পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

সুন্দর ফুটবল এক ‘অমীমাংসিত রমণী’

Reading time 14 minute
5
(13)
FIFA 2026 World Cup: Final Battle; Image Source & Credit: Collected; Google Image

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নামবে আজ। কানাডা থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত ধেয়ে আসা দাবানলের ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে ফাইনাল ম্যাচ ভালোভাবে উতরে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকছে বটে! তার মধ্যেই ম্যাচ আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা সারছে ফিফা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের আয়োজন শান-মান-গুণে কতটা সেরা হলো তা নিয়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা নিশ্চয় আলোকপাত করবেন সময় হলে। আপাতত এটুকু মাথায় রাখি,—ছাব্বিশের এই বিশ্বকাপ নানাকারণে দর্শকের মনে থাকার কথা ম্যালা দিন।

ফুটবলের বৈশ্বিক যজ্ঞকে ঘিরে বাংলাদেশে উন্মাদনা নতুন নয়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় ভাগাভাগি হয়ে সমর্থকরা একে অন্যকে বিদ্রুপ-পরিহাসের কামান দেগেছেন মাসজুড়ে। দুই মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি ভক্তদের বাকযুদ্ধ তিক্ততার সীমা ছাড়িয়েছে অহরহ। ভক্ত-সমর্থকদের পাগলাটে আচরণের মধ্যে আবার ‘সুন্দর ফুটবল’ দেখার আক্ষেপ ও এ-নিয়ে মতান্তর বজায় ছিল যথারীতি।

‘সুন্দর শৈল্পিক ফুটবল বনাম ফলাফল নির্ভর ফুটবল’কে ঘিরে চলে আসা বিতর্ক এবারের বিশ্বকাপে আলোচনায় ছিল না, এমনটি বলা যাচ্ছে না। একদল দর্শক এখনো সেই ফুটবলটা মাঠে দেখতে আকুল, যে-ফুটবল দেখে মনে হবে,—ফরাসি চিত্রকর ক্লোদ মোনের (Claude Monet) তুলিতে আঁকা ছবি দেখছি মাঠে! মিথ্যে নয় একথা,—ক্লোদ মোনে এমনভাবে ছবি আঁকতেন, দেখে মনে হতো, এর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়! দেহের ভিতরে ফুটতে থাকা উত্তেজনার আগুন নিভে মন পরিতোষে ভরিয়ে তোলেন এই ফরাসি চিত্রী।

সেই ফুটবল, এমনকি তা হতে পারে পরাবাস্তব চিত্রাঙ্কনের রাজা সালভাদর দালির যিশুকে নিয়ে আঁকা ছবিগুলোর মতো। যিশুকে অনন্য এক ভাবনা থেকে এঁকেছেন দালি। তাঁর ভাষায়,—সূর্যমুখী ফুলের মতো প্রস্ফুটিত পরমাণুরাজ্যে অনিশ্চয় গন্তব্যে ভাসমান যিশু জগতে ঈশ্বরের অনিবার্যতা প্রমাণ করেন। সোজা কথায়, ‘সুন্দর ও শৈল্পিক ফুটবল’ আধ্যাত্মিক প্রশান্তির মতো মনকে পরিতৃপ্ত দিয়ে যাবে। মাঠে ছকবেঁধে ঘুরে বেড়ানো বাইশখানা মানুষ চামড়ার গোলককে নিয়ে সেই কসরতটা দেখাবে, যার থেকে ছিটকে বের হবে জাদুকরি সব মুহূর্ত;—এবং তা যতবার চোখে ভাসবে, মনে হবে ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখি!

সবই বোঝা গেল। প্রশ্ন তবু জাগে মনে,—দর্শকের এই ‘সুন্দর ফুটবল’ আসলে দেখতে কেমন? ব্রাজিল একটা সময় যে-ফুটবলটা খেলেছে, এবং এখন আর খেলতে পারে না,—সেটা? ইয়োহান ক্রুইফদের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসা টোটাল ফুটবল, নেদারল্যান্ডস ও অন্যরা খেলেছে পরে, এবং পেপ গার্দিওলাটিটো ভিলানোভার বার্সেলোনা এই-তো সেদিন একে যুগানুগ কৌশলে মানিয়ে নিয়ে খেলেছে;—‘সুন্দর ফুটবল’ কি তাহলে এটাই? টোটাল ফুটবলের কলাকৌশল এঁনাদের হাতে টিকি-টাকা (Tiki-taka) ফুটবলের নান্দনিকতায় দর্শককে পরিতুষ্ট করার পাশাপাশি বার্সেলোনাকে লম্বা সময় অপ্রতিরোধ্য রেখেছিল।

স্পেন দলটা এখনো ওই টিকি-টাকা সংশোধিত ছকে খেলছে মোটামুটি। স্পেনকে ২০১০-এ বিশ্বকাপ পাইয়ে দেওয়া লুইস দে লা ফুয়েন্তের (Luis de la Fuente) হাতে পরিমার্জিত রূপ নিয়েছে সম্প্রতি। প্রতিপক্ষের পায়ে পারতপক্ষে বল না দিয়ে ছোট-ছোট পাসে মাঠে মৌচাক বেঁধে খেলা ও খেলানোর শৈলীকে কি ‘সুন্দর ফুটবলের’ উপমা ধরবে দর্শক? টোটাল ফুটবলের ছকে অধুনা সংযোজন গেগেনপ্রেসিং (Gegenpressing), অর্থাৎ প্রতিপক্ষের পা থেকে দ্রুত বল কেড়ে নেওয়া ও প্রতি আক্রমণে ফলাফল বের করে আনার ফুটবল কি তাহলে কম ‘সুন্দর’? দলগত সংহতি ও বোঝাপড়ার সঙ্গে অবিশ্বাস্য গতিতে পালটা আক্রমণ, আর এভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গ তছনছ করে দেওয়ার শৈলীটাকে ‘সুন্দর ফুটবল’ মানতে আপত্তি কোথায়?

কেপ ভার্দে, ডি আর কঙ্গো, মিশর, প্যারাগুয়ে, অস্ট্রিয়া, কলাম্বিয়া… এমনকি ফাইনালে উঠে আসা স্পেন ছাব্বিশ বিশ্বকাপে যে-কৌশলে খেলেছে, কেমন করে একে ‘সুন্দর ফুটবল’ নয় বলে দর্শক নাকচ করবে? রক্ষণভাগ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেখানে প্রাণভোমরা। ছক এমনভাবে সাজাও, প্রতিপক্ষ যেন বল জালে ঢোকানোর কোনো জায়গা না পায়। সুযোগ বুঝে প্রতি আক্রমণে তুলে নাও ফুটবলের কাঙিক্ষ্ত শিৎকার… গো-ও-ল! ফুটবল যেহেতু মূলত গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও অ্যাথলেটিক স্কিলের খেলা, যে-কৌশলে খেলাটা খেলুক একটা দল,—গোল ও জয় হচ্ছে সেখানে ‘নির্বাণ’। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে ‘সুন্দর শৈল্পিক ফুটবল’কে সংজ্ঞায় নির্দিষ্ট করা কি সত্যিই সম্ভব? নিশ্চয় নয়।

ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ এটাকে আরো অনির্দিষ্ট প্রহেলিকা করে দিয়েছে। স্পেনের সঙ্গে ফ্রান্সের সেমি ফাইনালটা স্মরণ করা যাক। ফুটবলে রক্ষণভাগ হচ্ছে নিখুঁত ছকে সাজানো বাগান। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের রক্ষণদুর্গে হামলা করার পরিসরকে সংকুচিত করে আনা ও এভাবে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়াটা ‘শিল্পের পর্যায়ে’ পড়ছে। তার সঙ্গে স্নায়ুচাপ সামলে খেলা ও পালটা অক্রমণে গোল বের আনার কৌশল যদি যুক্ত করি,—খেলার ছক নিমিষে বদলে যায়।

স্পেন যেমন এই বিশ্বকাপে কাজের কাজটা ফ্রান্সের সঙ্গে করে দেখিয়েছে। এমবাপ্পে, ডেম্বেলে, অলিসে তো বটেই, পুরো ফ্রান্স দলটাকে বোতলবন্দি করে হেসেখেলে ম্যাচটা জিতে নিলো তারা! হিসাবি ছকে খেলতে নামা স্প্যানিয়ার্ডরা ‘হারাম বল’ বা অ্যান্টি ফুটবলের প্রায় কিনার ঘেঁষে খেলেছে পুরো ম্যাচ। তাদের পাতা ফাঁদ তছনছ করার জন্য যা দরকার ছিল ফ্রান্সের, এর কিছুই করে দেখাতে পারেনি ফরাসি সেনাদল! ম্যাচটি সেখানেই জিতে নিয়েছিল স্পেন।

দুইহাজার ছাব্বিশ বিশ্বকাপে ফ্রান্স সবদিক থেকে সলিড টিম থেকেছে। সেমি ফাইনালে আসার পথে দাপটের সঙ্গে তারা জিতেছে ম্যাচের-পর-ম্যাচ। আধিপত্যে ঘাটতি দেখেনি দর্শক। সেমির মহারণে তেজে জ্বলতে থাকা সেই প্রদীপটা স্প্যানিয়ার্ডরা একফুঁয়ে নিভিয়ে দিলো! ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম কি একজন জিনেদান জিদান দলে না-থাকার আফসোসে পুড়লেন? সেমির মহারণ জিততে জিদানের মতো প্লেমেকার কেন জরুরি তা বুঝি আরেকবার জানিয়ে গেল ছাব্বিশ বিশ্বকাপের প্রথম সেমি ফাইনাল! গ্রেটদের সঙ্গে বাকিদের তফাত এখানটায় এসে অমোঘ থাকবে চিরকাল।

Zinedine Zidane Skill in World Cup; Image Source & Credit: Collected; Google Image

মাইটি ফ্রান্সে সবই ছিল। তরতাজা সেনারা ছিল। শক্তি ও গতির চোখ ধাঁধানো সম্মোহন ছিল। তুরন্ত আক্রমণে প্রতিপক্ষের দুর্গ তছনছ করার কৌশলে কমতি থাকেনি। তবু এবং তবু… একজন জিনেদান জিদান ছিলেন না এই ফরাসি শিবিরে। গ্রেটনেসের ওই ‘পিক’ ছাড়া ‘হারাম বলের’ ছকে সাজানো রক্ষণদুর্গে ঢোকা যে-কোনো দলের জন্য ‘জান হারাম’ করে দেওয়ার অনুভূতি দিয়ে যায়। ফ্রান্স হেরে গেছে সেখানেই।

ফাইনালে ওঠার প্রথম মহারণটা কি উপভোগ্য ছিল? উত্তর সুখকর নয় অতটা! দর্শক যে-আশা নিয়ে ম্যাচটি দেখতে বসেছিল, তার সিকিভাগও পূরণ হলো কি? আক্রমণ ও পালটা আক্রমণ, দারুণ পাস ও ক্রস, ড্রিবল, চোখ ধাঁধানো সেভ, আর গো-ও-ও-ল চিৎকারের শিহরন… বলার মতো কিসসু থাকেনি ম্যাচে। একটা দমবন্ধ অনুভূতি নিয়ে প্রতিপক্ষ ফরাসিদের সবুজ মাঠে অকার্যকর থাকতে বাধ্য করেছে স্প্যানিয়ার্ডরা। অতিরঞ্জিত হয়তো, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি,—অ্যান্টি ফুটবল ওরফে ‘হারাম বলের’ নিকটপ্রায় ম্যাচে কৌশলগত ফাউল ও সেট-পিসের ঝড়ো আক্রমণে ফাইনালে ওঠার রাস্তা বের করে নিলো ফুয়েন্তের স্পেন।

সেমি ফাইনালের আগে পর্যন্ত ফ্রান্স ছিল টগবগে আরবি ঘোড়া। সেমিতে খেলতে নেমে সেই ঘোড়া দম হারিয়ে বসে পড়েল সবুজ ময়দানে! এমবাপ্পের মধ্যে দেখা গেল না চিতার ক্ষিপ্রতা। অলিসে-ম্যাজিক ঠাণ্ডা খুনের দল স্প্যানিয়ার্ডরা ফুঁয়ে দিলো নিভিয়ে! কিসসু দেখতে পায়নি দর্শক সেদিন! একদল বুড়ো বাঘ নড়বড়ে দাঁত নিয়ে শিকারের আশায় নিরুদ্যম ঘুরছিল স্প্যানিয়ার্ড দিয়ে বোঝাই সবুজ মাঠে। হায় ফ্রান্স! হায় বাস্তিলের পতন! পরপর তিনটি বিশ্বকাপে খারাপভাবে বিদায় নেওয়া স্পেনকে খাদ থেকে তুলে আনা ফুয়েন্তে দেখালেন :

তিনি, সুন্দর ফুটবল খেলে হারতে রাজি নন। তাঁর চাই জয়, এবং এর জন্য স্প্যানিয়ার্ডরা দরকার হলে গোল দিবে কম, আর প্রতিপক্ষকে সহজে ঢুকতে দেবে না রক্ষণভাগে। দরকার হলে লামিন ইয়ামালের মতো অ্যাসেট নিচে নামবেই না শুধু,—প্রতিপক্ষের পা লক্ষ করে ট্যাকল করবে সতর্কতায়।

এই স্পেন বল কেড়ে নেয় ও নিজের মধ্যে পাস বিনিময় করে নিখুঁত। তাতে সময় নষ্ট হয় কিছুটা। আর, ফাঁকতালে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে নিমিষে ঢুকে পড়া যায়। প্রতিপক্ষকে স্পেস দিয়ে খেলে না তারা। প্রতিপক্ষ একটা গোল দিলে, পালটা দুটো দিতে তেড়েফুঁড়ে ওঠে না। একটা ‘হারাম বলের’ ডিসপ্লে সেমির মহারণে সেদিন দেখেছিল দর্শক! স্প্যানিয়ার্ডদের আলতামিরার গুহা ঠাণ্ডা মাথায় সাজানো এক মরণফাঁদ ছিল ফরাসিদের জন্য। ম্যাচ শেষে তারা গুহার দেয়ালে এঁকেছে ফ্রান্স বধের চিত্র।

স্পেন দলটি বার্সেনোলার টিকি-টাকা ফুটবলে সাজানো ২০১০ বিশ্বকাপের দল নয়। ওরা শৈল্পিক ফুটবলের ছটায় কাপ জিতেছিল। এবং, পরে একই সুন্দরের পুনারাবৃত্তি করতে নেমে টানা তিন বিশ্বকাপে নিজের কবর নিজে খুঁড়েছে স্পেন। ট্যকটিকসের রাজা ফুয়েন্তে সেখান থেকে দলটিকে বের করে ফাইনালে তুলে দিলেন। এই স্পেন স্নায়ুচাপে ভোগে না। এরা ঠাণ্ডা মাথায় প্যাসিভ ফুটবলটা খেলে। হালি-হালি গোল দিতে মরিয়া হয় না। প্রতিপক্ষকে নিজের জালে বল জড়ানোর সুযোগ দেয় না পারতপক্ষে। সেমি ফাইনাল পর্যন্ত যাত্রায় স্পেন গোল খেয়েছিল সম্ভবত দুটো।

দাবার বোর্ডে রাজাকে চেক দেওয়ার মতো আচমকা হিসাবি আক্রমণ সাজায় ফুয়েন্তের স্পেন। ওটা কিন্তু চিরাচরিত প্রতি আক্রমণ বা কাউন্টার অ্যাটাক নয়। ওটা হলো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা সময়ের। সুযোগ আসবে তারা জানে, আর ত্বরিত গোল তুলে নেবে একটা বা দুটো। ব্যাস, তারপর রক্ষণদুর্গ পাহারা দিতে মাঝমাঠ ও নিচে বল ঘোরাও। একঘেয়ে শ্বাসরোধী চাপে প্রতিপক্ষের জান কবচ করতে ‘হারাম বল’ খেলার মহড়া দিতে যেন-বা সেদিন মাঠে নেমেছিল স্পেনের গতিসেনারা। আগের ম্যাচগুলোয় যেমন, সেমিতেও এভাবে দুটো গোল তারা বের করে নিয়েছে। ১২০ মিনিটে ম্যাচটি গড়ানোর কথা ছিল। অতিরিক্ত মিলিয়ে ৯৭ মিনিটে খেল খতম করে দিলো স্পেন। ‘বেলা চাও’ গাইতে-গাইতে ব্যাংক লুটের মহড়ায় দলটিকে অগত্যা সফল মানতেই হবে!

ওরা এরকম-ই। ফুয়েন্ত দলটিকে একঝাঁক মানি হেইস্ট বানিয়ে পুরো বিশ্বকাপে মাঠে নামিয়েছেন। এর সঙ্গে পেরে উঠতে যে-হাই ইন্টেন্স ফুটবলটা খেলতে হয়, ফ্রান্স তা করে দেখানোর মওকা পায়নি ম্যাচজুড়ে। ৯৮-এর বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের অধিনায়ক দিদিয়ের দেশমের মতো কোচ ডাগআউটে বসে প্রিয় সতীর্থ জিদানের কথা ভেবে আঙুল কামড়েছেন নিজের।

স্ট্যাট জানাচ্ছে, ২০০৬ থেকে এ-পর্যন্ত ফ্রাস মোট ১১ বার স্পেনের মুখোমুখি হয়েছে। ৭টি হেরেছে। জিতেছে ৩টি। আর ১টা ড্র। ফরাসিরা সুতরাং মাঠে নেমেছিল অতীত চাপের পাহাড় মাথায় নিয়ে। স্নায়ুচাপ থেকে বেরুতে পারেনি যে-কারণে। স্প্যানিয়ার্ডদের সমর-কৌশলের কাছে হার মেনে দুবারের ফাইনালিস্ট সেমি থেকে বিদায় নিলো দর্শককে হতবাক করে!

ম্যাচ শেষে অনেকটা আবেগহীন এমবাপ্পেকে দেখে অবাক হয়েছেন অনেকে! কাতার বিশ্বকাপে শ্বাসরোধী গোল করে ম্যাচ জমিয়ে দেওয়া সেনাপতি মাঠে হাঁটু ভেঙে বসে পড়েছিল। দল হেরে যাওয়ার কষ্ট তাকে পোড়াচ্ছিল ভিতর থেকে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাঠে ও পরে ড্রেসিংরুমে ছুটে গিয়েছিলেন দলটাকে সান্ত্বনা দিতে। ছাব্বিশে তার কিছু দেখল না বিশ্ব! ফরাসিরা বুঝে নিয়েছিল,—স্প্যানিয়ার্ডরা প্রতিপক্ষের জাহাজ লুট করেছে এমনভাবে, তারপর আর বলার ভাষাটাই থাকে না সেখানে! প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে ও তারপরে হেরে গেলে তবেই-না হতাশা গাঢ় হয়ে মনে জমা হয়। এবার-যে তার কিছু করে দেখাতে পারেননি ফরাসি সেনাপতি!

Tiki-Taka Spain; Image Source & Credit: Collected; opta_analyst.com

স্পেনের এই ফুটবলকে দর্শক কি বলবে সুন্দর? গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ট্রফি ডিফেন্ড করতে নেমে যে-ছকে ফুটবলটা খেলছে এবার, একে ‘সুন্দর শৈল্পিক’ ফুটবলের প্রচলিত সংজ্ঞা ও ধারণার সঙ্গে মনে হয় না খাপ খাওয়ানো যাবে। সাধারণ দর্শক ছাড়াও সমর্থকদের বড়ো অংশকে দলটি খেলার নান্দনিকতা দিয়ে খুশি করতে পারেনি। আলবিসেলেস্তেরা (Albicelestes) ভালো ফুটবল না খেলে বরাতজোরে ফাইনালে চলে এসেছে;—এই অভিযোগ যদি কেউ তোলেন, একে অবান্তর বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। প্রশ্ন হলো, আসলেও কি ভালো ফুটবল না খেলে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ফাইনালে ওঠা যায়? ওঠা সম্ভব? অতীতে কি এভাবে উঠেছে কোনো দল? প্রশ্নগুলোর উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা বরং দলটির ফাইনাল পর্যন্ত চলে আসার ধারাটি দেখে নিতে পারি :

গ্রুপ পর্বে ৩টি দলের সঙ্গে আর্জেন্টিনাকে দর্শক স্বাভাবিক ফুটবলটাই খেলেতে দেখেছে। অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক ফুটবল তারা খেলেনি। অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মকও খেলেনি গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষ দলগুলোর বিপক্ষে। তাদের শক্তিমত্তাকে বিবেচনায় নিয়ে যে-ফুটবলটা খেলা দরকার ছিল,—সেটুকুন খেলেছে দলটি। ডমিনেট করে খেলেনি ফ্রান্সের মতো, আবার গুটিসুটি মেরে কোনোমতে ফল বের করে আনার ফুটবলটাও খেলেনি তারা। মাত্রা বজায় রেখে গোল দিয়েছে, এবং একটা-দুটো গোল হজম করেছে। খেলার ফলাফলে এর প্রভাব থেকেছে গৌণ। নকআউটে এসে ছবিটা বদলে গেল দ্রুত! কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে দলটিকে আজব এক ফুটবল খেলতে দেখল দর্শক! তিনটি দলের রক্ষণদুর্গ ও প্রতি আক্রমণের ধার সামলে খেলতে নেমে তাদের খেলার ছক ভোজবাজির মতো বদলে গিয়েছিল।

দর্শক দেখল, ওরা বিরক্তিকর ফুটবল খেলছে। গোল খেয়ে বসছে গোল দেওয়ার আগে। আগে গোল দিয়ে পালটা গোল হজম করছে পর মুহূর্তে। সেখান থেকে ম্যাচ বের করে আনতে খেলাকে টেনে লম্বা করছে। প্রতিপক্ষের পায়ে যেন মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে বলের নিয়ন্ত্রণটা তুলে দিচ্ছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বল কেড়ে নেওয়ার রীতি বা ওই প্রেসিংটা করছে না। এবং, আজব মনে হবে ভেবে,—খেলা শেষ হওয়ার দশ থেকে কুড়ি মিনিটের ঝড়ো আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গ তছনছ করে ফল বের করে নিচ্ছে! হ্যাঁ, সেখানে লিওনেল মেসির মতো এক অনন্য ফুটবল শিল্পী দানবিক ভূমিকা পালন করেছেন আগাগোড়া, কিন্তু এভাবে তারা খেলছিল কেন? সমর্থক ও ফুটবল দর্শককে অতিষ্ঠ করে এভাবে খেলা বের করে নেওয়ার মানে কি দাঁড়াচ্ছে তাহলে!

এই-যে পুরো নব্বই মিনিট কিংবা প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময়ে খেলাকে টেনে নিয়ে যাওয়া, নিজের সবটুকু শক্তি উজাড় করে খেলতে থাকা প্রতিপক্ষকে হতাশ ও বিভ্রান্ত করে ম্যাচের কিনারায় এসে জয় নিজের পকেটে ভরা… একে এখন কী বলবে দর্শক? বাজে ফুটবল? বিরক্তিকর ফুটবল? শিল্পমেধাহীন ফুটবল? ভাগ্যের জোরে জিতে যাওয়া ফুটবল? নাকি, একালের ভাষায় যেমন বলা হয় ও হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে,—লাতিন ফুটবলে ট্যাঙ্গো নাচের শৈলী দেখাতে পটু আর্জেন্টিনা ছাব্বিশ বিশ্বকাপে বিরক্তিকর হিসাবি ফুটবল খেলে এখন ফাইনালে?

কী উত্তর হতে পারে এর? দলটি কেন এভাবে খেলেছে পুরো বিশ্বকাপ? জবাব নিঃসন্দেহে কোচ স্কালোনি ও তাঁর সহযোগীরা ভালো দিতে পারবেন। ফাইনাল শেষে হয়তো পরিষ্কার করবেন সবটাই। বিশ্বের তাবড় ফুটবলবোদ্ধা ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা তা-বলে বসে নেই। তাঁরা আলবিসেলেস্তেদের এমনধারা খেলার কারণগুলো অনেকটাই বের করে এনেছেন;—এবং সেখান থেকে এই সারনির্যাসটি আমরা পাচ্ছি :

দুইহাজার ছাব্বিশ বিশ্বকাপে যারা গরম, আর্দ্রতা, ইনজুরি ও খেলার কৌশলে প্রতিপক্ষকে ধাঁধায় রেখে খেলেছে, এবং এভাবে নিজের শক্তি জমিয়ে রেখেছিল শেষ দুইয়ে পৌঁছানোর জন্য,—তারাই এখন ফাইনালে। স্পেন ও আর্জেন্টিনা হচ্ছে সেই দুটি দল, যারা প্রায় কাছাকাছি কিন্তু ভিন্ন কৌশলে খেলে গেছে পুরো বিশ্বকাপ।

স্পেন তাদের খেলার ছকে প্রতিপক্ষকে রক্ষণদুর্গে ঢোকার স্পেস বা জায়গাটি পারতপক্ষে দেয়নি। ম্যান টু ম্যান মার্কিং কি করেছে তারা? না;—এর বদলে কোচ এমনভাবে দলকে সাজিয়েছেন,—প্রতিপক্ষ আক্রমণভাগ দিয়ে রক্ষণদুর্গে ঢোকার জায়গা পায়নি খোঁজে! আক্রমণ শানানোর মতো পাস ও ক্রসের পরিসর তারা অচল করে দিয়েছিল। ফলাফল?—ফ্রান্সের মতো দলের নিষ্ক্রিয় হওয়া ছাড়া উপায় থাকেনি। এই স্পেন গোল খেয়েছে কম, প্রতিপক্ষের জালে গোল দিয়েছেও কম। ফলাফল বের করে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গোলের বাইরে ‘হারাম ফুটবলের’ কৌশলকে সূক্ষ্ম চাতুরি খাাটিয়ে ব্যবহার করেছে বিশ্বকাপে। বার্সেলোনার বিখ্যাত টিকি-টাকা ফুটবলের আপগ্রেডেড ভার্সনটা খেলছে মাঠে :

বল পায়ে রাখো। প্রতিপক্ষ বল নিয়ে অগ্রসর হলে বাগাড়া দিতে থাকো, যেন বলের নিয়ন্ত্রণ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে না পারে। আর, ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকো। ওটা আসবেই। ওরা ভুল করবে। ভুলের সুযোগ নাও, এবং প্রতিপক্ষের জালে দরকারি গোলটা দিয়ে ফেলো ঝটপট। ফলাফল হচ্ছে,—নিষ্প্রাণ ফুটবল খেলেও দলটি ফাইনালে।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা খেলে গেছে নিজের একশোটা সীমাবদ্ধতা ‘হিসাবে’ রেখে। উইং দিয়ে আক্রমণ করার মতো খেলোয়াড় তাদের নেই। রক্ষণভাগ স্পেনের মতো জমাট নয়। এমনকি দলটির মূল শক্তিকেন্দ্র মাঝমাঠে সবাই একসঙ্গে জ্বলে ওঠার অবস্থায় ছিল না। ইনুজরির সমস্যায় ভুছিলেন কোচ স্কালোনি। সকল বাধার পাহাড় তারা পার হলো লিওনেল মেসির সৃজনশীল প্রতিভা, দলগত বোঝাাপড়া, আর চাপে ভেঙে না পড়ার অভিনব কৌশলে ভর দিয়ে!

ক্রিকেট-সহ আরো অনেক খেলার মতো ফুটবলে দলগত বোঝাপড়া, মনোবল ও আত্মবিশ্বাস ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে, এবং সেখানে ছাব্বিশ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে থাকবে। নকআউটে আমরা কী দেখলাম? আমরা দেখলাম, তারা প্রতিপক্ষকে খেলতে দিচ্ছে খেলার উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রেখে। প্রতি আক্রমণে প্রতিপক্ষ তাদের জালে গোল ঢুকিয়ে দিচ্ছে ঝটপট। ব্যাকফুটে থেকে খেলার গতি ধীর করে আনছে দলটি। খেলাকে টেনে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাচ্ছে, এবং প্রতিপক্ষকে এভাবে বিরক্তিকর ক্লান্তিতে অবসন্ন ও মরিয়া করে তুলছে দলটি। অতঃপর, খেলা শেষ হওয়ার পনেরো-কুড়ি মিনিট বা আরো কম সময়ে একের-পর-এক আক্রমণে ফলাফল নিজের কোলে টেনে নিচ্ছে তারা! সমর্থকের জান তাতে কয়লা হচ্ছে বটে, দর্শক বিরক্ত হচ্ছে বা দুয়ো দিচ্ছে কোচকে, কিন্তু দলটি জানে ওটা তারা পুষিয়ে দেবে শেষ দশ-পনেরো মিনিটের কামব্যাক দিয়ে।

Leopnel Messi in action against Algeria; Image Source & Credit: Collected; FIFA website

এই ধাঁচের ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যাচের-পর-ম্যাচ কোনো দল এর আগে খেলেছে বলে মনে হয় না। নজির পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফল কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে? ফাইনালে চলে যাওয়ার পর এটুকু পরিষ্কার,—ট্যাঙ্গো ছন্দের স্বাভাবিক ফুটবলের পরিবর্তে হিসাবি ফুটবল থেকে মোক্ষম মেওয়া দলটি তুলে নিয়েছে :

আর্দ্রতার সঙ্গে লড়ে নিজেকে তারা অন্য অনেক দলের মতো ক্লান্ত করেনি। পুরো নব্বই বা একশো কুড়ি মিনিট খেলার পরেও দলটিকে ক্লান্ত মনে হয়নি একবারও। প্রথম বা মাঝখানে ঝড়ো দশ-পনেরো মিনিট খেলে গোল বের করে নেওয়ার পর গোল খেয়ে বসলে, ক্লান্তির কারণে তা ফেরানো শক্ত হয়। আলবিসেলেস্তেরা এই সমস্যায় পড়েনি। শেষের জন্য শক্তি জমিয়ে রেখে পুরোটা উজাড় করে দিয়েছে নকআউটের প্রতিটা ম্যাচে।

ইনজুরির সমস্যা থেকে নিজেকে বের করে এনেছে তারা। যেহেতু, দলে মেসি-সহ একাধিক প্লেয়ার আছেন, বয়সের কারণে ঘোড়ার মতো দৌড়ে দ্রুত অবসন্ন হয়ে পড়াটা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিপদের মুহূর্তে দলকে উদ্ধার করতেন কী করে, যদি দৌড়েই সকল শক্তি ক্ষয় করে বসতেন তাঁরা!

হিসাবি-ছকে মেসির মতো অলৌকিক প্রতিভাকে ব্যবহার করে দলটি যে-ফুটবল খেলেছে, তাকে কি সুন্দর বলা যাবে? প্রচলিত উত্তর অবশ্যই ‘না’ হবে সেখানে। আবার, শেষ দশ-পনেরো-কুড়ি মিনিটে যে-ফুটবলটা আর্জেন্টিনা খেলেছে, একে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবে দর্শক? অসুন্দর ফুটবল? অশৈল্পিক ফুটবল? বিরক্তিকর ফুটবল? তা বলার উপায় কি থাকছে কারো?

পনেরো-কুড়ি মিনিটে আর্জেন্টিনা এমন এক ফুটবল খেলেছে,—একে কী দিয়ে সংজ্ঞায়িত করবে দর্শক? রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, শিহরন ও নাটকীয়তায় খামতি ছিল কি কোথাও? উত্তর স্পষ্ট,—না, খামতি ছিল না। বড়ো কথা, এই দলে একজন লিওনেল মেসি খেলছেন। অপ্রতিরোধ্য ফুটবল শিল্পীর মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতাকে কি করে অস্বীকার করবে দর্শক! খেলার বিউটি টের পেতে তিনি একা বাধ্য করেছেন প্রত্যেককে।

আর্জেন্টিনা বোঝা গেল সেই দল হয়ে ছাব্বিশ বিশ্বকাপে এসেছে, হাওয়া অনুকূল দেখলে তারা লাতিন ছন্দে খেলে, মুসিবত খাড়া হলে ধীরগতির ফুটবল থেকে শুরু করে ডার্টি ফুটবল খেলতেও পিছপা হয় না। এরকম কৌশলে তারা খেলতে পেরেছে মূলত দলগত সংহতি ও লিওনেল মেসির মতো বিরল প্রতিভা দলে থাকার কারণে। মেসি না থাকলে স্কালোনির এই দলটি হয়তো অন্যছকে খেলত বিশ্বকাপ।

‘সুন্দর ফুটবলের’ সংজ্ঞাকে স্পেন ও আর্জেন্টিনা সুতরাং দুইহাজার ছাব্বিশ বিশ্বকাপে অনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেসব দল এমনকি তাদের সামর্থ্য জেনে বড়ো দলের সঙ্গে লো ব্লক ডিফেন্সের প্রাচীর তুলে খেলেছে, তাদের খেলাকে বিরক্তিকর ভাবার কারণ কি থাকে দর্শকের? রক্ষণভাগের শৈল্পিক মহড়া দিয়েই-তো কেপ ভার্দে ও ডি আর কঙ্গো দর্শক মাতিয়েছে এবার। মিশর ও মেক্সিকো যে-ফুটবলটা খেলেছে, সেখানে উপভোগ্যতায় কমতি থাকার অভিযোগ হ্যাসকর নয় কি?

এরচেয়েও বড়ো প্রশ্ন উঠানো যায় বোধহয়,—সুন্দর ফুটবলের ধরাবাঁধা সংজ্ঞায় স্থির থাকতে হবে কেন? কোন দুঃখে অন্য দল ব্রাজিলের ওই জোগো বনিতা খেলতে যাবে, যেখানে ইউরোপে খেলাটির বিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে স্বয়ং লাতিন দেশগুলোকে? আর্জেন্টিনা খেলবে তার চিরাচরিত ফুটবল খেলার ঐতিহ্য ও পরিবর্তীত বাস্তবতা মাথায় নিয়ে। ব্রাজিল বা অন্যরাও তাই। ‘মান’ এখানে চাপানোর বিষয় নয় একদম। কথার কথা, আফ্রিকার ফুটবল এবার যে-কৌশলে খেলেছে, সেখানে অ্যাথলেটিক স্কিলকে উপেক্ষা করা মানে একটা মহাদেশে আসন্ন ফুটবল বিপ্লবের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখছি আমরা। ক্যানভাসে ছবি অনেকভাবে আঁকা যায়। সবটাই ক্লোদ মোনে বা সালভাদর দালির মতো হওয়া জরুরি নয়। একটা ‘মান’ এভাবে চাপানোর মধ্যে বরং ‘পুনরাবৃত্তি’র বিপদ লুকিয়ে থাকে। যারা ‘সুন্দর শৈল্পিক ফুটবল’ বলে হামেশা চিল্লান, তারা হয়তো ‘জোগো বনিতা’য় এমনভাবে আটকা পড়েছেন,—আজো সেই খোঁয়ারি কাটছে না তাদের!

ফুটবলটাও সময়ের পালাবদলে বিচিত্র ছবি আঁকছে ও সামনে আঁকবে। ছাব্বিশ বিশ্বকাপ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে,—বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা ডমিনেট করে খেলা অবশ্যই ভালো, তবে মাঝেমধ্যে হারতে বা জোর ধাক্কা খেতে হয়। নকআউটের আগে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ওটা চুকেবুকে গেলে ভালো। স্পেন যেমন আর্জেন্টিনার মতো গ্রুপ পর্বে চাপটা সামলেছে স্নায়ু শীতল রেখে। ওরা জিতবে না তো কি জিতবে ফ্রান্স!

FIFA 2026 World Cup Matches in USA; Image Source & Credit: Collected; Share America

চাপ সামলানোর প্রশ্নে স্পেন ও আর্জেন্টিনা ভিন্ন ছাঁচে গড়া এবার। স্পেন স্নায়বিক চাপ সামলে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে চুপিচুপি। সতর্ক শিকারির মতো;—যতক্ষণ-না ভুল করছে শিকার। আর্জেন্টিনা চাপ সামলায় চিরাচরিত লাতিন আবেগের পালে হাওয়া দিয়ে। দলনেতার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়ে যাওয়ার মন্ত্র মাঠে ওদেরকে তাতিয়ে রাখে। এবং, তা হতে পারে দশ-পনেরো মিনিট, তার মধ্যেই তছনছ হয়ে যায় প্রতিপক্ষ-দুর্গ। ফ্রান্সে এ-দুটোর কোনোটাই ছিল না। ওরা নেপোলিয়ন হয়ে নেমেছিল স্পেনের বিপক্ষে। ভেবেছিল,—সহজে ঢুকে পড়বে দুর্গে। নেপোলিয়ন তো এভাবে হেরে গেছিলেন ওয়াটারলুর যুদ্ধ;—ইংরেজদের কাছে। ফরাসিদের বুঝি স্মরণে ছিল না তা!

এটা জানা ছিল মনে-মনে,—উড়ন্ত ফ্রান্সকে একটা খারাপ দিনে ঠিক মাটিতে নামিয়ে আনবে প্রতিপক্ষ। আর, এই বিশ্বকাপে তা করে দেখানোর এলেম কেবল ওই স্পেন ও আর্জেন্টিনার রয়েছে। বাকিরা হিসাবের বাইরে! দল দুটি জানে, নেপোলিয়ন সেনাদের কোন জায়গায় চেপে ধরলে ওরা মুখ থুবড়ে বসে পড়বে মাঠে। স্পেন এখানে পাক্কা মানি হাইস্ট ছিল তা মানতে হচ্ছে। ‘বিদায় রূপসী’ গাইতে গাইতে সব লুটে নেওয়ার ছলাকলায় ওস্তাদি দেখিয়েছে তারা। আর্জেন্টিনা সেখানে দানবিক আবেগ ও দলগত উজ্জীবনায় গুঁড়ি দিয়েছে প্রতিপক্ষ শিবির।

সেমির মহারণে নামা ফ্রান্স সেখানে কেমন ছিল? তাদের দেখে মনে হয়েছে,—দেরিদার ওই রিডিং স্পেস বিটুইন দ্য লাইন তারা খুঁজে পাচ্ছে না মাঠে! প্যারাগুয়ে এমবাপ্পেদের ফিজিক্যাল ও মিড ব্লক ডিফেন্স দিয়ে পরীক্ষা নিয়েছিল ভালোই। এখন সেটা নিয়ে দলটি পরে আর কাজ করেনি। করাটা ভালো ছিল, যেহেতু সামনে স্পেনের মতো প্রতিপক্ষ পড়তে পারে, এটা কোচের হিসাবে না থাকার কথা নয়।

এই স্পেন, এই মানি হেইস্টের ছলাকলায় চতুর দলটিকে হিসাব ও ভিতরের বোঝাপড়া বলছে,—একমাত্র আর্জেন্টিনা ‘ধরলেও ধরতে পারে’ হাতেনাতে। দুটি দল ফিনালেসিমা খেলেনি। কৌশলে এড়িয়ে গেছে। নকআউটে উঠার পথে স্পেন সুকৌশলে এড়িয়েছে ম্যাচের পর ম্যাচ সংগ্রাম করতে থাকা আর্জেন্টিনাকে। কেননা, স্নায়ুচাপ সামলে একটানা খেলে যাওয়ার প্রশ্নে দুটি দল সমানে সমান। ফ্রান্স এতটা লম্বা সময় খেলার পরীক্ষাই দেয়নি বিশ্বকাপে। দারুণ শক্তিশালী ইংলিশরা বরং এগিয়ে ছিল তাদের থেকে। আর্জেন্টিনার মতো খুঁড়িয়ে ম্যাচ পার হওয়া দলটাকে তবে ‘ধরলেও ধরতে পারে’ বলছি কেন? ফলাফল যাই হোক, দুটো কারণ আপাতত খোলাসা করে যাই আজ রাতের ম্যাচের আগে :

প্রথমত, এই দলটি পুরো বিশ্বকাপ লো ব্লক, মিড ব্লক, আর গোল খাওয়া ও ম্যাচে ফেরত আসার পরীক্ষা দিয়ে সেমিতে উঠেছিল। হার না মেনে রেজাল্ট বের করেছে শেষপর্যন্ত। তাও এমনভাবে, যেখানে তাদের ট্যাকটিক্সের আগামাথা দর্শকের বোধগম্য নেই আর!

স্পেনের পক্ষে এই জায়গাটি, মানে আর্জেন্টিনা কোন ছকে খেলতে পারে, সেটা ঠাহর করা কঠিন থাকছে। মেসির পজিশন কী হবে? অগোছালো মাঝমাঠ, দুর্বল উইং, আর নড়বড়ে রক্ষণভাগকে ঠিক কোন ছকে লণ্ডভণ্ড করা যায়… এই ভাবনা স্পেনকে পেরেশান রাখবে।

মনে রাখা প্রয়োজন,—অগোছালো এই আর্জেন্টিনা তারপরেও গোলের পর গোল বের করে নিয়েছে বিশ্বকাপে। নিজে গোল দিয়েছে, গোল খেয়েছে পর মুহূর্তে, এবং সেখান থেকে ম্যাচকে কঠিন বানিয়ে রেজাল্ট বের করে নিয়ে তবে মাঠ ছেড়েছে তারা। সোজা কথায় একটা ক্যাওস ও জুমলা বানিয়ে ম্যাচ বের করে নেওয়ার আজব কৌশলে খেলেছে দলটি! এটা এখন স্কালোনির মাথা থেকে বেরিয়েছে, নাকি আপনা-আপনি মাঠে হয়ে যাচ্ছে মেসির প্রেরণায়… তা বোঝার সাধ্য দর্শকের নাই। এরকম বিশৃঙ্খলাকে ছকে ফেলে নিয়ন্ত্রণ করবে কে? ফুয়েন্তকে এখানে ধাঁধায় রাখছেন তাঁর থেকে অনেক সবক নেওয়া লিওনেল স্কালোনি।

সে যাইহোক, ‘সুন্দর ফুটবলের’ ধরাবাঁধা মিথকে ছাব্বিশের আসর আরো একবার জোর ধাক্কাই দিয়ে গেল মনে হচ্ছে। স্মৃতিকাতর যারা সুন্দর ফুটবল দেখার জন্য কাতর, তাদের সঙ্গে এখানে আবার নিয়মিত ও মৌসুমি দর্শকের বিভাজন দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্বকাপ। দেখাচ্ছে,—ফুটবল অদ্য যতটা মাঠে হয়, মাঠের বাইরে কোচ কীভাবে কৌশল সাজাচ্ছেন তার ওপর সফলতা নির্ভর করে অনেকখানি।

Lionel Andrés Messi: One Last Dance; Image Source & Credit: Collected; Google Image

এবং, এটা সেই বিশ্বকাপ, যে-বিশ্বকাপ গত দুই দশক ধরে ফুটবলকে বর্ণিল করে রাখা একঝাঁক তারকার বিদায়বিধুর সুরে সকরুণ থাকছে। একটা প্রজন্ম মোটের ওপর এই বিশ্বকাপ দিয়ে ক্যারিয়ারে ইতি টানছেন। লিওনেল মেসির মতো মহাতারকা হয়তো শেষবার দলের হয়ে মাঠে নামবেন আজ। খেলাটির আপাত সর্বশেষ, এবং হয়তো সকল তর্ক ছাপিয়ে তিনিই GOATতো, সেই লিওনেল মেসিকে আর দেখবে না অগামীর কোনো বিশ্বকাপ!

জীবন তাঁর কানায়-কানায় পরিপূর্ণ। আজকের ফাইনালে যদি আর্জেন্টিনা জিতে, ফুটবলশিল্পীর ঝুলিতে নতুন করে কিছু যোগ হবে এমন নয়। ওটা পরিপূর্ণ থাকছে কানায়-কানায়। যদি হারেন, তাতেও ক্ষতি নেই। দর্শকের জন্য কেবল থাকবে ‘শূন্যতা’;—আরো অনেকদিন এক শিল্পীকে তারা মাঠে খুঁজে বেড়াবে। খেলাটির আরো কিছু বড়ো মাপের চিত্রীরা নিয়েছেন বিদায়। ছাব্বিশ বিশ্বকাপ নেইমার, রোনালদো, হ্যারি কেইন, লুকা মদ্রিচদের মতো স্বর্ণালী প্রজন্মের বিদায় নেওয়ার বিষাদে ভারাতুর থাকছে। ফুটবল মাঠে নিজের জাদু দেখানোর ভার লামিন ইয়ামালদের হাতে পড়তে যাচ্ছে সামনে।

সে যাকগে, স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে যে-দলটাই জিতুক, সব ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠুক লিওনেল মেসি। তাঁর ক্যারিয়ারে এটা শেষ বিশ্বকাপ। হারজিত ছাপিয়ে ফুটবলের এই মহান শিল্পী-প্রতিভাকে যেন সকলে জানাই কুর্নিশ। মারাদোনা পায়নি কুর্নিশ। শেষ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ দারুণ খেলার পরে এসেছিল নিষেধাজ্ঞা। জিদানও পায়নি লাল কার্ডের খাড়ায় পড়ে। মেসি যেন পায় প্রাপ্য সম্মান, তা সে ভালো খেলুক বা নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে একটা বাজে দিনের পাল্লায় পড়েছে বলে মনে হোক দর্শকের।

‘সুন্দর, অপূর্ব, শৈল্পিক’ ফুটবলকে অমীমাংসিত প্রহেলিকা ভেবে ফাইনালের মহারণটা লিওনেল মেসির জন্য উপভোগ করা উচিত হবে দর্শকের। এই মেসির আজ ভালো খেলা বা না খেলাটা অবান্তর থাকবে। বড়ো হয়ে উঠুক,—ফুটবলের এক মহান শিল্পীকে শেষবারের মতো মাঠে হেঁটে ও দৌড়াতে দেখার রোমাঞ্চ। আজকের ব্যাটলটা তোলা থাক মহাকাব্যিক এই শিল্পীর জন্য শুধু! যিনি হয়তো আধুনিক ফুটবলের সাংঘাতিক মাত্রার ‘হিসাবি ছকে’ সকল তর্ক ছাপিয়ে ‘সুন্দর শৈল্পিক ফুটবল’ নামক ‘অমীমাংসিত রমণী’র শেষ উপমা হয়ে আজ মাঠে নামছেন।
. . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা

খেলা কি শুধু মাঠেই গড়ায়? : সুমন বনিক

সমাজ-মনস্তত্ত্বে ফুটবল বিশ্বকাপ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

পিয়ের পাওলো পাসোলিনির ‘ফুটবল’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

নেটালাপ : ফুটবল মেরুকরণে ‘আফ্রিকা’ ও ‘লাতিন’

কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক

আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার

‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার

‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *