
বাড়ি ফেরার পথে তোমার মৃত্যু হলো।
একটা গাড়ি এসে তোমাকে চাপা দিয়েছিল। বলবার মতো কিছু নয় এটা, ঘটনাটি তবু মর্মান্তিক। বউ আর দুটি মাসুম বাচ্চার মায়া ছাড়তে হয়েছে তোমাকে। তোমার মৃত্যুটা অবশ্য যন্ত্রণাহীন ছিল। ইমার্জেন্সিতে ডাক্তার-নার্স সব চেষ্টাই করেছিল, কিন্তু তারা তোমাকে বাঁচাতে পারেনি। বিশ্বাস করো, তোমার শরীর এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, মারা যাওয়াটা বরং সুখের ছিল তোমার জন্য।
আর এখন তুমি আমার সামনে।
‘কী…হয়েছেটা কী? আমি এখন কোথায়?’—তুমি জানতে চাইলে।
কোনো ভণিতায় না গিয়ে আমি উত্তর করি, ‘তুমি মারা গিয়েছো।’
—‘সেখানে একটা…একটা ট্রাক ছিল, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণহীন হারিয়ে ফেলেছিল ট্রাকটি..’
—‘হ্যাঁ ’
—‘আমি…আমি তাহলে মারা গিয়েছি?’
—‘হ্যাঁ; তবে দুঃখ করো না, সবাইকে একদিন মরতে হয়।’
তুমি তাকিয়ে আশপাশটা দেখছিলে। ওখানে কিছু ছিল না, শুধু তুমি আর আমি ছিলাম।
—‘এটা কোন জায়গা?’—‘এটা তাহলে পরকাল?’
—‘মোটামুটি তাই।’
—‘আপনি কি ঈশ্বর?’
—‘হুঁ, আমিই ঈশ্বর।’
—‘আমার বউ-বাচ্চারা…? তাদের কি হলো? ওরা ভালো থাকবে তো?’
—‘আমি এটাই দেখতে চেয়েছিলাম। সবে মারা গিয়েছো তুমি এবং নিজের পরিবারের কথা ভেবে চিন্তা হচ্ছে তোমার। ভালো কিছুই ঘটছে এখানে।’
তুমি মোহাবিষ্ট হয়ে আমাকে দেখছিলে। আমাকে ঈশ্বর ভাবতে অসুবিধা হচ্ছিল তোমার। আমাকে আর পাঁচটা পুরুষলোকের মতো লাগছিল দেখে অথবা কোনো মেয়েমানুষের মতো;—অনিশ্চিত কোনো কর্তৃপক্ষের মতো, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের চেয়ে গ্রামার স্কুলের জনৈক শিক্ষকের মতো…।
—‘চিন্তা করো না। ওরা ভালো থাকবে। বাচ্চারা সবদিক থেকে যথার্থ একজন হিসেবে তোমাকে মনে রাখবে। তোমাকে নিয়ে অবজ্ঞা পুষে রাখার সময় তাদের নেই। তোমার স্ত্রী বাইরে কান্নাকাটি করলেও, গোপনে ভারমুক্তির স্বাদ অনুভব করবে। সত্যি বলতে কী, তোমার বিবাহিত জীবনে ধস নেমেছিল। এটা যদি কোনো সান্ত্বনা হয়ে থাকে, তাহলে ভারমুক্ত বোধ করার কারণে নিজেকে সে অপরাধী ভাববে।’
—‘ওহ! তাহলে এখন কী হবে? আমি কি স্বর্গে যাবো, নাকি নরকে অথবা অন্য কোথাও?’
—‘কোনোখানেই নয়;—তুমি আবার জন্ম নেবে।’
—‘হায়!’ তাহলে তো হিন্দুরাই সঠিক ছিল।’
—‘নিজ-পথে সকল ধর্মই সঠিক। চলো হাঁটি।’
তুমি আমায় এমনভাবে অনুসরণ করছিলে, যেন শূন্যে দীর্ঘ পা ফেলে আমরা হাঁটছি।
—‘আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?’
—‘ঠিক নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় নয়। এটা চমৎকার-যে, আমরা কথা বলতে-বলতে হাঁটছি।’
—‘বিষয়টা কি দাঁড়াচ্ছে তাহলে? আবারো জন্ম নেওয়ার সময় আমি একটা সাদা স্লেট মাত্র,—তাই নয় কি? একটা শিশু। আমার যত অভিজ্ঞতা এবং এই জীবনে যা-কিছু করেছি, তার কোনো গুরুত্ব থাকছে না।’
—‘ঠিক তা নয়! বিগত জীবনের সকল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা…তারা তোমারই থাকবে। উপস্থিত মুহূর্তে সেগুলোর কথা তোমার মনে পড়বে না।’
আমি হাঁটা থামিয়ে তোমাকে কাঁধে তুলে নেই।
—‘যেমনটা তুমি কল্পনা করে থাকো, তোমার আত্মা সম্ভবত তারচেয়ে মহৎ,—সুন্দর আর সুবিপুল। একটা মানবমনের পক্ষে তুমি যেমন, তার অতি ক্ষুদ্র অংশই কেবল ধরে রাখা সম্ভব। এটা হলো পানির গ্লাসে আঙুল ঢুকিয়ে দেখা পানিটা উষ্ণ নাকি শীতল। পাত্রে নিজের অতি ক্ষুদ্র অংশ তুমি রেখেছো এবং যখন তাকে ফেরত নিয়ে আসছো, যেসব অভিজ্ঞতা তার হয়েছে, তুমি তার সবটা পেয়ে যাচ্ছ।
বিগত ৪৮ বছর তুমি মানুষের জীবন কাটিয়েছো, নিজেকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসা ও অবশিষ্ট অমেয় সচেতনাকে কাজেই আজো অনুভব করোনি। আমরা যদি এখানে যথেষ্ট সময় বসবাস করি, তাহলে সবকিছু তুমি মনে করতে থাকবে। কিন্তু প্রতিটা জীবনের মধ্যবর্তী অবস্থায় এটা স্মরণ করার কোনো মানে হয় না।’
—‘সেক্ষেত্রে আমাকে কতবার জন্ম নিতে হবে?’
—‘ওহ! অনেক। অনেক এবং অনেকবার, ভিন্ন ভিন্ন জীবন। পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে এবার, খ্রিস্ট-জন্মের ৫৪০ বছর আগের চীন দেশের এক কৃষক বালিকা হয়ে তুমি জন্ম নিতে যাচ্ছো।’
—‘দাঁড়ান, কি বলছেন এসব?’…তুমি তখন তোতলাতে শুরু করেছো।
—‘আপনি আমায় অতীতে ফেরত পাঠাচ্ছেন?’
‘উত্তম, স্পষ্ট করে যদি বলি, আমি তাই ধারণা করছি। সময় সম্পর্কে তোমার জ্ঞান কেবল তোমার মহাবিশ্বে বিদ্যমান। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে ঘটনা ভিন্ন।’
—‘আপনি কোথা থেকে এসেছেন?’
—‘হ্যাঁ, নিশ্চয়। কোনো একটা জায়গা থেকে আমি এসেছি। অন্য কোনো জায়গা। আর সেখানে বাকিরাও আমার মতো। আমি জানি, তুমি জানতে চাইবে বিষয়টি আসলে ঠিক কেমন সেখানে; কিন্তু, সত্যিটা হলো,—তুমি তা উপলব্ধি করতে পারবে না।’
—‘হায়!’—হতাশায় তুমি কিছুটা নুয়ে পড়লে;—‘একটু দাঁড়ান, আমি যদি পরে অন্য কোথাও আবার জন্ম নেই, কিছুক্ষেত্রে নিজের সঙ্গে আমার সংযোগ বা মিথস্ক্রিয়া তো ঘটবার কথা।’
—‘অবশ্যই, ওটা সবসময় ঘটে। উভয় জীবন নিজের জীবনকাল সম্পর্কে শুধু সচেতন থাকে, এমনকি তোমার জ্ঞানের বাইরে এটা ঘটে।’
—‘শেষপর্যন্ত কী দাঁড়াল তাহলে?’
—‘সত্যি?’ আমি জিজ্ঞেস করি,—‘সত্যি? আমাকে তুমি জীবনের মানে জিজ্ঞেস করছো? কিছুটা গতানুগতিক হয়ে গেল না?’
—‘প্রশ্নটা যুক্তিসংগত’;—তোমার কণ্ঠে জেদ ফুটে ওঠে।
আমি তোমার চোখে চোখ রাখি;—‘জীবনের অর্থ হচ্ছে,—তোমাকে পরিণত করার জন্যই সমগ্র মহাবিশ্ব আমি সৃষ্টি করেছি।’
—‘তার মানে আপনি মানবজাতির কথা বলছেন? আমাদেরকে আপনি পরিণত করে তুলতে চাইছেন?’
—‘না, কেবল তোমার জন্য এই মহাবিশ্ব আমি সৃষ্টি করেছি। প্রতিটা নতুন জীবনের সঙ্গে তুমি বেড়ে ওঠো ও পরিপূর্ণ হতে থাকো, আর বৃহত্তর ও মহান এক ধীশক্তিতে পরিণত হও।’
—‘কেবল আমার জন্য? বাকিদের বেলায় কী?’
—‘কেউ নেই সেখানে। এই মহাবিশ্বে শুধু তুমি আর আমি রয়েছি।’
তুমি শূন্যদৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে, ‘কিন্তু পৃথিবীর সকল মানুষ…’
—‘তুমিই সব। তারা সবাই তোমার ভিন্ন-ভিন্ন প্রতিমূর্তি।’
—‘দাঁড়ান;—আমিই তাহলে সব!?’
—‘এতক্ষণে ধরতে পেরেছো।’—আমি তার পিঠ চাপড়ে দিই।
—‘এতকাল ধরে যারা জীবিত ছিল তারা সবাই ‘আমি’? অথবা যারা সামনে জন্ম নেবে…’
—‘হ্যাঁ, তারাও।’
—‘আমিই তাহলে আব্রাহাম লিংকন?’
—‘জন উইলকস বুথও তুমিই।’—আমি যোগ করি।
—‘আমিই তাহলে হিটলার?’—তোমার কণ্ঠে হতভম্ব ভাব ফুটে ওঠে।
—‘আর তুমি সেই লক্ষ-কোটি, যাদেরকে সে হত্যা করেছিল।’
—‘আমিই যিশু?’
—‘আর, যারা তাঁর অনুসারী, তারা সবাই হচ্ছো তুমি।’
তুমি নীরবতায় গুম হলে।
—‘প্রতিটা মুহূর্তে তুমি কাউকে-না-কাউকে বলি দিচ্ছো। নিজেকেই বলি দিচ্ছো আসলে। অন্যের প্রতি তোমার দয়া ও সহানুভূতির সবটাই মূলত তোমার নিজের জন্য। যে-কোনো মানুষের এখন পর্যন্ত অথবা আগামীতে অর্জিত প্রতিটা সুখ কিংবা বিষাদঘন মুহূর্তের অভিজ্ঞতা কার্যত তোমার অভিজ্ঞতা।’
তুমি অনেকটা সময় নিয়ে ভাবলে।
—‘কেন? এসব কেন করলেন?’
—‘কারণ, কোনো একদিন তুমি আমার মতো হয়ে উঠবে। যেহেতু, ওটাই হচ্ছো তুমি। তুমি আমার মতো;—আমারই সন্তান।’
—‘বাহ!’ তোমার কণ্ঠে অবিশ্বাস ফুটে বেরোয়,—‘আপনি বলতে চাইছেন আমিই ঈশ্বর?’
—‘না। এখনো নয়। তুমি একটা ভ্রূণ। এখনো বেড়ে উঠছো। একবার যখন সকল সময়জুড়ে যাপিত প্রতিটা মানুষের জীবন তুমি যাপন করবে, তখন তুমি যথেষ্ট পরিমাণে ‘আমি’ হওয়ার মতো প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠবে।’
—‘এই মহাবিশ্ব, এটা তাহলে কী? এটা কি শুধুই…’
—‘একটা ডিম। এখন সময় হয়েছে পরবর্তী জীবনের দিকে তোমার যাত্রা করার।’
আর আমি তোমাকে সে-পথেই পাঠাচ্ছি।
. . .

অ্যান্ডি ওয়্যার ও ‘দ্য এগ’ সমাচার
ইংরেজি সাহিত্যের নব-প্রজন্মের লেখকদের যে-জয়যাত্রা এই মুহূর্তে চলছে, সেখানে ‘Martian’ নামক আলোচিত উপন্যাসের (রিডলি স্কট কর্তৃক পরে চলচ্চিত্রায়িত) স্রষ্টা অ্যান্ড্রিউ টেইলর ওয়্যার (অ্যান্ডি ওয়্যার নামে অধিক পরিচিত) তাঁর রচনাশৈলীর গুণে দ্রুত পাঠক আগ্রহের কারণ হয়েছেন। পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী এই লেখক ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে প্রকাশিত দ্য এগ গল্পে অ্যান্ডি ওয়্যার দর্শন আর একইসাথে মানবপ্রজাতির এক মৌলিক জিজ্ঞাসাকে যেভাবে গল্পের আবরণে হাজির করলেন, তা সত্যি চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে পাঠকরা নিয়মিত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছিলেন। ত্রিশটির বেশি ভাষায় গল্পটি অনূদিত হয়েছে। গল্পটি লেখার দশবছর পূর্তি উপলক্ষে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রও মুক্তি পায় তখন।
ভারতীয় (এবং সামগ্রিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের) দর্শন, বিজ্ঞান, উপকথা ও সাহিত্যে বহুচর্চিত ঈশ্বর ও জগৎকেন্দ্রিক ধারণার ওপর সরস আলো ফেলার কারণে দ্য এগ-এর বয়ান পাঠকের মুগ্ধতা কাড়ে। জটিল ও একইসঙ্গে গুরুতর দার্শনিক প্রকল্পনাকে Storytelling-এর ছকে ফেলে অ্যান্ডি ওয়্যার যেভাবে নির্মাণ করেছেন, প্রথমপাঠেই এর অভিঘাত পাঠকমনে স্থায়ী রূপ নেয়। দ্য এগ গল্পটির নির্মাণকৌশল ও অন্তর্নিহিত বার্তা নিয়ে পৃষ্ঠার-পর-পৃষ্ঠা আলোচনা করা সম্ভব, আবার দু’চার কথায় যে-বিষয়ের উপর গল্পটি আলোকপাত করছে, একে অনুভবে জারিত করা কঠিন নয়। লেখক হিসেবে এখানেই অ্যান্ডি চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন।
গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয় সহজ নয়, কিন্তু সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ-প্রকৌশলের মাধ্যমে কঠিন কাজটাকে সহজ করে নিয়েছেন অ্যান্ডি। ঈশ্বরকে উত্তমপুরুষ হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে মোটর দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংলাপ বহুস্বরিক দ্যোতনায় পাঠককে ধরে রাখে। শুভ আস্তিকতার প্রবল এক সুর গল্পের বুননকে হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে। ভারতীয় বৈদিক দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ ও সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মূল কথা হচ্ছে, সৃষ্টি ও স্রষ্টা পরস্পর থেকে পৃথক হলেও মূলত তারা অভিন্ন। দ্য এগ গল্পে বার্তাটি প্রচ্ছন্ন বহমান।
—মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
সংযোজন ও ঋণ স্বীকার : আহমদ সায়েম সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘সূনৃত’ নবম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত ও বর্তমানে নতুন করে পরিমার্জিত।
. . .

. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
রিদম জিরোয় চিরন্তন মানব প্রবৃত্তি
টুটা পারিন্দা ও যে-পথে হয়নি যাওয়া
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



