দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই, সম্ভবত ১৯৯১ সালের কথা, সফিউদ্দিন স্যার সপরিবার আমার হলে (জগন্নাথ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এলেন। স্যার যে-বিদ্যাপিঠে পড়ালেখা করেছেন তাঁর সেই স্মৃতিমাখা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ‘অপরাজেয় বাংলা’ ইত্যাদি বিষয়-আশয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সেদিন স্যার সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এসেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন বিকেলের মরা রোদ গাছের মাথায় চড়ে বসেছে। মূল ফটক থেকে ডানে এবং বামে দুটি রাস্তা দুদিকে চলে গেছে, সামনে বরেণ্য শিল্পী সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেদ নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘অপরাজেয় বাংলা’র ভাস্কর্য।
স্যারকে বললাম, স্যার ডানদিকে যাবো নাকি বামদিকে যাবো। স্যার তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন—’আমরা তো সবসময় বামে চলি, চলো বাম দিকেই হাঁটি’। সেদিন স্যারের সংক্ষিপ্ত কথার নিগূঢ়তত্ত্ব কিছুটা আঁচ করতে পারলেও, এদ্দিন পরে এসে ঠিকই বুঝতে পারছি—আমৃত্যু তিনি প্রগতির পদাতিক ছিলেন। প্রসঙ্গত, স্যারের বড়ো সন্তান অধ্যাপক সুহেলী সায়লা আহমদ (স্বাতি) আমার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন স্মারকগ্রন্থে তাঁর লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন :
সুমন কাকু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমরা সবাই ঢাকায় গেলাম কোনো কাজে। ঠিক হলো বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাকুর সাথে আমাদের দেখা হবে। আমরা একসাথে ঘুরে বেড়ালাম। কাকু কখনো আমার ছোট বোন সেঁজুতিকে কোলে তুলে নিচ্ছেন, আর হেঁটে হেঁটে চারদিকের সব দেখাচ্ছেন। আবার আরেক হাতে আমার ছোট ভাই সাকীকে ধরে রেখেছেন। আবার আমাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন ‘স্বাতি খেয়াল করে হাঁটো, পাশে রিকশা’। এ-সকল স্মৃতি আজও অমলিন। আজ অনুভব করি উনি কতটা যত্নশীল আর স্নেহশীল ছিলেন আমাদের জন্য।

ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ আজীবন প্রগতিশীলতার পথ ধরে হেঁটেছেন, হোঁচট খেয়েছেন বারবার, কিন্তু শিরদাঁড়া সোজা করে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে হেঁটেছেন বহু দূর। ছাত্রজীবনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে দুবার কারাবরণ করতে হয়। সত্য-ন্যায় আর মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রগতির পথে তাঁর যাত্রা ছিল অবিশ্রান্ত-অবিচল। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে স্যারের সম্পৃক্ততা ছিল আইডিওলজিক্যাল কমিটমেন্টের জায়গা থেকে। নীতি-আদর্শে অনড় ছিলেন। দু’দফায় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সংগঠনকে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, সেখানে মুক্তচিন্তা/প্রগতিশীল চিন্তার চর্চাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কৃতি তাঁর কাছে ছিল সমাজ রূপান্তরের এক কার্যকর মাধ্যম। শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। বেশভূষা চিন্তা-চেতনায় আপাদমস্তক বাঙালি তিনি। তাঁর দেহ-আঙ্গিক, ঝাঁকড়া চুল, সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে চপ্পল, হাতে ডায়েরি, পকেটে কলম… ইত্যকার বিষয়াদি যেন চিরচেনা বাঙালি অধ্যাপকের সাক্ষাৎ রূপায়ণ! তাঁর চলনে-বলনে রাবীন্দ্রিক এক আবহ বিরাজ করত। স্যারের কথাবার্তায়/ বাক্যবিনিময়ে অবয়বজুড়ে ছিল স্মিত হাসির রেশ, যা ছাত্রদের কাছে টানত।
অসংখ্য ছাত্রের নামধাম স্যারের মুখস্থ ছিল। পথেঘাটে দেখা হলেই ছাত্রদের বলতেন : ‘কেমন আছো, বাসায় এসো’। যান্ত্রিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে ক’জন শিক্ষক অমন মায়ামাখা কথা বলেন! শ্রেণিকক্ষে পিনপতন নীরবতা সৃষ্টিকারী এক সম্মোহক শিক্ষক তিনি। নেত্রকোণা কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করে বরিশালের বিএম কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ ও সিলেটের এমসি কলেজে দীর্ঘদিন পাঠদান করেন। পরবর্তীতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়েছিলেন।
নিজ বিভাগে পড়ার কারণে এম সি কলেজে আমার পড়ার সুযোগ হয়নি, শুধু স্যারের ক্লাস করার জন্য মাঝেমধ্যে উপস্থিত হতাম আর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আস্বাদন করতাম;—এ আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। স্যারের পাঠদান ভঙ্গিমা ছিল ললিতময়, মুগ্ধ বিস্ময়ে আমরা আত্মস্থ করতাম। ডিরোজিও নামের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে স্যারের পাঠদান থেকেই। ঊনবিংশ শতকের সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করার জন্য ডিরোজিও নেতৃত্বে নব্যবঙ্গ আন্দোলন (Young Bengal Movement) সূচনা হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একদল যুবক ডিরোজিওর সঙ্গে তৎকালীন সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রতি সোচ্চার হয়েছিলেন। সমাজকে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণ এই আন্দোলনকে নব্যবঙ্গ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।

সফিউদ্দিন স্যারের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণ। তাঁর গ্রন্থ ডিরোজিও এবং ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট বাংলা গবেষণা সাহিত্যে এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। ডিরোজিওকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের একজন অনুঘটক হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন সেখানে। নবজাগরণকে শুধু সহজ-সরল প্রগতির ধারা হিসেবে নির্ণয় না-করে বরং এই জাগরণকে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব, যুক্তিবাদী চেতনার উন্মেষ এবং সমাজ-সংস্কারের অন্তর্গত টানাপোড়েনের আলোকে ব্যাখ্যাও করেছেন। ডিরোজিও’র চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতার বাস্তব প্রতিভূ ছিলেন সফিউদ্দিন স্যার, তিনি ছিলেন আমাদের সময়কার ডিরোজিও।
বাঙালির ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে তিনি লালন/ চর্চা করতেন তাঁর জীবনাচারে। একদিন স্যার আমাকে বললেন, ‘চলো আজ কিছু বাসন-কোসন কিনে নিয়ে আসি, এখানে কাঁসা-পিতলের দোকান কোথায়?’ এ-যে আমাদের পৈতৃক ব্যবসা তা স্যারকে জানিয়ে স্যারসমেত মহাজনপট্টি এসে কাঁসর থালা-বাটি-গ্লাস-জগ ইত্যাদি কিনে নিয়ে গেলাম। স্যারকে নিয়মিত কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র ব্যবহার করতে দেখেছি। স্যার ছিলেন মৃত্তিকাশ্রয়ী মানুষ। ১৯৪১ সালের ১৯ অক্টোবর নরসিংদীর রায়পুরায় জন্মগ্রহণ করে, আমৃত্যু থেকেছেন শেকড় সংলগ্ন। সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে ছিলেন প্রবাদপুরুষ। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে তাঁর পদচারণায় সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা প্রাণময় হয়ে উঠেছিল।
সিলেট অঞ্চলে আয়োজিত অনেক অনুষ্ঠানে স্যারের অনুগামী হিসেবে যোগদানের দুর্লভ সুযোগ ঘটে আমার। মনে পড়ে সম্ভবত ১৯৯৪ সালে জগন্নাথপুর উপজেলার হবিবপুরে ‘জাগরণী পাঠাগার’ উদ্বোধনকালে স্যারের সঙ্গে সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, এবং ডায়াসে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। স্যারের বাসাটি ছিলো যেন সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার একটা তীর্থক্ষেত্র! প্রায় প্রতিদিনই বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত স্যারের ছাত্র ও গুণগ্রাহীদের আগমনে ড্রইংরুমটি সাহিত্য আসরে পরিণত হতো। সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিদগ্ধজনরা এখানে আসতেন। সম্ভবত ১৯৯৩ সাল, একদিন সন্ধ্যায় আমরা স্যারের ড্রইংরুমে বসে আছি। কলিংবেল বাজলে আমি দরজা খুলি। দরজায় দাঁড়িয়ে বাউল শাহ আবদুল করিম। আমি আদাব দিয়ে উনাকে ভেতরে নিয়ে আসি। তিনি ড্রইংরুমে ঢুকে মোড়াতে (বেতের নির্মিত বসার টোল) বসতে চাচ্ছেন, স্যার সোফা থেকে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলেন, বললেন : ‘করিম ভাই আপনি সোফাতে আমার পাশে বসুন’। মহাজনদের অমন শিষ্টাচার আজও মনে গেঁথে আছে।
প্রায় দিনই অতিথি আপ্যায়নে ভাবির তোড়জোড় ছিল প্রশংসনীয়। ভাবি নীরবে সহাস্যবদনে অতিথি আপ্যায়ন করতেন। তাঁর আপ্যায়নে প্রাণের পরশ ছিলো। রন্ধনশিল্পী ভাবির সুস্বাদু খাবার আস্বাদনের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রসঙ্গত, স্বাতির স্মৃতিচারণ এখানে উৎকলন করছি :
এক শীতের সন্ধ্যায় আম্মা খেজুরের গুড়ের পায়েস রান্না করে বড়ো বাটিতে বাড়লেন। কিছুক্ষণ পর সেই পায়েসের বাটিতে সর পড়লো। আমি সান্ধ্যকালীন পড়তে বসার আগে হাতমুখ ধুয়ে রেডি। পায়েস খেয়ে পড়তে বসবো। কিন্তু ভাগ্যে জুটলো অন্য নাস্তা। কারণ আম্মা বললেন রাতে সুমন কাকু আসবেন। তখন পায়েস খাওয়া হবে। সেদিন যা হিংসে হয়েছিল। সেই শিশু বয়সের আবেগ আর অনুভূতি আজো ভুলিনি।
কবি সুমন বনিকের জীবনের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন স্মারক, সম্পাদক : পুলিন রায়, প্রকাশক : উদযাপন পর্ষদ, সুবর্ণে সুমন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সিলেট

বাংলা সাহিত্য, তুলনামূলক সমালোচনা এবং নবজাগরণ-গবেষণায় তাঁর সৃষ্টিশীলতা বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে অমূল্য সম্পদ। তাঁর গদ্য রচনাশৈলী স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল;—যুক্তিনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক। আবেগের চেয়ে বিশ্লেষণে তাঁর আস্থা বেশি; তথাপি, তাঁর সৃজনশীলতায় একধরনের মানবিক উষ্ণতা আমরা লক্ষ করি। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ১২ টি গ্রন্থসহ ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ প্রণীত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় শতাধিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পত্রিকা, বাংলা একাডেমি গবেষণা পত্রিকা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণামূলক পত্রিকা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পত্রিকা ও বিশ্বভারতী পত্রিকাসহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্যপত্রে তাঁর অর্ধশতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদেও তিনি অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সক্রেটিসের শেষ দিনগুলি’, ‘বোদলেয়ারের কবিতা’, ‘র্যাঁবোর কবিতা’, ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’ ইত্যাদি। এই অনুবাদসমূহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও’র সৃষ্টি ও নির্মাণ ভিত্তিক তিনি যে-সমস্ত গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন তা শুধু বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেনি,—বিশ্বসাহিত্য পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্যার কতিপয় মূল্যবান গ্রন্থ আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেগুলো এখনও আমার পাঠাগারের অমূল্য রতন। বইগুলো এখনও সযত্নে রক্ষিত। ১৮ মার্চ ১৯৮৯ সাল, স্যার তখন শিবগঞ্জ মজুমদার পাড়ায় ‘নিকেতন ভবন’-এ থাকতেন, সেদিন বিকেলে স্যার ‘স্বগত ভাবনা’ বইটি আমাকে উপহার দিলেন। প্রকাশক : কাজী পাবলিশিং হাউস, প্রকাশকাল ১৯৮৮। বইটি প্রবন্ধ সংকলন। ৪টি পর্বে ১৫টি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত ছিল। বইটির ফ্ল্যাপে ছোট্ট ভূমিকা লিখেছেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক ডক্টর আহমদ শরীফ, ভূমিকায় তিনি লিখেছেন :
প্রিয়বরেষু
তোমার খবর তোমার ছাত্রদের মারফত ঘন ঘন পেয়ে থাকি। চর্যাপদ সম্বন্ধে তোমার নতুন চিন্তাযুক্ত প্রবন্ধ পত্রিকায় পড়েছি। তোমার মৌলিক দৃষ্টি ও গবেষণামূলক মতামতের জন্য তুমি প্রশংসার যোগ্য। চর্যাপদ বাংলা নয় : এ স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করতে পারছো তোমার পড়াশুনা ও সাহস আছে বলেই।
সালামান্তে
শুভার্থী
শরীফ
১৫.৩.৭৩

সফিউদ্দিন স্যার যখন বইটি আমাকে দিলেন। বইয়ের পাতায় কিছু লিখে দিতে অনুরোধ করলাম, স্যার লিখে দিলেন —‘যার কবিতায় সমাজ বদলের ঘণ্টাধ্বনি শুনি’। কবিতা চর্চায় এটাই আমার সার্টিফিকেট হিসেবে মনে করলাম! যদিও সেই ঘন্টাধ্বনি স্যারের জীবদ্দশায় শোনাতে পারিনি! ডিরোজিও জীবন ও সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের ভাষা সাহিত্য ও শিক্ষা চিন্তা, মানুষ ও শিল্পী বিদ্যাসাগর, জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় শিক্ষার মাধ্যম ও মাতৃভাষা ইত্যাদি মহার্ঘ গ্রন্থ স্যার আমাকে দিয়েছিলেন। মহামূল্যবান গ্রন্থগুলোর পাতায় পাতায় স্যারের নিঃশ্বাস আজও শুনতে পাই! আমার জীবনের পঞ্চাশ বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে কবি পুলিন রায়ের সম্পাদনায় উদযাপন পর্ষদ কর্তৃক প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে সফিউদ্দিন স্যার আশীর্বাদ স্বরূপ লিখেছিলেন (স্যার তখন শয্যাশায়ী) :
‘প্রাণ প্রবর্তনার প্রাগ্রসরে ও পঞ্চাশে উত্তীর্ণ তোমার কণ্ঠে উচ্চারিত হোক I can’t bath in the same river twice. এবং তোমার অভিনন্দন হোক লোকে লোকে, আলোকে আলোকে।’—এ আমার জীবনের পাথেয়, পরম প্রাপ্তি!
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণায় তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যেও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। তথ্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান, সমাজমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার জন্য ছিলেন বিশেষভাবে সমাদৃত। ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ সাহিত্যচর্চা ও সমাজমনস্কতা এই দুয়ের সমন্বয়ে এক চিন্তাশীল জগৎ সৃষ্টি করেছেন—যেখানে সমাজ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, নন্দনতত্ত্ব মিলেমিশে একাকার।
রাষ্ট্র তাঁকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি, শুধুমাত্র বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার, শিল্পকলা পদক—তাঁর প্রজ্ঞা সৃজনশীলতার জন্য যথেষ্ট নয়। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক প্রদান না-কারার দীনতা/ কালিমা রাষ্ট্রের কপালে রয়েই গেল। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, স্যার এই পার্থিব মায়ারজাল ছিন্ন করে চলে গেলেন মহাবিশ্বের অনন্তের ঘরে চিরজিবীতদের মাঝে। স্যার বেঁচে থাকবেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র ও গুণগ্রাহীদের হৃদয়ে, কারণ—প্রজ্ঞাদীপ কখনও নিভে না, প্রাজ্ঞের প্রয়াণ দেহত্যাগ মাত্র!
. . .

. . .
ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ স্মরণে থার্ড লেন স্পেস-এ আরো দেখুন…
সফিউদ্দিন স্যারের সহজ প্রজ্ঞা : থার্ড লেন স্পেস.কম
. . .

লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .


