
বছরে একটা করে পরপর সাতটা বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় নবিতুন। আর না, অনেক হয়েছে। এ-বাচ্চাটাকে এবার বাঘের দুধ খাওয়াতে হবে। খাঁটি ও টাটকা। আগের অপজন্মাগুলো শরীরটাকে শুষে ছোবড়া বানিয়েছে শুধুশুধু। এটাকে আর নিজের ঐ অক্ষম স্তনজোড়া স্পর্শ করতে দেয়া যাবে না। মায়ের দুধ খেয়ে ওগুলো হয়েছে সব উচ্চিংড়ে। খামোকাই আলোর বৃত্তে ঝাঁপিয়ে মরে। আগুন জ্বালাতে পারে না। এমন একটা সন্তান চাই ওর, যে পারবে একটা আগুন জ্বালাতে, জীবনে আলো ফোটাতে, অন্ধ বিশ্বাসের কানা গলি ছেড়ে উজ্জ্বল আলোয় বেরিয়ে আসতে।
বাচ্চাটাকে ভালো করে কাঁথা মুড়িয়ে, বিছানায় শুইয়ে ছোট্ট একটু চুমো রাখে ওর কোমল ঠোঁটে। ঘরের দরোজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসে নদীতে গোসল সেরে নিতে। বর্ষার মাতাল বৃষ্টি তোলপাড় তুলেছে এখন ফুলেফেঁপে ওঠা নদীতে। ঠাণ্ডা পানিতে অনেকক্ষণ শরীর ডুবিয়ে ভালোভাবে শরীর ধুয়ে তীরে উঠে আসে নবিতুন।
সুনসান নীরব গ্রামের আকাশে সন্ধ্যার অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে। নির্জন জায়গা দেখে নগ্ন হয়ে শরীরের সব কাপড়ের পানি নিংড়ে ওগুলোই আবার গায়ে জড়ায় নবিতুন। অন্তর্বাসের ভেজা সুতোগুলো শরীরে শীতল চিমটি কাটতে থাকে। শাড়িটা ভালো করে ঝেড়ে আবার গায়ে জড়ায়। আচমকা কয়েকটা হাঁচি একসঙ্গে এসে যাওয়ায় ঝোপের ছোট ছোট গাছের ঘরের দরিদ্র টুনটুনিগুলো কাঁচা ঘুম ভেঙে উড়ে পালায়। দুএকটা বেজি ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়।
কিছুক্ষণ হেঁটে চেয়ারম্যান বাড়ির গোশালায় পৌঁছে একটা টিনের মগ খুঁজে বের করে নবিতুন। সব চেয়ে শান্ত ও বেশি দুধ দেয়া গাইটার দুধ দুইতে থাকে চুপচাপ। বড় আকারের মগটায় অর্ধেকের বেশি দুধ জমে। বিকেলে বেঁধেছে বাছুরটা। কতই বা আর দুধ জমবে সামান্য ঐ সময়ে। যথেষ্ট হয়েছে ভেবে উঠে দাঁড়াতে যায় নবিতুন। মাথাটা ঘুরে ওঠে হঠাৎ। একটু আগেও বুঝতে পারেনি-যে কতটা দুর্বল হয়েছে সে। বাঁশের খুঁটিটা ধরে উঠে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করে কিছু সময়। গোয়ালের উপর মেটে আলুর মাচা, কাঁঠালের বিচির মটকা, ওগুলো থেকে কিছু কিছু নিয়ে আঁচলে বেঁধে বাড়ির ভিতর ঢোকে।
চেয়ারম্যান-গিন্নি ওকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ে! জিজ্ঞেস করে, ‘কী রে নবিতুন, এই অবেলায়!’
‘আমার পোলা অইছে নানী, দুধ নিলাম।’
‘কইত থাইক্যা?’
‘বুড়ি গাইডা দোয়াইলাম।’
‘কস কী! না কইয়া নিলি, চুরি অইল না?’
‘না গো নানী।’
‘তাইলে, কী কয় এইডারে?’
একটু চুপ করে থাকে নবিতুন। তারপর বলে, ‘নানী, আমনের আব্বায় আমার আব্বার দেড়কুণ সম্পত্তি বেদখল দিছিল, কইছিল?’
এরকম একটা বেমাক্কা জবাবে কথা হারিয়ে ফেলে চেয়ারম্যান-গিন্নি। নবিতুনের চোখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। বিষয়টা হয়তো বুঝতে পারে নবিতুন। ফিরে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘যাই গো নানী। কয়ডা আলু আর কাডলের বিচিও নিলাম।’
পাগলিটার কি সত্যিই মাথা খারাপ হয়েছে! ওর চলে যাওয়া দেখে আর ভাবে চেয়ারম্যান-গিন্নি। বৃষ্টির কোনো নিশানাও নেই এখন অগোছালো গ্রামীণ প্রকৃতিতে। এক আশ্চর্য নির্মলতা চারদিকে। রাত-পাখিরা বেরিয়েছে আকাশে, জোনাকির দল বসিয়েছে আলোর মেলা, বাদুড়েরা বেরিয়েছে খাবারের সন্ধানে, আর পেঁচারা ব্যস্ত ভৌতিক সব আয়োজনে। কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য নেই যেন।
ছেলে ও নিজের খাবার নিয়ে ঘরে এসে দেখে বাচ্চাটা ঠাণ্ডায় প্রায় জমে গেছে, কান্নাও নেই। বুকে কান পেতে শব্দ শোনে, মরে গেল নাকি! তাড়াতাড়ি আগুন জ্বেলে পানি গরম করে নবিতুন। গামলায় ঐ পানি ঢেলে বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেয় ওখানে। উষ্ণতা পেয়ে ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করে বাচ্চাটা। তারপর তড়পাতে থাকে মাছের মতো। মায়ের চোখ থেকে যেন আশীর্বাদের একটা আলো ছড়িয়ে পড়ে ওর উপর। দুধটুকু গরম করে খাওয়ায় ওকে। নিজেও খেয়ে নেয় আলু ও কাঁঠালের বিচি পুড়িয়ে।
শিশুটার জীবনের প্রথম রাত কাটে চমৎকারভাবে। পরদিন খুব ভোরে নবিতুন যেয়ে আবার পৌঁছায় চেয়ারম্যান বাড়ির আঙিনায়। সবে হাত মুখ ধুয়েছে চেয়ারম্যান-গিন্নি। নবিতুন এসে দাঁড়ায় সামনে।
‘নানী, কাইল কইতে পারি নাই, রাইতে ভাইবা দেখলাম, আপনেরে কই। আমার পোলার লাইগা রোজ আধজের দুধ বেবোস্তা কইরা দিবেন।’
‘কী কইলি! ভাইবা দেখলি?’
‘হ নানী, পোলাডার দরকার। এইডাই আমার শেষ, নানী। আর অইব না। হাসপাতালে যাইয়া কাইট্যা ফালামু।’
‘কেন্ কাইট্যা ফালাইবি? আর দরকার নাই?’
‘না গো নানী। অনেক পড়ে বুঝছি-যে আর দরকার নাই।’
‘কেমনে বুঝলি?’
‘আপনেগো বাড়ির বউঝিরে দেইখা। আমাগো সবতের ঘরে আটটা দশটা পোলামাইয়া। আর আপনেগো বউঝিগোর একদুইডার বেশি নাই। একশোডা খাওয়ানোর খেমতা আছে আপনেগো। আর আমাগোর একটারেও হেই আপনেগো গোলাম বানাইতে অয়। আমার বড়ো-বাপ আছিল আপনেগো বাড়ির গোলাম, আমার দাদায় আছিল, বাপে আছিল, আমিও আছি। তয় এই পোলাডারে আর গোলাম বানামু না, নানী।’
‘তোর মাতার ঠিক আছে নবিতুন? খারা, খারা, তোর নানারে ডাকি।’
চেয়ারম্যান এসেই স্বভাবগত ক্রুদ্ধতায় চাপা দিতে চায় সবকিছু। কিন্তু নবিতুনের দৃঢ়তা পরাস্ত করে ওকে। খুব অবাক-করা, অভূতপূর্ব এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে ওদের ভেতর! ঐদিন থেকেই, যা হোক, আধ-সের করে দুধ যেতে থাকে নবিতুনের ছেলেটার জন্য।

শরতের মেঘের মতো গড়িয়ে যায় ওদের হালকা দিনগুলো। বাঘের দুধ খেয়ে বেড়ে উঠতে থাকে বাচ্চাটা। কোনো কোনো রাতে ঘুমের ঘোরে শিশুটা নবিতুনের শরীর চাটে, কাপড় চাটে। সুড়সুড়ি লাগে ওর, কখনো দুর্বল হয় নবিতুন, আবার সামলে নেয়। কোনো অবস্থায় বুকের দুধ দেয় না ওকে। প্রাকৃতিক নিয়মে জমে উঠলে নিংড়ে ফেলে দিত শুরুতে। কিছুদিন পর থেকে বাড়ির পোষা কুকুরটাকে, বেড়ালটাকে বাটিতে জমিয়ে খাওয়ায়। চুকচুক শব্দে ওদের খাওয়া দেখে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায় নবিতুন। দুধ খাওয়ার পর জিভ চেটে বেড়ালটা ডাকে মিঁউ। আর কুকুরটা শুধু ঘেউ ঘেউই করে।
এমনকি ওর ছেলেটাও একবারের জন্য হলেও বাঘের ডাক দেয় না। মায়ের আঁচল টেনে নাকি সুরে শুধু ম্যাঁ-ম্যাঁ করে।
একটু বড়ো হয়ে গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিশতে শুরু করে সে। চেয়ারম্যান-বাড়ি ও গ্রামের আর সব বড়ো বাড়ির ছেলেদের নাম মসজিদের হুজুরেরা রাখে আকিকা করে, ঝালঝোলে মাংস খেয়ে, আর এমনসব প্রার্থনা করে যেসবের অর্থ ওরা নিজেও জানে না। গ্রামের শ্রমজীবি নিরানব্বুই ভাগ মানুষের ছেলেমেয়েদের মতো নবিতুনের ছেলের জন্যও ওরকম কোনো অনুষ্ঠান ও খাওয়া-দাওয়ার প্রশ্ন আসে না। নবিতুনের ছেলের আবার নাম কী! নবিতুনের পোলা। মুখে যা আসে তাই ডাকে নবিতুন। ছেলেটাও জবাব দেয়। ওর নাম-যে কেউ খুব জিজ্ঞেস করে, তাও না। যদি-বা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে, তাহলে ওর বাপের নাম!
নবিতুনও পাল্টা জিজ্ঞেস করে, ‘হাছনের বাপের নাম কী? গোপালের বাপের নাম কী?’
‘আরে পাগলি, ওরা তো রাজা।’
‘তাইলে আমার পোলায়ও রাজা।’
ছেলেটার নাম অবশেষে রাজাই হয়ে যায়। ‘শুধু’ রাজা। এভাবে ছেলেটার বয়স প্রায় পাঁচ হলে প্রকৃতির প্রতিশোধ দেখা দেয় নবিতুনের শরীরে। মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষুদ্রাকায় থলেগুলোয় জমে ওঠা দুধের নিঃসরণ নিয়মিত না হওয়ায় কর্কট শিশুরা গুটি গুটি দাঁত বসায় ওখানে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরে। রাজার বয়স ছয় বছর পেরোনোর আগেই ক্রুদ্ধ বালক কোমরের কাইতন ছিঁড়ে ফেলে ওর মাকে হারানোর প্রতিবাদে। অবাক হওয়ার মতো নিশ্চয়-যে, একটুও কান্নার আয়োজন ছিল না ছেলেটার চোখেমুখে। প্রতিবাদ কিংবা কোনো আক্রোশ ছিল না কারো প্রতি, কাইতন ছিঁড়ে ফেলার ঐ ঘটনাটা ছাড়া।
জীবনের শুরুতেই একটা নিঃসঙ্গাবস্থার ভেতর এসে পড়ে রাজা। রাজ্য, পারিষদ, প্রজাকুল প্রভৃতি থাকলেও প্রকৃত অর্থে পৃথিবীর সব রাজারাও এমনই নিঃসঙ্গ ছিলেন। জল-কাদা-মাটির কোমল এই দেশে অবশ্য ঐ অর্থে রাজাদের উদ্ভব বা বিচরণ অনেকটা অসম্ভব। এজন্য চাই রুক্ষ্ম উষর নির্মম প্রান্তর ও রক্তলিপ্সু মানুষজন। রাজার সহোদর ভাই-বোনরাও-যে কে কোথায় ছিটকে পড়েছে গোলামির বাঁধা জালে, সেসবের হদিস নেই। নানীর আশ্রয়ে কিছুদিন কাটে রাজার। মাঝেমাঝে অবশ্য রাজাদের মতোই আনমনা হয়ে পড়ে সে। কিন্তু কোনো দেবদূত আসে না ওর কাছে। বরং মায়ের মলিন মুখটা প্রায়ই তাড়া করে বেড়ায় ওকে। ওর শেষ কথা কটা খুব করে মনে গেঁথে রয়েছে রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা হিমোগ্লোবিনের মতো :
উরুত শুয়াইয়া বাঘের দুধ খাওয়াইছি তোরে বাপ, বুকে ধরি নাই। কারো বুকে মুখ রাখিস না। বাঘের থাবা বয়াইবি, উরুর মইদ্দে . . .’
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা সত্যিই দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে। আট বছর বয়সে ল্যাং মেরে থানার দারোগা সাহেবের বড়ো ছেলের পা ভেঙে পলাতক হয় গ্রাম ছেড়ে। অনেকদিন পর আবার গ্রামে ফিরে এসে নানীর ঘর না পেয়ে এখানে-সেখানে কাটায় কিছুদিন। তারপর আবার বাউণ্ডুলে!

জন্মের পর থেকে কখনো উপোস করতে হয়নি রাজার। নিজে না খেয়ে হলেও মা ওর মুখে গ্রাস তুলে দিয়েছে। একটু বড়ো হওয়ার পর কোথাও-না-কোথাও কাজ করে খাবারটুকু অন্তত সংগ্রহ করেছে সে, এবং সেটা পর্যাপ্ত পরিমাণে। এভাবে, চোখে পড়ার মতো দশাসই শরীর বানিয়েছে একটা। শক্তি ধরে মোষের সমান। লম্বায় এক মানুষ সমান উঁচু হয়ে উঠলে উঠতি এক নেতার পছন্দের তালিকায় উঠে যায় সে। ঐ নেতা ওকে বিশ্বস্ত ক্যাডারে পরিণত করে। পরিমাণে প্রচুর এবং ভালো ভালো সব খাবার, নরম গদির বিছানা, সুগন্ধ সাবানে স্নান, নিয়মিত দ্রব্য-ভোজন, এসবে এক বন্য নেকড়ের স্বভাব রপ্ত করে ফেলে সে খুব সহজে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোগের চাহিদা বাড়তে থাকলে আবার প্রাকৃতিক নিয়মেই একসময় এসবের অবসান ঘটে।
চোরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আরেক চোরের। এদের একজন ভালো হলে অন্যজনকে নিঃশেষ করে দেয়ার কথা। দুই চোরের লড়াইয়ে এবার ওর প্রভুপিতা হেরে গেলে সেও পড়ে যায় বিপাকে। গা-ঢাকা দিতে হয় ওকে। আবার একা হয়ে পড়ে সে। আর এই নিঃসঙ্গ সময়ে ওর মায়ের স্মৃতি আপাত সুখের ঐ দিনগুলোকে আবার সামনে নিয়ে আসে। ওর শেষ কথাগুলো মনে করে। বিভ্রান্ত দিন কাটায় কিছুকাল। তারপর বেরিয়ে পড়ে আবার এক উষ্ণ উরুর সন্ধানে। কিন্তু সেজন্য তো চাই এখন বাঘের খাঁটি দুধ! কারণ এই অবাক পৃথিবীতে সে এখন খুব একা। এবং সময় এত প্রতিকূল-যে কিছুই কুলিয়ে উঠতে পারে না। প্রভুপিতার বিপক্ষ দল থেকে গোপন সূত্রে অনেক প্রলোভন, নয়তো হুমকি আসতে থাকে অবিরত। ঐ ফাঁদে আর পা দিতে চায় না রাজা বাহাদুর।
অবশেষে কোনো এক ঝড়ের রাতে চুপচাপ বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে। বাঘের খাঁটি দুধের সন্ধানে অনন্তর প্রবেশ করে একেবারে অজানা ও অচেনা এক গভীর অরণ্যে। এখনও ওর জানা হয়নি অরণ্যের ঐ দেশটার নাম!
. . .
লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

কামাল রাহমান : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
কামাল রাহমান-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



