‘হুমমমম’ : নিয়ানডার্থালের গান
স্টিভেন মিথেন-এর বিবরণে ভাষা বিকাশের আদিসূত্র

মানব প্রজাতির বিবর্তনরেখায় ভাষা ও সংগীতের আন্তঃসম্পর্ক ভালোই জটিল! ভাষার জন্মরহস্যের নেপথ্যে সাংগীতিক সুরধ্বনির ভূমিকাকে প্রাগৈতিহাসিক গণ্য করা নিয়ে মতান্তর আছে বৈকি! মনোবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার যেমন মানবভাষার আদি বিকাশে সাংগীতিক সুরধ্বনির অবদানকে সোজা খারিজ করে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
মানুষের মন কীভাবে কাজ করে এই তালাশে নেমে স্টিভেন পিঙ্কার ভাষা-বিকাশে সাংগীতিক সুরধ্বনির ভূমিকাকে মুখ্য মানতে আপত্তি ঠুকে বসেন। তাঁর মতে,—সংগীত হচ্ছে মানব প্রজাতির নিজেকে পরিণত করে তুলবার পথে দেখা দেওয়া সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। সংগীত নয়, বরং ভাষাই সংগীতকে জন্ম দিয়েছিল। হাই আর্টের অনুশীলনে মানুষের সৃজনশীল বিকাশকে সংগীত সমৃদ্ধ করেছে, কিন্তু ভাষার আদি উৎস ও বিবর্তনে তার ভূমিকা কোনোভাবেই মুখ্য ছিল না!
সংগীত হচ্ছে, স্টিভেন পিঙ্কারের ভাষায় ‘পনির দিয়ে মোড়ানো কেক’। খেতে সুস্বাদু। মানুষের কর্ণকুহরে সংগীত বয়ে আনে মনোরম স্বাদ। পক্ষান্তরে চার্লস ডারউইন প্রজাতির বিবর্তন-মানচিত্রের যে-রূপরেখা আমাদের দিয়ে গেছেন, ভাষা সেখানে অস্তিত্বরক্ষার অপরিহার্য উপাদান রূপে বিকশিত হয়েছিল। সংগীতকে সুতরাং ভাষার সঙ্গে জুড়ে দেখানো অতিরঞ্জন ছাড়া কিছু নয়।
গুহাবাসী ও আরণ্যিক মানব প্রজাতি এই-যে অস্তিত্বিক লড়াইয়ে লিপ্ত থেকেছে, প্রতিকূলতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে অভিযোজন করেছে, সেখানে দৈহিক অঙ্গভঙ্গি বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ও মৌখিক ভাষার পরম্পরা মূলত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক। লিপি নির্ভর লিখিত ভাষার মধ্য দিয়ে যা পরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। বিবর্তন ও অভিযোজনের রুক্ষ ময়দানে সাংগীতিক সুরধ্বনির আবির্ভাব ও বিকাশ মানব প্রজাতির ভাষা বিকাশের প্রাগৈতিহাসিক পর্বে গমন করলে,—বিবেচনায় আসতে পারে না।
স্টিভেন পিঙ্কারের বইটি বের হওয়ার পর নানা মহলে বিতর্কের ঝড় ওঠে। বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী ড্যানিয়েল ডেনেট স্বয়ং তাঁর মতামত খণ্ডন করে বিপরীত যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখায় ছড়ানো মুনিগণ ও মিউজিক থিয়োরিস্টরা পিঙ্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান, মস্তিষ্কবিজ্ঞানের বিচিত্র শাখা-প্রশাখায় থেকে তাঁর বক্তব্যের অসারতা প্রমাণের ঢেউ তখন তীব্র হয়েছিল।
মন কীভাবে কাজ করে বইটি স্টিভেন পিঙ্কার সামনে আনেন আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। তাঁর ব্যাখ্যা খণ্ডনে উদ্গ্রীব বইপুস্তক কাছাকাছি সময়ে বেরিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ স্টিভেন মিথেনের ‘দ্য সিংগিং নিয়ানডার্থালস’ ছিল মোক্ষম মারণাস্ত্র। বলা প্রয়োজন, মিউজিক হিস্ট্রি ও এ-সংক্রান্ত থিয়োরির দিক থেকে কিতাবখানার আবেদন আজো অমলিন।
স্টিভেন মিথেনের বইখানা অনলাইনে এতো বছরেও সুলভ নয়। গুগল বুকস কেবল এর নির্বাচিত অংশ মাগনা পাঠের সুযোগ রেখেছেন। বাকিটুকুর জন্য পেইড সাবক্রিপশন ছাড়া উপায় নেই। অন্যান্য সাইটে বইটির বিচ্ছিন্ন কিছু অধ্যায় অবশ্য তুলেছেন অনেকে। ইউটিউবে গমন করলে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর অডিওপাঠ শ্রবণ করা যায়। আর রয়েছে, স্বয়ং স্টিভেন মিথেনের বক্তব্য ও তর্কালাপের কিছু নমুনা।

উৎসগুলো একত্র করলে বইটির নির্যাস সম্পর্কে কাজচলতি ধারণা পেতে অবশ্য অসুবিধে হয় না। তবে, এর ওপর দাঁড়িয়ে বইটির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা বা মতামত প্রদান উচিত নয়। তারচেয়ে ভালো,—এর সারবত্তা একবার ঝালাই করে নেওয়া। আমি সে-চেষ্টাই করছি এখানে।
স্টিভেন মিথেন যে-মত দাঁড় করিয়েছেন, তা এসব সূত্র আমলে নিলে আগ্রহ জাগিয়ে তোলে প্রবল। সুদীর্ঘ বিবর্তনরেখায় মানব প্রজাতি কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযোগের ভাষা গড়ে তুলেছিল? প্রশ্নের মীমাংসায় ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জনকে তিনি আলাদাভাবে পাঠ ও ব্যাখ্যা করেছেন বিস্তারিত। ভাষার জায়গা থেকে এটাকে শব্দ রূপে শনাক্ত করা মুশকিল। কেননা, মানুষের ভোকাল কর্ড বা স্বরযন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা এরকম ধ্বনিগুঞ্জন মূলত অর্থহীন মনোভাব প্রকাশের সুরেলা ধরনকে আগে মনে করায়।
প্লাইস্টোসিন কালপর্বে ধরায় বিবর্তিত মানব প্রজাতি অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এরকম মৌখিক ধ্বনিগুঞ্জনের সাহায্যে নিজের অনুভূতি প্রকাশ ও পরস্পরকে সংযোগ করেছে। এর নমুনা মানব প্রজাতির সোদর বানর ছাড়াও প্রাণীজগতে এখনো চরে খাওয়া বিচিত্র প্রাণীর মধ্যে আমরা আজো দেখতে পাই। শিম্পাজির কথা ধরা যাক এখানে। তাদের ভোকাল কর্ড কিচির-মিচির টাইপের যেসব ধ্বনিগুঞ্জন পয়দা করে, সেগুলো কেন অর্থহীন নয়, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভালোভাবে প্রমাণিত। শিম্পাঞ্জি দলে এসব অবোধগম্য ধ্বনিব্যঞ্জনা যোগাযোগ ও সংকেত আদান-প্রদানে ভূমিকা নেভায়। বড়ো কথা হলো, এগুলোকে পিচ অনুসারে ভাগ করলে পরিষ্কার সুর-কাঠামো বের করে নেওয়া যাচ্ছে।
প্রকৃতিকে মধুস্বরে মাতিয়ে রাখা পাখির কূজন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বাদবাকি প্রাণীরাও মুখে যেসব আওয়াজ তোলেন হামেশা, খেয়াল করলে দেখব, সেগুলোর মধ্যে বিচিত্র লয়, ছন্দ ও সুরের ওঠানামা পরিষ্কার কানে ধরা পড়ছে। আকাশে মেঘের অনাগোনায় চঞ্চল ভেক টানাস্বরে যে-আওয়াজ ছাড়েন,—কান পেতে শুনতে থাকলে তার মধ্যে হাই পিচ ও লো পিচের ব্যঞ্জনাঘন সংমিশ্রণ পাচ্ছি। এটি একধরনের একঘেয়ে সুরেলা আবেশ কানে বহায়। সাগর তিমিরা যে-ডেসিবলে কম্পাঙ্ক ছুঁড়ে থাকে, সেখানে এই শব্দতরঙ্গ প্রায় দশ-পনেরো কিলোমিটার পর্যন্ত তাদের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানে কাজে লাগে। তিমিকুলের এই ধ্বনিগুঞ্জন যথেষ্ট সুরেলা ও আবেশ জাগানিয়া বটে!
মিউজিক স্কেল তৈরিতে এসব আওয়াজের ভূমিকা শাস্ত্রীয় তথা ধ্রুপদি রাগসংগীতের বিকাশে অবদান রেখেছিল। প্রকৃতিতে প্রতিয়িনত বিচিত্র আওয়াজ পয়দা হতেই থাকে। বাদ্যযন্ত্র ও কণ্ঠস্বরে বিশেষ আকৃতির সুরের জন্ম দিতে মানুষ এগুলোকে অনুকরণ করেছে ও এখনো করে-না তা বলার উপায় নেই। মিউজিক থিয়োরিতে যা ইমিটেটিং নামে প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যায় নিয়েছে মোড়।
মানে দাঁড়াল, প্রাণীমস্তিষ্কে সুস্পষ্ট শব্দার্থ ও ব্যকরণসম্মত ভাষার আদিরূপ সাংগীতিক ধ্বনিব্যঞ্জনায় নিহিত থেকেছে। স্টিভেন মিথেন ঠিক এখান থেকে ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জনকে আমলে নিয়ে নিজের থিয়োরি সাজিয়েছেন। তাঁর মতে ধ্বনিগুঞ্জনকে যদি প্রাগৈতিহাসিক মানব প্রজাতির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা নমুনা রূপে কল্পনা করি, সেক্ষেত্রে পাঁচটি পরিষ্কার কাঠামো আমরা পেতে পারি :

ক. ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জনকে বিশ্লিষ্ট করা সম্ভব নয়। এটি হোলিস্টিক, অর্থাৎ অখণ্ড বা সামগ্রিক। পরিণত ভাষাস্তরে আমরা অবলীলায় আলাদা-আলাদা শব্দ পরপর জুড়ে দিয়ে বাক্য তৈরি করি। অবিরত নতুন ভাব ও অর্থ জন্ম নেয় এর ফলে। আদিমানবরা এভাবে শব্দ তৈরি করার অবস্থায় তখনো পৌঁছায়নি। বানর গোত্রের মতো অখণ্ড ধ্বনিগুঞ্জন মুখ দিয়ে তারা ছুড়ে দিতো, যা তাদের সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
মানুষের মস্তিষ্ক ও ভোকাল কর্ডের সংযোগ যে-রসায়নিক তরিকায় হচ্ছিল তখন, সেখানে ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জন হয়তো কোনো একটা শিকার অথবা অন্য কিছু বোঝানোর খাতিরে তারা ব্যবহার করেছে। একটি সাংগীতিক সংকেত, যার মধ্যে হাই পিচ ও লো পিচ থাকছে, এবং যার কম্পনতরঙ্গ কানে পৌঁছোনোর কারণে বার্তা আদান-প্রদান করা কঠিন থাকছে না। এই ধরনের ধ্বনিগুঞ্জন এমন-যে, এগুলোকে পৃথক করা যায় না। তারা তাই হোলিস্টিক বা সামগ্রিকতার উপমা। ‘হুমমমম’-কে (Hmmmmm) ভেঙে পৃথক শব্দ পাওয়া সম্ভব নয়। এটি কেবল সাংগীতিক লয় ও ছন্দকে অখণ্ড রূপে ধারণ ও প্রলম্বিত করছে।
খ. ‘হুমমমম’ (Hmmmmm), স্টিভেন মিথেনের ভাষায় ‘ম্যানিপুলেটিভ’ বা প্রভাব বিস্তার করতে আদিমানবরা ব্যবহার করেছে ওই সময়টায়। এর উদ্দেশ্য ঠিক তথ্য বিনিময় ছিল না। মূল উদ্দেশ্য হয়তো নিজ গোত্রে দলবদ্ধ কাউকে ভয় দেখানো, শান্ত করা বা তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করাও হতে পারে।
গ. সুরেলা এই ধ্বনিগুঞ্জনকে স্টিভেন মিথেন Multimodal বা বহুমাত্রিক ভাবার পক্ষে। আদিমানবের ভোকাল কর্ড চিরে এটি বেরিয়ে আসছে ঠিক আছে, কিন্তু আসার প্রক্রিয়া শুধুই কণ্ঠষ্বরের ওপর নির্ভর করছে না। এটি অঙ্গভঙ্গি (Gestures) ও মুখের অভিব্যক্তি (Facial expressions), যে-দুটি আবার মানব সংযোগের আদি রূপ বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে আগাগোড়া, এবং শরীরের তাল বা নাচের (Dance) মধ্য দিয়ে ভোকাল কর্ড থেকে বেরিয়ে আসছে। সুতরাং, ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) দিয়ে তারা তখন যে-সংকেত দিচ্ছে, সেখানে অঙ্গভঙ্গি, অভিব্যক্তি ও নাচের মুদ্রা এর অর্থবোধকতা তৈরিতে বিরাট অবদান রাখছে।
আফ্রিকা বা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়ানো অদিবাসীরা বাদ্যযন্ত্র ও মুখের বুলি দুটোই ব্যবহার করে সাংগীতিক ভাষা ও সুরে আমাদের মোহিত করে আজো, সেখানে তাদের পরিবেশনা কিন্তু দেহের অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও নাচের নানা মুদ্রা মিলে ভাষা পায়। এগুলো সাংগীতিক ভাষার শিরায়-রক্তে আদি থেকে বহমান।
ঘ. ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জনকে যদি একালের মিউজিক স্কেলে ফেলি, তাহলে সংগীতের অপরিহার্য ত্রয়ী, অর্থাৎ লয় (Rhythm), সুরের ওঠানামা (Pitch) ও সমবেত সুর (Harmony)… সবটাই পাচ্ছি। অর্থাৎ, ধ্বনিগুঞ্জনকে কীভাবে সুরে প্রকাশ করতে হবে, তা আদিমানবরা গোড়ায় রপ্ত করেছিল। ঠিক যেমন, অন্য প্রাণীরা এখনো করছে প্রাকৃতিকভাবে।
সিংহের গর্জন এর অন্যতম উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সিংহের গর্জন শব্দকম্পাকের হিসাবে আট কিলোমিটার পর্যন্ত তরঙ্গিত হয়। এখন এই গর্জন কিন্তু হাই পিচ ও লো পিচের সঙ্গে রিদম ও হারমোনি ধরে পুরোটা। শুনতে অদ্ভুত! গায়ে শিহরন জাগে। মনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে ভেবে-যে, সিংহমামা নিকটে আছেন। কিন্তু গর্জনখানা সোজা কথায় ম্যাজেস্টিক। সিংহ এটি করে তার নিজের ডেরায় নিজের অবিসংবাদিত অস্তিত্বকে জানান দিতে। বাছারা, বুঝেশুনে এখানে পা বাড়িও। আমি আছি জেগে।
ঙ. আগেই বলেছি, মানুষের কণ্ঠে সাংগীতিক ভাষা বিকাশের নেপথ্যে মিম বা অনুকরণের বড়ো ভূমিকা আছে। মানুষ প্রকৃতগতভাবে হরবোলা। অন্যের ডাক ও আওয়াজ নকল করতে মহা ওস্তাদ। স্টিভেন মিথেন অনুমান করছেন, ‘হুমমমম’ (Hmmmmm)-এর মতো ধ্বনিগুঞ্জন প্রকৃতিবক্ষে ছড়ানো বিচিত্র আওয়াজের সমেবত সংহত রূপ হয়তো,—অনুকরণের ধারায় মানুষ একে নিজের মতো করে সংহত করেছিল কালক্রমে। নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মঙ্গোলিয়ান ও তুভান থ্রট সিংগিংকে এর পরিণত রূপ হিসেবে আমরা ইচ্ছে করলে বিবেচনায় নিতে পারি। ভোকাল কর্ড যেখানে ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) সদৃশ ধ্বনিগুঞ্জনকে অর্থবোধক ভাষায় প্রকাশ করছে।
এখানে এসে মনে ভাবনা আসে বটে,—মানব কণ্ঠস্বরের বিবর্তন তো আর মাটির নিচ খুঁড়ে বেরিয়ে আসছে না! স্টিভেন মিথেন যে-কালপর্বে গমন করছেন তা প্রাগৈতিহাসিক। লক্ষ-লক্ষ বছর আগে ধরায় ছড়ানো মানব প্রজাতি কীভাবে মুখের ভাষায় সংযোগ করত, তা তিনি কীসের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত হচ্ছেন? ‘হুমমমম’ (Hmmmmm)-এর মতো ধ্বনিগুঞ্জনের এই-যে ব্যাখ্যা তিনি দিচ্ছেন,—এর সাপেক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি জুটাচ্ছেন কী করে?
উত্তর হলো,—স্টিভেন মিথেন এখানে জীবাশ্মে পরিণত আদিমানবের অ্যানাটমিকে বিশ্লেষণ করে এগিয়েছেন। মাটি খুঁড়ে পাওয়া আদি মানবের ফুসফুস, স্বরযন্ত্র (Larynx) ও জিহ্বার নিচে থাকা ‘হায়য়েড অস্থি’ (Hyoid bone)-কে বিবেচনায় নিয়েছেন তিনি। প্রায় ৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে ধরায় চরে বেড়ানো হোমো হাইডেলবার্গেনসিস (Homo heidelbergensis) ও নিয়ানডার্থালদের (Neanderthals) হায়য়েড হাড়ের গঠনের জীবাশ্মের রসায়নিক বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, তাদের এই গঠন আধুনিক মানুষের নিকটবর্তী।
এখন আমরা সাংগীতিক সুরথধ্বনি পয়দা করার জন্য ফুসফুস, স্বরযন্ত্র ও হায়য়েড অস্থিকে যেভাবে ব্যবহার করে থাকি, হাইডেলবার্গেনসিস ও নিয়ানডার্থাল মানব প্রজাতিও তাই করেছিল তখন। বিবর্তনের ক্রমরেখায় এভাবে ধ্বনিব্যঞ্জনা পয়দার জন্য তাদের দেহের গঠন ততদিনে তৈরি। সুতরাং ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) সদৃশ ধ্বনিব্যঞ্জনায় সুরের যোগ অনুমান করাটা অসংগত নয়।
বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তাহলে ভাষার উৎপত্তি কখন? স্টিভেন মিথেনের থিয়োরি মেনে অগ্রসর হলে শব্দের সঙ্গে শব্দ জুড়ে বাক্য উৎপাদন ও পরিণত সংযোগ আসছে ওই সময়টায়, যবে থেকে মানুষ সুর থেকে শব্দকে পৃথক করার সক্ষমতা অর্জন করেছিল। তিনি এখানে ‘জ্ঞানগত বিস্ফোরণ’ (Cognitive Revolution)-এর কথা তুলছেন। বৈজ্ঞানিক কাল গণনার রীতি অনুযায়ী এই বিস্ফোরণ সত্তর থেকে পঞ্চাশ (৭০,০০০ থেকে ৫০,০০০) হাজার বছর আগে ঘটেছিল। ইউরোপের একাংশ জুড়ে নিয়ানডার্থাল ও ডেনিসোভান (Denisovan), আর আফ্রিকার সাভানায় হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়া মানব প্রজাতির আর কোনো প্রজাতি ততদিনে ধরায় বেঁচে নেই।
স্টিভেন মিথেন বলছেন, মানবমস্তিষ্কে একধরনের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটে ওইসময়। এর ফলে সুরের অখণ্ড রূপ, যেটি তারা মস্তিষ্কে বহন করে বিবর্তিত হচ্ছিল বংশ পরম্পরায়,—তা ভেঙে যায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে কম্পোজিশনালিটি (Compositionality) বলে বোঝাতে চাইছেন এই প্রত্নতত্ত্ববিদ।
মানে দাঁড়াল, সুরের মধ্যে গুঞ্জরিত ও সংগোপন শব্দব্যঞ্জনা এবার মানুষ পৃথক করতে শিখে গেল। ভাষার পরবর্তী সুগঠিত বিকাশে যা নিয়েছিল নির্ধারক ভূমিকা। ভাষা এখন আর কেবল দেহের অঙ্গভঙ্গি, নাচের মুদ্রা ও সুরগুঞ্জনে অখণ্ড সংকেত সীমাবদ্ধ থাকল না;—তা হয়ে উঠতে লাগল স্বরযন্ত্রের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসা অর্থবোধক, রূপান্তযোগ্য ও তথ্য বিনিময়ের আধার। পরে যা প্রাচীন সভ্যতায় চিত্রসম্বলিত লিপির মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকতা লাভ করেছে। লিখিত ভাষার বিবর্তনে যার অবদান যুগান্তকারী।
ভাষার এই ক্রমবিকাশ সাংগীতিক ধ্বনিগুঞ্জন থেকে একে পৃথক ও সার্বভৌম পরিণতি দান করেছে। তা-বলে কি সাংগীতিক গুণ বিলয় হয়েছে ভাষা থেকে? বিষয়টি সেরকম কিছু নয়। ভাষা এই পর্যায়ে পৌঁছে সংগীতকে পৃথক ও শক্তিশালী নান্দনিকতায় বিশিষ্ট করার কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। জন্ম নেয় যোগাযোগের বিচিত্র ভাষামাধ্যম। সুরধ্বনির সক্ষমতা এবার মানবসৃষ্ট শব্দে জুড়ে মানুষ। সাহিত্যের মতো সংগীতও যেখানে ভাষার অতিব জরুরি ও মনোরম প্রকাশমাধ্যম।
তথাপি, লক্ষ করলে দেখব, সংগীতের ভাষা অনেকসময় অবোধ্য থাকা সত্ত্বেও তাকে সংযোগ করতে মানুষ সমস্যায় পড়ে না অতখানি। কোনো অর্থ বোঝা যাচ্ছে না, এরকম ভিনদেশি ভাষায় রচিত গান আমরা শুনি ও বেশ উপভোগ করি। এটা সম্ভব হয় সংগীতে অন্তর্লীন সুরকাঠামোর কারণে, যেটি তার আদি ধ্বনিগুঞ্জন সাত সপ্তকে আজো ধারণ করছে বিশ্বজুড়ে। কানে এর লয়-তান ও উঠানামা অবোধ্য হয়েও বোধগম্য এক সুখকর অভিজ্ঞতা দিয়ে যায় আমাদের। সংগীত এ-কারণে হয়তো ডিভাইন বা স্বর্গীয়, যাকে ভাষা ব্যতীতও মানুষের কাছে আজো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব কেবল ওই ‘হুমমমম’ (Hmmmmm)-এর অনুরূপ সব ধ্বনিগুঞ্জন থেকে বিবর্তিত রাগ-রাগিনীর মধ্য দিয়ে।

স্টিভেন পিঙ্কার ডারউইনের বিবর্তনকে আমলে নিতে গিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করেছিলেন। ডারউইন যেখানে স্বয়ং এই অনুমানে স্থির থেকেছেন,—ভাষা বিকাশের আদি পর্যায়টি মূলত সাংগীতিক ছিল। অর্থাৎ প্রোটো ল্যাঙ্গুয়েজের অংশ সুরধ্বনি থেকে পূর্ণাঙ্গ শব্দ ও পরে বাক্য নির্মাণ, এবং আরো পরে লিপি ও লিখিত রূপে ভাষার বিবর্তন তুলনামূলক নবীন। মানবমস্তিষ্কে সাংগীতিক সুরধ্বনির আদিতম নিদর্শন রূপে মাদারিজকে (Motherese) সামনে পেশ করেছেন স্টিভ মিথেন।
আমাদের সঙ্গে ছোট্ট শিশুদের কথোপকথন মোটের ওপর ইউনিভার্সাল। বিশ্বজুড়ে শিশুদের মুখে বোল ফোটা, মা ও অন্যদের সঙ্গে সংযোগের সময় যে-ভাষা তারা ব্যবহার করছে,—এর সবটাই ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) নিকটবর্তী ধ্বনিগুঞ্জন বলা যেতে পারে। স্টিভেন মিথেন যে-কারণে বলছেন, মানব মাত্রই সাংগীতিক স্কেল নিয়ে বিকশিত হয়। পরে নানা ভিন্নতা আসে পরিবেশগত বেড়ে ওঠা ও অভিযোজনের রকমফেরের কারণে। কারো মধ্যে সাংগীতিক গুণ তীব্র হতে তাকে, বাকিদের ক্ষেত্রে গুণটি ম্রিয়মাণ হয়ে আসে।
এটা গেল কণ্ঠস্বরের বুলি ব্যবহারের জায়গা থেকে সাংগীতিক ভাষার অর্থবোধক পূর্ণাঙ্গ ভাষায় বিবর্তিত হওয়ার কাহিনি। এবার যদি বাদ্যযন্ত্রে সাংগীতিক ধ্বনিগুঞ্জনের ইতিহাস তালাশ করি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনই বলে দিচ্ছে এর ইতিহাস চল্লিশ থেকে ষাট হাজার বছর পুরাতন।
গুহা ও মাটি খুঁজে পাওয়া দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখানে বাদ্যযন্ত্রের আদি বিবর্তনের ওপর দারুণ আলো ফেলেছে। প্রথমটি দিভজে বাবে বাঁশি (Divje Babe Flute) নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। স্লোভেনিয়ার একটি অতি প্রাচীন গুহায় এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। কার্বন রেটিংয়ে এর বয়স ষাট থেকে সত্তর হাজার বছর নির্ণীত হয়েছে। নিয়ানডার্থলরা তখন অত্র অঞ্চলে রাজ করছিল। ধারণা করা হয়, তারা এটি তৈরি করে থাকতে পারে। যদিও প্রাকৃতিকভাবে হাড়ের গায়ে বাঁশির অনুকূল সুর পয়দার মতো ছিদ্রগুলো তৈরি হয়েছিল কি-না, এ-নিয়ে মতান্তর এখনো আছে।

দ্বিতীয়টিকে হোহেল ফেলস ফ্লুট (Hohle Fels Flute) নামে ডাকছেন বিজ্ঞানীদল। জার্মানির একটি গুহায় এটি তারা খুঁজে পান। এর বয়স কার্বন রেটিং অনুসারে মোটামুটি পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার বছর। বাঁশিটি শকুন অথবা ম্যামথের হাড় থেকে তৈরি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই বাঁশি, গঠন ও সুর উৎপাদনে আধুনিক বাঁশির সমকক্ষ। গঠনে বড়ো কোনো খুঁত নেই। হোমো স্যাপিয়েন্সরা এটি তৈরি করেছিল বলে প্রত্নবিদরা অনুমান করছেন।
দুটি আবিষ্কার আভাস দিচ্ছে,—গুহাচিত্র ও সংগীতের মতো হাই আর্ট অনুশীলনের ইতিহাস অতি সনাতন। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানব প্রজাতি নিজ প্রয়োজনে গুহায় যেমন ছবি এঁকেছে শিকার-সহ নানা আদিম অভ্যাস ও প্রথাচারের,—অনুরূপ প্রয়োজনে বাদ্যযন্ত্রে সুরধ্বনি পয়দা করার ক্ষমতাটি তারা রপ্ত করেছিল। ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জনে যা পরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একটা পর্যায়ে নিষ্প্রাণ জড়বস্তুকে সাংগীতিক ধ্বনিগুঞ্জন উৎপাদনের মাধ্যম রূপে ব্যবহার করতে থাকে মানুষ। বিচিত্র বাদ্যযন্ত্র তৈরির কালপর্ব তারপর হতে আজো সমানে চলছে।
সব মিলিয়ে একটি ছবি আমরা পাচ্ছি। ছবিটি বলে, মানুষ তার জন্মলগ্ন থেকে সুরের কারিগর। এই সুর নিছক কলা ছিল না তখন। তা ছিল যোগাযোগের আদিম স্তরে নির্ভরযোগ্য সংকেত, যেটি তাদের সামাজিক সংহতি রক্ষার উপকরণ হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। ভাষার নিজস্ব স্বরূপ গড়ে ওঠার যুগারম্ভকে তা দিয়েছিল আদি গতি ও পরবর্তী প্রগতি।
মানবধরায় ‘হুমমমম’ (Hmmmmm) ধ্বনিগুঞ্জন কাজেই প্রাক-ইতিহাসের সুর বহে আনে কানে;—আদিমানবরা এই সুরধ্বনি কণ্ঠে ধরেছিল ভাষার জন্ম দিবে বলে। আদিম এই সুরধ্বনি হলো প্রথম উচ্চারণ, এবং তা এই বার্তা জানায়,—সাংগীতিক ধ্বনিগুঞ্জনে সংগোপন থেকেছে ভাষার পরবর্তী শাব্দিক বিকাশ। আদি মানবের এই গান, এই ‘হুমমমম’ (Hmmmmm), যেন-বা সৃষ্টির প্রথম ওঙ্কার ‘ওম’-এর মতো চির পুরাতন হয়েও চিরনতুন!
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য দেখুন …
ডাকু চেঙ্গিসের আন্তঃনাদ সংগীত : থার্ড লেন স্পেস
বিপন্ন সারিন্দায় বিপন্ন মুখচ্ছবি : থার্ড লেন স্পেস
গানের শ্রোতা যখন মহান প্রাণীকুল : থার্ড লেন স্পেস
. . .

থার্ড লেন স্পেস-এ অবদায়ক আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন


