পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

এক জীবনের কাব্যদর্শন : মেকদাদ মেঘ

Reading time 8 minute
5
(10)

কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন স্মরণে উৎসর্গিত

Nirmalendu Goon (June 21, 1945); Image Source: Collected; Google Image

বাংলা সাহিত্যে প্রেম ও রাজনীতি সচেতন কবিতা রচনার ধারায় নির্মলেন্দু গুণ জনপ্রিয় নাম। প্রেম, দ্রোহ, শ্রেণিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবয়ব তাঁর কবিতাকে আজো পাঠকপ্রিয় করে রেখেছে। ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতার আবেদন যেমন আজো শাশ্বত বোধ হয়। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, পটভূমি ও স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবানকে অনন্য মাধুর্য ও বলিষ্ঠতায় ভাষা দিয়েছিলেন কবি।

‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত ‘হুলিয়া’ কবিতার কথায় আসছি পরে। কবিজীবনের সূচনালগ্নে লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি এই কবিতা। সত্তর দশকের রাজনৈতিক পটভূমি ও একজন বিপ্লবীর আত্মপরিচয় সন্ধানের গল্প কবিতাটির মধ্য দিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন কবি। তাঁর আরেকটি সংবেদনশীল কবিতা ‘মানুষ’-এর কথাও বলতে হয়। মানবজীবনের কষ্ট, বেদনা ও অসহায়ত্ব যেখানে মর্মস্পর্শী হয়ে পাঠকমনে দোলা দিয়েছিল।

‘আফ্রিকার প্রেমের কবিতা’ নির্মলেন্দু গুণের প্রেম বিষয়ক কবিতায় বারবার পাঠ করার মতো কবিতা। রোমান্টিকতার পাশাপাশি দূরবর্তী ভূখণ্ডের প্রতি গভীর আবেগ ও ভালোবাসা কবিতাটির মূল বিষয়। রোমান্টিক ধারার কবিতায় ‘একটি অসমাপ্ত কবিতা’ও পাঠ-সমাদৃত। প্রেম ও বিরহের অপূর্ব মেলবন্ধন যেন এই কবিতা। ‘আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই বলে দেব স্ট্রেটকাট : ‘ভালোবাসি’’—এমন অকৃত্রিম সত্যভাষণের জন্য কবিতাটি পাঠকমনে গভীর ছাপ রেখে যায়। ‘তেভাগা’, ‘না প্রেমিক, না বিপ্লবী’, ‘চৈত্রের ভালোবাসা’, এবং ‘মুঠোফোনের কাব্য’-র মতো কবিতার মায়ায় পাঠককে আজো মুগ্ধ রেখেছেন কবি।

কবির আসন্ন জন্মদিনে তাঁর ‘হুলিয়া’ কবিতাটি স্মরণ করছি অনুরাগে। ষাটের দশকের শেষভাগ ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত কবিতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ছবি এঁকেছিলেন কবি। পুলিশ প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় পলাতক এক তরুণের গ্রামে ফেরা, অপরিচিত লোকজনের তাকে সন্দেহের নজরে দেখা, গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক, আর প্রিয়জনের থেকে নিজেকে আড়াল রাখার মানসিক যন্ত্রণা কবিতার ভাষাকে মর্মস্পর্শী করেছিল। ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের গণ্ডি ছাপিয়ে জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত ‘হুলিয়া’র কাব্য-বয়ান ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কবিতাবইয়ে সংকলিত হয় পরে। ১৯৭০ সনের ২১ জুলাই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কবি প্রথমবার তাঁর এই কবিতাটি জনসমক্ষে আবৃত্তি করেন। ১৯৮৪ সনে গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল একে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেন।

বাংলা কবিতার ইতিহাসে নির্মলেন্দু গুণের বহু কবিতা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এরকম কিছু কবিতার পঙক্তি স্মরণ করি কবির জন্মদিনে :

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

—স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহাকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল; -আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।

—হুলিয়া

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।

—আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়;
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

—মানুষ

নির্মলেন্দু গুণের কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর সহজ-সরল ভাষার মাধ্যমে গভীর রাজনীতি সচেতনা ও প্রেমের অনুভূতি প্রকাশের সক্ষমতা :

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই।

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি।

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই।

তখন আমি একটু ছোঁব
হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরণী নায়ে।

নায়ের মাঝে বসবো বটে,
না-এর মাঝে শোবো,
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ
দুঃখ দিয়ে ছোঁব।

—যাত্রাভঙ্গ

‎নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত ‘যাত্রাভঙ্গ’ কবিতার মূলভাব অপার্থিব ও আত্মিক ভালোবাসা, যেখানে শারীরিক দূরত্বের চেয়ে মানসিক বা আত্মিক নৈকট্য অনেক বেশি শক্তিশালী। কবি ভালোবাসার মানুষকে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে চান না, বরং মনের গহীন থেকে অনুভব করতে চান। শরীরী মিলন মুখ্য নয়, বরং দুটি মনের অদৃশ্য বাঁধন শেষকথা। প্রেমিকের চিরন্তন উপস্থিতি প্রেমিকাকে ছেড়ে প্রেমিকের কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। প্রেমিকা যেখানেই পা বাড়াবে, ছায়ার মতো প্রেমিক তার সাথে জড়িয়ে থাকবে। প্রেমিক তার ভালোবাসার চাদর দিয়ে এমন এক জগৎ তৈরি করেছেন, যা ছেড়ে চলে যাওয়ার সব পথ বন্ধ।

কবিতায় ‘বৈতরণী নায়ে’র (মৃত্যু বা পরপারের নৌকা) উল্লেখ চরম সত্যকে তুলে ধরছে। জীবনের শেষ মুহূর্তে বা বিদায়বেলায় প্রেমিকাকে এই প্রেমের নৌকায় উঠতেই হবে। জাগতিক সব সম্পর্কের অবসান ঘটলেও প্রেমের এই আধ্যাত্মিক তরী থেকে মুক্তি নেই। দুঃখের মাঝে মিলনের শেষাংশে কবি বলেই দিচ্ছেন :—তিনি হাত দিয়ে মুখ ছোঁবেন না, বরং দুঃখ দিয়ে ছোঁবেন। এর অর্থ হলো, প্রেমের আনন্দ বা মিলনের চেয়েও বিচ্ছেদের যে-গভীর বেদনা ও হাহাকার, তা দিয়ে তিনি প্রেমিকাকে আজীবন নিজের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবেন। কবিতাটি মূলত শরীরের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক পরম আধ্যাত্মিক প্রেম, চিরন্তন অধিকারবোধ ও বিচ্ছেদের গভীর দুঃখের মাধ্যমে প্রিয়জনকে অনন্তকাল ধরে রাখার আকুলতা প্রকাশ করে।

. . .

Nirmalendu Goon (June 21, 1945); Image Source: Collected; Google Image

আকাশের তারা ছিঁড়ে ফেলি আক্রোশে,
বিরহের মুখে স্বপ্নকে করি জয়ী;
পরশমথিত ফেলে আসা দিনগুলি
ভুলে গেলে এতো দ্রুত,হে ছলনাময়ী?

পোড়াতে পোড়াতে চৌচির চিতা নদী
চন্দনবনে আগ্নির মতো জ্বলে,
ভূকম্পনের শিখরে তোমার মুখ
হঠাৎ স্মৃতির পরশনে গেছে গলে।

ফিরে গেলে তবু প্রেমাহত পাখি একা,
ঝড় কি ছিলো না সেই বিদায়ের রাতে ।
ভুলে গেলে এতো দ্রুত, হে ছলনাময়ী,
পেয়েছিলে তাকে অনেক রাত্রিপাতে।

শব্দের চোখে করাঘাত করি ক্রোধে,
জাগাই দিনের ধূসর প্রতিচ্ছবি।
না-পাওয়া মুখের মুখর সুষমা দিয়ে,
তবুও তোমার ছলনা-আহত কবি
তোমাকেই লেখে, তোমাকেই রচে প্রিয়!

—আক্রোশ

ওপরে উদ্ধৃত কবিতায় প্রেম, বিরহ, আর প্রিয়তমার প্রতারণায় সৃষ্ট ক্ষোভ ও যন্ত্রণার অনুভূতি পাঠককে টানে। কবি তাঁর প্রিয়তমাকে ‘ছলনাময়ী’ ডাকছেন কবিতায়। অতীতের সমস্ত মধুর স্মৃতি ও স্পর্শ পলকের মধ্যে ভুলে গিয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। প্রিয়তমার এই আকস্মিক বিদায় কবির মনে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে এনেছে। ভেতরটা চিতার আগুনের মতো পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। কবিহৃদয়ে চরম আক্রোশ ও ক্রোধ কাজ করছে, আবার না-পাওয়ার হাহাকার তাঁকে তাড়া করছে সারাক্ষণ! আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত প্রতারণা, অবহেলা ও কষ্টের পরে কবি তাঁর প্রিয়তমাকে ভুলতে পারছেন না! ছলনায় আহত হয়েও তাঁর সকল সৃষ্টি, শব্দ ও কবিতাজুড়ে কেবল প্রিয়তমার জয়গান চলছে। শত অবহেলার মাঝে প্রেমিকের এই চিরন্তন ও একনিষ্ঠ ভালোবাসার রূপ কবিতায় পরিস্ফুট।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না।
আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : “তোমার চোখ এতো লাল কেন?

—তোমার চোখ এতো লাল কেন?

‎কবিতাটি জনপ্রিয় প্রেমের কবিতা। কবিতায় মানুষের গভীর একাকীত্ব, সঙ্গপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা ও আন্তরিক যত্ন পাওয়ার মানবিক চাহিদা পাঠক টের পায়। কবি এখানে প্রেম বা রোমান্টিক ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কাতর নন। তিনি এমন একজন মানুষ চাইছেন, যে-কি-না তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে, তাঁর খোঁজখবর নেবে ও দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো প্রয়োজন আর অনুভূতির দিকে যত্নশীল থাকবে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে তিনি ক্লান্ত। এমন এক আশ্রয় খুঁজছেন, যেখানে কেউ তাঁকে দরজা খুলে দেবে, তাঁকে খেতে ডাকবে, জল লাগবে কি-না জিজ্ঞেস করবে অথবা তাঁর লাল চোখ দেখে উৎকণ্ঠিত হবে।

কবিতাটি মূলত ভালোবাসার বাহ্যিক বা দাম্পত্য রূপের চেয়ে বেশি করে মানবিক সহমর্মিতা, মমতা, যত্ন ও আপনজনের উপস্থিতির প্রয়োজনকে অনিবার্য করে। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি কখনও-কখনও গভীর প্রেম নয়, বরং এমন একজন মানুষের অস্তিত্ব, যে-আন্তরিকভাবে তার খোঁজ রাখছে;—এই সত্যটাই কবিতার কেন্দ্রীয় বক্তব্য।

নির্মলেন্দু গুণ বাংলা কবিতার অন্যতম জনপ্রিয় কবি। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেম, প্রকৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি স্থান পেয়েছে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, গণমানুষের জীবনসংগ্রাম, রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই বহুমাত্রিক বিষয় বৈচিত্র্য তাঁর কবিতাকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের জায়গা থেকে গভীর আবেগে কবিতায় ভাষা দিয়েছেন কবি।

তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো সরল, আন্তরিক ও জীবনঘনিষ্ঠ। প্রেমকে তিনি শুধু রোমান্টিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং মানবপ্রেম, মমত্ববোধ ও সম্পর্কের উষ্ণতা সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে। সমাজের অসংগতি, শোষণ, বঞ্চনা ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন কবি। গ্রামীণ জীবন ও প্রাকৃত বাংলার নদী, মাঠ, গ্রামীণ মানুষের জীবন-সংস্কৃতি তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শিকড়ের প্রতি কবির গভীর অনুরাগকে যা মূর্ত করে যায়।

তাঁর কবিতার ভাষা জটিল নয়। কথ্যভাষার সহজ প্রবাহ পাঠকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে। কবিতায় অনুভূতির তীব্রতা ও আন্তরিকতা লক্ষণীয়। ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক বোধ সেখানে একেত্রে মিশেছে। সহজ ভাষার মধ্যেই শক্তিশালী চিত্রকল্প ও প্রতীক ব্যবহার করেন কবি। তাঁর কবিতাকে এটা অর্থবহ করে তুলেছে। কাব্যস্বভাবে বক্তব্যধর্মী বা সরাসরি বলার প্রবণতা আমরা পাই। গণমানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে তাঁর এই বক্তব্যধর্মীতা কবিতার রসহানি ঘটায় না। ছন্দ ও সংগীতধর্মী গুণগুলো মূলত মুক্তছন্দ ও গদ্যছন্দকে আশ্রয় করে পথ খুঁজে নেয়। স্বাভাবিক সংগীতময়তা ও উচ্চারণগত সৌন্দর্য ধরে রেখে ছন্দের ব্যবহার ঘটান কবি।

নির্মলেন্দু গুণের কবিতা প্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের অনন্য সমন্বয়। সহজ ভাষা, তীব্র আবেগ, প্রতিবাদী মনোভাব ও জীবনঘনিষ্ঠ উপস্থাপনা দিয়ে বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর কবিতা একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের আবার উচ্চাঙ্গীয় মানুষের হৃদয়েও কড়া নাড়ার ক্ষমতা রাখে। এ-যেন অনন্তকালকে ধরে রাখার শৈল্পিক প্রকাশ!

. . .

Nirmalendu Goon (June 21, 1945); Image Source: Collected; Google Image

‎এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক—
আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।

—আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি

নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতা ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের মানবিক আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, শান্তি ও স্বপ্নপূরণের এক গভীর কাব্যিক উচ্চারণ। পঁচাত্তর পরবর্তী এমন এক সময়ে কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ও প্রকাশ্যে পাঠ করেছিলেন, যখন বঙ্গবন্ধুর ‘নাম’ মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল দেশে। প্রকাশ্যে তাঁর নাম নেওয়াটা ছিল অপরাধ।

‘এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,’… কবি ‎এখানে বসন্তের নবজাগরণের আবহে বটগাছের নিচে জড়ো হওয়া দুঃখভারাক্রান্ত মানুষদের সাক্ষী হিসেবে আহবান করছেন। বটগাছের স্থায়িত্ব, ইতিহাস ও আশ্রয়ের প্রতীক। ব্যথিত মানুষগুলো একটি সংগ্রামমুখর জাতির প্রতিনিধি।

‘না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,’… না-ফোটা কৃষ্ণচূড়া এখানে অপূর্ণ স্বপ্ন, অব্যক্ত সম্ভাবনা ও প্রতীক্ষার প্রতীক। ‘গোপন মঞ্জরী’ ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ইশারা করছে। কবি চাইছেন তাঁর ঘোষণা শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও শুনুক। ‘আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক—’ ‎কালো কোকিল সাধারণত বসন্ত, প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আসন্ন সন্ধ্যা একটি যুগসন্ধিক্ষণ বা পরিবর্তনের মুহূর্তকে বোঝায়। কবি তাঁর অনুভূতির বার্তা প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের কাছে পৌঁছে দিতে উন্মুখ যেন!

‘আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে/ আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা রাখলাম,/ আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।’ ‘পুণ্য মাটি’ মাতৃভূমির প্রতীক। প্রেম, সৌন্দর্য ও কোমলতার প্রতীক হলো গোলাপ। সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তিম চেতনার প্রতীক হচ্ছে পলাশ। কবি ঘোষণা করছেন, তিনি তাঁর প্রেম, সংগ্রাম ও স্বপ্নে বোনা অঙ্গীকার পূরণ করেছেন। এটি ব্যক্তিগত ও জাতীয়—উভয় প্রতিশ্রুতির সফল বাস্তবায়নের আভাস রেখে যায়।

‎‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,/ আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’ এটাই কবিতার কেন্দ্রীয় বক্তব্য। দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তপাত ও সংঘাতের পর কবি প্রতিশোধ বা নতুন রক্তক্ষয়ের আহবান জানাননি। তিনি ভালোবাসা, মানবতা, শান্তি ও সহমর্মিতার বাণী উচ্চারণ করতে এসেছেন। ভালোবাসা এখানে শুধু ব্যক্তিগত প্রেম নয়; এটি মানুষ, দেশ ও জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রতীক।

এই পংক্তিগুলোতে কবি প্রকৃতির নানা প্রতীকের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন, সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের পথ অতিক্রম করে তিনি এখন প্রেম, মানবতা এবং স্বপ্নপূরণের কথা বলতে চান। গোলাপ, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া ও কোকিলের প্রতীকী ব্যবহারে কবিতাটি একদিকে যেমন সৌন্দর্য ও প্রেমের কাব্য, অন্যদিকে মুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও মানবিক চেতনার অনন্য দলিল!
. . .

লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন

. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম

মেকদাদ মেঘ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 10

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *