ইনফো-রেজিম

অতীতে বিদ্যমান ক্ষমতাযুগে আমরা আর বসবাস করি না। ক্ষমতা একসময় দেহের নিয়ন্ত্রক ছিল। শ্রমকে শাসন করেছে ক্ষমতা। মানুষকে শৃঙ্খলিত করে উৎপাদন-যন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে তখন। ক্ষমতার সেই কেন্দ্রটি এখন তথ্য, ডেটা, অ্যালগরিদম ও পূর্বানুমানে সরে গেছে। শোষণ-বস্তুর স্বরূপও বদলেছে। দেহের জায়গা নিয়েছে মন;—মানুষের আচরণ, মনোযোগ, পছন্দ, অনুভূতির মতো অদৃশ্য তথ্য-অস্তিত্বরা। যুগান্তকারী এই পরিবর্তন হচ্ছে ইনফরমেশন রেজিমের মূল সত্য।
শৃঙ্খলাভিত্তিক সমাজ মানুষকে তার ছক মেনে চলতে বাধ্য করত;—ইনফরমেশন রেজিম একই মানুষকে প্ররোচিত করছে নিজেকে স্বাধীন ভাবতে। গভীর কৌশলটি মূলত সেখানে নিহিত। কোনো মানুষ যখন ভাবে তার জীবন সে নিজে গড়েপিটে নিচ্ছে,—তার এরকম করে ভাবাটা নিয়ন্ত্রণ আরোপের কাজটিকে সহজ করে তোলে। মানুষটি বুঝতেও পারে না তার পছন্দ, সিদ্ধান্ত ও চাওয়া-পাওয়াগুলো ডেটা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে আগে থেকে অনুমান করে নেওয়া হচ্ছে। আধিপত্য তখন বাহ্যিক না-থেকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেকে উন্মুক্ত করে সমাজের কাছে। নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ায় স্বেচ্ছায়। তার ওপর নজরদারির উপকরণগুলো যেচে সরবরাহ ও অনুমোদন করে বসে।
অতীত যুগগুলোয় ক্ষমতা দৃশ্যমান ছিল;—রাজদণ্ড, শাস্তি, জাঁকজমক ও ভয়ের মঞ্চ মানুষ খোলা চোখে দেখতে পেত। সময়ের পালাবদলে অদৃশ্য নজরদারির ভূমিকায় ক্ষমতা নিজেকে আড়াল করায় জন্ম নিয়েছে প্যানোপটিকন। আড়াল থেকে তাকে নজরে রাখা হয়েছে বলে মানুষ যেখানে টের পায়। এটি আরও সুক্ষ্ম রূপ নিয়েছে। নজরদারিকে এখন আর চাপিয়ে দিতে হয় না,—যোগাযোগের ভেতরে তা লুকিয়ে থাকে। আমরা যত বেশি সংযুক্ত হই, অধিক হারে ততই দৃশ্যমান হতে থাকি। যত বেশি ভাগ করি নিজেকে নানাভাবে, তত বেশি নিয়ন্ত্রিত হই। স্বাধীনতা ও নজরদারি একীভূত হলে আধিপত্য সম্পূর্ণ হয়;—কথাটি এখানে কেন্দ্রীয়।
স্বচ্ছতার ধারণা তাই দ্ব্যর্থক। সবকিছু দৃশ্যমান, সবকিছু তথ্যযোগ্য—এ-যেন মুক্তির প্রতিশ্রুতি। বাস্তবে মানুষ কেবল স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, ক্ষমতা যথারীতি অস্বচ্ছই থেকে যায়। অ্যালগরিদমের ভেতরের অন্ধকার থেকে যায় অদৃশ্য। নামে ‘স্বচ্ছতার সমাজ’ হলেও এটি আসলে ‘স্বচ্ছ কারাগার’! এমন এক কারাগার, বন্দিত্ব যেখানে অনুভূত হয় না।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই শাসনকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দেয়, প্রতিরোধের ভাষা সেখানে হারিয়ে যায়। স্মার্টফোন, স্মার্ট হোম, সোশ্যাল মিডিয়া… এরা সব মানুষের জীবনকে আরও সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য দিচ্ছে মনে হয়, আর সেই পথ ধরে নজরদারি প্রবেশের পথটি সুগম হয় আরও। মানুষ ভোগ করতে করতে, নিজেকে প্রকাশ করতে করতে, ধীরে ধীরে ডেটা-সত্তায় পরিণত হয়। ‘লাইক’ হয়ে ওঠে সম্মতির ভাষা। পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় পণ্য। স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে ক্লিক করার ক্ষমতায় মোড় নেয়। এখানে আর জনগোষ্ঠী নেই, আছে বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল ঝাঁক। মতাদর্শের জায়গা নেয় অ্যালগরিদম; গল্পের জায়গায় গণনা; ভবিষ্যদ্বাণী আসে ডেটা থেকে। নতুন এই সর্বাত্মকতায় কেউ কাউকে জোর করে বিশ্বাস করায় না, বরং স্বেচ্ছায় অংশ নেয় সকলে। শাসন ও নিয়ন্ত্রণ যে-কারণে আরও গভীর, আরও নীরব সেখানে!
সবশেষে যে উপলব্ধিটি উঠে আসে, তা হলো,—মাধ্যম বদলালে ক্ষমতার রূপ বদলায়। ক্ষমতার কেন্দ্র আজ তথ্যের দখলে। তথ্যকে যে নিয়ন্ত্রণ করে, সে এখানে সার্বভৌম। আর আমরা নিজেকে স্বাধীন ভেবে এই শাসনের ভেতরে বসবাস করি বোকার মতো।
. . .
ইনফোক্রেসি

ইনফোক্রেসি শব্দটি একালের অন্যতম চিন্তক বিয়ং-চুল হান তাঁর ভাবনায় ব্যবহার করেছিলেন। গণতন্ত্রের ভেতরে এমন এক শাসন-পরিস্থিতি বিরাজ করে, যেখানে রাজনীতি আর যুক্তি-তর্কের ধীর প্রক্রিয়ায় চলে না;—তথ্যের দ্রুত স্রোত, ভাইরাল বিস্তার, আবেগ-উত্তেজনা ও অ্যালগরিদম কৌশলের গতিবিধি তাকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে। জীবনজগৎ যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে,—আমাদের মনোযোগ, বিচারক্ষমতা ও সামষ্টিক কথোপকথন ভেঙে পড়ছে। তথ্যের সুনামি এত দ্রুত-যে, মানুষ এখন স্থির হয়ে কিছু ভাবতে পারে না। কোনো একটি বিষয় শোনা, বোঝা বা তাকে নিয়ে তর্ক ও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় সেখানে ক্ষয় হয়ে যায়।
বিয়ং-চুল হান দেখাচ্ছেন, গণতন্ত্র একটা সময় বই-সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়েছিল। বই পড়া মানে ধীরে ধীরে যুক্তির ভেতর ঢোকা, দীর্ঘ বাক্য সহ্য করা, জটিল ধারণা বহন করার সক্ষমতা। সেই যুগে জনপরিসর তুলনামূলক যুক্তিবাদী থেকেছে। লিংকন-ডগলাসের মতো দীর্ঘ বিতর্ক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এসে ‘মিডিয়াক্রেসি’ তৈরি করল। রাজনীতি তারপর থেকে বিনোদনের নিয়মে চলছে। দর্শকের ভূমিকা যেখানে নিষ্ক্রিয়। যুক্তির বদলে পারফরম্যান্সের কদর বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনীতি যেন রিয়েলিটি শোতে পালটে গেছে!
ইনফোক্রেসি অবশ্য মিডিয়াক্রেসির থেকেও এক ধাপ এগিয়ে এখানে। মানুষ শুধু দর্শক নয়, তারা সবাই প্রেরক। সবাই পোস্ট করে, শেয়ার দেয়, প্রতিক্রিয়া জানায়, তথ্য ছড়ায়, আর এই অবিরাম যোগাযোগ এক নতুন আসক্তি ও বাধ্যবাধকতায় পরিণত হতে থাকে। ফলে জনপরিসর কেন্দ্রীভূত থাকে না, খণ্ডিত হয়ে যায়; মনোযোগ ছড়িয়ে পড়ে;—আলোচনা আর কোনো ধারাবাহিক বয়ান তৈরি করতে পারে না। তথ্যের ভাইরাল গতি যুক্তি, পরিপ্রেক্ষিত ও ন্যায্যতার জায়গা কমিয়ে দেয়;—সবচেয়ে উত্তেজক, সবচেয়ে সহজে শেয়ারযোগ্য, সবচেয়ে আবেগ-জাগানো জিনিসগুলো সেখানে জয়ী হয়।
এই পরিবেশে নির্বাচনও ‘মঞ্চে ভালো অভিনয়’ নয়, এটি সেখানে ‘তথ্যযুদ্ধ’;—কে বেশি দক্ষভাবে আবহ তৈরি করতে পারে, কে অধিক কার্যকর উপায়ে মানুষকে উসকানি দিতে পারে, কে বেশি দ্রুত ভুল/খণ্ডিত তথ্য ছড়াতে পারে। মাইক্রো টার্গেটিং, সাইকোমেট্রিক প্রোফাইলিং, ডার্ক অ্যাড… এসবের ফলে সবাই একই জনপরিসরে থাকা সত্ত্বেও একই বার্তা পায় না। প্রত্যেকে তারা আলাদা-আলাদা বার্তার বুদবুদে বন্দি থাকে। সমাজের আত্মপর্যবেক্ষণের ক্ষমতা যে-কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ অনেক প্রভাবক-বার্তা প্রকাশ্য বিতর্কে ধরা পড়ে না।
ইনফোক্রেসির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো সত্যকে হাতিয়ার করে লড়াইয়ের পরেও সমস্যা মিটে না। কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা যাচাইয়ের আগে ভুয়া সংবাদ ‘তথ্য’ রূপে প্রচার পেয়ে যায়। জনপরিসরে যেটি অতি দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে বসে। ভাইরাল গতি সত্যকে অপেক্ষা করতে দেয় না। বয়ান ও সত্য ‘তথ্য’ সচারচর ভাইরাল হয় না, অথচ মিম, চটকদার ফটোকার্ড, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও স্লোগান মিলে তৈরি উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গণতন্ত্র ধীরেসুস্থে যে-কাজটা করে, যেমন, সবার সামনে কারণ ও যুক্তি তোলে ধরা,—ইনফোক্রেসির ত্বরিত তথ্যপ্রবাহে তা বারবার ভেঙে পড়ে। গণতন্ত্র এর ফলে ক্রমে এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়, যেখানে উত্তম যুক্তি নয়, বরং সবচেয়ে বুদ্ধিমান অ্যালগরিদম ও কার্যকর তথ্যকৌশল জয়ের শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
. . .
যোগাযোগমূলক ক্রিয়ার অবসান

ডিজিটাল যুগ যে ‘অতি-যোগাযোগ’ আর ‘রিয়েল-টাইম অংশগ্রহণ’-র স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেটা গণতন্ত্রকে গভীর করেনি; বরং গণতন্ত্রের শর্তকে ভেঙে দিয়েছে। পিয়ের লেভির মতো চিন্তকরা ভেবেছিলেন স্মার্টফোন হবে চলমান সংসদ;—সবাই সারাক্ষণ মতামত দেবে, প্রতিক্রিয়া জানাবে, এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে ‘উপস্থিতির গণতন্ত্র’ দিয়ে। বাস্তবে তা ঘটেনি। ডিজিটাল ঝাঁক কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সমষ্টি নয়;—তারা বেশি করে অনুসারী, ভোক্তা, আর অ্যালগরিদম চালিত আচরণে প্রশিক্ষিত একদল মানুষ মাত্র। স্মার্টফোন সংসদ নয়;—এটা অধীনস্থ করার যন্ত্র; যেহেতু, এটা ব্যক্তিগত জীবনকে ক্রমাগত প্রদর্শনকামিতায় ঠেলে দেয়। জনপরিসরকে যা আরও নাজুক করে ও ভেঙে দেয়।
ইন্টারনেটে এমনভাবে তথ্য ছড়ায়-যে, তা আর ‘জনপরিসর’ হয়ে উঠতে পারে না। তথ্য মূলত ব্যক্তিগত পরিসরে তৈরি হয় ও ব্যক্তিগত পরিসরকে লক্ষ্যবস্তু ধরে ছড়ানো হয়। সবার সামনে কোনো একটি বিষয় নিয়ে যুক্তি-তর্কের যে মঞ্চ দরকারি, সেটি তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কমিউনিটিকে দেখতে কমিউনিটির মতো দেখায়, কিন্তু আসলে তা কমিউনিটি নয়। এটি এখানে পণ্যায়িত;—সমাজমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুসারী মিলে রাজনৈতিক জনপরিসর তৈরি করে না, এর ফলে রাজনৈতিকভাবে দরকারি ক্ষমতার বিকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিয়ং-চুল হানের ভাবনা ও পর্যবেক্ষণে ‘যোগাযোগমূলক ক্রিয়া’ কেন সংকটে পড়ে তার কারণগুলো আমরা পাই। হানা আরেন্ট ও হাবারমাসের মতে, গণতান্ত্রিক মতামত গঠন মানে অন্যের অবস্থানকে মনে উপস্থিত করা, অন্যের সম্ভাব্য প্রশ্ন ও আপত্তিকে মাথায় রেখে কথা বলা, এমন এক বয়ানে ঢোকা যেখানে আমার দাবিকে অন্যরা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অর্থাৎ, বয়ান হলো এদিক-ওদিক চলার গতি;—অপরের কণ্ঠে আমি নিজ বিশ্বাস থেকে একটু সরে আসি, শুনি ও সংশোধন করি। আজ এই ‘অপর’ ক্রমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজের মতো মানুষ, নিজের মতো খবর, নিজের মতো ভাষা এই আত্ম-উল্লেখক বুদবুদে ঢুকে পড়েছি। বিতর্কের জায়গা নিয়েছে ইকো-চেম্বার;—যেখানে শোনা যায় কেবল নিজের কণ্ঠ। গণতন্ত্রের সংকট তাই প্রথমত ‘শোনার সংকট’।
ফিল্টার বাবল বা অ্যালগরিদমিক ব্যক্তিকরণ এর একটা কারণ হতে পারে বলে হান মনে করেন। প্রকৃত সমস্যা যদিও আরও গভীরে নিহিত;—সমাজ নিজে পরমাণুকৃত ও নার্সিসিস্টিক হয়ে উঠেছে; যেখানে সহমর্মিতার ক্ষয় ঘটে চলেছে, আর মানুষ মতামতকে পরিচয়ের সঙ্গে গুলিয়ে বসে আছে। ভিন্নমত মানে যুক্তি-তর্ক নয়, এটা বরং পরিচয়ের ওপর আঘাত হিসেব গণ্য করে অনেকে। কাউকে রাজি করানো যায় না;—উলটো সবাই আঁকড়ে থাকে নিজের মত।
হানের মতে জীবনজগৎ (একটা যৌথ পটভূমি, মূল্যবোধ ও স্বতঃসিদ্ধতা) ভেঙে পড়ায় মানুষ পরিচয়ের নোঙর খুঁজছে, আর ডিজিটাল ‘উপজাতি’ তৈরি হচ্ছে। সেখানে তথ্য জ্ঞানের উৎস নয়, ওটা এখন পরিচয়ের উৎস। মতামত আর বিতর্কযোগ্য দাবি নয়, ওটা হলো পবিত্র স্বীকারোক্তি। যুক্তির বদলে বিশ্বাস, সংলাপের বদলে শত্রুতা, বয়ানের বদলে পরিচয়যুদ্ধ। ফলাফল,—আমরা একে অপরকে শুনি না, আর শোনা ছাড়া কোনো ‘আমরা’ও তৈরি হয় না। এটা হলো যোগাযোগমূলক ক্রিয়ার অবসান।
. . .
ডিজিটাল যুক্তিবোধ

ডেটাবাদীরা (ডেটা-উপাসক) মনে করে আধুনিক সমাজ এত জটিল, আর তথ্য এত বিপুল, মানুষের এখন ‘আলোচনা করে বোঝাপড়া’ করার ক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। আরেন্ট-হাবারমাসের যে-বিতর্কমূলক জনপরিসর, যেখানে মানুষ যুক্তি দেয়, প্রশ্ন তোলে, পরস্পরের সামনে বৈধতার দাবি রাখে,—এটি নাকি আজ অচল। এমনকি হাবারমাস নিজে স্বীকার করছেন : ডিজিটাল, বিকেন্দ্রীভূত ইন্টারনেটে কীভাবে এমন এক জনপরিসর থাকবে, যা পুরো জনগোষ্ঠীকে একসাথে অন্তর্ভুক্ত করবে,—এই বিষয়ে তিনি স্বয়ং নিশ্চিত নন। এই শূন্যতায় ডেটাবাদীর যুক্তি হলো, বয়ানের জায়গা নেবে ডেটা, আর জনপরিসরের কাজ করবে বিগ ডেটা ও এআই। মানুষ ভালো শ্রোতা নয়;—এআই নাকি আরও ভালো শ্রোতা, কারণ সে কথা শোনে না, সে কেবল তথ্য ‘গণনা’ করে।
‘যোগাযোগমূলক যুক্তিবোধ’ ও ‘ডিজিটাল যুক্তিবোধ’-এর তফাতটি বিয়ং-চুল হান এভাবে ধরিয়ে দিয়েছেন। যোগাযোগমূলক যুক্তিবোধ হচ্ছে কারণ ব্যাখ্যা করে ওঠা, ভুল স্বীকার করা ও এর থেকে শেখা;—এবং যুক্তি দিয়ে নিজেকে সংশোধনও করা। বয়ান এখানে ধীর কিন্তু মানবিক শিক্ষাপ্রক্রিয়া রূপে কাজ করে। ডিজিটাল যুক্তিবোধে যুক্তিকে ছাপিয়ে অ্যালগরিদম মুখ্য। শেখা মানে ‘অপ্টিমাইজেশন’। মেশিন লার্নিং ভুল থেকে শেখার মতো করে নিজেকে ঠিক করে নেয়, তাই মনে হয় এটি যুক্তিকে অনুকরণ করছে। ডেটাবাদীর চোখে বয়ান হচ্ছে ধীর ও অদক্ষ এক তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ, আর মতভেদ ও তর্ক-বিতর্ক নাকি কম তথ্যের ফলে হওয়া এক ধরনের ‘শব্দ’!
উক্ত বিশ্বাস থেকে তারা এক ‘ঐশ্বরিক দৃষ্টি’র স্বপ্ন দেখে। সমাজে সবকিছু যদি ডেটায় পরিণত হয়, তাহলে যুদ্ধ, মহামারি, অপরাধ, সংকটের সবকিছু নাকি আগে থেকে ধরা ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে! ‘সবার মঙ্গল’ হিসেব একে তখন ব্যবহার করা সহজতর হবে। একে সম্ভব করে তোলার প্রশ্নে গোপনীয়তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগকে তারা বাধা রূপে গণ্য করে। তাদের আদর্শ সমাজ ধীরে ধীরে এই ছবি সামনে আনে, যেখানে রাজনীতি কমবে, দল-মতাদর্শ গুরুত্ব হারাবে, আর ডেটা-ভিত্তিক সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে বিশেষজ্ঞ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীর। গণতন্ত্রের জায়গায় এটি হলো উত্তর-গণতান্ত্রিক ইনফোক্রেসির স্বরূপ!
হানের বক্তব্য অনুসরণ করে আমরা রুশোয় পৌঁছে যাই। ‘সাধারণ ইচ্ছা’কে তিনি কথাবার্তার ফল নয়, বরং এক ধরনের গাণিতিক ফল রূপে কল্পনা করতে উতলা ছিলেন। রুশো বলেছিলেন,—সাধারণ ইচ্ছাকে বিশুদ্ধ রাখতে হলে নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ কমিয়ে আনা উচিত। ডেটাবাদীরা নতুন পরিভাষায় একই কথা বলছেন। তারা বলছেন : যত বেশি ডেটা, তত নিখুঁতভাবে ‘সকলের মঙ্গল’ গণনা করা যাবে। কেননা, বয়ান নাকি বিকৃতি নিয়ে আসে।
এই পথে সবচেয়ে বড় মোচড় হলো ডেটাবাদীরা স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত ব্যক্তির ধারণা বাতিল করতে চায়। তাদের আচরণবাদী দৃষ্টিতে মানুষ পূর্বানুমেয়। পর্যাপ্ত ডেটা থাকলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই ‘মানুষকে মানুষ ভাবা’, তার স্বাধীন ইচ্ছা ও নিজ জীবনের লেখক হওয়ার মতো বাসনাগুলোকে তারা পুরোনো যুগের ভূত হিসেবে দেখে। সমাজ তাদের কাছে এক জীবের মতো, সেখানে বৈধতার দাবি নেই, যুক্তি-তর্ক নেই, কেবল আছে কার্যকারিতা, তথ্যের প্রবাহ, এবং নিয়ন্ত্রণ ও শর্তায়ন। ফলে বিতর্কমূলক জনপরিসর প্রতিস্থাপিত হয় এআই-চালিত ডেটা বিশ্লেষণে;—এটি শেষপর্যন্ত গণতন্ত্রকে গুটিয়ে দেয়।
বিয়ং-চুল হান জুবফের মতো সমালোচকদের কণ্ঠ ধার করে বলেন, গণতন্ত্রকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে ব্যক্তির নিজ জীবনের সার্বভৌমত্ব, নিজ অভিজ্ঞতার লেখক হওয়ার অধিকার ও সেই জনপরিসর, যেখানে ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করা যায়;—এর সবটাই রক্ষা করতে হবে। ডেটাবাদী দৃষ্টি তা নয়। তাদের দৃষ্টিতে মানুষ ‘বালিতে আঁকা মুখ’। ডেটার ঢেউয়ে মুছে যাওয়ার পথে যে-মানুষটি গলে যায় বিশাল ডেটাসেটে।
. . .
সত্যের সংকট

আমাদের সময়ের বড়ো বিপদ ‘ঈশ্বর মৃত’ ধরনের পুরোনো নৈরাশ্যবাদ নয়। নতুন নৈরাশ্যবাদ জন্মায়, যখন আমরা সত্যের উপর বিশ্বাস হারাই। ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব… এসব শুধু আলাদা আলাদা মিথ্যা নয়। এগুলো বাস্তবতার ফ্যাক্টিসিটি, মানে ‘এটা সত্যিই ঘটেছে/আছে’… এই অনুভূত ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। ফলে তথ্যের চলাচল বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়;—এক ধরনের অতিবাস্তব, ডি-ফ্যাক্টিসাইজড জগৎ তৈরি হয়। তথ্যগত সত্য হারানো মানে শেষ বিচারে আমরা-যে যৌথজগৎ ভাগ করে কাজ করি,—তাকে হারানো;—যেখানে একই ভাষা, একই মানে, একই ভিত্তির সবখানি ভেঙে যায়।
বিয়ং-চুল হান তাই নিটশেকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন,—সত্যকে নিটশে ধ্বংস করতে চাননি। মানুষকে একসাথে রাখতে ও সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ’ ঠেকাতে সামাজিকভাবে সত্য কেমন করে তৈরি হয় তা কেবল দেখাতে চেয়েছিলেন। সত্য একটি সামাজিক শৃঙ্খলা ও বাধ্যতামূলক অর্থবোধ;—সমাজকে তা একত্রে রাখে। সমস্যা হলো সত্যকে মিথ্যা বলে খারিজ করার অবস্থায় আমরা নেই, কেননা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য গলে যাচ্ছে! ‘বুলশিট’ (ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ধারণা) এখানে ভয়ংকর। ধারণাটি সত্যের বিরোধিতায় না গিয়ে এই ব্যাপারে উদাসীন মনোভাব পোষণ করে। হানের মতে আজকের সংকট অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং তথ্যের উপর বিশ্বাস ভেঙে গেছে, আর সংকট সেখানেই নিহিত। মতামত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তথ্যগত সত্যকে সম্মান না করলে মতামতের স্বাধীনতা প্রহসনে পরিণত হয়।
পুরোনো সর্বাত্মকতাবাদে (হিটলার/অরওয়েল) মহামিথ্যা এমনকি সত্যের কর্তৃত্বকে ব্যবহার করেছে। ‘সত্য’ নামে এক কল্প-বাস্তবতাকে সেখানে বসানো হতো মিনিস্ট্রি অব ট্রুথের মতো যন্ত্র দিয়ে। সেখানেও সত্যের গুরুত্ব ছিল, যদিও তা ক্ষমতার হাতে বন্দি সত্যে রূপ নিয়েছিল। আজকের পোস্ট-ফ্যাকচুয়াল যুগবিশ্বে সত্যের ‘কর্তৃত্ব’ ফিকে হয়ে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ধাঁচের ভুয়া দাবি এখন আর পুরোনো সর্বাত্মকতাবাদের মতো বড়ো বয়ান গড়ে তোলে না। খণ্ড খণ্ড, সুবিধামতো, আদর্শহীন তথ্যশাসনকে সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সবটাই পলকা ও মিথ্যে ঠাসা।
মনে রাখতে হয়, এ-যুগে তথ্য যত বাড়ে, সন্দেহও বাড়ে সমানতালে। ‘এভাবে নাও হতে পারত’ অনুভূতিটি গভীর হয়। তথ্যসমাজ হয়ে ওঠে অবিশ্বাসের সমাজ। অনেক তথ্য, কিন্তু দিশা নেই। ফ্যাক্ট চেকিং তথ্যকে ঠিক করতে পারে, কিন্তু ‘সত্য’ তৈরি করতে পারে না। কেননা, সত্য নিছক সঠিক তথ্য নয়, তা হলো একধরনের প্রতিশ্রুতি এবং বয়ানগত অর্থ ও স্থায়িত্ব।
হাবারমাস আর ফুকোকে নিজের সত্য-ভাবনায় ব্যবহার করেছিলেন বিয়ং-চুল হান। হাবারমাসের কাছে সত্য মানে হলো যুক্তিতর্কের ভেতর দিয়ে যুক্তিসংগত ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি, যা সমাজকে সংহত করে। সত্যের সংকট মানে সমাজের সংকট। ভেতরের ঐক্য ভেঙে গেলে সমাজ তো বাহ্যিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনে আটকে থাকে। এই সমাজে সবকিছু পণ্য হয়ে ওঠে, আর ‘ওয়্যার’ সত্যকে করে প্রতিস্থাপন। ফুকোর parrēsia ওদিকে ছিল সত্য বলার সাহস ও গণতন্ত্রের প্রাণ। isegoria (কথা বলার অধিকার) থাকলেই হবে না, সত্য বলার নৈতিক সাহস না থাকলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ইনফোক্রেসিতে গড়ায়। ‘যা খুশি বলা’র তোড়ে তা বিকৃত হয়ে গেছে। নিজের সুবিধামতো কথা বলা মানে স্বাধীনতার নাম করে নির্লজ্জতার উচ্ছ্বাস। সমাজকে তা ঐক্যহীন করে।
বিয়ং-চুল হানের ভাবনা যদি অনুসরণ করি, তাহলে তাঁর কথামতো আমরা প্লেটোর গুহার অনুরূপ এক ‘ডিজিটাল গুহা’য় বন্দি হয়ে আছি। পৌরাণিক ছায়া নয়, তথ্যের গুঞ্জন সেখানে আমাদেরকে বেঁধে রেখেছে। সত্য আলো দেয়, তা কখনো গুঞ্জন তোলে না। তথ্যের কোলাহলে এই সত্য-আলো আর দেখার উপায় থাকে না। সত্যের সময় স্থায়ী, তথ্যের সময় ক্ষণস্থায়ী। ডিজিটাল যুগের সমাজে তাৎক্ষণিকতা স্থায়িত্বের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে। বিয়ং-চুল হানের সত্যভাবনা যে-কারণে মনে ভয়ানক প্রতিধ্বনি তোলে। তাঁর মতো আমরাও ভাবতে বাধ্য হই,—সত্যের যুগ মনে হয় খুব ছোট ছিল! তথ্যের শাসন যে-কারণে সত্যের শাসনকে প্রতিস্থাপন করতে পেরেছে অনায়াসে! এমন এক নিরাশাবাদে আমরা আছি, নতুন এক নিহিলিজমে বসবাস করছি এখন, যেখানে সত্যের প্রয়োজন গৌণ হয়ে পড়ছে!
. . .

. . .
… লেখকের বিয়ং-চুল হান ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য রচনা পাঠ করতে এই লিংকে চাপুন …
. . .

লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .


