
প্রতিটি নতুন গল্প একজন মননশীল গল্পকারের কাছে একটা বাজি। এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষের ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ। তাই সাধে-অসাধে গল্পের চরিত্রের সাথে লেখক নিজেও জড়িয়ে পড়েন, যদি তিনি ব্যবসায়ী হতে না চান! মানবসমাজের বিশেষ কোনো নর-নারীর দুঃখ-কষ্ট কিংবা তাদের একান্ত চেতনার অংশ হয়ে উঠতে চান গল্পকার। বিষয়টা নিয়ে দিনের পর দিন ভাবা, যুক্তি দিয়ে যাচাই-বাছাই করা, ওজন করা… এই গুচ্ছগুচ্ছ চিন্তা-চেতনার মধ্যে লেখকের হৃদয়ে জেগে থাকে একটা স্বপ্ন, যা তিনি গল্পের মাধ্যমে পাঠককে জানাতে চান। মানবচরিত্রে লুকানো কোনো সত্য আবিষ্কারের তপস্যায় গল্পকার তাই কিছুটা বিজ্ঞানীও বটে।
গল্পকারের মনের কোনো দুর্বলতা সংক্রামিত করতে পারে গল্পের চরিত্রকে। এই ছোঁয়াচে রোগ সাধারণত দুই ধারায় ছড়িয়ে পড়তে পারে :—একটি দেহকে গুরুত্ব দিতে চাইবে, অন্যটি হৃদয়কে মুক্তি দিতে চায়। চরিত্রের দেহ-মন ও সমাজ-সভ্যতা নিয়ে লেখকের কারবার। গল্পকারের জীবনচেতনা তাই বিকশিত হয় চরিত্রের মাধ্যমে, অর্থাৎ গল্পের চরিত্ররা হচ্ছে গল্পকারের চিন্তার ধারক-বাহক। স্বর্ণকারপুত্রের কাছে মায়ের সোনার গহনা যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি একজন গল্পকারের মা-ভাই-বোনসহ দুনিয়ার সব মানুষই গল্প-উপন্যাসের চরিত্র। চাষি ভাই যেমন ফসল লাগানোর আগে হাল-মই দিয়ে মাটি তৈরি করেন, তেমনি গল্পকার।
আবার এদিকে বিজ্ঞান বলছে, মানুষের মগজে যতগুলো স্নায়ুকোষ আছে, তার সবকটাকে একটা একটা করে পাশাপাশি বসালে দৈর্ঘ্যে তা পৃথিবীর পরিধির সমান হয়। তাই মানুষের দেহ-মন-মেধা বিষয়ে বাউল চিন্তকরা বলেন, ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে।’ সেজন্য আমি মনে করি, মানুষ যতই বোকা কিংবা নিরক্ষর হোক, যার যার স্তরে তার তার মতো বেড়ে ওঠা ও বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে তারা প্রত্যেকেই একটা জীবনকে যাপন করে, সঞ্চয় করে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। যা তার জীবনের তুলাদণ্ড। এ-থেকেই সে বাঁচতে শেখে। চিন্তা-চেতনা, যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা সে ওই জীবনাভিজ্ঞতা থেকেই অর্জন করে। তার স্বপ্ন, আনন্দ, বেদনা… ইন্দ্রিয়গত এই বিষয়গুলোর ওপর আবেগের একটা বিশাল ভূমিকা তো আছেই। এটা মৌলিক জিনিস। খুব কম মানুষই পারে চালাকি করে জীবনের এই আবেগময় কর্মতৎপরতাকে দমন কিংবা আড়ালে লুকিয়ে রাখতে।
একটু ভালো থাকা ও খাওয়ার জন্য মানুষ হৃদয়টাকে যতই নির্বাসনে পাঠাক, তবু রক্তমাংসের মধ্যে কিছু-না-কিছু জিনিস তো থেকেই যাবে—রক্তমাংস ও হৃদয়। যে মানুষ খুন করেছে, তারও তো প্রিয় নারী কিংবা ফুল থাকতে পারে। বস্তিবাসী কিংবা নগরের অট্টালিকার বাসিন্দা হলেও দেখতে পাবো, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে কবিতার ছন্দের মতো জীবনের কিছু কিছু মৌলিক জিনিসের মিল আছে। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে এইরকম অগণিত মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি করে, হাসে-কাঁদে। তারা দেহ-মনে একই ছাঁচে গড়া নর-নারী। কিন্তু একটু গভীর চোখে তাকালে এই মানুষগুলোর মধ্যে কেউ কেউ মণিমাণিক্যের মতো গল্পকারের নজর কাড়বে। তার দেহের গড়ন, চলন-বলন, টুকিটাকি কাজের মধ্য দিয়ে তার মনোজগতের একটুখানি ঝলক… লোকটাকে দেখে প্রকৃতিপন্থী লেখক যা লিখবেন, একজন নিরীক্ষাপ্রবণ তরুণ গল্পকার হিসেবে আপনি অবশ্যই আবিষ্কার করবেন তারচেয়েও দামি কোনো সুন্দর কিংবা জঘন্য সত্য।
তাহলে কী লিখবে আমার মতো একজন সাধারণ মানুষ?
এই জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো লেখক নিজে। তিনি পিতা, স্বামী কিংবা স্বপ্নবাজ তরুণ লেখক। বৈরী পরিবেশে টিকে থাকা কিংবা তার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই জনপদে তিনিও একজন যোদ্ধা। দুর্যোগের মতো দৃশ্যমান কিংবা বাতাসের মতো অদৃশ্য এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে তার বেড়ে ওঠা, টিকে থাকা, প্রেম-কাম, মমতা-ভালোবাসা… নিজের জীবনের এই বিষয়গুলোই তো তরুণ লেখকের হাতে আতশকাচ। তিনি মানুষকে দেখেন মানুষের চোখ দিয়ে। এখানে আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু লেখার সময় তাঁকে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করতে হয়। যুক্তি-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ছাঁকুনি দিয়ে আবেগকে ছেঁকে নিতে হয়। প্রেম-কাম, চাওয়া-পাওয়ার হিসাব… ইত্যাদি সব জটিল চৌম্বকক্ষেত্র পদে পদে লেখকের জন্য ওঁত পেতে আছে!
ছোটগল্পের পঞ্চধমনীর একটি হতে পারে যুক্তি। যে-লোকটা গরিব কিংবা দায়িত্বশীল সম্মানী পিতা, সে কেন খুন বা ধর্ষণের মতো জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়ে বসে? এখানে যুক্তিবিদ্যা ও মনোবিজ্ঞান কিন্তু লেখকের দিকে উৎসাহের চোখে তাকিয়ে থাকবে।
একজন লেখকের শৈশবই হলো সেরা। যার কোনো বর্ণাঢ্য শৈশব নেই, তাঁর লেখা ইটচাপা ঘাসের মতো হতে পারে। শৈশব-কৈশোর-কর্মজীবন, সংসারজীবন—সবকিছু মিলিয়ে লেখক একজন মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত দৃঢ়তা-দুর্বলতা সত্ত্বেও চিন্তার দিক থেকে আমি বলব, লেখক তাঁর সময়ের চেয়ে একটু বেশি মানুষ। কারণ তিনি তাঁর চরিত্রকে পর্যবেক্ষণ করেন অনেক দূর থেকে। একজন ব্যক্তি যে-সত্যটি তার স্মৃতিকোষে লুকিয়ে রেখেছেন… হ্যাঁ, ব্যক্তিত্ব! মানুষ যতই নষ্ট হোক, তবু তার কিছু-না-কিছু ব্যক্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে। যে-চোর বাজারে ধরা পড়ে গণপিটুনি খেয়েছে, তাঁর স্ত্রী কিংবা সন্তানের সামনে তাকে চোর বলে দেখুন…!

একজন মননশীল লেখক বাস্তবের মানুষটার চুল-চামড়া-দাঁতের কালো দাগসহ তাঁর লেখায় খুব বেশি হলে ছায়াটুকু নিতে পারেন, অবশ্যই কোনো স্থিরচিত্র নয়। আর কী কী দিতে পারেন? দেবেন তো তাঁর পবিত্র আত্মা থেকে! মনোবিজ্ঞানীর চোখ, কুকুরের মতো ঘ্রাণশক্তি আর দরদি আত্মা দিয়ে সময়চেতনার টানটান তার দিয়ে বাঁধতে পারেন ছোটগল্প নামের দোতারাটা।
গল্পটি লেখার আগে বাস্তবের মানুষটা লেখকের মগজে ছিল, লেখা কিংবা ভাববার সময় যা শুধু স্মৃতি। অনেকদিন অন্ধকার ঘরে পড়ে থাকতে থাকতে ময়লা জমে ঝাপসা হয়ে গেছে। তারপর কল্পনা যখন স্মৃতি ও ভাবের কালি দিয়ে লিখতে শুরু করে, তখন বাস্তবের সেই মানুষটার কঙ্কাল ছাড়া কিচ্ছু থাকে না। তার খটখটে হাড্ডির ওপর স্তরে স্তরে বসতে থাকে লেখকের জীবনবোধ, স্বপ্ন… সবই আসতে থাকে গল্পের চরিত্র নামের সেই মানুষটাকে কেন্দ্র করে। গল্পটা বাস্তব, খুব বাস্তব, তবু তা বাস্তব না। কারণ এই চরিত্রটাকে গতকাল কিংবা দশ বছর আগে আপনি প্রথম দেখেছিলেন মাছবাজারে। তক্ষুনি গল্পটা মাথায় ঝিলিক দিয়েছিল, আর সেই অনুভূতিটা এখন তালাশ করছেন। দূর থেকে আসা কোনো সুরের মতো ছায়া ছায়া কিছু একটা অনুমান করতে পারছেন। দিনে দিনে এসবের সাথে যুক্ত হতে থাকে প্রজ্ঞার আলো-জল, আর বাস্তবের একটুখানি মাটি। বোধ-বুদ্ধি আর যুক্তি ঝেঁড়েমুছে টুকরো-টুকরো সব জিনিসপত্র জোড়া দিতে থাকে, আর লেখকও তার সাথে সময়ের মসলা দিয়ে বাঁধতে থাকেন গল্প। তাই একজন গল্পকারের লেখা পড়ে বুদ্ধিমান পাঠক লেখকের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটু-আধটু ধারণা পেয়ে যেতে পারেন।
যিনি গল্প লিখবেন, তিনি চরিত্রের বাহিরের চেয়ে ভেতরটা দেখতে চাইবেন অনেক বেশি। মুরগির দোকানের সেই ছেলেটার কথাই ধরা যাক; যে-কিশোর আপনার মুরগি জবাই করে, ছাল ছাড়িয়ে আঁত-নাড়ি ফেলে পরিষ্কার মাংসটা শুধু দেয়। আপনি তাকে কটা টাকা দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি জায়গাটা থেকে পালিয়ে রক্ষা পান। কিন্তু সে? এসেছিল সেই সকাল সাতটায়, ফিরবে রাত দশটায়। এইটুকু ছেলে! আপনি কি তার মানসিক অবস্থার কথা ভেবেছেন? সে কিন্তু জীবন্ত একটা প্রাণীর চার হাত-পা আর তার সাথে গলাটা বিশেষ এক কৌশলে ধরে একাই প্রতিদিন অসংখ্য মুরগি কাটছে, যান্ত্রিক হাতে ছাল ছাড়াচ্ছে, সবশেষে মুরগির বুক চিরে ফেলে দিচ্ছে নাড়িভুঁড়ি। এই রক্ত, আঁত-নারি আর বাজে গন্ধভরা নিষ্ঠুর একটা পরিবেশ কি কিশোরের মনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে না? মনোবিজ্ঞান কী বলে?
পাঠকের না জানলেও চলে, লেখককে জানতে হয় অন্তত নিজের দেশের ভূগোল-ইতিহাস, মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব বিষয়-আশয়। বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের কিছু কিছু মৌলিক বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অনেক জরুরি। অভিজ্ঞতা, পঠনপাঠন এবং প্রজ্ঞার আলো ফেলে লেখক তাঁর নির্বাচিত বাস্তব মানুষটির (গল্পের চরিত্র) মধ্যে অনেক অজানা কিছু আবিষ্কার করতে পারবেন অথবা স্পর্শকাতর কিছু জায়গা তিনি তাঁর হৃদয়ের বোধ দিয়ে এমনভাবে ভরাট করে দেবেন, যেন তা পাঠককে রাতের নক্ষত্রের মতো মিটমিট করে অনেক না-বলা কথা বলে দেয়।
সবশেষে মানুষে মানুষে সম্পর্কের কথা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষে মানুষে কেন সম্পর্ক হয়, কোনো সম্পর্কই কেন চিরস্থায়ী নয়, কেন মানুষ সমাজ ও পরিবারের মধ্যেও দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছে? গল্পকার নিশ্চয়ই এসব জিজ্ঞাসায় তাড়িত হন। মানুষের জীবনে জন্ম যেমন আছে তেমনি মৃত্যুও অবধারিত। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যু বিষয়ে আমাদের সঠিক কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যা আছে সেটুকু শুধু অনুমান, কল্পনা। আমার কাছে ছোটগল্প মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মতো রহস্যঘেরা সুন্দর এক অনুভূতির নাম।
. . .
লেখক পরিচয় : শেখ লুৎফর : উপরে ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক দেখুন …
নেটালাপ : কণাআখ্যানে বৃহতের বিস্তার
. . .

শেখ লুৎফর : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম
শেখ লুৎফর-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



