার কয়েক প্রজন্মের নামকরা এলিট! অর্থমন্ত্রী পরিচয়ের আগে আবুল মাল মুহিতকে আমরা রসিক পড়ুয়া বলে জানি। আমাদের তারুণ্যে ভালো বইয়ের আস্তানা ‘বইপত্র’ ও বইজহুরি হান্নান ভাইয়ের বাসায় তাঁকে বই ঘাঁটতে ও বুঁদ থাকতে দেখেছি নিজ চোখে।
বনেদি বড়োলোকদের জন্য এসব রুটিন খেয়ালের অংশ হতে পারে, তবে হ্যারল্ড এখানেও ভিন্ন ও আজব থেকেছেন। তাঁর ভিতরে আমীনূর রশীদকে ডিনাই করার একটা স্বভাব শান্ত জেদ ধারণা করি গোড়া থেকে জমছিল। ওয়েলথ চাইছেন না তিনি, ওটাকে হালকা করে নামিয়ে আনছেন যোগীভাবে সাধা গিটার ও আঁকায়। নামিয়ে আনছেন মাজার ও বাউল গানের চক্করে। ওসব চক্করের গান আমীনূর রশীদ লিখেছেন একটা সময়। হ্যারল্ড তার মধ্যে মিশিয়ে দিলেন বিলেত থেকে পাওয়া রক অ্যানার্জি। একটা সংমিশ্রণে ভরাট আধ্যাত্ম-মোক্ষণ হলো তাতে, যেটা এখন ছবির-পর-ছবিতে ‘জাস্ট’ ফেটে পড়তে দেখছি!
. . .

নিজেকে নানাদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আলাপের একটা ভাষা এভাবে গড়ে তুলেছেন হ্যারল্ড রশীদ। এটা এখন ছবিতে তাঁর হয়ে কথা বলছে। এখানে তিনি গৃহী সন্ন্যাসী। গভীর রাতে মানিক পীরের টিলায়, কোনো মাজারে বা বাউলা গানের আসরে জমে ক্ষীর হ্যারল্ড… দৃশ্যটি অচেনা থাকেনি একটা সময়। তাও ওইসব লোকজনের সঙ্গে জমে ক্ষীর হচ্ছেন, যারা তাঁর স্ট্যাটাসে পড়েন না। সেই লোকটাকে পরদিন হয়তো পাওয়া যেত ঢাকায় আলাউদ্দিন আলীর মতো মিউজিশিয়ানের সঙ্গে আড্ডায়। হতে পারে সেখান থেকে হুট করে পা রাখছেন হিথ্রোয়। ভিনদেশি কারো সঙ্গে গান অথবা ছবি নিয়ে আলাপে মগ্ন দেখছি তাঁকে। মনের তারে তখনো গুনগুন চলছে ফেলে আসা সিলেটে বাউল থেকে শুরু করে পীরালি সব ব্যাপার-স্যাপারে মজে থাকার তেষ্টা।
এগুলো এক ধরনের রসায়ন তৈরি করে মানুষের দেহে। হ্যারল্ডের একুনে পঞ্চাশখানার অধিক ছবি মূলত এই জার্নিটা ধরছে সেখানে। লাইফজার্নির পাতায়-পাতায় লোকটা এসবের মিক্সচার। এটা তাঁর জীবনে কেন্দ্র বলে কিছু অবশিষ্ট রাখেনি। রাখবার কথাও নয়। যা ছিল বা এখনো আছে বলে অনুমান করে নিতে পারি, সেটা হলো এক ইনার রিয়েলিটি। নিজের ভিতরে তৈরি জগৎ;—তাঁর বাল্যজীবন থেকে সত্তর বছরী জীবন যেখানে তালগোল পাকানো একটা ভ্রমণে আজো বহমান।
রফিকুন নবী এই জায়গাটি ধারণা করি আন্দাজ করতে পারেননি। তিনি দেশের নামকরা আঁকিয়ে। হ্যারল্ড আসলে কোনখান থেকে ক্যানভাসে কী পিক করছেন, এর মাহাত্ম্য টের পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। যে-কারণে হুট করে ট্যাগ দিয়ে বসেছেন,—হ্যারল্ডের ছবিতে ‘ফ্যান্টাসি ও পরাবাস্তবতা’ আভাসিত। চারুকলার অধ্যাপক ও দেশের বড়ো আর্টিস্ট হলে বোধহয় কিছু একটা বলতে হয় অন্যদের নিয়ে। পিঠ চাপড়ে দিতে হয় মাঝেমধ্যে। রনবীও তাই ঘটিয়েছেন। ধা করে বলে দিয়েছেন,—‘ফ্যান্টাসিধর্মী, সুররিয়াল ধাঁচের কাজ’ ইত্যাদি। না বললে মনে হচ্ছে ভালো করতেন।
তাঁর ভাষ্য জানাচ্ছে,—হ্যারল্ডকে তিনি প্রথম দেখছেন ঘোড়াশালে জনৈক বনেদি পরিবারের ছবি আঁকার কর্মশালায়। একটা ছেলে গিটার বাজিয়ে গান করছে আপন খেয়ালে। স্বভাব বিনয়ী ছেলেটি। গুরুজনদের মাঝখানে এসে মাঝেমধ্যে বসছে ও ফের চলে যাচ্ছে। যাইহোক, তার সঙ্গে চিনপরিচয় গাঢ় হয়েছে পরে। হ্যারল্ডের আমন্ত্রণে সিলেটের বাসায় গিয়েছেন ও তার আঁকা ছবি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তখন। ছবিগুলো দেখার পর রনবীর মতো গুণী ঠিক কী কারণে ‘ফ্যান্টাসিধর্মী ও সুররিয়াল’ তকমা অক্লেশে বেচারাকে দিলেন, তা মাথার ওপর দিয়ে গেল মনে হচ্ছে! এমন নয়, হ্যারল্ডের আঁকা ছবিতে রনবীর দেওয়া ট্যাগিংয়ের আভাস কিছু নেই। আছে;—তবে তা গৌণ বা ইনসিগনিফিকেন্ট হয়ে পড়ছে প্রতিটা ছবির ইনার কম্পোজিশনের গুণে।
হ্যারল্ড রশীদের ছবি স্পিরিচুয়াল ক্যাথারসিসে গমন করতে অভ্যস্ত। দুই-একটি বাদ দিলে সবগুলো ছবি যে-কারণে পরস্পরের প্রতিধ্বনি। একটা লোকের মনোজগৎকে প্রতিভাসিত করছে তারা। আঁকার গুণে যা আবার কেবল তার নিজের থাকেনি। দর্শককে ওই জগতে ঢুকিয়ে নিচ্ছেন হ্যারল্ড। তাঁর আঁকা জগৎ-ফাঁদে দর্শক বন্দি বটে! আমাদের শিরদাঁড়ায় একটা স্পাজম টের পাইয়ে দিচ্ছে এই লোক!
হ্যারল্ড রশীদের আঁকা পঞ্চাশের অধিক ছবির একটাও স্থবির নয়। মিনিমাম উপকরণে একটা জগৎ আঁকছেন তিনি। পেন্সিল নয়তো তুলি ঘঁষে গাঢ় করেছেন ছবির অনুষঙ্গ ও খাঁজভাঁজ। ব্যাস এটুকুন। ওই ‘এটুকুন’-এর কী জোর!—প্রতিটা ছবির সাবজেক্ট ও ফিগারকে গতিশীল করতে ভূমিকা রেখেছে। তারা মৌন, কিন্তু দেখে মনে হবে সরব কলরবে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে! তর্জনি উঁচিয়ে নিজের প্রেজেন্সকে বিশেষায়িত করছে ক্যানভাসে। ভিতরের একটা কিছু এভাবে আছড়ে পড়ছে ও সংহত রূপ নিচ্ছে ছবির আয়তনে!
. . .

হ্যারল্ড রশীদের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে অতীন্দ্রিয়। মর্ডিব মনে হবে প্রথম দেখায়। অন দ্য শোরস অব অ্যান্টিসিপেশন (On the shores of anticipation)-এ তাঁর কাজ দেখে রনি আহম্মেদের পাশাপাশি মিশরদেশি চিত্রশিল্পী খালেদ হাফেজ মনে উঁকি দিয়ে যাবেন তাৎক্ষণিক। প্রত্নযুগে সমাধি নেওয়া ইতিহাস ও মিথরঞ্জিত চরিত্রের সঙ্গে একালে তৈরি হতে থাকা ইতিহাস ও চরিত্রের মেরুকরণ কমিক রিলিফ ও সার্কাজমের মধ্য দিয়ে ছবিতে আভাসিত করেন খালেদ হাফেজ। যে-ঘূর্ণিটা তিনি আঁকেন, হ্যারল্ডের কাজে এরকম একটা অনুরণন চোখে পড়ার কথা দর্শকের।
একালে ইতিহাসকে স্থানান্তরিত ও পুনর্লিখন করে কার্টুন চরিত্র, অ্যাভাটার ইত্যাদিরা। বাস্তবের মানুষ মুছে যায় অথবা তারা অ্যানিমেশন ক্যারেক্টারে পালটাতে থাকে হামেশা। হয়ে ওঠে সার্কাস্টিক। খালেদ হাফেজ প্রাচীন মিশরীয় অঙ্কনরীতি ব্যবহার করে রূপান্তর ও সংমিশ্রণটাকে জীবন দিয়েছেন। বদ্রিলারের হাইপাররিয়েলিটি বা অতিবতাস্তবতার ঘন পরিসর এভাবে ভাষা পায় তাঁর ক্যানভাসে।
বাস্তবতা বলে যাকে আমরা বুঝে নিচ্ছি, এর অস্তিত্ব ও টিকে থাকা নির্ভর করে ন্যারেটিভ কারা কীভাবে তৈরি করছে এর ওপর। কমিক্স কিংবা গ্রাফিক্যাল নভেল থেকে উঠে আসা সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানের মতো চরিত্রগুলো যেখানে মিথকে ডিফাইন করে যায়। খালেদ হাফেজ যেমন মিশরীয় আনুবিসের মতো মিথঈশ্বর, আর আজো চিরজীবী ফারাওদেরকে কবর থেকে উঠিয়ে স্পাইডারম্যান ও সুপারম্যানদের পাশাপাশি বসিয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়!
একটা রদবদল ও স্থান্তান্তরের ঘূর্ণিতে বিচরণ করতে থাকা এসব অ্যাভাটারকে দেখে বোঝা কঠিন, ইতিহাস ও সময়রেখার কোন বিন্দুতে আমরা বিরাজ করছি আসলে! পুরাতন ইতিহাস নতুন করে লিখছে কেউ নতুন সময়রেখায় দাঁড়িয়ে। এর বিপরীতে নতুন ইতিহাস হ্যাস্যকর তামাশায় নিজেকে গুম করছে পুরাতনে! যুদ্ধ, দখল, যৌনতার ঘূর্ণিগুলো পরস্পরের ভিতর গলেমিশে গতিসর্বস্ব দৌড়ের ওপর আছে। তারা কোথায় চলেছে বা যেতে চাইছে সে একমাত্র জানে খোদাতালা। হ্যারল্ডের কিছু কাজ এরকম ফিল দিয়ে যায় মুহূর্তে। তথাাপি, সব ছাপিয়ে ভিতরে কোথাও একটা বিষাদবিন্দু কি নেই? গন্তব্য বুঝে নেওয়ার যোগীভাব কি অনুপস্থিত সেখানে? হ্যারল্ড সত্যি কথা বলতে, আধ্যাত্ম-বিমোচনে গভীরভাবে রোমাঞ্চিত ও বিচলিত শিল্পী।
An artist deeply thrilled and disturbed by spiritual catharsis.
শ্রদ্ধেয় রনবী তা ধরতে পারলেন না! এই লোকের অঙ্কনরীতির মধ্যে পরাবাস্তবটা দেখলেন কেবল! হ্যারল্ডের ছবির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মানায় নব্বই দশকের আমেরিকায় অল্টারনেটিভ ও প্রগ্রেসিভ রক গানে আবির্ভূত টুল ব্যান্ডের স্পিরিচুয়াল ক্যাথারসিসে ভরাট গান ও গ্রাফিক আর্ট। তাদের মতো নয় তাঁর কাজ। সেরকম হতেও চাইছে না তারা, কিন্তু জান্তব ও রাহসিক সমাধিতে ছবির সাবজেক্ট মুখর। পরকাল ও ইহকালের সাংঘর্ষিক ঘূর্ণি চলছে প্রতিটা ছবির পরিসরে। এটা আবার অন্যভাবে টুল ব্যান্ডকে মনে করিয়ে যায়।
হ্যারল্ড রশীদ মানুষটা গোড়া থেকে দুই জগতের বাসিন্দা তলে-তলে। তাঁর দেহ এখানে, ওখানে বা সেখানে বিচরণ করে, কিন্তু দেহখাঁচায় ধুকপুক প্রাণপাখি মাটির নিচে ও উপরের আসমান ছাড়িয়ে ব্রহ্মাণ্ডে সরব। যেখানে থাকুক প্রাণপাখি,—কোনো কেন্দ্র তার অজানা বা তার কাছে ওটা রহসময় আবরণে আচ্ছাদিত! যেন সে ছিটকে বেরুনো উল্কা। ঠিক কোথায় পড়বে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রতিটা, হ্যাঁ, প্রতিটা ছবি ফ্যান্টাসি ও পরাবাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করে একটা লোকের ইনার পেইন তুলে ধরছে সাবলীল। পেইনগুলো তার জীবনজার্নির ভগ্নাংশ থেকে নেওয়া রিয়েলিটির অংশ হতেও পারে। তারা নয় কল্পবাস্তবতা বা হ্যানত্যান। আর, এখানে হ্যারল্ডের ক্যাপশনুগলো স্বয়ং ছবিকে ডিফাইন করে যায় নিখুঁত তাল-লয় ও ছন্দে।
. . .

হ্যারল্ড রশীদের মধ্যে নিজের বনেদি পরিবারের অবক্ষয়ী হতে দেখার যন্ত্রণাটা হয়তো-বা নিত্যসঙ্গী এখনো। সঙ্গে থাকছে রিলিজিয়ন স্টাডির খ্যাপাটে নেশা। ধর্মীয় মিথরঞ্জিত অতিলৌকিকতায় নিগূঢ় টান। আছে দেশবিদেশ করতে থাকার মধ্যে বদলে যেতে দেখা সময়রেখায় নিজেকে অনিকেত ভাবার মুহূর্তিক অস্থিরতাও।
লোকটার কোনো সেন্টার পয়েন্ট নেই বা সেন্টার পয়েন্ট ধরতে চাইলেও, সেটা তার নাগালের বাইরে ঘুরে বেড়ায়। অনেকটা তাঁর জন্মের মতো। হ্যারল্ডকে জন্ম দিতে গিয়ে তাঁর মা মরণাপন্ন হয়েছিলেন। এক পীর বাবা নিদান হাঁকেন,—একমাত্র পুত্র সন্তানটি জন্ম নেবে, তবে মাকে খেয়ে দিতে পারে। তাই ঘটতে চলেছিল অনেকটা। হ্যারল্ড বের হলেন মায়ের পেট কেটে। এবং এটা ওইসময় ঘটছে, যবে সিজারিয়ানটা এই শহরে কমন ঘটনা ছিল না। সম্ভবত প্রথম ঘটছিল শহরে। বই পড়ে-পড়ে চলছিল শল্যচিকিৎসা। আর, স্ত্রী মরণাপন্ন শুনে আমীনূর রশীদ বন্দুক হাতে বেরিয়ে পড়েছিলেন ডাক্তার ও নার্সকে সাবাড় করতে। এর সবটাই হ্যারল্ড গল্পচ্ছলে বলেছেন নানাসময়। জিন সিরিজের ছবিগুলো এখানে এসে সামথিং ফিশি ও ডিস্টার্বিং কাহিনির আভাস রেখে যায়। হ্যারল্ড যেন কিছু একটা বলতে গিয়ে গোপন করে যাচ্ছেন। নিজেকে নিয়ে ভুগছেন ব্যর্থ জটিল যাতনায়!
ছবিগুলো ওরকম সব মোমেন্টকে ধরছে পেন্সিলে আঁকা কিংবা পরে রং চাপানো ফিগারগুলোর মধ্যে। জিন সিরিজের ছবিগুলো যদি খেয়াল করি, একটা গল্প সেখানে আছে যুতসই ক্যাপশন সহকারে। মানছি,—সেটা হ্যারল্ডের নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া গল্প নাও হতে পারে। হতে পারে তাঁর পরিবার অথবা ভিন্ন কারো। এটা ম্যাটার করছে না;—কেননা ছবির ভিতর থেকে এমন এক ইনার ফোর্স ঠেলে বেরুচ্ছে, যা পরাবাস্তব নয় মূলত। নয় ফ্যান্টাসিতে নিমজ্জিত। ছবিগুলো বরং ওইসব মানুষের কথা বলছে, যারা নিজের ভিতরে সক্রিয় শক্তির সঙ্গে ডুয়ালে লিপ্ত। ডিস্টার্বিং। টুল ব্যান্ডের গানের কলির মতো ডিস্টার্বিং : অল দিস পেইন ইজ অ্যান ইল্যুশনকে তা মনে করায়।
বাকি ছবি (কয়েকটি বাদে) ওরকম সব গল্প পরিষ্কার বলছে। রনবীর ‘পরাবাস্তব কিংবা ফ্যান্টাসি’…! মাই ফুট! এসব গালভরা বুলিকে প্রত্যাখ্যান করে ছবিরা কথা বলছে স্যার। সাম ফ্রেন্ডস অব মাইন ছবিটির কথাই ধরা যাক,—একটা ভয়ংকর স্পিরিট দর্শক টের পায় ছবিটার দিকে তাকালে। গাঢ় পেন্সিলে আঁকা মুখগুলো দেখে মনে হবে ভিতরের শক্তি নিংড়ে দিচ্ছে তারা। বাস্তবের দুনিয়ায় এই মুখগুলো করে খাওয়া মানুষ ছাড়া কিছু নয়। সকলে কিছু-না-কিছু ফেরি করছে বাজারে। গানবাজনা অথবা অন্যকিছু ফেরি করার চক্করে লেগে আছে দিনমান। ছবিতে ওই ইনার রিয়েলিটি এবার বেরিয়ে আসছে, যেখানে তারা শক্ত হয়েও ভঙ্গুর ও অনিশ্চিতভাবে বক্র। এই বক্রতা ছবিতে নিজের অনেস্টিকে ডেলিভার করছে।
ড্রইংয়ের শক্তি এভাবে হ্যারল্ডের প্রতিটি ছবিতে খোলা চোখে দৃশ্যমান। এবং এর অনেকখানি একটা মিশ্রণের মতো,—সেই ষাট-সত্তর-আশির দশকে হ্যারল্ডের সিলেট টু বিদেশে যাওয়া-আসায় সঞ্চিত অ্যানার্জি ও অ্যানার্কিকে বর্তমানের সঙ্গে কী করে জানি মিলিয়ে দিচ্ছে তারা! অঙ্কনরীতিটা এখানে এসে বাকিদের থেকে পৃথক করেছে নিজেকে। হ্যারল্ডের শক্তি কেবল রেখার টানে নয়, গ্রাফিক আর্টে যে-ইনার কম্পোজিশন ও হারমোনিটা থাকে, একটা ফোর্স হয়ে তারা বেরিয়ে আসছে, আর এটাই খিুঁচনি ধরায় দেহে।
মানবজীবনের শুরু ও পরিণামের একটা উলম্ব ও সমতল উঠানামার এই তরঙ্গ মানুষকে চোখের আরাম দিতে আঁকছেন না হ্যারল্ড। আর্ট যদি চোখের আরামের জন্য হয়, তাহলে তা টেকনো। এআই দিয়েও আঁকানো যায় চট করে। আর্ট যখন হয় একটা লোকের ওই দস্তয়েভস্কির মতো মানবচরিত্রের ভিতরে ডুব দেওয়া ও নিজেকে তালাশ করে ফেরার মুসাফিরি, তা হয়ে ওঠে অসহ্য স্পিরিচুয়াল।
. . .

যাকগে, হ্যাটস অফ মি. হ্যারল্ড রশীদ। হ্যাটস অফ আপাদমস্তক সিলটি থাকার ব্যামো ও অযুত পরিসরে বিচরণের মধ্য দিয়ে ভিতরের স্পার্ক বের করে আনা আর্টপিসগুলোর জন্য। এর সবটাই আপনাকে চিনিয়ে দিচ্ছে। আমরাও কীভাবে জানি চিনে উঠছি নিজেকে ছবিগুলো দেখার ঘোরে। যে-আমরা নিজের মেমোরি চালান করছি কম্পিউটারে। আমাদের যেন আর মানুষ থাকতে নেই। আমরা ‘না-মানুষ’ হচ্ছি;—এই ম্যাসেজটা তিনি রাখবেন জানা কথা। জীবন তার পরিণাম খুঁজছে বিপ্রতীক সব কোণে সেধিয়ে গিয়ে। হ্যারল্ড সেখানে ছিলেন ও আছেন বেমানান। তাঁর মধ্যে নিজের ইনার পেইনকে নির্গলিত করছেন টুল ব্যান্ডের গানে গুঞ্জরিত কলির মতো :
সব ব্যথা হলো ভ্রম, যদি ভাবো তুমি আছো এমন এক গোলমেলে ঘূর্ণির জগতে, যেখানে চায়ের কাপকে মনে হবে ঝড় তুলছে পতনের। এই পতন সুফি ফানার মতো তোমাকে সমাধিস্থ করছে অজানায়। কথা বলো অজানার সঙ্গে। অজানাই আখিরাত।
সিলেটের মতো গলাপচা এক শহরে বসে জনাব হ্যারল্ড রশীদের একজিবিশনকে পড়বার মতো লোক কি আছেন অবশিষ্ট? যেখানে, ইংরেজ ও পাকআমল মিলিয়ে গড়ে ওঠা এলিট পরিবারগুলোর ভগ্নাংশ আর পাওয়া যাবে না খোঁজে। দেশবিদেশে তারা ছিতরে পড়েছেন অনেকদিন হলো। লন্ডন-আমেরিকা যাওয়ার মচ্ছবে অঞ্চলটির মধ্যবিত্ত সমাজে জেল্লা দেখা গেলেও, সংস্কৃতির মান নিম্নগামী। সেইসব হিন্দু পরিবারগুলোও নেই, যারা একটা সময় এই শহরে সংস্কৃতিচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। বড়ো অংশ দেশান্তরী হয়েছেন সাতচল্লিশ থেকে বিরানব্বইয়ের মধ্যে।
এই পরিবেশে বসে হ্যারল্ডের প্রদশর্নী দেশের শহরগুলো অথবা রাজধানী শহরের পরিবর্তে বিদেশে হলে বরং মোক্ষম ফল বয়ে আনত। হি ডিজার্ভ ইট। দেশে তাঁর আঁকা ছবিগুলো থেকে বের হওয়া গুঞ্জন, এর আধ্যাত্মিক জখম ও নিরাময়ের তালাশ অনুভব করা সম্ভব নয়। বোঝার সময় কারো নেই এখানে! হ্যারল্ড রশীদ যতই উঠবস করুন দেশের নামকরা লোকজনের সঙ্গে, তাঁকে নিবিড় করে জানার খিদেটা উনাদের মধ্যে মৃত!
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


