আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

আমাদের বুদ্ধিজীবীতা : প্রভাববলয়, মুগ্ধতা ও সংশয় : হাসনাত চৌধুরী

Reading time 10 minute
5
(12)

ফয়েজ আহমদ রাজিব ও শাকিল ভূঞা-র
প্রভাববলয়-এ আমার মুগ্ধতার দিনরাত

Lieutenant Colonel Abu Taher and the book cover ‘Kraher Kornel’ written by Shahduzzaman; Image Source: Collected; Google Image

সময় ও পরিস্থিতি মানুষকে তার পূর্ববিশ্বাস ও ধারণা থেকে প্রায়ই বহুদূর সরিয়ে নিয়ে যায়। আজ যে-ব্যক্তি ও চিন্তাধারা আমাকে মুগ্ধ রেখেছে, কাল একে নিয়ে সংশয়, এমনকি বিরক্তিও মনে জন্ম নিতে পারে। মানুষের বৌদ্ধিক জীবনে এই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়া ও মোহভঙ্গ হওয়ার চক্রটি সম্ভবত কখনো শেষ হয় না।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। ২০০৫ কিংবা ২০০৬ সালের দিকে ফয়েজ ভাই আমাকে শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ পড়তে উৎসাহিত করেছিলেন। কর্নেল তাহের সম্পর্কে তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল। বইটি পড়ার পর গভীরভাবে প্রভাবিত ও মুগ্ধ হয়ে পড়ি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে পা হারানো, এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জাসদের গণবাহিনী গঠনে কর্নেল তাহেরের ভূমিকা বীরোচিত আখ্যান পাঠের অনুভূতিতে আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। বিশেষত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানকে ঘিরে ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে রচিত শাহাদুজ্জামানের উপন্যাসকে প্রায় প্রামাণ্য দলিল বলে ধরে নিতে আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

‘ক্রাচের কর্নেল’ বাংলা সাহিত্যের ল্যান্ডমার্ক উপন্যাস হলেও, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতার কারণে কর্নেল তাহেরকে কেন্দ্র করে তর্ক-বিতর্ক ও সমালোচনা পরে জানতে পারি। সময়ের সঙ্গে পাঠপরিধি কিছুটা বাড়ার ফলে দৃষ্টিভঙ্গিও এক থাকেনি। ২০১১ সাল হবে, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ বইটি পাঠের পর কর্নেল তাহেরকে নিয়ে আমার অনুভূতিতে নতুন রং যোগ হয়। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ দিলেন জেনারেলর মইনুল। নতুন এক আলোয় ‘ক্রাচের কর্নেল’কে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছি তখন।

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে জনাব মইনুল তাঁর বইয়ে এমনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, কর্নেল তাহের সম্পর্কে গুরুতর কিছু প্রশ্ন ও সংশয় আমার মধ্যে দেখা দেয়। মহিউদ্দিন আহমদ রচিত ‘জাসদের উত্থান-পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইটি সংশয়কে আরও গভীর করেছিল। সাহস ও আত্মত্যাগের জন্য কর্নেল তাহেরের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকলেও, তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের ব্যাপারে মনে তীব্র হওয়া রোমান্টিক মোহ পরে আর অবশিষ্ট ছিল না।

অনুরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ পাঠ করার পর। অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে শা‌কিল ভূঞার অ‌তি-মুগ্ধতা বইটি পড়তে আমা‌কে ইন‌সিস্ট করেছিল। পাঠের পর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে ব্যাপক মুগ্ধতা বোধ করি মনে। আহমদ ছফার বিবরণে রাজ্জাক কিংবদন্তির জ্ঞানপুরুষ হয়ে ধরা দিয়েছিলেন। রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাসের জটিলতম প্রশ্নের সহজ অথচ গভীর ব্যাখ্যায় তাঁর তুলনা নেই! পরবর্তী সময়ে উপলব্ধি করি,—বইটি মূলত একজন গুণমুগ্ধ শিষ্যের শ্রদ্ধাঞ্জলি ছিল নিজের গুরুর প্রতি। নিরাসক্ত বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ভাবনা থেকে ছফা বইটি লিখেননি। অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে শা‌কিল ভাইয়ের মুগ্ধতা এখনো অটুট কি-না, তা অবশ্য জানা হয়নি!

সময়ের সঙ্গে আমি ধীরে-ধীরে আহমদ ছফার অন্যান্য রচনা, স্মৃতিকথা ও তাঁকে নিয়ে অন্যদের লেখা পাঠ করে বুঝতে পারি অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। সেইসঙ্গে প্রবল মাত্রায় আবেগপ্রবণও ছিলেন। তাঁর রাগ, অনুরাগ, ভালোবাসা ও বিরাগে আবেগের আধিক্য ছিল। ব্যক্তি ও ঘটনার মূল্যায়নে ছফার এই অতিআবেগ বস্তুনিষ্ঠতার হানি ঘটিয়েছে বলে অনেককে মতামত দিতে দেখেছি। আহমদ ছফা হয়তো কাউকে আকাশচুম্বী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, অন্যদিকে অপছন্দের কাউকে সমালোচনার বাণ ছোড়ার আগে যৌক্তিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতাকে বিবেচনায় নেননি সবসময়।

Author mentioned book cover: Collage; Image Source: Collected; Google Image

এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আহমদ ছফা কি বাঙালি বুদ্ধিজীবীর বড়ো অংশকে রোমান্টিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রমে পতিত রেখে গেলেন? প্রশ্নটি হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু ছফার গুণমুগ্ধ স‌লিমুল্লাহ খান ও তাঁর অনুসারীদের বক্তব্য শুনলে আমার মাঝেমধ্যে এমনটাই মনে হয়। তাঁদের চিন্তায় গভীরতা থাকতে পারে, কিন্তু এর কোনো গন্তব্য বা বটমলাইন খুঁজে পাওয়া প্রায়শ কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে, একথাও সত্য-যে,—ইতিহাস, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে মোহভঙ্গ নেতিবাচক কোনো ঘটনা নয়। নতুন করে ভেবে দেখা, প্রশ্ন তোলা ও নিজস্ব অবস্থান পুনর্নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয় এর ফলে। আমাদের এই মোহগ্রস্ত হওয়া ও মোহভঙ্গের বেদনা এভাবে কতদিন চলবে তা আমার জানা নেই। নতুন চরিত্র ও ভাবধারা এবং আবারো নতুন কোনো মোহের আবির্ভাব ঘটতে থাকবে অন্তহীন;—এই বিষয়ে অন্তত আমার মনে কোনো সংশয় নেই!
. . .

পাঠ-সংযোজন
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

Serajul Alam Khan; Image Source & Credit: Collected; Google Image

বাংলাদেশের বামবিপ্লবীদের ক্যারিক্যাচার

সিরাজুল আলম খান, কর্নেল তাহের, সিরাজ সিকদারের মতো চরিত্ররা নিজের সময়বিশ্বে পয়দা হওয়া বিকারের অংশ ছিলেন হাসান। পুঁজিবাদের বিকল্প আধেয় রূপে বামপন্থী উত্থানের সম্ভাবনা ও একে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক তরঙ্গ বিশ্বজুড়ে প্রসার লাভ করছিল তখন। তাঁরা প্রত্যেকে এতে সংক্রমিত ছিলেন। মাও সেতুংয়ের দেখানো পথ ধরে সশস্ত্র পন্থায় সমাজবদলের ভাবনায় উজ্জীবিত ছিলেন কমবেশি।

কিউবায় চে গাভেরাকে নিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোর সশন্ত্র সংগ্রামের সাফল্য ও পরে লাতিন বলয়জুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ঢেউ ‘উজ্জীবনের’ পারদকে তীব্র করেছিল। আরববিশ্বে জামাল আবদেল নাসেরের সমাজতন্ত্র ঘেঁষা আরব জাতীয়তার জোশটাও মনে হয় অনেককে সংক্রমিত করে থাকবে তখন। আর, ভিয়েতনামে রুশ-মার্কিন প্রভাবলয়ে ভাগ হয়ে চলমান গৃহযুদ্ধে রাশিয়ান ব্লকভুক্ত হো-চি-মিনের গেরিলা বিপ্লবের সাফল্য অনেকের মনে রেখাপাত করছিল।

খোদ আমেরিকায় ষাট-সত্তর দুটি দশক মিলে হিপি-বিটনিক বিদ্রোহ, বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ও পপ সংস্কৃতির উত্থান পরিস্থিতিকে যথেষ্ট ঘোলাটে রেখেছিল। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-জুড়ে চারু মজুমদারে নকশালপন্থী ঢেউয়ের কথাও ভুললে চলবে না। বৈশ্বিক গোলযোগের অভিঘাত বা এর পাল্লায় পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে এখানকার বামপন্থীরা বিপ্লবী সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করতে মরিয়া ছিলেন। বিপ্লবের পন্থা নিয়ে অবশ্য তাঁদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ছিল। পরস্পরের ভূমিকা নিয়ে সংশয় ও প্রত্যাখ্যান ছিল সাধারণ ঘটনা। তবে হ্যাঁ,—সশস্ত্র বিপ্লবের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখছিলেন সবাই।

রুশপন্থী সিপিবি বা মণি সিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টি ওদিকে মাও সেতুংয়ের মন্ত্রে উজ্জীবিত চীনাপন্থাকে নিতে পারলেন না। সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন তাঁরাও দেখছিলেন, তবে এর জন্য চীনা পার্টিলাইনের সঙ্গে সমঝোতা তাঁদের কাছে অবান্তর গণ্য হচ্ছিল। মধ্যখানে আবার ‘না-ঘর না-ঘট’ টাইপের তালগোল পাকানো ইসলামি সমাজতন্ত্র নিয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছিলেন মাওলানা ভাসানী

সব মিলিয়ে একটা ক্যাওস বলা যেতে পারে একে। এমন একটা ক্যাওস, যেখানে এঁনাদের গণভিত্তি শক্ত নয়। কৃষকদরদি মাওলানা ভাসানী নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন, কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে অগ্রসর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার কাছে তা ছিল খড়কুটো। মাওলানা ভাসানীকে শেখ মুজিবের বিকল্প করে তোলার বদ মতলব মাথায় নিয়ে ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানের মতো লোক যতই বয়ানের ফুলঝুরি তৈরি করুন,—লাল মাওলানার গণভিত্তি খণ্ডিত ও স্ববিরোধী ছিল আগাগোড়া।

সোজা কথা, লেলিন মানের এমন কোনো নেতা এদেশের বামপন্থীরা খুঁজে পাননি, যিনি কিনা একটা শক্ত গণভিত্তি এনে দিতে পারেন। এর ওপর ভর দিয়ে একটা দল গড়ে উঠবে, একটা শ্রেণি বিকাশ লাভ করবে, এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিপ্লব সাধন করবে। রুশ বিপ্লব কিন্তু চরিত্রগতভাবে সংহত, সুগঠিত ও একধরনের জনসমর্থন তৈরি করে এগিয়েছে। লেনিনকে যে-কারণে বিরল ‘বিপ্লবী’ বলাটা অবান্তর নয়।

অন্যদিকে, এমন কোনো বিপ্লবী এখানকার বামপন্থীদের ভাণ্ডারে ছিল না, যিনি মাও সেতুংয়ের তৈরি লালফৌজের কথা যদি বাদও দেই, অন্তত চারু মজুমদারের ছক মেনে সমাজে অস্থিরতা এনে দিতে পারবেন। কথা সত্য,—বিপ্লব কখনো সন্ত্রাস ছাড়া বৈধতা পায় না। নৈরাজ্য ছাড়া সমাজদেহে কম্পন জাগে না, যেটা সমাজে জেঁকে বসা সিস্টেমকে তছনছ করে দিতে পারবে। নকশালরা প্রায় এক দশক এই অস্থিরতা ভালোভাবে ক্যারি করেছিল।

Red Mawlana Bhashani and Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman; Image Source & Credit: Collected; Google Image

তো, এঁনারা তখন কী করলেন? সময়টায় নজর ফেরালে আমরা দেখছি,—শেখ মুজিবুর রহমানকে বামপন্থীরা তলে-তলে ‘অপছন্দ’ই করছেন। পরিস্থিতির খাতিরে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় বুঝে তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া কঠিন ছিল তাঁদের জন্য। শেখ মুজিবের রাজনীতিকে তীব্র ঘৃণা ও খারিজ করার ভাবনা থেকে যদিও বামরা কখনো সরে আসতে পারেননি। স্বাভাবিক;—শেখ মুজিবের পথ কোনোভাবে তাঁদের পথে এসে মিলবার কথা নয়। স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী বাংলাদেশে তৈরি হওয়া বামপন্থী ন্যারেটিভে শেখ মুজিব সুতরাং প্রধান প্রতিপক্ষ হয়েই থেকেছেন সবসময়।

শেখ মুজিবকে ‘ঘৃণা ও খারিজ’ না-হয় করলেন তেনারা, কিন্তু নেতা তো লাগবে ভাই! নিরুপায় হয়ে অগত্যা ভাসানীকে পির মানলেন। এমন এক নেতার পেছনে লালঝাণ্ডা নিয়ে খাড়া হলেন তাঁরা, মার্কসবাদের সংজ্ঞায় যে-মানুষকে ফিট খাওয়ানো সমস্যা। ভাসানীর রাজনীতি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি’ মার্কা বলা যেতে পারে। এটাকেই নিরুপায় হয়ে অ্যানক্যাশ করলেন বামগণ।

ফলাফলটা কিন্তু ভাসানীর ওই আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাপ প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তী ভাঙনে জাতি দেখেছে। বামপন্থার তালগোলমার্কা বিকার বুঝতে ‘ন্যাপ’-এর মতো বেশ বড়োসড়ো একটা দলের বারবার ভাঙন ও শিবির বদলানোর খেলায় নেতা-কর্মীর প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বগলের গন্ধ শোঁকার ঘটনা খেয়াল রাখা প্রয়োজন। কেউ তা বুঝতে চাইলে ‘বুঝপাতা’, আর সলিমুল্লাহ বা নূরুল কবীরের মতো অংবংছং বুঝতে চাইলে ‘কাডালপাতা’।

যাইহোক, এবার মহিউদ্দিন আহমদের কথায় আসি। ভদ্রলোকের বইটই পড়ার প্রয়োজন দেখি না হাসান। সত্যমিথ্যার মশলা দিয়ে রান্না করা বই পড়তে যাবো কোন দুঃখে! কলামটলাম পড়লে বুঝে যাওয়ার কথা,—উনি কতটা কী সঠিক বলছেন! তাঁর বই আমি পড়িনি বা পড়ার আগ্রহ বোধ করিনি কখনো। হাড়ির ভাত একটায় টিপ দিলে আস্ত হাড়ির খবর বোঝা হয়ে যায়;—টাইম ইজ মানি-র যুগে কথাটি স্মরণ রাখা উচিত।

মহিউদ্দিনের আবালমার্কা বই বাদ দিয়ে আমরা বরং তানভীর মোকাম্মেলের তথ্যচিত্রে নেওয়া আ. স. ম. আবদুর রবের জবানী শুনতে পারি। তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম রব, শেখ ফজলুল হক মনি প্রমুখরা মিলে স্বাধীনতার বনেদ খ্যাত ‘নিউক্লিয়াস’ গড়ে তোলার আগের ঘটনা জবানীতে তুলে ধরেছিলেন আ. স.ম রব। সিরাজুল আলম খান, আ. স. ম রব প্রমুখরা মিলে মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁকে জানালেন,—পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার কথা ভাবছেন তাঁরা, এবং সেখানে নেতা হিসেবে ভাসানী হচ্ছেন প্রথম চয়েজ। সিনটা কল্পনা করলে অট্টহাস্য করা উচিত হয়তো!

ভাসানী পরিষ্কার বলে দিলেন,—ভিন্ন পথ ধরে স্বায়ত্তশাসন আদায়ের লক্ষ্যে তাঁকে মহন সব বামপন্থী ঘেরাও করে রেখেছেন! ‘ঘেরাও’ কাটিয়ে চ্যাংড়াদের সঙ্গে বিপজ্জনক পথে হাঁটা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আতাউর রহমানের কাছে তারা যেতে পারে। এঁনারা তখন তাঁর কাছে গেলেন। ‘আমি অপরাগ’ জানিয়ে শেখ মুজিবের কোর্টে বলটা ঠেলে দিলেন তিনি। আব আয়া না মজা! শেখ মুজিব সব শুনেটুনে, অ্যাকর্ডিং টু আ. স. ম রব,—রক্তগরম তরুণদের বলেছিলেন,—তোরা কি পারবি? সিরাজুল আলম খান উত্তরটা এভাবে দিয়েছিলেন সেদিন,—আপনি যদি সামনে থাকেন, তাহলে পারব। শেখ মুজিবের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না তা নয়। তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় একে অস্বাভাবিক বলা সংগত হবে না;—তথাপি সম্মতি দিয়েছিলেন মুজিব।

Book Cover: Unfinished Biography of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman; Image Source & Credit: Collected; Google Image

স্বাধীনতার লড়াইয়ে বিলাই নয়, বরং ‘শের’ দরকার হয়, আর শেখ মুজিবের মধ্যে সেটা অপিরমেয় পরিমাণে মজুদ ছিল! তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এখানটায় এসে মাইলস্টোন রচনা গণ্য হতে পারে অনায়াসে। গণভিত্তির রাজনীতি বা এর অ আ ক খ বোঝার জন্য বইটি অপরিহার্য। দেশকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার জন্য একজন নেতা কীভাবে নিজেকে তৈরি করেন, তা বোঝার খাতিরে বইটি অবশ্যপাঠ্য। মজাটা এখানেই,—সিরাজুল আলম খানরা বিপ্লবী পন্থা সফল করতে এমন এক নেতাকে বেছে নিতে বাধ্য হলেন, যিনি তাঁদের বাক্সে পা ঢোকানোর বান্দা কাভি ছিলেন-ই না। শেখ মুজিবের ‘সমাজতন্ত্র’ বরং সুকর্ণর ‘পাঞ্চশীলা’ ও ‘সীমিত গণতন্ত্র’র মতোই তাঁর একান্ত নির্মিতি। এর সঙ্গে মহামতি কার্ল মার্কসের তাত্ত্বিক সংযোগ ক্ষীণ।

এখান থেকে মূলত একটা বামবিকার খোদ আওয়ামী লীগের মধ্যে তৈরি হলো। সিরাজুল আলম খানরা এই বিকারকে আওয়ামী লীগের মতো একটা, শেখ মুজিবের ভাষায় ‘মাল্টিক্লাস’ পার্টির ওপর চাপানোর জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব যেমন করে মাঠে খেলবেন বলে ভাবছিলেন, সিরাজুল আলম খানের মতো লোকের পক্ষে এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মুশকিল ছিল;—এলাউ করার প্রশ্নই থাকেনি সেখানে।

সমস্যা হলো সিরাজুল আলম খানদের এমন কোনো গণভিত্তি ছিল না, যার উপর ঠেকনা দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। ভাসানীকে দিয়ে হওয়ার নয় তা ততদিনে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। সিরাজুল আলম খান বিশেষভাবে শেখ মুজিবের ওপর একালের প্রেসিং ফুটবলের মতো চাপ প্রবল করলেন। বিপ্লবী হতে অনিচ্ছুক একটা লোকের ওপর বিপ্লবী সরকার তৈরির এহেন চাপাচাপি মারাত্মক ছিল। ফলাফল, শেখ ফজলুল হক মনি ও সিরাজুল আলম খান দুটি পৃথক শিবিরে ভাগ হয়ে ছাত্রলীগের ভাঙনকে তীব্র করলেন।

বলে রাখা প্রয়োজন, দৈনিক বাংলায় ওইসময় শেখ ফজলুল হক মনি মাল্টিক্লাস পার্টি আওয়ামী লীগে রূপান্তর ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চমৎকার একখানা আর্টিকেল লিখেছিলেন। আজাইরা সব কিতাবের চেয়ে মনির নিবন্ধটি পাঠ করা অধিক জরুরি। জিয়াউর রহমানের রাজনীতি বুঝতে যেমন তাঁর রচিত কয়েকখানা নিবন্ধ পরে জরুরি হতে থাকবে।

শেখ মুজিব সংগতকারণে সিরাজুল আলম খানকে ডিনাই করে শেখ মনির ডাকা ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। আর, সিরাজুল আলম খান ছাত্রলীগের একাংশ নিয়ে বেরিয়ে জাসদ প্রসব করলেন। তখনকার প্রজন্মকে সম্ভবত বেবি বুমার্স নামে ডাকা হতো। বেবি বুমার্সদের বড়ো অংশকে জাসদ নিজের শিবিরে সফলভাবে ভিড়াতে পেরেছিল, যারা পরে দ্রুত ভারতবিরোধী ও মুজিববিদ্বেষী হয়ে ওঠে।

এর পেছনে কারণ ছিল যথেষ্ট। একাত্তরের পর জম্বিতে রূপান্তরিত ইসলামপন্থী জাতীয়তার ধারক-বাহক এলিট ও মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশ পুনরায় কবর থেকে বেরিয়ে অ্যাটাক শুরু করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশকে নকশাল স্টাইলে খতমের রাজনীতি দিয়ে দোজখ বানাতে মরিয়া সিরাজ সিকদার গংবিপ্লবের লে হালুয়া রুটি ভাগাভাগির জেরক্স কপি ছিলেন কর্নেল তাহের ও তাঁর পরিবারের ভাইবেরাদরগণ। বেচারা সাহসী ও সাচ্চা দিল মানুষ ছিলেন, কিন্তু সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের হাইডোজ গলাঃধকরণ করায় সাত নভেম্বরে কাউন্টার রেভুল্যুশনে গমন করেন। সেখানে আবার পালটা প্রতিবিপ্লব ইত্যাদি মিলে জিয়া তাঁকে শিকার করলে পরে। মোটা দাগে এটুকুন হচ্ছে ঘটনা। এখানে মোরাল একটাই দাঁড়ায় :

গণভিত্তি ছাড়া বিপ্লব কখনো শেপ নিতে পারে না। ওটা রুশ বিপ্লবে ঘটেছিল, যদিও আফটার লেনিন বিপ্লব স্বয়ং বিভীষিকায় নিয়েছিল মোড়।

রুশ বিপ্লবের পদধ্বনি যবে সন্নিকটে, লেনিন গ্রামে চলে গিয়েছিলেন সাময়িক। নিবিষ্ট ছিলেন হেগেল পঠনে। তাও হেগেলের ওই অংশগুলো পড়ছিলেন, ‘ভাববাদী’ দাগিয়ে মার্কস যেগুলো সরিয়ে রেখেছিলেন সিলেবাস থেকে। তাঁর জায়গা থেকে দেখলে ওটা ভুল ছিল না। লেনিন তথাপি পুনরায় আমলে নিলেন, কেননা, রুশ দেশে যে-বিপ্লব আসন্ন তা মার্কসের ছক মেনে ঘটেনি। লেনিনের মধ্যে প্রাগ্রসর বিবেচনা ও পুনর্গঠনের তাগিদ ছিল, যেটা পরে বজায় থাকেনি।

কিউবা কিংবা চীন থেকে শুরু করে সবখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সশস্ত্র হওয়ার কারণে একচ্ছত্রবাদ অবধারিত ছিল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে মানুষকে ছকে আসতে বাধ্য করেন মাও সেতুং। কিউবায় এটা স্থবিরতা ডেকে আনে, আর চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব কালের ধারায় মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিজেকে রূপান্তরিত করেছে।

বাংলাদেশে বামপন্থার বিকার এসব বৈশ্বিক কার্যকারণে অনিবার্য ছিল। সময় এঁনাদের নিয়ে তামাশা করেছে তখন। এই তামাশা-যে,—নিজের কোমরের জোর ছাড়া এঁনারা বিপ্লবের খোয়াব দেখেছিলেন ও এখনো দেখে চলেছেন! ভাসানী ও মুজিবের ঘাড়ে চড়ে দেখেছেন সেইসময়;—এখন আবার ইসলামপন্থীদের পেছনে লাইন দিয়েছেন! এটা বেমালুম বিস্মৃত হয়ে-যে,—‘গজওয়াতুল হিন্দের’ লোকজন সেখানে গিজগিজ করছে ব্যাপক! সত্যি ফানি!
. . .

I. Qazi Motahar Hossain playing chess with Grand Master Niaz Murshed; II. Professor Abdur Razzak studying; Image Source: Collected; Google Image

সংযুক্তি

গ্রুপে এসব নিয়ে একসময় ব্যাপক কথা চালাচালি আমরা করেছি হাসান! অ্যানার্জি খতম এখন। তবু সংক্ষেপে বলি বরং,—অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও আহমদ ছফা দুজনেই ওভাররেটেড। ছফার মহৎ কাজ বলতে আমি বুঝি, জার্মান ভাষা শিখে গ্যোটের ‘ফাউস্ট’-র অনুবাদ। এটা আমি শতবার পড়তে রাজি। তার বাইরে ‘পুষ্প-বৃক্ষ-বিহঙ্গ পুরাণ’ পড়তে আপত্তি থাকবে না কভু। স্যাটায়ারে নিকানো অন্যান্য ‍উপন্যাসগুলা পড়া যাইতে পারে, তবে অনিবার্য নয় অতখানি।

ছফার ওইসব ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ব্যবচ্ছেদকে ‘পাকিস্তানি মন’ চেনার জন্য পড়া যায় হয়তো। আর, জাতির পয়লা সক্রেটিস রাজ্জাক সায়েব কাজী মোতাহার হোসেনের মতো বাংলাদেশের প্রথম গ্রান্ড মাস্টার নিয়াজ মোর্শেদের সঙ্গে দাবা খেলতেন মাঝেমধ্যে। এই তথ্যটা ছাড়া উনার ব্যাপারে আগ্রহ জিরো।

নিয়াজ মোর্শেদের সঙ্গে অধ্যাপক রাজ্জাকের দাবা খেলার ছবিটবি অনলাইনে পাবো আশা করেছিলাম। সার্চ দিয়া পেলাম না একটাও। মোতাহার হোসেনের সঙ্গে অবশ্য আছে। সেটা সংযুক্ত করছি। কাজী মোতাহার হোসেন ভালো দাবাড়ু ছিলেন। মেধাদীপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ মুক্তচিন্তক ছিলেন আমাদের জন্য। তাঁর শানে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও সালাম।
. . .

Interview of A. S. M. Abdur Rab: Tanvir Mokammel’s Documentary on 1971; Source: Kino-Eye Films Archive YTC

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

মোহাম্মদ আজমের সিলেক্টিভ রিডিং

মুজিবমিথ ও না-লেখা প্রেমচুক্তি

ছায়ামানব মাহফুজ

জামায়াত কেন নিষিদ্ধ করা গেল না

আবার তোরা মানুষ হ

. . .

লেখক পরিচয় : হাসনাত চৌধুরী

সিলেটের জকিগঞ্জে হাসনাত চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছাপামাধ্যম ও গ্রাফিক ডিজাইনে কাজ করেছেন একটা সময়। বর্তমানে প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংকে পেশা করে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ও দুই কন্যা সন্তানের জনক হাসনাত চৌধুরী ব্যবসায়িক ব্যস্ততার চাপ সত্ত্বেও নানামুখী সৃষ্টিশীলতায় নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন।

অবসরে পড়তে ভালোবাসেন কবিতা ও সাহিত্য। স্বদেশ ও রাজনীতির গতিধারা নিয়ে সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ ও মতামত প্রকাশ করেন সমাজমাধ্যম ও বন্ধুজনের আড্ডায়। আপন খেয়ালে মাঝেমধ্যে গদ্য ও কবিতা লিখলেও তাঁর কোনো বই এখনো প্রকাশিত হয়নি।

থার্ড লেন স্পেস-এ তিনি অন্যতম অবদায়ক। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও থার্ড লেন স্পেস-এর কারিগরি খুটিনাটি সামলান স্বেচ্ছায়। থার্ড লেন স্পেস-এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সময় প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু নিয়ে যখন লেখেন দু-এক ছত্র, তার মধ্যে ধরা পড়ে এক মুক্ত ও সংবেদী মনন।

. . .

অবদায়ক : হাসনাত চৌধুরী ও আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 12

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *