নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’-১

Reading time 10 minute
0
(0)
@thirdlanespace.com

. . .

শিল্পে অ্যাকশনকে (Action) কী দিয়া বুঝব!

কৃতজ্ঞতা জাভেদ। বিয়ং-চুল হানহানা আরেন্টকে নিয়ে পরিশ্রমী আলোকপাতের পর রোজেনবার্গকে যুক্ত করা সময় ও পাঠ-প্রাসঙ্গিক মানতে হবে। রোজেনবার্গকে নিয়ে ব্ল্যাক স্মিথের আলোচনার বাংলা ভাষান্তর বেশ লেগেছে পাঠ করে।

হানা আরেন্ট ও রোজেনবার্গের চিন্তারেখা সময়ের সঙ্গে বড়ো আবর্তনে মোড় নিয়েছিল। আারেন্ট অবশ্য অনেকবেশি ছড়ানো থেকেছেন;—যেখানে আবার হাইডেগারের প্রভাব বড়ো ভূমিকা রেখেছিল। মার্টিন হাইডেগারকে এমনকি পরে তিনি প্রশ্নের মুখেও দাঁড় করিয়েছেন, বিশেষ করে নাজিবাদকে নৈতিক সমর্থনের প্রশ্নে। আপনি আগেও আলোকপাত করেছেন। অশুভ যখন হয়ে ওঠে মামুলি : প্রসঙ্গ হানা আরেন্ট শিরোনামে আলাপটি আমরা সাইটে ইতোমধ্যে তুলেছি পক্ষান্তরে মার্কসবাদী রোজেনবার্গ সময়টানে পোস্ট মডার্ন বিচার ও চিন্তনপদ্ধতির দিকে কীভাবে মোড় নিচ্ছিলেন,এর আভাস ব্ল্যাক স্মিথ নিজের লেখায় দিয়েছেন। তাঁর আলোচনা যদি সঠিক বুঝে থাকি, তাহলে আরেন্ট ও রোজেনবার্গকে তিনি একটি বিন্দুতে এনে মিলিয়েছেন, আর সেটি হলো,—সমাজে ‘শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী’র ভূমিকা কেমন হওয়া প্রয়োজন তা-নিয়ে ভাবতে যেয়ে দুজনেই অ্যাকশনের (Action) ওপর জোর দিয়েছেন।

অ্যাকশন বলতে নিছক ব্যক্তিগত রুচি ও ভাবনার গভীর উৎকর্ষ বা শিল্পবোধকে তাঁরা মিন্ করেননি এখানে। তাঁদের কাছে অ্যাকশন হলো চাবি। এর সাহায্যে একজন ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক যেসব অচলায়াতন গড়ে উঠছে সমাজে, এবং চিন্তা, রুচি, ও বোধকে যারা কোনো-না-কোনোভাবে বৃত্তবন্দি করতে মরিয়া থাকছে,—অ্যাকশন সেখানে এগুলো ভেঙেচুরে নতুন পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত কাজগুলোও দেখা যায় সমাজে নতুন অর্থ ও মূল্য ‍সৃজন করছে। এতে করে ব্যক্তি নিজেকে অচলায়তন থেকে মুক্ত করে। অন্যদিকে, সামাজিক অচলায়তনে ধস নামাতে যুগান্তকারী অবদানও রাখে। রোজেনবার্গ যে-কারণে বামপন্থা ও দক্ষিণপন্থা উভয় ভাবাদর্শকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছেন। স্মিথের রোজেনাবার্গ-পাঠের ধরন এদিক থেকে বিবেচনা করলে অবশ্যই মূল্যবান। তবে দুটি জায়গা আমার বুঝে আসেনি। আপনি সময়-সুযোগ করে আশা করি তা ক্লিয়ার করবেন :

ক. চিত্রকলার ইতিহাসে এ-পর্যন্ত যতগুলো বাঁকবদল ঘটেছে, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান থেকে আরম্ভ করে ভারতবর্ষেও তা ঘটেছে… এর সবটাই তো অ্যাকশনের সংজ্ঞায় পড়ছে তাহলে! ইউরোপের অতি সমৃদ্ধ চিত্রকলার কথা যদি ধরি, রেনেসাঁ যুগে আঁকা ছবি থেকে আরম্ভ করে কালানুক্রমিক রিয়েলিস্টিক, ইম্প্রেশনিস্ট, কিউবিস্ট, সাররিয়্যাল ও ক্যান্ডিনিস্কিদের কালপর্বে বিকশিত বিমূর্ত চিত্রকলার কোনোটাই প্রথাগত নয় বা কখনো ছিল না। সামাজিক এক-একটি অচলাবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতি ভেঙে দেওয়ার তাড়না থেকে এসব মুভমেন্ট একে-একে জন্ম নিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এর প্রত্যেকটি আবার নিজেকে একঘেয়ে, পণ্যায়িত ও বৃত্তবন্দি করায় বেরিয়ে আসার তাড়না প্রবল হতে দেখেছি আমরা। নতুন অঙ্কনরীতি বা আর্ট রেবিলিয়ন যে-কারণে ফিরে-ফিরে ঘটেছে। এই জায়গা থেকে স্মিথ যেভাবে রোজেনবার্গকে পাঠ ও ব্যাখ্যা করেছেন, সেটি আমার বুঝে আসেনি।

খ. স্মিথের আলোচনা মার্কিন চিত্রকলার নিয়ম-বিরুদ্ধ অ্যাকশনে গমন ও এর তাৎপর্য বিষয়ে রোজেনবার্গের ভাবনাকে অনুসরণ করেছে যথাসাধ্য। যেটি আবার নিউম্যানের ব্যাপারে রোজেনবার্গের অনুরাগ ও অ্যান্ডি ওয়ারহলকে নিয়ে বিরাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছে বেশ প্রাঞ্জলভাবে। তবে অবাক হয়েছি জ্যাকসন পোলক ও নিউম্যানকে নিয়ে আলোচনায় ইউরোপীয় চিত্রকলার জগতে অ্যাকশনের তাৎপর্যকে রোজেনবার্গ কোন চোখে দেখতেন,—স্মিথ তা পুরোপুরি বাদ দিয়ে এগিয়েছেন।

Action Painting: Jackson Pollock in his studio in 1951; Image Source: Collected; Google Image

ছবির মধ্যে ফিগারের সাহায্যে আভাসিত কাঠামো ও এভাবে একটি কাহিনিকে ক্যানভাসে ধারণ করার কায়দা,—এখন এটিকে স্থানচ্যুত করতে পোলক রং ছিটিয়ে আঁকতে শুরু করলেন। মার্কিন পুঁজিবাদী জীবনধারার অবর্তনকে যেটি পৃথক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ দিয়েছিল তখন। যেটি, স্মিথ যথার্থই বলেছেন,—নিউম্যানের স্রেফ লাইন টেনে বোঝানো অঙ্কনরীতিতে পৌঁছে আরো প্রখর তাৎপর্য ধারণ করছিল। সমাজ যখন নন-ফিগারেটিভ হতে থাকে, তখন তার দুটি প্রতিক্রিয়া ঘটে সচরাচর,—প্রথমত, শিল্প সেখানে পপ আর্টের জন্ম দেয়, যেটি বাস্তব থেকে বিচ্যুতির নতুন ধারণা আনে সমাজে। নতুন বাস্তবতা জন্মও দেয় এভাবে, যেমনটি অঅমরা অ্যান্ডি ওয়ারহলের আঁকা কোকোকলা ও মেরিলিন মনরোয় দেখেছি।

প্রবণতাটি অন্যদিকে নিউম্যানের মতো মিতবাক অঙ্কনরীতির জন্মও অনিবার্য করে, যেটি একাধারে সাইলেন্স, টেরর ও একে অতিক্রমে আধ্যাত্মিক সুচেতনায় উপনীত হতে উন্মুখ সেখানে। এখন, ইউরোপে ক্যান্ডিনস্কিরা ওই-যে কিউবিস্ট ফর্মের জ্যামিতিক আদল ভেঙে নতুন জ্যামিতিক আদল আনলেন ক্যানভাসে, যেখানে ফিগার আর বোঝার বিষয় থাকছে না, যদিও তার আভাস প্রচ্ছন্ন থাকছে সেখানে, এবং গতি ও সংহতি বোঝাচ্ছে অনেকখানি;—এরকম অঙ্কনরীতির পেছনে দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের কালান্তক ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। একে এখন রোজেনাবার্গ কোন বর্গে ফেলছেন তাহলে! কিংবা মার্সেল ডুচ্যাম্প ও রেনে ম্যাগ্রিট যে-ধারায় গমন করলেন সেইসময়, যার ওপর বদ্রিলার ও ফুকো অসাধারণ আলোকপাত করে গেছেন,—এই দুই শিল্পীর অঙ্কনরীতি তো অ্যাকশনের অনন্য মাত্রার নজির ভাবা উচিত।

ডুচ্যাম্প যেমন ইউরিনালের একখান ভাস্কর্য হুবহু বানালেন ও ‘ফাউনট্যান’ নাম দিয়ে ঘোষণা দিলেন : এর বেশি কিছু আঁকা অথবা গড়ার অর্থ হচ্ছে শিল্পে অযৌক্তিক ও অনাবশ্যক অর্থ আরোপ করা;—প্রকৃতি ও মানববিশ্বে সৃষ্ট জগৎ থেকে যা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করবে। তাঁর এই শিল্পরীতি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত অর্থ ও নান্দনিকতা আরোপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল তখন। প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমরা রেনে ম্যাগ্রিটের This is not a Pipe/ Ceci n’est pas une pipe শিরোনামে আঁকা ছবিতেও পাই। ম্যাগ্রিট কী করেছেন সেখানে? নাথিং…! তামাকটানার পাইপ এঁকেছেন ও ক্যাপশন দিয়েছেন ‘এটি কোনো পাইপ না’ বলে। মানে হলো, বাস্তবতাকে তাঁর এই বিবৃতি এখানে চ্যালেঞ্জ করছে।

বাস্তবে যাকে পাইপ বলে আমরা বুঝে নিয়েছি ও একপ্রকার স্বতঃসিদ্ধ বলে জানি একে,—ম্যাগ্রিট এখন পাইপের প্রতিলিপি এঁকে বলছেন ‘এটি কোনো পাইপ নয়’;—তাঁর বিবৃতি লজিক্যাল ফ্যালাসিকে গভীর করছে সেখানে। সত্যিই তো, ছবির পাইপ তো সত্যিকারের পাইপ নয়, এটি হচ্ছে পাইপের প্রতিলিপ। সংগতকারণে ম্যাগ্রিটের বিবৃতিকে অসত্য ভাবার যুক্তি নেই। পক্ষান্তরে, ভবিষ্যতে যদি টোব্যাকো পাইপ বলে কিছু মানব-ধরায় না থাকে, বস্তুটি কোনো এককালে ছিল সেট প্রমাণে ম্যাগ্রিটের আঁকা ছবিখানা সম্বল হয়ে দাঁড়াবে। ছবি তখন বাস্তবকে বুঝে নেওয়ার অবলম্বন সেখানে। বোর্হেসের ওই মানচিত্র নিয়ে লেখা প্যারাবোলকে উদ্ধৃত করে বদ্রিলার এটি চমৎকার ব্যাখ্যা করেছিলেন।

Action Painting: Fountain by Marcel Duchamp; “This is not a Pipe” by René Magritte; Image Source: Collected; Google Image

তো ম্যাগ্রিটের এই অঙ্কনরীতি প্রকারান্তরে বাস্তবের সঙ্গে দূরত্ব ও বাস্তবতর সত্য তৈরির উপায় বটে! আমাদের সামাজিক জীবনধারায় যেসব অনুঘটক ভূমিকা রাখছে, এটি ওসব কার্যকারণের ফলাফল মাত্র। অ্যান্ডি ওয়ারহলের ছবিও অনুরূপ পন্থায় রিয়েলিটিকে ফলসিফাই করতে আঁকা;—পণ্য ও ভোগবাদী সমাজের বাস্তবতাকে তারা সেখানে জন্ম নিতে দিচ্ছে। রোজেনবার্গ, স্মিথের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মানতে হবে, এদিকটা ভেবে দেখেননি।
. . .

মিনহাজ ভাইয়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা—লেখাটিকে এত মনোযোগ ও সংবেদনশীলতা দিয়ে পাঠ করার জন্য। ব্ল্যাক স্মিথের লেখা কিংবা রোজেনবার্গ-পাঠের প্রতিক্রিয়ায় যে-দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, সেগুলো কেবল যুক্তিসংগতই নয়, বরং গভীর পাঠ ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ফল। একইসঙ্গে এটাও স্বীকার করা প্রয়োজন-যে, এই প্রশ্নগুলোর পূর্ণ উত্তর দিতে যে-বিস্তৃত পাঠঅভিজ্ঞতা ও ধারণা থাকা দরকার, তার সীমাবদ্ধতা আমার মধ্যেও রয়েছে। তবু সেই ’সীমা’ সত্ত্বেও আলোচনায় কিছু জরুরি দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করা প্রয়োজন মনে করি।

কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হলো যদি শিল্পের ইতিহাস জুড়েই প্রথাভাঙা, বিদ্রোহ ও নতুন রূপের আবির্ভাব ঘটে থাকে, তবে হ্যারল্ড রোজেনবার্গ যে-‘অ্যাকশন’-র কথা বলছেন, সেটি আলাদা কী অর্থ বহন করে? প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে রোজেনবার্গ যে-অর্থে ‘অ্যাকশন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ইউরোপীয় বা অন্যান্য শিল্প-আন্দোলনের প্রথাভাঙা কর্মকাণ্ড আদৌ সেই একই স্তরের কি-না।

ইউরোপীয় আধুনিকতার বড় আন্দোলনগুলো—ইম্প্রেশনিজম, কিউবিজম, দাদা, সুররিয়ালিজম—নিশ্চয়ই প্রথাভাঙা অ্যাকশন। একাডেমিক রিয়েলিজম ভেঙেছে, একক দৃষ্টিকেন্দ্র ভেঙে কিউবিজম এসেছে, যুদ্ধোত্তর শূন্যতা থেকে ‘দাদা’ ও সুররিয়ালিজম জন্ম নিয়েছে। কিন্তু এই ‘অ্যাকশন’ ছিল মূলত নান্দনিক ও ঐতিহাসিক স্তরের—শিল্পের ভাষা বদলানো, প্রতিনিধিত্বের কাঠামো ভাঙা, পূর্বসূরিদের সঙ্গে তর্কে নতুন রূপ দাঁড় করানো। রোজেনবার্গ এই ইতিহাস অস্বীকার করেননি। তিনি লক্ষ করেছিলেন—এই বিদ্রোহগুলো খুব দ্রুতই নতুন ভাষা, নতুন শৈলী, নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ফেলে। যা একসময় ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, অল্প সময়ে তা পাঠ্যসূচি, জাদুঘর ও বাজারে স্বীকৃত হয়ে ওঠে। এখান থেকেই রোজেনবার্গের মৌলিক প্রশ্নের জন্ম।

এই জায়গায় এসে তাঁর ‘অ্যাকশন’ ধারণাটি আলাদা হয়ে যায়। রোজেনবার্গের কাছে তা কোনো শৈলী, আন্দোলন বা নান্দনিক আবিষ্কার নয়। এটি একটি অস্তিত্বগত ঘটনা। তিনি যখন বলেন—What was to go on the canvas was not a picture but an event;—তখন তাঁর অর্থ হলো শিল্পী ক্যানভাসে যা করছে, তা কেবল দৃশ্যমান বস্তু উৎপাদন নয়, বরং নিজের পরিচয়, নিরাপত্তা ও অর্জিত অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন’-র বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট—এটি অ-প্রাতিষ্ঠানিক, পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের দিকে যায় না, শিল্পীকেও সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না, এমনকি শেষপর্যন্ত এটি তাকে তার অর্জিত পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এই ঝুঁকির মধ্যে তিনি অ্যাকশনের সত্যিকারের অর্থ খুঁজে পান।

Harold Rosenberg by cartoonist friend Saul Steinberg; Image Source: Collected; Rosenberg FB Fan Page

এখানে আরেকটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় আধুনিকতা জন্ম নিয়েছিল দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যের ভেতর থেকে, যেখানে বিদ্রোহ মানেই ছিল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সংলাপ। বিপরীতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকান শিল্পীরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে ঐতিহ্যহীন, রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত ও মতাদর্শগতভাবে অনিশ্চিত। রোজেনবার্গের কাছে এই অনিশ্চয়তাই ছিল ‘অ্যাকশনের’ সম্ভাব্য ক্ষেত্র। তাঁর চোখে ইউরোপীয় আধুনিকতা তখন ইতিহাসে পরিণত হচ্ছিল, আর আমেরিকান বিমূর্ত শিল্প তখনো নিজের মানে খুঁজে পাচ্ছিল না। এ-কারণে তিনি এমন ‘অ্যাকশনের’ কথা বলেন, যা বারবার ঝুঁকিতে যায়, নিজের অর্জিত অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, এবং কোনো নিরাপদ নান্দনিক পরিচয়ে স্থির থাকে না। এই প্রেক্ষিতে জ্যাকসন পোলকের কাজ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ;—কারণ, পোলক নিজের শরীর, মানসিক অবস্থা ও ব্যর্থতার সম্ভাবনাকে ক্যানভাসে নিয়ে এসেছিলেন।

ওয়ারহল নিয়ে মিনহাজ ভাইয়ের পর্যবেক্ষণ যথার্থ। অ্যান্ডি ওয়ারহল ভোগবাদী সমাজের বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছেন;—এটি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু রোজেনবার্গের প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায় : এই উন্মোচনের ভেতরে ওয়ারহল নিজে কতটা ঝুঁকিতে ছিলেন? নাকি তিনি শিল্পীর ঝুঁকিকে মিডিয়া-কৌশলে রূপান্তর করে নিজের ব্যক্তিত্বকে ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিলেন এবং বাজারের সঙ্গে সংঘর্ষের বদলে সহাবস্থান বেছে নিয়েছিলেন? রোজেনবার্গের চোখে ওয়ারহল হয়ে উঠেছিলেন ভোগবাদী সমাজের অংশ;—একটি সমাজ, যা তাঁর বিদ্রোহে কখনোই প্রকৃত অর্থে বিপন্ন বোধ করেনি। তিনি সঠিক ছিলেন কি না, তা আলাদা বিতর্ক, কিন্তু তাঁর সংজ্ঞায় ওয়ারহল ছিলেন ‘অ্যাকশন’-র বাইরে।

সবশেষে বলা যায়, রোজেনবার্গ শিল্প-ইতিহাসের কোনো পদ্ধতিগত তত্ত্ব নির্মাণ করতে চাননি। তাঁর প্রশ্ন ছিল আরও গভীর ও অস্তিত্বগত;—আধুনিক সমাজে, যেখানে মতাদর্শ, বাজার ও প্রতিষ্ঠান সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে, সেখানে একজন শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী কীভাবে সত্যিকারের কাজ করতে পারে? এই প্রশ্নই তাঁর চিন্তার কেন্দ্র, এবং এই প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
. . .

ধন্যবাদ জাভেদ, স্মিথের ব্যাখ্যা পাঠ করতে যেয়ে যে-প্রশ্ন মনে জেগেছিল, আপনার ব্যাখ্যা তা ভালোভাবে খণ্ডন করেছে। ব্যাখ্যাটি অন্যদিক থেকে স্মিথ পড়তে বসে যে-ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল মনে, তা দূর করেছে অনেকখানি। রোজেনবার্গ, বোঝাই যাচ্ছে, শিল্পে দেখা দেওয়া প্রথাভাঙা এক-একটি ঘটনা ও সেখানে শিল্পীর ভূমিকাকে ডিনাই করেননি;— তিনি ডিনাই করছেন শিল্পকে বাজারি করে তোলার পদ্ধতিকে, যেটি প্রকারান্তরে শিল্পীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে। যে-কারণে জ্যাকসন পোলকদের ছবি আঁকার নয়া তরিকাকে সমর্থন জানিয়েও ক্রমশ নিউম্যানের অঙ্কন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছিলেন। যেহেতু, নিউম্যান বাজারে নিজেকে বিসর্জনের মুহূর্তে সরে যাচ্ছেন ও সৃজন করছেন তার অস্তিত্বকে যেন জিম্মি না করতে পারে… এরকম এক তরিকা।

সবই ঠিক আছে, তথাপি এই খটকা থেকে যায়, শিল্পী যদি ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে, সেটি তো সামাজিক বাস্তবতার অনিবার্য কার্যকারণে সে হতে বাধ্য। এখন, সেই ব্র্যান্ডকে অন্য কেউ শুধু নয়, বাজার তার নিজ প্রয়োজনে ভেঙে নতুন কাউকে খুঁজে নেয়। এছাড়া অস্তিত্ব-সংকটে সে নিজে খাবি খেতে বাধ্য। যে-কারণে পিকাসোর ব্র্যান্ড ভ্যালু আমার কাছে ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে তিনি কী দিচ্ছেন বাজারকে।

সভ্যতায় ব্যক্তি ও বাজার অবিচ্ছিন্ন। এখানে ভ্যান গখকে বাজার দাম দেয়নি, পরে তাঁকে ব্র্যান্ডিং ও বিক্রি করেছে চুটিয়ে। সংগতকারণে এর পালটা প্রতক্রিয়ায় নতুন কেউ বাজারকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন কিছু এঁকেছে, যার মধ্যে তার অস্তিত্ব কথা কইছে দেখে পরে এটিও বাজার কবজায় নিয়েছে। একটি দুষ্টচক্র, কিন্তু এছাড়া উপায় কি? রোজেনবার্গ এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কোন পথে?
. . .

ব্র্যান্ড হয়ে যাওয়ার পর শিল্পীর নিয়তি

মিনহাজ ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ—রোজেনবার্গের ভাবনার সবচেয়ে সংকটময় জায়গাটি চিহ্নিত করার জন্য। আধুনিক সমাজে শিল্পীর ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা প্রায় অনিবার্য একটা পরিণতি। বাজার কেবল শিল্পীকে গ্রাসই করে না, প্রয়োজনে তাকে ভেঙে আবার নতুন ব্র্যান্ডও তৈরি করে। ফলে প্রশ্নটি দাঁড়ায়—এই দুষ্টচক্রের বাইরে যাওয়ার আদৌ কোনো পথ আছে কি?

হ্যারল্ড রোজেনবার্গ প্রশ্নটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবিত ছিলেন, তা তাঁর লেখাপত্রে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তিনি কখনো এই ভ্রান্তিতে ভোগেননি-যে, শিল্পী বাজারের বাইরে থাকতে পারে। তাঁর চিন্তার শুরুই এই বাস্তবতা থেকে—বাজার, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম শিল্পীকে গ্রাস করবেই। তাঁর প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায় : বাজার শিল্পীকে গ্রাস করার পর শিল্পীর আর কিছু করার থাকে কি না? আরও গভীরে গেলে—ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার পরেও কি শিল্পী আবার ‘অ্যাকশন’-এ ফিরতে পারে? রোজেনবার্গের কাছে ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আধুনিক শিল্পীর প্রায় অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু এই দশা মানেই শিল্পীর মৃত্যু, এ-কথা তিনি বলেননি। এখানেই, তাঁর মতে, শিল্পীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হয়। তিনি দেখান, শিল্পী যখন ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে, তখন দুটি বিষয় একসঙ্গে ঘটে:

প্রথমত, শিল্পী তার কাজের উপর প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ হারায়। কাজ আর ‘ঘটনা’ (event) থাকে না, তা হয়ে ওঠে বস্তু, স্টাইল, পণ্য। দ্বিতীয়ত, শিল্পীর ব্যক্তিত্ব, তার জীবন, অভ্যাস, ভঙ্গি, এমনকি নীরবতাও—বাজারের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এই মুহূর্তে শিল্পীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। কারণ তখন, রোজেনবার্গের ভাষায়, শিল্পী আর কাজ করছে না, সে নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করছে। সে নিজের সফলতার বন্দি হয়ে পড়ে। রোজেনবার্গ এখানেই থেমে যাননি। তিনি কখনো বলেননি, এই পর্যায়ে শিল্পীর দায়িত্ব শেষ। তাঁর মতে, এখান থেকে শিল্পীর নৈতিক দায়িত্বের আরেকটি পর্ব শুরু হয়।

রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন’ যদি একবারের বিদ্রোহ হতো, তাহলে ব্র্যান্ড হয়ে যাওয়ার পর শিল্পীর আর কিছু করার থাকত না। কিন্তু তাঁর কাছে ‘অ্যাকশন’ কোনো এককালীন ঘটনা নয়, এটি একটি পুনরাবৃত্ত অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন : শিল্পীকে শুধু প্রথমবার ঝুঁকি নিলে চলবে না, নিজের সাফল্যকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে হবে।

এই জায়গায় এসে বার্নেট নিউম্যান রোজেনবার্গের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন। নিউম্যান জানতেন, একসময় তাঁর কাজও বাজারে ঢুকবে, স্বীকৃতি পাবে, ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। কিন্তু তিনি যতদিন পেরেছেন, নিজের কাজকে সহজ ব্যাখ্যা, সহজ ভোগ ও বাজারি ভাষার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন। রোজেনবার্গের চোখে এটি ছিল ব্র্যান্ড হয়ে যাওয়ার পরেও নিজেকে আংশিকভাবে প্রত্যাহার করার এক নৈতিক কৌশল।

এ-কারণে অ্যান্ডি ওয়ারহলের সঙ্গে রোজেনবার্গের দূরত্ব। ওয়ারহল ভোগবাদী সমাজের বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছেন—এতে রোজেনবার্গের দ্বিমত নেই। কিন্তু তাঁর আপত্তি ছিল এই-যে,—ওয়ারহল কখনোই ব্র্যান্ড হওয়ার পর সেটিকে ভাঙার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি নিজেকেই শিল্পকর্মে রূপান্তর করেছিলেন। রোজেনবার্গের দৃষ্টিতে, এটি ‘অ্যাকশন’ নয়; বরং ‘অ্যাকশন’-র অনুকরণ;—একধরনের ছদ্মকর্ম। কারণ, এখানে শিল্পী নিজে আর ঝুঁকিতে নেই। সংগতকারণে রোজেনবার্গ প্রশ্ন তুলছেন : যে-শিল্পী নিজে বিপন্ন নয়, সে কি আদৌ ‘কর্ম’ করছে?

তাহলে ব্র্যান্ড হয়ে যাওয়ার পর শিল্পীর করণীয় কী? রোজেনবার্গ কখনো বলেননি বাজার ছেড়ে দাও, খ্যাতি ত্যাগ করো। বরং তাঁর পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন : নিজের স্টাইলকে অস্বীকার করা, নিজের সাফল্যের ভাষা ভেঙে ফেলা; অর্থাৎ নিজের বিরুদ্ধে আবার কাজ শুরু করা। রোজেনবার্গের কাছে ব্র্যান্ড মানে তাই কোনো ক্লান্ত, পরাজিত শিল্পী নয়;—এমন একজন শিল্পী, যে-জানে—তার সবচেয়ে বড় শত্রু এখন আর সমাজ নয়, বরং তার নিজের প্রতিষ্ঠিত পরিচয়।

ইতিহাস দেখায়, শিল্পী ব্র্যান্ড হয়ে যাওয়ার পরিণতি এড়াতে পারে না। ভ্যান গখ জীবদ্দশায় বাজারে স্বীকৃতি পাননি, পরে তাঁকে ব্র্যান্ড বানানো হয়েছে। পিকাসো জীবদ্দশাতেই ব্র্যান্ড। বাজার পুরোনো ব্র্যান্ড ভাঙে, নতুন কাউকে খুঁজে নেয়;—এটি একটি দুষ্টচক্র। রোজেনবার্গ এই চক্র অস্বীকার করেননি। তিনি শুধু বলছেন : চক্রের ভেতর থেকেও শিল্পী যেন নিজের ঝুঁকিকে মিথ্যা না বানায়।

The Anxious Object (1965)-এ তিনি লেখেন : The artist’s problem is not how to escape the system, but how not to lie within it. অর্থাৎ, বাজারে থেকেও নিজের কাজকে অবধারিত, নিরাপদ বা নৈতিকভাবে নিশ্চিন্ত বলে উপস্থাপন না করা। রোজেনবার্গ জানতেন ‘অ্যাকশন’ শেষপর্যন্ত Absorption-র দিকে যায়। The Tradition of the New (1959)-এ তাই বলছেন : Every revolution in art sooner or later becomes a style. কিন্তু তাঁর সতর্কতা আরও তীব্র হয় The De-definition of Art (1972)-এ, সেখানে বলছেন : The danger is not that the act will be absorbed, but that it will be rehearsed. বিপদ এই নয় যে কাজ একদিন গ্রাস হবে; বিপদ হলো—শিল্পী যদি আগেই জানে কাজটি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, কীভাবে বাজারে ঢুকবে। তখন কাজ আর ‘অ্যাকশন’ থাকে না, তা হয়ে ওঠে ঝুঁকির অভিনয়।

এ-কারণে জ্যাকসন পোলক রোজেনবার্গের কাছে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন;—যতদিন তিনি জানতেন না কী হবে। কিন্তু পরে পোলক নিজে যখন নিজের স্টাইলের পুনরাবৃত্তিতে আটকে পড়লেন, রোজেনবার্গও তাঁর প্রতি সংশয়ী হয়ে উঠেছিলেন।
. . .

Action Painting: Cow by Andy Warhol; Pierre Doyen, CC BY-NC-ND 2.0; Iamge Source: Collected; Google Image

সংযুক্তি :

রোজেনবার্গের এই চিন্তাগুলো বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে। এখানে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় তিনটি বই ও প্রাসঙ্গিক রচনা উল্লেখ করছি। প্রথমটি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ The American Action Painters, যা The Tradition of the New (1959)-এ অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, The Anxious Object: Art Today and Its Audience (1965)। এই বইয়ে রোজেনবার্গ শিল্প–বাজার–দর্শক সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে তিনি বিস্তৃত করেছেন শিল্প ও শিল্পী নিয়ে তাঁর ভাবনা—শিল্প কীভাবে বাজার, জাদুঘর ও দর্শকের চাপে পড়ে; শিল্পীর কাজ কীভাবে পণ্য ও ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পাশাপাশি Debra Bricker Balken-র Harold Rosenberg: A Critic’s Life (2021) গ্রন্থটি যেখানে অত্যন্ত সংবেদী ও গভীর বিশ্লেষণে রোজেনবার্গকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে, রোজেনবার্গকে কেবল একজন শিল্প-সমালোচক হিসেবে নয়, বরং একজন রাজনৈতিক, নৈতিক ও অস্তিত্বগত চিন্তক হিসেবে পুনর্গঠন করার একটি বিস্তৃত প্রয়াস রয়েছে।
. . .

Books on Harold Rosenberg; Image Source: Collected; Google Image

. . .




How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *