
১.
ওঠো; তুমি এখন যেহেতু উঠবেই। রাতভর তোমার হৃৎপিণ্ডের গর্ভে যে-সমস্ত প্রতিবাদ-ঝড় বলকে উঠছিল কাল, এই পরিষ্কার আলোয় এই পোশাকি পরিচ্ছেদে তেমনটিই দেখতে পাও যদি জানবে ‘পেরিয়ে এস্ছ’ এই কথা ভুল। যদিও পেছনে তাকানো কোনওভাবেই আর তোমার জন্য নিষিদ্ধ নয়। ইচ্ছে করলেই তুমি ঘুরে দাঁড়াতে পারো পৌঁছুনোর প্রান্তে। যা কিছুই এখন ঘটে যাচ্ছে ওখানে, তা-যে মীমাংসাৱ দিকে নয়, শুধুই বৈরিতার চাল, বলে না দিলেও আজ তা আমরা বুঝি। সহজের দিনে আমরা সহজ হতে পারিনি। অনেক শ্রম অনেক যত্ন আমাদের প্রার্থনা-পদ্ধতি। নয়তো একমাত্র যেখানেই চোখ তুলে তাকানো যেত, তোমার ব্যর্থতার যাত্রা পথ-ভেঙে এলে, সেখানেই গুঁজে দেয়া যেত—আকুতি, আকুতিমুখ। ভেতরের সমস্ত আগল খুলবো করে যেখানে মানুষ, মানুষের মিলে যাবার সম্পূর্ণ চরা, এগিয়ে আসে, সেখানেই আজ নীরবতা…
২.
দেখা যাচ্ছে যখন লুকোনোই থাকছে তোমার হাড়ভাঙা শব্দগুলো বুকের বাঁ-পাশটায়, আর পেয়ালার পর পেয়ালা খেয়ে নিচ্ছ রক্ত মানুষেরই নিপুণ চাতুর্যে, যদিও এতটা অভ্যেস কখনোই ছিল না আগে,—লুকোনোই থাকছে এবার লুকোচুরির একচ্ছত্র অন্ধকার, জন্মানোর পালা। বাড় ভেঙে উঠে আসছে আবার ছুঁয়ে-না-দেবার প্রবল ইচ্ছেটুকুও। কতটুকু শক্তি হলে আজ এই দৃষ্টিবিস্মরণ থেকে, মিথ্যে-হয়ে-যাওয়া থেকে ছিনিয়ে আনা যেত আজকের দিনের প্লাবন—যদি আমরা ভাবি, যদি আমরা ভেবে দেখি বিন্দুমাত্র মুহূর্তের দিকে চেয়ে, আমাদের আরও ভেতরে প্রতিনিয়তের যে-ছন্দ নিজেরই তালে উছলে উঠছে, একেবারে অন্যরকম তানে তাকেও খুঁচিয়ে দিই যদি তোমার কথা বলে, তুমি-কি আর অভ্যেসমতো সিঁটিয়ে থাকতে পারো, বলো? যতই লুকিয়ে থাকতে চাও
অন্ধকারকে জেনে, দাপাতে দাপাতে ভাসতে ভাসতে তোমার আশীর্বাদ আমাদের চাই-ই-চাই…
৩.
যেহেতু আর পালানোর কোনো মানে থাকছে না, মানে থাকছে না থমকে থাকারও। অনুর্বর ছাদ ভিজতে ভিজতে পাওয়া-না-পাওয়ার যেই দোলাচল ‘পেরিয়ে এস্ছে’ গতরাত, আজকের এই হালকা দিনে তার কোনও অবক্ষয়চিহ্ন আমাদের/মানুষের তীব্র শরীরে দেখতে পাওয়া যায়? ভিড় থেকে সামনে এগিয়ে কেবলই ঘূর্ণিলাগা দূর। অনেক… অনেক দূরতায় সিঁড়ি নেমে গ্যাছে। কিন্তু নামবে কে? কারও-তো নিশ্চয় নেমে যাবারও কথা। এতোদিন যে-মুখ লুকিয়ে রেখেছিলে, খুঁজতে খুঁজতে এসে আজ যদি সেই মুখ আয়নায় দেখো, যদি চিনতে পারো ওই ক্ষতবিক্ষত… এই পরিচিত গলা এই পরিচিত কণ্ঠ তাহলে কার? বাস্তুর সমস্ত নিয়ম ছিঁড়ে যার সর্বস্তর বন্ধু হতে চাও, টেনে নিতে চাও যেখানে মানুষ গর্জে ওঠে, তারও তো একটা আস্ত আকাশ থাকে, মাটিও থাকে। তোমার ওইসব কই? পালানোর জন্য এবার অমন যে থমকে থাকো… তার শেষটাও দেখিও…
8.
কথার ভেতর এতো প্রত্যাশার ক্ষত, না খুঁড়তেই বেরিয়ে এলো যেন। তাতে কী, না-হয় আসলোই, তলিয়ে দেখতে চেয়ে ভেঙে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের টুকরোগুলো উছলে উঠল এই সরল সহজ মনে। শুধু দূর থেকে চেনা; চেনা মানে চিনতে চাওয়া; চিনে-ফেলা মান-ভাঙানোর-ফুল আমাদের মনকে ভেঙে দিয়েছিল। অথচ আজকের দিনে, জন্মের দিনে, দেখতে পাওয়ার যে-আকুল কান্না নিয়ে এসছিলাম জানি, তার কোনও শব্দই আর শব্দ থাকল না। ক্ষরণে ক্ষরণে তার সবই মিথ্যে হলো। মাঝখানে শুধু কয়েকটা মুহূর্তের ফের। তারপর আবার সেই ঘৃণা; ঝাপটানোর দারুণ অস্থির রক্ত; বেওয়ারিশ বিষ। ফিরে আসতে গেলে কেউ যেন ডাকে; একেবারে আপনার আপ্রাণ ডাক। যদি এমনই হতো, কোনওকালেই আমাদের কোথাও কেউ ছিল না, খুব সহজেই মুহূর্তে চেঁচিয়ে ওঠা যেত;—দিক্বিদিক ফাটিয়ে দিয়ে কেবল লাল আর লাল, মানুষের বয়স-গুণতির দিন।
৫.
মানুষকে দেখে গা কেমন শিউরে ওঠে। বুঝি না মানুষের সাথে গা’র কী সম্পর্ক! ধুলো মাটি জল আর মানুষের স্রোত এক-একবার উপড়ে ফেলছে ঘর। ভাসতে ভাসতে গড়িয়ে গড়িয়ে আজ যেখানেই ঠুকে যাবার কথা, দেখি লাফিয়ে উঠছে মানুষ; নিচে, আরও নিচে আমাদের বাঁধন আলগা হয়ে আছে। ঈশানে নৈঋতে হাড় ভাঙছে আর ফেনিয়ে আসছে বাস্তুর সাগর। তুমি কিছু বলবে বলবে করেও যখন বললে না কিছুই,—সরে এলে, ভাবলে ফাটলের দিকে এসে যদি আমরা কেউ, কেউই আর না তাকাই আমাদের প্রান্তবিন্দুতে, তাহলে এই উপচেপড়া ভিড় এমন সর্বস্বব্যাকুলতা কেন? কেন এই হঠাৎ শিউরে ওঠা? না, এ-কোনো অর্থ খোঁজা নয়; এমনকি পরিত্রাণের গূঢ় কোনও অভিসন্ধিও নয়; ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়তই-গর্জে-ওঠা-যে-মানুষ মানুষের মধ্যে থাকে, তারই এই চড়াই-উতরাই তারই এই বিষ। জানি না কতদিন আর… কত’কত’কত’ কত’ মূহূর্তের পর গা’কে আমরা বুঝে উঠবো!
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আজ আলোর নাচন; যখন তাকিয়েছি এই দিকে, উপরে, আমাদের প্রতিরক্ষার গা’য়… কিন্তু এই আলো, কার? কার জন্যেই-বা এই নেমে-যাওয়া, দিগন্ত পর্যন্ত? জানি নেই নেই করে সেই মিথ্যে করেও যেহেতু আর নেই, তখন দূরালাপই চাই। দূর দূর পাপ আমাদের ইচ্ছের দায়। ভেতরে আসতে চেয়ে আজ আবারও প্রান্তে শরণ। অথচ এতকাল পর তোমার মুখটিও আর মনে পড়ছে ন আমার! কান্নার যন্ত্রণার দাগ ছোপ ছোপ লেগে আছে।—তুমি কি ভুলতে পেরেছ, পেরিয়ে আসতে পেরেছ, সব;—এ-সমস্তই জানতে চাইছিলাম; চাইছিলাম তুমিই বলো, অন্যভাবে। পথের ভাবনায় ফিরে যাচ্ছি না আর। একটু এগুনোর পর সত্যিই যখন ডুকরে উঠলে, মনে হলো আমার অন্ধকার চিরে এ-কোন আলোর ভাঙন আমাকেই কেন অন্ধ করে ফ্যালে! বাস্তবিকই আমি বুঝতে পারি না : তুমি খুব কাছেই আছো, কেবল একটিবার, অন্তত একবার ঝাঁপ দেবার অপেক্ষায় ৷
৬.
প্রবাহকে ধরে ফ্যালো। এসো, এখান থেকেই আজ চিনেফেলবার চোখ উপড়ে নেয়া যাক; তুলে নেয়া যাক চিৎকার বাঁচানোর পাঁকানো কৌশল। শত্রুতাকে নয়; বন্ধুতাকেও না; কেবল ছিনিয়ে আনতে চাই আজকের দিনের শাপ; অভিসম্পাতের গূঢ় অভিসন্ধি। অথচ কী হচ্ছে ওখানে? কিছুই কি আর পৌঁছানো গেল?—আমরা জানবো না। জানতে পারবো না-যে মিথ্যে করে এসে দেখতে পেলেও, অপেক্ষার ছাড় বাঁচার। তারই জন্যে এই ফলাবার সমস্ত চেষ্টা। কিন্তু আমরা কেউ ওজন বুঝি না। ভর সইতে সইতে নুয়ে-পরে-যে-ক্লান্তি এমনি করে আর কত কাল ঘিরে থাকবে ছায়া, আমরা বলতে পারি না। ছিঁড়ে-ফেঁড়ে শুধু লজ্জাকেই ঢাকি। এতো মুখ লজ্জার! মরণমুখে যেন মৃত্যু নেই তার… অতঃপর রাতের পর রাত দিনের পর দিন; এখান থেকেই তুমি ইচ্ছে কোরো; ফাটিয়ে ফেলো শূন্যতার ভার। একদিন ঠিকই ঠিক ঠিক চোখে আমরা তাকিয়ে নেব; পূর্বাপর গ্লানি পৌঁছে দেব জেনো; বহতায়।
. . .

পাঠ-অনুভব : ‘পরাহত ভাঁজ’-এ বিরচিত ‘সময়চরিত’
ঋতো আহমেদ-এর এই কবিতালেখ্য আহমদ সায়েম-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘হরমা’র ২য় সংখ্যায় আমরা পড়েছি আজ থেকে পনেরো-ষোল বছর আগে। ‘সূনৃত’ ছোটকাগজ নিয়মিত প্রকাশের দিনকালে কম খর্চায় অপেক্ষাকৃত ছোট কলেবরের কাগজ করার ভাবনা সম্পাদক ও এর সঙ্গে জড়িতদের মনে তখন দানা বাঁধছিল। কলেবরে ক্রমশ স্ফীত হতে থাকা ‘সূনৃত’র পক্ষে সৃজনশীল ও নিরীক্ষাপ্রবণ লেখালেখির আবেগকে স্থান দেওয়া নানা কারণফেরে কঠিন হয়ে পড়েছিল। ছোটকাগজের চিরচেনা অবয়ব ছাপিয়ে যাওয়ার ফলে কাগজটিকে কেমন জানি অচেনা লাগত তখন।
বিংশ শতাব্দীর আশি ও নব্বই দশকে বাংলাদেশে ছোটকাগজ প্রকাশনার মরাগাঙে নবজোয়ার আসে তাতে সন্দেহ নেই। ওপারবাংলায় ছোটকাগজ প্রকাশের প্রথা দীর্ঘ নাগরিক সংস্কৃতির আবহে লালিত হওয়ার কারণে ততদিনে ভালোই পরিপুষ্ট ও সবল। সময়-উপযোগী বিষয়বস্তুকে প্রাসঙ্গিকে রেখে বৃহৎ আকৃতির ছোটকাগজ প্রকাশের চর্চা নতুন ছিল না তাঁদের জন্য। বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু দিয়ে সাজানো খুদে ও মাঝারি আকৃতির কাগজের সংখ্যাও ছিল প্রচুর।
বাংলাদেশে ছোটকাগজ ও ছোটকাগজ কেন্দ্রিক বই প্রকাশনা এদিকে থেকে ধারাবাহিক ঐতিহ্য মেনে গড়ে ওঠেনি। আশি-নব্বইয়ের দিকটায় ‘গাণ্ডীব, প্রান্ত, নিসর্গ, লিরিক, একবিংশ, দ্রষ্টব্য’-র মতো কাগজ তুলনামূলক বড়ো কলেবরে ‘প্রাসঙ্গিক সংখ্যা’ বের করতেন। রাজধানী ও জেলা-শহর থেকে প্রকাশিত বাদবাকি কাগজের বৃহৎ অংশ আট-দশ ফর্মায় সীমিত থাকা শোভনীয় মানতেন। একফর্মা থেকে চার-পাঁচ ফর্মার কাগজ সংখ্যায় অধিক ছিল। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে পা রাখার পর থেকে সিনারিটা দ্রুত বদলে যায়। ছোটকাগজের কলেবর বৃদ্ধির বিষয়টি স্বাভাবিক ও অনিবার্য হয়ে ওঠে।
৪র্থ সংখ্যা থেকে ‘সূনৃত’ তার চেনা আকৃতির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিষয় কেন্দ্রিক সংখ্যা ও ক্রোড়পত্র করার পরিকল্পনা বড়ো ভূমিকা রাখে সেখানে। বড়ো আয়তনের লেখাকে জায়গা দেওয়ার বিষয়টিও সম্পাদক বিবেচনায় নিয়েছিলেন। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে যে-ঘটনা নিয়মিত ছিল না বাংলাদেশে, নতুন শতকে সেটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। ‘সূনৃত’র কলেবর বৃদ্ধির পেছনে এরকম কিছু বাস্তবতা নির্ধারক ছিল তখন। খর্চা, শ্রম ও সময় যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিষয়ধর্মী লেখার চাপে নিরীক্ষাধর্মী সৃজনশীল লেখা ছাপানোর পরিসরটা ‘সূনৃত’-এ এভাবে অনেকখানি সংকুচিত হয়ে আসে। উপায় ভাবতে বসে কাগজটির সঙ্গে জড়িতরা ‘হরমা’ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। সৃজনশীল গল্প-কবিতা-গদ্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাগজটি অবশেষে আলোর মুখ দেখে। একই সম্পাদক; কিন্তু অবয়ব ও লেখার ধরনে ‘সূনৃত’ ও ‘হরমা’ পরস্পর থেকে আলাদা। নদী ‘সুরমা’কে মানুষ একটা সময় অসমরাজ-কন্যা ‘হরমা’র নাম ধরে ডাকতেন। ইতিহাস ও কিংবদন্তিতে বিলীন সেই নামখানা সম্পাদক কাগজটির জন্য বেছে নিয়েছিলেন।

পরিতাপ এই-যে, ছোটকাগজের লেখক-পাঠক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক সাড়া ও পাঠ- সমাদর পাওয়া সত্ত্বেও ‘হরমা’র যাত্রা কিছুদিন পর থেমে যায়! ৩টি সংখ্যা বের করার পর কাগজটিকে অবলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত সম্পাদক আহমদ সায়েম পাকাপাকি নিয়ে ফেলেন। দুটো কাগজের ভার বহনের তাড়া ও চাপ সম্ভবত তাঁর জন্য পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছিল। এটা তবু মানতে হবে, ‘হরমা’র ৩টি সংখ্যা ছোটকাগজের সেই আত্মাকে সযত্নে ধারণ করেছিল, যেটা বৃহৎ কলেবরে প্রকাশিত ‘সূনৃত’ ওইসময় অতখানি ধারণ করতে পারেনি।
‘হরমা’র ৩টি সংখ্যায় যাঁরা লিখেছিলেন সেইসময়, প্রত্যেকের লেখায় ছোটকাগজ যেরকম থাকতে চায়, অর্থাৎ আন্তঃনিবিড় উষ্ণতাটা পুরামাত্রায় ছিল। ঋতো আহমেদ-এর ‘পরাহত ভাঁজ’ও তাই। মনোলোগঘেঁষা পঙক্তিরা নব্বই ও নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতায় চারিয়ে ওঠা লক্ষণকে চিনিয়ে দিয়ে যায়। ঋতো আহমেদ এখন না-হয় মানব-সংসারের মহারণ্যে মধ্যবয়সে পা দিয়েছেন। কবিতা, গদ্য, ভাষান্তরে তাঁর যাত্রা জীবন-রসায়নে পরিপক্ক;—তথাপি, ‘হরমা’য় ছাপানো কবিতায় যে-কণ্ঠস্বর পাঠকের কানে তরঙ্গ তোলে, অনুমান আশা করি অসংগত নয়,—ওই কণ্ঠস্বরটি এখনো তাঁর কবিতার আদ্যশক্তি হয়েই আছে।
অনলাইন মুখপত্র ‘মেঘচিল’-এ প্রবুদ্ধসুন্দর করের একটা কবিতা নিয়ে পাঠ-আলোচনায় ‘আমি’র কবিতা’ ও ‘না-আমি’র কবিতা’কে তিনি যে-দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা ও ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তাঁর নিজের লেখা কবিতায় এর প্রতিধ্বনি পাঠকের পাওয়ার কথা। ‘পরাহত ভাঁজ’-এ বোধগম্য এক অবোধ্য ধ্বনিগুঞ্জন পাঠককে বিচলিত করে। ঋতো আহমেদকে যেখানে মনে হবে, ‘আমি’র সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হতে-হতে গহনতলে যাত্রা করছেন। তাঁর এই ‘আমি’টাকে আত্মার মাংসভক্ষণে অধীর ও মীমাংসায় পৌঁছাতে উন্মুখ অন্বেষক ধরে নেওয়া হয়তো অবান্তর নয়। ‘পরাহত ভাঁজ’-এ কবি লিখেছেন :
মানুষকে দেখে গা কেমন শিউরে ওঠে। বুঝি না মানুষের সাথে গা’র কী সম্পর্ক! ধুলো মাটি জল আর মানুষের স্রোত এক-একবার উপড়ে ফেলছে ঘর। ভাসতে ভাসতে গড়িয়ে গড়িয়ে আজ যেখানেই ঠুকে যাবার কথা, দেখি লাফিয়ে উঠছে মানুষ; নিচে, আরও নিচে আমাদের বাঁধন আলগা হয়ে আছে।…
‘বাঁধন আলগা হয়ে আছে’টাকে যদি প্যারাফ্রেজ ধরে নিই, তাহলে এটা গুরুতর হয়ে ওঠে, ঋতো আহমেদ সময়ঘূর্ণির মধ্যে বসে ভালোই টের পাচ্ছেন,—প্রতিটা মানুষের একান্তে অন্তর্লীন ‘আমি-সত্তা’র মধ্যকার গ্রন্থি টুটাফাটা! নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্করেখা কিছুতেই স্পষ্ট হওয়ার নয়, অন্যদের ‘আমি-সত্তা’কে উপেক্ষা করে। কবি এ-কারণে বিবৃতিটা দিচ্ছেন তারপর :

না, এ-কোনো অর্থ খোঁজা নয়; এমনকি পরিত্রাণের গূঢ় কোনও অভিসন্ধিও নয়; ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়তই-গর্জে-ওঠা-যে-মানুষ মানুষের মধ্যে থাকে, তারই এই চড়াই-উতরাই তারই এই বিষ। জানি না কতদিন আর… কত’কত’কত’ কত’ মূহূর্তের পর গা’কে আমরা বুঝে উঠবো!
পঞ্চাশ থেকে সত্তরের কালপর্বে বাংলা কবিতায় ‘আমিত্ব’, ‘আমিসত্তা’, ‘আমি-যাপন’-এর যেসব নমুনা পাঠক ট্রেন্ড হয়ে উঠতে দেখেছে, এর অনেকখানি আবার স্বদেশ ও বিশ্ব মিলেঝুলে ঘনীভূত সংঘাত ও টানাপোড়েনের ভিতর কবিগণকে বিজড়িত রেখেছিল,—নব্বই ও পরবর্তী সময়ের কবিতা সেখানে ভিন্নস্রোতে অবগাহন করতে মরিয়া ছিল। ‘পরাহত ভাঁজ’কে সেই ভিন্নস্রোতের অন্যতম নজির বলে ধরে নেওয়াকে পাঠক অত্যুক্তি ভাববেন না আশা করি।
নব্বই ও পরবর্তী কবিতা তাদের একান্ত ভালোমন্দ মিলে পূর্ববর্তী কাব্যধারা থেকে ভিন্ন। যেখানে, এর সাফল্য বা কবিতামগ্ন ‘আমি-যাপন’টা পরিশেষে কী মণিরত্ন কুড়িয়ে পেলো, এই বিবেচনার ভার সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া সমীচীন মনে করি। সময় সেই নির্মম নির্বাচক,—যা রাখার তা রাখবে সযত্নে। বাকিরা ভেসে যাবে ও বিলীন হবে কালগঙ্গায়। চুলচেরা ব্যবচ্ছেদ বাদ দিয়ে ঋতো আহমেদ-এর কবিআস্তিনের ভাঁজে লুকানো পঙক্তিচরণ এতদিন পরে এই-যে পড়তে বেশ লাগছে, এটাকে বরং উদযাপন করা যেতে পারে। সতেজ একটা ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে দূর নাশপাতিবনে।
আলঙ্কারিক কবিতারীতিকে বিসর্জনের নীরব দ্রোহ কবিতাটি ঋতো যে-সময়ে বসে লিখেছেন, অনেক কবির মধ্যে তখন তা কাজ করছিল। কবিতার ভাষা-বুনোটে নিরলঙ্কার আত্মমগ্নতা অনেবে আরাধ্য ভাবতেন। বহির্মুখী হওয়ার চেয়ে অন্তর্মুখী কবিমনের সমাদর বাড়ছিল। ঋতোর কবিতা ওই আভাসটা রেখে যায়। অলঙ্কারের ছটা, উপমার বাহার, বাঁকপ্রতিমার গূঢ়তাকে ছাপিয়ে আটপৌরে ও সহজিয়া ভাষাকে তিনি কবিতায় আরাধ্য করেছেন। ভাষার চাল সেখানে সহজ, কিন্তু কবিতার ভিতরে যে-ক্ষুধা ও কিছু একটা মোকাবিলা করার প্রত্যয় অথবা বিনয়,—মনোলোগের সুরে বলতে থাকা এই কথাস্রোত ও এর সারার্থ কি বোধগম্য হলো পাঠকের? প্রশ্নটি, এতদিন পরেও মনে জেগে আছে দেখতে পাচ্ছি।
কোনো কবি যখন নিজের আত্মগহিনকে খননের সংকল্পে গাঁইতি-শাবল হাতে নামেন, ভাষা সেখানে বোধগম্যতার সীমায় চলাফেরা করা সত্ত্বেও অবোধ্য কূটাভাস রেখে যায়। ‘পরাহত ভাঁজ’-এর আত্মমগ্ন কবিতাস্বরে তা মুদ্রিত ছিল মনে হচ্ছে। এবং, এটা অনন্দের-যে, ‘হরমা’ এমন এক সময়ে কবিতাটি ছেপেছিল, যেখানে এর লক্ষ্যই ছিল,—কবি ও লেখকের সাবলীল নিঃশ্বাসগুকে কাগজে সযত্নে ধরে রাখা।
—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
. . .

লেখক পরিচয় : ঋতো আহমেদ
কবি, গদ্যকার, অনুবাদক ঋতো আহমেদ-এর জন্মশহর ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠ শেষে শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পেশায় প্রকৌশলী ও বর্তমানে ঢাকায় নিবাস। কবিতার পাশাপাশি গদ্য ও অনুবাদে সক্রিয় গোড়া থেকেই। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘হে অনন্ত অগ্নি’, ‘জলের পাতাল’, ‘কবিতার দৃশ্যমান, কবিতার দৃশ্যাতীত’, ‘কবিতায় অভিনিবেশ’, ‘ভাঙনের মুখ’, ‘আদিরসাত্মক সংস্কৃত কবিতা’ ছাড়াও ‘নির্বাচিত কবিতা : পাউল সেলান’, ‘ওয়াকিং টু মার্থাস ভিনিয়ার্ড’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
. . .

ঋতো আহমেদ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম


