I have never seen anybody so attached to existence: Salvador Dali

এই নগরে সে কুড়াবে না আরও কোনো পাতা। পান করেছো তুমি বৃক্ষের ছায়া, দশহাজার বছর আগেকার অজন্তার উঠোনে, সিন্ধুর অববাহিকায়। এই নগরে সে কুড়াবে দুঃসময় !
তোমাকে ভয় পাই, একবারও বলো না—
মানুষের, রাতের পর রাতের অবস্থান; আজিকার। গাঢ় করে বলো, ভালো আছি;
যে জন্মায়নি তার মতোই অপাপবিদ্ধ;
ভালো।
যে-মেয়ে গাইতে গাইতে গান, সহাস্যে দেখছিল তোমায়, তার কণ্ঠহারে দশটা প্রজাপতির ছায়া, আমি দেখেছি উৎসব-অন্ধকারে; সেই মেয়ে অভাবিত নক্ষত্রদের বোন। আর তুমি বলতে এসেছো—
তার ভাগ্যমন্ত কণ্ঠফুল ছিঁড়ে নিয়েছে এক মাতাল, বেলেল্লা, যাযাবর যুবক; মেয়েটি নির্বাক, তার ব্যক্তিগত গোলাপে ছিল আত্মা, পুনর্জন্ম; যুবক, তোমার জন্যে ভালোবাসা, জলদ্গম্ভীর!
তার পার্থিব তরঙ্গমালায় সমুদ্রস্রোত নির্বাসিত, কেননা
সে বানাবে পাথর কেটে স্রোত, পৃথিবী ভাসাবে অথৈ সমুদ্রসন্তরণ!
—আজ থেমেছে সুর, তার হারমোনিয়াস দেহে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পাথরযুবক।
তুমি সেই নবযৌবন, যার শরীরে গান ঠুকে লুফে নিয়েছিল মানুষ আর ভালোবেসেছিল নারী (মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করব না আর)। আজ তোমার দুঃসময়, জল থেকে কুড়াও কালোস্নান, সৌন্দর্যসাবানের ফেনা, তোমার শরীরে একাকাশ বেদনা, নক্ষত্রপুঞ্জ। মানুষের চেনা গ্যালাক্সি, তুমি
যার থেকে রাত্রিবেলা ঝরে মানুষেরই মৃত্যু অবিরত।
যুবক, তোমার জীবন যাচ্ছে সংগীতছাত্রীর শব বহনের দিনে, কিন্তু তুমি-তো তার জনক ছিলে, আরেক জন্মে তোমার শতরূপা সন্তান-সন্ততি ছিল গান। এ-জন্মে পৃথিবীর বসন্তদিনে তুমি আত্মরহিত আগুন, দেখো, আমার শরীরে বর্ষা রেখে যাচ্ছে তার অবৈধ সন্তান;
চলো, স্বর্ণকান্তি তরুণীর কেশ থেকে খুলে নিই শেষফুল; রক্তকরবী আর ফুল ধরবার দীর্ঘ অঞ্জলি, আমাদের অনেক, অনেক নবজাত ফুলের বাগিচা!
স্ফূর্তিমান দেহের বালিকা, দ্যাখো, তোমার কাঁপা কাঁপা স্তনের মতন আজকের ভোর। এই ভোর পৃথিবীর না, মানুষের, মানবিক উপমা হয়ে বালিকার স্তন; রোদরাঙা, অশাপান্ত
বাতাসের নরম আত্মজা—আমাকে পৌঁছে দিচ্ছে কোথাও। ওখানে তো গতদিনের শেষ রাত আর রাতের নির্জন, শব্দহীন বাউলমুহূর্ত, হাতে তার একতারা; বালিকা দেখো, তোমার অজান্তে সেই তোমারই দেহ হলো গান, বৃক্ষে জলদান; তখনই মানুষের সংগীতমেধা বালক-প্রতিভার মতো রাত্রি তার কণ্ঠে উঠে আসে, এসে, ফেলে দিচ্ছে তাকে একজন দু’জন না-ঘুমন্ত প্রাণে, যে-প্রাণ, দৌড়াচ্ছে ওই বালিকার নগ্ন স্নান-সপ্তাহের দিকে আর তুমি পৃথিবীর দুই মায়াবী তোরণের মাঝে দু’গাছি নির্বিন্যস্ত চুল ফেলে দেখে নিচ্ছো স্তনে আজ ক’ফোঁটা শিশির। কুমারী শরীর পেলে জলও কেমন যৌবন পেয়ে যায় আর রূপান্তরিত হয়; শীতক্লান্তজল, তুমি যদি মুছে ফেলো, আমি ওই দিগন্তকুয়াশা হয়ে লক্ষ রাখবো বালিকার ক্লান্তি। প্রাণ, দেহজীবী না-হও, মনে রেখো তোমার দিবাদীপ্তি আজো অচিন, সত্য-হৃদিমুগ্ধকর ইতিহাস আর নিশিগন্ধা দেহটি আছে বলেই অন্ধকার কোনোদিন তেমন নিবিড় স্পর্শে পেলো না এই মানুষজন আর আমিভূমিকে।
মানুষ আকাঙ্ক্ষিত, সেইহেতু দুঃখ পাওয়া জীব। কিন্তু কোন নক্ষত্রটি সে চায়, রাত ফুরোলেই ভুলে যায়। পুনরাবৃত্ত হয় রাত কিন্তু তুমি এতো দূরবর্তী আর বিস্মরণশীল অথবা সেই নক্ষত্রমণ্ডল এতো আত্মমগ্ন জীব, যে, মানুষ তা চিহ্নায়নে ভুল করে এবং মানুষে-মানুষে বাসনারাশি কেমন একাকার, পড়ে থাকে লোকায়ত দূরেই, মানুষ বিষাদগ্রস্ত আদিজনতা, যে-বিষাদ আন্তরিক।
তবু সে কিছু পায়, যাকে আশা করা অন্যায়, সেই নারীমানুষের মতো; গৃহস্থালি ছড়িয়ে রয়েছে তোমার হাতেপায়ে, সবখানে এবং তার তো স্বশরীর আর রয়েছে আত্মবিনাশ? তবু হাতে পেয়ে মানুষ ভাবে, তোমাকে চাইছিল তার জংলিগৃহবাস । ভাবে, তারকাদের দূরস্থাপনা স্পর্শের অতীত, ভালো। রক্তেমাংসে যে-মিথুনস্তম্ভ পৃথিবীর জলে জলে ছায়া ফেলে আছে, তার সবই-তো রৌদ্রকে দেয়নি চিতাবাঘের দিকে অপরূপ শৈশব, ঝাঁপিয়ে পড়োনি তুমি আগুনে, অগ্নিবাহিনী তুমি দাঁড় করাওনি নষ্টজলের সরোবরে, মানুষিক।
তোমার জন্মদেহ ছাড়া পৃথিবীতে রয়েছে আর কোন বস্তুউদ্ভিদফুল মানুষের ঘুম ভাঙানিয়া আশ্চর্য কলতান? কে তোমার আত্মসমুদ্রের বেলাভূমিময় ছড়াবে সৌন্দর্যের ফেনা, দীর্ঘ জীবনের? জলকে অবগাহন করাবে না তোমার ছোট্ট সুন্দর যৌবনে? দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেখো, গোধূলিলগন ক্রমেই অস্তমিত কোনো দৈত্যের মুঠোয়, প্রেতাত্মার নগ্ন ডানায়। জলদস্যুরা চিরকাল লুট করেছে তোমার জলবিম্বিত মুখ; আর তুমি বৃক্ষের নবপল্লব ছিঁড়ে ঝরিয়ে দিচ্ছো কষ, মানুষেরই হৃদয়ের কাছে তোমার কোনো ঋণ? গান লিখবে না, গাইবে না তোমাকে? নাকি এমনি এমনি মিথ্যে যৌবনের তীরে দাঁড় করাবে সব রোদ্দুর, যুবাদের কাঙ্ক্ষিত প্রেম? তোমার আজানুলম্বিত চুলে কে পরিয়েছিল ফুল? কে কিনে দিয়েছিল এক শিশি বিষাক্ত সৌরভ, তোমার শরীরে চুম্বনের খোঁজে গিয়ে পৃথিবীর প্রেমিকেরা জরাগ্রস্ত, হাসপাতালের বেডে মানুষের কাছে ক্ষুদ্র, শরণার্থী। বুনোগন্ধী দেহে পড়েছে আজ কলঙ্কপদচাপ, মতিমুক্তা খুঁজে পাতালে থেকেছো কতকাল, সুন্দরের চর্চা বলে মানুষ-শরীরে তোমার—অন্ধের দরোজা অনুসন্ধান!
দেখো কী বিপদগর্ভা বসুন্ধরাপ্রাণ, কেউ কেউ সমুদ্রে ছেড়ে দেয় বিষ আর ধানজমিতে বিষ আর পান করে বিষ…। বিষ আজো তোমার স্পর্শ পেয়ে হলো না মধু ও মৌচাক; স্ফুর্তিমান যুবতীর শরীরে বৈধ সন্তান!
গোলাপ ফেমিনিন, যে-গোলাপ লাল; শাদাগোলাপগাছ তবে ক্লীব। স্কুলের রাজা সমস্ত নির্জনে অন্ধকার ছুরি।
ফুল তার ডালে ডালে কী নিঃসঙ্গতাই না যাপন করেছে, বুনো আম-সুন্দরীদের মতো শান্ত ঘুমে যেতে মানুষ চাও না। যাও নগরীর তোরণশোভিত পথে আর ছিঁড়ে ফেলো ময়ূরপেখম, তুমি চেনো, কত আত্মশূন্যতা। পাখিরা যে গিয়েছিলো খড়-অন্বেষে, মৃত শস্যগাছ কুড়িয়ে কখনও পৃথিবীকে পুতুল বানিয়েছো? আমৃত্যু শরীর লুকাবার তরে শিখছো কবর খনন। আঙুলের অলংকারমূল্য ভুলে হওনি কুসুমিত দেহে নতুন পাপড়ি, মানবিক। সংলিপ্ত আছো, যেন মানুষ জানতে পার আমরা ক্ষুদ্র, পতঙ্গের মতো প্রাণী?
তোমার নেই কোনো নিজস্ব আলো, অন্ধকার পিছনে ফেলে, আলোভর্তি দেহে যদি অভিসারে যাও তবেই আমরা দেখতে পাই আয়নায় দাঁড়ানো—আমি, তোমার স্বজীবনের সত্য আর্তি, আরাধনা।
কে বিক্রি করে কাম, কে কামসন্তপ্ত কিনতে যাও নিখাদ অন্ধকার? শীতকাল তো পৃথিবীর, বসন্ত তো পাখিদের, হেমন্তের ঝরাপাতা; ছুঁয়ে দেখো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কত নোংরা, কালো চুলে বসে আছে শীতের রেণু, না, আমি আর শিউলি ফুল ভালোবাসি না, কারণ আমার রজস্বলা পড়শিনিরা দূর পাহাড়ের সানুদেশে খুঁজতে গেছে সংসারের লাশ এবং বেনোজলে মৃত প্রাচীন বাগানের শখ। সন্তানের তরল দেহভঙ্গিমা যে-রমণী পাত্রে পাত্রে করে পান, তারও ক্ষুধা ছিল এবং আমারও ছিল ভরা গ্রীষ্মে আপন শীতকাল। বৈদ্যুতিক আত্মজা তোমার দেহস্মৃতি নিয়ে কয়জন বেঁচেবর্তে আছে, জানবে না, কেননা তোমার আজ পালাবার
শেষদিন, সন্তানের সারামুখে রেখে যাবার কথা শেষচুম্বন।
তুমি বস্তুপূজক, চাঁদ সওদাগর; বাণিজ্যবীর। সব অন্ধকার এক নয়; না-জানো সত্তাহীনে কীভাবে ভূষিত, অলঙ্কিত নিজের জন্ম ও মৃত্যু; না-জানো আকারহীনে কীভাবে দিতে হয় শরীর, দেহভর্তি বেদনা; ভূ-খণ্ডে লিখিত হওনি—পৃথিবীশোভা, যাও শুধু একমগ্ন জীব, লুটে নিতে প্রাণের ক্ষুদ্রপ্রাণ এবং জান্তে অজান্তে বিদীর্ণ হও খণ্ড খণ্ড মাটি, কবর খনকেরা জানে শূন্যতা বানাবার সকল রীতি। বিধান-সংবিধানে মানুষের স্থৈর্য ভেঙেছো আর টেনে টেনে উঠে এসেছো, কতো-যে পাতালে তোমার এই ছেঁড়াচ্ছিন্ন শব! বিনিময়ে দাও, কিনে নিতে চাও; গুহাবাসী কন্যাকে ধর্মে দীক্ষা দাও আর সন্ধ্যাআঁধার থেকে ভোরাবধি কে দেয় পাহারা? তোমার কাম, রতিকল্পনা।
আমাদের গলন্ত প্রেম সৃষ্টি করেনি কোনো নদী, তারা কেবলই বাষ্পে বাষ্পে মেঘ আর মেঘে মেঘে শিলা হয়ে ঝরেনি, থমকে রয়েছে চির স্তম্ভিত, স্তব্ধবাক—দেখো, শিলাবরিষণকালে কেবলি শস্য আর বাস্তুভিটা থ্যাঁতলে চাকার তলে পড়া ব্যাঙের জীবন হয়ে রয়। অভিজাত বংশ-সন্তান, রাজসন্ততি, নারীর গর্ভান্ধকার অপরূপ, কীরকম জানবে যেহেতু অন্ধকার মানেই ভূতপ্রেত। অথচ সেই নিঃসূর্যসময়ে লিখিত হয়েছিল প্রথম প্রেম-চিরকুট—প্রতীক্ষিত আলোকে তুমি পুড়ে-ঝরে কালো কেমন অচেনা অশ্লীল। অথচ অন্ধকার মানেই তোমার গুলি-নিক্ষেপ-কাজ পাগলের মতো আর ভোরবেলা ঝরা ফলের পাশে মনুষ্যলোক,—নিস্তেজ।
আমাদের প্রেম কোথাও পুনর্জন্ম পেলো কিনা অথবা আমরাই তাকে ফেলে এসেছি কিনা আমাদের আদিম বংশধরের নিঃসঙ্গ কবরের মতো, দূর দূরদেশে? খুঁজতে যাওয়ার বদলে, গণিতের সূত্রসন্ধান করেছি আর অঙ্কন করেছি ঠিক ঠিক তোমার মুখ, মাথার খুলির মাপে—ভূ-গোলজ্যামিতি। আজ শস্য বা প্রাণদানে যখন স্থাপন করবো মর্ত্যের শীর্ষে তখন তুমি ধারণ করেছো, না না কাউকেই নয়। এমনসব স্থানে মানুষের মৃত্যু, যেখানে তার কোনো সম্পর্কস্থাপন অথবা সম্পর্কচ্ছেদের ইতিহাসগ্রন্থ নেই। ভালোবাসাবিনা আমার ঈর্যাই তোকে টেনে এনে ফেলেছে আমাতে। কত আগেই তো গেছো বিদ্যুতের খুঁটি বেয়ে আনতে গেছো ঈর্ষান্বিত আলো, মরণ। কে দেখবে আজ গতরাতে মরে ঝুলে আছো যে-বিদ্যুতের তারে, যেন স্তন্যপায়ী বাদুড়।
জন্ম থেকে আজ অবধি উৎপন্ন করেছো যত শ্বাসবেধী গন্ধঘ্রাণ তার কিছুই-তো উপলব্ধি করবার কথা ছিল না? রক্তকে স্নান করাবার জন্য যে-সব বাতাসবায়ু, আজ তারা, দেখো পাথরপ্রাচীরে ধাক্কা খেতে খেতে হারিয়ে ফেলেছে তাদের জলবোধি। মানুষের জন্য স্নাতক হয়ে দেখি মানুষ থাকিনি; হয়ে আছি সার্কাসের চিড়িয়া, বাঘহাতিবানরশেয়াল। পৃথিবী তার পাহাড়প্রেরণা হারিয়ে চিড়িয়াখানার প্রতি প্রণম্যস্থিরদৃষ্টি ফেলে কেন চেয়ে আছে, প্রিয়নারীপুরুষ সেই কথা ভাবোনি একবারও, ভেবেছো ময়ূর কখন মেলবে পেখম এতো মূল্যের নাগরিক জঙ্গলে প্রবেশ, রেখে আসা ব্যতিব্যস্ত সংসার ও সম্পত্তি। কে বলেছিল, ময়নাপাখির মুখে শুনতে তোমাকে ভালোবাসা? দায়িত্বজ্ঞানহীন গৃহপালিত কুকুরের মতো যে-যার খাদ্যগুদাম আর প্রহরার কাজে আছি গুপ্তধনে ভরা লোহার সিন্দুক। একজনার এতো অশেষ বৈভব, বিভূষণ দেখে ফেলে আমি মানুষিক অধিকারে ভাবতে পারি তুমি ছোটো, আরও ছোটো? মূলত যে-কোনো শস্য ও বিজয়ের দিকে যে-কোনো মানুষের জন্ম নিতে পারে হাসির ইচ্ছা, সুখাদ্যের প্রতি একটু মমতা?
রূপান্তরের দিকে শুরু হয়ে যাওয়া রাত—শরীর চুঁয়ে পড়ছে পাখির ঠোকর, জন্তুজানোয়ারের লালা; ভোরের দিকে সূর্যশক্তিতে বিনত প্রণাম—নিচুনত জানুতলে একটি স্ত্রী-পদছাপ, ওখানেই জড়ো আছে জন্মহীন পুরুষের কাঁপা না-কাঁপা বীর্যের সুঘ্রাণ।
নষ্ট করবার বদলে তুমি এ-জীবন রেখেছো কোন তোরঙ্গে তুলে, তার শবসৎকার করবে কে? খুলে দেখো কবেই সে মরে গিয়ে, মৃত? গর্ভিণীর ভ্রূণ ধারণের সতর্কব্রত ঠিক তেমন, আমি যেমন হাড়েরক্তে মেদে ও মাংসে বয়ে বেড়ালাম তোকে, তোর সত্তা ও শত শতকায়ু কোথায়, অন্তর্লীন? তবে আমি তলিয়ে যাইনি তোর শূন্য ছাপিয়ে আরও কোনো নবদূর শূন্যান্তরে?
স্বপ্ন-আরাধনা-বস্তু ছিল মানুষ, তার নিশিবেলাকার গান? না, রাজপ্রাসাদের স্বর্ণখচিত দরোজা আর দরোজার ভেতর নিজস্ব জলবায়ু; পৃথিবীর আবহাওয়া তোর পছন্দ পেলো না। যার প্রার্থী তুমি, যাকে পেলে আত্মপ্রসাদের জ্বলনে অগ্নি-তো-নারী; ধুলো উড়িয়ে, রক্ত কুড়াবার প্রতি অশ্বপিঠে আরোহী, এক-দুই জীবনের সমস্ত বিনিময়ে সে-তো মানুষের মতন শাদা, মাংসরক্তের জীব নয়; সে তোমার সেইসব কঙ্কাল, যেইসব জীবাশ্ম হত্যার শেষে সমুদ্রে ভাসিয়েছো আর ভাবছো বেঁচে আছো। বিভ্রান্তির এইসব মুখ, সুন্দর মুখশ্রী আর কারো নয়, অর্জিত, মানুষিক সফলতা! আর না হলে কাঁধে হাত রেখে আজও তো চাইলে না জানতে ঝড়োকালে কীরকম বেঁচে ছিল জীবন্মৃত।
ভালোবাসা; ভাষান্তর-অযোগ্য মানুষের মাতৃভাষায়। শিশুরা শেখেনি ফুল থেকে আপনে, আপনে তুলে নিতে দীর্ঘ চুম্বন। মানবশিশুকে কিনে দিয়েছি আমি খেলা, বৈদ্যুতিক ঘাসমাঠ; সবখানে কতো আগে পা থেকে শক্তি ফেলে, থুতু থেকে বিষ ফেলে আমি হয়েছি একেবারে আমারই—কাঁটাতারে ঘেরা গোলাপ গাছেও তীব্র কাঁটা। তোমাকে সেইদিন, প্রত্যেকটি দিন জলের প্রবেশবিরোধী পোশাক, বৃষ্টিবিরোধী কালোকোট পরে জলমিথুনে লিপ্ত দেখেছে কন্যাকুমারী স্নান।
আমি কাটিয়েছি ছুটি, ছুটির পর ছুটি ছিল আমার একক; জেলজীবন। যে-জীবন অন্যগ্রহ থেকে ঋণ পায়নি সময়, পৃথিবীময় ব্যতিব্যস্ত কিশোর পইপই করে খুঁজেছে তাকে যোগ্যতা দেবে সেইরকম উজ্জ্বল উপাদান, দেখো, দেখছি-তো আমিও—সত্যসিংহাসন কোন অতলজলরেখা বেয়ে তলিয়ে যাচ্ছে ঊর্ধ্বাকাশের পেটে, পৃথিবীর পা-তলে কত কত বছর থেকে চাপা আমি; ভূ-গর্ভের বেজন্মা সন্তান? তোর শরীর ঘেঁষে বসতে চাইছিলাম, শুনতে চাইছিলাম নীরব হয়ে যাওয়া একজনার শব্দহীন সুন্দর ঝংকার; কেউ কোনোদিন না-জেনে ইতিহাস, না-জেনে তোর শ্রেণি ও সম্মান, পেয়েছিল তাকে তোর প্রেমিকস্বভাবী রাত্রিবেলা একা?
স্থাপত্য হয়ে নাকি স্থপতি, না স্থাপনায় অন্তরিত ছায়া, মানুষের বিষ কিংবা কল্যাণের উদ্ভাবক না পাগলোদ্ভাবন, চেয়ে যাবো চুম্বন নাকি দেখবার শক্তি? কথা বলতে বলতে, না সব হৃদয়ের প্রতি ছুঁড়ে দেবো গভীর নির্জনতা? উনুন, আগুন, আগুনের আঁচ নাকি আগুনের আলোবন্ধু? স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে যাবো নাকি চাইতে যাবো সেইসব পূর্ণতা? (যেইসব শূন্যস্থানে মানুষের দীর্ঘতম শ্বাসগুলো জড়ো হয়, আর হয়ে ওঠে কৃষ্ণগহ্বর)। নত, উন্নত, নাকি ঢেউভাঙা ঢেউয়ে, ঢেউ হয়ে স্রোত, ছুঁতে যাবো আরেক স্তব্ধ স্রোতের শরীর? উৎসর্জন, প্রান্তর্জন করে, বাজিয়ে বাজিয়ে শব্দ? নিঃশব্দ দাপিয়ে, সুন্দরে সুন্দরে পূর্ণ হয়ে নাকি সৌন্দর্যশূন্য যাবো? কলঙ্কিত, অলংকৃত, মানুষিক না ধার্মিক? চলচিত্তে, স্থিরচিত্তে, স্বচেতনে নাকি মগজে ভরে যাবো পরচেতনা? তুমি শ্বেতদূর্বা? ডাক দেবো স্তোত্রপাঠক? সত্যনগ্নতা? গজদন্তমিনার থেকে নেমে নাকি ফেলে আসবো অন্ধকার? বিষ ও বিষাদ, উৎসব ও উৎপাদন; বজ্রবৃষ্টির ভেতর দিয়ে নাকি তাড়িয়ে তাড়িয়ে যাবো জোনাকি? শস্ত্র, মানুষের চিরদিনের ভিক্ষাহন্ত, যৌনশরীরের সঙ্গে বিভোর, অন্ধকারে ফোটা পুষ্পগন্ধের টানে নাকি উদযাপন করতে যাবো প্রেম? স্বরাজ নাকি দাঁড়াবার একটু অধিকার; ভিনভাষে করতে যাবো নির্ভাষ? বাগদাদ ধ্বংসস্তূপ—জানাবো নাকি হাসিতে গলে গিয়ে বলবো, দেখো শান্তি, এই হলো বিজয়ের দাগচিহ্ন; জানোই-তো জয় মানে দূরে কোথাও নিঃশব্দ কিছু পরাজিত মুখ; আমরা সেই জাত, আমাদের জয়-তো নিশ্চিত। শকুনের সম্মুখে হবে শবোত্থান আর মানুষই বলবে—প্রকৃত দুর্গন্ধ। আকাশি পাহাড় থেকে শিলাবৃষ্টি নিয়ে যাবো নাকি মাটির বিলে গুনতে যাবো রাজহাঁস? অতিথিলেখা-পাতা হাতে যাবো নাকি লগ্ন তিথি মেনে যৌবনে ব্যস্ত জাহাজের পোতাশ্রয়, চাইবো? মায়ের প্রথম সন্তানের মৃত্যু আর সপ্তম সন্তানের জন্মখবর বলতে যাবো, নাকি বলতে যাবো—মাকে দেখবো না আর গর্ভবতী?—আমাকে শেখবেনা কেউ, কীভাবে গুনতে হয়। শহরের গৃহীত প্রশ্বাস। দূরভেদি দৃষ্টি না গভীর-অন্ধ অনুভূতি তুমি? অসময়ে ধরে নেবো ভ্রমণশীলা—হাত? আমার কেবলই ফড়িং ধরাধরি, গৃহকোণে মৌচাক।
তোমার বংশবিস্তারের কথা, কথা জনুশাসনের? পেরিয়ে আসা ঐতিহ্যের মতো রোদ্দুর না অভ্যাসের মতো ভবিষ্যৎ, নীতিভূক্ত, সমাজ থেকে চ্যুত; শৌর্যবস্তু না অনার্য যুবক? মহাদেশিক জাহাজের নাবিক না মফস্বলী নৌকোর মাঝি? কারো সমীপে, ঘনশান্তির তলে না দূরবর্তী চাঁদতারা? ঠোঁটের ওপর যৌনঠোঁট শুধু? ফাঁসলাগা প্রশ্বাসে নয় কোনো বায়ু সঞ্চালন? সর্বাঙ্গে যাবো, গলিত-যে তাকে শরীরের শৃঙ্খলসীমানা দেবো বেঁধে? দেখো তোমাকে দেখতে চাইছে কারো তামাটে মূল্যবোধ। আমাকে কেউ আজো বলেনি সে কোন প্রাঙ্গণ বসুধার। কেবলই পাথরের ঝিমঝিম একাকিত্ব হবো; দুর্ঘটনার দিনলিপি। তুমি শুনতে চাওনি এই আমি বিচ্ছেদকাহিনি; সংযুক্তিসাধন নয়, বেহালাবাদকও না? রক্ত বাজানো আর পাহাড় বসানো, ধ্বংসলীলা, বেঁচে ফেরা একা কৈশোর। হাজারদিনের আয়ু একদিনে পান করতে বলো, আমার মাটির দেহটি কেটে দেখো শুধু প্রাণকণা নয় হাজার মৃত্যু করে চলাচল। স্থান কিংবা শূন্যতা কোথাও নেই তার পরিচয়, যে-কোনো ভূমিজুড়ে খেলতে দেখেছে সে রোদশিশু, ঘুরে ঘুরে পড়তে দেখেছে রঙিন ওড়াওড়ি। অগ্নিগর্ভা, লাল ফায়ারব্রিগেড যাবে আগুনলাগা মানুষের প্রতি? পাহাড়ে খোদিত জাতনীচু, না-গোত্রমানব, আদিশক্তি, সূর্যদিনেরা আজ? জলে মিশ্রিত জল নিশীথনিবিড় দেহবেদনা, অরণ্যের অন্তর্দৃষ্টি, নগ্নচোখে জানতে চাওয়া মুখ, ভদ্রলোকের নিজে থেকে দূরত্বরক্ষণ? কালোদেহ-সন্ন্যাস, সুবিন্যস্ত আলতাদুধে?
প্রতিশ্রুত দিন শেষের ক্লান্ত সংগীত
যে-নদীর জন্মস্মৃতি মৃত, মানে, কোনো মানুষ বেঁচে নেই, যে, যাহারা বলে দেবে—একদিন ভোরবেলা আমরা শুনি জলের গর্জন, আর দৌড়ে গিয়ে দেখি লোকালয়ের ফাঁকে ফাঁকে গড়িয়ে নামছে এক নদী, তখনও বুঝিনি সে নদী, তারপর এই জলতোড় আমাদের স্নানের ইস্কুল, গানের শ্রোতা আর পূর্ণিমারাত্রির গভীর বন্ধুতা। কেউ নেই, পৃথিবীর কাউকেই দেবে না তার জন্মরহস্য বলে, মানুষকে সে জানায়নি তার শুরু, শুধু মৃত্যু মুখস্ত করেছি, যেমন বয়স্ক পাঠ করে বন্ধুর শোক। এখনও আছো, পিঠে নিয়ে পণ্যবাহিত নেভি এবং জলযুদ্ধের মহড়া মানেই তোমার শান্ত শরীর। বলো, কীভাবে লিপিকার জানবে তোমার জন্মাক্ষর? জলবালি, পাড়ের ভাঙা বাড়ি আর দুপুরের রোদ, পালে পালে কৈশোর নিয়ে তেমন থাকোনি, যেমন থাকেনি মা সন্তানছায়ায়। লিখিত হও তবু আদিম জলের শরীর, কাল তো সবই খাবে, ফুরোবে জল, বর্ষার ভাসানে তুমি আরেক যৌবন, নয়াবৌ চিরদিন যাবে তার বাবার বাড়ি;
জলের শরীর ছুঁয়ে দেখেছি যে-কোনো বয়সে সে তরুণ জলই। বুড়ো নিমের ছায়া স্রোতে স্থির, মানুষ ভাবছে অস্থির, তুমি দূর দূর সাগরের প্রেমিকা!
ছাইদানি হয়ে, দুইহাত পেতে বসে আছো আজীবন। দিন-তো অনেকই গেল, দেয়া হলো রক্তের ছাই, আজ, যখন ভাবছি আর কোনো দূরত্ব পেরুবো না, তখনই এই- জীবন, এই-কাল থেকে বেরিয়ে পড়া কাঙালের মরণ তুমি, ধরিয়ে দিয়েছো পলাতক জ্বালানির গায়ে পুষ্পিত আগুন! কড়া আয়রন-শার্টে ঘরে ফিরে দেখি লেগে আছে স্ব-রক্তের মৃতদেহ, কখন ছিঁড়েছি তনু? ভালোতম বন্ধুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে মুখ, আমি-তো ছিঁড়েছি কুসুম; কোনোদিন বাতাস না পেয়ে বন্ধুর মতো কাঁপেনি প্রকৃতি! কেন চাওনি দিতে সেই কথা, যে-কথা দেয়া হয়নি আজো; মানুষ শুনবে না মানুষের মুখ থেকে যে-গোপন রাত্রি, সেই রাত্রি কেন তোমার একার? একাই পাহারা দেবে মৃত পিতাকে সারারাত? বন্ধু আমাকে নে, নেবে না তোর… আমি-তো কথা দিয়ে কথাকে অবগাহন করাবার জন্য নগ্নিকার স্নানের দর্শক, শুঁকে দেখতে চাই-ই চাই নতুন বর্ষদেহে ঘ্রাণ! কিন্তু আজীবনই রিফিউজড তুমি? মানুষের মিলিত হর্ষচিৎকারে কুড়াবো গিটার?
অথচ যেতে যেতে কবেই ভুলে গেছিস তোর না-দেখা পরিচয়, অচিন মানুষ হয়ে, আপনার কাছে তুই কী সুন্দর, দেশান্তরিত যুবক! অথচ আমরা-তো জানি কেউ কিছু হারায়নি আজো, তোর কিছু ছিল, জন্মপ্রাপ্ত? তোর আলোনির্ভর বোধ; কবে আর ছিল অন্ধের দৃশ্যপ্রতিভা, এখনো অন্ধকারে, খাদ্যসংগ্রহে তোকে আমি পুরনো আসবাব ভেবে ফেলে রাখি উন্নত সিঁড়ির তলে। আলোরও শব্দ আছে। সেই শব্দ কোনখানে ধাক্কা খেয়ে কোথায় মরেছে না জেনেই শূন্যচুম্বী বাড়ি আর আলো আলগানো রীতি। কারো জীবন করেছে ভোগ ‘বিপন্ন বিস্ময়’।
‘দাম্ভিক-নীরবতা; নির্জন যাযাবর, অভিশাপ নিয়েই প্রস্ফুটিত হও।’—ঠুকরে ঠুকরে যদি নিঃশেষ করে বোধিবৃক্ষের চারা, আমি কি বিনষ্ট তোকে মেলে দেবো সূর্যালোকে; যেমন ভেজা হাওয়া মানুষের দেহকান্তির আলিঙ্গনে গান থেকে আরও তীব্র গানে, স্পষ্টতম একজন করে তোলে, মূলত যে-আমি অথবা আমার সেরকম ভ্রান্তিবিভ্রান্তি! চেনা কিশোরের প্রেমিকাও একদিন হেঁটেছিল বিলুপ্ত ভালোবাসার দিকে আর একমুহূর্ত হলেও ভেবেছিলাম—পুরাণ-আত্মজা; কীর্তিস্তম্ভ—যাকে ভাঁজ খুলে বলে ফেলা যায়, জন্মজনিত হৃদিমৃত্যুকাল। যে-সব কলঙ্ক রাত্রির বাইরে যায়নি। আজও, শুনেনি পড়শিজনেরা। সে-কালো আমি নয়, আমি তোর দেহান্তর, অসুন্দর ক্ষত; যার জন্যে মানুষ দীক্ষা দিয়েছিল ভিক্ষাহীন পাত্র হাতে তোকে ফিরে আসবার সব পথ। বিন্দু জল, তোর সূর্যমেধার কাছে শূন্য, মিলিয়েছিলাম তোরই সন্ধ্যাসরোবরে। যে-স্নান কেউ দেখেনি, যখন সে আমাকেই ভর্ৎসনা করে আর চুম্বনের শেষ চুম্বন পেয়ে যায় আমারই দেহ।
আমাকে যেভাবে ডাকি আমি সেইভাবে সেই সংগীতে ডাকো। নিজস্ব ফুলবাগানে তুমি পালন করো না সাপ। অন্তর্দীপনে দেখো, মুখস্থ হয়ে যাবো। পোকাপতঙ্গপিঁপড়েরা তোমাকে তো পেলো? সে ছাড়া আর পায়নি কে মুকুরে রেখে যাওয়া তোর ছায়া! রাতে ডাকে যে-পাখি, সে কি ভোরের পিয়াসী; ভোরে ডাকে যে-পাখি, সেও কি নয় আর কোনো রাতের সঙ্গী? কেউ এবং জানো না তুমিও। সূর্য আসবে তবু, মৃত যুবকেরা চাইবে না প্রেম পুনর্বার। একবার উপলব্ধি করো তাকে, প্রিয় মানুষের শব-সম্মুখে দাঁড়িয়ে যেভাবে করে বংশধরেরা। সেই-রকম একবার অনুভব করো, যে-কোনো সত্যআশার মতো, তাকে হারানোর ক্ষতিবিক্ষতি! পণ্যপৃথিবীকে চাও যদি, না-যদি মানুষ, জীবন্ত মৃতদেহ তুমি।
হতে পারি প্রাণকণা, যদি বসুন্ধরা ধারণ করো দেহে; ভালোবাসা। এবং পানপাত্র, পিপাসাও, ভেঙে যদি ফেলো না অকস্মাৎ, দুই হাত চিরদিন অবিশ্বাসী; একবার স্পর্শ করে দেখো ভঙ্গুর এই মানবশরীর। প্রত্যাখ্যান করবার একশো-এক রকম পদ্ধতি আর গ্রহণের একহাজার একটি প্রণালী যেখানে, সেইখানে আমি। এবার ঋণ ঘুচাবার জন্য নিতে চাও কি। আমার প্রার্থনাক্ষণ, নরকের আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করেছো। তারপরেই যোগ্যতম দর্শন আর দার্শনিক প্রাণময় যুবক, কবি ও দেয়াললেখক। কোনো দেয়ালে পাওনি খুঁজে বর্ণমালা, পারিবারিক অক্ষর কিন্তু জানো ঠিক কার অভিশাপে কেউ মুহূর্ত এক না-শিখে অশান্তি, লিখে ফেললো ঐশ্বর্যময় গোধূলি ও অঙ্গশরীর? ধূলি যেভাবে ওড়ে এবং যেভাবে ঝরে মেঘ, মুখস্ত করো তাই-ই, পাপড়ি মেলবার মতো করে তোমাকে সে খুলে খুলে যাবে, টেরও পাবে না। তাহাদের ছিল এই নিবিড় পরাজয়। আরও আছে? ঝরে পড়বার কালে মেঘেরা যে-বাষ্প হতে চায়, তপ্ত হতে চায়, ঘর্ষণে ঘর্ষণে বজ্র উৎপাদনে, আগুনে, সেখানে মৃত্যুরও বেশি ভালো আলোই ছিলো; গোপন গৃহছিদ্রে তারা আকাশ থেকে নেমে উল্লসিত ঝড়োরাতে খবর নিয়েছিল? বলেছিল, ঝড় হলো মেঘক্রোধ, আত্মাভিশাপ। ভোরবেলা পাঠাবো পাখি ও গান, বিবাহ ও রোদ্দুর…। মানুষই-তো রাজা হয়, রাজ্য বানায় কারুকার্যময়, মরে পড়বার কালে তুমিই চাওনি ভক্তি? গাওনি মাটিমাখা মানব শরীর?
তুমি-তো সেই চমৎকার গ্রাম এবং তারই ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়া মেয়ে রোদে পোড়া; তোমার সর্বনাশ, অজানিত? বলো-তো আজকের এই চাঁদসম্ভব সন্ধ্যা, বিশ্বম্ভরা, নানা প্রকৃতিমানব কোনরকম লাগছে; কত বছর পাই না শিহরণ, হওনি প্রার্থী, বাস্তব-কাঙাল, বিসর্জন চিরকাল দেবতাকে নয়, অতি সন্তর্পণে আমিও গ্রামমাটি চ্যুত, নগরআকাশে কাক, কিম্ভূতকিমাকার—লাল। সুস্থির চলাচলা করিনি; বৎসর ঘুরে মরে আরো কত বৎসরের পায়।
কল্যাণের দীপ্তি দেবে যে-আগুন তাকেও তো মানতে হবে সীমা, সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাক অতন্দ্র ব্রতছায়া।
কেন সে আগুনের ভিতর পথ খুঁজে পাবে না? তুমি কী অগ্নিজ কীট? আলোতে দেখেছি প্রেম, ভোরজন্মকাল। বিক্ষত ছায়া তোর—কিশোরীর হাতেধরা ছেঁড়া ফুল, প্রার্থনা? না জানাই থাক; পুড়েওছি আগে বহুবার, এইবার সেইসব দাবানল, অরণ্যবিনাশী আগুন শরীরে সংক্রমিত হোক তোর;—নে এই হলো সত্য, এতোকাল যার সংস্পর্শে আসেনি ঈর্ষা। ঈর্ষাবিনা অন্য কোনো স্বস্তি ছিলো না তোমার, গ্রহণ করো চুম্বনের তলে তলে আরেকজনার একাকিত্ব থেকে স্ফুরিত বিষাদ।
অথচ আজ আমরা কথা বলছি অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক। কেন হবে ছাই সব পাণ্ডুলিপি, রক্তলিপি সব পুড়িয়ে সে পুড়িয়েছে শিলালিপি সবই, জয়ের প্রতি উড়ন্ত সময়ের প্রাণিক পাথরেরা পুড়ে হলো ভস্মজীবন। একদিন খুব রাত করে বাড়ি ফিরে আপন আগুনে আমি লিখিনি তোমায়? বিজ্ঞানে ছেড়ে দেয়া মানুষের শান্তি ও কল্যাণ আজ তাই আগুনও ডিঙাবে পাহারা, মনীষার ধ্যান। বিজ্ঞান, তুমি নও মানবসন্তান
রাখোনি কথা।

. . .
পাঠ-সংযুক্তি : এক পাথরযুবকের আত্মলিপি

মুহম্মদ ইমদাদ-এর কবিসত্তার গহিন থেকে উৎসারিত এই মনোলোগ কুড়ি বছর আগে গুটেনবার্গের ছাপাকল থেকে বের করেছিলেন ছোটকাগজ সূনৃত সম্পাদক কবি আহমদ সায়েম। ইমদাদ তখন তারুণ্যে ঝলমল ভাস্কর্যের মতো সুঠাম। সহপাঠী প্রাণবন্ধু এমদাদ রহমান-এর মতো দুর্নিবার ক্ষুধায় দেশি-বিদেশি বইপত্র গিলছেন। দুজনে মিলে টো টো ঘুরে বেড়াতেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর থেকে সিলেট শহরের অলিগলি। গায়ে ছাত্রত্বের গন্ধটা তখনো বেশ টাটকা দুজনের। ওটা শেষ হওয়ার পথে যে-জীবনের সামনে মানুষকে দাঁড়াতে হয়, তা সচরাচর এমন-যে,—একটা জলজ্যান্ত মানবপ্রাণকে মাটিতে পুঁতে দিতে পারে!
নির্দয় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই মানিকজোড় যাপন করছিলেন লেখকদের চিরকাঙ্ক্ষিত কেয়ারলেস জীবন। দেহটা অচিরে খাদে পড়তে যাচ্ছে বা সেখানে পড়ার পর চোখ থাকিতেও অন্ধের নিয়তি মেনে খাদেই চলবে চংক্রমণ… দুজনের তা অজানা থাকেনি। যে-কারণে হয়তো শলাপরামর্শ করলেন তাঁরা,—একফালি রোদ্দুর দেখো আমাদের পায়ের মাঝখানে উর্বশীর মতো মদালসা শুয়ে আছে। পরে যা হওয়ার হবে, রোদ্দুরে গা আগে তাপিয়ে নেই চলো।
এমদাদ ও ইমদাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতমুখ, অগ্রজ ও অনুজ কবি-লেখকরা তাঁদের নামদুটো তখন গুলিয়ে ফেলছেন হামেশা,—এমদাদকে ইমদাদ এবং ইমদাদকে এমদাদ ঠাউরে বসছেন অহরহ, আর মানিকজোড়ি তার কিছু পরোয়া না-করে কাগজে ও কম্পিউটারে কিবোর্ড চেপে লাগাতার বুনছেন বাক্যজাল। খাদে পড়ার আগে কেবল এর’ম করে জাল বোনা যায়। এমদাদ ও ইমদাদ জীবনের ওই তুঙ্গ মুহূর্তগুলো ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ উপভোগ করছিলেন!
জীবনকে এভাবে উপভোগ করতে পারা এবং এর’ম করে লিখতে পারার মধ্যে ভণিতা ও জুয়েলারির বাড়বাড়ন্ত থাকে না। দুজনের লেখাকর্মে সুতরাং লাগামহীন কল্পনা ডানা মেলছিল। এখন হয়তো একে ছেলেমানুষী ভেবে তাঁরা নাকচ করবেন নিমিষে। কিন্তু নাকচ করলেই কি নাকচ হয়ে যায় সবকিছু? এটা ছিল সময়;—লেখক হতে চাওয়া দুই তরুণ নিজের সত্তার কাছে সৎ থেকে বেপোরোয়া ভাষায় বিস্ফারিত হওয়ার স্বপ্নটা দেখছিল। ‘আবেগ, ভাবাবেগ, ভাবালুতা, অতিরঞ্জন’কে এই সময়টায় রূপসী লাগে দেখে! ‘রূপসী বড়ো দরকারি, কিন্তু বিপজ্জনকও’;—তথ্যটা জেনে যাবার পরেও লিখতে চাওয়া লোক এর পরোয়া করে না। তাঁরা দুজনও করেননি যথারীতি।
লেখকজীবনের এই পর্বে বর্ণমালায় সাজানো প্রতিটা শব্দ, বাক্য, স্তবক, অনুচ্ছেদের ভিতরে গমনের কনফেশন লেখক স্বয়ং দিতে থাকে অবিরল! কোনো সেন্সর তথাপি তার বোধে কাজ করে না। নিজের উপর নিরোধ আরোপ করে না সে! নিজেকে এই বলে তাতিয়ে তোলে না :
‘দারুণ পরিপক্ক’ কিছু লিখতে হবে আমাকে; এমন কিছু, যা অন্য কেউ অতীতে লিখেছে, এখন লিখছে অথবা ভবিষ্যতে লিখতে থাকবে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমিও দেখাবো আমার হ্যাডম;—সত্তা থেকে ছিটকে বের হচ্ছে দেখো সুগম্ভীর মেঘের মতো মনোহর ইন্দ্রজাল!
মুহম্মদ ইমদাদের কুড়ি বছর আগে লেখা এই মনোলোগ এই কনফেশন নিজের ‘আত্মআমির’ সঙ্গে সংলাপের আবেগমথিত বিস্ফারটা সেরকম নয়;—আর নয় বলেই তা ‘মৌলিক’। মানবধরায় ‘মৌলিক’ বলে সত্যি কিছুর অস্তিত্ব যদি থাকে, তাহলে যুবাবর্ষে বিরচিত এই কবিতালেখ্য অন্তত আমার কাছে ‘মৌলিক, যেখানে এক সত্যপ্রাণ নিজেকে নগ্ন হতে দিচ্ছে দ্বিধাহীন।
ইমদাদের কুড়ি বছর আগে ব্যাকরণভাঙা আলেখ্যটি পুনরায় পড়তে বসে কবি রফিক আজাদের কথা মনে পড়ছে। ‘গদ্যের দীর্ঘ অরণ্যে আমি এক দিকভ্রান্ত পথিক’ শিরোনামে একটা কবিতাবই গুটেনবার্গের ছাপাকল থেকে বের করেছিলেন কবি। জটিল ঊর্ণাজালে বোনা গদ্যভাষে বক্ষ্যমাণ মনোলগটি লিখে ওঠার মুহূর্তে কবি মুহম্মদ ইমদাদ কি দিকভ্রান্ত বোধ করেছেন? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিচ্ছে এখন, সেইসঙ্গে এই অনুভূতিও জাগছে বটে,—নিজের গন্তব্য কবির জানা ছিল, এবং সেভাবে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অন্তে পৌঁছেছিলেন।
কবিতার প্রথাসিদ্ধ ব্যাকরণ ও স্বীকৃতিকে একপাশে সরিয়ে টানাছাদে লিখেছেন ইমদাদ। শব্দের সঙ্গে শব্দের বিবাহে বিবাহপ্রথাকে অনেকক্ষেত্রে মধ্যম আঙুল দেখাতে মনে ভয় কাজ করেনি। তাঁর এই মিডল ফিঙ্গারিংটা কবিতালেখ্যে বেশ মানিয়েও গেছে! লাইন ভেঙে আগাচ্ছেন বা পরের লাইনে গমন করছেন প্রথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে! শব্দের সঙ্গে শব্দের জোড়টাও সমাস মেনে ঘটছে না নিখুঁত, এবং এই নিখুঁত না হওয়াটা এখানে জন্ম দিচ্ছে নতুন ব্যঞ্জনার! ২০২৬-এ এসে পুনরায় পড়তে যেয়ে কারো মনে হতে পারে,—এই… এই অংশটুকু কবি ছাটাই করলে ক্ষতি ছিল না; ছাটাই করতে মনে আপত্তি থাকলে অন্ততপক্ষে কাটছাট করে ঋজু করা যেত… ইত্যাদি। আমিপাঠকেরও তা মনে হয়নি এমন নয়, তবে একে গৌণ করেই অনায়াসে শুনতে পারছি কবির চেতনস্রোত থেকে উঠে আসা শব্দের কলরব।
এটা আবার এআইয়ের যুগ বটে! কবি ইমদাদের সঙ্গে তাল দিয়ে ওই ব্যাটা কবি হতে মরিয়া এখন! তাকে যদি পড়তে দেই, আমি নিশ্চিত,—ঝুড়িঝুড়ি প্রশংসার সঙ্গে আত্মসংমের কথা পাড়বে। রহসময়তা রাখার জন্য কোথায় কাঁচি চালানো যায়, প্রবীণ কিন্তু ফতুর কবি ও সমালোচকের মতো দেবে নসিহত। আগ বাড়িয়ে নমুনা করবে হাজির। এআই আসার আগে কি এগুলো ছিল না বাহে? খুব ছিল, বেশ চলত মুরব্বিদের এসব ভ্যানতারা। কৌতূহল বরং এখানে আমার,—২০২৬ সনে পা দিয়ে ‘পরিপক্ক’ ইমদাদ কীভাবে দেখছেন নিজের এই সৃজনকে? অবিকল রাখবেন তো, নাকি এতোদিনে নিজেও মুরব্বি হয়ে ওঠার কারণে ছাটাইয়ে নামবেন উন্মূল বয়সকালে বিরচিত এই আত্মভাষণ?
উত্তর আমার কাছে অজানা। তবে একথা নিশ্চিত বলতে পারি,—কুড়ি বছর পর সূনৃত থেকে এই কবিতালেখ্য থার্ড লেন স্পেস-এ তোলার মুহূর্তে ছাটাই কিংবা পরিমার্জনার অনুভূতি পাঠকসত্তায় প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে না। মেনে নিচ্ছি,—স্রোতের টানে গুঞ্জরিত জলমর্মরে কিছু বাহুল্যদোষ রয়েছে, কিন্তু কবিতার স্বয়ম্ভর গুণে তা মানিয়ে গেছে মাইরি! কম্প্যাক্ট করা ভালো, তবে সকল কবিতার জন্য এটা কোনো সংবিধান নয়। ‘হারমোনিয়াস দেহে হেলান দিয়ে, এক পাথরযুবক’ শিরোনামে নিজেকে নিরীক্ষাধীন রাখার বয়সে লেখা মুহম্মদ ইমদাদের কবিতালেখ্যটি সুতরাং অবিকল রাখার পক্ষে সায় থাকবে আমার। এর শব্দ, বাক্য, যতিচিহ্নরা স্বতঃস্ফূর্ত, এবং তারা সম্ভাবনার আলোয় দ্যুতিমান এক ছন্নছাড়া কবির হদপাতাল থেকে তখন উঠে এসেছিল। একে এভাবে পড়লে হয়ে ওঠে পরম!
জানি বাহে জানি, তোমরা বলবে,—শর্টকার্টের যুগে এটা কে পড়তে যায়! মানুষগুলো লাগাতার চলতে থাকা রিলের মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবন তার অভ্যাসে নিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘ কবিতা, লম্বাপণা গদ্য, শত-শত পৃষ্ঠাজুড়ে ছড়ানো আখ্যান পড়বার অবসর ও মনের খিদে উবে গেছে বেমালুম! মন খারাপ হলেও সত্যটা নিমর্ম,—যা-কিছু ছিল মস্ত বড়ো, আসমানজুড়ে ছড়ানো মেঘখণ্ডের মতো সুবিপুল, যা-কিছু ছিল ও আছে মর্ত্যে হিমালয়… এগুলোকে ধারণ করার শক্তি মানুষ হারাতে চলেছে! সকল ভার যন্ত্রসত্তাকে দিয়ে লঘু হতে চাওয়া এই মানুষকে হামিংবার্ডের মতো পলকা হওয়ার নেশায় পেয়েছে। ছোট করে বলাকে কামিয়াবি ভাবছে, এবং তা হতে হবে তার বোঝার পক্ষে সহজ। তো, এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা উঠবে,—মুহম্মদ ইমদাদের কুড়ি বছর আগে রচিত কবিতালেখ্যটি কি পড়বে ২০২৬ বসন্তের কোনো হামিংবার্ড? আমি সন্দিহান! দিন যাচ্ছে, আর মানুষ ‘বামন’ হচ্ছেন বটে! তবু এবং তবু থার্ড লেন স্পেস-এর হয়ে আমিপাঠক এটা পড়ছি এবং পড়ব,—যতক্ষণ-না মনে হবে প্রাসঙ্গিকতা অনুভূত হচ্ছে না এর!
ছোট করে ‘হাইকু’ মানুষ লিখেছে তো হাজার বছর! ছাব্বিশের আদমসুরত ওটা কি পড়তে চায় এখন? না, চায় না। কারণ, সে জানে, তিন লাইনের ‘হাইকু’র মধ্যে হিমালয় বা অসীম চরাচরকে পলকে দেখে নেওয়ার সক্ষমতা সে হারিয়েছে। মগজের বিলিয়ন নিউরন কোষকে এর জন্য ব্যতিব্যস্ত করাটা তাকে দিয়ে হচ্ছে না। জুকারবার্গের নেশাধরা ফাঁদে ঢুকে হয়ে পড়েছে বেকুব একজন!

এরকম এক পাঠখরার দিনে মুহম্মদ ইমদাদের কবিতালেখ্য থার্ড লেন স্পেস-এর হয়ে পুনরায় পাঠ করছি এই সমীকরণে ভর দিয়ে,—মারখাওয়া পরাস্ত মানুষ দূরাতীত কোনো আগামীতে নিজ ডেরায় ফিরবে। সব হারানো মানুষগুলো আবার ঘন হয়ে গোল হয়ে বসবে নূরলদীনের ডাকে। যেহেতু, তাদের জন্য এছাড়া আত্মরক্ষার বিকল্প বেঁচে থাকবে না।
ঘনশীত নামবে কি তখন? হ্যাঁ, নামবে, তাকে নামতে হবে মানুষকে বাঁচানোর জন্য। এই শীত তাদেরকে নৈকট্যে আনবে। উষ্ণ হওয়ার জন্য তারা বসবে পাশাপাশি, একে অন্যকে আলিঙ্গনে জড়াবে। তখন, আগুন জ্বালবে মানুষ। এবং, ‘অবসরের গান’-এর মতো কোনো কবিতালেখ্য পাঠের আগ্রহ তার মনে তীব্র হবে। আমরা সেদিন বেঁচে থাকব না, কিন্তু আমাদের উত্তরসূরি কবি ও পাঠক হয়তো মুহম্মদ ইমদাদের এই কবিতালেখ্যটি গোল হয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর সমুখে পড়বে সাগ্রহে…
যে জন্মায়নি তার মতোই অপাপবিদ্ধ;
ভালো।
এরকম লাইন তাকে চমকে দেবে কি? একটু দার্শনিক হয়ে উঠবে? যেমনটা আমরা হয়েছি কবেকার ধূসর ধুলোয় বিলীন কিটস, এলিয়ট, ইয়েটস, রিলকে অথবা ঘরের ছেলে জীবনানন্দ, উৎপল, শক্তি পড়তে বসে! মনে হতো,—চেতনপ্রবাহের ভূতুড়ে স্রোত বইছে, আর সেখান থেকে গমগম করে বেরিয়ে আসছে নিযুত শক্তিকণা! ইমদাদ যেমন লিখেছেন তাঁর ছন্নছাড়া তারুণ্যে এরকম কোনো পঙক্তি…
মানুষের চেনা গ্যালাক্সি, তুমি
যার থেকে রাত্রিবেলা ঝরে মানুষেরই মৃত্যু অবিরত।
জন্ম না নিলে কী হতো, আর জন্ম নেওয়ার কারণে কী হয় মানুষের… এই দ্বিরাভাসে গোপন থাকে সকল জিজ্ঞাসার উত্তর। এবং ঠিক সেইক্ষণে, আগুন তাপানো কোনো শীতরাতে আমাদের উত্তরসূরি নিজের ভিতরে টের পাবে এরকম চেতনস্রোত! মগ্ন সন্ন্যাসীর গলায় সে পড়বে…
স্ফূর্তিমান দেহের বালিকা, দ্যাখো, তোমার কাঁপা কাঁপা স্তনের মতন আজকের ভোর। এই ভোর পৃথিবীর না, মানুষের, মানবিক উপমা হয়ে বালিকার স্তন; রোদরাঙা, অশাপান্ত
বাতাসের নরম আত্মজা—আমাকে পৌঁছে দিচ্ছে কোথাও।
পৌঁছে দেওয়ার খতিয়ানটাই আজোবধি লিখছি আমরা। কবি মুহম্মদ ইমদাদ তারুণ্যের ছন্নছাড়া দিনে সিগ্রেটশলাকায় অনবরত দম দিতে-দিতে, এবং তার ঠিক পাশে ছাত্রাবাসের ঘুপচিকোণে ‘পাথরখেকো’ এক মানুষের কাহিনি লিখতে নিমগ্ন এমদাদ রহমানের দিকে একপলক তাকিয়ে লিখছেন :
পণ্যপৃথিবীকে চাও যদি, না-যদি মানুষ, জীবন্ত মৃতদেহ তুমি।
হে কবি ইমদাদ, এটা একুশ শতক, এটা দুইহাজার ছাব্বিশ চলছে, এটা পণ্যপৃথিবীর মরণ ও এখনো অজানা গণবিলুপ্তির আভাস দিচ্ছে। আপনি কি টের পাচ্ছেন কিছু? বুঝলেন তো,—মানুষ থেকে ‘না-মানুষ’ হওয়ার একটা পর্যায়ে আমরা যাপন করছি কীটের জীবন। কীট মরে যাবে। কীট মাটিতে মিশে যাবে। কীট সার হবে। সার থেকে জন্ম নেবে নতুন বীজের জীবন। নতুন মানুষ কি জন্মাবে তারপর? যদি তাই হয়, আপনি মুহম্মদ ইমদাদ কুড়ি বছর আগে নিজের অজান্তে ছন্নছাড়া সিগ্রেটশলাকায় টান দিতে-দিতে দ্রষ্টার মতো এ-লাইনটি লিখে ফেলেছেন।
এরকম অনেককানেক দ্যুতিময় উচ্চারণ, চেতনস্রোত থেকে উঠে আসা প্রলাপের হারমোনি এই সুদীর্ঘ বিবরণে যে-পাঠক পাচ্ছে, তার পক্ষে একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই রচনা, কুড়ি বছর পার হয়েও আমিপাঠকের কাছে কবি মুহম্মদ ইমদাদের সবচেয়ে পরিণত বিস্ফার বলে গণ্য হতেছে। এবং তা ঘটেছে ওই ছন্নছাড়া বয়সকালে, যখন সিগ্রেটশলাকায় সারাক্ষণ পুড়েত থাকা কবিটি ছিল না ‘পরিপক্ক’। আর ছিল না বলে একটা অনেস্ট কনফেশন, যার আয়নায় আমরা যে-কেউ নিজের মুখটা দেখে নিতে পারি,—কবি তার ব্যবস্থাপত্র লিখেছিল।
আজকের ইমদাদ বয়সে ‘পরিপক্ক’ এবং সহসা নিজেকে বার্গম্যানের ওই ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ-এর অভিজ্ঞতায় নিজেকে করবেন আবিষ্কার। প্রতিটা বয়সের পৃথক সৌন্দর্য থাকে জানি। থাকে কদর্য ও নান্দনিক দুটো দিক। ইমদাদের কবিসত্তা বিবর্তনের নিয়ম মেনে এভাবে এখনো সচল। কুড়ি বছরে অনেক পরিপক্ক কবিতাফল তার বাগানে নিশ্চয় ফলেছে, এবং পাঠকঠকানো কবিতাও-যে লিখছেন না এমন তো নয়!
কবি যত পরিপক্ক হতে থাকে, ঠকানোর মাত্রা তত বাড়ে। তার মধ্যে দু-চারটা এমন গাছে ধরে, যাকে দেখে মনে হয় এই তো সোনা ধরেছে গাছে। ইমদাদের ক্ষেত্রে কতটা কী সে মোর অজানা! তাঁকে আগের মতো নিবিড় পড়া হয় না অনেকদিন। আমার বরং ভালো লাগছে কুড়ি বছর আগের এটা। যেখানে, এক কবি চেতনস্রোতে অবশ থেকে, যেন-বা নিজের ভিতরের আদিমানুষটাকে উগড়ে দিয়েছিলেন।
মুহম্মদ ইমদাদের নিজের কাছে এর মূল্য কেমন দাঁড়িয়েছে কে জানে! আমিপাঠকের কাছে মূল্যটা এখনো অমলিন। দূর ভবিষ্যতের কোনো কবি ও পাঠকের কাছে তা অমলিন থাকবে বলে ভাবতে চাই এখন! সেইসব মানুষ, যারা আমরা ‘না-মানুষের দল’ বিলুপ্ত হওয়ার পর মানুষ হওয়ার জন্য গোল হয়ে ঘন হয়ে বসেছে। শীতরাতে আগুন তাপাতে বসে পড়েছে মানুষ। ভবিষ্যতের কবি ইমদাদ… এক পাথরযুবক… তার হারমোনিয়াস কনফেশন থেকে পড়ছে অনর্গল! ধুয়েমুছে যাচ্ছে যত গ্লানি মানুষ একদিন জমিয়েছিল ধরায়…!
—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
. . .
. . .
লেখক পরিচয় : মুহম্মদ ইমদাদ

মুহম্মদ ইমদাদ মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার সন্তান। মনু নদীর জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে শিক্ষকতাকে পেশা করে নিয়েছেন। স্বনামধন্য মুহিবুর রহমান একাডেমিতে ছাত্রদের পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন। মূলত কবিতা তার বাড়িঘর হলেও, সাহিত্যিক গদ্য ও ভাষান্তরেও সমান সাবলীল। শূন্য দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবিকণ্ঠ রূপে চিহ্নিত বটে, তবে নিজেকে দশকসীমায় আটকে না রেখে লিখেছেন নানামাত্রার কবিতা। প্রকাশিত কবিতাবইয়ের মধ্যে ‘অন্ধ পৃথিবীর জানালাগুলি’, ‘নদীমাতৃক পৃথিবী মেঘমাতৃক আকাশ’, ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে’, ‘পাখির জুতা নাই’, ‘প্রেগন্যান্ট পাগলী ও অন্যান্য কবিতা’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ‘আধুনিক কবিতা বিষাদবৃক্ষের ফুল ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ নামে গদ্যবই পেয়েছে পাঠসমাদর। এছাড়াও অনুবাদবইয়ের মধ্যে ‘দূরাগত স্বর’, ‘চূর্ণচিন্তন’, ‘আর্থার শোপেনহাওয়ারের কথাগুলি’, ‘মিথের পৃথিবী, পৃথিবীর মিথ’ তাঁকে এনে দিয়েছে পৃথক স্বীকৃতি।
. . .

মুহম্মদ ইমদাদ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম


