নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : ‘মনু’ নিয়ে ‘মনের গোলযোগ’

Reading time 12 minute
5
(7)
@thirdlanespace.com

. . .

প্রাত্যহিক—প্রাসঙ্গিক

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে ঋগ্বেদের এক মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ‘মনু’ নীতিশাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন, যা ‘মনুসংহিতা’ নামে অভিহিত। মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতি বৈদিক সনাতন ধর্মাবলম্বী অনুসারীদের অনুশাসনে ব্যবহৃত মুখ্য এক স্মৃতিগ্রন্থ। মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতি সনাতন ধর্মের প্রাচীনতম ও প্রধানতম স্মৃতিশাস্ত্র বা আইনগ্রন্থ। বেদের পর হিন্দু সমাজে এর প্রভাব ও প্রামাণ্যতা সবচেয়ে বেশি। প্রাচীন ভারতীয় সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, ধর্মাচার এবং নৈতিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে এই গ্রন্থের মাহাত্ম্য অপরিসীম।

মনুসংহিতা-র মতে ধর্ম হচ্ছে কতগুলো গুণের সমষ্টি। উক্ত হয়েছে :

ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ। ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম। (মনুসংহিতা, ৬/৯২)

অর্থাৎ সহিষ্ণুতা (ধৈর্য), ক্ষমা (ক্ষমাশীলতা), আত্ম-সংযম, চুরি না করা (পরস্ব অপহরণ না করা), শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, শুদ্ধবৃদ্ধি (প্রজ্ঞা), বিদ্যা (জ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ (ক্রোধহীনতা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ। এই দশটি লক্ষণের মধ্যে ধর্মের স্বরূপ প্রকাশ পায়। প্রায় ৪০০০ বছর পরেও আমরা কী এসব সদগুণাবলী অর্জন/ আয়ত্ত/ চর্চা করতে পেরেছি— পারছি!!
. . .

‘মনু ও মনুসংহিতা’ : মনের ‘গোল’ আজো মিটল না!

‘মনু’ ও ‘মনুসংহিতা’র কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ সুমনদা। শরিয়তনিষ্ঠ ইসলাম ধর্ম পালনে ফিকাহশাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রভাবের কথা আমরা জানি। হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের জীবনে ‘মনুসংহিতা’র গুরুত্বও অপরিসীম। ধর্মবিধি পালনের সামাজিক অনুশাসন রূপে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিস্ট জন্মের দুশো থেকে তিনশো বছর আগে কোড অব কন্ডাক্ট রূপে সংহিতাকে সামনে আনা হয়।

‘মনুসংহিতা’ চার হাজার বছর আগে প্রণীত বলে যে-তথ্যটি আপনি দিয়েছেন, তা মনে হচ্ছে সঠিক নয়। ‘মনু’ নামটি প্রাগৈতিহাসিক, কিন্তু ‘মনুসংহিতা’ বেশি হলে আড়াই হাজার বছর আগে প্রণীত বা একে ওই সময়টায় সমাজে মান্যতা দানের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক কালপর্বে পা দিয়ে সংহিতা ও এর রূপকার বলে কথিত ‘মনু’কে ঘিরে বিতর্কের ঝড় শুরু হয়, এবং এখনো তা সমানে অব্যাহত রয়েছে।

ইসলামি ফিকাহ বা আইনশাস্ত্রের সঙ্গে ‘মনুসংহিতা’র এদিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে। চার মাজহাবের প্রণেতা ইমামগণ মূলত কোরান ও কতকক্ষেত্রে হাদিস সংকলনকে উৎস মেনে ইসলামি জীবনাচার ও সামাজিক অনুশাসনকে সুগঠিত রূপ দিয়েছিলেন। হযরত মোহাম্মদের জীবদ্দশায় যদিও হাদিস বলে আলাদা কিছুর চল ছিল না। ধর্মাচার ও সমাজ-অনুশাসনে কোরানকে একমাত্র ‘সহি’ ধরে করণীয় বাতলে গেছেন তিনি।

নবি দেহ রাখার পরবর্তী দেড়শো থেকে দুশো বছর কোরান অনুসারে ধর্মীয় বিধি-বিধান ও সমাজশাসন অব্যাহত থেকেছে। দুশো বছর পার হওয়ার কালপর্বে নবির জীবনী বা সিরাহ ও হাদিসশাস্ত্রকে সামনে আনা হয়। ইসলামি জীবনবিধান ও সামাজিক অনুশাসনের ছবি তারপর থেকে অতীতের ন্যায় অবিকল থাকেনি।

ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলমানের ব্যক্তিগত-সামাজিক জীবনধারা রাজনৈতিক ও একইসঙ্গে বিতর্কিত এক কাঠামোয় বন্দি হয়ে পড়ে। আধুনিক যুগবাস্তবতার সঙ্গে বেমানান, খাপছাড়া ও উদ্ভট আইনি কাঠামোয় মুসলমানের দেহমন আজো নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হয়ে চলেছে। ‘মনুসংহিতা’ এই পর্যায়ের না-হলেও, হিন্দু ধর্ম মানছেন এমন ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচার ও আইনি বাধ্যবাধকতায় এর প্রভাব বিতর্কিত। আপনার পরিচিতমূলক লেখা এই দিকটি মাথায় রেখে অগ্রসর হলে ভালো হতো মনে করি।

ধার্মিক হিন্দু যে-‘মনু ও মনুসংহিতা’কে ভক্তিভরে প্রণাম জানায়, সমীহ ও শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে, সেখানে একাধিক ব্লারিলাইন বা ঝাপসারেখা আছে ভাই। সেগুলো বাদ দিয়ে কিছু বলা মানে হলো আপনি বিবচেক নন। মুসলমানের ‘উম্মাহ’ কেন্দ্রিক জাতীয়তার মতো হিন্দুয়ানি এক জাতীয়তার বেদিতে নিজেকে সচেতনে অথবা অজ্ঞাতসারে বলি দিতে উতলা হয়ে আছেন। আশা করি আমার কথায় কিছু মনে করবেন না ও বিষয়টি ভেবে দেখবেন পুনরায়।

নতমস্তকে স্বীকার করছি,—‘মনুসংহিতা’র বাংলা ভাষান্তর আমি নানাসময় পাঠ করার চেষ্টা করেছি। নিজের অক্ষমতা-দোষে দম ধরে রাখতে পারিনি। সংহিতাটি অধমের যৎসামান্য পাঠতালিকায় আজো অর্ধপঠিত রয়ে গেছে! হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও জীবনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো সম্পর্কে তথাপি যেটুুকুন জেনেছি, নিজের সীমিত ক্ষমতায় বোঝার চেষ্টা করেছি ফিরে-ফিরে, না-বলে পারছি না,—জনাব মনু প্রণীত সংহিতার ভাওগতিক আমার কাছে সুবিধের ঠেকেনি।

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর কথা তুলতে হয় এইবেলা। ‘মনুসংহিতা’র ওপর সহজাত ভঙ্গিতে তিনি অতীতে লিখেছেন। অনলাইনের যুগে এর মাহাত্ম্য ও প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করছেন চমৎকার। আস্থা ও প্রীতি আছে বলে তাঁর ‘মনু বিষয়ক’ লেখাপত্র অতীতে পাঠ করেছি বা এখন একই আলাপ শুনে বোঝার চেষ্টা করি কমবেশি।

‘মনু ও মনুসংহিতা’কে শ্রদ্ধেয় নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী যে-দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন, বিতর্কের জায়গাগুলো কেন যথার্থ নয় তা বোঝানোর চেষ্টায় ঘাটতি রাখেন না কোনো,—এর সঙ্গে অধমের মনোবিরোধ নেই। ‘মনু ও মনুসংহিতা’কে তিনি একালের চোখ দিয়ে নয়, বরং সেকালের সমাজদেহে বিদ্যমান যুগ-সময় ও পরিপার্শ্বে ফেলে ব্যাখ্যা করে থাকেন। যৌক্তিক কারণে তাঁর ব্যাখ্যা অন্যদিকগুলো আমলে নিতে মনেক প্ররোচিত করে। একে এখন যথার্থ মানতে কারো আপত্তি থাকার কথাও নয়। আমি তাঁর বয়ানকে তা-সত্ত্বেও দুটি কারণে নিতে পারিনি :

প্রথমত, বেদ-উপনিষদ ও পুরাণে বর্ণিত ‘মনু’র সঙ্গে ‘মনুসংহিতা’য় নির্দিষ্ট ‘মনু’র একখানা গোলযোগ রয়েছে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীকে সব জেনেবুঝে তা পাশ কাটিয়ে যেতে দেখেছি! দ্বিতীয়ত, কোনো বিধান যদি একালে প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণীয় বলে ভাবা হয়,—সেক্ষেত্রে এর যুগ-প্রভাব ও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াকে আমি-আপনি বিবেচনায় নিতে বাধ্য। প্রশ্ন উঠছে দেখে অতীত কালপর্বে দাঁড়িয়ে এর যৌক্তিকতা খোঁজা ও জাস্টিফাই করার পন্থা স্ববিরোধী হয়ে দাঁড়ায় শেষতক।

‘মনুসংহিতা’ মূলত স্মৃতিশাস্ত্র। বেদ-উপনিষদের মতো শ্রুতি বা অপরিবর্তীয় কোনো টেক্সট নয়। সংহিতার অস্বস্তিকর, বিতর্কিত ও যুগস্বভাবে আপত্তিকর বিধি-বিধানগুলো ছেটে ফেলা কিংবা সংশোধন হিন্দু আচার্যদের জন্য কঠিন হওয়ার কথা ছিল না। তার বদলে সংহিতাকে হাদিসশাস্ত্রের মতো প্রশ্নাতীত ‘উৎস’ বলে গণ্য করা, এবং গাড্ডায় পড়লে ‘হাসান অথবা জইফ’ দাগিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা কি যৌক্তিক? স্মৃতিশাস্ত্রকে ব্যাখ্যার নাম করে জাস্টিফাই করার চেয়ে বরং সংশোধন যুগের রীতি হওয়া উচিত ছিল।

শ্রদ্ধেয় নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর মতো পুরাণ বিশারদের একে জাস্টিফাই করার বয়ান কাজেই আমার পোষায়নি। দলিত সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা ও ভারতের সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকরের মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আম্বেদকর এই সংহিতাকে ‘দমনমূলক’ নাম দিয়ে ঝেড়েছিলেন বটে! চারখানা বেদ ও এর পরিশিষ্ট উপনিষদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দার্শনিকতার শক্তি ও মাহাত্ম্যের সঙ্গে ‘দমনমূলক’ কোনোকিছু একদম মাননসই নয়।

সংহিতা নিয়ে হিন্দু সমাজের ভাবার প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে বলে মনে করি। কারণগুলো অকপটে বলার চেষ্টা এখানে থাকবে। ধৈর্য ধরে পাঠ করবেন আশা করি। আর হ্যাঁ, ভুলত্রুটি থাকতে পারে কথায়। যদি থাকে, তাহলে ধরিয়ে দেবেন। নিজেকে শুধরে নিতে ও ফিরে ভাবতে কোনো আপত্তি থাকবে না। ভারতবর্ষে বৈদিক সাহিত্যকে কেন্দ্র করে বিবর্তিত হিন্দু ধর্ম অতিব বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক জীবনধারার স্মারক, এবং আমার মতো অনেকেই তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন বৈকি।

Nrisingha Prasad Bhaduri on Manu and Women Freedom; Source: Nrisingha Prasad Bhaduri YTC

প্রথমত, মনু নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন। একে আপনি গোত্রধারায় অধিষ্ঠিত পদবী ধরতে পারেন। মহাভারত-রচয়িতা বেদব্যাস যেমন একক ব্যক্তি কি-না তা নিয়ে বিস্তুর মতভেদ রয়েছে। বেদব্যাস মানে হলো যিনি বেদকে ভেদ ও খণ্ডনের জ্ঞান রাখেন। অর্থাৎ বেদের আদ্যোপান্ত তাঁর অধিগত ও এর ব্যাখ্যায় সক্ষম। বেদব্যাসকে পরবর্তীতে দেবতায়ন করা হলো! তাঁর বংশধারাকে খোদ নারায়ণ/ ভগবানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন পুরাণকার। এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক তাৎপর্য এখানে টানার প্রয়োজন দেখি না। আমাদের জন্য সে-আলোচনা আপাতত প্রাসঙ্গিক নয়।

দেবতায়ন হচ্ছে বেদব্যাসের মতো যুগন্ধর চরিত্রের মিথকরণ। মিথটি নিঃসন্দেহে মনোরম। বাস্তব ইতিহাসে ফিরলে একই চরিত্র হয়তো এমন কোনো ভারতীয় স্কুল বা ঘরানার কাহিনি শোনাবে, যাঁরা বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও মহাভারত-র মতো মহান রচনাকে কাল-পরম্পরায় মনোহর ও যুগ-প্রাসঙ্গিক ভাষা দিয়ে গেছেন। এসব নিয়ে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ বিস্তারিত লিখেছেন একটা সময়। স্মৃতি আশা করি বিভ্রান্ত করছে না,— মনীষাদীপ্ত সুকুমারী ভট্টাচার্যের বৈদিক কালপর্ব বিষয়ক রচনারোমিলা থাপারের মতো ইতিহাসবিদের লেখাপত্রে এসব নিয়ে যৌক্তিক মন্তব্য সহজে চোখে পড়বে। একালে যেমন আনন্দ নীলাকান্তনদেবদত্ত পট্টনায়েকর মতো মিথ বিশারদরা ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্য ও বৈদিক কালপর্ব নিয়ে লিখেছেন ও নিয়মিত বলছেন অনলাইনে। জয়ন্তানুজ-সহ এঁনাদের বক্তব্য ভেবে দেখতে পারেন।

মনুও সেরকম। তাৎক্ষণিক গুগলিং অথবা যে-কোনো এআইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ চ্যাট করলেও দেখবেন, তারা আপনাকে উইথ রেফারেন্স একটা সামারি ধরিয়ে দিচ্ছে। আমি যেমন মাত্র বের করালাম। সামারি কী বলছে তা চট করে দেখে নেওয়া যাক :

প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রের কালগণনা অনুসারে আমরা ১৪ জন ‘মনু’র খবর পাচ্ছি। পুরাণ সাহিত্য অনুসারে পৌরাণিক ভগবান ব্রহ্মা (ইনি আবার বেদের অন্ত বা পরিশিষ্ট উপনিষদ ও পরবর্তী দার্শনিক ঘরানায় বর্ণিত ‘ব্রহ্ম’ নন সঠিক;—তাঁকে আমরা বৈদিক ‘ব্রহ্ম’র ডামি ভার্সন ভাবতে পারি।) এক দিন বা ‘কল্প’-এ ১৪ জন মনু পর্যায়ক্রমে দেখা দিয়েছেন। প্রত্যেক ‘মনু’র পিরিয়ডকে বলা হচ্ছে ‘মন্বন্তর’। ১ মন্বন্তর মানে ৭১টি মহাযুগ। বর্তমান ক্যালেন্ডারের হিসাবে ৩০ কোটি মানব বছরের কিছু বেশি হতে পারে।

প্রথম ‘মনু’ হলেন ‘স্বায়ম্ভুব মনু’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষের পাতা যদি কষ্ট করে উল্টাই, এঁনার পরিচয় সংক্ষেপে দেওয়া আছে দেখব। বঙ্গীয় শব্দকোষ জানাচ্ছেন :

ইনি ‘ব্রহ্মা’র দেহ হইতে উদ্ভূত, এই হেতু নাম ‘স্বায়ম্ভুব মনু। ইঁহার পত্নী শতরূপা, পুত্র প্রিয়বত ও উত্তানপাদ, কন্যা আকুতি, দেবহুতি ও প্রসূতি। ইঁহার পুত্র-কন্যাগণ হইতে মনুষ্য জাতির বিস্তার হেতু তাহারা মানব। মনুসংহিতা মতে, হিরণ্যগর্ভ হইতে বিরাট, বিরাট হইতে মনু উৎপন্ন।

মনু মরীচি-প্রভৃতি, দশপ্রজাপতির স্রষ্টা। মরীচি-প্রভৃতি হইতে অঙ্ক সপ্ত মনু, অন্য দেবগণ, যক্ষপিশাচাদি, নাগাদি, পক্ষিগণ, পিতৃগণ উৎপন্ন হয়। ইনি ব্রহ্মার নিকটে স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া মরীচি-প্রভৃতিকে অধ্যয়ন করান। ইহা ‘মানবধর্ম্মশাস্ত্র’।

Manu and Saptarishi (1890); Image Source: Collected; Wikimedia

‘মনু’ বিষয়ে হরিচরণ বাকি যা-তথ্য দিয়েছেন তাঁর শব্দকোষে, সেগুলো মূলত ‘মনুসংহিতা’ ও প্রচলিত সূত্র থেকে নিয়েছেন। উল্লেখ না-করলেও চলছে আপাতত। তবে হ্যাঁ, বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ চৌদ্দ মনুর নাম তিনি সংকলিত করেছেন। আমরা তা একঝলক দেখে নিতে পারি :

১. স্বায়ম্ভুব মনু (আদি মনু); ২. স্বারোচিষ মনু; ৩. উত্তম মনু; ৪. তামস মনু; ৫. রৈবত মনু; ৬. চাক্ষুষ মনু; ৭. বৈবস্বত মনু (বর্তমান মনু;—আমরা এঁর যুগে বাস করছি); ৮. সাবর্ণি মনু (ভবিষ্যৎ মনু); ৯. দক্ষ-সাবর্ণি মনু; ১০. ব্রহ্ম-সাবর্ণি মনু; ১১. ধর্ম-সাবর্ণি মনু; ১২. রুদ্র-সাবর্ণি মনু; ১৩. দেব-সাবর্ণি বা রৌচ্য মনু; এবং ১৪. ইন্দ্র-সাবর্ণি বা ভৌত্য মনু।

পৌরাণিক সূত্রে পাওয়া ১৪ জনের ক্রনোলজিটা এখানে ইন্টারেস্টিং। তিনটি মার্কার পাচ্ছি এর থেকে :

মার্কার-১ : প্রথম মনু ‘স্বায়ম্ভুব’ হলেন মানবজাতির আদিপিতা ওরফে আদম। সৃষ্টির সূচনালগ্নের কোনো এক পর্যায়ে তিনি জন্ম নিচ্ছেন।

মার্কার-২ : সপ্তম মনু ‘বৈবস্বত’ হলেন মরণশীল জগতের সংরক্ষক। তাঁর কালপর্ব এখনো চলছে।

মার্কার-৩ : বৈবস্বত মনুর পর আরো সাতজন থাকছেন। এঁনাদের আবির্ভাব এখনো ম্যালা দূরের ঘটনা! ‘কল্প’ বছরের হিসাবে আমরা কলিযুগে রয়েছি। সাকুল্যে ৫ হাজার বছর পেরিয়েছে মাত্র!

এলা বোঝেন, মানবজাতি এই পাঁচ হাজার বছরে যতো সুকাম ও আকাম করেছে, সেগুলা কেন বাতাসা! বৈবস্বত এখনো সুরক্ষার জন্য পাহারায় জেগে আছেন। মানব-সংকটের মহালগ্নে ত্রাতা রূপে এঁনার আবির্ভাব ঘটেছিল।

সপ্তম ‘মনু’ বৈবস্বত মনু এই ক্রনোলজিতে নানা কারণে সিগনিফিকেন্ট। তাঁর সঙ্গে মহাপ্লাবনের কাহিনিটি জড়িত। সেই মহাপ্লাবন, যার বিবরণ আমরা ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য অবতীর্ণ তাওরাত-এ গেলে পাবো। বাইবেলকোরান-এ গেলেও পাচ্ছি তা। কোরানে মহাপ্লাবনর বিবরণ খুব ভালোভাবে সংকলিত। শুধু তাই নয়, ধরার বিভিন্ন প্রান্তে সৃষ্ট লোকপুরাণে মহাপ্লাবনের উল্লেখ পাওয়া যায়। কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত পূর্ণাঙ্গ অথবা রাজশেখর বসুর সারানুবাদে সংকলিত ‘মহাভারত’ যদি খোলেন, শুরুর দিকটায় এর বিবরণ পাচ্ছি। আর, শতপথ ব্রাহ্মণ ও মৎস্য পুরাণ-এ (এগুলো সবই বাংলায় চমৎকারভাবে অনূদিত হয়েছে) বলা হচ্ছে :

জগৎ যখন পাপের কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি হলো, ভগবান বিষ্ণু ‘মৎস্য অবতার’ (একটি বিশাল শিংওয়ালা মাছ) রূপ নিলেন। বৈবস্বত মনু বিরাট আকৃতির নৌকা তৈরি করেন। জীবজগতের বীজ ও বেদকে সেখানে তিনি রক্ষা করেন। মৎস্যরূপী ভগবান নৌকাকে হিমালয়ের চূড়ায় (নৌবন্ধন শৃঙ্গ) বেঁধে রাখলেন। প্লাবন শেষে বৈবস্বত মনুর মাধ্যমেই পৃথিবীতে আবার নতুন করে নতুন যুগের মানব সভ্যতার সূচনা হয়।

Vishnu as Matsya protecting Manu’s Bost from demon; Company School, Patna Painting; Source Credit: imp-art.org

বৈবস্বত মনু এখানে নূহ নবির রোলটা প্লে করেছিলেন বোঝা যায়। তো এই মহাপ্লাবন নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বর্তমানে অত্যন্ত আকর্ষণীয় জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। মহা বিতর্কিত ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ গ্রাহাম হ্যানককের নাম উঠবে এখানে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সাধারণত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নন। ফিল্ডের বাইরে সাধারণ মানুষ তাঁদের ব্যাপারে ধারণা রাখেন না খুব একটা। গ্রাহাম হ্যানকক ব্যতিক্রম। তাঁর কাজের ধারা ও দাবির কারণে বর্তমানে সুপরিচিত। নেটফ্লিক্সে আট পর্বের Ancient Apocalypse তাঁকে আকাশচুম্বি খ্যাতি ও জনপরিসরে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। সিরিজটি নেটফ্লিক্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার দেখা অন্যতম সিরিজের একটি বটে! সময় করে দেখতে পারেন, আপনাকে ভালোই আটকে রাখবেন ভদ্রলোক।

যাকগে, গ্রাহাম হ্যানকক মহাপ্লাবন নিয়ে এই দাবি তুলেছেন,—মহাপ্লাবনের আগে থেকে ধরার বিভিন্ন প্রান্তে উন্নত মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। প্লাবনের কারণে সভ্যতার আদিচিহ্ন বিনষ্ট হয়ে যায়। প্লাবনচাপ সামলে যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা পরে ধরার একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ও নতুন করে মানব সভ্যতা গড়ে তোলে। উন্নত মানব সভ্যতার কালপর্ব তাই সুদীর্ঘ। আজ থেকে পনেরো-কুড়ি হাজার বছর বা তারো আগে থেকে মানব সভ্যতা ধরায় বিদ্যমান ছিল বলে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছেন হ্যানকক। দাবির সপক্ষে মাটির নিচ থেকে অকাট্য প্রমাণাদির কিছুই অবশ্য খুঁড়ে বের করতে পারেননি। প্রত্নতত্ত্বে দুটি বিষয় জরুরি ধরা হয় :

১. মাটির নিচ থেকে আমরা কী পাচ্ছি ও কার্বন ডেটিংয়ের পর তার প্রাচীনত্ব কেমন দাঁড়াচ্ছে সেখানে।

২. Circumstantial Evidence বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণ কী-কী পাওয়া যাচ্ছে, যার ওপর ভর করে অন্তত সমীকরণ মেলানো সম্ভব।

গ্রাহাম হ্যানকক এখানে এসে সমস্যায় পড়ে গেছেন। প্রচুর যুক্তি তিনি দিচ্ছেন বটে, কিন্তু সলিড ডেটা দেখাতে পারছেন না। এর ফলে বেচারার পিঠে ‘ছদ্মবিজ্ঞানী’র তকমা বাকিরা বসিয়ে দিয়েছেন। তবে, তাঁর হাইপোথিসিস ফেলনা নাও হতে পারে, এবং বিজ্ঞানের ধারাবাহিক অগ্রগতির কারণে একটা সময় প্রমাণাদি বা যোগসূত্র বেরিয়ে আসতেও পারে।

এই যেমন, অনার্য সিন্ধু সভ্যতার বয়স আমরা এতদিন খ্রিস্টপূর্ব চার-সাড়ে হাজার বছর জেনে এসেছি। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণা সিন্ধু সভ্যতা আরো পুরাতন হওয়ার আভাস দিচ্ছে। খ্রিস্ট জন্মের আট থেকে বারো হাজার বছর আগে এটি বিকাশ লাভ করে থাকতে পারে বলে তাঁরা মত দিচ্ছেন।

অনার্য সিন্ধু সভ্যতা অতি পুরাতন জানার পর বৈদিক আর্য সভ্যতার বয়স পেছনে নেওয়ার দৌড় শুরু করেছেন ভারতের একদল হিন্দুত্ববাদী পণ্ডিত। মহাপ্লাবনের আগে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব নিয়ে গ্রাহাম হ্যানককের দাবির সাপেক্ষে সলিড ডেটা নেই ঠিক আছে, তবে তিনি প্রত্নতত্বের নিয়ম মেনে আগানোর চেষ্টা করেন। ডেটা বিশ্লেষণে তাঁর পদ্ধতি বিজ্ঞানের পথরেখা থেকে বেরিয়ে ঘটছে এমন নয়। পর্যাপ্ত ডেটা দিতে না-পারায় তাঁর যুক্তি ও অনুমানকে বাকিরা মানতে চাইছেন না। এমনকি জিন বিশারদ রিচার্ড ডকিন্স থেকে আরম্ভ করে তাঁর কলিগ প্রত্নবিদগণের সঙ্গে হামেশা ডিবেটের চাপ সামলাতে হচ্ছে। পরিহাসের শিকার হয়ে থাকেন হামেশা। তথাপি তাঁর কাজের পদ্ধতি মোটের ওপর বিজ্ঞানসুলভ।

‘মহাভারত’, ‘রামায়ণ’ থেকে আরম্ভ করে ভারতীয় আর্য সভ্যতাকে গ্রাহাম হ্যানককের টাইমলাইন বা তারো আগে দেখাতে তৎপর নিলেশ ওক নামের একজন দাঁড়িয়ে গেছেন হিন্দুত্ববাদের রমরমা বাজারে। আচমকা নিজেকে হিন্দু ন্যাশনালিটির অধিকারী ভেবে পরিতৃপ্ত একালের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরাট অংশ বুঝে-না-বুঝে এঁনার ভক্ত হয়ে পড়েছেন। পেশায় প্রকৌশলী এই ভদ্রলোকের কাজকারবার বিনোদনে ভরপুর। ন্যারেটিভের ধাপ্পাবাজি একমাত্র সারবস্তু সেখানে।

ভারত থেকে তাঁকে চ্যলেঞ্জ দিয়েছেন যেসব বিজ্ঞাননিষ্ঠ লোকজন কিংবা বৈদিক ভারতের ব্যাপারে গভীর জানাশোনা যাঁর, সেই নিত্যানন্দ মিশ্র বিজেপি প্রযোজিত হিন্দুতভার সঙ্গে তাঁকেও এই-যে হাসির পাত্র বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তো বেচারা তা ডিফেন্ড করার এলেম রাখেন বলে মনে হয়নি। অনলাইনে যদিও তাঁর নামডাকের অন্ত নাই! এঁনাকে নিয়ে শোরগোল হিন্দু ন্যাশনালিটির মদ খেয়ে মাতালদের ছ্যাবলামিকে যেন প্রবল করছে ইদানীং!

যাইহোক, সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বোঝাতে গিয়ে আমি সম্ভবত প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে গেছি অনেকখানি। উপসংহারে এসে মূল কথায় ফেরত যাই ঝটপট। নিচে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আমার বক্তব্য তুলে ধরছি, আশা করি ভেবে দেখবেন :

Protesting against `caste-based discrimination’: A group of students in Delhi University burnt copies of ancient text Manusmriti; Source: thehindu.com

ক. বেদে ‘মনু’ ফিরে-ফিরে আসছেন প্রথম যজ্ঞকর্তা, ঋষি ও মানবজাতির পিতা হিসেবে।

খ. বেদের নির্যাস তুলে ধরতে মিথরঞ্জিত পুরাণসাহিত্যে (কলিম খানের বিবেচনায় অবশ্য এর পেছনে পরিষ্কার সমাজ-ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে, যদি আমরা ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির সাহায্যে পুরাণগুলো পাঠ ও বিশ্লেষণ করি। ) ১৪ জন মনুর পরিচয়, বংশলতিকা ও তাঁদের যুগের সপ্তর্ষিদের নামসহ বিস্তারিত লীলাকাহিনীতে ঠাসা।

গ. আজকে যাকে আমরা ‘মনুসংহিতা’ নামে চর্চা করছি, তা এ-পর্যন্ত আবির্ভূত সাতজন ‘মনু’র কারো রচনা নয়। তাঁরা মূলত মহাজাগতিক নিয়ম (ঋত) ও বেদে বর্ণিত ও বেদের অন্ত বা পরিশিষ্ট রূপে আবির্ভূত উপনিষদে প্রকাশিত ব্রহ্মজ্ঞানের অনুসারী। একালে আমরা যেটিকে ‘মনুসংহিতা’ বলে বুঝে নিচ্ছি, এরকম কোনো সংহিতা বা আইনশাস্ত্র প্রণয়নের প্রমাণাদি জোটানো কঠিন।

ঘ. সাতজন ‘মনু’ শ্রুতি (চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয়) রূপে কীর্তিত বেদ-র অংশ। বেদে মর্মরিত ‘ঋত’ বা মহাজাগতিক নিয়ম মানব ও ব্রহ্ম সম্পর্কে যেসব আভাস আমাদের দান করেছে, যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও শংসাগাথার দেখা পাচ্ছি সেখানে, সাতজন ‘মনু’কে ওই জায়গা থেকে ঋগ্বেদ-এ বন্দনা করা হয়েছে। বেদান্তে এসে তা দার্শনিক ব্যাখ্যায় অতি মনোরঞ্জক ও শিক্ষনীয়। আজো সমান প্রাসঙ্গিক।

ঙ. এখন-যে ‘মনুসংহিতা’র কথা তুলছেন, তা স্মৃতিশাস্ত্রের অংশ। স্মৃতিশাস্ত্র হলো পরিবর্তনশীল, এবং তা স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী সমাজ পরিচালনার জন্য মানুষের তৈরি নিয়ম বা আইন রূপে স্বীকৃত।

চ. ‘মনুসংহিতা’ চার হাজার বছর আগের কোনো রচনা মোটেও নয়। খ্রিস্ট জন্মের দুশো বছর আগে রচিত বলে অনুমান করা হয়। তার মানে আড়াই হাজার বছরের কাছাকাছি ধরতে পারেন। আদি বৈদিক সভ্যতা ততদিনে বর্ণপ্রথা, জাতপাত ও ধর্মাচারের নামে মানুষকে দাবিয়ে রাখার মারণাস্ত্রে কলুষিত হয়ে পড়েছে।

জ. এরকম এক সময়ে বসে একদল ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বৈদিক ‘মনু’গণকে ব্যবহার করলেন। তাঁদের নাম ভাঙিয়ে ইসলামের হাদিসশাস্ত্রের মতো রচিত হচ্ছে এমনসব কোড অব কন্ডাক্ট, যেগুলো পরে হিন্দু সম্প্রদায়কে নানাভাবে দমিত, অবরুদ্ধ ও বিড়ম্বিত করতে ভূমিকা নিভেয়েছে।

ঞ. তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশি আক্রমণ থেকে ভারতীয় সমাজকে বাঁচানো ও ধর্মরক্ষার প্রয়োজনে এসব আইন ‘মনুসংহিতা’য় উনারা ঢুকিয়েছেন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। একটি কঠোর ডিফেন্স মেকানিজম বলা যেতে পারে একে। উদ্দেশ্য, শ্রেণিবিন্যাসে ভাগ হয়ে থাকা সমাজে নিজের কৌলিন্য ও বিশ্বাস রক্ষা করা।

ট. ভালো-ভালো অজস্র কাহিনি ও বচনে হাদিসশাস্ত্রও ভরপুর। এর পাশাপাশি এমনসব কাহিনি ও বিধান সেখানে সংকলিত হয়েছে, যেগুলোকে মারণাস্ত্র রূপে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক ইসলাম। ‘মনুসংহিতা’কে সেরকম উদ্দেশ্যমূলক ও শ্রেণি রাজনীতির লক্ষ্যে প্রণীত বয়ান হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি। দলিত সমাজ থেকে উঠে আসা বাবাসাহেব আম্বেদকর যে-কারণে এটিকে দমনমূলক আখ্যা দিয়ে পিটিয়েছেন, কারণ সেখান দলিত ঘৃণ্য জীব বটে!

ঠ. এই ‘মনুসংহিতা’য় বেদ ও উপনিষদ হলো অছিলা। যেমন হাদিসের জন্য অছিলা ছিল কোরান। বেদকে ধর্মের মূল বলে স্বীকার করছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতি, ব্রাহ্মণ্য দৃষ্টিভঙ্গি ও সমসাময়িক প্রয়োজনকে কোডিফাই করতে ব্রাহ্মণসমাজ এটি রচনা করেন। ‘মনু’র নাম নেওয়া হয়েছে একে পৌরাণিক ও বৈদিক মহিমায় বিশ্বাসযোগ্য করার প্রয়োজনে। নৃসিংহপ্রসাদ নিজেও এ-ইতিহাস জানেন বৈকি। কিন্তু হিন্দু সমাজ ও স্পর্শকাতরতার কথা ভেবে এড়িয়ে গেছেন।

ঢ. ইংরেজরা এখানেও হিন্দুদের বাঁশ দিয়ে রেখেছে। তারা ১৭৭৬ সনে উইলিয়াম জোনস অনূদিত ‘মনুসিংহতা’কে হিন্দু আইনের ভিত্তি বলে ধরে নেয়। হিন্দু আইন প্রণয়ন করে তখন। ইংরেজ প্রস্তাবিত ও বাস্তবায়িত এই আইনের আইক্কা প্যাঁচ পরে কত হিন্দুর সর্বনাশের কারণ হয়েছে, তা হিন্দু জাতীয়তার খপ্পরে পড়া হিন্দুরা মনে হয় ভুলতে বসেছেন আজকাল!

ণ. হাদিসের মতো মনুসংহিতা’ও নারীকে স্ত্রী ও জননী রূপে সর্বংসহা ধরিত্রীর প্রতীকে পাম মেরেছে বিস্তর। দেবী ও জননীর মহিমায় গরিয়সী দেখাতে কসুর করেনি। আবার প্রয়োজনে রুদ্রাও করেছে দেবীমাহাত্ম্য আমলে নিয়ে। নারীকে এটি একধরনের মেকি সম্মোহনে জব্দ রাখে, এবং নারীকুল বোকার মতো এগুলোয় জব্দও থাকে ভালোই।

তো এর মধ্যে বৈদিক যুগে নারীর স্বকীয়তা ও প্রকৃতির সঙ্গে একীভূত হয়ে নিজের দেহমনের সবটুকু স্বাধিকার চর্চার হদিস মিলে কি? প্রশ্নটি নিয়ে ভাবার আছে বিস্তর। এগুলোকে কেটেছেটে বামন করে দিয়েছে অতি প্রতিক্রিয়াশীল এই সংহিতা। একালের যে-কোনো নারীর চোখে এ-কারণে ‘মনুসংহিতা’কে চোখ বুজে ভ্যালিড ভাবাটা কঠিন। যথেষ্ট বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে আছে এখনো।

মোদ্দা কথা, ‘মনুসংহিতা’ বেদের ‘প্রতিধ্বনি’ নয়, বরং প্রায়োগিক ধর্মশাস্ত্র। ফুকোর ‘ক্ষমতা রাজনীতি’র হাতিয়ার। সমাজকে সংগঠিত ও বশে রাখতে প্রণীত। বেদ-উপনষিদের সুদূরপ্রসারী জগৎবীক্ষণ ও আধ্যাত্মিক স্ফুরণ শুধু নয়, এর অতিকায় দার্শনিকতা এখানে এসে সংকুচিত হয়েছে। এটি মোড় নিয়েছে পিতৃতান্ত্রিক ও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যকে শক্তিশালী করার মারণাস্ত্রে।

একুশ শতকের ধরায় ‘মনুসংহিতা’কে ঐতিহাসিক দলিল রূপে পাঠ করা সংগত,—চিরন্তন আইন হিসেবে নয়। হিন্দু ধর্ম বৈচিত্র্যময়। বেদ, উপনিষদ, গীতা, ভক্তি আন্দোলনে কত-না উদার ও বিস্তারগভীর এর শিকড়। সেগুলোর চর্চাই কেবল হিন্দু ন্যাশনালিটির সস্তা রাজনীতি থেকে হিন্দুকুলকে বাঁচাতে পারে।
. . .

মিনহাজ ভাই,
‘মনুসংহিতা’ বিষয়ক অতি ক্ষুদ্র লেখাটি মূলত ‘ধর্ম’ সম্পর্কে হালকা একটা ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা করেছি। ধর্মচর্চার আস্ফালন দেখে কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়েই উদ্ধৃতিটুকু পোস্ট করেছি। আপনার লেখা পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।
. . .

ধন্যবাদ সুমনদা। আমি তা বুঝতে পেরেছি। এই ব্যাপারে আমার জানাশোনার পরিধি ব্যাপক নয়। তবু সাহস করে বিস্তারিত লিখেছি, কেননা ধর্মকে রাজনীতির বাতাবরণে যেভাবে ব্যবহার করা হয় এখানে, তা কেবল মুসলমান সম্প্রদায়ে সীমিত নেই এখন। এর থেকে অনেকখানি বেরিয়ে আসা হিন্দুরাও এতে প্রচণ্ড আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন। এটা অশুভ লক্ষণ আমাদের জন্য। যে-কারণে ধর্মকে জানা-বোঝা ও এর মিসিং লিংকগুলো যে যেভাবে যতটা পারেন তুলে ধরা প্রয়োজন। কেবল ধর্মীয় সুবচনে আর কাজ হবে না।

জমিদার তনয় থেকে বিপ্লবী প্রয়াত নকশালী কমরেড আজিজুল হক বেশ আড্ডাবাজ লোক ছিলেন। জীবনের অন্তিমে এসেও বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মন খুলে মিশতেন। এরকম একখানা ভিডিও চোখে পড়ল হঠাৎ। সেখানে দেখি আজিজুল হক তাঁর সঙ্গে আড্ডায় বসা ছেলেমেয়েদের বলছেন :

ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক মহিমার অনুরক্ত রোম্যাঁ রোলাঁ একবার ভারত সফরে এসে শান্তিনিকেতনে গেলেন রবি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। দুজনে আলাপ চলছিল, এমন সময় রবি ঠাকুর বলে ওঠেন : ‘ভারতবর্ষে নিরীশ্বরবাদের একটা প্রচণ্ড প্লাবন হওয়া দরকার।’

রবি ঠাকুরের কথা শুনে রোম্যাঁ রোলাঁর চোখ কপালে উঠেছে তখন! উপনিষদে নিমজ্জিত টেগোর কী বলছে এসব! রোলাঁ নিজে ওদিকে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস ও বিবেকানন্দের পরম ভক্ত। রোঁলার বিস্ময় দেখে রবি ঠাকুর নাকি বলেছিলেন তাঁকে, ‘দেখো, এই দেশটায় মানুষগুলো সংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে ক্রমাগত নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। অসীম সংকীর্ণ এক জগতে ধর্মকেও তারা টেনে নামাচ্ছে। একটা প্রচণ্ড ‘না’-এর প্লাবন ছাড়া এ-জাতি শুধরাবে না। না তারা কখনো বুঝতে পারবে,—‘ধর্ম’ আসলে কী অর্থ রাখে মানুষের জীবনে।’

আমাদের ধর্মবিশ্বাস এখানে এসে গোলমেলে হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রশ্ন করি না। জানতে চাই না। তলিয়ে দেখি না। একে অন্যকে জানার চেষ্টাও করি না ভালো করে। ইংরেজরা এটা ধরতে পেরেছিল বলেই-না দুই সম্প্রদায়কে দুশো বছর আচ্ছাসে ব্যবহার করে রাজ করেছে।
. . .

RSS Wanted Manusmriti, Not the Constitution; Kunal Kamra ft Shamsul Islam; Source: Kunal Kamra YTC

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য দেখুন …

জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

. . .

নেটালাপ অবদায়ক : সুমন বনিক ও আহমদ মিনহাজ; থার্ড লেন স্পেস.কম 

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *