পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

রোজিনা-কামলা : সজল কান্তি সরকার

Reading time 8 minute
5
(7)
Haorer Mukh-I; Artist: Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

ভাটি ময়াল। গিরস্তি মৌসুম। একফসলি কৃষিব্যবস্থা। বছর ঘুরে বর্ষা শেষে ভাটির দেশে আসে এ-মৌসুম। জেগে ওঠে ছয়মাস জলের তলায় ঘুমিয়ে থাকা ফসলের মাঠ। ধান, কালাই, তিল, তিসি, সরিষা, আলু, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুনসহ আরো নানারকম শস্যদানার চাষ হয় তখন। প্রধান ফসল শাইল বোরো ধান হলো যক্ষের ধন। এই ধানের লাগি বিয়ান-বিয়াল ভুলে বিরামহীন কাজ চলে। গিরস্তদের ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না। গিরস্তি কাজে তখন অতিরিক্ত ছয়-মাস-চুক্তির ও রোজবন্দি কামলার প্রয়োজন পড়ে। কামলাদের কদর বেড়ে যায় ভাটিময়ালে।

একদিন বিয়ানবেলা। শীতকাটা রোদ উঠে শুকিয়ে গেছে ঘাসের শিশিরবিন্দু। ভারী কাজকামের বয়স গিয়েছে এমন বুড়ো খুড়িরা রোদে গা দিয়ে আচালা শাক-আনাজ তুলছে ঠুনাভরে। বধূরা কোদাল চালিয়ে বিচরায় বুনছে রবিশস্যের বীজ। কোলের শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে মাটি খাচ্ছে কোলের অভাবে। গিরস্তের ছোটপুত পাঠশালা ভুলে বিয়ানের ভাত নিয়ে যাচ্ছে জমিনে। গিরস্তগণ গায়ের গিলাফ খুলে কাজে নেমেছে। হালের বলদ গা ধুয়ে গাঙ পার হয়ে পালে ফিরে শিং নেড়ে ‘ডুক্কার’ দিচ্ছে। অহেতুক ‘লাখড়ুয়া’ গাইয়ের পিঠে উঠতে দৌড়াচ্ছে ‘কাল্যিয়াদামা’। নবযৌবনের চঞ্চলতায় গোষ্ঠে আনন্দে ‘নাড়াই’ করে ডেকা-ডেকি। গোয়াল ঘরের দুধ দোহানো গাভীটি বাছুর ছেড়ে লেজ নাড়িয়ে মাঠে মাটি কামড়িয়ে ঘাস খায়। কাঁচিবাছুরের তিড়িংবিড়িং দৌড়াদৌড়িতে ঘাসফড়িংয়ের উড়াউড়ি। ছোঁ মেরে ফড়িং ধরে বলদের পিঠে বসে উদর ভরে পাপিয়া। গোবরকুড়ানি মেয়েটি উদুমগায়ে রোদ মেখে ‘উরা’৪ মাথায় গোবর কুড়াতে কুড়াতে ক্লান্ত। তাই দেখে যৌনতায় ভোগে কত পথচলা লোক! রাখালরা মাঠে তারগুটি খেলায় মেতেছে পেটে ক্ষুধা চেপে। পালের খেয়ালে হাঁপিয়ে উঠছে রাখাল রজনীকান্ত। বাউল তার বাউলিয়ানা রেখে নিরলে বসে বিরহীগানের পদ খুঁজতে মগ্ন। ভিক্ষার অভাবে ওদিকে ময়ালে ময়ালে ঘুরছে সৌদামিনী। নেহায়েত যারা বাবুগিরি করে, তারাই কেবল জমির আইলে বসে রেডিও বাজানোর সৌখিনতা রাখে।

এমন মৌসুমে জোয়ান-বুড়ো কেউ ঘরে বসে নেই। জমির নরম বুকে শালিধান রোপণের ধুম পড়েছে। গিরস্তগণ রোজিনা-কামলা নিয়ে দলবেঁধে রোপণ করছে শালিধানের জমি। জমির বুকে কামলাদের মেলা। কাজের বাহাদুরি। হাতে কাজ, মুখে গান। কান পাতলেই শোনা যায় সারিগানের সুর। মাঝেমধ্যে জমিনের বাঁকবদলের সময় দেহের ক্লান্তি কাটাতে তারা সুরে সুরে স্লোগান দেয়। একজন প্রথমে বলে, বাকিরা তাললয় ঠিক রেখে দোহার দেয় :

ঘুইরা ল’রে — ঘুর
আরেকবার — ঘুর
ঘুরঘুর সুয়া—
হাইলক্ষেতে বোরো রোয়া।

শেখদিল একজন রোজিনাকামলা। তার নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে কাজ করে পেটের খোরাক মেটায়। আজ সে কাজ পায়নি, তাই মনখারাপ। কী করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। সারাদিন ময়ালে জমিনের আইলে-আইলে ঘুরে অন্যদের কামলাগিরি দেখছে কেবল! মাঝেমাঝে মাগনা তামাক খাচ্ছে খানে-খানে জমিনে-জমিনে। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। কথা বলা দূরের কথা, তামাক খাওয়ার সময়টাও নেই। শেখদিল অসহায় বোধ করে। কোথাও কাজের ভাগিদার হতে পারেনি আজ! যাইহোক, ‘কাজ তো আর পড়াবাড়ির গাছের গুটলুম বড়ই না-যে মাটিতে পড়ে থাকবে, আর যখন খুশি কুড়াইয়া নিয়া খাবে।’ কাজ পাইতেও আগাম তদবির লাগে।

শেখদিল কাজের লোক। ভাটি ময়ালের অনন্তপুর গ্রামের ‘ছাপারবান’ কামলা সে। বলা যায় হাল-জাল, কাঠ-বাঁশ, ঘর-গিরস্তসহ সকল কাজের কাজী। তার হাতে কাজ থাকেই। এমন নিষ্কর্মা সচরাচর হয় না। তার কাজের শরীর। আরাম সয় না। গিরস্তের মন জোগাতে কিংবা ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার আশায় এর জমিনে তার জমিনে মাগনা কিছু কাজ করে আগাম দিনের কাজ জুটিয়ে নেয়। আজকের দিনটি তার জীবনে ব্যতিক্রম! অনেকদিন পর একটা কর্মহীন দিন গেল আজ! বিকালের সূর্যটা পশ্চিম আকাশে লালতি ধরেছে। সবাই কাজের হিসাব মিলাতে মরিয়া। কাজের ভারে ক্লান্তদেহ টানতে টানতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। অতিথি পাখিদের ডানার আওয়াজে জেগে ওঠে আকাশের চাঁদতাঁরা। শুরু হয় কাজ শেষে ঘরে ফেরা।

কাজ শেষে সবাই বাড়ি ফিরছে, কিন্তু শেখদিলের ফিরতে ইচ্ছে করছে না। বউটা না খেয়ে আছে সারাদিন! সকালে পান্তাভাত যেটুকু ছিল, দুজনের তাতে পেট ভরেনি। ঘরে খাবার নেই। সে দিনে রোজগার করে আনে, রাতে খায়। গরিবের হলো দিনে রোজগার, রাতে সংসার। রাতেই সুখ। অনাহারে দিন কাটলেও—রাত কাটে না। রাতে না খেলে সংসার ঠিকঠাক থাকে না কিছু! এসব ভেবে গাঁয়ের এবাড়ি-ওবাড়ি চাল মাগতে গিয়ে শেখদিলকে নিরাশ হতে হয়। গাঁয়ে চরম অভাব। রুটিটাও ঠিকমতো জুটছে না অনেকের পেটে। বিল থেকে ‘খুই’ বা শালুক তুলে ভাতের সাথে সিদ্ধ করে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করছে অনেকে। কেউ খাচ্ছে খুদের জাউ। কেউ হয়তো আটার লেই। মাড়ভাত যারা খেতে পারছে, তাদের কপাল ভালো বলা যায়। রোজখোরাকিতে এ-সময় জীবন চলে অনেকের। যাদের অঢেল আছে, তারা পর্যন্ত কচ্ছপের মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখে। গিরস্তি মৌসুমে কেউ সহজে অন্নদাতা হয় না। যাদের সামর্থ্য আছে, শেখদিল তাদের দ্বারস্থ হয় না কখনো।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হতে চলেছে। কাউয়া-কুলি নীরব। গাঁয়ের লোকজন ঘুমে। সাড়াশব্দ নেই কোথাও। ঘরে ফেরা ছাড়া শেখদিলের উপায় থাকে না। গাঁয়ের পুবপাড়ায় ছোট্ট একটি ছনের ঘর আছে তার। লেপেপুছে রোদে শুকানো তেজে পরিপাটি সে ঘরের ভিটা। পুবমুখি দুয়ার। দরোজাটা আসলে নামমাত্র! বেড়া ভাঙাচেরা। পুরোনো ছাউনি মাঝেমধ্যেই উদোম হয়ে আছে। অমাবস্যা পূর্ণিমার আলো-আঁধার ঘরের ভিতরে শুয়ে বেশ যাপন করা যায়! শীতকালে ভাটিময়ালে খুব একটা বৃষ্টি হয় না। ঘর ভিজে যাওয়ার ভয় নেই। যৌতুকভরতি বিয়ের ট্রাংক বা জমানো টাকাপয়সা শেখদিলের নেই। চোর-ডাকাতের ভয় তাই করে না। সে এই ময়ালের সাহসী পুরুষ। বিয়ের আগে বেডাগিরি যা করেছে, বাকি জীবন আঙুল নাড়িয়ে নির্ভয়ে চলতে পারবে। তার ভাঙা কুঁড়েঘরটা তাই নিরাপদ। মা-বাপহারা এতিম শেখদিল যে-ঘরে সংসার পেতেছে!

বাড়িটি গাছগাছালিতে ঘেরা। আছে নানাজাতের ফলফুলের গাছ। ঘরের দুপাশজুড়ে দোআঁশ মাটির পরিচ্ছন্ন বড়ো উঠোন। বাড়ি দেখে প্রতিবেশীরা শেখেদিলের বউয়ের তারিফ করে। প্রকৃতির মায়ায় ঘিরে আছে বাড়িটা! শ্বশুরবাড়ির কল্যাণে ভাগে আনা একটা বকনা বাছুর ও দুটি পাতিহাঁস মিলে একঘরে রাত্রিযাপন করে তারা। পাঁচ সদস্যের পরিবার বলা যায় একে। ঘরের মাঝখানে পার্টিশন দিয়ে উত্তরপাশে লালবকনাটা রাতে ঘুম যায়। ঘরের এককোণে ডুলিতে হাঁসজোড়া ঘুমান। এই অবলা জীবগুলো রাতে শেখদিলের ঘরে না ফেরা পর্যন্ত তার বউয়ের একলা থাকার ভরসা। মাঝেমধ্যে কারণে-অকারণে বাদী ও বিবাদী হয়ে উকিলের মতো এদের সাথে একা কথা বলে।

Haorer Mukh-II; Artist: Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

ঘরের দক্ষিণবেড়ায় ছোট্ট একটি ‘খেরকি’ রয়েছে। গরম পড়লে ওটা খোলা থাকে। দুজনে মিলে গলাগলি করে দখিনা বাতাস খায়। এখন অবশ্য খোলার প্রয়োজন হচ্ছে না। খেরকির পাশটা নানাজাতের লাকড়িতে ঠাসা। ঘরের ভিতরে মাটির চুলার পাশে সাজানো-গুছানো খাবারের থালাবাসন ও রান্নার হাড়িপাতিল। ছিক্কায় ঝুলছে সৌখিন বাসনকোসন। ঘরের খুঁটিতে লোহা পুঁতে টাঙানো আয়না-কাঁকই। মড়াল বাঁশের তেলতেলে আগার টাঙ্গি দিয়ে নিখুঁত ভাঁজে জড়াজড়ি দোল খাচ্ছে পরনের শাড়িলুঙ্গি। ঘরটি যথেষ্ট পরিপাটি।

ঘরের দক্ষিণকোণে আলাদা ভিটায় রান্নার জন্য আরো দুটি মাটির চুলা রয়েছে। এটা মূলত রান্নাঘর। ঘরের ভিতরে রাখা চুলাটি কেবল বিপদকালীন সময়ে তারা ব্যবহার করে। বাইরে বসে আহ্লাদি গালগল্পে মেতে প্রায়ই রাতের রান্না শেষ করে দুজন। দুজনের এই আহ্লাদিপণা দেখে গাঁয়ের পতিব্রতা রমণীদের গা জ্বলার অন্ত থাকে না! পিরিতের বিয়া বলে কথা। আড়ালে আবডালে শেখদিলকে ‘মাগ্যীয়া’ বলে ডাকে অনেকেই, আর তার বউটাকে ‘লাংগী’।

তাতে কী! আহ্লাদ, ভালোবাসা টাকাপয়সা নয়-যে কাউকে ধারকর্জ দেওয়া-নেওয়া করা যায়। উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে স্বাধীন জোড়শালিকের মতো দুজনের এই ভালোবাসার বন্ধন। চুলার আগুনে বউয়ের হাত পুড়িয়ে দিনে তিনবার আয়েশ করে যারা পেটভরে ভাত খেয়ে জীবনটা পার করতে চায়, শেখদিল তাদের দলে নেই। তথাকথিত স্বামীসেবা তার পছন্দ নয়। গোয়ালে বাঁধা সৌখিন বলদের মতো কাটা ঘাস খেয়ে শ্রেষ্ঠ ধেনু হয়ে পালের গাভীর সাথে হুংগাহুংগির ভালোবাসা তার ভালো লাগে না। সে অমরসঙ্গী হয়ে সংসারী। মেলা থেকে আলতা কিনে প্রাণপতি হয় না, বরং বউকে মেলায় নিয়ে যায়, নিজের হাতে আলতা পড়ায় পায়ে। বউকে নিয়ে মিলেমিশে মহানন্দে একবার রান্না করে পরমানন্দে দুইবেলা খায়। আজ শেখদিলের কপালে সেই সুযোগ জোটেনি!

রাতে রান্নাবান্না করার বেলা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। গাঁয়ে এখন ঘুমরাত চলছে। ভাতঘুমে কাতর সবাই। কেউ আবার একঘুম দিয়ে নিঃশব্দে অভিসার সেরে নিচ্ছে। নব দম্পতিরা পুনরায় মিলনের জন্য লেপের তলে নীরবে গা গরম করার তালে আছে। তাদের মধ্যে দু-একজন জেগে থাকলেও, অহেতুক কথা কেউই বলছে না। রাতে নীরব থাকা যেন ভাটির মানুষের ব্রত। গাছের পাখিগুলোও নীরব! রাতে পাখিদের মিলন আনন্দরব কিংবা ধর্ষণকলহ নেই। তারা রাতে গর্ভবতী হয় না। তাদের মিলন ও সংসার দিনে। পাখিরা রাতে পরাধীন, দিনে তারা স্বাধীন। হুতুম পেঁচার ডাক ছাড়া সুনসান নীরবতা চারিধারে। ময়ালে এই পাখিকে দুশমনি পাখি ডাকে অনেকেই।

শেখদিল তার ঘরের বাইরে দরোজার পাশে অসহায় দাঁড়িয়ে আছে। বউকে ডাকতে গিয়ে থমকে গেছে কয়েকবার। জিহ্বা নড়ে কিন্তু মুখ ফুটে ডাক বের হয় না। অপরাধীর মতো আঁধারে আঁধারি হয়ে দাঁড়িয়ে শেখদিল। ঘরটা শব্দহীন। শেখদিলের বউ জানে, স্বামী যখন বাড়ি ফিরে তখন উদাস মনে গান গায়। রাতে অকারণে বাইরে টহল দেওয়ার লোক নয় সে। বউ তাই রাতের খাবার সাজিয়ে বাতি নিভিয়ে শেখদিলের আগমনী গান শোনার অপেক্ষায় আছে।

গরিবের সংসারে রাতে অহেতুক কুপিবাতি জ্বলে না। শেখদিল এদিকে অন্ধকার ঘরের ভিতরের খবর কিছু আন্দাজ করতে পারছে না। বাইরে সাজানো উনুনের পাশে বসে মুশকিল আসানের উপায় খুঁজছে। খড়-লতা-পাতার আগুনে রান্নার তাপ চুলার চারপাশে ডিম ফোটানো কুরুচের মতো উম ছড়াচ্ছে এখনো! শেখদিল তার পায়ের তলায় উমটা টের পায়। এই উম রাতে ভাত রান্নার উম। ভেতরে-ভেতরে উল্লাসে ফেটে পড়ে শেখদিল! তার এই আনন্দ কেউ দেখে না।

তর সইছে না শেখদিলের। দরোজার কাছে গিয়ে স্বামী সোহাগে ডেকে ওঠে,—‘বউ, অ বউ, দুয়ার খোলও’। শেখদিলের ছনের ঘরের দুয়ারটা নিয়মের জন্য, কোনো নিরাপত্তার জন্য নয়। ইচ্ছে করলেই ওটা খোলা যায়। ডাক শুনে কুপিবাতির আলোয় ঘরটা নিমিষে আলোকিত হয়ে ওঠে। ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা হাঁসদুটি প্যাকপ্যাক ক্যাকক্যাক করে জেগে ওঠে। বকনা বাছুরটা উঠে দাঁড়ায়। মুখ বাড়িয়ে শেখদিলের সোহাগ মাগে। দরোজা খুলে নিজের এই রাতের সংসারে ঢুকে বকনাবাছুরের গায়ে হাত বোলায় শেখদিল। আর কোনো দুঃখ নেই তার মনে! খাবারের ভাবনা নেই! নিজে কিছু জোগাড় করতে পারেনি, তবু রান্না-যে হয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই শেখদিলের!

ঘরে পতির আগমনে বউটা হাসছে! শেখদিলের কাজ না পাওয়ার বেদনার কিছু সে এখনো টের পায়নি। শেখদিল যেমন জানে না, নিদানের কথা ভেবে বউটার এই নিত্তি নিত্তি মুষ্ঠিচাল জমিয়ে রাখার কেরামতির কথা! দুজনের পেটে দুই গামলা সমান ক্ষুধা ভর করেছে। দেরি না করে শাক আর মরিচপোড়া দিয়ে একথালা মাড়ভাত একথালে ঢেলে খেতে বসে তারা। মাড়ভাত দেখে শেখদিলের মন খারাপ হয়ে যায়। শেখদিল অবাক হয়ে বউয়ের দিকে তাকায়,—‘মাড়ভাত রানছ্য কেরে? বাছুরে কিতা খাইব্য!’

Haorer Mukh-III; Artist: Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

বউ শেখদিলকে বোঝায়,—‘বাছুররে মাড় দিলে তুমি কিতা খাইবা!’

শেখদিল অবুঝের মতো তবু বলে—‘কেরে! ভাত খাইয়াম।’

স্বামীর সরল কথায় জওয়াব করে বউ,—‘চাউল কম। এর লাগি মাড়ভাত রানছি।’

শেখদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌন হয়,—‘অ!’

তার মনোকষ্ট বউটা ঠিক ধরে ফেলে,—‘বাছুর একদিন মাড় না খাইলে কিতা অইব্য? বেশি কইরা ঘাস খাওয়াইছি।’

ভাতের থালায় হাত রেখে সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়ে শেখদিল,—‘‘অ!’

বউ পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলে,—‘তুমি খাও। নিজের শইলের ভাডি একবার চাইয়া দেখছ্য?’

শেখদিল চমকে ওঠে খাবারে থালা থেকে হাত তুলে কৌতূহলী হয়,—‘কেরে, শইলে আমার কিতা অইছে?’

মুখে কষ্টের আলপনা এঁকে বউ জবাব দেয়,—‘বিয়ার আগে কিতা আছ’লা আর অন্নে কিতা অইছ্য!’

শেখদিল তার বউয়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে বুক ফুলিয়ে শরীরের দিকে তাকায়,—‘হুনঅ! বিয়ার আগে একমণ ধান মাথায় লইলে ঘাড় বেদনা করছে! অন্নে দুইমণ লইলেও খবর অয়না!’

বউ চরম আপত্তি জানায়,—‘এইডা কুনু কথা অইল্য!’

শেখদিল কথা না বাড়িয়ে অপরাধীর মতো বাছুরের দিকে তাকিয়ে খেতে শুরু করে। আর বউয়ের হাত ধরে বলে,—‘খাও, খাও…’

বউ পাশে বসে খায়। খেতে খেতে ভাত যেন ফুরায় না! একে অপরকে খাওয়ানোর ছলচাতুরী প্রতিযোগিতায় থালায় ভাত থেকে যায়। শেখদিল কৌশলে ভাতহীন পাঁচ আঙুলের বড়ো বড়ো গ্রাস মুখে দিয়ে অযথা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে বউকে খুশি করতে। বউটা না খেয়েই বলে,—‘আর না গো, পেট ভইরা গেছে। তুমি খাও।’ খাবারের এই অভিনয়ে শেখদিল তার বউয়ের কাছে হেরে যায়। বউ তার স্বামীসোহাগী। স্বামীর সোহাগ খেলেও তার পেট ভরে যায়।

খাবার শেষে আয়েশের তামাক সাজিয়ে ফেলে বউ। খাবার শেষ করে পেট টান করে বিছানায় শুয়ে পরে শেখদিল। মাটিতে কাঁথা-বালিশের ছোট্ট বিছানা। আঞ্জাআঞ্জি করে শুতে হয় দুজনকে। ছোট হওয়ার কারণে ঘুমে তলিয়ে যাওয়া বউটা শেখদিলের দেহের চাপে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। ফজরের আজানে ঘুম ভাঙলে শেখদিল তাকে বিছানায় টেনে তোলে। একটা চকিত মিলন সেরে ফেলে দুজন। উঠে পড়ার আগে বউ শেখদিলের লুঙ্গিটা ঠিকঠাক করে দেয়। নিজের ব্লাউজ খুলে মুছে নেয় গায়ে লেপটে থাকা ধুলোবালি আর ভোররাতের বাসী বীর্য। ঘুমের ভান করে স্পর্শসুখটা উপভোগ করে শেখদিল। মাঝেমধ্যে সাতসকালে হাঁসের মতো ফের ঝাপটে ধরে বউয়ের গতর।

বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে লুঙ্গির গিট খুলে সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে নেয় শেখদিল। কুপিবাতির আলোয় শীতের উম চাওয়া শেখদিলের উদোম শরীরে আলো-আঁধার খেলা করছে। সোনালি আলো গা-ভরতি রোমকূপে ঝিলিক ছড়িয়ে নাচে, আর রেণু গলেগলে ঠিকরায় দেহে। বউ তামাক সাজাতে সাজাতে আড়নয়নে স্বামীর গোপনাঙ্গের তেজ দেখে হাসে। শেখদিল উন্মাদ গায়ে কাঁথা জড়িয়ে উম নেয়। বউয়ের শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে সরে যায় মিলনের আকুলতায়। কুপিবাতির আলোয় তার অন্তর্বাসহীন পাতলা কাপড়ের ব্লাউজে ঢেকে থাকা বুকের অন্তঃযুগল দেখা যাচ্ছে। শক্ত হয়ে আছে কারো আকুল পরশ পাবে বলে! শেখদিলের পরাণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে বউকে বলে,—‘তাড়াতাড়ি হুতঅ। দেড়িং কৈর না!’

শীতে কাঁটা দিয়ে ওঠা বউ দাঁত চেপে তবু হাসে,—‘আইতাছি গ, আইতাছি, বেউশ অইয়্য না, তামুকটা ভইরা লই।’

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা শেখদিল দুবাহুতে বালিশ আঞ্জা দিয়ে শরীর মুড়ে বউকে শুধায়,—‘তামুকটা চড়া কইরা দিছ?’

বউ মুচকি হাসে,—‘কেমনে?’

পিপাসার্ত কণ্ঠে শেখদিল জবাবটা দেয়,—‘বাসর রাইতে যেমনে দিছিলা! হেমনে!’

কথাটা শুনে বউ শেখদিলের দিকে তাকিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। তার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠছে! মনে পড়ে যায় প্রথম রক্তক্ষরণের কথা। মনে মনে গুনগুনায়,—‘ওরে বাবা! আর না!’ মিলনের আহ্বানে তবু দেহটা এই ভোররাতে বেচইন করে।

ঘনঘন টিক্কায় ফু দেয় বউটা। ঠোঁটে তাপের হলকা এসে লাগে। নাকমুখে ঢুকে পড়ে নেশালি তামুকের ধোঁয়া। বউটার চোখে পিপাসার লালরং। মিলনের শিহরন ভেবে শরীরটা তড়পায়। নৈচায় চেপে ধরে শেখদিলকে বলে,—‘নেও, বাসর রাইতের মতো আউস মিডাইয়া খাও।’ শেখদিল ঠোঁট লাগিয়ে হুক্কা টানতে টানতে মাতাল ধোঁয়া ছেড়ে বউকে বাসররাতের নবযৌবন দেখায়! তার উদোমবুকে মাথা রেখে বউটা তখন কুপিবাতি নিভিয়ে দেয়।

. . .

Haorer Mukh-IV; Artist: Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

সুরেন বাইন : শেখ লুৎফর

বৈঠা : সজল কান্তি সরকার

নাইওর : কামাল রাহমান

‘লঞ্চ চলে ধীরে ধীরে’ : একটি গানের বয়স

একটি ‘জলকাহন’ ও ‘সিদল শুঁটকি’ সমাচার : ফয়েজ আহমদ

জীবনের হঠাৎ চমকে ওঠা মুহূর্তগুলো — আহমেদ বেলাল

. . .

লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম

সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *