পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

যে তুমি ‘হরণ’ ও ‘বিনাশ’ করো-র জেন-জি

Reading time 8 minute
5
(7)

দিল ওয়ালো কে দিল কা কারার্ লুটনে
ম্যায় আয়ি হু ইউপি বিহার লুটনে

Zen-Z Protest South Asia; Image Source & Credit: Collected; Google Image

জেন-জি প্রজন্মের মতিগতি বোঝা কঠিন! শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশের দেখানো পথে রাস্তায় নেমেছিল ভারতের জেন-জি। দাবি আদায় করতে নেমে সরকারকে গদি থেকে ফেলে দেওয়ার হট্টগোলে মেতে থাকল কিছুদিন। সমাজমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে খবর ও রিলের বন্যা দেখেছে বিশ্ব। যুক্তিসংগত দাবি নিয়ে ভারতের জেন-জি রাস্তায় নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু ফলাফল ঘরে তুলতে পারল কি?

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বছরের-পর-বছর ধরে চলে আসা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তো রয়েছেই,—কর্মসংস্থান জটিলতা ও পারিবারিক অন্যান্য চাপ সামাল দিতে না পেরে ভারতে প্রতি বছর গড়ে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী নিজের প্রাণ স্বেচ্ছায় হরণ করে। সরকারি পরিসংখ্যান গত দশ বছরে লাখো শিক্ষার্থীর এরকম স্বেচ্ছাহননে যাওয়ার তথ্য দিচ্ছে

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এই ‘নিয়মে পরিণত হওয়ার ছবি’ কেবল ভারতের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটা দেশে মিলবে। ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন বুকে পুষে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিনারি যদি বারবার রিপিট হতে থাকে,—ক্ষোভের বিস্ফার একটা সময় এসে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বিগত বছরগুলোয় তা হয়তো ঘটতে গিয়েও ঘটেনি, ২০২৬ সনে এসে পুঞ্জিভূত ক্ষোভটা রাস্তায় ফেটে পড়ল। সরকারের বিরুদ্ধে পরিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কাজেই অবান্তর ভাবার অবকাশ নেই।

ভারতে সরকারবিরোধী আন্দোলন অতীতে যেমন ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লির মসনদে রাজত্ব করার সময় খাদ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে সাড়া দিয়ে বিহার থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন জরুরি অবস্থায় মোড় নিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে পরবর্তী নির্বাচনে মানুষ প্রত্যাখ্যান করে। ক্ষমতার মসনদ যদিও পরে পুনুরুদ্ধার করেন ইন্দিরা;—জেপি নারায়ণের নামে স্মরণীয় আন্দোলনটি যদিও তাঁর নিদ হারাম করে দিয়েছিল তখন।

ধারাবাহিক সব অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সমর্থন, সহানুভূতি ও ‘বিস্ফার’ কাজেই নতুন নয়। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জনবিস্ফারকে অতীত আন্দোলনগুলোর অনুরণন ভাবা যায় ‘হয়তো’! ‘হয়তো’ এ-কারণে বলছি,—অকালে পরিশেষ টানতে বাধ্য আন্দোলনটি লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। একটা এজেন্ডার ভিতরে স্রোতের মতো এজেন্ডার অনুপ্রবেশ এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মানুষের মনে সংশয় তৈরি হতে তাই সময় লাগেনি। অতীতে সংঘটিত আন্দোলনগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে সমাজে পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্নমত ছিল, তবে লক্ষ্য ও প্রেরণায় স্বচ্ছতার খামতি থাকেনি। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া জনবিস্ফারটির বিশ্বাসযোগ্যতা সেখানে নড়বড়ে ও সন্দেহজনক মানতে হচ্ছে।

হরকিছিমের আরশোলারা মিলে একটা ‘জনবিস্ফারকে’ একা খেয়ে দিলো! ভারতজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের মূল বারুদ জেন-জির দলবেঁধে রাস্তায় নামার দৃশ্যটা ছিল স্বাভাবিক। তবে, বাংলাদেশ ও নেপালে ঘটে যাওয়া আন্দোলনে দেখে ফেলা কিছু দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি সব মাটি করে দিয়েছে। জেন-জিকে দাবার বড়ে বানিয়ে সিনিয়র প্রজন্মের ধেড়েলরা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। পৃথিবীকে দোজখ বানানোর কাজে সুদক্ষ ধেড়েলরা মানবধরায় গিজগিজ করছে। খতরনাক ওই মালগুলোর চক্করে পড়ে আন্দোলনের মেওয়া ভারতের জেন-জি স্বেচ্ছায় নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দিয়েছে!

সাচ্চা দাবিকে সংহত ও ন্যায্য প্রমাণের দায়বোধ থেকে বুড়ো আরশোলারা জেন-জিদের সঙ্গী হয়নি। ভারতের অখণ্ডতা ভেঙে খানখান করার পরিকল্পনায় তারা খেলতে নেমেছিল। নিজেকে বালপাকনা ভেবে মহা পরিতুষ্ট জেন-জি যার বিন্দুবিসর্গ টের পাওয়ার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বুড়ো আরশোলারা জানত,—এই টিকটকারদের দিয়ে ভালো বিভীষিকা কায়েম করা যায়শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালে করা গেছে, ভারত সেখানে কোন চ্যাটের বাল-যে ওটা করা যাবে না? সরকার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি ডিল করায় বুড়ো আরশোলাদের উদ্দেশ্য অপাতত ভেস্তে গেছে।

মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা লাডলি জেন-জি কোনোকিছু তলিয়ে দেখার ধৈর্য ও গভীরতা রাখে না;—বাংলাদেশ ও নেপালের ঘটনায় তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। বুড়ো আরশোলাদের মিশন সফল করার হাতিয়ার রূপে তারা ব্যবহৃত হবে;—অনেকে সেটা আগেভাগে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। কার্যত তাই ঘটেছে ভারতে। সরকারকে চাপে রাখার নাম করে বিশ্বকে তামাশায় ভরপুর বিনোদনে মাতিয়ে রেখেছিল ভারতের জেন-জি।

দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতার মতো মস্ত শহরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ সয়লাব ছিল মৌজ-মাস্তির মুজরোয়। কী ছিল না বটেক! মার্ভেল কমিকের বাটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানরা সেখানে হাজির ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, রবি ঠাকুর, নজরুলও বাদ পড়েননি। এঁনাদের সাজে সেজে জেন-জি হরবোলারা টানা সার্কাস দেখিয়েছে রাস্তায়। আধন্যাংটা মেয়েগুলো ক্লিভেজ ও নাভির সুড়ং শুধু নয়, যোনিকেশ দেখিয়ে এনজিও স্টাইলে শো-অফ করেছে প্রচুর! মনে হচ্ছিল ব্যারিকেড, লাটিচার্জ, বারুদ আর টিয়ার গ্যাসে উত্তাল আন্দোলন নয়, বরং টিকটকের মহড়া দেখছে মানুষ! জেন-জি প্রজন্ম টিকটক বিশারদ বটে!

পুলিশকে টিকটকের খোরাক করতে তারা উপহার দিয়েছে লাল গোলাপ। ‘শাদি করেগা মুজকো?’—মশকরার ছলে বিয়ের প্রস্তাব দিতে বাকি রাখেনি জেন-জি তরুণী। আর, রাস্তায় নাচাগানা, খানাপিনা ও কামাসনের মচ্ছব উল্লু প্লাটফর্মে দেখানো রগরগে ছবিকে হার মানতে বাধ্য করেছিল। কামসূত্রকে তারা নামিয়ে আনল রাজপথে। বিশ্ব আরো দেখেল চ-বর্গে সয়লাব ভাষার বাহার! প্রধানমন্ত্রী মোদি থেকে উজির-নাজির পর্ষদ ও তাদের বাপ-মাকে একখালে ভাসিয়ে টানা খিস্তি মেরে গেল রাতদিন মোবাইল স্ক্রিনে পড়ে থাকা বাপ-মায়ের লাডলি ছেলেমেয়েরা।

Gen-Z Protest Graph; Image Source & Credit: the.graphic.earth Instagram

নিজের তৈরি ফ্যান্টাসিতে ডুবে থাকা অরুন্ধতী রায়ের মতো চরিত্রদের কাছে এগুলো বিপ্লবের অনিবার্য ভাষা মনে হতে পারে, ‘টাবু ভাঙছে ওরা’ ভেবে পোস্ট-মডার্ন সুখে পুলকিত বোধ করতে পারেন, কিন্তু সত্যটা হলো,—জেন-জি প্রজন্মের বাইরে বিপুল মানুষ ছেলেমেয়েদের এসব বালপাকনা তামাশায় প্রথমে বিনোদিত হলেও দ্রুত বিরক্ত ও রুষ্ট হয়ে ওঠে। আন্দোলনটি যে-কারণে রগরগে তামাশায় এসে ইতি টানতে বাধ্য হয়েছে।

রগরগে এই তামাশার তোড়ে এর মূল লক্ষ্য শুরুতে যেটুকু ছিল বলে মনে হচ্ছিল, তা গেল ভেসে! দশ-বারো-চৌদ্দ হাজার করে স্বেচ্ছাহননে যাওয়া ছেলেমেয়ের কথা কে আর মনে রাখে ভাই! খোদ জেন-জি তাদেরকে ভুলে থাকল বেমালুম! তারা বুঝতে চাইল না,—সরকার চুপচাপ মোক্ষম দান ফেলার অপেক্ষায় আছে। সময় হলে দানটি ফেলবেন মোদিজি, আর তাতেই ওপেনটি বাইস্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ আওরাতে-আওরাতে মেওয়া ভরবেন নিজ পকেটে।

অবশেষে তাই হয়েছে। জেন-জি বিনোদনে ভরপুর আন্দোলনের ক্রিম মোদিজির সরকার ভোগ করতে যাচ্ছেন সামনে। লোকসভা ও বিধানসভায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী আসন সংখ্যা বাড়ানো ও পুনর্বিন্যাসের বিল পাস করানো নিয়ে সমস্যায় ছিল সরকার। কঠিন কাজটিকে জেন-জিরা সহজ করে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, লোকসভায় আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে সাড়ে আটশোয় উঠছে। বিজেপি নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলো, বিশেষত উত্তর ভারত ও রাজস্থানে জনঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে আসন সংখ্যা অত্র অঞ্চলগুলোয় অধিক হওয়ার কথা। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের রাস্তা বানিয়ে নিলেন নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেস, আম আদমি কিংবা বাম নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জনঘনত্ব কম,—তেনাদের ভাগে অগত্যা জুটছে কাঁচকলা।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বিলটির বিরোধিতা করে আসছিলেন মোদি বিরোধী শিবির। আন্দোলনের কারণে পরিস্থিতি বদলে গেছে। আসন সংখ্যার পুনর্বিন্যাসের জন্য ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল তো ছিলই, নাটের গুরু এনজিওর মাধ্যমে আসা অনুদানের সন্দেহজনক ব্যবহার ঠেকাতে প্রস্তাবিত আইন সংসদে পাশ করানো নিয়েও ঝামেলায় ছিল বিজেপি। এরকম অনেকগুলো বিল আসন্ন বাদল অধিবেশনে টপাটপ পাশ করানোর মওকা উদ্ভটরসে নিমজ্জিত আন্দোলনটি সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে! জেন-জি সোনারা, বোঝাই যাচ্ছে, ব্যবহৃত বলদ হয়ে পুনরায় ফেরত যাবে টিকটক ও রিল বানানোর দুনিয়ায়। সরকারকে মধ্যম আঙুল দেখানো বাচ্চারা এখন অবসন্ন! বাংলাদেশ ও নেপালের মতো ভারতেও তাদের অর্জনের ঝুলি শূন্য থেকে গেল মনে হচ্ছে।

ষাট-সত্তর থেকে নব্বই দশকের পরিসীমায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মরা বিশ্বজুড়ে বিরাট আন্দোলন জন্ম দিয়েছে অতীতে। সমাজ বদলের নেশায় নিজেকে হত্যা হতে দেওয়ার ভয় তাদেরকে কাবু করতে পারেনি। জেন-জির মতো তারাও মতলবি লোকজনের হাতে ব্যবহৃত ও প্রতারিত হয়েছে। তারাও ব্যর্থ ছিল বা ব্যর্থ হতে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছিল। তবু, ষাট-সত্তরের বেবি বুমার্স, নব্বইয়ের জেনারেশন-এক্স বা পরবর্তী মিলেনিয়াল প্রজন্মের আন্দোলনে সৃষ্টিশীলতার ঘাটতি ছিল না। জেন-জি প্রজন্মের আন্দোলনে এর নজির বিশ্ব এখনো দেখতে পায়নি!

বেবি বুমার্স, জেনারেশন-এক্স বা মিলেনিয়ালরা জীবনবোধের মাপে গভীর ও নিবেদিত ছিল। দশকের-পর-দশক ধরে অনন্য সাংস্কৃতিক মুহূর্ত বিশ্বকে উপহার দিয়েছে। ব্যর্থতা ও প্রতারিত হওয়ার বেদনা ছাপিয়ে কেবল এই একটি অর্জনের গুণে তারা স্মরণীয় হয়ে আছে বহু মানুষের অন্তরে। প্রেরণাদায়ী অগ্নিশিখা হয়ে অনেকের হৃদয়ে বেঁচে আছে তাদের করা আন্দোলন। দূর ভবিষ্যতেও এগুলোর প্রাসঙ্গিকতা অটুট থাকবে বলেই আমরা ধরে নিতে পারি। জেন-জিরা এখনেও ব্যর্থ। আমরা, বুড়ো আরশোলার দলবল ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়েছি এই বাচ্চাগুলোকে! মায়া হয়, সত্যি মায়া হয় তাদের মুখের দিকে তাকালে।

জেন-জি প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আসলে হতভাগা। যেসব বেবি বুমার্স কিংবা জেনারেশন-এক্স একটা সময় সৃষ্টিশীল বিস্ফারে দুনিয়া কাঁপিয়েছে, সময়ের সঙ্গে তারা সৃষ্টিশীল থাকেনি। সিস্টেমের সঙ্গে আপস করেছে একযোগে। তারাই আবার জেন-জির জন্য পৃথিবীজুড়ে দোজখঠাসা এক পরিবেশ গড়ে তুলেছে । টাকা কামানো, ফান ও মাস্তি ছাড়া কিছু অবশিষ্ট রাখেনি উত্তর প্রজন্মটির জন্য। ফলাফল,—আমেরিকার জেন-জি প্রজন্মের একাংশ স্মার্টফোন ছেড়ে বাটনফোন হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। স্মার্টফোনের পর্দায় দেখানো জগতে ঘুরে বেড়াতে তাদের ভালো লাগছে না! তারা এখন সমুদ্রসফেন ক্লান্ত। ম্যাসেজিং, টিকটক ও এআইর সঙ্গে পাল্লা দিতে নেমে গভীর বিবমিষা ও বিষাদরোগ তাদের দেহমন খুবলে খাচ্ছে প্রতিদিন।

শোনা যায়, ফ্যাটিগ ভালোভাবে চেপে ধরেছে আমেরিকান জেন-জির একাংশকে। স্মার্টফোন ফেলে ফ্লিপফোনের পানসে জগতে ফেরার জন্য উতলা হয়েছে। ফ্লিপফোনে তোলা ছবি, তারা বিশ্বাস করে,—এটা অন্তত রিয়েল হবে। স্মার্টফোনে তো সবটাই ফিল্টারের কারসাজি। এআইকে দিয়ে রঙিন ও চকচকে করা ব্যাপার নেই আর! বাটনফোনের দুনিয়ায় ফিরতে চায় ভালো কথা, কিন্তু ওটা-যে পুনরায় ক্লান্ত করে তুলবে না,—এই গ্যারান্টি কি দিতে পারবে তারা? উদ্দেশ্যহীন অবসন্ন আমেরিকার জেন-জি;—হায়!

উপমহাদেশের জেন-জি ওদিকে সরকারের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত, হতাশ ও বিভ্রান্ত। বুড়ো বদমাশরা তাদেরকে নিয়ে খেলা করছে;—এই সত্যটি বোঝার অবস্থায় তারা নেই। নেপালে নিজ পছন্দের সরকার বসিয়েছিল। তাকে ফেলে দিতে আবার রাস্তায়। বালেন্দ্র প্রসাদের সরকারের বয়স ছয় মাস পার করেনি এখনো। জেন-জিরা এরিমধ্যে বুঝে গেছে,—এই শালা বালেন্দ্রকে দিয়ে ‘বাল’ ছেঁড়া যাবে না সিস্টেমের। হায় নেপালিজ জেন-জি!

Gen-Z Protest Graffiti; Image Source & Credit: Collected; Google Image

বাংলাদেশের সিনারি আবার অন্যরকম! সরকার ফেলার মাস্তি নাইটমেয়ার হয়ে তাড়া করছে অনেক জেন-জিকে। শোধ তুলতে খিস্তি ও আক্রোশে ভরপুর ভাষা-দুনিয়া তারা বানিয়ে নিয়েছে। শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি, তারেক রহমান, ভারত অথবা ইউনূস থেকে আরম্ভ করে কারো রেহাই মিলছে না;—চুটিয়ে খিস্তি করে যাচ্ছে সবাইকে। উপমহাদেশের জেন-জি চ-বর্গ ছাড়া দ্বিতীয় ভাষা ব্যবহারে অক্ষম!

আমাদের মতো বুড়ো বদমাশগুলোর জন্য এর সবটাই বিরক্তি ও তামাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! ভারতে একই ছবি দেখতে হচ্ছে পুনরায়। দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতা শহরে একপাল বুড়ো বদশমাশের সঙ্গে তাল দিয়ে হাঙ্গামা ও তামাশার অ্যান্ডসিনটা বিহার প্রদেশে ঘটিয়েছে ভারতের জেন-জি! শিল্পা শেঠি স্টাইলে আইটেম সংয়ের মহড়া দেখতে সবাইকে বাধ্য করেছে তারা। ‘ম্যায় আয়ি হু ইউপি বিহার লুটনে’ গাইতে-গাইতে মোদি সরকারকে ট্রিট দিলো বিহারি জেন-জি। পুলিশ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিকম্মা বানিয়ে রাখল তামাশাভরা সার্কাসের বাহার দিয়ে!

যে-আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান ঘটানোর জন্য সরকারকে বাধ্য করা, সেই আন্দোলনটা দিল্লি ও মুম্বাইয়ে আগেই বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। বুড়ো আরশোলাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে একে সঠিক রাস্তায় ফেরত আনার কঠিন কাজটি জেন-জিরা করে উঠতে পারেনি। এলেম নাই,—পারবে কী করে! আন্দোলন ভেস্তে গেল দেখে বিহারি জেন-জি আর দেরি করেনি,—নিজহাতে ওটাকে নিকাশ করেছে পাটনায়।

তারা বুঝে গিয়েছিল,—আন্দোলনটির পেছনে কোনো দল নেই, নেতা নেই, নেতৃত্ব নেই, কর্মসূচী নেই, সংহতি ও লড়ে যাওয়ার ক্ষুধাটাও মৃত। কিছু যেহেতু নেই, একে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মকারি দিয়ে মেরে ফেলাটাই বরং পুণ্যের কাজ। বিহার তা দাপটের সঙ্গে করে দেখিয়েছে। শিল্পা শেঠির আইটেম ফেল মারবে সেখানে! দিনভর মকারি দিয়ে পুলিশি প্রতিরোধ অচল করে দিয়েছিল তারা। নেট দুনিয়ার মানুষ বিনোদনটা উপভোগ করেছেন মনভরে। বিহারের জেন-জিকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সকলে মিলে। কিন্তু, আড়ালের আর্তনাদ নেটিজেনরা টের পেলেন কি? বিহারে জেন-জিরা যে-কাণ্ড করেছে, তা আর নিছক তামাশা থাকেনি দিল্লি, মুম্বাই কিংবা কলকাতার মতো,—সেখানে উঁকি দিয়ে গেছে হাহাকার ও নিরাশায় ভারাতুর তরুণ হৃদয়ের আর্তনাদ।

বিহারি জেন-জি যেসব মশকরা পুলিশের সঙ্গে করেছে, এর সবটাই কি মোদি সরকারকে নাজেহাল করার জন্য করেছে? এমনটা ধরে নেওয়া সরলীকরণ হয়ে যাবে। ভারত ও দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমাদের মতো বুড়ো বদমাশের জন্য ওটা ছিল সতর্কবার্তা। বিহারি জেন-জির কাণ্ড উপভোগে ব্যস্ত সিনিয়র নেটিজেনরা তা উপলব্ধি করতে পারছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেল না! আত্মসমালোচনা করতে দেখা গেল না কাউকে!

আরে ভাই, আমরা, বাপ-মায়েরা হচ্ছি আসল ক্রিমিনাল! গভীরতাহীন ঠুনকো পরিবেশে ছেলেমেয়েগুলোকে জন্ম দিয়েছি। এমন এক পরিবেশ, নিজের হাতে আমরা ওটা বানিয়েছি এবং স্বেচ্ছায় কবর খুঁড়ছি তারপর থেকে। নিজেকে গড়েপিটে নেওয়া আমাদেরকে দিয়ে হয়ে ওঠেনি। বাচ্চাগুলোকে গড়েপিটে নেওয়ার দায় তাই আমাদের মধ্যে গভীর নেই এখন। দোজখে ঠাসা ধরায় জেন-জিগুলো অবিকল আমাদের নকল! দমবদ্ধ এক খাঁচায় আমরা নিজেকে পিষে মারছি। বাচ্চাগুলো সেখানেই জন্ম নেওয়ার কারণে আবর্জনায় পরিণত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভবিষ্যৎ তারা পাবে কোথায়!

জেনারেশন গ্যাপের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায়মুক্তি খুঁজছি সকলে। সেটা করার অধিকার কি আছে কারো? রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারকে বিষাক্ত রেখে কোনো প্রজন্মের কাছে ভালো কিছু আশা করা অবান্তর। সব জেনেবুঝে কেউ কিছু করে উঠতে পারিনি। জেন-জিকে দায়ী করে কী লাভ! সমাপ্তি টানতে বিহারি জেন-জি সুতরাং কাজের কাজটাই করে দেখিয়েছে। আন্দোলনকে মৌজ-মাস্তি দিয়ে লঘু করে দিয়েছে তারা। এর জন্য হলেও তাদেরেক কুর্নিশ ঠুকতে হয় ব্রো!

আপাত হতভম্ব সরকারের অবশ্য তাতে বাল ছেঁড়া গেছে। মোদি বুঝে নিলেন,—এটা এখন তামাশায় গিয়ে অ্যান্ডিং টানছে। তারপর? ‘তারপরটা’ কি বুঝতে বাকি আছে কিছু? পুলিশ এখন তালিকা ধরে হাঙ্গামা বাঁধিয়ে তোলাদের খুঁজে বের করবে। বিরোধীদের দিকে অনেক আগে ছোঁড়া বিজেপিবাণ ‘ঘরকে ঘুসকে মারউঙ্গা’ ষোলকলায় পূর্ণ করবে সরকার। মাঝখান থেকে চাপা পড়ে যাবে রূঢ় সত্যটা,—আমাদের মতো বুড়ো ভাম মিলে বানিয়ে তোলা সিস্টেমের কারণে প্রতি বছর বারো-চৌদ্দ হাজার তাজা প্রাণ ‘যে তুমি হরণ’ করো বলে যায় আত্মহননে।
. . .

NEET Paper Leak Protests: Genuine Protest or Anti-Modi Propaganda? Source: Gaurav Thakur YTC

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

চার্লি কার্ক কতটা ‘বিকল্প’ ছিলেন?

জাতীয় সাহিত্য ও শিশ্নবাসনা

. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *