পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

প্রত্নস্মৃতি থেকে প্রতিরোধ : ফজলুররহমান বাবুল

Reading time 9 minute
5
(14)
পাঠ-আলোচনা : নিকট থাকো বৃক্ষ
Artwork-I: Stay Close, Tree by Akhalakur Rahman Shuaib; Source & Credit: Hosne Ara Kamali;

কবিতার জন্য তাঁর ‘একটি প্রার্থনাঘর’ কাম্য; এবং তার জন্য তিনি নিঃশর্ত কিছু সময়ও চান। কবিভাবে কবিতা স্রেফ ভালোবাসার ব্যাপার নয়, বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতার এক দীর্ঘ যাত্রা (‘খোয়াব’, বন্দনার ঠিক আগে)। তিনি হোসনে আরা কামালী। উল্লিখিত এই অভীপ্সামূলক ছোট্ট স্বীকারোক্তি থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর আসক্তি ও আত্মসমর্পণের অভিজ্ঞতাকে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা কবিতাচর্চায় হোসনে আরা কামালী যুক্ত হয়েছিলেন বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে। এযাবৎ এই কবির লেখা/কবিতাবই পরিমাণে খুব বেশি নয়। তাঁর প্রথম কবিতাবই ‘নাশপাতি ঘ্রাণে মন’ প্রকাশ হয় খ্রিস্টাব্দ দুইহাজার সতেরোর এপ্রিল মাসে। বছর-কয়েক পর আমাদের হাতে আসে ‘বন্দনার ঠিক আগে’ (২০২০) ও ‘নিকট থাকো বৃক্ষ’ (২০২৫)। প্রথম কবিতাবই ‘নাশপাতি ঘ্রাণে মন’-এ প্রথম কবিতা হিশেবে পাই ‘আহ্বান সংগীতে’—যার রচনাকাল খ্রিস্টাব্দ দুইহাজার ষোলো, এবং এই বইভুক্ত শেষ ও নামকবিতা ‘নাশপাতি ঘ্রাণে মন’-এর রচনাকাল খ্রিস্টাব্দ উনিশশত নব্বই। উল্লেখিত তথ্য ইঙ্গিত করে, এই কবির সৃজনপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ব্যাপী, ধীর ও সংযত।

কথা-বিস্তারের শুরুতেই উল্লেখ করতে চাই, হোসনে আরা কামালীর অনেক কবিতাই নিবিড় পাঠপরিসরের দাবি রাখে—আর এ কথা হয়তো বোদ্ধা কাব্যামোদীদের মধ্যে অনেকেই উপলব্ধি করেন, কিংবা উপলব্ধি করার সুযোগ পান। তাঁর কাব্যভাষা একদিকে যেমন আত্মজৈবনিক, তেমনই প্রত্নস্মৃতি, পৌরাণিক পুনরাবিষ্কার এবং নারীর প্রতিরোধস্বরকে অন্তর্লীনভাবে ধারণ করে। ব্যক্তিগত শোক, সামষ্টিক স্মৃতি, পৌরাণিক চেতনা, নগরের একাকিত্ব এবং অস্তিত্বসংকট এক আন্তঃজাল সৃষ্টি করে, যার ভিতরে প্রবেশ করা মানেই সময়, সমাজ ও সত্তার বহুস্তরীয় প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। আরও বলতে গেলে প্রেম, প্রকৃতি, ক্ষয়/ক্ষত, মানবীয় সংবেদন তাঁর কবিতার শক্তি/দীপ্তি।

তাঁর প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাটিই একটি সংবেদনশীল জগতে নিয়ে যায় কি-না, তা উপলব্ধির জন্য এখানে না-হয় একবার পাঠ করি :

ছুঁয়ে দেখো এই কপালের ভাঁজে নোনাঘাম জমা কঠিন সমতল
আর এইখানে, এই যে যুগল ভ্রুর মাঝখানে ছুঁয়ে দেখো মমতার সবুজ মনোগ্রাম
না-গোনা দিনের রোদবৃষ্টি ঝড়ে ক্ষয়ে গেছে পাণ্ডুর রোগে
অঘন পাপড়ির নিচে শুকনো বঙ্গোপসাগর দুটি চোখ স্পর্শ করো
স্কেচপড়া ধূলি-মলিন, নেই কোনও প্রতিবিম্বও
একবার স্পর্শ করো, পাহাড়ের বুক চিরে ডেকে তোল বানের নদী

বচনের খরা কত অসহায় করে তোলে তুমি জানো
এই ঠোঁটে রাখো একবার প্রেম — দেখো পরাভব তার
বাঘিনির অভয় অরণ্য জেনো কালকূট সুন্দরবন।

কবিতাটিতে শব্দচয়ন ইন্দ্রিয়কে কি টানে না? ভাষা একধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ কি সৃষ্টি করে না—যেখানে দেহ, প্রকৃতি, সময় এবং ইতিহাস একসঙ্গে যুক্ত? সময় ও স্থান ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং সামাজিক/প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেই মিলতে দেখি। উপলব্ধি করি, কবিতার শেষদিকে কবি কেবল ‘কালকূট সুন্দরবন’ উল্লেখের মাধ্যমেই স্থানীয় বাস্তবতা এবং বাঙালি ভূ-চিত্রের সঙ্গে কীরকম সংযোগ করতে পেরেছেন। বিষয় ও প্রতীকের দিকে মনোযোগী হলে, এক কবিতায়-ই কালের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনের কঠিনতা, মানবীয় অনুভূতির প্রাণবন্ততা, প্রেমের/স্নেহের চিহ্ন, অতীতের স্মৃতি, ক্ষয়, প্রকৃতির শক্তি এবং জীবনধারার প্রবাহ, ভাষা, কথার শক্তি এবং তার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বা রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সাহসিকতার মুখোমুখি হয়ে পড়ি।

হোসনে আরা কামালী, কবিতাভাষায় মূলত মুক্তছন্দভিত্তিক; তবে তাতে আছে এক অন্তর্মুখী সংগীতধর্মিতা। শব্দের নির্বাচন, বাক্যগঠন ও অনুচ্চারিত আবেগ—এইসবের সম্মিলনে তাঁর পঙক্তিগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতি-সংলাপের মতো। ‘নিকট থাকো বৃক্ষ’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত ‘আম্মার বিষাদ-সিন্ধু পাঠ’ কবিতায় কবির উচ্চারণ :

আমরা সুবোধ দুইবোন
পড়ার টেবিলকে অস্বীকার করে
সন্ধ্যায় আম্মার পালঙ্কে পড়তে বসতাম

শুয়ে শুয়ে যে-দিন আম্মা
বিষাদ-সিন্ধু পড়তেন
নবির বংশ কতল হওয়ার শোকে
আম্মার কণ্ঠ অ্যাপোলো মন্দিরের দৈববাণীর মত
ছড়িয়ে পড়ত আমাদের ব্যাকরণ-বই অবধি

Artwork-II: Let there be light by Akhalakur Rahman Shuaib; Source & Credit: Hosne Ara Kamali;

উপর্যুক্ত কবিতাংশে প্রথমেই যে-দৃশ্যটির মুখোমুখি হই, তা একেবারেই গৃহস্থালি ও অন্তরঙ্গ (স্মৃতি)। ‘পড়ার টেবিলকে অস্বীকার করে’ সন্ধ্যায় আম্মার পালঙ্কে পড়তে বসা তো কেবলই পারিবারিক স্মৃতি নয়; একধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থান। পড়ার টেবিল এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতীক, আর আম্মার পালঙ্ক হয়ে ওঠে বিকল্প পাঠপরিসর—যেখানে জ্ঞান আসে ঘরোয়া স্নেহ, কণ্ঠ ও উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। সন্ধ্যার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ; দিনের কাজ শেষে আলো ও অন্ধকারের সংযোগ-মুহূর্তে পাঠ শুধু পড়াশোনা নয়, একধরনের অস্তিত্বযাপন। আর, এই পরিসরে মায়ের পাঠ বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। ‘শুয়ে শুয়ে যে-দিন আম্মা বিষাদ-সিন্ধু পড়তেন’ এখানে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ও কোনও সাধারণ বই নয়; এটি উপমহাদেশীয় মুসলমান সমাজের শোক, ইতিহাস ও বিশ্বাসের এক বড়ো আখ্যান। এতে শোক ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক ও ঐতিহাসিক। অথচ শোকের উচ্চারণ এক মায়ের কণ্ঠে, সন্তানদের পাশে বসে। ফলে ইতিহাস ও ধর্ম ঘরে উপস্থিত হয়, আর পারিবারিক আবহ হয়ে ওঠে এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারক।

এই কামালী-স্মৃতির মধ্যে আমরা কার কণ্ঠ পাই? ‘আম্মার কণ্ঠ অ্যাপোলো মন্দিরের দৈববাণীর মতো’—এই তুলনা (কবিতাংশটি) হঠাৎই বহুসাংস্কৃতিক এক স্তরে নিয়ে যায়। গ্রিক-পুরাণের ওরাকল এবং ইসলামি শোকগাথা মুখোমুখি হয়। মায়ের কণ্ঠ হয়ে ওঠে এক ধরনের দৈববাণী। তা কি শুধু গল্প বলে? না। তা এক গভীর অনুভব ও নিয়তির বোধ তৈরি করে। সেই কণ্ঠের অনুরণন পৌঁছে যায় ‘ব্যাকরণ-বই অবধি’—যেখানে ভাষা শেখানো হয় নিয়মে, কাঠামোয়। অন্তর্নিহিত বক্তব্য স্পষ্ট হয়। আর, ব্যাকরণ কেবল শুষ্ক নিয়মের বিষয়ও থাকে না। মায়ের কণ্ঠে শোক, আবেগ ও ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মায়ের উপস্থিতি, তাঁর পাঠ ও কণ্ঠ মিলে তিনি হয়ে ওঠেন শিক্ষক, প্রথম পাঠক এবং সংস্কৃতির বাহক।

একই কবিতার আরও-একটি অংশে স্বল্প পরিসরে স্মৃতি, কল্পনা, ইতিহাস ও প্রতিরোধের স্তরগুলো একত্রে ধরা পড়ে। যাতে ভাষা যেমন প্রবাহমান, চিত্রকল্পেও বৈপরীত্য :

পড়াভোলানিয়া এক জগতে আমরা হাঁটতাম
বরফের ওপর দিয়ে গা ছমছম ভয় নিয়ে
বালুময় তীব্র তাপের শহর কুফা
আমাদের তখন কাবু করতে পারত না!

হ্যাঁ, ‘পড়াভোলানিয়া এক জগতে’ শব্দবন্ধে একটি বিকল্প বাস্তবতার ইঙ্গিত। এ-যে এমন এক জগৎ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ, মুখস্থবিদ্যা বা পরীক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞান নেই; আছে স্মৃতি, কল্পনা ও অনুভবের স্বাধীনতা। ‘পড়াভোলানিয়া’ শব্দটি ভুলে যাওয়ার নয়, বরং শেখার প্রচলিত কাঠামো থেকে সরে আসার ইশারা। এবং, ‘বরফের ওপর দিয়ে গা ছমছম ভয় নিয়ে’ এই জগতের ভিতর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতাও সহজ নয়। বরফ তো এখানে শীতলতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। এখানে পথ মসৃণ নয়, নিরাপদও নয়; বরং ভঙ্গুর, পিচ্ছিল। তবু কি হাঁটা থামে? না, থামে না।

অতঃপর তীব্র বিপরীত চিত্র—‘বালুময় তীব্র তাপের শহর কুফা।’ বরফের ঠান্ডা থেকে হঠাৎ মরুভূমির উত্তাপ; এই দ্বন্দ্ব পাঠ-অভিজ্ঞতাকে (কবিতা-আবহের বাইরে) ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে নিয়ে যায়। কুফা নিছক একটি শহরের নাম নয়; একটি (ধর্মীয়) ইতিহাস, রাজনৈতিক সংঘাত, বিশ্বাস ও প্রতিরোধের স্মৃতিবাহী এক স্থান। তাপ, বালি ও শহর মিলে এক দমনমূলক বাস্তবতার প্রতীক। কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ‘আমাদের তখন কাবু করতে পারত না!’ প্রতিরোধের কথা, পরাস্ত না-হওয়ার ঘোষণা। ‘আমাদের’ শব্দে ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে সামষ্টিক চেতনায় উত্তরণ। এ এক প্রজন্ম, একটি মানসিক অবস্থান, কিংবা একটি কল্পিত সম্প্র্রদায়ের কণ্ঠস্বরও হতে পারে। কবিতাটি পাঠউত্তর উপলব্ধি করা যায়, কীভাবে স্মৃতির আশ্রয়ে গড়ে ওঠা এক ‘পড়াভোলানিয়া’ জগৎ বাস্তবের কঠিন, দমনমূলক পরিসরকেও অকার্যকর করে দিতে পারে। এখানে কবির কাব্যিক কল্পনা তো নিছক পালিয়ে যাওয়া নয়; টিকে থাকার ও প্রতিরোধের ভাষা। দেখতে পাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে গড়ে ওঠা এক অন্তর্লীন পাঠসংস্কৃতি—যেখানে নারী, স্মৃতি ও কণ্ঠ জ্ঞানের প্রধান উৎস। এতে পাঠ আলাদা কোনও কাজ নয়; দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক স্বাভাবিক ও গভীর মানবিক অভিজ্ঞতা।

তাঁর ‘বন্দনার ঠিক আগে’ কবিতাবইয়ে ‘এপিটাফ’ নামক কবিতাটির শুরুতেই বিপরীত চিত্র/ বৈপরিত্যের উদাহরণ আরও-একবার দেখি। ‘পাখির ডানায় প্রতিশ্রুতি নেই ফেরার/ তবু তুমি ফিরে আস’। কিন্তু, বৈপরিত্যই কি চূড়ান্ত? না। আছে মৃত্যু, স্মৃতি, প্রত্যাবর্তন ও ভাষার সংযত ও তীক্ষ্ণ ধ্যান, আছে আত্মোপলব্ধিতা। কবিতাটিতে গীতল আবেগের চেয়ে চিন্তাশীল সংযমের বেশি প্রাধান্য। মৃত্যুচিন্তাকে কেন্দ্র করলেও ঠিক শোকগাথা বা এলিজি নয়। এতে মৃত্যুর উপস্থিতি ভয়াবহ বা নাটকীয়ও নয়, বরং ধীর, সংলগ্ন ও বোধনির্ভর :

পাখির ডানায় প্রতিশ্রুতি নেই ফেরার
তবু তুমি ফিরে আস
অপেক্ষার জল গলে গলে পাথর
আমি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি নই
পাথর সরিয়ে নাও — বড়ো লাগছে আমার!

এই আসা এই যাওয়া এই চাতুর্যের শিল্পখেলা
কী শিরোনাম হতে পারে এই অন্তহীন ভাবনার
তোমার অভিধানের পাতাগুলো পতপত নিশান হয়ে
ঢেকে দিক আমার সমাধি

এপিটাফহীন সমাধিতে কোনও পথিক না তিষ্ঠ ক্ষণকাল
তোমার নিশান শুধু উড়িয়ে দিক
শুকনো পাতায় জমে থাকা ধুলোর প্রলেপ!

রূপগতভাবে কবিতাটি গদ্যছন্দ-সংলগ্ন। কোনও আলংকারিক অতিরঞ্জন নেই; বরং সংক্ষিপ্ত বাক্য, কথোপকথনের ভঙ্গি এবং হঠাৎ উত্থাপিত স্বীকারোক্তি (‘আমি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি নই’) কবিতাটিকে অন্তরঙ্গ ও আত্মকথনমূলক করে তোলে। প্রতীক ব্যবহারে কামালী মোটামুটি সংযত হয়েও তীক্ষ্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই (কবিতায়) তাঁর শব্দ-ব্যবহার বহুবিধ অর্থ বহন করে, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যাখ্যার ভার চাপানো থাকে না, তবু ব্যাখা করা যায়। যেমন—‘পাখির ডানায় প্রতিশ্রুতি নেই ফেরার/ তবু তুমি ফিরে আস।’—পাখির ডানা সাধারণত স্বাধীনতার/ওড়ার/যাত্রার প্রতীক, কিন্তু এখানে সেই যাত্রার মধ্যে ফেরার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবু ‘ফিরে আস’—এমন অনুরোধ/আহ্বান কবিতাকে নিছক নিয়তি-স্বীকারের দিকে নয়, বরং সম্পর্ক ও স্মৃতির দিকে টেনে আনে। প্রত্যাবর্তনও শারীরিক নয়; এটি স্মৃতি, ভাষা কিংবা ভালোবাসার প্রত্যাবর্তনও হতে পারে।

এমন আরও ব্যাখ্যায় যাওয়া যায়—‘এই আসা এই যাওয়া এই চাতুর্যের শিল্পখেলা/ কী শিরোনাম হতে পারে এই অন্তহীন ভাবনার’—জীবনের পুনরাবৃত্ত যাত্রা, সম্পর্কের কৌশল, বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা, সবই যেন একটি শিরোনামের খোঁজে। কিন্তু সেই শিরোনাম অধরা। ভাবনারও কি নাম প্রয়োজন? নাকি নামই ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে? কবি যখন উচ্চারণ করেন—‘তোমার অভিধানের পাতাগুলো পতপত নিশান হয়ে/ ঢেকে দিক আমার সমাধি’—তখন ভাষা এক সুন্দর রূপক ধরে। অভিধান তো ভাষার ভান্ডার, অর্থের সম্ভাবনা। ভাষা যখন ‘নিশান’ হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল অর্থ নয়, তা পরিচয় ও স্মৃতির চিহ্ন। কবির অভীপ্সাকে আমরা বুঝি, তাঁর সমাধি কোনও পাথরের লেখায় নয়, বরং প্রিয়জনের ভাষায় আবৃত হোক।

Artwork-III: Downfall by Iffat Mehjabeen Kamali; Source & Credit: Hosne Ara Kamali;

মনে করি, কবি ভাষাকে তাঁর বড়ো ভরসা হিশেবে কল্পনা করেন। তাই, সমাধিলিপির পাথরের বদলে অভিধানের পাতা, খোদাইয়ের বদলে নিশানের উড়াল। ফলে ‘এপিটাফ’ হয়ে ওঠে একধরনের মেটা-কবিতা, যা নিজের বিষয় (সমাধিলিপি) নিয়েই প্রশ্ন তোলে। আর, এতে স্থির নয়; বরং ধুলো ঝাড়ার মতো চলমান।

সমকালীন অনেক বাংলা কবিতার মতো কামালীর কবিতাও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত অনুভবের সীমা অতিক্রম করে ভাষা ও স্মৃতি-আখ্যানের দিকে অগ্রসর হয়; যা আসলে পাঠকের দিক থেকে আবেগের বদলে মনোযোগ দাবি করে বেশি। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে বৃক্ষ, নদী, কুয়াশা, রোদ, কাজল, শহর কিংবা পাণ্ডুলিপি—যা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ‘নিকট থাকো বৃক্ষ’ কবিতায় বৃক্ষের প্রতি এই যে সমর্পণের আহ্বান—‘আমাকে রাখো পাতা করে তোমার ডালে/ না-হয় ফুল করে রাখো, শোভা হই তোমার’—এটি আত্মরক্ষার ভাষা, আবার আত্মপ্রতিষ্ঠারও। এই প্রতীকের ব্যবহার কখনও নৈঃশব্দ্যে, কখনও রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায়, আবার কখনও শীতের শহরে হারিয়ে যাওয়া কোনও এক প্রেমিক-সত্তার নির্জন স্বীকারোক্তিতে উন্মোচিত হয়। ‘এই শীতের শহরে’ কবিতায় উঠতে দেখি নাগরিক ইতিহাসের শোকপ্রবাহ—‘এ শহর আমার চেনা/ জানি না কখন হারিয়ে গেছে মেঘলেখা/ আমার নিজের সময়’ … শহর এখানে শুধু বসতভূমি নয়, বরং পরিচয়ের অন্বেষণস্থল। এই শহর হারিয়ে দেয় ‘জীবিকাজীবন, প্রেম’—তবু কবি জানেন, ঠিকানাটি হারায়নি—‘যেখানে শিশিরে স্নান হয় তৃষ্ণার্ত দুপুরে’। এ এক চিহ্নহীন শিকড়ের আকুল সন্ধান।

খ্রিস্টাব্দ দুইহাজার পঁচিশের জুলাই-এ প্রকাশিত কবির ‘নিকট থাকো বৃক্ষ’ কবিতাবইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে— ‘সমকালীন বাংলা কবিতায় এক স্নিগ্ধ ও দীপ্ত স্বর হোসনে আরা কামালী। তাঁর কবিতা যেন শূন্যে আলো ফেলার মতো—নিঃশব্দ অথচ দীপ্তিমান। হৃদয়ের দেউড়িতে বাজতে থাকা স্মৃতির বীণা, নারীচেতনা, ইতিহাস ও প্রত্নবোধ—নিভৃত রেখায় তিনি আঁকেন এক গভীর সংবেদনশীল প্রতীকময় কবিতাভুবন। কামালী-কাব্যে আছে শোকের স্থির জলের মতো ধ্বনি, আছে প্রেম, মনোভূমে উড়ে যাওয়া পাতার শব্দ, আবার আছে অস্তিত্বের জাগরণ ও প্রতিরোধের আত্মবাণী। মানুষ ও প্রকৃতি তাঁর কবিতায় মুখোমুখি নয়, সহযাত্রী…।’ তা বাড়িয়ে কিছু বলা নয়।

বস্তুত, কোনওরকম কবিতারই অর্থ ও উপভোগ কখনও একমাত্রিক বা স্থির নয়; তা পাঠকের সঙ্গে এক পারস্পরিক সম্পর্কে যুক্ত হয়। পাঠক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, রুচি ও বোধশক্তির পরিসর থেকেই কবিতার ভাষা, চিত্রকল্প ও অনুভবকে গ্রহণ করেন। সেই কারণে একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও আবেগের দরজা খুলে দেয়। কবিতা এখানে কোনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত বস্তু নয়; বরং পাঠকের অংশগ্রহণে তা ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়। এই পাঠপ্রক্রিয়ায় পাঠকের জীবনানুভব ও মানসিক প্রস্তুতিই কবিতার অর্থ ও উপভোগের সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে।

কবিতায় কামালীর অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো, তিনি নারীকেন্দ্রিক পুরাণ ও ইতিহাসকে বর্তমান নারীবোধের প্রতিরূপে রূপান্তর করেন। যেমন—‘এথিনাপর্ব’ কবিতায় দেখা যায় : ‘আমি জয়ী পিতঃ/ অযোনিসম্ভবা সন্তান আমিই দেবী এথিনা।’ এখানে নারী শুধু পিতা-নির্ভর জন্মলাভ করে না, বরং হয়ে ওঠে নিজেরই অস্তিত্বের নির্মাতা। এই প্রতিরোধী নারীবোধ আবার ফিরে আসে ‘শকুন্তলাগণ’-এ, যেখানে অপঠিত নারীকথা আলোতে হেসে ওঠার দাবি তোলে। যেখানে চোখ মানে দৃষ্টি, দৃষ্টি মানে জীবন। অশ্রু ও প্রতীক্ষার ভিতর দিয়ে অন্ধকারকে আলোয় টেনে আনার, দৃষ্টিহীনতার আগেই দেখার, পাথর হয়ে যাওয়ার আগেই অনুভবের ডাক—‘শকুন্তলা সখিগণ-/ অপঠিত তোমাদের বয়ানগুলো/ এইবার আলোতে হেসে উঠুক।’

হোসনে আরা কামালী’র কবিতা কেবল আত্মজীবনের পেছন ফিরে তাকানো/স্মৃতি-খননকারী নয়, বরং তা কখনও-বা হয়ে ওঠে নীরব রাজনৈতিক উচ্চারণ, কখনও কখনও নিঃসঙ্গতা ও পুনরাবৃত্ত আবেগের ঘনীভূত রূপক ভাষ্য, কখনও সময়ের টানাপোড়েনের ক্ষীণ অনুরণন, স্মৃতি ও ভাষার ক্ষয়মান ইতিহাসকে গাঢ় কাব্যিক পরিসরে সংরক্ষণের আশ্রয়, কখনও-বা আত্মপর্যবেক্ষণমূলক। এই কবি কেবল কবিতার নির্মাতা নন, একান্তভাবে সময়েরও ভাষ্যকার। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত ইতিহাস ও সামষ্টিক বেদনার সম্মিলন ঘটে এক আন্তরীক্ষ পাঠজগতে। কখনও তিনি শিশু, কখনও প্রেমিকা, কখনও দেবী, কখনও শোকস্মারক নারীর মুখপাত্র। স্মৃতি, প্রত্নচেতনা, প্রতীক, পৌরাণিক পুনর্বিন্যাস এবং দার্শনিক শোকবোধ মিলিয়ে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে পাঠকের আত্মবীক্ষণের আয়না। তাঁর কবিতা আমাদের শেখাতে চায়—’দু-চোখ খসে পড়ার আগে অশ্রু মুছে নাও। দৃষ্টিই জীবন।’
. . .

Book Cover: Nikote Thako Brikhkho by Husne Ara Kamali; Source & Credit: Author;

হোসনে আরা কামালীর কয়েকটি কবিতা


নিকট থাকো বৃক্ষ

কাকগুলো বাড়ি ছাড়ার পর
প্রত্মসময়ের বাণী ছড়িয়ে পড়ে প্রান্তরজুড়ে
ঘাসপোকার শোভাযাত্রা শেষে
সাতবিলা পার হয়ে যে শিশুগ্রাম
বধির বৃদ্ধের কথা ফুরোলে পরে
হে বৃক্ষ ছেড়ে যেয়ো না আমায়

অগহিন জলের মায়ায় শৈশবে
হাত থেকে ছুটে গেল সহোদর হাত
তবে আমিও অপরাজিতা!
নদীমেখে তুলে আনি জলের গ্লুকাস সিক্তডানার ওম নিয়ে ইতিহাস
ঘাসে লেখা আছে তার অবিকল স্বরলিপি হে বৃক্ষ আমাকে বিস্মৃত করে দাও

ভীত-ত্রস্ত আমার জিহ্বায় রক্ত
আমাকে রাখো পাতা করে তোমার ডালে
না-হয় ফুল করে রাখো, শোভা হই তোমার
আমার দু-চোখ অবধি বাড়িয়ে দাও শাখা সাজিয়ে রাখি কান্না, সাজিয়ে রাখি প্রেম দোহাই যেয়ো না, নিকট থাকো বৃক্ষ।

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
. . .

সুরমা, জল রাখো আমার চোখে

মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি ঝরল আজ
অনেকটা আগে ভাগেই ভিজল সুরমার চোখ

আমি তোমার তেঁজা চোখ ছুঁয়ে দিই সুরমা—
এই দেখো দু-হাত চুয়ে কত জল গড়িয়ে পড়ে
কত প্লাবন এসে ভাসিয়ে নিতে চায়—
এই জলেই তুমি দেখো আমাকে
কেবলই দেখো…

দেবী এথিনার যুদ্ধকাতর কষ্টের ইতিকথা
জন্মের পাপ কী করে যুদ্ধজয়ে ঘুচে যায় সুগভীর খাদ থেকে তুলে আনো নিখাদ মানবী আমায়—

নাব্যতায় আমাকে শুদ্ধ করো সুরমা
তোমার আবাল্যসখা মেঘ ঝমঝম বৃষ্টি হলে আমি হই উত্তাল গাঙ
মানুষের কান্নার সঞ্চয়ে যে নদী
হাসির কল্লোল জমিয়ে রাখা পলিমাটি
মানুষের স্বপ্নের সঙ্গী আমি সেই তনুশ্রী

আমাকে জল দাও সুরমা
সাশ্রু হয়ে উঠি—
বিশুষ্ক চোখে জলের প্লাবন ডেকে তোলো।

১৫ মে ২০২৫
. . .

আমার শহর

বন্ধু বলে — ‘তোমার শহর’
ওই কি তবে ‘আমার শহর’
ঠিক মনে নেই কোন সে প্রহর
পায়ের নিচের শক্ত পিচে
হারিয়ে গেছে খোয়াব সকল
আমার নিদান খুব গোপনে
এই আমারেই পোড়ায় কেবল

আমার শহর ঠিক অচেনা প্রেমের মতন।

১৪ জানুয়ারি, ২০২২
. . .

সারিগুটি হিজলে

মাটির পেটভরা বিষ
অমরাবতীর স্বপ্নযাত্রায় দ্রাবিড় সানাই
ফুল ফুল ফুল টি
তেল টি
জাম টি

গালভরা বাবল
চুয়ালের কোনায় বিষদাঁত
সুষম সুষম সুষম টি
এ কে দুসুষম টি

কোথায় সাকিন
আবুখালির পাড়ে ক্রন্দন থেমে নেই যুদ্ধকথা খামোখার এলেমবাজি

তারাজাম তারাজাম টি
একে দুত্তারাজাম

কদম কদম টি
এ কে দূর কদম টি

আমার ফুলেল শৈশব কেঁদে কয়!
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ হোসনে আরা কামালীর কবিতা নিয়ে প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন …

. . .

… ফজলুররহমান বাবুল-এর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন …

লেখক পরিচয় : উপরে ছবি অথবা এখানে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 14

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *