কবিতা সিরিজ : মেকদাদ মেঘ
পাতালের লৌকিক সাঁতার-৪

৩১.
কতটুকু জানো মানুষের ভেতর বাহির,
বীজের ভেতর কী করে বাড়ে আঁধারের তীব্র ক্ষুধা?
চামড়ার নিচে রাখা তিনশো পঁয়ষট্টিটি রঙের অক্ষর,
ব্যাকরণ মেনেও মানে না,
নখ দিয়ে ছুঁতে চায় গোলার্ধ
থমকে থাকা প্রাচীন তরল,
তাকে কি তৃষ্ণা বলবে? নাকি বলবে অবাধ্য ডালিমের ফেটে যাওয়া ভেতরের দানা?
কেউ কাউকে খুব একটা নগ্ন দেখিনি,
শুধু খোলস ভেঙে পরস্পরের ছায়া চিবিয়েছি
মাঝে-মাঝে ভেসে গেছি পাতালের লৌকিক সাঁতারে
. . .
৩২.
দৈব জলের আয়নায় দেখেছি নিভৃতে রূপ
টেবিলের ওপর পড়ে আছে অর্ধেক চিবানো ফল
যেন আমাদের অর্ধেক না বলা কথা,
অর্ধেক থেকে যাওয়া আঙুলের ফুল বিষাদের দাগ,
উত্তর-আধুনিক চিহ্নবিদ্যা ঘাম হয়ে ঝরে—
ঠোঁটের কোণে থাকা চিহ্ন কোনো আদিম পাপ নয়;
পাপের ফসল নয়, স্রেফ জলের টেক্সট,
যা পড়তে চেয়েছিলাম জরায়ুর সমীকরণ পেরিয়ে রাতের জ্যামিতি পেরিয়ে বৃত্তের পরিধি কেন্দ্রে উপকেন্দ্রে,
জলের মুদ্রায় আমরা প্রণয়ের জলখেলা খেলি
. . .
৩৩.
আবহায়াতের জল অনেকের কাম্য
সে জল তুলনাবিহীন!
রসালো দানার ভেতর কীসের ঘ্রাণ
আটকে আছে বুঝি সেলুলয়েড স্মৃতি
পিঠ বাঁকিয়ে নামিয়ে আনো রাতের জোছনা,
মনে হয় কাম শুধু কাম নয় অন্য বসন্তের হাওয়া চুম্বনের গভীরতা খোঁজা বৃথা,
ঠোঁট যেন দেহ ও চামড়ার প্রান্তিক সীমান্তের প্রতীক
আমরা সীমান্তে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি,
পরস্পরের সমন্বয়ে লিখেছি প্রেমের ইশতেহার। ডালিমদানাগুলো ছড়িয়ে পড়ে,
যেভাবে ভেঙে যায় আস্ত চেনা সভ্যতা প্রাচীনস্তম্ভ।
তবুও থেমে থাকে না পাতালের লৌকিক সাঁতার।
. . .
৩৪.
বাতাসের কম্পিত কম্পন
জল জলের ঘূর্ণন তল অবতল পেরিয়ে আসে
সূর্যের লৌকিক আলো, আমরা দেখি দৃশ্য দৃশ্যান্তর
দেখি বাজপাখিরও জ্যামিতি রয়েছে
ডানায় রয়েছে অভিজ্ঞতা মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ
ভাঙা নিয়ন আলোয় পালক ঝরে বাজপাখির, চোখে ঘুরে নীল রেডিয়েশন।
মেঘ শুধু বাষ্প হয়ে নয়, রঙ বেরঙের ক্রিয়ায়
ভেসে বেড়ায় মেগাবাইটের অলীক জগতে
মেঘ ডানা মেললেই ঝরে যেন পরাবাস্তব পরিমিতি সময়ের বুকে শোনা যায় ধাতব চিৎকার জলমগ্ন জলে।
জলেরও ক্রন্দন আছে
শিকারি নিজেই শিকার, ছায়ার টুকরো ছায়া,
নখের ডগায় ঝুলছে মৃত অতীতস্মৃতি,
ঠোঁটে লেগে থাকা নোনতা স্বাদের মতো।
পর্বত চূড়োয় নয়, ডিশের ওপরে ডানার ছায়ায় মানুষের ভাঙা অবচেতন মনের খণ্ডাংশ,
যেন শূন্যে স্থির মুহূর্ত কাঁচের মতো ভেঙে যায়
ইতিহাসের পাতা থেকে উড়ে এসে বসে জলবিন্দুর মতো ভবিষ্যতের শূন্য শূন্যতায়,
যদিও লোকে জানে জলের নিচেও মৃত্তিকা রয়েছে।
. . .
৩৫.
পা জীবনের গহিন প্রতীক
যেন পায়ের নিচে গলে যাচ্ছে ঘড়ি ঘড়ির কাঁটা,
আঙুলে তোমার আদিম গুহাচিত্রের খসড়া।
আমরা ছুঁয়ে আছি কোনো জ্যামিতিক শূন্যতা,
যেখানে শরীর মানেই নীলচে নদী উন্মাদ সমুদ্র। চুম্বনে খসে পড়ে আকাশের সিলিং,
যেন দুটি পরাবাস্তব দ্বীপ,
পোস্টমডার্ন জোছনার রুপালি জলে
ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের কামমগ্ন যৌথ ছায়া,
সহজে ভুলি না ছায়া প্রচ্ছায়ায় ছায়ার সাঁতার।
. . .

৩৬.
বলি আমাকে ভুলিয়ো না
সহজে ভুলতে যেও-না স্মৃতিচিহ্ন
আমাদের স্মৃতি ভুলতে গেলে দেহপিঞ্জরের ভেতর ভুলে যাওয়ার রোগে ভুগবে ধ্বংসাবশেষে
পাতালের লৌকিক সাঁতারে
জীবনসমুদ্রের জলে সাঁতরায় দেহমুদ্রার কোষ।
. . .
৩৭.
পাতালের লৌকিক সাঁতারে
ডুবে ভাসে ভাসে ডুবে
দেহমনের দাগে জাগে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি,
যেন লেগে থাকে মহাজাগতিক অগ্নি-ধুলো
জলবিম্ব মরূদ্যান, পিপাসার কঙ্কাল,
ভাষার ওপারের নগ্ন নগ্নতার শৈল্পিক কোলাজ। নিঃশ্বাস ডানা মেলে প্রজাপতির মতো,
রক্তের ভেতর ভাঙে রক্তের দেয়াল
নৃত্য করে হেসে ওঠে বিছানায় ময়ূরপঙ্খী নাও
কখনো কখনো বেঁচে থাকাই সংগ্রাম লৌকিক সংসারে।
. . .
৩৮.
আধুনিকতার আলোয় চুঁইয়ে পড়ে কাম,
আমরা ঝাঁপ দিই পাতাল থেকে পাতালে
কোষে কোষেও বিপ্লবের সুর,
মিথ্যা চিরকাল মিথ্যে, অবাস্তবের ঘোর।
হাতে হাতে আঙুলে আঙুলে জলে ও জঙ্গলে
দেহের ভেতর যে-উপাখ্যান লেখা হয়
যেন ব্ল্যাকহোলের পর ব্ল্যাকহোল কৃষ্ণগহ্বরের অন্যজগৎ।
কামেঘামে স্পর্শে মুহূর্তে থমকে দাঁড়ায় মহাকাল।
. . .
৩৯.
নক্ষত্রনকশার নিচে
দেহমন মাধ্যাকর্ষণের প্রাচীন নিয়ম ভেঙে
অগ্নিচূর্ণ সূর্যের যাত্রায়
যেন কোনো উপগ্রহ, রাতের জ্যামিতিক ক্যানভাসে রেখায় রেখায় আঁকা জটিল প্রণয়,
আলো অন্ধকারে জেগে ওঠে দেহতরীর
কণায় কণায় লেগে থাকা সায়েন্স ফিকশন
আঙুলের ডগায় অদ্ভুত থিওরি অব রিলেটিভিটি সমর্পণ চাই না, তবু খুঁজি মাংসের তীব্র ওমেগা;
নক্ষত্রের নকশার নিচে কাম যেন নশ্বরকোড,
যা প্রতিনিয়ত রক্তের ভেতরে বাজায় প্রেমের বাঁশি সেখানে স্রেফ নিউরনের তীব্র প্রেমের ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যায় একাকীত্ব, বহুরৈখিক বেদনা বিষাদ
চুম্বনের ব্যাকরণ ভেঙে সুতীব্র চুম্বনে
দুটি তরঙ্গের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়
মহাবিশ্বের নিঃসঙ্গ হাইওয়েতে প্রেম স্থায়ী
কখনো ক্ষণস্থায়ী, তীব্র ডেটা ট্রান্সফার
জেগে থাকা লৌকিক জোয়ার-ভাটায়।
. . .
৪০.
কখনো কখনো মানুষ ঘ্রাণজীবী
মানুষ ফুলের গন্ধে আকুলিবিকুলি করে
অন্ধকারেও টের পায় প্রাচীন শ্যাওলার ঘ্রাণ
চোখে ভাসে মনসার বেহুলা-জলসা;
কেঁপে ওঠে মাটির গভীরে মাটি
নিউরনে লেগে থাকা জলকাদা,
তারার মতোন রুপোলি তারামাছ সাঁতরায়
জলের শরীরে ডুবুরি খোঁজে জলের স্পন্দন;
যেন পাতালরেলে আমাদের লৌকিক ডুবসাঁতার
ক্রমাগত অট্টহাসি দিয়ে যায় অদ্ভুত মায়ায়।
. . .

. . .
… পাতালের লৌকিক সাঁতার-এর আগের পর্ব পড়তে নিচের লিংক চাপুন …
পাতালের লৌকিক সাঁতার-৩ : মেকদাদ মেঘ
পাতালের লৌকিক সাঁতার-২ : মেকদাদ মেঘ
পাতালের লৌকিক সাঁতার-১ : মেকদাদ মেঘ
. . .
লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম



