পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’তে কবির অনন্তযাত্রা

Reading time 5 minute
4.9
(19)
Rotho Rafi (1975-2026); Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

রথো রাফির সঙ্গে ব্যক্তিগত চেনাজানা ছিল না। সমাজমাধ্যমের বিচিত্র ভিড় ও হট্টগোলের মধ্যে বসে ‘একলা’ একটা মানুষের ‘কেবল ওই’ কবিতামগ্ন যাপনের কারণে তিনি অচেনা থেকে অনেকখানি চেনা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর স্বাতন্ত্র্য বুঝে নিতে ফেসবুক ভূমিকা রেখেছে বৈকি। ছোটকাগজ ‘গাণ্ডীব’ ও শাহবাগের লেখক সার্কেলে নিজের মর্জি মেনে জড়িত ছিলেন বলে শুনেছি। এর ছাপ মনে হচ্ছে ফেসবুকে তাঁর কবিতা-যাপনের মধ্যেও খুঁজলে মিলবে। নিজের লেখা কবিতায় ভিন্নস্বর, এবং বিশ্বকবিতার নিবিড় পাঠ ও ভাষান্তর মিলে ‘যাপন’টা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।

নব্বই ও শূন্য দশকি কবিদের বাড়াবাড়ি ভিড়ে ‘স্বতন্ত্র’ একজনকে হারানোর শূন্যতা কি মনে অনুভূত হচ্ছে? অনেকে তাঁকে চিনতেন সমাজমাধ্যমে কবিতা-যাপনের খুঁটিনাটি নিয়ে নিয়মিত থাকার কারণে, এবং অনেকের কাছে তথাপি ছিলেন অপিরিচিত হাইফেন! তো সেই রথো রাফি তাঁর প্রথম ও একমাত্র কবিতাবই ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’ বের করেছিলেন মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে বিপর্যস্ত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে দাঁড়িয়ে। কুড়ি বছর ধরে লেখা কবিতা একটা বইয়ের মলাটে জায়গা দিয়েছিলেন কবি। অনেকগুলো বইয়ের বদলে একটা বইয়ে কবিতা-যাপনের অভিজ্ঞান ধরতে চাওয়া বিরল ঘটনা। বইটি, যতদূর মনে পড়ছে, করোনা অতিমারির সময়ে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কবি। চারশো পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যাওয়া কবিতাবইটি সংগ্রহ করা হয়নি তখন।

পরে আর স্মরণে থাকেনি,—গৎবাঁধা কবিতাবই প্রসবের ধারায় ব্যতিক্রম বইটি অন্ততপক্ষে একটিবার হাতে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এর একটা কারণ হয়তো এই,—ফেসবুক ও অনলাইন পোর্টালে তাঁর নিজের লেখা কবিতা ও ভিনদেশি কবিতার ভাষান্তর বেশ নিয়মিত চোখে পড়ত। ফেসবুকের পরিসরকে ‘কেবল কবিতা এবং কবিতার জন্য’ আর কোনো কবি এভাবে এইমাত্রায় ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নেই। অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর ফেসবুক পোস্টগুলো কবিতাকে যাপন করেছে নিয়মিত।

এটা বেশ বিস্ময়কর লাগছে ভেবে,—ফেসবুকের মতো একটা মাছের বাজারে রথো রাফি যাপন করেছেন সাচ্চা কবিতাকর্মীর জীবন। অনুসারী অথবা বন্ধুজনের মধ্যে কতজন তাঁর এই যাপনকে পাঠ করছেন আক্ষরিক, কতজন না পড়ে লাইক-কমেন্ট ইত্যাদি মেরেছেন হামেশা… এসব নিয়ে তাঁকে কখনো বিচলিত মনে হয়নি। একটাই লক্ষ্য ছিল জীবনের,—কবিতাকে এমনভাবে যাপন করতে হবে, যেন তা বিরতিহীন অতৃপ্তির মধ্য দিয়ে একজন কবির যাত্রাকে মুদ্রিত রাখে অক্ষরের অনঘ ইশারায়।

এটা, যেন-বা তাঁর নিজের লেখা অনেকানেক কবিতাচরণের মতো ছিল। আপাতপাঠে এগুলো প্রেমের কবিতা। জীবনের চকিত কোনো উদ্ভাসের কথা মনে করে উৎফুল্ল অথবা মরণকে হঠাৎ শিয়রে দেখে ম্লান বোধ হলে যেমন লেখে কেউ, রথো রাফিও লিখেছেন এরকম অনেকানেক কবিতা। কিন্তু ভেবে দেখলে তাঁর এইসব কবিতা, যেগুলো হয়তো নিজের কবিতাবইয়ে জায়গা দিতে কার্পণ্য করেননি,—তারা (অন্তত আমার কাছে) ‘কেবল এবং কেবল কবিতার দিকে হয়ে ওঠা’র কথা বলেছে অবিরত!

করোনাদিনে তাঁরই লেখা একটা কবিতা পাঠে বেশ চমকে উঠেছিলাম। সহজ ভাষায় কারো পানে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছিল সে-কবিতা। যাওয়াটা রথো রাফির কাছে এরকম,—তিনি তাঁর সকল চাওয়া-পাওয়ার দায় অনামার ঘাড়ে চাপিয়ে তার কাছে যেতে আকুল। নেটে তালাশ করে কবিতাটি পেলাম বটে। দুইহাজার কুড়ি সনে ‘ইশ’ শিরোনামে প্রকাশ হতে দিয়েছেন কবি। বাংলা ভাষায় ‘ইশ’ শব্দটা মাদকতাময়! ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলে’র মতো হাজারটা কথা এই একটা শব্দে গুঞ্জন তুলছে! রথো রাফি অবশ্য সরবে বলেছিলেন ‘ইশ’;—উচ্ছল গুঞ্জনে বলেছিলেন এরকম করে…

তার মতো কে বলে আর, তুমি কি
মৃত্যুর মতো যাকে এড়াতে পারি না আমি
যেদিকেই যাই যেদিকে পালাই
দেখি অসম্ভব তোমার দিকে না যাওয়া!

কবিতাটি অদ্য পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে, তাঁর পক্ষে সবচেয়ে কঠিন ছিল ওই ‘কবিতার দিকে না যেতে পারা’। নিজের অন্যতম পছন্দের কবি চার্লস বুকোস্কির মতো রাফিও কবিতার অস্থিমজ্জায় প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন;—যেন দিনের শেষে তিনি এবং কবিতার মধ্যে তৃতীয় কোনো আড়াল বা ছদ্মবেশ না থাকে। ‘কেবল কবিতা’য় এভাবে ‘অভিন্ন’ হতে চাওয়াটা একালে বই বের করার মচ্ছবে সত্যিই বিরল ঘটনা!

রথো রাফির এই একটা কবিতাবইয়ে কুড়ি বছরকে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি পরদেশি মেঘ ফার্নান্দো পেসোয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বেঁচে থাকতে একমলাটে বন্দি পেসোয়ার বিরামহীন মনোলোগ ‘দ্য বুক অব ডিসকোয়েট’ নামে বের হয়েছিল অথবা পরে বেরিয়েছিল, তা এখন আর মনে করতে পারছি না। গুগল করার ইচ্ছা আপাতত নেই। আমার কাছে বরং এটা জরুরি মনে হচ্ছে :

Book Cover, written by Ratho Rafi; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

কবির জন্য একটা বই যথেষ্ট হতে পারে…যখন তিনি এটা ভাববেন,—একজীবনে যা-কিছু রসদ কুড়িয়ে পেয়েছি, তার ভালোমন্দ অনেকগুলো বইয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না রেখে একত্রে রাখা যাক। জীবনানুভূতি সেখানে ভিন্ন-ভিন্ন হতে পারে, তাদের মধ্যে ক্ল্যাশ ও ইন্টারক্ল্যাশ থাকতেই পারে, একটার সেখানে অন্যটাকে ওভার‌ল্যাপ করার সম্ভাবনা থাকছে… আমি তবু এর মধ্যেই নিজের স্বাক্ষর রেখে যাবো। সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে হেমন্তের ওই গানটির মতো জানিয়ে যাবো :

আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা।
আমি কাঁদলাম বহু হাসলাম
এই জীবন জোয়ারে ভাসলাম
আমি বন্যার কাছে ঘূর্ণির কাছে রাখলাম নিশানা।।

রথো রাফি এই দুঃসাহস করেছিলেন বাংলাদেশে বসে! এটা সেই কবির পক্ষে সম্ভব, যিনি পাঠকের কাছে অধিক প্রত্যাশা না রেখে কবিতার চড়াই-উৎরাই ধরে হাঁটছেন নিভৃতমগ্ন মুসাফির। পাঠকের যদি মন চায় তো তাঁকে পড়বে। যদি না চায়… বয়েই গেছে কবির তাকে পড়তে বলার। রথো রাফি হয়তো এভাবে ভাবেননি। একটা বইয়ে কুড়ি বছরকে অন্য কারণবশত হয়তো ধারণ করেছিলেন। পেসোয়ার মতো তাঁর কবিতাও, লক্ষ করেছি, মাঝেমধ্যে মনোলোগে নিজেকে পরখ করতে মরিয়া থেকেছে।

ঘটনাবহুল পৃথিবীতে কবির অনুভূতিরা চারপাশের মুখগুলোকে পড়ে নিতে কতটা সক্ষম?—পেসোয়ার মতো এই প্রশ্নটা তাঁকে কি উত্যক্ত করেছে কখনো? যেহেতু পরিচয় ছিল না, উত্তর অধরাই থেকে গেল! তবু, এটা মনে হয়েছে নানাসময়,—বিদেশি কবিতার নিবিড়পাঠে যত্নশীল থাকায় রাফির কবিতার ভাষা ও বুনোট পরদেশি মেঘেদের সঙ্গে নিজেকে অভেদ করে নিয়েছিল। এটা আবার তাঁকে অগ্রজ ও অনুজ কবিদের ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একলা পথ হাঁটতে বাধ্য করেছে অনেকখানি।

এই দেশে এরকম ভাষায় কবিতা বিরচন কবিমহলে এখনো স্বীকৃতিযোগ্য নয় অতটা! তাঁর কবিতা স্বয়ং নানাসময় ফেসবুক ও অনলাইন মুখপত্রে চোখে পড়েছে নিয়মিত, নিজের মধ্যে তবু বোঝার আর্তি প্রবল হয়নি,—কবিতায় কেবল আবেগের পারদ ফেনিয়ে তোলার চেয়ে রথো রাফি বরং পরদেশি মেঘেদের মতো সূক্ষ্ম কারুকাজে কবিতার গন্তব্য খুঁজে ফিরছেন। অদ্য যেমন ‘হৃদয়’ কবিতাটি চমকে দিচ্ছে, এবং সেটা এজন্য,—এই কবিতার পরিশেষটা উপসংহারের মতো তাঁর ওই ‘কেবল কবিতার দিকে যেতে চাওয়ার’ বার্তা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে। পেসোয়ার মতো অনেকটা, রাফিও তুচ্ছ ব্ল্যাকবোর্ড ও ডাস্টারে টের পাচ্ছেন ‘কবিতার দিকে যাওয়ার’ পীড়াদায়ক সারসত্য :

তাহলে কেন ভুলে যাবে
ব্ল্যাকবোর্ডের পাশেই থাকে ডাস্টার
যতো লেখা তত মুছে চলা আর তত বড়ো হওয়া

কে না জানে এইতো জীবনের ধর্ম
জন্মের পর কোনোদিন ছোট হয় না গাছ!

যাইহোক, এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই! বড়ো সত্যটা এই,—রথো রাফিকে ফেসবুক নামের মাছের বাজারে একবগগা ঘুড়ির মতো কবিতা-যাপন করতে দেখা যাবে না! তাঁর মুদ্রিত কবিতারা অবশ্য থাকছে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে। কতটা মনে পড়বে তা যদিও নিশ্চিত নই এখনো। পুষ্প ঝরে গেলে তাকে মনে রাখে কি প্রকৃতি কিংবা মানুষ? এই দ্বিরাভাস তো রাফি স্বয়ং রেখে গেছেন নিজে, তাঁকে লিখতে দেখেছি…

দেখো, সাত রঙে জীবনকে 
ডাকতে ডাকতে 
             হাসতে হাসতে 
প্রতিটি পুষ্প মৃত্যুর দিকেই চলে যায়!

বসন্তের শেষে, বলো,
বীজ না পুষ্প কার দিকে তাকাবে তুমি!

আত্মবিলীনের দিন 
               কখন যে কাছে এসে পড়ে!

চাইব… তবু চাইব… তিনি মনে উদয় হবেন হঠাৎ উদ্ভাসের মতো। বেজে উঠবেন কোনো এক সহসা নিরালায়। বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকার’ চকিতাভাসে কিংবা ওরকম অন্তর্মগ্ন স্বরে হয়তো পড়ব একবগগা কবির দনহনযন্ত্রণায় গাঁথা কনফেশন কোনো! মনে ছবিটা জাগবে,—হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে রথো রাফি পড়ছেন নিজের কবিতামাল্য…

কাঁটার পোশাকে দাঁড়িয়ে
আমার অতলে কোনো পুষ্প-সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রেখে যাব
বোকার মতো আরো অনেকদিন পোকাখাওয়া স্বপ্নের স্তূপে পড়ে থেকে
কত ভুল গান গাই অনিচ্ছায় আর শুনি বন্ধুরা
জ্ঞানী বলে আমাকে ভেংচায় এই নাকি অনুপম পুরস্কার আমার!
মাঝে মাঝে ভাবি, এই নিখিল সবুজনরকে, বিরাট স্ববিরোধ আছে হয়তো
আমাদের স্বভাবে, বন্ধুত্বে, এমনকি প্রেমেও
সাতরংফুলের গভীরে গিয়েও দেখি সেই একই শিকারি স্বভাব
দেখি অস্তিত্ব কীভাবে প্রেমকে অনিবার্য করে তুলে ফের হত্যা করে চলে!

. . .

Rotho Rafi (1975-2026); Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ ‘গুণিজন স্মরণ’-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

‘জোলিন’, কেড়ে নিয়ো না : স্মরণে ডলি পার্টন

মারজান সাত্রাপি : পারস্যে অগ্নির সুবাস

উজ্জ্বল ‘এই’ নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক!

রঘু রাইয়ের ‘শরণার্থী’

মুস্তাফা মনোয়ার : স্মরণে সতত ‘শিল্পমেধাবী’

প্রাজ্ঞের প্রয়াণ দেহত্যাগ মাত্র : সুমন বনিক

অসমাপ্ত লড়াই ও আহমদ রফিকের প্রস্থান

বৃক্ষনাথ কমল চক্রবর্তী

সফিউদ্দিন স্যারের সহজ প্রজ্ঞা

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তবে কার জন্য ‘বাঁচবেন’!

কাঞ্চনজঙ্ঘা জুবিন

ওজি অসবর্ন — বিদায়, ক্লেদজ কুসুম

মৃত শহরে এক ‍গুণী

ও তরঙ্গ লাফাও

সৌমিত্রর স্বদেশ

প্রথা ও প্রতিমার দেশে সন্‌জীদা খাতুনের শেষযাত্রা

প্রতুলকে বিদায় বলাটা যে-কারণে সম্ভব নয়

. . .

আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 19

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *