আমার ধারণা ছিল মিলিটারি ও উগ্রপন্থী মোল্লাদের লাগাতার চাপে বিপর্যস্ত পাকিস্তানের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। চাপ ও জখম সইছে প্রতিদিন; তবু ‘যত চাপ তত প্রতিরোধ’-কে সার জেনে গ্রামীণ সমাজে তা বইছে নীরবে। অতীতের মতো পরিপুষ্ট হয়তো নয়, কিন্তু স্থানিক জীবনচর্চায় তার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। অন্তঃসলিলা জীবনীশক্তির জোরে মুছে দেওয়ার সকল চেষ্টাকে প্রতিহত করছে লোকসংস্কৃতির ধারক-বাহক গ্রামীণ সমাজ স্বয়ং। পাকিস্তানের তথ্যচিত্র নির্মাতা জাওয়াদ শরীফের Indus Blues দেখার পর আমার এই অলীক ধারণা ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে!
পাকিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকার শেষ সারিন্দা বাদককে দেখালেন জাওয়াদ! ভাবা যায়! কাওয়াল গানে সারেঙ্গি নামক বাদ্যযন্ত্রটি রাগ সংগীত ও কাওয়ালে অতি আদরের জানা ছিল এতদিন। রাগ সংগীত ও কাওয়াল গানের আসরে সারেঙ্গি বাজতেও শুনেছি কমবেশি। সেই সারেঙ্গি নাকি যুগ বদলের চাপে ধুঁকছে! পাহাড়ি উপত্যকায় ঠাসা পাকিস্তানে সারেঙ্গি বাজানেওয়ালার সুদিন ফতে হতে চলেছে।
মহেঞ্জোদারোর মাটি দিয়ে বানানো বরেন্দো যন্ত্রটির ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না! দেখে বুঝলাম ইনি ব্যাঞ্জোর গলিভাই। দুনিয়াজুড়ে ব্যাঞ্জোর কদর আজো অমলিন। পাকিস্তানেও বাদ্যযন্ত্রটি জনপ্রিয় ছিল। বেচারা এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে আছে। পাকিস্তানের গ্রামীণ সমাজে কিছু টিকছে না ‘গানবাজনা হারাম’ এই ফতওয়ার দাপটে!
সূরুয বাদ্যযন্ত্রটি দেখে বেহালার জাতভাই মনে হলো। আওয়াজ অবশ্য চেলোর নিকটপ্রায় লাগল কানে। বালুচদের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র এটি। যে-গ্রামটি জাওয়াদ দেখালেন, সেখানে মাত্র দুজন সূরুয বাদক কোনোমতে টিকে আছে। বাকিরা অক্কা পেয়েছেন ইতোমধ্যে। সূরুয বানানেওয়ালা কারিগরদের কেউ আর বেঁচে নেই সেই গ্রামে। বাজিয়েও তৈরি হচ্ছে না নতুন করে। তাহলে কি শেষ সূরুয বাদককে দেখালেন জাওয়াদ?

রাজস্থানী লোকসংস্কৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা রাখে এরকম এক অঞ্চলে ঢুকেছিল জাওয়াদের ক্যামেরা। নারেইলি নামক বাদ্যযন্ত্রটি দেখে চেনা মনে হলো। কোক স্টুডিও পাকিস্তানের ফিউশন গান বা অন্য কোথাও এনাকে বাজতে দেখেছি সম্ভবত। ঘোড়ার লেজের গোছা ব্যবহার করে তৈরি যন্ত্রটিও মরহুম হওয়ার পথেই আছেন। মরমি ও উচ্ছল ঘরানার গানবাজনায় হাজারবর্ষী বাদ্যযন্ত্রটি ব্যবহারের ইতিহাস অতি পুরাতন। সেই নারেইলি এখন আর টিকতে পারছে না!
বিখ্যাত হুনজা গোত্র ওদিকে নিজের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে পেরে উঠছে না। ধর্মে মুসলমান এই জনজাতি চীন ও পাকিস্তান সীমান্তের পাহাড়ি উপত্যকায় বাস করেন। প্রাকৃতিক জীবনধারায় অভ্যস্ত পুরোপুরি। প্রকৃতি নির্ভর যাপনে নিজেকে তারা একীভূত রেখেছেন এই একুশ শতকেও! হুনজা জনগোষ্ঠীর গড় আয়ু নব্বইয়ের কাছাকাছি জানা ছিল। নারীকুলের সৌন্দর্যে বয়সের সঙ্গে ভাটা নামে না। ষাট-সত্তর ঊর্ধ্ব কোনো নারীও সেথা যৈবতীর বিস্ময় জাগায় মনে! প্রাকৃতিক জীবনধারায় যাপন করাটাকে জীবনীশক্তির মূল চালক বলে তারা জানে এখনো।
তো এই হুনজাদের চারদাহ বাদ্যযন্ত্রটি দেখে গিটার ও সেতারের সম্মিলন মনে হলো। দোতারার মতো মিঠেকড়া আওয়াজ ছাড়েন বেশ! ইরান দেশের সুফি-দরবেশদের হাত ধরে যন্ত্রটি পাকিস্তানে ঢুকেছিল হাজার বছর আগে। হুনজা সংস্কৃতি তারপর থেকে একে আপনা করেছিলেন; আর এখন একে বাঁচিয়ে রাখা দায় হয়ে উঠেছে তাদের জন্য। চারদাহ যে-মরমি জীবনবেদের অনুরণন তোলে, হুনজা জনপদে পাকিস্তানের সরকাররাজ ও বিচিত্র মতলব নিয়ে সেখানে ঢুকতে থাকা লোকজনের চাপে বাদ্যযন্ত্রটি বিপন্ন বলা যায়।
আহ সারেঙ্গি! কত শুনেছি! রাগ সংগীত, কাওয়াল থেকে কত্থক নাচের সংগতে এর জুড়ি নেই! সারেঙ্গির স্ট্রিং ৩৪টা! তার মানে সুর তুলতে কোন পর্যায়ের মেহনত করে একজন বাজিয়ে। শহরে কদর থাকায় সারেঙ্গি হয়তো কায়ক্লেশে টিকে আছে, তবে এর মূল লোক উৎসে বাদ্যযন্ত্রটির মরণদশা নিশ্চিত হতে চলেছে! কে বানাবে? কে বাজাবে? পরম্পরা ছাড়া ৩৪ স্ট্রিংয়ের অনন্য বাদ্যযন্ত্রটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।

এসব বাদ্যযন্ত্র বিলোপ হওয়ার পেছনে পরিবর্তনশীল সময়ের ভূমিকা নিশ্চয় রয়েছে। নতুন বাদ্যযন্ত্রের আগমন পুরোনোকে বিগত করে দিচ্ছে অনেকক্ষেত্রে। লোকজনের গানবাজনা শোনার রুচি বদলাচ্ছে অনবরত। পালাবদলের বাস্তবতা মেনে পুরাতন বাদ্যযন্ত্রকে নতুনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। সমস্যা হলো পাকিস্তানের সৃমদ্ধ সংগীত ঐতিহ্যে ধারাটি সবল নয়। এর জন্য যে-পরিবেশ ও বাজার থাকা প্রয়োজন, জাওয়াদ দেখাচ্ছেন,—পাকিস্তানে তা আশা করা দিবাস্বপ্নের শামিল।
তারওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে ‘গানবাজনা হারাম’ এই বিশ্বাসের প্রাবল্য। শহরের গানপ্রিয়রা এসব বাদ্যযন্ত্র বাঁচল-না-মরল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। পাহাড়ি উপত্যকায় ঘেরাও পাকিস্তানের গ্রামীণসমাজও এগুলোকে এখন আর পরম মমতায় বাঁচিয়ে রাখার কথা ভাবে না। বালুচরা যেমন স্বাধীন দেশে গোলামের জীবন পার করছে! তাদের দিন কাটছে জঙ্গে!—গানের স্থান সেখানে কোথায়!
ধর্মের প্রবল তর্জনি-শাসনে বিপন্ন সারিন্দা বাদকের মুখচ্ছবিই বুঝিয়ে দেয় পাকিস্তানে লোকসংস্কৃতির বেগবান উৎসরা মরতে বসেছে! ইসলামি প্রজাতন্ত্রে আবার কীসের নাচাগানা! শরিয়তি বিশ্বাসের নীরব এই সম্মোহনে মানুষগুলো আর মানুষ নেই। তারা ধর্মরোবট হয়ে গেছে এতদিনে! জাওয়াদের তথ্যচিত্রে শেষ সারিন্দা বাদককে দেখে স্থবির হওয়া ছাড়া কী করার থাকে তারপর!
আমাদের এখানেও একই মড়ক চলছে বৈকি। কোনো এক জাওয়াদ যদি ক্যামেরা নিয়ে বাংলাদেশের আনাচ-কানাচ ঘোরেন, বিলোপের মড়ক দেখে হয়তো তার পিলে চমকে উঠবে! ওই সারেঙ্গি বাদক ও কারিগরের মতো হয়তো শুনবো, আমাদের কোনো বিপন্ন বাজিয়ে বলছেন :

ভারতে হিন্দুরা সুরকে আল্লা মিয়ার সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। তাঁকে তো আমি-আপনি কেউ দেখি নাই। সুরের মধ্য দিয়ে যখন শুনি, একিন চলে আসে।
যে-স্রষ্টা বিশ্বকে সুরে বাঁধলেন প্রতি অঙ্গে, সেই সুরকে নির্বাসিত করে বীভৎস ধর্মারসের চর্চা চলছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো মুমিন মুসলমানে ঠাসা জনপদে! কোনো পুষ্প এখানে কী করে ফুটবে! কিছু ফুটবে না, বরং যেটুকুন একটু-একটু করে পরম মমতায় ফুটেছিল এতদিনে,—তারা সবে ঝরে যাবে! কে জানে আমরা হয়তো অচিরে কোনো পল্লী জনপদে শেষ একতারা, দোতারা বা সারিন্দা বাদককে দেখব,—বেচারা ধুঁকছে, শরিয়তি ইসলামের বরখেলাফ বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অপরাধে!
. . .
. . .


