
যে ঘাটে ভরিবো কলসি,
সেই ঘাটে ইংরাজের পানসি
ঠেইলে দ্যাও ইংরাজের পানসি
ভইরে উঠাও কাঙ্খের কলসি।।
আজ থেকে প্রায় একশো বছরেরও আগে সড়কপথে যোগাযোগ না-থাকা অবিভক্ত বাংলার গ্রামে যাতায়াত অনেকসময়ই জলপথে হতো। সাধারণভাবে ছায়াঘেরা শান্ত সেসব গ্রামে বিদেশি পুলিশ আসা উপদ্রবেরই শামিল ছিল। তৎক্ষণাৎ তার বিরোধিতা করাটা খুব সহজ না হলেও, তাই-ই হয়তো করেছিলেন গ্রামের সাহসিনী মেয়েরা। পুলিশের পানসি ঠেলে-সরিয়ে নিজেদের ঘাটেই কলসিতে জলভরা আর তা নিয়ে গান বাঁধাও হয়ে যায় সঙ্গে-সঙ্গেই। মনে রাখার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে তাকে নিয়ে মুখে-মুখে নতুন গান বাঁধতে পারতেন মেয়েরা, আর গাইতেন তেরো পার্বণের কোনো একটিতে অথবা আপন খেয়ালে। এবারের গানটিকে তাঁরা মিশিয়ে দিলেন বিয়ে উপলক্ষ্যে গাওয়া ‘জলভরা’র গানে। এভাবে তৈরি হয় হাজার হাজার গান, আর তা ধরা থাকে যৌথস্মৃতি ও যৌথ যাপনে।
এই সাহসী স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণকে কোনো স্মৃতিকথা বা স্বদেশী ‘সংগীত সংকলন’-এ খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, এ-কণ্ঠ শুধু মৌখিক ঐতিহ্যেই ধরা থাকে। সেই পরম্পরার খোঁজ না করলে অজানা থেকে যায় অক্ষর ও বৃত্তের বাইরে থাকা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়েদের নিজস্ব বয়ান;—ঘরে-বাইরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁদের অন্তর্দৃষ্টির কথা;—সৃজনশীলতা আর দায়িত্ববোধের আখ্যান। পরিবারের লালন-পালন ছাড়াও নানাবিধ উৎপাদন ও সৃজনশীল কাজকর্মে সমানভাবে অংশ নেওয়া গ্রামীণ নারীর নিজস্ব গান তাই সমাজ, সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে তাঁদের বলিষ্ঠ স্বাক্ষর;—বিষয় নয়, বরং বিষয়ী হিসেবেও।
সমাজতাত্ত্বিক থেকে মনোবিদ সকলেরই আক্ষেপ নারীর নিজস্ব বয়ানের অভাব নিয়ে;—‘মেয়েদের যদি পুরাণকথা থাকতো’ (ও. ফ্লাহার্টি, ১৯৮০)। ‘ভারতমাতার কোলে মেয়েরা কেমন থাকেন, জানা খুব কঠিন’ (সুধীর কাক্কার, ১৯৯৬);—এরকম মন্তব্য প্রায়ই শোনা যায়। লিখিত উপাদানের উপর নির্ভর করলে ইতিহাসের একটা বড়ো অংশই আমাদের চর্চার বাইরে থেকে যাবে, একথা বারবার পণ্ডিতজনরা মনে করিয়েছেন (দ্রষ্টব্য : রামানুজন, ১৯৯১; আপ্পাদুরাই ১৯৯৪; কসকফ ১৯৮৭; জর্ডন ও কালসিক ১৯৮৫..)। কিন্তু, আমরা এখনও মৌখিক ঐতিহ্যের প্রতি ততটা মনোযোগী নই। এখানে সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করবো।
. . .
প্রকৃতির কোলে
প্রকৃতির কোলেই জন্মানো, বেড়ে ওঠা বলেই তার কাছে আমাদের নতজানু হতে হয় নানা সময় নানা কারণে। প্রকৃতিলগ্নতা মেয়েদের বেশি বলে বিজ্ঞান-পূর্ব-যুগে এ-দায়িত্বটা ছিল তাঁদেরই;—আর গান ছিল সেখানে মাধ্যম। নৃবিজ্ঞানী শেরি ওর্টনার তাই মেয়েদের প্রকৃতির সঙ্গে সেতুবন্ধনের কাজের কথা মনে করান। সূর্য, ধরিত্রী, মেঘ-নদী থেকে গাছপালা, পশুপাখি সবার উদ্দেশে, সবার জন্য মেয়েরা গান করেন নানা সময়ে। শীতে উত্তাপের প্রয়োজনে বলেন :
পুগদি সূর্য উঠে রে অরুণবরণ
কলার চারা দি পুজি আমরা সূর্যেরই চরণ…
—উৎস : সীতাকুণ্ড
মাঘমাসে এভাবে সূর্যপুজো চলে নানা জেলার নানা গানে। বৃষ্টির জন্য মেঘের কাছে প্রার্থনাও হয় গোটা বাংলা জুড়ে—‘মেঘরাজা রে তুই নি সোদর ভাই/ একঝুড়ি মেঘ দে ভিজ্যা ঘরে যাই…’ (কিশোরগঞ্জ)। অথবা ‘মুত্যা নাম রে নাম/ জল ঢালিয়া করবো কাদা থাপাং থাপাং’ ( মুর্শিদাবাদ)। নিকট আত্মীয়ের মতো নদীকে বরণ করে তবে জলভরার প্রচল অনেক জায়গায়—‘একটা গুয়ায় পাঁচটা পান গঙ্গা নিমন্ত্রণ গো/ কী-রূপে ভুবন আলো হইয়াছে..!’ (ঢাকা)। গাছকে জড়িয়ে রক্ষা করার চিপকো আন্দোলনের কথা আমরা জানলেও, খোঁজ রাখিনি এই বাংলার মা-দিদিরা গাছের সঙ্গে কোলাকুলি করে ‘সই’ পাতিয়েছেন যুগ যুগ ধরে ‘সইয়ালা’র গান গাইতে গাইতে…
সই সই বলিয়া আইলাম, সইনি আছইন ঘরে
দোনো সইয়ে বদল করে বিকনা গাছের তলে
—উৎস : মৈমনসিংহ
মালদহ, মুর্শিদাবাদে বছর শেষে জঙ্গল পরিষ্কার করে ‘বসনবুড়ি’ পুজোর গানে মেয়েরা অঙ্গীকার করেন ‘গাছের সেবা করবো হে’; আর বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-মেদিনীপুরে জাওয়া পরবে করম গাছের ডালের সামনে সদ্য অঙ্কুরিত শস্য-সরাকে রেখে সারারাত ধরে চলে জাওয়া গান—‘জাওয়া-যে দিলি তোরা হলুদ কোথা পালি লো।’ যাতায়াতের পথে পায়ের চাপ লেগে কষ্ট পায় যে-দূর্বাঘাস, তার জন্যও গান বাঁধেন দরদি নারী :
দূর্বা তুই শুয়ে নিদ্রা যাইস
সখিরা যাইত স্নান করিত দূর্বারে জাগায়
—উৎস : সুবর্ণের চর
ডিপ ইকোলজি, ইকো ফেমিনিজম… এসব ধারণা আসার বহু আগে থেকে অভিজ্ঞতা আর মায়াভরা মন নিয়ে মেয়েরা বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবীটা শুধু মানুষের নয়,—প্রাণের শৃঙ্খলে আমরা শুধুই একটা অংশমাত্র। প্রখর গ্রীষ্মে তাই বৃষ্টি প্রার্থনা করেন তাঁরা সকলের জন্য :
সোনারই নাঙল-জোঙাল রোদি পুড়ি যায়
মেঘারাণী জল দিলে ধানের ভাত খাই।।
চালের উপর কাউয়ের ছাও ট্যাও ট্যাও করে
মেঘারাণী জল দিলে কাউয়ের ছাওডা বাঁচে।।
আহার উপর বিলইয়ের ছাওটা চ্যা চ্যা করে
মেঘারাণী জল দিলে বিলইয়ের ছাওডা বাঁচে।।
—উৎস : ফরিদপুর
প্রাণ-স্পন্দনের মর্মকথা নারীর তাই অজানা নয়।
. . .
চাষবাস খাদ্যযোগান ও খাদ্যপ্রস্তুতি
লাঙল আসার আগে পর্যন্ত কৃষির পুরোটা ছিল মেয়েদের কাজ। আজও অনেক পর্বে তার ছোঁয়া আমরা দেখি। আজও কোনো কোনো অঞ্চলে ধান রোয়ার সময় মেয়েদের গান গাওয়া আবশ্যক গণ্য করা হয়;—মানবসন্তানের মতো শস্যচারা গানের সুরে নিরাপদে বাড়বে, এমনটাই বিশ্বাস কাজ করে সেখানে। উর্বরতাসূচক ‘ধান রোয়ার গান’ লোকালয়ে গাওয়া হয় না। খেতের খোলা হাওয়ায় মেয়েরা নরনারীর সম্পর্ক ঘিরে গান ধরেন—‘শুধু শিশিরে কি মাটি ভিজে বন্ধু/ বরষা না হল্যে পর কখনো কি খেদ মিটায়/ কোলের স্বামী না হল্যে’ (বাঁকুড়া)।
ধানচারা বড়ো হলে চলে নিড়ানির কাজ—‘মারোয়া ঘরের নিড়ানি, খানিক নাই দেয় জিরানি/ দিন গেলে মাইদানি খাই, তারা উঠলে বাড়ি যাই’। ধান ঘরে এলে শুরু হয় অন্যপর্ব—ধান শুকোনো, ধান সেদ্ধ, ঢেঁকিতে বা উদুখলে ধান ভানা… এসব পর্ব একান্তই মেয়েলি। নিজের ঘরে শুধু নয়, অন্যের বাড়ি বা হাটে গিয়েও কাজ করেন তাঁরা—‘হামরা বারা বানতে যাবো সানঝা একসাথে/ চলটে রাইহোর হাটে” (মালদহ)।
খাদ্যপ্রস্তুতির অন্যান্য পর্ব, যেমন চিঁড়েকোটা, মুড়ি, খইভাজা, জাঁতায় ডাল ভাঙা বা ছাতু তৈরির সবটাই মেয়েদের কাজ, আর সবকিছু নিয়ে তৈরি হয়েছে গান—‘ডাল ডলনু, ছাত্তু পিষনু আরও পিষনু আটা’। বাড়ি সংলগ্ন ছোট জমিতে বা বড়ো খেতে সবজি ফলিয়ে, খেত পাহারা দিয়ে ফসল তো ঘরে ওঠেই, সেইসঙ্গে হাটে বা পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করে রোজগারও করেন তাঁরা। গান আছে সব পর্যায়ের—‘ও দিদি তাড়া লো, হনুতে ফুলকপি খেলো, ফুলকপি খেলো লো দিদি, ওলকপি খেলো’ (ঝাড়গ্রাম)। অথবা শুনি—‘দে তুলে দে বিলাতি ঝুড়ি/ আমরা বিকবো লো কুলহি কুলহি’ ( বাঁকুড়া)।
অপ্রতুলতার সময় সবার মুখে খাবারটুকু তুলে দিতে মেয়েরা কখনো শাক তুলছেন, কখনো-বা সংগ্রহ করছেন গুগলি, কাঁকড়া বা মাছ। কখনো পায়ে কাঁটা ফোটে, কখনো আবার সাপ বা বাঘের মুখোমুখিও হতে হয়—‘শাগের ভুঁইত বাঘের পাড়া, ধুমকি উঠিল গাও রে’ (রঙপুর)। অন্য বিপদের মোকাবিলাও করতে হয় বৈকি মাঝে মাঝে—‘সিকি পয়সা গুনতে লারি, বাবু দেখায় আধুলি/ এবার যদি দেখাস বাবু মাইরবো তোকে শুকনা ঢিল’ (ঝাড়গ্রাম)। বিপদ কাটিয়ে একটু গুগলি বা মাছ পেলে খুশির সীমা থাকে না তাঁদের! সঙ্গেসঙ্গে কী দিয়ে রান্না হবে তার পরিকল্পনা তৈরি হয় গানে...
ছেঁচা বিলে মাছ মারিলাম রে
হেলেঞ্চার শাগে মইজ্যা যায়
—উৎস : মালদহ
জোগাড় সারা হলেও থেকে যায় কাটা-ধোয়া-বাটা, মাজাঘঁষা, কুটনো কোটা, বাটনা বাটা, বাসনমাজা নিয়েও গান বাঁধেন তাঁরা—‘নাউ কুটিনু ঘুচি ঘুচি, সাদু চালে বা থুনু দাও’; অথবা—‘মশলা পিষিতে ভারা না মাঞ্জিতে হাতে মোর পড়িচে কালা’ (গোয়ালপাড়া)। এমন গান মেলে গোটা বাংলাজুড়ে।
. . .
জল জ্বালানি গৃহস্থালি
‘আমার হাতে কলসি, কাঁখে কলসি সই গো/ আমি পারিনে জল ভরাতে…’ বা ‘ঘাট পিছল পথ পিছল, পিছল ঘাটের মাটি/ আছাড় খাইয়ে ভাঙলো রাইয়ের সুবর্ণের কলসি’ (নদিয়া বা ঢাকা)। মেয়েদের সমস্যা একইরকম, এর পৌনঃপুনিক প্রকাশ তাই মান্যতা দেয় তাঁদের যাপন অভিজ্ঞতাকে। তবে একথাও মানতে হয়, কলসি ভাঙলে বকাবকি যেমন জোটে, আগলানো স্নেহও মেলে কখনো কখনো—‘গেছে গেছে উহ কলসি, রাধার বালাই লইয়া গো/ আরো কলসি গইড়া দিবো হালকা মাঞ্জা চাইয়া’।
জল আনা অনেকসময় ঘরের একঘেয়েমি থেকে মুক্তিও নিয়ে আসে মেয়েদের জন্য। বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে জল ফেলে জল আনার ঘটনার কথা জানায় মেয়েদের মুখে বাঁধা গান—‘কলসির জল মাজিয়ায় ঢালিয়া/ কলসি হইল মোর খালি রে’। বাঁধন পেরিয়ে নিজের স্বাধীনতা নিজে খুঁজে নেওয়া এভাবেই।
রান্নার জন্য জ্বালানি জোগাড়ও বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ। পাহাড়ি পথে কাঠ নিয়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় কি-না, কেউ কখনো জানতে না চাইলেও মেয়েরা গানের মধ্যে রেখে যান স্বাক্ষর—‘ও আমার আসা যাওয়া লাগে গেল বুকধড়ি’ বা ‘দিনে-রাইতে জনাইর মাঢ়, কাঠ আনি যাই পাহাড় দিদি গে, খাটি খাটি ঝলকে পাঁজরা হাড়’ (পুরুলিয়া)। বর্ষায় ভিজে কাঠে রান্নায় দেরির জন্যও তাদেরই দায়ী করা হয়:
ভিজা আঙ্খা ভিজারে খড়ি
ভাত আন্দিতে দেওরা হইছিল দেরি রে
মিছা দোষে মোক ক্যানে বা ধরিয়া মারে
—উৎস : কোচবিহার
ভোরের আলো ফোটার সময়ে ঘরদোর পরিষ্কার থেকে শুরু হয় ‘সিরিয়াল’ কাজ। মেয়েদর গান সেকথাও বলে নিঃসংকোচ :
আঙিনা সাংটিয়া, ঘর না নেপিনু, ঘর না মুছিনু রে
ছ্যাঁকা না পাড়িয়া কাপড় ধুইনু কাপড় শুকানু রে…
ভাত না চড়েয়া ভাত আন্দিনু ভাত না বাড়িনু রে…
সুপারি কাটেয়া পান সাজিনু খিলি না বানানু রে…
বিছিনা ঝাড়িয়া বিছানা পাড়িনু,
মশরি টানানু রে...
—উৎস : কোচবিহার
নানা রান্না আর পরিবেশন নিয়েও গানের সংখ্যা অগুন্তি!
. . .
সৃজন দক্ষতা জীবিকা
জীবন যেমনই হোক, তাকে আরেকটু সুন্দর, আরেকটু আরামদায়ক করতে নানা সৃজনে মাতেন মেয়েরা। পাটি বা আসন বোনা, শিকা, পাখা তৈরি, কাঁথা সেলাইসহ নানা কাজ, নানা গান—‘বারা ভুকাওং, বসিয়া সিয়ান আরো খ্যাঁতা’। দেওয়াল বা মেঝেকে সুন্দর করতে আলপনা দিতে-দিতে তৈরি হয় গান—‘রসো ধীর ধীর গমনে চালাইয়ো হাত/ কন্যার মায় আঁকতে পারে নবীন সুন্দার গাছ’ (কুমিল্লা)। ‘তালের পাতা কেটে চতুকদিগে বসে/ পাঙ্খা বোনাবো আমরা’…(মুর্শিদাবাদ)। মুখে-মুখে অজস্র গান বাঁধা আর উৎসবের আনন্দে নাচের তালে তাল মেলানো তো সৃজনই—‘নাচনকোণা নাচিম মুইঁ মনের হাউসে’। সুরে-তালে মাতোয়ারা মাটির সেই উঠোন।
ডাক্তার-হাসপাতাল আসার আগে পর্যন্ত প্রসব করানো ছিল দাইমার কাজ। গোয়ালিনী, রজকিনী, কাটুনী, ভানুনীর মতো পেশা বা জীবিকা ছিল অনেকের;—গান আছে তাঁদের নিয়েও। তাছাড়া হাটবাজার বা পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মেয়েরা পরনির্ভর বা পর্দানশীন এমন ধারণা সমাজের সর্বস্তরে প্রযোজ্য নয়। মালিনী, রাঁধুনিরাও কিন্তু আছেন যুগ যুগ ধরে—‘মেলেনি লো সই,/ সারারাতি ফুল কুড়ুলি, পয়সা পেলি কই (বীরভূম)।
. . .
ঘর সমাজ দেশ
পারিবারিক গণ্ডির বাইরে মেয়েদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না, এমন ভাবনা বড়ো একপেশে। টানা অনাবৃষ্টি চলতে থাকলে, যাঁদের নামে হয়তো এককাঠা জমি নেই, সেই গ্রামীণ নারী বৃষ্টি নামাতে এগিয়ে আসেন। বিজ্ঞানপূর্ব নানা ক্রিয়াকৌশলে বৃষ্টি নামানোর যজ্ঞটি সারেন তাঁরা। ব্যক্তিগত বা পরিবার নয়, কাজটি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা করেন। ভাবনাটি এখানে এতটাই গভীর ও আন্তরিক-যে, ‘হুদুম’ বা ‘জলাইশরি’কে আহবান করতে নগ্ন হয়ে নাচের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলতে নারীরা পিছপা হন না! গান চলে—‘হিলহিলাইছে কোমরটা মোর, শিরশিরাইছে গাও’।
সমাজে রোগব্যাধি প্রতিরোধের জন্য করা হয় নানা অনুষ্ঠান। বনজঙ্গল সাফ করা থেকে ‘মেলেনি মাসি’ বা ‘হ্যাঁচড়া’ পুজোর আয়োজন চলে। অন্যদিকে, সার্বিকভাবে ফসল কামনায় জাড়িয়ে থাকে ভাদু, টুসু জাওয়া বা কার্তিকপুজো। লক্ষণীয়, মেয়েদের এসব অনুষ্ঠানে না থাকে কোনো সংস্কৃত মন্ত্র অথবা আলাদা করে পুরোহিত। ফুল দিয়ে সাজানো, আর নাচগানের মধ্য দিয়ে আচার-অনুষ্ঠান এগিয়ে চলে। কুমড়ো, লাউ, আকন্দ, দুধলির মতো আশেপাশে ফুটে থাকা ফুলে সাজানো ও একের-পর-এক গান—এই হলো মেয়েদের সমবেত আরাধনা। ‘গান্ধিলার ফুল তুলো, চলো ঘাটে ধুইয়ো’;—এই গান মালদায় শুনলে, বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় শুনি—‘তিরিশটি দিন রাখলাম মাকে তিরিশটি ফুল দিয়ে গো’। গানের সঙ্গে কোথাও থাকে নাচ, তাই ডাক পড়ে ঢাকুয়া, ঢুলিয়া বা মাদলইল্যার—‘আমার বাড়ি কাতিপূজা ঢাকের বায়না দে’ বা ‘যত টাকা লাগে গুণগার/ তবু না ছাড়িব বাজনদার’…
উত্তরের গোয়ালপাড়া থেকে দক্ষিণের মেদিনীপুর, উৎসবের সুরে মিলে যায় গোটা সমাজ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধ থেকে স্বদেশের ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে মানুষের মনে স্থায়ী হতে শুরু করার সময়ে এসে পড়ে বঙ্গভঙ্গ ও তার বিরুদ্ধে আন্দোলন। এইসময়ে গান হিশেবে শুধু নয়, ধ্বনি হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’ ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার আনাচ-কানাচে। হাওয়ায় ভেসে সেই ধ্বনি যেন-বা ঠাঁই নিয়েছিল মেয়েদের মনেও। তাঁদের ঐতিহ্যবাহী বিবাহগীতের মধ্যে মিশে গিয়েছিল তার অনুরণন। চাল ঝাড়তে ঝাড়তে মেয়েরা তখন গেয়েছিলেন :
পাটিতে ঢালিয়া চাল, চাল করে আলঝাল
সবে বলে বন্দে মাতরম্
—উৎস : ফরিদপুর
জলভরার গানেও শুনি ‘বইলে বন্দে মাতরম,/ কইলকাতাতে ভইরে গো আনলাম কালিতলার জল…/ বইলে বন্দে মাতরম’ (কুমিল্লা)। বিদেশি জিনিস বর্জন করে, স্বদেশী ব্যবহারের ডাক তাঁরা দিয়েছিলেন নানা অঞ্চলের গানে—‘দেশি সাজন চমৎকার পরো বন্ধু একবার/ বিলাতিতে মন দিও না’ (ফরিদপুর)। অথবা ‘স্বদেশী সিন্দুর দিয়ে করাবো সাজন/ সেন্দুরের মদ্যি লেখা বন্দেমাতরম (কিশোরগঞ্জ)। আন্দোলনের অভয়মন্ত্রে মেয়েরাও উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বলেই ইংরেজের পানসিকে তাঁরা ঠেলে দিতে দ্বিধা করেননি, যেমনটা আমরা শুরুতেই দেখেছি। দেশকালের ভাবনায় অনক্ষর মেয়েরা এভাবেই তাঁদের স্বাক্ষর রেখে যান।
ঘর তো শুধু কাঠামো নয়, ঘরের মানুষজন হলো এর প্রাণ। মেয়েদের এই বাপের বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ি মিলিয়ে এত ধরনের সম্পর্ক, এক-একটা সম্পর্কে এতরকম ভাঁজ, আর তা নিয়ে এত অজস্র গান ছড়িয়ে আছে বাংলাজুড়ে,—এর সবটাই পৃথক গবেষণা ও প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে। রানাঘাটের কাছে আনুলিয়ার সর্দারপাড়া থেকে সংগৃহীত এরকম একটা গানে বাঁধা অভিজ্ঞতার উদ্ধৃতি দিয়ে আপাতত ইতি টানছি :
বাপের ঘরের পিছাড়ে ঢাকল ঢাকল পাত গো
মায়ে বাঢ়ে মুঠায় মুঠায় ভাত
শ্বশুরঘরের পিছাড়ে ছুটু ছুটু পাত গো
সাসে বাঢ়ে দু’টি দু’টি ভাত।
—উৎস : রানাঘাট
বাংলার মেয়েদের মুখে মুখে রচিত এরকম গানগুলো আমাদের সামনে রত্নভাণ্ডার খুলে দিতে পারে। যে-রত্নভাণ্ডারের অন্বেষণ, সংরক্ষণ ও যুগ-উপযোগী প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব সকলের। অন্যথায়, আমরা হারিয়ে ফেলব আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এমন এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎস, যা পরে হাজার চেষ্টা করেও হয়তো উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
‘মধুরবান্ধা’ গানের গোড়ার কথা : সজল কান্তি সরকার
বান্দিপুরাণ : সজল কান্তি সরকার
চেনা গান, অচেনা গীতিকার-৫ : সজল কান্তি সরকার
চেনা গান, অচেনা গীতিকার-৪ : সজল কান্তি সরকার
চেনা গান, অচেনা গীতিকার-৩ — সজল কান্তি সরকার
চেনা গান, অচেনা গীতিকার-২ — সজল কান্তি সরকার
চেনা গান, অচেনা গীতিকার-১ — সজল কান্তি সরকার
. . .
লেখক পরিচয় : চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও পুরাণসাহিত্যের নিবিড় অন্বেষক চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়-এর পরিচয় ছড়িয়ে আছে তাঁর বৈচিত্র্যধর্মী কাজের মধ্যে। গ্রামীণ নারীদের গার্হস্থ্য ও কর্মজীবন থেকে উৎসারিত গানের তালাশে তিন দশকের বেশি সময় ব্রত আছেন এই গবেষক ও গান সংগ্রাহক। বাংলার কৃষি কেন্দ্রিক জীবনধারায় পল্লীবালাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য তাঁর গবেষকমন সংবেদনশীল বয়ানে তুলে এনেছে শহুরে সমাজের কাছে প্রায় অপরিচিত এক জগৎ। লোকসংস্কৃতির মৌখিক ধারা বা ওরাল ট্রাডিশনকে নিজের গবেষণার আধার করেছেন চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়। যেখানে শ্রমজীবী নারীর ভূমিকা ও বিচিত্র সাংগীতিক উৎস সৃষ্টির ইতিহাস তাঁর কাজের ভিতর প্রতিফলিত।

তিন দশকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, গানের সংগ্রহ ও এগুলোর সামাজিক পটভূমির সঙ্গে পাঠককে অন্তরঙ্গ করতে লিখেছেন একাধিক বই ও গবেষণা নিবন্ধ। ‘শরীরকথায় মেয়েরা’, ‘নারীর গান, শ্রমের গান’, ‘বাংলার বিয়ে গান’ এর মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রান্তিক সমাজে মেয়েলি গীতের বিশেষ ধারা নিয়ে অনলাইন মুখপত্র ‘রোববার’, ‘বঙ্গদর্শন’-এ লেখালেখির পাশাপাশি ‘গিদালি’ ইউটিউব চ্যানেলে এসব গান সংরক্ষণ ও ভিডিও পডকাস্টে সক্রিয় এই গুণী গবেষক।
বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে যেমন তিনি তুলে এনেছেন বাংলার লোকসমাজে সৃষ্ট সেইসব গানের বিবরণ, যার বৃহৎ অংশ সময়ের পালাবদলে বিলুপ্ত হতে বসেছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে শ্রমজীবী নারীদের মহলায় মুখে মুখে বাঁধা বিচিত্র গানের সমাজ-ইতিহাসটাও। চন্দ্রা মুখোপাধ্যায় তথাপি একাগ্রমনে বিলুপ্তির সম্মুখীন এই গানভাণ্ডারের তালাশে ঘুরছেন গ্রামবাংলা।
গ্রন্থী ছোটকাগজ সম্পাদক কবি শামীম শাহান -এর সৌজন্যে প্রাপ্ত ও থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়ের বক্ষ্যমাণ নিবন্ধটি যথারীতি অনামা সেইসব গীত রচয়িতার স্বতঃস্ফূর্ত ও সমবায়ী সৃজন পদ্ধতিকে ধারণ করেছে। নিবন্ধটির জন্য কবি শামীম শহানের কাছে সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।
. . .

চন্দ্রা মুখোপাধ্যায় : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম


