কবিতা সিরিজ : মেকদাদ মেঘ
পাতালের লৌকিক সাঁতার-৩

২১
জলের দর্পণে জল, দর্পণ-জলের প্রেতগাথা যেন
নদী বয়ে যায় প্রতিটি করোটির নিচে। জলের কল্লোলে প্রতিবিম্বে শরীর ছিঁড়ে পালায় দূরে, ছায়াচিত্রনদে শ্যাওলা-পড়া দেয়ালে মেঘের ছায়া।
জলের দর্পণে ভাসে মুখ ও মুখোশ
মানুষের চোখে গ্রহ উপগ্রহ মহাকাশ
যেরকম নক্ষত্রের জ্বলে ওঠে জলের আয়নায়
হাঙরের চোখে জ্বলছে যেন নির্বাসিত নক্ষত্র
একেকটি মাছের চোখ একেকরকম,
যেন জলের সংসার আরেকটি জলবিশ্ব
পাতালের লৌকিক সাঁতার কেটে
জলপাই রঙের জরায়ু জড়িয়ে ধরে সৌরসংসার।
লৌকিক সাঁতারে কেউ ভাসছি কেউ ডুবছি
যেন কোনো ওজন নেই, শূন্যতার গভীরে
লৌকিক সাঁতারের ডুবুরির গান, কখনো মনে হয় সময়ের চাকা বিকল করে দিচ্ছে যুগের শামুক!
. . .
২২
অতলান্তিক পাতালরেলে ভ্রমণ করছে জ্যান্ত মাছ
পরাবাস্তব উত্তর-আধুনিক চোরাবালি শুষে স্মৃতিচিত্র
হৃদয়ের নোনাজলের স্রোতে
আলো-অন্ধকারে কাঁদে পরাবাস্তব নীল তিমি।
আমরা সাঁতার কাটছি
যেন জলের সংসারে কোনো জল ছাড়া,
ফাটলে উপচে পড়ে প্রাচীন অন্ধকার
স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ধ্বংসাবশেষে জলের অতলান্ত জুড়ে,
যেন গহিন স্পেসের নিচে
হাসিকান্না নিয়ে জেগে আছে কোনো লৌকিক হ্রদ।
. . .
২৩
জলের সংসারে জল মাটি-চাপা স্রোতের জ্যামিতি
শিকড়ে আঙুল ছুঁয়ে নামে যেন চোরাবালি পরিণতি
মাটির নিচেও মাটি সমান্তরাল কোন সে জটিল গ্রাস কঙ্কালের বাঁশি শুনে জাগে যেন প্রাচীনের ইতিহাস অনেকে ভেসেছি এখনো ভাসছি চেনা অচেনা অতলে।
অস্তিত্বের অস্তিত্ব নড়ে ওঠে ক্রমশ জলজন্ম জলে
পাতাল কুয়োর ওপারে অনন্ত উৎসব কোলাহলে
. . .

২৪
ঘর্ষণের আঁধার চুঁইয়ে কোনো আরণ্যিক খনিতে,
নুনজলের ভারী চাদর বিছানো পাতালে
মানুষের অন্যভ্রমণ জৈব সত্তার রসায়ন,
সেখানে নদী থেকেও কোনো নদী নেই,
তবু মানুষ সাঁতরায়
শরীরে মেখে মৃত গ্রহ-নক্ষত্রের ছাই।
মৃদু আভায় জ্বলে ওঠে পিঠ,
ইস্পাত কঠিন হাতের ওপরে হাত
পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খায় আদিম কান্নার রিফ।
. . .
২৫
চোখের ভেতরে চোখ
চোখ খোলা, অথচ যেন দেখার কিছু নেই,
অন্ধকার জমাট বাঁধা কালো পাথরের মতো
কয়লার মতো কালোজামের মতো কালো অন্ধকার
বুকের পাঁজরে আটকে থাকে ফেলে আসা রোদ্দুর,
হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় না অপার আকাশ শিকড়ের হিমশীতল সুর ভাসে
যেন পায়ের নিচে তল নেই, শুধু শূন্যতার শূন্যতা
মাটির গভীরে স্পন্দিত লৌকিক সাঁতারের গান।
. . .
২৬
ফুসফুস ভরে নেয় মাটির ভেজা ঘ্রাণ আর পারদ, ঠোঁটে জমে ওঠে নোনতা স্বাদের একচিলতে কাদা। রুই-কাতলা নয়, এখানে সাঁতরায় ছায়ার মানুষেরা, যাদের পায়ের ছাপ ভুলে গেছে ওপরের চেনা বসুন্ধরা। তলিয়ে যেতে যেতে তারা খোঁজে একচিলতে আলো, যে-আলো কোনোদিন পাতালে এসে পৌঁছায়নি ভালো।
. . .

২৭
তোমার ঘ্রাণেই আমার ঘ্রাণ
আঁশটে গন্ধের জল কেটে কেটে এগিয়ে যায় হাত,
পাহাড়-পর্বতের নিচে আছে শত কোটি রাত
শত কোটি দিন
পাতালের লৌকিক সাঁতারের শেষ নেই,
অনন্তকাল ধরে চলে এই পাতালের লৌকিক সাঁতার যেন শরীর ক্রমশ ভেসে থাকে
শূন্যে শুধু বেঁচে থাকার প্রয়োজন।
. . .
২৮
অর্কেস্ট্রানিমজ্জন :
পাতালের লৌকিক সাঁতারে জলে অর্কেস্ট্রানিমজ্জন
ঠোঁটের কার্নিশে আটকে থাকে আদিম ফসফরাস। সাঁতারে পেরুতে গিয়ে অনেকে ডুবছে তরল অবস্থায় অমাবস্যায়
স্পর্শের স্মৃতি গাঁথা মুক্তোর মতো
যেন মেদহীন শরীরে লেগে আছে নোনাজলের ঘ্রাণ
যদিও জলের ব্যাকরণ সর্বত্র সচল থাকে না। আলোর স্রোতে ভেসে ভাঙতে পারে জলের গরিমা
তবুও মনে হয় তোমার নাভি যেন জলের গহিন কূপ
. . .
২৯
উষ্ণ আলিঙ্গনে মনত্বকে ভেসে ওঠে নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা
রক্তকণিকায় চলে লৌকিক কামাগ্নি-যুদ্ধ।
লোনা জলের গভীরে পুড়ে প্লাস্টিক সার্জারি
চেতন-অবচেতনের সাইবারনৃত্য।
যেন যৌথ ছায়া হয়ে ওঠে জলদস্যু
অন্ধকারের চাদরের নিচে
. . .
৩০
সাঁতারুর দেশে মাটির নিচেও যেন লুকিয়ে থাকে আদিম নদীপথ জলের সংসার
ক্ষুধার লিপিখণ্ড মাংসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাগায় পলিমাটির টান পরানের গহিন যাপনে
মাছের আঁশের মতো চকচকে রঙিন সে যাপন। বুদবুদ হয়ে উড়ে যায় সভ্যতার শৃঙ্খলের জলপুষ্পগুলো
তবু যেন জলেভেজা চুলে লেগে থাকে নক্ষত্রের ছাই
পাতালের লৌকিক সাঁতার আমরাই হয়ে উঠি একেকটি পৃথিবী।
. . .

. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ মেকদাদ মেঘ-এর অন্যান্য রচনা পাঠে এখানে চাপুন …

লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .


