পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

উট : কামাল রাহমান

Reading time 17 minute
0
(0)
Conceptual Artwork-I, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

মরুনিবাসী ওরহান সালেমের জীবনের শুরুর দিকের দিনগুলোর স্মৃতি এখনো হালকা মেঘের মতো ওর মনের ভেতর মাঝেমাঝে উড়ে আসে। আরো একটু স্পষ্ট করে বললে ওর হাঁটতে শেখার দিনগুলোর স্মৃতি প্রায়ই উঁকি দিয়ে যায় ওর গোধূলি-আকাশে। ওর মনে হয় সেই তখন থেকে সে পেরিয়ে চলেছে এক সীমাহীন মরুপ্রান্তর। রুক্ষ্ম, নির্মম, উষ্ণ, নিষ্প্রাণ, এসব দিক থেকে ভেবে দেখলে গোবি, সিনাই অথবা নেভাদা বা সাহারা প্রভৃতি সব মরু হয়তো একইরকম। বালিয়াড়ি, বাতাস, পাথর এসব হয়তো হতে পারে কিছুটা ভিন্ন। মরুজীবনের প্রতি অথবা নিজের প্রতি এক অজানা অবজ্ঞায় সে হেঁটে চলেছে উদ্ভ্রান্তের মতো। প্রতিকূল কোনো পরিস্থিতি রোধে সামান্য কোনো আয়োজনও ওর নেই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটা মাদি উট, অসম্ভব কোনো বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য জোর করে গছিয়ে দেয়া কয়েকটা মোহর, আস্তিনের নিচে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট একটা চাকু, সামান্য কিছু শুকনো খাবার, জলের দুটো মশক, উটের পিঠে চাপানো ছোট্ট একটা তাঁবু, অন্তরে ধরে রাখা মায়ের কিছু উপদেশ,—এইসব ওর চলার পাথের অথবা বেঁচে থাকার উপকরণ।

মরুজীবনের আরো একটা দিনের শুরুতে দূরের দিগন্তরেখায় চঞ্চল প্রাণের চিহ্ন দেখে সঙ্গী উটটাকে বসিয়ে দেয় সে বালিয়াড়ির ভেতর। মুখে একধরনের অদ্ভুত শব্দ ‘উখ্ট, উখ্ট’ করে শান্ত থাকতে বলে ওকে। নিজেও লুকিয়ে পড়ে বালুর খাদে।

কঠিন মরুচারী জীবনে ক’টা বিষয় এড়িয়ে চলে সে খুব যত্ন করে। প্রথমটা মানুষের ছায়া, দ্বিতীয় মরীচিকা ও তৃতীয়টা হল ঝুমঝুমি সাপ। ভাগ্য হয়তো ভালো নয় আজ। লুকিয়ে পড়ার আগেই ওকে দেখে ফেলেছে মরুদেশের আদি পেশাদার একটা ডাকাত দল। ঝড়ের বেগে ওর দিকে এগিয়ে আসে ওরা। দৃষ্টিসীমার ভেতরে এলে ওদের দেখে খুব সুবিধের মনে হয় না ওর। মলিন জোব্বার পকেটে হাত ঢোকায় সে। ছোট্ট একটা চাকু মাত্র ওখানে, যা দিয়ে দৈনন্দিন টুকটাক কাজ মেটানো যায়, কিন্তু কোনোভাবেই একটা ডাকাত দলের সঙ্গে লড়া যায় না। মনে মনে ভাবে সে, কতটুকু আর প্রতিরোধ করতে পারবে এটা দিয়ে! প্রথমে চেষ্টা করে এড়িয়ে যেতে, যা সে বরাবর করে থাকে।

নিস্পৃহভাবে বসে থাকতে দেখে ডাকাত দলের সর্দার লম্বা শিংওয়ালা একটা ভেড়া লেলিয়ে দেয় ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে, একটা খারাপ সময়ের মুখোমুখি হয়েছে সে। একটু ভাবে। ওর মনে হয়,—শুরুতেই এটা শেষ করে দেয়া দরকার। চট করে হাতে নেয় ছুরিটা। প্রথমে দ্বিধা হয় একটু। এত ছোট এটা!—ভরসা হয় না। একটা ডুয়েল হয়তো লড়া যায় এটা দিয়ে। একদল মানুষ সামলানো অবশ্যই কঠিন। নিমেষের মধ্যে ঝাঁপিয়ে ওই প্রাণীটার শিং আঁকড়ে ধরে। গলনালীর ভেতর সেঁধিয়ে দেয় ছুরিটা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে চোখমুখ ভাসিয়ে দেয় ওর। মুহূর্তের ভেতর ওটার সামনের একটা পা হাঁটু থেকে কেটে নেয়। ওটা নিয়ে দৌড়ে এগিয়ে যায় ছোট্ট দলটার দিকে। এত দ্রুত এসব ঘটে-যে হতভম্ব হয়ে পড়ে ওরা। এমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কাজটা শেষ করে ফেলায় ওরা বুঝতে পারেনি একটা সাধারণ মানুষ সে। দৈত্যদানো ভেবে আতঙ্কে দ্রুত পিছিয়ে যায়। নিজের এমন বীরত্বে একটু অবাক হয় সে। মজাও পায় কিছুটা। ওদেরকে আরেকটু ঘাবড়ে দিতে গলা ফাটিয়ে একধরনের অদ্ভুত শব্দ করে। তীব্র ওই উ-লা লা-লা-লা ধ্বনি খোলা প্রান্তরে মরুঝড়ের আর্তনাদের মতো শোনায়। আরো জোড়ে দৌড়ে পালাতে থাকে ওরা।

ওই দলের অনেক পেছনে ওদের একজনকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যায় সে। ওরা হয়তো ভেবেছে সে কোনোভাবে আহত করেছে ওকে। মুহূর্তের ভেতর দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে যায় ওরা।

ওকে এগিয়ে যেতে দেখে উঠে বসে লোকটা। শরীরের ধুলো ঝেড়ে বলে, ‘ঠিক আছি আমি।’

চোখ ধারালো করে বলে ওরহান, ‘তা তো জিজ্ঞেস করিনি তোমাকে!’

ওর কাছ থেকে কিছুটা সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করে সে। বলে, ‘না, ভাবলাম মাটিতে পড়ে আছি দেখে হয়তো ভেবেছ-যে কিছু একটা হয়েছে আমার।’

কণ্ঠে রুক্ষ্মতা ধরে রেখে বলে ওরহান, ‘তা ভেবেছি। উঠে দাঁড়াও তো বাপু এখন সোজা হয়ে। সঙ্গে অস্ত্রটস্ত্র কী আছে বল দেখি?’

‘না, কিছু নেই। এই দেখো, ঝাড়া হাত পা।’ একচক্কর ঘুরে ওর শরীরটাকে দেখায় সে।

নিশ্চিত হতে পারে না ওরহান। বলে, ‘সন্দেহ হচ্ছে।’

প্রতিক্রিয়ায় একটু আহত শোনায় কালো মানুষটার কণ্ঠ। বলে, ‘সব খুলে ন্যাংটো হবো?’

‘না। শুধু জোব্বাটা খুলে নিচে রাখো। আর পিছিয়ে দাঁড়াও কয়েক পা।’ আদেশের সুরে বলে ওরহান।

ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখে ওটা ফেরত দেয় লোকটাকে। ওর ফন্দি বোঝার চেষ্টা করে। বালুতে ঘঁষে পরিষ্কার করে কোমরে গুঁজে রাখে ছুরিটা। দুম্বার কাটা পা ছুঁড়ে ফেলে ওটার পাশে। কষ্ট হয় প্রাণীটার জন্য। নিজেকে রক্ষা করতে যেয়ে একটা প্রাণ কেড়ে নিতে হলো! বিকল্প কিছু ছিল না আর। ভয় না দেখিয়ে জয়ী সে হতে পারত না ওদের সঙ্গে। শারীরিক সংঘর্ষটা এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না। পালিয়ে বাঁচার কোনো পথও নেই এই মরুভূমিতে। প্রাত্যহিক জীবনের এইসব নৃশংসতা থেকে দূরে থাকার জন্য লোকালয় ছেড়ে এসেছিল সে। অথচ এখানেও এই অকারণ রক্তারক্তি! ভালো লাগে না এসব।

মনে মনে ভাবে, ‘ওই লোকটার বিষয় শেষ করে দিতে হয় এখন।’ ওকে জিজ্ঞেস করে, ‘যদি কিছু না হয়ে থাকে তোমার তাহলে মাটিতে পড়ে রয়েছিলে কেন?’

তর্জনী ও মধ্যমা তুলে দেখায় সে। বলে, ‘দুটো জবাব আছে এটার।’

একটু অবাক হয় ওরহান। বলে, ‘ভণিতা না করে প্রথমটা বল।’

সরাসরি এবার সে তাকায় ওরহানের চোখের দিকে। বলে, ‘মুহূর্তের জন্য তোমার চোখ দুটো দেখতে পেয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি-যে অকারণ কোনো অত্যাচার নেই ওখানে। ভয় পাইনি তোমাকে।’

একটু কৌতুকের স্বরে বলে ওরহান, ‘বাহ্, তুমি তো এক অসাধারণ মানুষ হে, চোখ দেখেই বুঝতে পারো!’

চোখেমুখে একটু হাসির ভাব ফুটিয়ে বলে সে, ‘মানুষের মনের আয়না হলো চোখ।’

ওর বিষয়ে একটু ভাবে ওরহান। মনে মনে কোনো ফন্দি আঁটছে কিনা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছো কেন?’

কয়েকটা মাত্র বাক্য বিনিময় হয়েছে ওদের মধ্যে। এতেই কিছুটা নৈকট্যভাব এসেছে ওদের ভেতর। পারস্পরিক সন্দেহ ও ভীতি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। কালো মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে সে বলে, ‘আমি পালিয়েছি।’

অবাক হয় ওরহান। জিজ্ঞেস করে, ‘কেন?’

মুখের রেখায় ওই হাসিটা ধরে রেখে বলে সে, ‘ওটা হলো তোমার প্রশ্নটার দ্বিতীয় জবাব।’

একটু খটকায় পড়ে ওরহান। বলে, ‘মনে হয় প্যাঁচাচ্ছো। সোজাসুজি বলো কেন পালিয়েছ ওদের কাছ থেকে?’

বিষয়টা যেন আবার অন্যদিকে ঘুরে না যায় তাই সরাসরি বলে সে, ‘ওই দলের কেউ না আমি। সামান্য এক দাস।’

স্বগতোক্তির মতো বলে ওরহান, ‘হুম… সামান্য এক দাস!’

দু’জনেই চুপ থাকে কিছুক্ষণ।

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ওরহান, ‘দাসদের পালানোর শাস্তি কি জানো?’

নির্বিকারভাবে জবাব দেয় সে, ‘জানি, এই দেখো।’

জোব্বা খুলে উদোম পিঠ দেখায় সে। উরু ও পশ্চাতদেশ দেখায়। সব জায়গায় লোহার আগুনে ছ্যাঁকা দেয়ার বীভৎস চিহ্ন। কষ্ট পাওয়া চোখে ওগুলো দেখে ওরহান। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘আবার পালিয়েছ-যে তাহলে?’

একটু সময় নিয়ে জবাব দেয় সে, ‘প্রথমবার পালানোটা ছিল সত্যিকারের। মনিবের দেয়া শাস্তি পেয়ে শোধ হয়ে গেছে ওটা। তারপর ওদের সঙ্গে চুক্তি হয় আমার। দাসত্বের মূল্য শ্রম দিয়ে শোধ করে দিলে ওরা মুক্তি দেবে আমাকে। জীবন হাতে রেখে শ্রম দিয়েছি শুধু মুক্তির আশায়। অথচ আমার ওই মনিব এই দস্যুদলের কাছে দ্বিতীয়বার বিক্রি করে দেয় আমাকে।’

ওকে জেরা করা অব্যাহত রাখে ওরহান। জিজ্ঞেস করে, ‘আহত হওয়ার ভান করে প্রতারণা করলে? ওরা তো কিনে নিয়েছিল তোমাকে।’

হেসে বলে সে, ‘প্রতারণা করিনি। সামান্য অভিনয় করেছি। জীবনের জন্য এটুকু না করলে হয়তো জীবন থেকে মুক্তিই পেতাম না কোনোদিন।’

কিছুটা নমনীয় হয়ে বলে ওরহান, ‘যুক্তি দাঁড় করাচ্ছ এখন তোমার অন্যায়ের বিপক্ষে।’

মাথা দুলিয়ে বলে সে, ‘হয়তো। তবে কোনো-না-কোনোভাবে অভিনয় করে না এমন কে আছে এ-জগতে?’

ওর এই যুক্তিটা শাঁসালো মনে হয়। মরুদিগন্তে চোখ মেলে বলে ওরহান, ‘ভাবার বিষয় বটে।’

এবার সে কিছুটা ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করে, ‘দক্ষিণে চলে যাওয়ার জন্য একটা সুযোগ খুঁজছিলাম। ভালোভাবেই জানতাম-যে ওখানেও কঠিন শ্রম বিক্রি করে বাঁচতে হবে। তবে একটু ভিন্নতা ছিল ওটায়। ওখানে অন্যের দাস নয়, নিজের।’

ওকে থামিয়ে দেয় ওরহান। বলে, ‘পৃথিবীতে সবাই দাস। হয় অন্যের, নয় নিজের!’

‘না-হয় প্রভুর।’ উপরের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বলে সে।

মেনে নেয় না এটা ওরহান। সে বলে, ‘না। প্রভুর কোনো দাস নেই। দাসের প্রয়োজন হয় না প্রভুর। কোনো প্রয়োজনই নেই তাঁর। দাস লাগবে কেন?’

একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে সে, ‘তাহলে ওরা-যে বলে আমি প্রভুর দাস?’

জোর দিয়ে বলে ওরহান, ‘ওটা সত্যি না। নিজেদের লোভের দাস ওরা।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সে। একমুঠো বালু হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে যেতে দেয় ওগুলো। মরুভূমিতে বাতাসের কোনো প্রবাহই নেই এখন। বালুগুলো সব ঝরে যাওয়ার পর হাত ঝেড়ে বলে সে ‘তোমাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে আমার।’

সঙ্গে সঙ্গে বলে ওরহান, ‘এই মুহূর্তে।’

ওর দিকে তাকিয়ে বলে সে, ‘হয়তো পরেও লাগবে।’

অকারণ এসব বাক্য বিনিময় ভালো লাগছে না ওরহানের। বলে, ‘থাক ওসব।’

একটু ভেবে জিজ্ঞেস করে সে, ‘একটা প্রস্তাব রাখব তোমার কাছে?’

ওর দিকে তাকায় ওরহান। মুখ দেখে কিছু অনুমান করতে পারে না সে। বলে, ‘বলো।’

কথাগুলো গুছিয়ে নেয়ার জন্য একটু থামে সে। তারপর বলে, ‘বন্ধু হিসেবে একজন দাস নেয়া কঠিন। একজন স্বাধীন দাস হিসেবে নেবে আমাকে? দাম দিতে হবে না। কিছুদিন তোমার সঙ্গে থাকার অনুমতি দিলেই হবে। নিরাপদ একটা জায়গা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে যাব আমি।’

এটা চায় না ওরহান। একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে পথে নেমেছে সে। কোনো ঝামেলায় জড়ানোর সামান্যতম ইচ্ছে ওর নেই। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে সে। বলে, ‘না। প্রয়োজন থেকে দাস কেনে মানুষ। আমার তা নেই। আগেও একবার বলেছি ওটা। তাছাড়া তোমাকে সঙ্গে নিলে বন্ধু হিসেবেই নিতাম। দাস নয়। সবকিছু ছেড়ে এসেছি আমি একা থাকার জন্য। যাহোক, প্রস্তাবটার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

ওরহানকে প্ররোচিত করার চেষ্টা না করে সে বলে, ‘ঠিক আছে। তুমি না চাইলে আমিও চাই না। চলে যাব এখুনি। তবে ওই একাকিত্বের মর্ম বোঝার জন্য হলেও মনে হয় একজন বন্ধুর প্রয়োজন রয়েছে তোমার।’

ওর দিকে তাকিয়ে বলে ওরহান, ‘হুঁ। শিক্ষিত মানুষের মতো কথা বলছ মনে হয়! ভালো কোনো মনিবের সঙ্গে ছিলে নিশ্চয়?’

মাথার কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে বলে, ‘ভালো কিনা জানি না। তবে শিক্ষিত। পারিবারিক একটা পাঠাগার ছিল ওদের। বইপত্র গোছগাছ করে রাখতাম আমি ওখানে। মনিব আমাকে অক্ষরজ্ঞান দিয়েছিল, যেন ওর প্রয়োজনীয় বইগুলো তাক থেকে খুঁজে দিতে পারি। তারপর বই পড়া শুরু করি ধীরে ধীরে। ঘুমানোর আগে কিছু কিছু পড়তাম প্রতিদিন। ওই মনিব বেঁচে থাকলে হয়তো দ্বিতীয়বার বিক্রি করে দিত না আমাকে।’

কিছুটা নমনীয় হয় ওরহান। বলে, ‘আচ্ছা, ভেবে দেখি। তোমার কাহিনি না-হয় পরে শুনব।’

সে মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাবার সময় আছে কি তোমার বা আমার?’

‘একটু তো ভাবতে হবে নিশ্চয়। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত না।’ বলে ওর সঙ্গী উটটার দিকে তাকায় ওরহান। যেন ওর কাছে পরামর্শ চাইছে সে। দিগন্তে শূন্য দৃষ্টি মেলে আপনমনে জাবর কেটে চলেছে। কোনো কিছুতেই কোনো পরোয়া নেই ওর। তাই অনেকটা নির্বিকারভাবে বলে ওরহান, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। একদিনের চুক্তি। ইচ্ছে হলে প্রতিদিন ওটা বাড়ানো যেতে পারে।’

সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেয় সে ওটা। বলে, ‘ঠিক আছে। আমার দিক থেকেও তাই। যেদিন চলে যেতে চাইব সেদিনই চুক্তি মেনে নিতে হবে তোমাকে।’

‘বলেছি ওটা।’ সম্মতি জানায় ওরহান।

মাথার উপর দু’হাত তুলে ওরা। পরস্পরের করতলে আঘাত করে। তারপর কোলাকুলি করে। কেঁদে ফেলে লোকটা।

চোখ মুছে বলে, ‘এই প্রথম একজন স্বাধীন মানুষ কোলাকুলি করেছে আমার সঙ্গে!’

ওরহান জিজ্ঞেস করে, ‘কী নাম তোমার?’

আকর্ণ হেসে ওর ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বের করে বলে, ‘নাজার।’

ওরহান জিজ্ঞেস করে, ‘নাজার?’

সে বলে, ‘হ্যাঁ, ওরা নাজ নামে ডাকে।’

মনে মনে ভাবে ওরহান। দাসদের নাম যত সংক্ষিপ্ত করা যায় ততই যেন সুবিধে ওই মনিবদের! ওদিকে আর না এগিয়ে সে বলে, ‘আমার নাম ওরহান।’ একটু থেমে পুরো নামটাই বলে সে, ‘ওরহান সালেম। বাবামা ওরান নামে ডাকত আমাকে।’

মনে মনে হাসে ওরহান। আহা, শৈশব!

চুপচাপ বসে থাকে ওরা কিছুক্ষণ। উঠে দাঁড়িয়েছে উটটা। সতর্ক হয়ে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয় দু’জনে। বিপদের কোনো দিকনিশানা নেই এই মরুদরিয়ায়। সংজ্ঞাও নেই। যে-কোনো মুহূর্তে যা-খুশি ঘটে যেতে পারে এখানে। ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে অতিতুচ্ছ কোনোকিছুও। এমনকি প্রাণহীন এই বালুকণাগুলোও। আপাতত কোনো বিপদ নেই বুঝতে পেরে আবার কথা বলা শুরু করে নাজার, ‘দূর থেকে একটা মাত্র উট দেখে ওরা ভেবেছিল তুমি কোনো দলছুট বেদুইন অথবা পলাতক দাস।’

ওর কথায় সায় দেয় ওরহান। বলে, ‘এই নিষ্ফলা মরুভূমিতে বিনামূল্যে একটা উট আর দাসের লোভ সামলানো তো সত্যি কঠিন।’

‘সবার জন্যই এটা সত্য।’ বলে নাজার।

ঠোঁট চেপে বলে ওরহান, ‘হয়তো।’

নীরবতা নেমে আসে আবার। দু’জনেই ক্লান্ত ওরা। মৃত প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলে নাজার, ‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে ওরহান। এক টুকরো মাংস নিতে পারি ওখান থেকে?’

মাথা হেলিয়ে সম্মতি দেয় সে। বলে, ‘পুরোটাই নিতে পারো। মাংস খাই না অনেকদিন। ছেড়ে দিয়েছি। এখন আর মনেও নেই ওটার স্বাদ।’

একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করে নাজার, ‘কিছুক্ষণের জন্য ছুরিটা ধার দেবে তোমার?’

সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেয় ওটা ওরহান, ‘নাও।’

যত্ন করে দুম্বার চামড়া ছাড়িয়ে নেয় নাজার। রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করার জন্য গুটিয়ে রাখে ওটা। রানের বড়ো এক টুকরো মাংস কেটে নিয়ে বাকি সবটুকু বালু দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে রাখে। জায়গাটা ছেড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বলে, ‘চল সরে পড়ি এখান থেকে। মানুষগুলো ভালো না ওই দলের। ওদের উদ্দেশ্যটা তো বলেছি তোমাকে। হঠাৎ করে তোমার ওই মারমূর্তি দেখে ভেবেছে-যে ভয়ানক কোনো এক দলের সর্দার তুমি। কোনো কারণে হয়তো সামনে এগিয়ে এসেছো, আর পেছনে রয়েছে তোমার দল। যে বিদঘুটে স্বরে উ-লা লা-লা ধ্বনি করেছিলে তাতে ওরা ভেবেছিল তোমার দলে পাঠানো কোনো সংকেত ওটা। ভুল যদি আবার ভেঙে যায় ওদের, তাহলে বেরিয়ে পড়বে তোমার খোঁজে।’

একমুঠো বালু হাতে তুলে নেয় ওরহান। বালুঘড়ির মতো মুঠোর ফাঁক গলিয়ে ধীরে ধীরে নেমে যেতে দেয় ওগুলো। তারপর বলে, ‘ওটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই নাজার। ওরা আর ফিরে আসবে না।’

সংশয় কাটে না ওর। জিজ্ঞেস করে, ‘এতো নিশ্চিত হলে কী করে?’

তখনো ওরহান তাকিয়ে রয়েছে মুঠোর ফাঁক দিয়ে নেমে আসা বালুকণার ক্ষীণ ধারাটির দিকে। ওরহানকে আস্বস্ত করতে বলে, ‘কোনোকিছুুর নিশ্চয়তা নেই রে ভাই। কেন ভেবে মরো?’

বুঝতে চায় না নাজার। জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে কি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকব?’

ওরহানের মুঠোর বালুগুলো সব আবার মরুবালুর সঙ্গে মিশে গেছে। ওগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘না। হাল ধরে বসে থাকবে নাজার। জীবন যেদিকে নিয়ে যায় তোমাকে যাবে সেদিকে। ধরো, গতকাল কি ভেবেছিলে তুমি এখানে আমার সঙ্গে কাটবে আজ? একটু আগেও তুমি একজন দাস ছিলে। এখন হয়তো স্বাধীন।’

একটু থামে সে। তাকায় নাজারের মুখের দিকে। তারপর বলে, ‘সুনসান এই মরুভূমিতে ঝড়ের মতো ওই দলটা হঠাৎ এসে দাঁড়াবে আমার সামনে আর ওভাবে ওদের মুখোমুখি হবো আমি, তা একমুহূর্ত আগেও কল্পনায় ছিল না! সবকিছুই তো ঘটে গেছে। বলো তো কীভাবে?’

‘প্রভুর ইচ্ছা।’ জবাব দেয় নাজার।

ওরহান মেনে না নিয়ে বলে, ‘না। সবকিছুতে খামোকা প্রভুকে টেনে এনো না। এসব ঘটে জগতের নিয়মে বা অনিয়মে।’

হেসে বলে নাজার, ‘এখন ক্ষুধা পেয়েছে আমার। জানি না জগতের নিয়মে, না অনিয়মে।’

ওরহানও যোগ দেয় ওর নীরব হাসিতে। বলে, ‘আগেও বলেছো ওটা। তোমাকে দেয়ার মতো কোনো খাবার আমার কাছে থাকলে নিশ্চয় দিতাম।’

‘আমি অবশ্য চাইনি। পরামর্শ চাইছি তোমার। কীভাবে কিছু খাবার সংগ্রহ করা যায়। কী খেয়ে থাকো তুমি। মানে কীভাবে জীবন ধারণ করো।’

হো হো করে হেসে ওঠে ওরহান। বলে, ‘হাসালে নাজার। আমি জীবন ধারণ করি না, জীবন আমাকে ধারণ করে আছে… তাই তো ভেবে পাই না!’

নাজার বলে, ‘ধরো, দুটোই সত্য।’

দিগন্তের দিকে খুব সজাগভাবে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় ওরহান। তারপর বলে, ‘কী খাবে তুমি তা ভেবে দেখিনি নাজার। কোনো একসময় মনে হতো খাওয়ার জন্যই এ- জীবন এতো প্রিয় ও মধুময়। এখন না খেয়ে থাকার চেষ্টা করি। একটা রুটির চার ভাগের এক ভাগ আর একটা খেজুর খেয়ে দিব্যি একটা দিন কাটিয়ে দিতে পারি। তৃষ্ণার প্রয়োজন মেটায় দুঢোক মাত্র পানি। অযথা শরীরের শক্তি ক্ষয় করি না কখনো। এমনকি জোরে হাঁটিও না। লক্ষ্য রাখি যেন শরীরের ঘাম বেরিয়ে না যায়।’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে নাজার। হাসি থামলে বলে সে, ‘এই তাহলে তোমার সাধনা!’

নির্বিকারভাবে বলে ওরহান, ‘না। এটা শরীরের। মনের সাধনা ভিন্ন। ভারতবর্ষের ঋষিদের কাছ থেকে শিখেছি। মনকে শূন্য করে ফেলা। একমাত্র শূন্য মনেই পেতে পারো তুমি নিজেকে। অথবা যদি ঈশ্বর বা পরমাত্মায় বিশ্বাসী হও, তাহলে ওটা।’

‘পেয়েছো কখনো?’ জিজ্ঞেস করে নাজার।

মাথা দোলায় ওরহান। বলে, ‘না। সাধনা করছি।’

Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

বিষয়টা আকর্ষণ করে নাজারকে। প্রথম মনিবের কাছে থেকে অনেক পড়াশোনা করেছে সে। ওদের লাইব্রেরিতে একটা উপনিষদও ছিল। ভারতবর্ষের ওরা ওটাকে পঞ্চম বেদ বা বেদের সারাংশ বলে থাকে। দার্শনিক প্রজ্ঞাবান ওই গ্রন্থটা ওকে অনেক সদর্থক ভাবনার খোরাক যুগিয়েছে। ওরহানকে জিজ্ঞেস করে সে, ‘আসলেই কি তোমার চিত্ত শূন্য করতে চাও তুমি না ওই চিত্তকে পূর্ণ করার একাগ্র বাসনা লালন করে চলেছো তোমার মনের গোপন গভীরে?’

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওরহান, ‘প্রশ্নই বটে এটা একটা।’

আবার জিজ্ঞেস করে নাজার, ‘কী পেয়েছো তোমার ওই তথাকথিত নির্মোহ সাধনা থেকে?’

হাসে ওরহান। হাত উল্টে বলে, ‘কিছুই না। এটাই আমার সাধনা। কোনোকিছু পাওয়ার আশা না করা। ভেবে দেখো, তোমার দলের মানুষগুলো দৌড়ে এসেছিল এখানে কিছু পাওয়ার আশায়। অথচ ফিরে গেছে ওরা খালি হাতে।’

হেসে বলে নাজার, ‘তুমি হয়তো পেয়েছো কিছু।’

ওর কথায় মাথা নাড়ে ওরহান, ‘আমি তা মনে করি না।’

নাজার জিজ্ঞেস করে, ‘কারো বন্ধুত্ব?’

সরাসরি জবাব দেয় সে, ‘না।’

অবাক হয় নাজার। আবার জিজ্ঞেস করে, ‘না?’

দৃঢ়ভাবে আবারও ওরহান বলে, ‘না।’

একটু খটকায় পড়ে নাজার। অনেকটা নিজেকেই যেন জিজ্ঞেস করে সে, ‘জীবনে যদি আশাই না থাকে তবে জীবন কোথায়?’

ওটার ব্যাখ্যা করে ওরহান। বলে, ‘ওটার সন্ধানেই তো বেরিয়েছি নাজার। সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে, আমি ঘুমাই, ঘুম থেকে আবার জেগে উঠি, প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে ডুবে থাকি। প্রকৃতির নিয়মে চলছে সব। এসবের ভেতর আমার, একান্তই আমার জীবনটা কোথায়?’

চুপ করে থাকে নাজার। উষ্ণ বালু দিয়ে ওর পা দুটো ঢেকে দেয় নাজার যেন একটা গাছের চারা রোপন করছে সে। কিছু একটা বলার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নেয়। তারপর হাত দুটো শব্দ করে ঝাড়ে। ওরহানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘যা সাধনা করে পেতে চাও তুমি, ওরহান, তা কী করে এমনিতেই রয়েছে আমার বলো তো? সবসময়ই শূন্য আমার মন। অনেক চেষ্টা করেও কিছু ভাবতে পারি না। ভাবনার যেন কিছু নেইই আমার। সাধনা করে না খেয়ে বা কম খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করছো তুমি। আর ওটা আমার জন্মগত, সহজাত। কোনো কারণে আমার মনিব অসন্তুষ্ট হলে রশি দিয়ে বেঁধে রাখত আমাকে। দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখত। একফোঁটা পানি স্পর্শ করতে দিত না। প্রথমবার পালিয়ে যাওয়ার পর ধরে এনে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল তিন দিন তিন রাত। মার খেয়ে ঠোঁটে জমাটবাঁধা নিজের রক্ত খেয়েছি চেটে চেটে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিজের জিভ চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়েছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাওয়ার দশা হয়েছে। হাতের চেটোয় ধরে নিজের প্রস্রাব পান করেছি। বিশ্বাস করেছো?’

ওরহান বলে, ‘করেছি।’

আবার বলে নাজার, ‘যদি বলো তিন দিন না খেয়ে থাকতে, কোনো সমস্যা নেই আমার, পারব।’ বালুর ভেতর থেকে ওর পা দুটো টেনে বের করে সে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু আমার হাতে খাবার থাকতে তা করব কেন? আগুন জ্বালানোর কিছু আছে তোমার সঙ্গে? কোথাও বসে মাংসটা ঝলসে নেবো তাহলে।’

মাথা দোলায় ওরহান। বলে, ‘আছে।’

উঠে দাঁড়ায় নাজার। বলে, ‘চলো কিছুটা দক্ষিণে যাই। পশ্চিম সাগরে যাবে ওরা। ওদের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে নেয়া ভালো।’

হাঁটতে থাকে ওরা। ক্লান্তি নেই কারো। কঠিন শ্রম দেয়া একজনের চেষ্টার্জিত। অন্যজনের জন্মগত অভিজ্ঞতা। যে-মৌনতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিল ওরহান তা নাজারের সান্নিধ্যে এসে ভেঙে পড়ে। ভালো একজন শ্রোতা পেয়ে নিজেকে মেলে দিয়েছে সে। বিনিময়ে জানতে পেরেছে অনেককিছু। দীর্ঘদিন শুধু নিজেকেই প্রশ্ন করেছে সে এবং জবাব খুঁজেছে। ধ্যানস্থ হয়ে যা সে পেয়েছে তা কোনো কিছু না ভেবেই বলে দেয় নাজার। মামুলি এক দাস মনে হয় না ওকে। ও শিখেছে জীবন থেকে। জীবনই শেখায়। শেখার কিছু নেই এই মরুভূমিতে। এখানে জীবন নেই। কিছুদিন ওর সঙ্গে কাটাতে মনস্থির করে ওরহান।

ধীরে ধীরে রাত নামে মরুভূমিতে। মরুঝোপ থেকে কিছু শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করে নাজার। তাঁবু টানিয়ে ভেতরে ঢোকে দু’জনে। আগুন জ্বালিয়ে মাংসটা ঝলসে নেয় নাজার। ওরহানকেও খেতে বলে সে। মৌনতা ভেঙেছে ওরহান। একাকিত্ব ছেড়েছে। কিন্তু এটা না। কালই হয়তো চলে যাবে নাজার। কিন্তু ভোগলিপ্সাটা সঙ্গে নিয়ে যাবে না। অনেক কষ্টে এটা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে সে। একাই খাওয়া শুরু করে নাজার। ওরহান খেলো কি খেলো না তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই ওর। স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে সে পুরোপুরি। শরীরটাকে দাস বানিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল ওর মনিব। ওর ইচ্ছাকে নয়। অনুভূতিকে নয়। কোনোকিছুতেই পরোয়া নেই এখন ওর। সরাসরি বলে, ওর কোনো দায় নেই। নিজে নিজেই সে শিখে। জীবন থেকে, প্রকৃতির থেকে। জন্মের পর যেমন একটা শিশু জেনে যায় কোথায় তার খাবারের উৎস, কিভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়, হাঁটতে হয়, দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, সেভাবে সবকিছু এসে যায় ওর সামনে, স্বাভাবিক নিয়মে। ভাবতেও পারে না সে এটার জন্য সাধনা করতে হবে। কী আছে শুধু হেঁটে যাওয়ার মধ্যে! ওরহানও বোঝাতে পারে না ওকে, কেন হেঁটে চলেছে সে। ওর বরাদ্দ এক টুকরো রুটি, একটা খেজুর ও একঢোক পানি খেয়ে শুয়ে পড়ে আগামী দিনে আবার হাঁটার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য!

পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে যায় ওরা। পরিবার-পরিজন ছেড়ে আসার সময় ওরহানের পিতা উপদেশ দিয়েছিল ওকে, একটা বোবা প্রাণী অন্তত সঙ্গে রাখতে। সঙ্গী হিসেবে এই উটটাকে তাই সাথী করে নিয়েছে সে। গত ক’টা দিন নাজারের সঙ্গে কথা বলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে কিছুটা আবার। নাজারের অনুপস্থিতিতে ছোট্ট একটা বিরতি পেয়ে উটের গায়ে হাত বুলাতে থাকে। জিজ্ঞেস করে ওকে, ‘কেমন আছিস রে?’

দাঁত বের করে জাবর কাটে প্রাণীটা। ওটাই হয়তো ওর হাসি!

ক্রমাগত তিনদিন ঊষর মরু পেরিয়ে ছোট্ট একটা লোকালয়ের কাছে এসে পড়ে ওরা। কিছু সময়ের জন্য ওখানে যেতে চায় নাজার। চামড়াটা সঙ্গে নেয়। যত্ন করে শুকিয়ে বেশ ভালো একটা পণ্যে পরিণত করেছে ওটাকে। আর ক’দিনের খাবার কিনে আনার জন্য সামান্য অর্থ ও জলের একটা মশক দেয় ওকে ওরহান। লোকালয় থেকে দু’চারদিনের চেয়ে বেশি দূরত্বে সাধারণত যায় না সে। নির্মম এই মরুতে উদ্ভ্রান্ত পথচলায় প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতে হয় ঘন ঘন।

সন্ধ্যে নাগাদ ফিরে আসে নাজার। নেকাবঢাকা অতিসুন্দরী এক নারী সঙ্গে নিয়ে এসেছে সে! গত ক’দিনের বন্ধুত্বের বাঁধনে এতটা বাঁধা পড়েছে ওর সঙ্গে ওরহান, কী বলবে ভেবে পায় না। মনে মনে ক্রোধ জমে ওঠে ওর ভেতর। নাজার বুদ্ধিমান। বুঝতে পারে বন্ধুর মনোভাব। বলে, ‘চামড়াটা বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছি ওরহান। খাদ্য ছাড়া আরও একটা ক্ষুধা আছে আমার। তিনরাতের জন্য কিনেছি ওকে। যদি কিছু মনে না করো এবং অসম্ভব না হয়, শুধু আজ রাতের জন্য তাঁবুটা ধার দিতে পারো। কালই চলে যাবো আমরা।’

চুপ করে থাকে ওরহান। চোখের ইশারায় সম্মতি জানায় সে। খুশি হয় নাজার। লেগে যায় রাতের আয়োজনে। উটের শরীর ঘেঁষে আপাদমস্তক কাপড় মুড়িয়ে শুয়ে থাকে ওরহান। শেষরাতে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার আগেই ওকে তুলে তাঁবুর ভেতর নিয়ে আসে নাজার। বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত সে। বলে, ‘বিদায় জানাও বন্ধু। হয়তো আর কখনো দেখা হবে না এ জীবনে।’

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওরহান, ‘জীবন একটাই। এ জীবনে না হলে আর হবে না কখনো।’

ক্ষণিকের নীরবতা নেমে আসে ওদের ভেতর। দিগন্তের দিকে চোখ মেলে বলে নাজার, ‘হয়তো তুমিই ঠিক। কে জানে?’

ওরহান কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে না। নাজার আবার বলে, ‘তুমি চাইলে দু’দিনের জন্য রেখে যেতে পারি ওকে। ওর সঙ্গেও হয়তো আর দেখা হবে না কখনো।’

প্রত্যাখ্যান করে সে। বলে, ‘না। ওটার প্রয়োজন নেই আমার, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’

তাঁবুর দিকে তাকিয়ে বলে নাজার, ‘হয়তো নেই। পুরোপুরি তৃপ্ত তুমি। কিন্তু শেখার মতো অনেক কিছু ওর কাছেও থাকতে পারে। খুব ভালোভাবেই জানি-যে, বিন্দুমাত্র কিছুও তোমাকে শেখাতে পারিনি আমি। অথচ বলেছো অনেক কিছু শিখেছো। ওকেও একটু দেখো না কেন? আশা করি কোনো ক্ষতি হবে না ওর দিক থেকে।’

তাঁবুর এক কোণায় অনেকটা সহজভাবে জবুথবু হয়ে বসে আছে মেয়েটা। শরীরে ক্লান্তি। অথচ আশ্চর্য মধুর ভঙ্গি! মুহূর্তের জন্য ওর চোখে চোখ যায় ওরহানের। দৃষ্টিতে ওর কামদেবের বর দেয়া কোমল শর। এমন কোনো বর্ম নেই পুরুষের যা দিয়ে তীব্র ওই বাণ প্রতিহত করে। চুপ করে থাকে নাজার। উঠে দাঁড়ায় ওরহান। গোপন জায়গা থেকে একটা মোহর বের করে ওর হাতে দেয় সে। চমকে ওঠে নাজার। বলে, ‘কী করছ ওরহান! গোটা একটা জীবন চলে যাবে আমার এ-দিয়ে। না না, রাখো এটা তোমার কাছে। প্রয়োজনে আসবে একদিন।’

ফিরিয়ে নিতে চায় না সে ওটা। বলে, ‘কোনোদিনও না। বাবা দিয়েছিল বলে সঙ্গে রেখেছি। ওটা নিয়ে যাও। তোমার কাজে লাগবে।’

মুদ্রাটিসহ ওর হাত ওরহানের দিকে বাড়িয়ে দেয় সে। অনেকটা মিনতি করে বলে, ‘তারপরও এটা নিতে চাই না আমি, ওরহান। এক দাসের জীবন আমার। অনোপার্জিত কোনোকিছু কেন সইবে আমাকে, বলো?’

ওর বাড়ানো হাত করতলে চেপে ধরে ওরহান। বলে, ‘বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে বলছি নাজার। গ্রহণ করো এটা। এমনি এমনি খরচ করে ফেলো না। সম্ভব হলে এটা ভাঙিয়ে একটা ব্যবসা শুরু করো। শুরু করো একটা স্বাধীন জীবন।’

বন্ধুত্বের দিব্যি দেয়ায় মেনে নেয় ওটা নাজার। বলে, ‘চিরদিন মনে থাকবে তোমাকে, বন্ধু। যাবার সময় আরেকটা প্রশ্ন করি। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেকেই শুধিও। ‘জনমানবহীন কোনো মরুপ্রান্তর পাড়ি দিচ্ছ তুমি, না মানুষ গাছপালা এবং অন্যান্য প্রাণীতে গিজগিজে এক পৃথিবী?’

ওর কাঁধে হাত রাখে ওরহান। দীর্ঘ আলিঙ্গন করে ওরা। তারপর ধীরে ধীরে সে মিলিয়ে যায় নির্মম মরুর ওই ধূসর দিগন্তে। তাঁবুতে ঢুকে দেখে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর চোখেও ঘুম। একটু পরে সেও ঢলে পড়ে গভীর ঘুমের জগতে। মরুর আকাশে প্রখর সূর্য ওঠার পর ঘুম ভাঙে। তাঁবুর এক কোণে একেবারে পরিপাটি হয়ে বসে আছে মেয়েটা। মনেই হয় না সে রাতের অতিথি! ধীরে ধীরে ভাব জমিয়ে নেয় ওর সঙ্গে। আজ আর হাঁটা হবে না। সুন্দরী নারী কখনোই নিরাপদ না এই মরুপথে। ওদের অবস্থান একটা খাদের কিছুটা ভেতর দিকে থাকায় দূর থেকে চোখে পড়ে না এ-জায়গাটা। নাজারের চলে যাওয়া পথের চিহ্নও মুছে গেছে মরুর এলোমেলো বাতাসে। মেয়েটার জীবনের গল্প শুনে সারাদিন কাটিয়ে দেয় ওরহান। সত্যি না মিথ্যে, সেই জানে। নতুন কিছু নয় ওটা। দারিদ্র্য ও পরিবারের উপেক্ষা ওকে ঠেলে দিয়েছে এই পথে। পরিশীলিত জীবন যাপনের সুযোগ নেই উদরনর্তকীদের। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে রাত কাটাতে হয়। কোনো দুঃখবোধ নেই ওর। এভাবেই মেনে নিয়েছে জীবনটাকে। ওর নাম খৈফা। কোমরের অনেক নিচে বাঁধা ঘাগড়া দুলিয়ে বিভিন্ন নাচের মুদ্রা দেখায় সে। পেটের কম্পন দেখায়। উদরনৃত্য, শরাব, শিশা, এসব নতুন কিছু নয় ওরহানের কাছে। অতীতদিনের হালকা স্মৃতি। এখন কিছুটা রহস্যময়!

রাত ঘনিয়ে এলে ওকে আকুল করে তোলে খৈফা। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় না ওরহান। ভেঙে পড়ে ওর সংযমের সকল বাঁধ। ষোলকলার অতিরিক্ত আরো দুটো কলাও ওই মেয়েটা শিখিয়ে ছাড়ে ওকে। পরের দিন ও রাত কাটে ওদের তাঁবুর ভেতরই। অবশেষে নিজেকে ফিরে পায় ওরহান। ঘুম থেকে উঠেই প্রস্তুত হতে বলে ওকে। সত্যিই অনেক কিছু শিখিয়েছে ওকে এ মেয়েটা। মনে মনে নাজারকেও ধন্যবাদ জানায় এজন্য।

রুক্ষ ও অকরুণ মরুপথের তপ্ত বালুর উপর দিয়ে দিনের পর দিন হেঁটে এসেছে সে। কিন্তু এক উদরনর্তকীর কোমল শরীর এমন কঠিন পথে অভ্যস্ত নয়। উটের পিঠে চড়িয়ে দেয় ওকে। এই প্রথম একজন সওয়ারী পেয়েছে উটটা। কিন্তু মরুপথে এভাবে চলা সত্যিই বিপদজনক। ভালোয় ভালোয় যাহোক লোকালয়ের কাছে ফিরে আসে ওরা। আরেকটা মোহর বের করে দেয় ওকে। কেঁদে আকুল হয় মেয়েটা। লুটিয়ে পড়ে ওর পায়ের উপর। বুকে তুলে কিছুক্ষণের জন্য আলিঙ্গনে বেঁধে রাখে ওকে ওরহান। বিদায় চুমো দেয়। ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘পুরুষের পায়ে পড়ার জন্য নারী নয়। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো। সঙ্গিনীর প্রয়োজন হলে হয়তো তোমাকেই চাইতাম। তুমি খুব ভালো, খৈফা। সম্ভব হলে নাজারকে খুঁজে নিও। সেও হয়তো ভালো মানুষ। সামান্য এ-অর্থটুকু দিয়ে ওর ব্যবসার অংশীদার হতে পারো তুমি। আশা করি তোমাকে সুখী করবে সে। ভালো থেকো। শুভ কামনা করি তোমার।’

ঘুরে দাঁড়িয়ে সে আবার শুরু করে ওর নিয়তি-নির্ধারিত ওই নির্মম পথচলা। বিচ্ছিন্ন এক উদ্যানের মতো গত পাঁচটা দিন ঊষর মরুভূমি থেকে জেগে উঠে আবার মিলিয়ে গেছে কোনো এক অজানা রহস্যলোকে। আশ্চর্য একটা পরিবর্তন অবশ্য এসেছে ওরহানের ভেতর। ক্রমাগত হেঁটে আগের দিনগুলোয় সাধনা করেছে সে চিত্তশূন্য হওয়ার। এখন ডুবে থাকে ভাবনার ভেতর। ভাবতে ভালো লাগে এখন ওর। হাঁটে আর ভাবে।

এই পথচলা যেন শেষ হয় না আর। ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসে ওরহানের। এখন আর মনে করতে পারে না কবে ও কখন থেকে হাঁটছে সে। দিন, তারিখ, মাস, চাঁদের পরিবর্তন, ঋতুবদল, সব যেন গুলিয়ে যেতে থাকে। বার্ধক্য মনে হয় এগিয়ে আসছে খুব দ্রুত।

মনে পড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় ওর মা বলেছিল, ‘যদি কখনো এই নির্মম মরু পেরিয়ে যেতে পারিস, আর নিঃসঙ্গ ও সবুজ কোনো গাছের দেখা পাস, তাহলে থেমে যাবি।’

পুবের কোনো দেশ থেকে ছিনিয়ে আনা ওর মায়ের ব্যতিক্রমধর্মী চোখ দুটো খুব মনে পড়ে এখন। পিঙ্গলবর্ণ ওই চোখে ছিল ওর জন্মভূমির ছায়া। হয়তো ওটাই এখন খুঁজে চলেছে ওরহান। সারা জীবন ধরে খুঁজে বেড়াবে ওটা। মাকে কখনো স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি ওর বাবা। যুদ্ধে পাওয়া মেয়েদের নিয়ে যা করে এসেছে ওর গোত্রের মানুষগুলো। কিন্তু ওরহানকে দিয়েছিল পুত্রের স্বীকৃতি।

মরুচারী মানুষেরা হয়তো বোঝে না শান্ত ও শীতল, সবুজ ও কোমল কোনো দেশের মানুষ কেমন করে জীবন কাটায়। পুব দেশের এক ঋষির সঙ্গে একদিন আচানক দেখা হয়েছিল ওরহানের। অনেককিছু বলেছিল ওকে সেই ঋষি। ওসবের একটা টুকরো বিদ্যুৎবেগে ঢুকে পড়েছিল ওর অন্তর্জগতের ভেতর।

‘জীবন নিয়ে কোনো ভাবনা যদি তোমার নাই থাকে তবে তুমি জানোই না, একটা জীবন যাপন করে চলেছো তুমি। জীবনের রং সবুজ, আর মৃত্যু বর্ণহীন। মরুময় ধূসর।’

ওরহানের মনে আছে, ওর মা সেই ঋষিকে বারণ করেছিল এসব কথা ওকে বলতে। কিন্তু যা শোনার তা শুনে নিয়েছিল সে। এরপর সুযোগ বুঝে কোনো একসময় জগৎ-সংসার ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল ওই জীবন অথবা মৃত্যুর অকারণ অন্বেষণে!

মরুপথে হাঁটতে হাঁটতে এখনও ওর দুচোখ খুঁজে বেড়ায় একটা দীঘল সবুজ গাছ! কোনো একদিনের শুরুতে প্রথম পা ফেলতে যেয়ে দেখে দূরে একটা গাছের নিশানা। যত এগিয়ে যায় সে ওদিকে, মরীচিকার মতো পিছিয়ে যায় ওটা। সারাদিনের ক্লান্তিকর হাঁটার পর অবশেষে আকাশছোঁয়া ওই গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতে পারে। রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দেয় সে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মনে হয় এবার শেষ হয়েছে ওর এই অন্তহীন পথচলা। প্রথমে মুক্ত করে দেয় উটটাকে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী হিসেবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল সে। কিছুতেই তাড়াতে পারে না ওকে। একটু দূরে যেয়ে ফিরে আসে আবার। শেষপর্যন্ত দূরের একটা মরুঝোপের কাছে ছেড়ে আসে অবুঝ প্রাণীটাকে।

ক্লান্তিকর এই হেঁটে চলা এবার শেষ করতে হবে ওকে। ছায়াদেয়া সবুজ ওই গাছের সন্ধান হয়তো পেয়ে গেছে সে। মনে হয় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে জীবনের। অশেষ ক্লান্তি ও চূড়ান্ত অবসাদ ছেয়ে ফেলে সবকিছু। নাজারের ওই প্রশ্নটা উঁকি দেয় মনের গহিকোণে। প্রায় সারাজীবন হেঁটে কী পেরিয়ে এসেছে সে? মনে মনে ভাবে, ওই গাছটার চূড়ায় উঠে হয়তো কিছুটা হলেও দেখা যাবে। শুরু করে গাছ বেয়ে উপরে ওঠা। কিছুদূর ওঠার পর বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটু বসে শক্ত একটা ডাল দেখে। অবাক হয় চারদিকে তাকিয়ে! মরুভূমির কোনো চিহ্ন নেই! অসংখ্য গাছ ঘিরে রয়েছে ওটাকে! উপরে উঠতে থাকে আবার। যত উপরে ওঠে, গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দিনের শেষে ওই গাছের চূড়ায় উঠে ওর মনে হয়, এখানেই বুঝি সবকিছুর শেষ এই জীবনের! তামাম শুদ।

. . .

Conceptual Artwork-III, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

টাওয়ারস অব সাইলেন্স : ‘নীরবতায়’ সংগোপন যে-উত্তর

গানালেখ্য : জহরে আজম

টুটা পারিন্দা ও যে-পথে হয়নি যাওয়া

সুফিবাদ — কোন সুফিবাদ?

মুক্তবিহঙ্গ সৌদি যুবরাজ

ও মাটি হবো মাটি

. . .

লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

কামাল রাহমান : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস

কামাল রাহমান-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *