নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : ৪৩২ ও ৪৪০ হার্টজের গোলযোগ ও ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’

Reading time 7 minute
5
(5)
@thirdlanespace.com

. . .

দীর্ঘ লেখা ক’জনই-বা পড়ে এখন! সেই কবে লিটলম্যাগে মিনহাজ ভাইয়ের দীর্ঘ-দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ পেতো। পড়তাম মনোযোগ দিয়ে, যদিও হাজারো চেষ্টার পর অনেককিছু বুঝতাম না;—এখনো যেমন অনেক কিছু বোঝা বাকি থেকে যায় বলে মনে হয়। উদয় রহমানের ‘সুর’ নিয়ে বুক-কাঁপানো একটা লেখা এখানে শেয়ার করলাম। জানি, দীর্ঘ লেখা যেমন অনেকে এখন আর পড়েন না আমার মতো, তেমনি অনেকের বুক কেঁপেও উঠবে না এই লেখা পড়ে…
. . .

উদয় রহমানের ‘সুর’ লেখাটির বাঁধুনি চমৎকার। পড়ে ভালো লাগল বেলাল ভাই। উনি সুরের মানুষ। সুরকার ও শব্দ প্রকৌশলীর অভিজ্ঞতা থেকে ছেকে নেওয়া কাহিনি তাঁর প্রাঞ্জল বিবরণগুণে পাঠককে দখলে রাখে। তারচেয়ে বড়ো কথা, এরকম কোনো লেখা আমাদের এখানে বিরল। সংগীত নিয়ে বিচিত্র রচনার অভাব নেই, তবে ৪৩২ হার্টজ থেকে ৪৪০ হার্টজের সুরতরঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তন ও এর পরিণাম নিয়ে বাংলা ভাষায় এর আগে কেউ সবিস্তারে লিখেছেন বলে মনে পড়ছে না! লেখাটি এখানে এসে বিরল গোত্রে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। উদয় রহমানের ভাষাবয়ান মিউজিক থিয়োরির বিতর্কিত প্রসঙ্গটির ওপর আলো ফেলার ছলে একটা পক্ষ বা অবস্থান নিলেও, গল্পের রসদ দিয়ে বোনা লেখাটি পাঠমুগ্ধ করবে যে-কাউকে।

যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে আসি। শ্রোতার জন্য কোনটা অধিক প্রীতিকর? যে-কোনো বাদ্যযন্ত্র ৪৩২ হার্টজে বেঁধে কিছু একটা বাজানো? নাকি ৮ হার্টজ বাড়িয়ে ৪৪০ করাটা তার কাছে বেশি প্রীতিকর শোনায় কানে? এ-নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরোনো। অনলাইনে হাজারো রেফারেন্স একটু খোঁজ করলে পাবেন যে-কেউ। ৪৩২ হার্টজে বাজানো শব্দকম্পনের সঙ্গে ৪৪০-এ বাজানো শব্দকম্পনের তফাত টের পাইয়ে দিতে নমুনা ছড়ানো-ছিটানো আছে অনেক। ইচ্ছে করলে সেগুলো কান দিয়ে শুনতে ও দেখতে পারেন নয়নে।

ইনফ্যাক্ট, বাদ্যযন্ত্রে নতুন ‘সুর’ পয়দার পরীক্ষা-নিরীক্ষা যাঁদের কাছে নেশার মতো, ৪৩২ বা ৪৪০-এ তাঁরা সবসময় স্থির থাকেন তাও নয়। বাঁধা হার্টজের বাইরে ওঠানামা করার নজির বিরল নয়। যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে ৪৩২ ও ৪৪০ হার্টজ নিয়ে মিউজিক থিয়োরিস্টদের মধ্যে এতো ক্যাচাল কেন? কেনই-বা দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে তর্ক জড়ান হরদম?

এসব প্রশ্নের সোজা কোনো উত্তর আসলে নেই। ৪৩২ হার্টজে বাজতে থাকা বাদ্যযন্ত্র যে- সাউন্ড পয়দা করে, তা শুনতে মধুর। উদয় রহমান যেমন তাঁর বয়ানে ঠিকই ধরেছেন,—৪৩২ হার্টজে বাঁধা বাদ্যযন্ত্র থেকে বেরুনো ‘সুর’ শুনে মনে হবে এর তরঙ্গটা সোজা হার্টচেম্বারে বা হৃদয়ে ঢেউ তুলছে। কান সেখানে শব্দবাহক মাত্র! আসল ধাক্কাটা যেন-বা মস্তিষ্কে পৌঁছার আগে হৃদয়ের দরজায় করাঘাত করছে, আর তাতেই হৃদয়টা খুলে যাচ্ছে নিমিষে! এ-কারণে ৪৩২ হার্টজে বাঁধা রিডকে ন্যাচারাল বা প্রকৃতিতে যেসব বিচিত্র শব্দ ও সুর গুঞ্জরিত হয় প্রতিনিয়ত, এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবার পক্ষে প্রচুর মত ও যুক্তি রয়েছে। ন্যাচারাল হারমোনির কারণে ৪৩২ হার্টজকে দেহমনের জন্য অতি উত্তম বলেও বিবেচনা করেন অনেকে। মিউজিক থেরাপির সাহায্যে কারো মন শান্ত করতে ৪৩২ হার্টজের ব্যবহার আছে বটে!

অন্যদিকে, ৪৪০ হার্টজে সাধা বাদ্যযন্ত্র বাজালে এর শব্দ ও সুরকম্পন মনে হবে স্নায়ুকে বিচলিত ও আলোড়িত করছে অধিক! ওপেন এয়ার কন্সার্টে ৪৪০ হার্টজে বাদ্যযন্ত্র বাঁধাটা হয়তো এ-কারণে রেওয়াজে মোড় নিয়েছে। সমবেত শ্রোতা-দর্শককে স্নায়বিক বিচলন ও উত্তেজনার বিপজ্জনক খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে শব্দ প্রকৌশলীরা ওটা ব্যবহার করেন ব্যাপক। গানে ‘সুর’ বসানোর সময় বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাসে ৪৩২ হার্টজ এখন আর নাম্বার ওয়ান চয়েজ নয়। ঘুরেফিরে ৪৪০ হার্টজ নিয়ন্ত্রক সেখানে।

তো, এই জায়গা থেকে উদয় রহমান তাঁর লেখায় ৪৩২-এর পক্ষে ওকালতিটা করেছেন মূলত। ৪৩২ থেকে ৪৪০-এ বাদ্যযন্ত্রকে বেঁধে ফেলার সর্বনাশ তুলে ধরতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা কন্সপিরেসি থিয়োরিও লেখায় ব্যবহার করেছেন। ব্যবহার করে অন্যায় করে ফেলেছেন তা নয়। তবে, লেখার সুরটা তাতে করে একরৈখিক হয়ে পড়েছে। পাঠকের আবেগকে ভুল ধারণা পেতে এটা ভূমিকা রাখতেও পারে। মিউজিকি থিয়োরিতে মহা বিতর্কিত প্রসঙ্গটির ওপর একরৈখিক আরোপণ মনে হয় ঠিক হলো না। ভ্রান্ত আরোপণটা কেন ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা যথাসম্ভব সংক্ষেপে বলার চেষ্টা থাকবে। আশা করি আপনি খেয়াল করবেন ও বিবেচনায় নেবেন কথাগুলো :

Antique Tuning Fork; Image Source & Credit: ask.video artcile on music theory

দেখেন ভাই, ৪৩২ হার্টজকে প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল সুরকম্পন দাবি করার ঘটনাটি সমাজমাধ্যমের কারণে হাইপ তৈরি করেছে নানাসময়। প্রকৃতিতে এই-যে বিচিত্র শব্দ ও ‘সুর’ গুঞ্জরিত হয়, সেগুলো ৪৩২-এ বাঁধা বলে মতটাকে এভাবে লোকের নজরে আনা হয়েছে। এখন এর সত্যতা নিশ্চিত করবে এরকম অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অধরাই থেকে গেছে! এমনকি, ৪৪০ হার্টজে বাদ্যযন্ত্রের রিড বেঁধে ফেলার আগে যন্ত্রী ও সুরকার ভুবনজুড়ে ৪৩২ হার্টজ অনুসরণ করতেন,—বিষয়টি তর্কাতীত নয়। ৪৩২ যেমন ‘কমন’ থেকেছে বলা হচ্ছে, এর থেকে নিচে অথবা উপরে রিড বাঁধার নজির রয়েছে বলে অনেকে মতামত ও যুক্তি দিয়েছেন। সুতরাং, ৪৩২ সত্যি অঘোষিত স্ট্যান্ডার্ড ছিল কি ছিল না, এখন এটা নিয়ে সন্দেহের নিরসন ঘটেনি।

কথা সত্য, ইতালির প্রখ্যাত অপেরা সুরকার জুসেপ্পে ভের্দি (Giuseppe Verdi) ৪৩২-এর পক্ষে ওকালতি করে গেছেন। পেছনে কারণ ছিল। অপেরা শিল্পীর গলার পিচের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের হারমোনি বা সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রশ্নে এই সুরকম্পনকে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী বলে তিনি সাব্যস্ত করেছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল এমন নয়। ভের্দির নিজের কম্পোজিশন তো আছেই, এমনকি পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত সুরসাধকদের তৈরি ‘সুর’ ৪৩২-এ শ্রবণ-শিহরন ও প্রশান্তি আনে বৈকি! ৪৩২ হার্টজে সুরকম্পন তুলতে থাকা বাদ্যযন্ত্র মানবকণ্ঠের সঙ্গে পারফেক্ট হারমোনি ও মধুরিমা তৈরির ক্ষমতাও রাখে;—এরকম যিনি ভাবছেন, তার এই ‘ভাবনা’ সুতরাং অমূলক নয়।

বিপরীতে, ৪৩২ হার্টজ থেকে ৪৪০-এ উত্তরণকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ধরে নেওয়া বাড়াবাড়ি পর্যায়ের অতিরঞ্জনে পড়ছে। আবারো বলছি,—প্রকৃতিতে হামেশা তৈরি হতে থাকা ‘শব্দগুঞ্জন ও সুরধারা’ যেমন ৪৩২ হার্টজে বাঁধার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কেউ দেখাতে পারেননি,—৪৪০ হার্টজে উত্তরণের পেছনে একক ব্যক্তি বা দেশের ভূমিকাও প্রমাণ করা যায়নি। সময়-পরিবেশ ও পরিপার্শ্বের যুগান্তকারী পালাবদলের স্রোতে বিবর্তনটা ঘটেছিল ধরে নেওয়াকে বরং সুবিচারের লক্ষণ মনে করা যেতে পারে।

৪৩২ হার্টজকে আত্মিক প্রশান্তির জন্য ‘নিখুঁত’ বলে যিনি রায় দিচ্ছেন, এটা এখন তার ব্যক্তিগত অনুভূতির স্তরে হয়তো জন্ম নিচ্ছে। অন্য কেউ ৪৩২ হার্টজের পরিবর্তে ৪৪০ হার্টজে খুঁজে পেতে পারে শিহরন। তার অ্যাড্রিনালকে শব্দের ওই কম্পাঙ্ক থেকে সৃষ্ট তরঙ্গ তাড়িত করুক, এটা হয়তো সে চাইছে আকুলতায়! বিষয়টিকে এভাবেও দেখা যায় মনে করি।

যাইহোক, বাদ্যযন্ত্রকে সুরে বাঁধার সবচেয়ে অগ্রগণ্য থিয়োরিটা আমরা পাচ্ছি গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাসের বরাতে। বৈদিক ভারতবর্ষেও ‘বাদ্যযন্ত্রে সুর’ সাধা নিয়ে থিয়োরি রয়েছে। আমার জানাশোনার স্বল্পতার কারণে সেদিকে যাওয়ার সাহস করব না। পিথাগোরাসে থাকি বরং। তাঁর ‘নাম্বার থিয়োরি’ হচ্ছে সাত সপ্তকে বাদ্যযন্ত্রকে বাঁধাই করার আদি প্রেরণা। পিথাগোরাস এই ধারণায় পৌঁছেছিলেন,—প্রকৃতিতে পয়দা হতে থাকা সুরকম্পন কোনো দৈব ঘটনা নয়। এর একটা নিখুঁত গাণিতিক ছন্দ ও বিন্যাস রয়েছে, এবং মহাবিশ্ব সেই গণিতছকে বাঁধা। যেমন, কোনো বাদ্যযন্ত্রের তারকে যদি আমরা মাঝখানে আঙুলের টোকায় বাজাই, এটা উপর বা নিচ থেকে বাজালে যে-সুর বেরুবে, তার থেকে ভিন্ন। এভাবে তারের বিন্যাসকে গাণিতিক নিয়মে বেঁধে ভিন্ন-ভিন্ন সুরকম্পন তৈরি করা সহজ।

পিথাগোরাস তাঁর এই মিউজিক থিয়োরিকে পরে মহাবিশ্বে ঘূর্ণনশীল গ্রহ-নক্ষত্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এই ধারণায় পৌঁছালেন দার্শনিক প্রবর,—গ্রহ-নক্ষত্ররা মূলত নিখুঁত গণিতছকে ঘুরছে ও শব্দকম্পন পয়দা করে চলেছে। আমাদের কান তা সবসময় ধরতে পারে না। এটা আবার পরে মিস্টিক বা মরমিবাদের আলোয় মহাবিশ্বের রহস্য ও এর বন্দনায় রেখেছিল যুগান্তকারী ভূমিকা। পিথাগোরাসের এই নাম্বার থিয়োরি সুরকে মহিমান্বিত করে তখন। প্লেটো এর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন ভালোই। যে-কারণে ‘রিপাবলিক’-এ সুরসাধনাকে কম্পালসারি করলেন, আর কবিতাকে ‘যা, দূর হ’ বলে পাঠান নির্বাসনে।

এ-কথাটাও ইয়াদ রাখা ভালো, শব্দকম্পনের সুরসংগতির পরিমাপক হার্টজের বিবর্তন মূলত ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল, যেখানে পিথাগোরাস থেকে আল বেরুনি ও পরবর্তীরা স্মরণীয় অবদান রেখেছেন।

Historical Evolution of Hertz Unit; Image Source & Credit: ask.video artcile on music theory

৪৩২ হার্টজে বাদ্যযন্ত্রকে বাঁধার রেওয়াজ ১৯৪০ সনের আগে ব্যাপক ছিল না ঠিক আছে, তবে উদয় রহমান যেমন হিটলারকে টেনেছেন লেখায়, তা অতিরঞ্জিত। বিশ্বের সব বাদ্যযন্ত্রকে ৪৪০ হার্টজে বাঁধার ঘটনায় হের হিটলারের সরাসরি ভূমিকা গবেষকরা খুঁজে পাননি। গুঞ্জনটির পেছনে গল্পের রসদ দারুণভাবেই বিদ্যমান,—তবে বাস্তবতা ততটাই ফিকে সেখানে। ইনফ্যাক্ট, নাজিরা বিশ্বকে তাদের ছকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করতে মরিয়া থেকেছে ওইসময়;—কিন্তু বাদ্যযন্ত্রকে ৮ হার্টজ বাড়িয়ে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা ও বিচলন ঘটানোর নীলনকশায় তাদের ভূমিকা প্রমাণিত নয়।

উদয় রহমানের তা জানা নেই, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটাকে তিনি নিয়েছেন এটা প্রতিষ্ঠার জন্য,—৪৩২ হচ্ছে সেক্রেড বা পবিত্র। এখন এ-নিয়ে একশো মুনির একশো মত আছে ভাই। সুরের টেস্ট শ্রোতাভেদে ভিন্ন হবে। যুগভেদে তা এক থাকবে না কখনো। যে-কারণে ৪৪০ হার্টজ দিয়ে সুরকে প্রাকৃতিক সুরসংগতি বা হারমোনি থেকে ভিন্নদিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে;—মতটি আমার কাছে যথার্থ মনে হয় না। মানুষ যে-কোনো ঘটনায় ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সহজে বিশ্বাস করে। অনেকটা ওই লিওনেল মেসি ফিফাকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে বিশ্বকাপ পাওয়ার জন্য বা আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানে রিগড্,—এরকম চটকদার বিশ্বাসের মতো ‘৪৩২ বনাম ৪৪০’কে দাঁড় করিয়েছেন একদল।

৪৪০ হার্টজে বাদ্যযন্ত্রের গমন প্রকৃতপক্ষে কারিগরি ও বৈশ্বিক পালাবদলের তোড়ে ঘটেছিল বলে আমরা বুঝে নিতে পারি। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। চেনা জীবনতরঙ্গ অবিশ্বাস্য দ্রতলয়ে মানুষের চোখের সামনে পালটাতে শুরু করে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে এর প্রতিক্রিয়া ছিল যুগান্তকারী। কথার কথা, ফেদেরিকো ফেলিনির ‘আমারকর্ড’ ও ‘রোমা’ ছবি দুটো যদি দেখেন, চট করে বুঝে যাবেন, চেনা ইতালি ও তার চারপাশ কেমন করে বদলে গিয়েছিল রাতারাতি! জাপানের দুই প্রণম্য সিনেনির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়াইয়াসুজিরো ওজুর ছবিগুলো দেখলে তা আরো ভালো ধরতে পারবেন যে-কেউ।

ওজুর ছবিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী জাপানের নিস্তরঙ্গ, পারিবারিক ও প্রশান্ত জীবনছক যেন ৪৩২ হার্টজেই সাধা ছিল! একই ওজুর ছবিতে আমরা দেখছি, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর জাপানি সমাজ কী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ভাঙন ও পালাবদলের ঘূর্ণিতে খাবি খেয়েছে! ৪৪০ হার্টজের একটা সুরকম্পন যেন-বা বইছিল সেখানে! মিউজিশিয়ানরা মূলত এই পালাবদলকে বাদ্যযন্ত্রে ধরতে মরিয়া থেকেছেন। এই অনুভব-যে,—সময় এখন আর প্রশান্ত ও নিরুদ্বেগ নয়, এটা উদ্বেগকে অনিবার্য করছে। উদ্বেগ নিয়ে মার্টিন হাইডেগার যেমন বড়ো থিয়োরি রেখে গেছেন সেইসময়।

৪৩২ হার্টজের পক্ষে এখন এই উদ্বেগ ও অস্থিরতাকে ধরতে পারার কথা নয়। ওটা প্রশান্ত মহাসমুদ্রের মতো গভীর ও সুধীর। কী করা যায় তা ভাবতে বসে যন্ত্রী ও সুরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বসলেন। ৮ হার্টজ বাড়ানোর পর মনে হলো ফিলটা যেন ধরা যাচ্ছে। বিশ্বের তাবড় বাজিয়ে ও সুরকার পরে ওটা লুফে নিলেন। স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ডের পেছনে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা মূলত সেখান থেকে এসেছে পরে।

Harmonic Ratio Chart 432 Hz; Image Source & Credit: ask.video artcile on music theory

হার্টজের এই বিবর্তনের জন্য হের হিটলারকে মন চাইলে আমরা গালি দিতে পারি। আফটার অল, ওই ব্যাটার কারণে বিশ্ব মহাদুর্যোগে পতিত হয়, যার পর থেকে মানবসমাজের চেহারা-সুরত আগের মতো থাকেনি। কিন্তু, হিটলার মহাশয় সরাসরি ৪৪০ হার্টজে বাদ্যযন্ত্রকে বাঁধার কোনো অর্ডার জারি করেনি। সময়ের পালাবদলে তা অনিবার্য হচ্ছিল বিশ্বে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটা ব্যবহার করে চমৎকার গল্প বোনা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবতা হলো এর পেছনে হিটলারের সরাসরি ভূমিকা রাখার প্রয়োজন পড়েনি।

সংগীত কোনো স্থবির বিষয় নয় ভাই। আমাদের এখানে একটা সময় ধ্রুপদ-ধামারে ওস্তাদরা লম্বা রাগ-রাগিণী গলায় সেধেছেন। রাজা-বাদশা-নবাবারা ভারতীয় রাগ শুনেছেন তাকিয়ায় হেলান দিয়ে। একটা পর্যায়ে এসে ধ্রুপদ শোনার সময় ও অবসর মানুষের কমে আসে। ধ্রুপদের লেন্থটা কেটেছেটে বড়ে খেয়াল ও আরো পরে ছোট খেয়াল, এবং ঠুমরি, গজল ইত্যাদি এসেছিল। আর, এখন তো ভারতীয় রাগ-রাগিণীর সঙ্গে পাশ্চাত্য রক মিউজিকের ফিউশন দেখছি সমানে!

মানুষের গান শোনার রুচি ও স্বাদ বদলাবে। একে চাইলেও আমরা রিজিড করতে পারব না। রিজিড করা মানে সামাজিক পালাবদল ও রূপান্তরকে আমরা স্বীকার করতে রাজি নই। মিস হ্যাভিশ্যামের মতো ঘড়ির কাঁটা নির্দিষ্ট ঘরে স্থির করে ভাবছি ‘এভরিথিং ইজ ফাইন’! পরিবর্তনটাই যুগধর্ম। এবং, সব পরিবর্তনের মধ্যে ভালোমন্দ মিলেমিশে থেকেছে ও থাকবে ভবিষ্যতে। সংগীত তার বাইরে নয়। সুতরাং ৪৩২ হার্টজ মানে তোফা, আর ৪৪০ হার্টজ উপদ্রব… একম ভাবার মধ্যে আবেগ থাকতে পারে, মিথরঞ্জিত স্মৃতিকাতরতা থাকবে, কিন্তু মানব সমাজের অব্যাহত বিবর্তনকে তা কোনোভাবে সুবিচার করে না।

এরকম হতেও পারে, সামনে একটা সময় আসবে, কোনো যন্ত্রী হয়তো ৪৩২-কে ব্যবহার করবে নিজ প্রয়োজনে। এখনো-যে কেউ করছে না, তা কীভাবে বলি! আবার, কেউ হয়তো অন্য হার্টজে সাধবে শব্দ ও সুরকম্পন। এর কোনোটা হৃদয় খুলে দেবে। কোনোটা আবার কান ও মস্তিষ্ক হয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নেবে। এখানে রক্ষণশীলতা কোনো কাজের কথা নয়।
. . .

নেটালাপ অবদায়ক : আহমেদ বেলাল; আহমদ মিনহাজ; থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *