পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

মানুষ ও মহাশূন্য : আবিদ ফায়সাল

Reading time 6 minute
5
(17)
Prometheus (1909); Artist: Otto Greiner; Image Source & Credit: Wikipedia

প্রথম আগুন

যেদিন মানুষ প্রথম আগুন জ্বালাল
সেদিন অন্ধকারের বুক
থেকে একটি লাল পাখি উড়ে গিয়েছিল।

সেই পাখির নাম ছিল সভ্যতা।

কিন্তু আগুনেরও ছায়া থাকে।

মানুষ তখনও জানত না—
প্রতিটি প্রদীপের নিচে
একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ ঘুমিয়ে থাকে।

আদমের প্রথম কান্না,
প্রমিথিউসের প্রথম চুরি,
ঋগ্বেদের প্রথম স্তোত্র,
গুহাচিত্রের প্রথম হরিণ—

সব মিলে পৃথিবী ধীরে ধীরে
একটি দীর্ঘ প্রশ্নে পরিণত হলো।

মানুষ কে?
. . .

ঘর ও বাড়ি

মানুষের কাঁধে কাঁধে দেশ ভেসে যায়।

শিশুর পকেটে ভাঁজ হয়ে থাকে
একটি পুরোনো মানচিত্র।

সীমান্তরক্ষীরা ঘুমিয়ে পড়লে
নদীরা রাতের অন্ধকারে দেশ বদল করে।

ঘরগুলো পাখি হয়।
বাড়িগুলো দুর্গ হয়।

দুর্গগুলো কারাগার হয়।
কারাগারগুলো রাষ্ট্র হয়।

রাষ্ট্রগুলো একদিন
নিজেদের মানচিত্রের ভিতর
নিজেরাই হারিয়ে যায়।
. . .

স্মৃতি ও বিস্মৃতি

ম্নেমোসিনের১ ভাঙা কলস থেকে জল ঝরে পড়ে।

মিমিরের কূপে আজও একটি চোখ ডুবে আছে।

সেডনা সমুদ্রতলে চুল আঁচড়ান।

গিলগামেশ মৃত বন্ধুর নাম ধরে ডাকেন।

পৃথিবীর সমস্ত নদী আসলে স্মৃতির দীর্ঘ বাক্য ছিল।

মানুষ একে একে পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে দিল।

এখন নদীগুলো সমুদ্রে
পৌঁছানোর আগে নিজেদের
নাম ভুলে যায়।
. . .

শব্দ ও নীরবতা

বাবেলের ভাঙা ইটের ফাঁকে ফাঁকে ভাষা জন্ম নেয়।

সরস্বতী বীণার তারে অক্ষরের বীজ বুনে দেন।

থথ২ চাঁদের আলোয় প্রথম বাক্যটি লিখে রাখেন।

অক্ষরগুলো বিদ্রোহ করে।

তারা অভিধান ছেড়ে পালায়।

রাষ্ট্রেরা শব্দ কিনতে থাকে।
বাজারেরা অর্থ কিনতে থাকে।

শেষপর্যন্ত
শুধু নীরবতাই নিজের ভাষা রক্ষা করতে পারে।
. . .

নদী ও মানচিত্র

আমাজনের বুকে মানুষ কুড়াল চালায়।

প্রতিটি পতিত বৃক্ষের গায়ে
একটি মুদ্রার চিহ্ন জন্ম নেয়।

আর্কটিক ছিল পৃথিবীর স্মৃতি।

মানুষ তাকে পণ্য বানিয়েছে।

একদিন
শেষ হিমবাহটি গলে যাওয়ার আগে বলে—
আমি আসলে জল নই।

আমি সময়।
. . .

মানুষ ও মুখোশ

শহর জ্বলছিল।

রুটির চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল গুজব।

সমুদ্রের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল উদ্বাস্তু মানুষের সারি।

তবু—
একটি শিশু নিজের রুটির অর্ধেক আরেক শিশুকে দেয়।

সেই মুহূর্তে
সমস্ত ধর্মগ্রন্থ নিজেদের নতুন করে লিখতে শুরু করে।
. . .

Thoth: Egyptian God eith Ibis-head; Image Source & Credit: Wikipedia

ঘড়ি ও কাল

ক্রোনোস, মহাকাল, শিবের তাণ্ডব।

ক্রোনোসের বালুঘড়ি থেকে বালি ঝরে পড়ে।

মানুষ প্রতিটি কণা গুনে রাখে।

কিন্তু আকাশে প্রথম তারা উঠলে
সে আর মাথা তোলে না।

সে বয়স গুনতে শিখেছে।

কিন্তু জীবন নয়।
. . .

দেবতা ও মানুষ

একদিন ওডিন, জিউস, শিব, রাবণ, প্রমিথিউস, সেডনা, কোয়েটজালকোয়াটল ও অনুবিস
একই নক্ষত্রমণ্ডলের নিচে জড়ো হলেন।

তারা দেখলেন—
মানুষ তাদের ছাড়িয়ে গেছে।

ওডিন দেখলেন—
মানুষ নিজেই বজ্র নির্মাণ করেছে।

শিব দেখলেন—
মানুষ নিজের জন্য নতুন প্রলয় রচনা করেছে।

অনুবিস দেখলেন—
মৃতদের স্মৃতি এখন সিলিকনের ভিতর বাস করে।

দেবতারা তখন বুঝলেন—
সৃষ্টি তাদের হাত ছেড়ে মানুষের হাতে চলে গেছে।

মানুষ নতুন ভাষা সৃষ্টি করে
নতুন সূর্যের মানচিত্র আঁকে
মৃতদের স্মৃতি সিলিকনে সংরক্ষণ করে।

দেবতারা তখন নিজেদের অবসরের আবেদন লেখেন।
. . .

পৃথিবী ও নক্ষত্র

মানুষের পদচিহ্ন লাল ধুলোয় শুকিয়ে থাকে মঙ্গলে।

ইউরোপার বরফের নিচে প্রথম মানবস্বপ্ন ঘুমিয়ে পড়ে।

টাইটানের আকাশে পৃথিবীর শেষ লোকগান ভেসে যায়।

মানুষ পৃথিবী ছেড়ে যেতে পারে।

নিজেকে কি ছেড়ে যেতে পারে?
. . .

বিচার ও ক্ষমা

কোনও ঈশ্বর বিচার করবেন না।

কোনও ফেরেশতা নয়।

কোনও যমদূত নয়।

মানুষের বিচার করবে—

একটি নদী।

একটি বৃক্ষ।

একটি মৃত ভাষা।

একটি অনাথ শিশু।

একটি বিলুপ্ত পাখি।
. . .

মানুষ ও মানুষ

মহাবিশ্বের শেষপ্রান্তে
একজন বৃদ্ধ বসে আছেন।

তার পাশে একটি শিশু।

বৃদ্ধটি মানুষের অতীত।

শিশুটি মানুষের ভবিষ্যৎ।

তারা একই আগুনের সামনে বসে আছে।

শিশুটি জিজ্ঞেস করে—
মানুষ কী?

বৃদ্ধটি দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে বলেন—
মানুষ হলো সেই প্রাণী
যে বারবার দানব হয়ে ওঠে
বারবার দেবতা হতে চায়
আর সমস্ত ব্যর্থতার পরেও
কারও হাত ধরার চেষ্টা ছাড়ে না।

তারপর
পৃথিবীর সমস্ত মৃতেরা
সমস্ত জীবিতেরা
সমস্ত অনাগতেরা
একসঙ্গে উচ্চারণ করে—

আমরা মানুষ।
. . .

Mnemosyne tempted by Jupiter; Artist: Jacob de Wit (1727); Image Source & Credit: Wikipedia

ফু ট নো ট
১. ম্নেমোসিন (Mnemosyne) গ্রিক পুরাণে স্মৃতির দেবী হিসেবে বর্ণিত। অতীতস্মৃতি ও তা সংরক্ষণ করেন এই দেবী। তাঁর নামের উচ্চারণ ও বানান ভাষাভেদে ভিন্ন হলেও, ইংরেজি উচ্চারণে নামের আদ্যাক্ষর এম ঊহ্য ধরে নেমোসাইন/ নেমেসিন/ নেমোজিনি ইত্যাদি ব্যবহার প্রচলিত।

২. থথ (Thoth), মিশরীয় পুরাণে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা। মিশরীয় দেয়ালচিত্রে মানবদেহধারী থথ-এর দেহের উপরিভাগে আইবিস পাখির মাথা সংযুক্ত দেখা যায়। তাঁকে জাদুবিদ্যা ও চাঁদের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ও এর নিয়ন্ত্রক রূপেও গণ্য করা হয়।

. . .

লেখক পরিচয় : আবিদ ফায়সাল

হাওর পরিবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে আবিদ ফায়সাল-এর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কবিতাচর্চা এবং বিচিত্র স্বাদের লেখালেখি, সম্পাদনা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতায় নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন। প্রকাশিত কবিতাবইয়ের মধ্যে ‘ঘর, কেন বাড়ি ছেড়েছিলে’, ‘মানুষ হবার আগে গ্রামে যেতে হয়’, ‘লবণের অস্থিমজ্জা’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

লেখক-জীবনের গোড়া থেকে সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নিজের চর্চার বিষয় করেছেন আবিদ ফায়সাল। সিলেটের অন্যতম গুণী মোহাম্মদ হারিছ আলী’র জীবনালেখ্য নিয়ে লিখেছেন ‘সিলেট চরিতকথা’।

সময় ও পরিপার্শ্ব যাপনের অভিজ্ঞতা নিজের বীক্ষণ ও ভাবনায় ধারণের তাগিদে কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও সাবলীল আবিদ ফায়সাল। ‘গদ্যনমস্কার’ ও ‘কথারা বাদাম ভাঙে’ উল্লেখযোগ্য গদ্য সংকলন। তাঁর গদ্যের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করানোর মানসে ‘কথারা বাদাম ভাঙে’ বইয়ের মুখবন্ধে সালেহ মাহমুদ রিয়াদ লিখেছেন :

আবিদ ফায়সাল কথার বাদাম ভাঙতে গিয়ে সমকাল-মানব-কথন এবং সমাজ- সংসার-বিধৌত প্রাণপুঞ্জের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গের পরিকাঠামো মুক্তগদ্যের কাব্যসুষমা এবং সংহত বাকপ্রপঞ্চে স্থাপন করেছেন। তাঁর গদ্যভাষ অবিরত অপরিমিত মৌলমেধার সহজাত আভাস।

বর্তমানে কানাডা প্রবাসী কবি ঘুরতে পছন্দ করেন। ভিনদেশি মেঘ দেখার টানে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরেছেন। ‘নেপাল দার্জিলিং নমস্তে’, ‘ভুটান, অজানা উঠানে’, ‘মণিপুর অল্পদূর’ শিরোনামে প্রকাশিত বইগুলোয় ভিনদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সুখপাঠ্য গদ্যভাষায় তুলে ধরেছেন এই কবি।

আবিদ ফায়সালের কবিতারা সময়-সচেতন ভাষায় কথা বলে। অতীত ও বর্তমানে গমনাগমনের মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর কবিতাসেতু। নব্বই ও পরবর্তী দশকসীমায় যেসব কবি কবিতা লিখছেন নিয়মিত, বিশেষত সিলেট অঞ্চলের অগ্রজ, সমসাময়িক ও অনুজ কবিদের মধ্যে আবিদ ফায়সালের কবিতাভাষা পৃথক গন্তব্য খুঁজে ফিরেছে। তাঁর এই অন্বেষণে নব্বইয়ের সহজাত আড়াল ও অন্তর্মগ্নতাকে কম প্রাধান্য দিয়েছেন কবি।

আবিদ ফায়সালের কবিতারা পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে প্রবলভাবে বেছে নিয়েছে মিথরঞ্জিত নানা অনুষঙ্গ। জফির সেতু ও হেলাল চৌধুরীর মতো তাঁর কবিতাও মিথলগ্ন। মিথের এই প্রয়োগ মূলত এজন্য-যে, ব্যক্তিকবির আয়নায় মানবরচিত সভ্যতার বিবর্তন ও পরিণামটা এভাবে পাঠ করতে আগ্রহী এই কবি।

গ্রিক মিথের পাশাপাশি লোকায়ত অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় বড়ো জায়গা নিয়েছে। দৃশ্যব্যঞ্জনা তৈরির ভিতর দিয়ে মানব-অভিজ্ঞতাকে যাপন ও পাঠকের জন্য বার্তা রেখে যায় এসব কবিতা। আপাত সর্বশেষ কবিতাবই ‘লবণের অস্থিমজ্জা’র ‘ছাইফুল’ কবিতাটি যেমন এর দৃষ্টান্ত গণ্য হতে পারে। কবি সেখানে লিখছেন :

ভোর হলে
চড়ুইরা খড়ের গাদায় রেখে যায়
কয়েকটি সোনালি নিশ্বাস।

মা সেগুলো কুড়িয়ে শিলপাটায় বাটে;
গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তুলসীতলার শিকড়ে।

সেই গন্ধে একটি অন্ধ কেঁচো মাটি সেলাই করে
একটি শামুক তার পিঠে বয়ে আনে
বর্ষার প্রথম দুধ।

বিকেলের শেষে
গোলাঘরের দরজায়
কে যেন নিঃশব্দে একমুঠো খোসা রেখে যায়—

গ্রামের বুড়িরা বলে,
এসব অন্নদাসীর পায়ের ধুলো, ফেলে দিতে নেই।

রাতে চুলোর ছাই উসকে দিলে জেগে ওঠে,
ধানের পোয়াতি ছায়া।

মা, এক চিমটি সেই ছায়া
আমার থালায় দিয়ো।

মানুষ সবসময় ভাতে বাঁচে না—
কখনও কখনও একমুঠো বিশ্বাসেও
মোরগসকাল ডেকে ওঠে।

Books, written by Abid Faysal; Collage; Image Source & Credit: Author; @thirdlanespace.com

তিন-দশকি কবিতাযাত্রায় কবি আবিদ ফায়সাল মানবজন্ম যাপনের উদ্দেশ্য ও পরিণাম নিয়ে গোড়া থেকে প্রশ্নশীল। একটা দার্শনিক মীমাংসায় পৌঁছানোর তাড়না তাঁর কবিতাভাষাকে অনেকখানি দখলে রাখে। যেমন, ‘ছায়াফুল’ কবিতাটি ২০২৬-এ কবি লিখছেন, যেখানে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞানে মুদ্রিত মানবজীবন ও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মিথের ভাঙনটা পাঠকের নজর এড়ায় না। কবি, তথাপি ওই মিথকে অন্তরে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি ধরেন। ‘একমুঠো বিশ্বাস’ যে-কারণে একটা প্যারাফ্রেজ হয়ে তাঁর কবিতার মৌল প্রবণতাকে শাসন করে। প্যরাফ্রেজটা একদশক আগে প্রকাশিত কবিতাবই ‘মানুষ হবার আগে গ্রামে যেতে হয়’-এ মুদ্রিত ‘টেড হিউজের কাক’ কবিতার দৃশ্যব্যঞ্জনায় খুঁজে পায় পাঠক। কবি সেখানে লিখেছেন :

দাদিবুর কাক
হয়ত বৈনারি তার
তারপরও
বাস্তবে কাককে আর কতটা স্বজন ভাবতে পারি?
তবু যত্ন করে ধরে নিয়ে এসে ঘরে আত্মীয় তোয়াজ করে
দুধকলা-শস্যদানা খেতে দিই
আদরে-পোষণে বাঁচিয়ে রাখতে চাই;
কিন্তু সে কিছুই ছোঁবে না এবং
দানাপানি ছাড়া একদিন দাদিবুর মতো সে-ও মৃত্যুর বান্ধবী

আমরাও দু-দশদিন পর ভুলে যাই কাকজ বেদনা
টেড হিউজের কাক হলে অমরতা পেত

মিথের ভাঙন ও তাকে খুঁজে ফেরার এই পিছুটান আবিদ ফায়সালের কবিতায় সহজাত। বলা প্রয়োজন, এটা তাঁর কবিতাস্বরকে অনেকখানি নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে সময়-সচেতন অন্যস্বরের কবিতাও তিনি লিখেছেন। ব্যক্তিকবির অন্তর্মগ্ন স্বর ছাপিয়ে সামষ্ঠিক মানব-যাপনের অনুষঙ্গে নিজেকে বিদীর্ণ করার তাড়না সেখানে দুর্লভ নয়।

‘সীমানা’, ‘কাঁটাতার’, ‘বিভেদ’, ‘বিচ্ছিন্নতা’র রাজনীতি বর্তমানে যে-ভাষা ও বয়ানের মধ্য দিয়ে বিশ্বে অবিরত প্রাসঙ্গিক ও অমোঘ করে তোলা হয়েছে, আবিদ ফায়সালের কবিতাস্বর শুরু থেকে এর প্রতিরোধী। তাঁর কাছে এই রাজনীতিটা মূলত মানুষকে ‘না-মানুষ’-এ রূপান্তরিত করার ছল হয়ে ধরা দিয়েছে :

মাঝখানে রাগি কাঁটাতার

অভিশপ্ত এই না-মানুষ—
সীমান্তে কপাল ঠুকে-ঠুকে
অশ্রু অস্ত্র করে ফেলি

কবিতাভাষায় নিজের সংক্ষোভ তিনি যেভাবে তুলে ধরেন, এটা এখন নব্বই পূর্ব কবিতার কুললক্ষণের সঙ্গে তাঁকে একাত্ম করেছে। গ্রাম ও শহর যাপনের অভিজ্ঞতায় ধস নামার সংবাদ পাঠককে কবি শুরু থেকে দিয়ে চলেছেন। এটা তাঁর কবিতাস্বরকে নিরাশাঘন করার কথা ছিল, কিন্তু ভেঙে পড়া ধসে পড়া অনুষঙ্গকে নিজের ‘একমুঠো বিশ্বাস’ ভেবে হৃদয়ে ধারণের তাড়না নিরাশা থেকে নিষ্ক্রমণ নিতে তাঁকে সাহায্যও করেছে।

মানব-যাপন কি নেতিবাচক?—প্রশ্নটার উত্তর কাজেই আবিদ ফায়সালের কবিতায় অমীমাংসিত। মানুষের অগ্রযাত্রায় অজস্র নেতিবাচক ভিড়ের দেখা মিলছে, কবি তবু বিশ্বাস রাখেন এই মিথরঞ্জিত আবেগে-যে,—ধসের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা শেষ মানুষটিও উঠে দাঁড়ায়, এবং সে আঁকড়ে ধরে এমন কারো হাত, যে তাকে নিরাময়ের আশ্বাস দিতে পারবে। তাঁকে, সুতরাং ফিরে-ফিরে উঠে দাঁড়ানোর আন্তনাদ জানান দিতে হয় কবিতায়…

শিশুটি জিজ্ঞেস করে—
মানুষ কী?


বৃদ্ধটি দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে বলেন—
মানুষ হলো সেই প্রাণী
যে বারবার দানব হয়ে ওঠে
বারবার দেবতা হতে চায়
আর সমস্ত ব্যর্থতার পরেও
কারও হাত ধরার চেষ্টা ছাড়ে না।

. . .

আবিদ ফায়সাল : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 17

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *