
শীত আসলেই আমার চোখের কোণে পিঁচুটি জমে আর বইগুলির দিকে ঘনঘন দৃষ্টি যায়। তখন বুঝি-যে বইগুলি নিয়ে ছাদে উঠার সময় হয়ে গেছে, গলির মোড়ের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে—ভাই ন্যাপথালিন আছে? পুরা কাজ শেষ করতে অবশ্য এক সপ্তাহ লেগে যায়। বাকি সব কাজ বন্ধ রাখতে হয় এই কয়দিন। এতগুলো বই নিয়ে ছাদে ওঠা, পুরো ছাদে শুকনো কাপড় পেতে বইগুলি ছড়িয়ে দেয়া, ধুলা ছাড়ানো, আবার নিয়ে এসে সারি করে রাখা,—পুরা ব্যাপারটা অনেক কষ্টের। কিন্তু কিছুই করার নাই, বছরে একবার অন্তত কাজটা করতেই হয়। না হলে চোখের কোণে পিঁচুটি জমা কমে না আমার।
বারো বছরের অভ্যাস এইবার তেরোয় পরবে। ভাবতে ভালোই লাগে। কিন্তু মঙ্গলবার থেকে প্ল্যান করে করে আজ শুক্রবার পেরিয়ে যাচ্ছে, বইগুলিতে হাত দিতে ইচ্ছা করছে না একদম। গত শীতেও এইরকম আলসেমি ভর করেছিল। আজ নয় কাল কাল নয় পরশু করে করে পনেরো দিন লেগেছিল কাজটা শুরু করতে। এইবার মনে হচ্ছে আরো বেশি দিন লাগবে। মনে সায় পাচ্ছি না। ইচ্ছা করছে না একটুও। ভাবছি মায়া কমে গেছে নাকি বইগুলির প্রতি! এগুলি কি দায় হয়ে পড়েছে এখন! চুরির জিনিসের প্রতি ভালো লাগা কি তাইলে বারো বছর টিকে!? এই কারণেই কি বারো বছরকে একযুগ বলে!
একযুগ কম সময় না। কত কিছু পালটে গেছে এইসময়ে। রাজনীতির বোল পালটেছে। অর্থনীতির চেহারা পালটেছে। পালটে গেছে আমাদের নদী আর আমাদের গান। আমার এই ছোট্ট শহর বড়ো হয়ে গেছে। শহরের প্রতিটি মানুষের জীবন মারাত্মক তীব্র হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে এই শহরে এখন গাড়ির জ্যাম লেগে থাকে, ফুটওভার ব্রিজ বানানো হয়েছে, বইয়ের ছোট ছোট দোকানগুলির জায়গায় হয়েছে পোশাকের শো-রুম আর সাইবার ক্যাফে। ‘প্রগতি বইঘর’ হয়েছে ‘মডার্ন ফ্যাশন হাউজ’, ‘বইপত্র’ হয়েছে ‘ড্রেস কোড’। বারো বছর আসলেই কম সময় না। অনেককিছু পালটে গেছে। আমারও বোধহয় পালটানোর সময় হয়েছে। চুরির সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার সময় এসে গেছে।
চার হাজার বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমার রুমে। সংখ্যাটা বাড়িয়ে দশ-বিশ হাজারে নিতে পারলে চুরির বইয়ের প্রদর্শনী করার সাহস করতে পারতাম। হয়তো সে প্রদর্শনী করার পর থানা পুলিশ হতো, কিন্তু শাস্তি হতো না আমার। কারণ পত্রিকাগুলি আমারে নিয়া ফিচার করত তখন, দুনিয়ার কোন কোন লেখকের বই চুরির অভ্যাস ছিল সেসব তথ্য পরিবেশন করে পুরা ব্যাপারটাকে একটা রোমান্টিক ঘটনা করে তুলত সাংবাদিক ভাইয়েরা। এক-দুইটা পত্রিকায় হয়তো সাক্ষাৎকার দেয়া লাগত আমার। এটা ঘটতই, কারণ আমাদের মিডিয়া ব্যতিক্রমী নিউজ কাভারের জন্য মরিয়া থাকে অলটাইম। আর সেটা ঘটে গেলে আমিও বইগুলা কোনো পাবলিক লাইব্রেরিতে দানটান করে দিয়ে রেহাই পেতাম। তখন হয়তো মনে হতো, জীবনে একটা কিছু করতে পেরেছি।
গোপনে এইরকম একটা চাওয়া ছিল আমার। কিন্তু সেটা আর সম্ভব না। কারণ চুরি করার মতো বই আসলে খুব বেশি আসে না এই শহরে। বইয়ের দোকান কমে গেছে, আর আমারও বিতৃষ্ণা ধরে গেছে। আর চুরি করব না। প্রদর্শনীটা করা হবে না বিধায় একটা অতৃপ্তি থাকবে মনে। সেটা করতে পারলে নিজের কাছে নিজেরে পাক্কা চোর মনে হইত। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। চার হাজার বই প্রদর্শনী করার জন্য খুবই কম। তবে বারো বছরের চুরিতে সংখ্যাটা নেহায়েত কম না। ৩৬৫ দিনে ১২ বছরে ৪৩৮০ দিন হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় একটা করে বই চুরি করেছি। কাজেই চোর হিসেবে-যে খারাপ নই এটা ভাবতে পারি আমি।
বইগুলোর দিকে যখন মনোযোগ দিয়ে তাকাই, সেই মেয়েটার কথা দারুণভাবে মনে পড়ে। আমাকে চোর বানিয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে! বইয়ের দোকানে তখন পার্ট-টাইম জব নিয়েছি আমি। টিউশনি জুটছিল না। চলার জন্য চাকরিটা বেছে নিয়েছিলাম। প্রথম দেখাতেই কালো লম্বা মেয়েটাকে ভালো লাগল। টানা তিনদিন এসে যখন একই কবিতার বই খুঁজল, বললাম,—‘একসপ্তাহ পরে আসেন, আনিয়ে দিবো।’
ঠিক একসপ্তাহ পরে আসল মেয়েটা। কিন্তু বইটা দিতে পারলাম না। মিথ্যা বললাম,—‘আমি প্রকাশনীর সাথে আলাপ করেছি, ওটার প্রিন্টেড কপি নাই, দু-এক দিনের মধ্যেই প্রিন্ট করবে ওরা, আপনি আরো একসপ্তাহ পরে আসেন, পেয়ে যাবেন।’ কথাগুলি শুনে মেয়েটা চোখ বড়ো করে আমার দিকে তাকাল, সত্যি বলেছি নাকি মিথ্যা বলেছি বোঝার চেষ্টা করল বোধহয়। তারপর মৃদু হাসি হেসে বলল,—‘ঠিক আছে সাতদিন পরে আসব আমি।’ মেয়েটার তাকানোর ভঙ্গি কবিতার মতো সুন্দর মনে হলো আমার কাছে। তাড়াতাড়ি প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করলাম। মনে মনে ভাবলাম সামনের দিন যে-করেই হোক বইটা হাতে তুলে দিতে হবে।
সাতদিন পর মেয়েটা আসল। সুন্দর করে প্যাকেটে মোড়ানো বইটা তার হাতে তুলে দিলাম। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে মেয়েটা কিছুটা অবাক হলো। বললাম,—‘গিফট আমার পক্ষ থেকে।’
—‘না না না, এ কী বলেন, আমি তো!’
কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললাম,—‘এত সিরিয়াসলি টানা এতদিন ধরে একই কবিতার বই কাউকে খুঁজতে দেখিনি আমি, উপহারটা নিলে ভাল লাগবে আমার।’
লজ্জার হাসি হাসল মেয়েটা। সেই আগের মতো করে চোখ বড়ো করে তাকাল,—‘বাইরে চলেন, কোথাও বসে চা খাই।’
চা খেতে খেতে পরিচিত হলাম। জানলাম কবি হওয়াই তার জীবনের একমাত্র ইচ্ছা। বললাম,—‘কবির অভাব নাই এই দেশে, তারচেয়ে গল্পকার হোন, ঔপন্যাসিক হোন, ভালো গল্পকারের খুব অভাব।’
আবার চোখ বড়ো করে তাকাল সে আমার দিকে। আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ছি জেনে খুব খুশি হলো। বলল,—‘ভেবেছি ব্যাপারটা, দেখা যাক কী হয়।’
দুদিনের মধ্যেই সে জানাল,—সিদ্ধান্ত পালটে ফেলেছে, গল্পকারই হবে সে, কিছুদিন গল্প লিখে তারপর উপন্যাসে হাত দেবে। এরপর থেকে দু-এক দিন পরপর মেয়েটা দোকানে আসতে থাকল, আর আমি তার হাতে ধরিয়ে দিতে থাকি একটা করে গল্পের বই। মাস খানেকের মধ্যেই দোকানের মালিকের কাছে ধরা খেলাম। চাকরি গেল। কিন্তু ততদিনে মেয়েটাকে বই দেয়ার নেশায় পেয়ে গেছে আমাকে। গোলগাল কালো মুখের উপর সেই বড়ো-বড়ো সাদা চোখ রাতভর আমাকে ভাবাতে লাগল। প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। ভাবলাম যে-করেই হোক বই দেয়া চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কেমনে চালিয়ে যাবো, চুরি ছাড়া তো উপায় নাই। তাইলে চুরিই সই। প্রথম দিন চুরি করে আগের দোকানে যাওয়ার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকলাম, কিন্তু সে আসল না, পরের দিন দুইটা বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, সেদিনও আসল না। এর পরের দিনও না। তার পরের দিনও না। ভাবলাম যেদিনই আসুক আসবে তো, চুরি অব্যাহত থাকুক।
এভাবে মাস খানেক চলে যাবার পরেও যখন আর আসল না, তখন মনটা খারাপ হয়ে গেল। খুব কাঁদলাম একদিন। ততদিনে প্রায় পঞ্চাশটার মতো বই জমে গেছে। সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা বইগুলির দিকে চেয়ে মনটা ভালো হয়ে গেল। ভাবলাম চুরি যেহেতু একটা মামুলি ব্যাপার হয়ে গেছে সেহেতু চলতে থাকুক চুরিবিদ্যা। এভাবেই আমাকে চোর বানিয়ে চলে গেল মেয়েটা। সে কোনো গল্প লিখতে পেরেছিল কিনা জানা হয়নি। প্রথমদিন তার জন্য যে-বইটা চুরি করেছিলাম সেটার নাম কালো বরফ। লেখক মাহমুদুল হক।

অবশ্য বই চুরির সূত্রে শুধু-যে এই মেয়েটার সাথেই সম্পর্ক হয়েছে তা নয়। আরো অনেকের সাথেই সম্পর্ক গড়িয়েছে বইগুলির মাধ্যমে। আর এইসব সম্পর্কের কোনো-কোনোটা এমন জটিলতা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল-যে, খুন হয়ে যেতে পারতাম আমি। মাস্তান গুটলু যেদিন আমার রুমে এসেছিল সেদিন একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যেতে পারত। কোমরে গুঁজা অস্ত্রটা দেখিয়ে গিয়েছিল শুধু। রুমের মধ্যে সারি করে রাখা বইয়ের সৌন্দর্য তার অস্ত্র ঠেকিয়ে দিয়েছিল। যাবার সময় বলে গেছিল,—‘তোমার ওই সুন্দর রুমডারে রক্ত দিয়া রাঙ্গাইলাম না, লেখক সাবের বউয়ের পিছন ছাইড়া দিও কইলাম।’
এরপর আমি ভুলেও আর কবি আহমদ শরীফের বউয়ের সাথে দেখা করি নাই। মহিলার সৌন্দর্য আর শরীরের সুঘ্রাণের কথা মনে হলে নতুন বইয়ের পাতা নাকে লাগিয়ে ভাবতাম নারীর সৌন্দর্যের চেয়ে বইয়ের সৌন্দর্য ভালো। নারীর সৌন্দর্য বিপদে ফেলতে পারে কিন্তু বইয়ের সৌন্দর্য সবসময় নিরাপদ।
কিন্তু বইয়ের এই নিরাপদ সৌন্দর্য-চিন্তাও বেশিদিন টিকল না। দেখলাম বইয়ের নিরীহ সৌন্দর্যও খুব সহজে বিপদ ডেকে আনে। ঘটনাটা দুই বছর আগের। ছাদে বই ছড়িয়ে দিয়ে ন্যাকড়া দিয়ে মুছতে মুছতে হঠাৎ দেখি এক কিশোরী সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল,—‘আমি মুছে দিই?’
হাসি পেল আমার,—‘না, আমি মুছি, তুমি দেখো বসে বসে।’
—‘আমার নাম মাহবুবা ইসলাম শান্তা।’
—‘ও আচ্ছা, বাসা কোনটা তোমাদের?’
—‘ওই-যে মায়া ভিলায় থাকি আমরা, কিন্তু আপনি যে-বাসায় আছেন এটাও আমাদের বাসা।’
—‘ও আচ্ছা! তুমি কি মোস্তাক সাহেবের মেয়ে?’
—‘জ্বি, হ্যাঁ,আমি ইন্টারে পড়ি, সায়েন্সে।’
—‘খুব ভালো, তুমি কি গল্পের বই কবিতার বই পড়ো?’
—‘হ্যাঁ এজন্যই তো আসলাম। আমাদের বাসার ছাদ থেকে এতগুলা বই দেখে একদৌড়ে চলে আসছি, আপনি কি আমারে বই দেবেন?’
আবার শুরু হলো বই দেয়ানেয়া, আবার শুরু হলো বিপদ। একদিন যখন আমার মোকসেদুল মোমেনিনের পাতা ছিঁড়ে শান্তারে তার গলার তলের ঘাম মুছতে দিচ্ছিলাম, তখন চিৎকার দিয়ে রুমে ঢুকলেন মোস্তাক সাহেব,—‘শুওরের বাচ্চা শুওর, আমার সহজ সরল মেয়ে পাইয়া বইয়ের ব্যবসা আরম্ভ করছস? তোর বই পুড়াইয়া আমি সিগারেট ধরাইমু কইয়া থুইলাম।’
একমাসের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল শান্তার। অস্ট্রেলিয়ান সিটিজেনশিপ হাজবেন্ড। বিয়ের আগের দিন আমার রুমে এসেছিল শান্তা। কিছুক্ষণ বসে আলাপ করেছিল।
—‘আব্বা আপনারে বাসা ছাড়ার কথা বলেছিল না?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘বাসা ছাড়তে হবে না আপনাকে, যতদিন খুশি ততদিন থাকতে পারবেন, আমি খুব কঠিন করে বলে দিয়েছি। আমি আবার এসে যেন আপনারে পাই!’
—‘বিদেশে গিয়ে কী করবা তুমি?’
—‘সায়েন্টিস্ট হবো, ওইটাই ত মোটো আমার।’
—‘সায়েন্টিস্ট হইবা তো এত গল্পের বই পড়তা কেন তুমি?’
—‘সায়েন্স তো গল্পের মতোই সহজ আর সুন্দর! আপনার কাছ থেকে একটা গল্পের বই নিতে চাই, দিবেন?’
—‘হ্যাঁ নাও।’
মাটিতে পড়ে থাকা বইটা তুলে নিয়ে চুপচাপ বের হয়ে গিয়েছিল শান্তা।

বইটা ছিল নন্দিত নরকে। শান্তার ঘাম লেগে থাকা মোকসেদুল মোমেনিন এখন আমার শিয়রের পাশে থাকে। ওইটা পড়ে দোয়া করি আমি শান্তা যেন বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট হয়। আচ্ছা যদি এমন হয়-যে, ফিরে এসে শান্তা খুব আগ্রহ সহকারে আমারে দেখতে এলো, কিন্তু দেখল আমি এবং আমার বই কিছুই নাই, তাইলে কি খুব কষ্ট লাগবে তার? মোকসেদুল মোমেনিনের পাতা উলটে আমি এর উত্তর পাই না।
শান্তা একটা বই কমিয়ে দিয়েছে আমার। কবি আহমদ শরীফের বউয়ের কাছে রয়ে গেছে কয়েকটা বই। পরিচিত আরো কয়েকজনের কাছে দশ-বিশটা বই থেকে গেছে। তাও সংখ্যাটা চার হাজারের কম হবে না কিছুতেই। কিন্তু এতগুলা বই চুরি করে না পেরেছি পড়তে, না পেরেছি লিখতে। মাঝেমধ্যে ভাবি চেষ্টা করলে কি লেখক হতে পারতাম? নাকি চুরি করা বই থেকে কিছুই শেখা যায় না! সেটাও বোধ হয় ঠিক না, তাইলে কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের বই চুরির কথা ফলাও করে বলা হতো না। তারা নিশ্চয়ই শেখার জন্যই চুরি করেছিলেন এবং সেইসব বই পড়ে শিখেছিলেন।
কিন্তু এতগুলা বই থেকে আমি কি কিছুই শিখিনি? কেউ কেউ বলে-যে,—বই চুরি অতো গুরুতর অপরাধ না। তবে আমি মনে করি বই চুরি অন্য যে-কোনো চুরির মতোই চুরি। অন্যের জিনিস গোপনে হাতিয়ে নিচ্ছি এবং আমার কারণে তার ক্ষতি হচ্ছে যেহেতু,—বই চুরিও গুরুতর অপরাধই। হয়তো বই চুরি করতে পারায় অন্যকিছু চুরির চেয়ে ভিন্ন আনন্দ হয়। আমি হয়তো এই আনন্দটা পেয়েছি। কিন্তু পড়তে পারি নাই, লিখতে পারি নাই। আসলে আমার ইচ্ছাই জাগে নাই। ইচ্ছা থাকলে হয়তো পারতাম। চুরি তখন বাধা হয়ে দাঁড়াত না কিংবা লিখতে পারলে চুরিটা ছেড়ে দিতে পারতাম। লেখকের আত্মসম্মানবোধের তাড়ায় চোরের দুর্বুদ্ধির আনন্দ দৌড়ে পালাত তখন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। চোর শুধু চুরিই করতে থাকলাম, আর বইয়ের শরীরে হেলান দিয়ে ভাবতে থাকলাম ইহাই সৌন্দর্য ইহাই প্রেম!
মানুষের আয়ু হিসাব করলে একযুগ আসলে কম সময় না। ৩৬৫ দিন হিসাবে ১২ বছরে ৪৩৮০ দিন আর আমার মতো বই চোরের পক্ষে এইসময়ে চার হাজার বই চুরি করে ফেলা সম্ভব। তবে, চুরির জিনিসের উপর ভালো লাগা সম্ভবত একযুগের বেশি থাকে না, সেটা এমনকি বই হলেও। কারণ একযুগে অনেক কিছুই পালটে যায়। একযুগে চুরি একটা সর্বজনমান্য সিস্টেম হয়ে উঠেছে। সরকার নির্বাচনের নামে ভোট চুরি করছে, রাজনীতিবিদ আদর্শের নামে টেন্ডারবাজি দখলবাজি করে চুরি করছে, ব্যবসায়ী ব্যবসার নামে সিন্ডিকেট করে চুরি করছে, চাকরিজীবী ঘুষের নামে চুরি করছে। কারো চোর হতে বাকি নাই। সবাই সবারটা জানতেছে বুঝতেছে। চুরি একটা উন্মুক্ত ব্যবস্থা হয়ে গেছে এখন। চুরি একটা উৎসব। কিন্তু আমার আর চুরি করতে ইচ্ছা করছে না!
আর, সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছে, এই শহরে চুরি করার মতো মূল্যবান বইও আসছে না তেমন! ছোট ছোট বইয়ের দোকানগুলি নাই হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড়ো দোকানটারও ঝিমুনো ভাব, মালিকের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় খুব হতাশ, পুরোনো বইয়ের কালেকশান দিয়ে কোনোরকম চালিয়ে-টালিয়ে নিচ্ছে। গত তিনমাস ধরে ঘুরে একটাও চুরি করার মতো বই পাই নাই। যেনতেন বই চুরি করে কী হবে! তারচেয়ে ছেড়ে দেয়া অনেক ভালো। চার হাজার বইয়ের মধ্যে একটাও বাজে বই নাই আমার। সবগুলা বইই দারুণ আগ্রহ জাগানিয়া, শুধু মোকসেদুল মোমেনিন ছাড়া। কিন্তু ওটাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বই। কারণ এক সায়েন্টিস্টের শরীরের ঘাম লেগে আছে ওইটাতে, লেগে আছে আমার দোয়া দুরুদ। ভাগ্যিস ওইটা আমি চুরি করি নাই। কিন্তু আমি বুঝে গেছি আর বই চুরি করা হবে না আমার। হয়তো আমিই এই দেশের সবচে বড়ো বইচোর, যে ধরা না পড়েও চুরি ছেড়ে দিচ্ছে।
বইগুলো দিয়ে তাহলে কী করব এখন। চুরি করব না যেহেতু আর, চুরির জিনিস সামনে রাখা ঠিক হবে না। সবচেয়ে ভালো হতো যদি কোনো পাবলিক লাইব্রেরিতে দিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু এই শহরে যতগুলা পাবলিক লাইব্রেরি আছে, একটাতেও মিনিমাম কার্যক্রম নাই। প্রতিদিন দুই-চাইরটা পত্রিকা রাখে আর কয়েকজন লোক এসে প্রতিদিন তাই পড়ে। বইগুলা সেখানে ইঁদুর আর তেলাপোকার খাদ্য হবে নিশ্চিত। কেজি ধরে বিক্রি করে দেয়াও ঠিক হবে না, তাতে সেগুলা স্রেফ কাগজ হয়ে যাবে।
কিছুদিন আগে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম পত্রিকায়, ‘ব্যক্তিগত বাংলা লাইব্রেরি বিক্রি হবে।’ ঢাকার কোনো এক স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত বাংলা শিক্ষক অসুস্থতায় পড়ে নিজের গড়ে তোলা দুই হাজার বইয়ের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি বিক্রি করে দিতে চেয়েছেন। ভদ্রলোক তার লাইব্রেরির দাম চেয়েছেন পনেরো লক্ষ টাকা। কিন্তু আমি এভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে নির্বিঘ্নে কাজটা করতে পারব বলে মনে হয় না।
প্রথমত, বইগুলা থেকে আমি কোনো টাকা চাই না, দ্বিতীয়ত, বইগুলা চুরির;—কোনো বই বিক্রেতা এসে যদি কোনোভাবে শনাক্ত করে ফেলে-যে এটা তার দোকানের বই, তাইলে ঘটনা জটিল হয়ে যেতে পারে। কাজটা নির্বিঘ্নে করতে চাই আমি। কিন্তু কীভাবে করব সেটা আসলেই ভাবনার ব্যাপার! শীত পড়তে শুরু করেছে। সকালের সোনা রোদ প্রতিদিন জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বইগুলোকে ছাদে উঠার জন্য ডাকছে। গলির মোড়ের দোকানদারও নতুন ন্যাপথালিন এনে রেখে দিয়েছে হয়তো। দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। কারণ চোখের কোণে ক্রমাগত পিঁচুটি জমছে।
. . .

. . .
পাঠ-সংযুক্তি : ‘অতঃপর বইচোর সমাচার’

কবি ও ছোটকাগজকর্মী শামীম শাহান সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘গ্রন্থী’র তিরিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত সংকলন থেকে প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরীর ‘চুরি’ গল্পটি অনলাইনে পুনরায় প্রকাশের ভাবনা এমন এক সময়ে বসে, যখন ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এই খবর দিচ্ছে :
বইয়ের দোকানে পুরোনো ও বিশেষত দুষ্প্রাপ্য বইয়ের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে গেছে!
পত্রিকাটির প্রতিবেদন বলছে, এআইকে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজনে ২০২২ সনের আগে মুদ্রিত ও বিরল মুদ্রণের তালিকায় ওঠা বইগুলো বাজার থেকে কিনে নিচ্ছে এআই কোম্পানি। উচ্চ প্রযুক্তির হাই রেজ্যুলেশন স্ক্যানারে বইগুলো স্ক্যান করার পর তথ্যভাণ্ডারি এআইয়ের পেটে চালান করছে তারা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো সর্বভূক এক যন্ত্রজীব! সারাক্ষণ ‘খাইখাই’ করবে এমন স্বভাব দিয়ে বিজ্ঞানীরা তাকে গড়েপিটে নিচ্ছেন। সর্বভূক যন্ত্র মহাশয়ের ক্ষুধা মেটানোর জন্য মানুষ রচিত জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলাকে ধারণ ও বহন করে যেসব বইপত্র,—সেগুলো থেকে বেছে-বেছে অ্যালগরিদমে ঠেসে দিচ্ছেন তাঁরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দানবিক সক্ষমতাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে নেওয়ার ভাবনা তাঁদেরকে পেয়ে বসেছে! আলাদীনের চেরাগ ঘঁষে বেরিয়ে আসা জিনের মতো করে যদি গড়ে নেওয়া না যায়, তাহলে এআইয়ের কী প্রয়োজন মানুষের! সকল চাওয়া ‘জো হুকুম’ বলে যদি তামিল করতে পারে, তবেই-না মুনাফায় লাল হবে এর পেছনে টাকা ঢালতে থাকা কোম্পানিমালিকরা! এআইয়ের পেটে বইপত্তর ঠেসে দেয়ার জরুরত কাজেই তীব্র হয়েছে তাদের মধ্যে।
এআইয়ের পেছনে পুঁজি খাটানো বণিক ও তাকে দিয়ে ঝটপট কাজ করিয়ে নিতে মরিয়া জনতা লাভালাভের মোহে ধরা খেতে যাচ্ছেন বলে অনেকে তাই নিদান হাঁকছেন। মোহ ধরে রাখতে দুষ্প্রাপ্য বা ‘হতে চলেছে’ এরকম কিতাব বইয়ের দোকান থেকে হাপিশ করা হচ্ছে চোখের পলকে! অবিক্রিত কিংবা গুদামে পচতে থাকা বইপত্র খালাস হওয়ায় বই দোকানিরা বেজায় খুশি, আবার এর আখেরি পরিণাম চিন্তা করে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে তাদের!
গুদামবন্দি বই দোকানিরা খালাস করছেন ভালো কথা, কিন্তু এআই সেগুলো হজম করার পর যে-পরিস্থিতি অনিবার্য হতে যাচ্ছে সামনে, সেখানে বই দোকানের ব্যবসা লাটে উঠার কথা ভেবে অনেকে পেরেশান বোধ করছেন। দরকারি বই ও এ-সংক্রান্ত কোনোকিছুর জন্য মানুষ বইয়ের দোকানে হানা দেবে না। দুনিয়াজুড়ে বইয়ের অতিকায় মহাফেজখানায় ঢুঁ মারার তাগিদ কমে আসবে। এআইকে তারা খুঁজে নেবে ঝটপট। গাঁটের পয়সা খর্চা করে তাকে দিয়ে আস্ত বই বের করে নেওয়া ব্যাপার থাকবে না সামনের দিনগুলোয়। বইয়ের দোকানে যাওয়ার ঠেকা উবে যাওয়ার শঙ্কা অগত্যা দোকানিদের পেয়ে বসেছে। তাঁরা মনে-মনে ভাবছেন,—বই ব্যবসায় লালবাত্তি জ্বালানোর পয়লা কদম হতে যাচ্ছে এই যন্ত্রদানব।
উদ্বেগের বিষয় হলো,—এমন সব দুষ্প্রাপ্য বই কোম্পানি কিনে নিচ্ছে ও এআইয়ের পেটে চালান করার পর সেগুলো বিনষ্ট করছে, যার মুদ্রিত কপি এমনকি পৃথিবীর নামকরা বইয়ের লাইব্রেরিতে খোঁজ করলে হয়তো মিলবে না! বইটির তালাশে অগত্যা এআইয়ের দ্বারস্থ হতে হবে মানুষকে, এবং নগদ নারায়ণ দিলে মিলবে দেখা সেই সোনার হরিণের! বইয়ের ব্যবসায় নতুন যুগ কাজেই সমাগত সামনে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন। সত্যমিথ্যার তদন্তে ঢুকছেন গভীরে। অনলাইনে ভিডিও ও পডকাস্টের দেখা মিলছে পরপর। সকল সূত্র জড়ো করলে দেখা যাচ্ছে,—‘নৈতিকতা’র প্রশ্ন বড়ো আকারে তুলছেন সবাই। যেসব বই কোম্পানি কিনছে ও এআইয়ের পেটে চালানের পর ধ্বংস করছে অপ্রয়োজনীয় গণ্য করে, তো, কাণ্ডটি ঘটানোর হক তারা রাখে কি? স্বত্ব ও অনুমোদনের আইনি মারপ্যাঁচ কি সেখানে মানা হচ্ছে সঠিক?
প্রশ্নগুলোর উত্তরে এআই কোম্পানি নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে দেরি করছে না। শিখনের অংশ হিসেবে কাজটি তারা করছে, আর ‘শিখন’ কীভাবে অনৈতিক হতে পারে? অন্যদিকে, রচয়িতা ও প্রকাশকরা উদ্বিগ্ন একথা ভেবে,—ব্যবসাদার কোম্পানির মোড়লরা আইনি ফাঁকফোকড় ও নৈতিক অধিকারের ঝাপসা সীমারেখা চতুরভাবে কাজে লাগাচ্ছে, যার বিরুদ্ধে সরকারগুলোর সচেতন হওয়া প্রয়োজন! পক্ষে-বিপক্ষে কথা চলাচালির হুজ্জত কয়েকটি বাস্তবতাকে সামনে এনেছে দ্রুত, যেমন :
প্রথমত, বিশ্বজুড়ে বইয়ের দোকান থেকে বই কেনা ও বই পাঠের সংস্কৃতি মোটের ওপর নিম্নগামী অনেকদিন ধরে, আর অনলাইন সংস্কৃতি উন্মুক্ত হওয়ার পর সেখানে ধসের লক্ষণ কারো অজনা নয়। ‘বইয়ের দোকান’-এর বিকল্প হওয়ার ভাবনায় এআই ধসকে ত্বরান্বিত করছে মাত্র!
দ্বিতীয়ত, ২০২২ সনের আগে প্রকাশিত কিতাব কেন কিনছে কোম্পানি? উত্তর এই-যে,—করোনাটাইমের শেষ দিকটায় এসে এআই সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। ২০২২ সনের পর থেকে যেসব বইপত্র বাজারে এসেছে, তার বড়ো অংশ মানুষ স্বয়ং এআইকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। এআই শিখতে পারে এমন কোনো রসদ ওসব বইয়ে নেই। মানে দাঁড়াচ্ছে,—মানুষ মাত্র চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এআইয়ে পুরোপুরি অভ্যস্ত ও নির্ভরশীল করে ফেলেছে নিজেকে। কিতাব লেখার খাটনি এআইকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে ও স্বনামে বাজারে ছাড়ছে বেশরম মরদের মতো!
এখানে হতভাগা হলেন ওইসব লোক, যারা নিজ মেধায় এখনো কিতাব বের করার খাসলত ছাড়তে পারছেন না। এর পেছনে খেটে মরছেন উদয়াস্ত। এআইকে তাঁরা ব্যবহার করছেন নিছক তথ্য-আহরণ ও ভাবনায় শান দেওয়ার প্রয়োজনে, কিন্তু মূলত লিখছেন স্বকীয় মেধা ও শ্রমের সবটুকু উজাড় করে। এই হতভাগাদের খাটনি বৃথা যেতে বসেছে, কেননা, মানুষ অদ্য কোনটা এআইকে দিয়ে লেখানো আর কোনটা নয়… দুয়ের মধ্যে বিদ্যমান তফাত পরিষ্কার ধরতে বিমুখ থাকছে অথবা ধরতে পারছে না ঠিকঠাক!
তৃতীয়ত, এআইকে প্রতিপক্ষ ভেবে নাকচ করার ভাবনা আবার একদলকে পেয়ে বসেছে, যা নয় বাস্তবসম্মত। কামিয়াবি হাসিলে এআইকে কোন সীমা পর্যন্ত ব্যবহার করবেন বা এর তরিকা কেমন হওয়া প্রয়োজন, ইত্যাদি নিয়ে ঘোলাটে বিতর্ক বিরাজ করায় ঝামেলা আরো বেড়েছে। যন্ত্রদানবের সক্ষমতা মোকাবিলায় মানবিক সক্ষমতার প্রভেদ ও নতুনত্ব কেমন হতে পারে তা কারো কাছেই যেন স্পষ্ট নয়।

এরকম এক ঘোলাটে পরিসরে বসে প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরীর ‘বই চুরি’ নিয়ে লেখা গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছে পূর্বস্মৃতি-যে,—বইপাঠের নেশার মতো বই সংগ্রহের নেশা (এবং তা চুরি করে হলেও) একটা সময় অনেক মানুষের মধ্যে তীব্র ছিল। ‘অবশিষ্ট’ রূপে কিছু মানুষ সম্ভবত এখনো ধরায় টিকে আছেন! প্রাণকৃষ্ণ তাঁর গল্পে যে-বইচোরের কাহিনি বলেছেন, সে কি তাহলে একুশ শতকের যুগে প্রত্নতত্ত্ব বিবেচিত হবে? জাদুঘরে সাজানো অ্যান্টিক বলে আমরা তাকে ধরে নেবো? অতীতে ছিল এরকম এক সময়রেখাকে কি মমি করে রেখেছে প্রাণকৃষ্ণের বয়ানে উঠে আসা বইচোর? এরকম দিন বইখোর অনেকের জীবনে ছিল বটে,—বইয়ের দোকান কিংবা কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই মেরে দেওয়ার আপাত ‘অনৈতিক’ কাণ্ড তারা অক্লেশে করে বসতেন!
একটা নেশা, যার পেছনে কত-না কারণ লুকিয়ে থেকেছে তখন! উত্তমপুরুষে প্রাণকৃষ্ণ যেমন বই চুরির কারণ বর্ণিয়াছেন সাড়ম্বরে। অন্য কারো ক্ষেত্রে হয়তো অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে। বই কেনা বা চুরি যাই ঘটুক, এর বড়ো অংশ অপঠিত থাকার ঘটনা চরম সত্য ছিল সর্বদা। উমবার্তো একো যেমন তাঁর খুদে এক রচনায় অকপটে জানিয়েছিলেন,—যত বই তিনি জমিয়েছেন এ-জীবনে, এর সিংহভাগ পড়া হয়নি পরে। অপঠিত বইকে আবার কেমন করে পড়তে হয় এবং তা-নিয়ে ফাটিয়ে লেখা ও বলা যায়,—চালাকিটা খুদে রচনায় ফাঁস করেছিলেন একো। এবং, অপঠিত বই কেন পাঠকের ব্যক্তিসত্তার উন্মোচন ঘটায়, সেই বিষয়েও বলে গেছেন চমৎকার!
সত্যি বলতে কি, বই পড়া কোনো রমণসুখকর ঘটনা নয়। একটা বই পড়ে উঠার মধ্যে ক্লান্তি ও অবসন্নতা নেই সেকথা হলফ করে বলা যাবে না। সব বই এমন মনোরম নয়-যে, হাতে নিলে ছাড়তে মন চাইবে না। অন্যদিকে, ‘ছাড়তে মন চাইবে না’ টাইপের বই প্রায় সময় তেমন কাজে আসে না পাঠকের। আপাত নিরস অনেক বই বরং একশো কারণফেরে তাকে বারবার পড়তে হয়! বই পাঠের পর বইয়ের নির্যাস শুষে নেওয়া ও বাকিটা আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলার বিদ্যা জানা নেই বা তা রপ্ত হয় না অনেক পাঠকের। তারা তখন পুথিবিদ্যায় খড়খড়ে জীব হয়ে ওঠেন। ভিতরে জীবনের স্পন্দন নেই, কেবল আরশোলা উড়ছে হামেশা। বই পড়া ও না-পড়া সুতরাং সমান বিড়ম্বনার।
বই চুরি করা ও জমানোর পেছনে যে-কারণ কাজ করুক কারো মনে, এআইয়ের পেটে ক্রমাগত হজম হতে থাকা বইসম্ভারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে একথা ভেবে,—এমন দিন ছিল মানুষের জীবনে, বইয়ের দোকান থেকে বই চুরি করত কোনো বইখোর! অজ্ঞাত কোনো নেশা থেকে যেমন চুরি করত,—প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরীর ‘চোর’ গল্পে বর্ণিত চরিত্রটির মতো প্রেমের ফাঁদে ফেঁসেও সাগ্রহে বই চুরিতে মন দিতো! আহা, ফতুর হয়ে আসা বইপাঠক! আহা, কোনো একদিন চুরিবিদ্যায় পারদর্শী সেই বইখোর বইচোর!
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক দেখুন …
. . .

লেখক পরিচয় : প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী
হাওর জনপদের ছেলে প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরীর জন্ম মধ্য আশির দশকে সুনামগঞ্জে জেলার মধ্যনগর গ্রামে। হাওর অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনের সঙ্গে সংযোগ নিবিড় ছিল ও এখনো তা ধরে রেখেছেন এই লেখক। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল জীবন কেটেছে। পরে বাংলা সাহিত্যে ছাত্রত্বের পাঠ শেষ করেন। পেশায় ব্যাংকার।
প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরীর কোনো বই এখনো আলোর মুখ দেখেনি, তবে সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যের পাঠ এবং লেখালেখিতে সক্রিয় রয়েছেন। কথাসাহিত্য প্রিয় পছন্দ হলেও নানামুখী প্রবন্ধ ও কবিতায় নিজের মেধা ও স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন ইতোমধ্যে। ‘প্রতিধ্বনি’ ‘গানপার’ ইত্যাদি অনলাইন মুখপত্র ও ছোটাকাগজে নিয়মিত লিখছেন। বিচিত্র বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন। সিনেমা নিয়ে পাঠ ও লেখালেখির পাশাপাশি হাওর জনপদের জীবন মানচিত্র সেলুলয়েডে তুলে আনার স্বপ্নবীজ পোষেন মনে।
. . .

প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম



