পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

ঘুঙুর : কামাল রাহমান

Reading time 2 minute
5
(5)

বদলে গেছি আমি। যেভাবে অন্যরা বদলায়। ঠিকভাবে বললে কেউ বদলে দিয়েছে আমাকে।

সান্ধ্যনাচ অনুষ্ঠানের একটা টিকিট পেয়েছি এক বন্ধুর সৌজন্যে। অনেকটা অনিচ্ছায় ওর টিকিটের মূল্য বাঁচাতে এসেছি। ওর ধারণা নাচটা কেউ না দেখলে ওর ব্যয় করা অর্থ জলে যাবে। কোনোভাবেই বোঝাতে পারিনি ওকে-যে, পয়সা কখনো জলে যায় না। ওটা অন্য কেউ পেয়ে গেছে।

নাচের শুরুতে ছোট্ট একটা ঘুঙুর খুলে আসে মেয়েটার পায়ের নূপুর থেকে। হয়তো লক্ষ করেনি সে। নেচে চলেছে নাচের নেশায়, অথবা আনন্দে।

অকারণে ভয় হয় আমার, যেভাবে নেচে চলেছে ঐ মেয়ে, ঘুঙুরটা পায়ে পিষে ব্যথা পেতে পারে সে। পা কেটে রক্ত ঝরবে। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠবে! নাচ থামিয়ে দেবে। হুল্লোড় জুড়বে দর্শক।

দু’চোখ আটকে আছে আমার ঐ ঘুঙুরে। মাঝে মাঝে আঁতকে উঠি আমি। এই বুঝি পায়ের নিচে চাপা পড়ে ওটা! বাজনার তালে তালে দ্রুত হয় ওর পায়ের ছন্দ আর আমার বুকের কাঁপুনি। মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাতে পারি না ওখান থেকে।

কোনো অঘটন ছাড়াই, যাহোক, শেষপর্যন্ত থামে ঐ মেয়ে। বেরিয়ে আসি আমি নাচঘর থেকে। বাইরে এসে অপেক্ষা করি মঞ্চ থেকে ওর বেরিয়ে আসার জন্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন আমার, দেখা হয় ওর সঙ্গে। ‘শুভেচ্ছা তোমাকে’, বলি আমি;—‘অনেক ভালো নেচেছো।’

‘ধন্যবাদ তোমাকে।’ আমাকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করে সে, ‘নাচ না দেখে সারাক্ষণ মেঝেতে কী দেখছিলে?’

কৌতুক করে বলি আমি, ‘মেঝেটার নাচ দেখছিলাম।’ মনে মনে ভাবি, নাচের সময় দর্শকদের দেখে ওরা?

‘উঁহু’ মাথা দুলিয়ে বলে সে, ‘দেখছিলে ঐ ঘুঙুরটা।’

আরো অবাক হবার পালা আমার। এতটা লক্ষ করে কী করে ওরা! জিজ্ঞেস করি, ‘কীভাবে বুঝলে?’

‘পেশাগত অভিজ্ঞতায়।’ চোখে কৌতুক মিশিয়ে বলে, ‘ওটা-যে খুলে পড়েছিল তা বুঝেছিলাম আমি শুরুতেই।’

‘আমার দৃষ্টি থেকে?’

‘হ্যাঁ বা না, দুটোই হতে পারে।’

‘হ্যাঁ হলে তো ভালোই। সম্ভাব্য একটা দুর্ঘটনা এড়ানো গেল।’

চোখের রহস্য হাসিটা ধরে রেখে বলে সে, ‘না, পেশাগত অভিজ্ঞতায় ওটাও এড়িয়ে যাই আমরা।’

একটু হতাশ হই। বলি, ‘তাই?’

‘শোনো’ একটু থেমে থেকে বলে সে, ‘অন্যের যন্ত্রণা বা উৎকণ্ঠাটা নিজের ভেতর নিও না। নিজের ক্ষতি হয় এতে। অন্যের লাভ হয় না।’

বোঝার চেষ্টা করি কি বলেছে সে। চুপ করে থাকি কিছুটা সময়। মনে মনে নিজেকে বলি, কি করব, এটাই যে আমার ধাত। কিছু বলছি না দেখে আচমকা ও জিজ্ঞেস করে :

‘নাচ শিখবে?’

কখনো ভাবিনি এটা। চটজলদি কোনো জবাব দিতে পারিনা।

আবার বলে সে ‘দেখবে তাহলে কত সহজে ভুলে থাকা যায় নিজের ও অন্যের সব যন্ত্রণাগুলো।’

হাতটা এগিয়ে দেই ওর দিকে। এক চোখে আমার ভেসে থাকে দলছুট ঐ একলা ঘুঙুর, আর অন্য চোখে ওর নৃত্যরত পায়ের ছন্দ ও কারুকাজ। আর কিছু না ভেবে বলি :

‘শিখব।’
. . .

লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

কামাল রাহমান : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস

কামাল রাহমান-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *