ক বি তা সি রি জ
বিরহযাপনকাল-১ : মেকদাদ মেঘ

পৃথিবীতে শুরু কিংবা শেষ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন জেগে রয়। বুঝতে হয় শিখতে হয় টোন। ড্রয়িং নিয়ে পেরুতে হয় রেখাঙ্কনের গ্রহ। আলোছায়া সঙ্গে থেকে যায়। কম্পোজিশন ব্যক্ত করে ব্যাপ্ত মহাকাশ। পার্সপেক্টিভ সত্যি প্রয়োজন, আয়োজনের পাতায় পাতায় ক্যানভাসে অর্ধসমাপ্ত কিংবা সমাপ্তির যাত্রায়। দৃশ্য অদৃশ্য সংলাপের মতো অনিবার্য প্রতিক্রিয়া জানায় আনন্দ বিরহ যে-কোনো মুহূর্তে। কাঙ্ক্ষিত চিত্রকর্ম আঁকতে গিয়ে ভাবনার গভীরতা স্পর্শ করে ইস্পাতের মতো দৃঢ় এইসব কথাগুলো কবিতা হয়ে হেসে ওঠে জীবনের বেহিসাবি খেরোখাতায়।
ভালো থেকো কবিতা এইটুকু বললাম,
কবিতা যেন প্রতিনিয়ত নতুন জন্মের নাম।
. . .
২.
বিরহকে পাথরনৃত্য থেকে তুলে এনে
তুলতুলে নরম শরীরে অনেকে ঘুমুতে দিয়ে
হৃদয়ের মুদ্রায় আরেক পৃথিবী ঘুরতে যায়। বিরহবেদনা অগ্নি হাওয়ার গতিবেগ পায়,
শরীরও ক্লান্ত হয় আয়ুর ঘূর্ণনে,
কিন্তু বিরহ বিচ্ছেদ খুব একটা ক্লান্ত হয় না।
৩.
স্বদেশকে বিরহী হতে যেমন দেখতে পারি না
পৃথিবীর বিরহ বিচ্ছেদ তেমনি অসহ্য লাগে,
মানুষ অমানুষের ভারে পৃথিবীও ক্লান্ত হয়ে যায়
যদিও হৃদয়ে মননে কোনো ভয় নেই বিরহবিষয়ক।
৪.
বিরহকে রাজমুকুট পড়ালেও বিরহই থেকে যায়
৫.
মানুষের অন্তরের শূন্যতায় বিদ্যমান বিরহের লাফিং গ্যাস
বিরহকে দেখলে তাই কাকতাড়ুয়ার মতো হেসে উঠি
৬.
সবজিবাজারে অনেক ক্রেতার ভিড়। সেরকম বিরহের বাজারেও অনেক বিরহ। অজস্র ক্রেতার সংলাপ জমা, টের পাই রক্তমাংস হাড়ে। বিচ্ছেদের বাজারে তাই লেনাদেনা বাড়ে।
৭.
বাষ্পের নিচে হিমায়িত স্মৃতি,
অনেকে চুষছে সমবায়ের যান্ত্রিক স্তন
নিয়ন আলোয় স্নাত আদিম গোয়াল,
স্মৃতির চারণভূমি মাঝেমাঝে বন্দি হয়ে যায়;
তবু ভাতের পাতিল থেকে উড়ে জলবাষ্প,
খাঁচায় জেগে ওঠে চিলতে চিলতে কৌমঘ্রাণ। পাস্তুরিত সভ্যতার এপার-ওপারে এখনো
বিরহ বিচ্ছেদের প্রাচীর ডিঙানো কালান্তরে
মাতৃত্বের গন্ধ খোঁজে — ক্ষুধার্ত, মেদবহুল,
একাকী ইশতেহারের মতো মানবজীবন।
৮.
অপরূপ অপরূপা শূন্যতার জানালায় যেন পাখিজন্ম, ঠোঁটে অনন্তের চিঠি, ডানায় মহাদেশ
চোখ দুটি আয়নাযুগল, যেখানে নিজেকে দেখি না, দেখি অনামা নদী প্রতিরাতে চাঁদের হাড় ধুয়ে সকালের কাছে যায়।
অপরূপার চুলের ভিতর অন্ধকার নড়ে যেন প্রাচীন বন ঘুমিয়ে আছে; পাতায় পাতায় তাঁর অসমাপ্ত প্রেম, বিরহগুচ্ছের ভিড়ে পথিকও পথ ভুলে যায়,
অনেকেই গন্তব্যের ভাষা জানে না স্পর্শ — অদৃশ্য আগুন, যা পোড়ায় না, বরফে লুকিয়ে থাকা সূর্যকে মনে করিয়ে দেয়। তোমাকে খুঁজি জ্যোৎস্নার নিচে,
জ্যোৎস্নারও আংশিক অন্ধকার আছে! সেখানে শিকড় তোমার আকাশে, ফুলগুলো পৃথিবীর গভীরে ফুটে অপরূপ অপরূপা, হারানো ঋতুর উচ্চারণ? যেন মানুষের নিঃসঙ্গতা তারই স্বচ্ছ প্রতিকৃতি? জানি না, শুধু জানি — চলে গেলে সময় থামে না, মানুষ সহজে ভুলে না সমুদ্রের নোনাভাষা।
চাঁদের শরীরে চাঁদ নিজের মুখ খুঁজতে থাকে,
বুকের ভিতর দরজা-জানালা খুলে যায় — ওপারে কেউ নেই, কিছু নেই, সে ছাড়া। অপরূপ অপরূপা রূপরূপান্তরে অস্তিত্বের গভিরে জ্বলতে থাকা সৌন্দর্যের আলো।
৯.
কামিনী ফুলের ঘ্রাণে ভিজে যায় রাত,
জানালার কাচে কে আঁকে অদৃশ্য মুখ,
চাঁদ খুলে রাখে স্মৃতির ডাঙর হাত—
নিঃশব্দ শহরে হারায় রঙিন সুখ।
ঘ্রাণ ভেসে আসে সাঁতরায়ে করিডোরে,
যেখানে সময় নিজের ছায়াকে গুনে,
বিকেলেও ঝুলে দরজার পাশে ঘোরে,
পাখি ডেকে যায় কোনো সে অনমক্ষণে।
তবে কি মানুষ — ভুলে গেছে পরিণাম?
ফুলের ভিতর ঘুমে থাকা কোনো কাল,
শরীরে আজও জেগে ওঠে অবিরাম
শৈশবের নদী, জীবনের মায়াজাল?
কামিনীও ঝরে — রাত্রি রাখে তার ঘ্রাণ,
জরায়ুর অঙ্কে তোমার আমার প্রাণ।
১০.
বিরহকে বিষন্নতা একাকিত্বের রেখায় এঁকো না
বিরহও লজ্জা পেয়ে যাবে?
যদিও বিরহের বনে বিরহপুষ্প একাকী ফুটেছে।

১১.
সমুদ্রেরও হাসি কান্না বিরহ রয়েছে। সমুদ্র সন্ন্যাসী হয় সংসারীও হয়। সমুদ্রে বৃষ্টিফোঁটা ফেলে ভাবে
করছে সে সমুদ্রের উপকার। সবসময় সব ভাবনা সত্য নয় মরিচীকার মতো। মেঘে মেঘে সূর্যের আলোকডানায় সমুদ্র তখনও বৃষ্টিজল বাষ্পীভূত করে পৌঁছায় মেঘদল লড়াকু পুষ্পিত মেঘের কাছে,
ফিরিয়ে দেয় জলচক্রে জলপুষ্পের মতো। সমুদ্রের অহংকার নয় এ যেন নীরব দায়, মৌন মৌলিক মৌনতার মতো।
বিরহযাপনকালে মনে হয় প্রকৃতি রাখে না ঋণ,
মানুষ ঋণের ভাণ্ডার আজন্ম বহন করে যায়।
১২.
বিরহদিনে দেখি ডালিমদানা মহাবিশ্বের ভেতর
ঘুমিয়ে আছে অসংখ্য রাত্রির কাছে যেন রক্তের নক্ষত্রমালা। দানায় আঙুল রাখতেই দেখি প্রাচীন বিকেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে পাখিউড়া দিনে নির্বাসিত নদী, ডালিমের লালচে আঁধারে
যেন জন্মের দরজা খুলে আছে
জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেখছে মানুষ
মুখহীন চোখে অসংখ্য পৃথিবীর মতো। সেই কবে বলেছিলে — রক্তেরও স্মৃতি থাকে। ডালিম কাটলে ছুরির ফলায় ফোটে যুদ্ধের নকশা, ছিন্নচিঠি যেন মেলায় হারানো লাল ঘুড়ি।
ডালিমদানা মুখে দিলাম — জিহ্বায় ফুটে উঠল সময়ের রক্তক্ষরণ, যুগল আয়নায় প্রতিটি দেয়াল
মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ডালিমদানা — কি শুধু ফল, নাকি পৃথিবীর ভেতর লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্ব?
তোমাকে ছিঁড়তে ছিঁড়তে পৌঁছে যাই নিজেরই গভীরতম ক্ষতে; দেখি — বীজের মধ্যে নিজেই বসে আছি, অন্ধকারকে জন্ম দিচ্ছি অবিরাম
আলোর মতো।
ডালিমদানাও তোমার ঠোঁটে গলে যায়, কোনো অদৃশ্য বাগানে, ডালিম ধীরে ধীরে পেকে ওঠে,
যেন সমস্ত প্রেম, রক্ত, স্মৃতিপুষ্প আবার একদিন ফলের ভিতর কর্মফল হয়ে জন্ম নেবে জরায়ুর চক্রপথ ঘুরে।
১৩
পরাবাস্তব জলছাপ স্মৃতির কফিনে শুয়ে আছে, হাত বাড়ালেই ‘আলতাপরা’ শূন্যতা। একমুখী নদী — ধুয়ে নেয় জ্যামিতিক অবয়ব।
১৪.
প্রতীকী ভাঙনে কাচের গ্লাস ভাঙলে হয়ে ওঠে সম্পর্কের ডানায় সংলাপের প্রতীক। বিচ্ছেদের করাত দিয়ে কে যেন কেটে নিচ্ছে ছায়া, রক্তরঙে চিৎকার নেই, সেখানে হাহাকার শুয়ে আছে ।
১৫.
বিছানাজুড়ে এ কোন ক্যাকটাসের গুঞ্জন, ঘুমে ডুবে দেখি অন্তহীন রেললাইনে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো।
১৬.
তোমার নিঃশ্বাসের কুয়াশায় অনুপস্থিতর ঘ্রাণ
আঙুল রাখি আঙুলে পাখি উড়ে যায় অন্ধকারে
১৭.
শূন্য চেয়ার জানে বিকেলের বিষণ্ণতা,
তোমার ছায়া যেন অপেক্ষমাণ মানুষের ছায়া।
১৮.
নদীর ওপারে জল শুধু ফিরে ফিরে আসে
তোমার পায়ের শব্দ শুনি জল হাওয়া কাদার ভেতর
১৯.
মহাকাশে তোমার মুখ খুঁজি
গ্রহের দাগগুলোকে মনে হয় না-বলা কথার চিঠি।
২০.
বৃষ্টিতে শুধু প্রকৃতি ভিজে না—
পুরোনো স্মৃতিগুলোও ভিজে নরম হয়,
স্মৃতিও জলের মধ্যে হাঁটে।
. . .
লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম



